Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১২

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১২

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১২
নুরিয়া ইসলাম

বাইরের আকাশে জমে থাকা কালো মেঘের মতোই এরিকের বুকের ভেতরেও জমে আছে অজস্র অস্থিরতা ঠিক যেমন সন্ধ্যার শেষ আলোয় শহরের চেনা গলি হারিয়ে যায় অচেনা অন্ধকারে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এরিক নিজেকে একা, নিঃসঙ্গ এক নাবিকের মতো মনে করে যে সমুদ্রের মাঝখানে দিগন্তহীন অস্থিরতার ঢেউয়ে ভাসছে। বাতাসে ভেসে বেড়ানো সিগারেটের ধোঁয়া তার বুকের গভীর থেকে উঠে আসা চাপা দীর্ঘশ্বাসের মতো, প্রতিটি কুয়াশার রেখা যেন তার মনের অজস্র অশান্তি আর অজানা অনুভূতিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে।বৃষ্টির ফোঁটার মতোই তার ভাবনাগুলো জানালার কাঁচে জমে, কখনও গড়িয়ে পড়ে, কখনও মিলিয়ে যায় অজানায়।

ইনায়ার মুখ, তার ভয় আর রাগ সবকিছুই এরিকের মনের আকাশে বিদ্যুতের ঝলকের মতো ফিরে ফিরে আসে, কখনো মৃদু, কখনো প্রবল ঝড় হয়ে। সে চায় ভুলে যেতে, অথচ স্মৃতির কুয়াশা ভেদ করে সেই নির্ভীক চোখের দৃষ্টি তার বুকের গভীরে বাজতে থাকে এক অজানা অনুভূতি , এক অব্যক্ত হাহাকার হয়ে।
এক পর্যায়ে সে বিরক্ত হয়ে নিজের মনে চেঁচিয়ে বলে উঠে,
“Why the fuck can’t I get her out of my head?”
এই বলে, এরিক জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে নিঃশব্দে ফিসফিস করে,
“Shit… এটা তো ঠিক না। কেন ওর কথা মাথা থেকে ঝেটিয়ে ফেলতে পারছি না? ও তো আমার জগৎ থেকে কত দূরে। ও একটা মুসলিম মেয়ে, আমি ওর জন্য একেবারেই নিষিদ্ধ।তবু কেন ওর সেই চোখ, সেই নির্ভীক তেজ আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেয়?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

এরিক চোয়াল শক্ত করে আয়নার দিকে তাকায়। চোখে ঘুম নেই, মুখে ক্লান্তি, আর মনের ভেতর এক গুমোট অন্ধকার। নিজেকে দেখে নিজেই কেমন ঘেন্না লাগে।
“Fuck this feeling…” সে ফিসফিস করে, গলার স্বরটা ঠান্ডা অথচ ধারালো। সে নিজের দিকেই তাকিয়ে ঠাট্টার সুরে বলে,
“Seriously, Eric?” … You? Falling for hijabi girl… shit?”
(সিরিয়াসলি, এরিক? তুই? একটা হিজাবি মেয়ের জন্য এমন করছিস? হ্যা! যেই মেয়েকে তুই সহ্যই করতে পারতি না, সেই মেয়ের জন্য কেন তোর ভেতরে এই নিষিদ্ধ অনুভূতি জেগে উঠল? you are such a pathetic!”)
সে নিজের মনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে ।
“She’s not even your type, man. না ফায়ার, না ফান, না ফাকড আপ। just plain fucking purity.”

তখনি তার কল্পনায় ইনায়ার সরল মুখটা ভেসে উঠে সেই নির্ভীক চোখ, সেই ঠোঁট তার সেই তেজ,সবকিছু। সে আনমনে হেসে বলে উঠে,
“Hijabi girl with those eyes full of fire..
পরমুহূর্তেই বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,
What the hell was I even thinking?”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, নিজের মনে গালি দিতে লাগলো সে,
“You’re getting soft, Eric. Weak. Just like every pathetic idiot out there chasing feelings.”
(দেখ, এরিক তুই মেয়েটার প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছিস? হ্যা! দুর্বল, একদম বাকি সব হাবলাদের মতো যারা শুধু ফিলিংসের পিছনে ছুটে বেড়ায়।
আমিও কি তাই হয়ে যাচ্ছি নাকি? ধুর,আমি এরিক অ্যাসফোর্ড, নিজেরে এতটা ছোট ভাবার টাইম আমার নেই।”)
নিজের ভিতরের অনুভূতি দাবাতে সে হঠাৎ ঘুষি মারে জানালার পাশের দেয়ালে,

