প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৪
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
রাত প্রায় বারোটা। বাহিরে বৃষ্টি একটু কমেছে। নিরিবিলি পরিবেশ বাড়ির সবাই ঘুমে।
আজ রাশেদ বাড়ি নেই। অফিসে কাজে আজকে বিকেলেই সে রওনা দিয়েছে কুমিল্লা। তার আসতে আসতে দুদিন লাগবে তা জানিয়েছে। শুভ্র উপর হয়ে খালি গায়ে শুয়ে আছে। তার পাশে ব্ল্যাকি গোল করে মালিকের সাথে ঘুমিয়ে আছে।
তখনই খট করে শুভ্র ঘরের দরজা খুলে গেলো।
ব্ল্যাকি ফট করে তাকালো দরজার দিকে।
মাথায় গামছা পেঁচিয়ে একটা ঢিলা ঢালা কামিজ পড়ে পা টিপে টিপে রুমে প্রবেশ করলো লামিয়া। তাঁকে দেখে ব্ল্যাকি বিছানা থেকে নেমে লামিয়ার পায়ে ঘেঁষতে লাগলো।
লামিয়া তা দেখে তাকে কোলে তুলে রুমের বাহিরে এসে তায়েবার হাতে দিয়ে বললো
– এটাকে তোর রুমে নিয়ে কিছুক্ষণ আটকে রাখ। কাজ শেষ হলে আবার নিয়ে আসবো।
তায়েবা মাথা নাড়িয়ে ব্ল্যাকি কে তুলে নিয়ে চলে গেলো।
লামিয়া আবার পা টিপে রুমে প্রবেশ করলো। বিছানার দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো।
বিছানার কাছে এগিয়ে আসতেই দেখলো গালে হাত দিয়ে ঘুমিয়ে আছে।
কপালে ছোট্ট ছোট্ট চুল এসে পড়ছে।
চুল দেখে মনে হচ্ছে ভেজা হয়তো গোসল করে ঘুমিয়েছে।
আজকে সারাদিন দেখেনি তাকে বাড়িতে ও ছিলো না।
যেখানে মন চায় সেখানে যাক তাঁতে তার কী। ভেবেই আবার তাকালো শুভ্রর দিকে।
লাল ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় লোকটাকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে।
পুরোই চকোলেট বয়। এসব ভেবে নিজের মাথায় গাট্টা মেরে বললো
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
– ছিঃ ছিঃ এসব কী ভাবছিস লোকটা নিজেকে যতোটা ভালো দেখায় এতোটা ভালো এই লোক নয়।
বলেই কালকে সকালের কথা মনে পড়ে গেলো।
লামিয়া আস্তে করে সরে কাঁধে রাখা ব্যাগটা খুলে ফ্লোরে রেখে ব্যাগ থেকে একটা কাঁচের বোতল বের করে হেঁসে উঠলো।
তারপর ফিসফিস করে বললো
– মিস্টার বিলাইয়ের আব্বা আপনে শুধু অতিথি দেখে থাপ্পড়ের হিসাব আমি ছোট্ট করে নিবো। আমি আবার কারোর ঋণ রাখি না।
বলেই বোতলটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
ধীর পায়ে বিছানার সামনে এসে মধু ভর্তি বোতল পা থেকে মাথা পর্যন্ত শুভ্রর উপর ঢেলে দিলো। ডান হাত আর ঠোঁটে একটু বেশি মধু দিলো।
তারপর ব্যাগ থেকে আরো দুটা কাঁচের বোতল বের করলো।
একটা বোতলে পাঁচ রকমের কাঠ পিঁপড়ে, আরেক বোতলে মৌমাছি। অনেক কষ্টে এই বৃষ্টির মধ্যে খুঁজে খুঁজে পেয়েছে তারা।
পিঁপড়ার বাসা থেকে পিঁপড়া আনতে যেয়ে লামিয়া পিঁপড়ার কামড় ও খেয়েছে আর সে একা না মাহির তায়েব তায়েবা কে সাথে নিয়েই খেয়েছে।
দরজার পাশে মাহির তায়েব দাঁড়িয়ে আছে। তাঁরা ভয়ে ঢোক গিলছে।
লামিয়া বাঁকা হেঁসে বোতলের ছিপি খুলে
শুভ্রর পায়ে পিঁপড়ে গুলো ছেঁড়ে দিলো।
পিঁপড়ে গুলো ছাড়া পেতেই দ্রুত ছড়িয়ে গেলো শুভ্রর শরীরে।
লামিয়া তা দেখে বাঁকা হেঁসে মৌমাছির বোতলের ছিপি খুলে দিয়ে সোজা শুভ্রর হাতে ছেড়ে একটা মৌমাছি বোতলে আটকে রাখলো। তারপর সেটাকে কিছুক্ষণ গভীর ভাবে দেখে আস্তে করে শুভ্রর ঠোঁটে ছেঁড়ে দিলো।
সারাদিন দৌড়া দৌড়ি করে ভীষণ ক্লান্ত শরীর আর হাতে আঘাত নিয়ে ঘুমিয়েছে শুভ্র। সে এখন গভীর ঘুমে। হঠাৎ শরীরে তীব্র ব্যাথায় শুভ্র লাফিয়ে উঠলো।
হঠাৎ লাফিয়ে উঠায় লামিয়া দূরে সরে গেলো।
এতো রাতে লামিয়া কে দেখে শুভ্র অবাক হলো তারপর তারাতাড়ি করে লাইট জ্বালিয়ে দিতেই চোখ বড়বড় করে ফেললো।
