Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২
Tahmina Akhter

— পাতিলে ভাত নেই কেন, আম্মা?
কথাখানি বলেই চুপ হয়ে গেছে আলো। সিতারা বেগম চোখ রাঙিয়ে বললেন,
— ভাতের চালের কেজি কত জানিস? রোজ রোজ যে তোকে লোকজন দেখতে আসে, তাদের জন্য ফলফলাদি কিনতে কিনতে তোর বাপ শেষ হয়ে যাচ্ছে। চাল নেই ঘরে। বয়ামে কটা বিস্কুট আছে খেয়ে নে।
সিতারা বেগমের কথা শুনে আলোর পেটের খুদা যেন মরে গেল। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পাতিলটা রান্নাঘরে রেখে আসার সময় দেখল একটা প্লেটে ভাত আছে। এবার যেন আলো সম্পূর্ণ ভেঙে পরল। চোখের পানি আপনাআপনি চলে এলো। সিতারা যদি তার আপন মা হত তাহলে কি আজ মেয়েকে না খাইয়ে রাখতে পারত?

মুখের ওপর ওড়না চেপে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল আলো। নিজের জন্য বরাদ্দ ঘরে গিয়ে চুপচাপ মেঝেতে পাতানো বিছানায় শুয়ে পরল সে। মাথার ওপর চরকির ন্যায় ঘুরছে ফ্যান। ফ্যাকাশে রঙা ছাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের কোল ঘেসে পানি বেয়ে তার বালিশ ভিজছে তখন।
কাঁদতে কাঁদতে আলো ক্ষুদার্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পরল। ক্লান্ত দেহ যেন বেমালুম পেটের খুদাকে ভুলে গেল।
সকালের মিষ্টি রোদে আলোর ঘুম ভাঙে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে পরল। কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে নিজেকে পরিপাটি করে তুলল। তারপর, তার মায়ের কাছে চলল রান্নাঘরের দিকে। গিয়ে দেখল সিতারা বেগম চুলায় ভাত চরিয়েছেন। আলোকে দেখে তিনি মুখ মলিন করে বললেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— ওখানে চালনিতে কটা আলু আছে। কুচি করে কেটে দে। সঙ্গে ডিম ভেঙে দিয়ে ভাজি করব। খেতে পারবি তো নাকি?
— পারব মা। এখন যদি বলো পাথর খেয়ে পেটের খুদা মেটাতে হবে, তাও পারব। দুনিয়াতে যেকোনো পশু এবং মানুষকে কেবল পেটের ক্ষুধা কাবু করে ফেলে। আমাকেও কাবু করে ফেলেছে।
আলোর মনের কথা মনে রইল। অবশ্য সিতারা বেগমের কাছে প্রকাশ করে লাভ কি? তার কি মন পুড়ে আলোর জন্য?
সকালের খাবার তৈরি হলো সাদামাটা আয়োজনে। ডিম দিয়ে আলু কুচি করে ভাজা, ধোঁয়া ওঠা সাদা গরম ভাত এবং চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা। সিতারা বেগম আজ সবার আগে আলোকে খাবার বেড়ে দিলেন। হয়ত, এতিমের ওপর আজ তার মায়া হয়েছে!

গতকাল দুপুরে কোনোমতে খেয়েছিল আলো। তারপর, তো পানি ছাড়া কিছুই জোটেনি। পুরো একটা বেলা এবং রাত গড়িয়ে আজ সকালে তার পেটে দানা পরল। আলো আজ পেট পুরে খেলো৷
খাওয়ার পর বাসনকোসন ধুয়ে রান্নাঘরে রেখে নিজের ঘরে এলো আলো। বইখাতা নিয়ে কিছুক্ষণ পড়াশোনা করল। তারপর, পরিপাটি হয়ে কলেজের উদ্দেশ্য রওনা হলো। কলেজে পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগে বিশমিনিট। তাই ক্লাস শুরু হওয়ার আর কিছু সময় আগে থেকে রওনা হয় আলো। যেন সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারে। অবশ্য আলোর বাবা কিন্তু আলোকে রোজ রিকশা ভাড়া দেয়। কিন্তু, আলো ওই টাকা খরচ করে না। জমা করছে। তার স্বপ্ন পূরণের জন্য রেখে দিচ্ছে। হয়ত পরিমাণে কম হতে পারে। তবুও যেন আলো স্বস্তি পায় এটুকু সঞ্চয় করে।
তাই হেঁটে কলেজে যায়। হোক না কষ্ট তাতে কি। একটা গানের লাইন আছে না “আগুনের দিন শেষ হবে একদিন” ঠিক সেইদিনের অপেক্ষায় আছে আলো।
আমি এই গল্পের লেখিকা Tahmina Akther – তাহমিনা আক্তার এই পেইজে গল্পের বাকি পর্বগুলো পেতে ফলো করুন।