“Snap the fuck out of it!”
“She probably thinks you’re just another arrogant asshole… and she’s right.”
এই বলে একটুখানি হেসে নেয় সে , তারপর আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“Love? That shit’s for fools. That girl she doesn’t belong in my world. She deserves some clean-souled dreamer, not a fuck-up like me.”
এরিক গ্লাসে স্কচ ঢেলে নিয়ে একটা ঢোঁক দিয়ে দেয়। তারপর ফোন তুলে কাউকে একটা মেসেজ পাঠায়,
“Come to my place. Need a distraction.”
আধাঘণ্টা পর দরজার বেল বেজে ওঠে। রুমে ঢুকে পড়ে অলিভিয়া, চোখে তার স্পষ্ট ফুটে উঠে মোহ আর এরিককে পাওয়ার প্রত্যাশা।
এরিক তাকে কাছে টেনে নেয়, ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে যায়, কিন্তু ঠিক তখনই চোখের সামনে ইনায়ার চেহারা ভেসে উঠে।
এরিক অলিভিয়াকে ছেড়ে হঠাৎই পিছিয়ে যায়, অলিভিয়া অবাক হয়ে বলে,

“What the hell is wrong with you, Eric?”
এরিক জোরে চিৎকার করে উঠে,
“JUST SHUT THE FUCK UP!”
রাগে গ্লাস ছুড়ে দেয় দেয়ালে। অলিভিয়া ভয়ে সরে যায়। আর এরিক দেয়ালে ঘুষি মেরে বলে,
“Why can’t I stop thinking about her?”
অলিভিয়া এরিকের কাছে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে জরিয়ে ধরে বলে,
বেইবি কী হয়েছে তোমার।
এরিক এক ঝটকায় অলিভিয়াকে ছাড়িয়ে নিয়ে, রাগি কন্ঠে বলে,
just get lost.
অলিভিয়াঃ কিন্তু বেইবি।
এরিকঃ don’t repeat myself, consequences won’t good for you?
এরিকের হুমকি শুনে অলিভিয়া সেইখানে আর এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না।
অলিভিয়া চলে যেতেই, এরিক ওয়াশরুমে গিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধোয়। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে:
“She’s getting into my fucking head.”

এরিক ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে, আয়নার সামনে শেষবার তাকিয়ে ঠান্ডা নিঃশ্বাস ফেলে। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে “Dad calling…”
এরিক একটু চোখ কুঁচকে, ঠোঁটে বাঁকা হাসি হেসে বলে,
“Of course… who else?”
এরপর ফোনটা রিসিভ করে, কাঁধে ঠেকিয়ে সিগারেট ধরায়,রুক্ষ কন্ঠে বলে,
“What?”
রিচার্ড অ্যাসফোর্ডঃ

“তুমি আবার বাইক রেসিং করেছ? পুলিশ আমাকে ফোন করেছে, এরিক! তুই কখনই বদলাবি না, তাই তো!
এরিকঃ “তোমার কথা কি কখনো ‘how are you’ দিয়ে শুরু হয় না? সবসময় শুধু অভিযোগ, শুধু বকা—relax, আমার জন্য এত সিরিয়াস হওয়ার দরকার নেই। I’m not here to play your perfect son.”
মিস্টার রিচার্ড রেগে এরিককে বলে উঠে,
“You haven’t even outgrown your own father, you insolent boy. All I want is for you to be a man just be a man.”
( নিজের বাপের থেকে বড় হয়ে যাওনি তুমি বেয়াদব ছেলে। আমি শুধু চাই, তুই একটু মানুষ হ।বড় হ”)
এরিক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে উঠে,

Save the lectures, Mr. Richard. I stopped caring about being ‘a man’ the day I realized men like you never mattered.”
( আমাকে এইসব জ্ঞান দিতে আসবেন না, মিস্টার রিচার্ড। মানুষ হই না হই, আপনার মতো লোকদের কথায় আমার কিছু যায় আসে না।”)
মিস্টার রিচার্ড চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,
“Enough! Don’t test my patience, Eric. You’re still under my roof, don’t ever forget that.”
এরিক গভীরভাবে নিঃশ্বাস ফেলে, সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে ফ্লোরে ফেলে পায়ের নিচে চাপা দেয়।
“Look, I didn’t ask for this call. If all you want is someone to yell at, call your assistant. I’ve got a life to live.”
(শুনুন, আপনাকে ফোন করতে বলিনি আমি। চিৎকার করার দরকার হলে আপনার পিওন বা সহকারীকে ধরুন। আমি ব্যস্ত, আমার নিজের লাইফ আছে, আপনার আদেশে চলার টাইম নেই আমার।”)

ইনায়া ক্লাসরুমের জানালার পাশে বসে মনোযোগ দিয়ে লেকচার শুনছিল। পড়াশোনায় যতই মনোযোগী হোক, মনটা কোথাও যেন খালি। একজন আপনজন, একজন বন্ধুর অভাব বড্ড বেশি অনুভব হচ্ছিল তার। এত বড় ক্যাম্পাস, এত মানুষের ভিড়, তবুও ইনায়ার মনে একাকিত্বের ছায়া নেমে আসে।
হঠাৎ, ক্লাসের মাঝে এক মিষ্টি কণ্ঠের ডাক ভেসে আসে,
“Hi, can I sit here?”
ইনায়া চোখ তুলে দেখে, মেয়েটির মুখে সরল হাসি, চোখে অদ্ভুত কোমলতা ফুটে উঠে ।
“Of course,” ইনায়া মৃদু হেসে উত্তর দেয়।
মেয়েটি ইনায়ার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,
“আমি সোফিয়া, সদ্যই অন্য ইউনিভার্সিটি থেকে ট্রান্সফার হয়েছি।”
সোফিয়ার সহজ-সরল ব্যবহার ইনায়ার মনে এক অজানা ভালোলাগা ছড়িয়ে দেয়।
ইনায়া নিজের পরিচয় দেয়,

“হাই, আমি ইনায়া শেখ।”
কিছুক্ষণ পর সোফিয়া হেসে বলে,
“তুমি দারুণ ব্যক্তিত্বের মনে হচ্ছে, আমরা কি বন্ধু হতে পারি?”
ইনায়া একটু লাজুক হেসে বলে,
“অবশ্যই, আমি তো অনেকদিন ধরেই এমন কাউকে খুঁজছিলাম।”
সোফিয়া খুশিতে বলে,
“ওকে, আজ থেকে আমরা ফ্রেন্ড!”

ক্যানটিনের কোণে ইনায়া আর সোফিয়া স্যান্ডউইচ আর কফি নিয়ে গল্পে মশগুল ছিল। হঠাৎ, ফুটবল এসে সজোরে ইনায়ার কাঁধে লাগে।
ইনায়া কষ্টের স্বরে বলে ওঠে,
“আহ্! এটা আবার কোথা থেকে এলো?”
সোফিয়া চারপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,
“ও মাই গড, তুই ঠিক আছিস?”
দূর থেকে এরিক এগিয়ে এসে হেসে বলে,
“উফফ… সরি বেবি। টার্গেট মিস হয়ে গেছে।”
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলে উঠে ,
“এক্সকিউজ মি?! আমাকে ‘বেবি’ বলার সাহস কোথায় পেলেন?”
এরিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠে ,
“ওহ, রিল্যাক্স প্রিন্সেস, এটা তো প্রথমবার নয়। একটু মজা করলাম, ডোন’t টেক ইট পার্সোনালি।”
ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

“আপনি প্রতিদিন এই নাটক না করলে ঘুমাতে পারেন না?”
এরিক হেসে বলে,
“ঘুম আসবে কী করে, যখন মাথায় তুমি ঘোরাফেরা করো!”
ইনায়া অবাক হয়ে বলে,
“মানে!”
এরিক দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
“মন চুরি বুঝো বালিকা।”
ইনায়া ঠান্ডা গলায় জবাব দেয়,
“না বুঝি না, আপনি বুঝিয়ে দিন।”
এরিক বল হাতে নিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলে,
“আজ মুড খুব খারাপ জুনিয়র বেবি! অন্যদিন আমার স্টাইলে না হয় বুঝাবো। আপাতত,clue রেখে গেলাম, খুঁজে দেখো।”

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১১

এরিক চলে গেলে সোফিয়া বিস্ময়ে বলে উঠে ,
“এই ছেলেটা নিজেকে কী ভাবে! তোকে ‘বেবি’ বলছে।
ইনায়া সোফিয়ার কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৩