ক্লাস শেষ হবার পর বাড়ির পথে রওনা হয় আলো। আজ সূর্যের তাপ অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশ প্রখর। আলো মাথার অংশের ওড়নাটা আরেকটু টেনে নিলো। রোদ থেকে বাঁচার বৃথা চেষ্টা। হুট করে হোঁচট খেলো সে। জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেছে। আলো জুতাটা হাতে নিতেই তার চেহারা মলিন হয়ে যায়। মাসের শেষের দিক এখন। বাবার ওপর এমনিতেই সংসার চাপ, বাবার এবং মায়ের প্রেশারের ঔষুধের খরচ, তার পড়াশোনার খরচের চাপ। মাঝেমধ্যে খরচ বাড়ানোর বোনাস হিসেবে পাত্রপক্ষ তো আছে। এখন বাবাকে কি করে নতুন জুতা কেনার কথা বলবে সে?
এমনসময় অদূরে চোখ পরল আলোর। মুচির দোকান যাচ্ছে। অজান্তেই আলোর মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে পায়ের জুতাজোড়া খুলে হাতে নিলো। তারপর, এগিয়ে যায় সেদিকে।

— কাকা, এই জুতাটা সেলাই করে দিন তো।
আলোর ডাকে অর্ধবয়স্ক লোকটা আলোর দিকে তাকালো। জুতা হাতে নিয়ে বলল,
— এমন পুরনো জুতা সেলাই করে লাভ নাই।
আলো লজ্জা পেলো কথাটি শুনে। ইতস্ততভাবে বলল।
— আপাতত বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য হলেও জুতাটা সেলাই করে দিন।
— ঠিক আছে। কিন্তু বিশ টাকা দেয়া লাগবে।
লোকটা তৎক্ষনাৎ তার কাঠের বাক্স থেকে সুই সুতা বের করে জুতা সেলাই করতে শুরু করল। আলো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। দুই হাত সামনেই একটা টংয়ের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু চ্যাংড়া ছেলেপেলে গুলো আলোর দিকে তাকিয়ে কি যেন বলাবলি করছিল আর হাসছিল! আলো আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে রইল। কোনোমতে জুতাটা সেলাই হলে চলে যাবে।

– নেন হইয়া গেছে সেলানি। ট্যাহা দেন?
আলো জুতা পায়ে পরল। তারপর, ব্যাগ থেকে টাকা নেয়ার জন্য হাত দিলো। কিন্তু, এ কি? টাকা নেই যে! আলো অস্থির হয়ে টাকা খুঁজতে লাগল। কিন্তু, এতটুকু ব্যাগের কোনো কোণায় টাকা নেই। “হায় হায় বাবার কাছে থেকে আজ তার টাকা নিতে মনে ছিল না!”
বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও আলো যখন টাকা বের করতে পারিনি তখন মুচি একপ্রকার বিরক্ত হয়ে বলল,

— ট্যাহা বাইর করেন! আর কতক্ষণ অপেক্ষা করুম?
আলোর লজ্জায় মরে যেতে মন চাইল। আজই কেন তার সাথে এতকিছু হচ্ছে!
— চাচা, আমার বাসা তিন লাইন পরে। আপনি অপেক্ষা করুন আমি টাকা নিয়ে আসি। ব্যাগে টাকা নেই।
— ট্যাহা নাই তাইলে জুতা সেলাই করতে আইছো কেন?
আমার ট্যাহা দিয়া এরপর এইখান থেইকা যাবা।
— আমার ব্যাগে টাকা নাই। এখন এখান থেকে যেতে বারণ করছেন! তাহলে আমি আপনাকে টাকা দেব কি করে?
— আমি এতকিছু বুঝি না। ট্যাহা দিয়া এরপরে যাইবা। দুনিয়ায় এখন বাটপার দিয়া ভইরা গেছে। তোমারে আমি যাইতে দেই আর তুমি পগারপার হইয়া যাও। এমন হইতে দিমু না আমি।
আশেপাশের অনেক মানুষ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আলোর এত অসহায় লাগছিল প্রকাশ করা যাবে না। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে মন চাইছে তার৷

— আমি জুতাগুলো আপনার এখানে রেখে যাই। দামি জুতা এইগুলো। আমি আপনার টাকা নিয়ে এসে জুতাগুলো নিয়ে যাব।
— যদি ফিরা না আসো?
— তাহলে জুতা জোড়া বিক্রি করে দিয়েন।
মুচিকে জবাব দিয়ে আলো খালি পায়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হচ্ছিল এমন সময় কেউ “এক্সকিউজ মিস. ” বলে ডাক দিলো। আলো পেছনে ঘুরতেই দেখতে পেলো সূদর্শন এক যুবককে৷ আলো ভ্রু কুঁচকে তাকালো। আলোর চেহারার অভিব্যক্তি দেখে যুবকটা দুই কদম এগিয়ে এসেও পিছিয়ে গেল।
— আপনাকে ডাকছিলাম ।
যুবক খানিকটা ইতস্তত করে বলল। আলো বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে বলল,

— কেন?
— আপনি যদি মাইন্ড না করেন তাহলে আপনার জুতা সেলাইয়ের বিল আমি দিতে চাই।
— আপনি কেন দিবেন? আপনার কাছে চেয়েছি আমি?
আলো যেন আরও বিরক্ত হলো নিজের ওপর,নিজের পরিবারের স্বচ্ছলতার ওপর, অর্থনৈতিক অবস্থা ওপর৷ সেই সঙ্গে বিরক্ত হলো সাহায্য করতে আসা ভদ্র মহাশয়ের ওপর।
— আমি কখন বললাম আপনি চেয়েছেন! আমি তো শুধু আপনাকে হেল্প করতে চেয়েছি!
— আপনি শুধু শুধু আমার সময় নষ্ট করছেন। আমার আপনার সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
— আমার একটা কাজের বিনিময়ে হেল্প করতে চাই আপনাকে?
যুবকের কথা শুনে আলো চোখ ছোট করে তাকালো লোকটার দিকে। লোকটাকে কোথাও দেখেছে মনে হচ্ছে? কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছে না!

— আসলে আমি খুলশীতে থাকি। এদিকে তেমন আসা হয় না। তাই কাউকে চিনিও না তেমন। আমি একজনকে খুঁজছি আসলে।
— আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? আপনি যাকে খুঁজছেন,আমি তার পরিচয় জানি বলে ধারণা হচ্ছে নাকি আপনার ?
— আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? আগে আমার পুরো কথাটা তো শুনুন?
লোকটার কথা শুনে আলো এবার সত্যি ধৈর্যহারা হয়ে বলল,
— বলুন?

— আমার মা গতকাল সন্ধ্যায় এই কলোনির সামনে অচেতন হয়ে পরে যায়। তখন আমার মা’কে একটা মেয়ে হেল্প করে। আমাকে কল করে আমার মায়ের খোঁজ জানায়। এবং আমিও আমার মাকে সহি সালামতে ফিরে পাই। কৃতজ্ঞতা থেকেই সেই মেয়েটাকে আমার মা খুঁজছেন। সকাল থেকে আমি এখানকার বেশ কয়েকটা দোকানে মেয়েটার পরিচয় জানার জন্য চেষ্টা করেছি। কেবলমাত্র একটা তথ্য উদ্ধার করেছি। মেয়েটা নাকি পাহাড়তলী কলেজে পড়ে! আপনিও হয়ত সেই কলেজের স্টুডেন্ট?

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১

আপনার আই কার্ড তো বলছে আপনিও পাহাড়তলী কলেজের স্টুডেন্ট?
লোকটার পুরো কথা শুনে আলোর মাথা ঘুরছে। বলে কি?এত খুটিনাটি তথ্য কিভাবে খেয়াল করছে? সামান্য একটু হেল্প করাতে উনারা আলোকে খুঁজছে? আলোর কাছে এসে আলোর পরিচয়ের খোঁজ করছে? আচ্ছা এই লোকটাই কি “মেঘালয়”। হুট করে আলো মিইয়ে যায়। যদি লোকটা সত্যি সত্যি মেঘালয় হয় তো? হতেও পারে? কারণ গতকাল সন্ধ্যায় সেখান থেকে চলে আসার সময় আবছা আলোয়ে লোকটাকে দেখেছিল অস্পষ্ট দেখা আরকি? তাই হয়ত চেনা চেনা লাগছে।

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