এদিকে পিঁপড়া আর মৌমাছি তাদের সাধ মতো কামড়াচ্ছে তাকে। শুভ্র দ্রুত উঠে শরীর ঝাড়া দিলো মৌমাছি উড়ে গেলেও আবার ঠোঁটে আর হাতে এসে বসলো।
লামিয়া তা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
শরীর ব্যাথায় অবস্থা খারাপ শুভ্রর। ভীষণ রাগ লাগছে তার লামিয়ার উপর।
পিঁপড়া আর মৌমাছির কামড়ে ফর্সা শরীর তার লাল টুকটুকে হয়ে ফুলে গেছে।
তা দেখে লামিয়ার ভীষণ হাঁসি পাচ্ছে। হঠাৎ করেই শুভ্রর কেনো জানি রাগ উঠে গেলো। রাগে
শুভ্রর চোখ দুটো লাল রক্ত বর্ণের হয়ে গেলো।
লামিয়া তা দেখে এইবার একটু ভয় পেলো কিন্তু প্রকাশ করলো না।
আস্তে করে রুমের বাহিরে দৌড় দিতেই শুভ্র লামিয়ার হাত চেপে ধরে বিছানায় ফেলে, দ্রুত ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে রুম লক করে লামিয়া দৌড়ে দরজার কাছে আসতেই শুভ্র লামিয়ার হাত পিছন মুচরে ধরলো, লামিয়া ছটফট করতে থাকলেও ছাড়ে না।
শুভ্র আচমকা লামিয়ার গলা থেকে উড়না টেনে হাত বেঁধে ফেলে। তারপর লামিয়ার চুল থেকে গামছা খুলে পা বেঁধে ফেলে শক্ত করে। তা দেখে লামিয়া ছটফট আরো বেরে গেলো। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য বৃথা চেষ্টা করলো।
দরজার ওপাশ থেকে মাহির তায়েব ভয়ে ঢোক গিললো তায়েব ভয়ে বললো
– আগেই বলেছিলাম মাল সুবিধের নয়, কচু পড়া গরীবের কথা বাসি হলেও সত্য হয়।
তা শুনে মাহির তায়েবের পিঠে কিল মেরে বললো
– তোর ফিল্ম ডায়লগ বন্ধ কর। লামিয়া কে কীভাবে বের করবো সেটা ভাব।
লামিয়ার হাত পা বেঁধে মুখে টেপ দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে শুভ্র গোসল করতে চলে গেলো।
লামিয়ার ভেজা চুল থেকে টুপ টুপ পানি পড়ছে।
কিছুক্ষণ বসে থেকে মোচড়া মোচড়ি করলো হাত কিন্তু ছাড়াতে না পেরে বিরক্ত হয়ে বসে রইল।
তারপর আবার হাত মোচড়া মোচড়ি করতে করতে হাতের বাঁধন হালকা হতেই লামিয়া বাঁকা হাসলো।
বাহিরে থেকে মাহির তায়েব বৃথা চেষ্টা করছে দরজা খোলায় ,কিন্তু পারছে না।
বাথরুমের দরজা খুলে গোসল করে বাহিরে আসলো শুভ্র। লামিয়া চোখ তুলে তাকালো।
ফর্সা শরীর পিঁপড়ার কামড়ে লাল টুকটুকে হয়ে আছে।
ঠোঁট ফুলে টম হয়ে আছে। পুরো শরীর ফুলে আছে। তা দেখে লামিয়া মনে মনে হেসে শুভ্রর চোখের দিকে তাকাতেই আতংকে উঠলো।
চোখ দুটো তার দিকে তাকিয়ে আছে চোখ লাল রক্ত বর্ণের হয়ে আছে। লামিয়া তা দেখে কপাল কুঁচকে অন্যদিকে তাকালো।
এটা মনে হলো শুভ্রর পছন্দ হলো না তাই সে দ্রুত লামিয়ার কাছে এসে তার বাহু খামচে ধরতেই লামিয়া ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে ফেললো।
তা দেখে শুভ্র ক্ষিপ্ত হলো আরো। হঠাৎ পুরুষ ওয়ালী একটা শক্ত পোক্ত হাত ঠাস করে লামিয়ার বা গালে চড় বসিয়ে দিলো। লামিয়া হতভাগ হয়ে চোখ খুলে তাকালো শুভ্রর দিকে।
আচমকা আরো একটা থাপ্পড় পড়লো লামিয়ার গালে। ব্যাস হয়ে গেলো, ধৈর্য্যের সিমা অতিক্রম করে ফেলেছে শুভ্র।
লামিয়ার চোখ লাল টুকটুকে হয়ে আসলো তেজি চোখ শুভ্রর দিকে তাকালো।
শুভ্র তা দেখে হালকা মাথা নিচু করতেই লামিয়া নিজের মাথা দিয়ে শুভ্রর মাথায় জোরে আঘাত করতেই শুভ্র একটু পিছিয়ে গেলো।
লামিয়া এই সুযোগে হাত মোচড় দিতেই বাঁধ খুলে গেলো। লামিয়া কে ধরতে শুভ্র এগিয়ে আসতেই লামিয়া টেবিল থেকে কাঁচের গ্লাস ছুঁড়ে মারলো। দ্রুত এমন হওয়ায় শুভ্র বুঝে উঠতে পারলো না।
কাঁচের গ্লাস ছুটে গিয়ে শুভ্রর কপালে লাগতেই কপাল কেটে রক্ত বেরিয়ে এলো।
কিন্তু সেদিন শুভ্রর খেয়াল নেই সে সামনে তাকিয়ে আছে। লামিয়া পায়ের বাঁধন খুলে মুখ থেকে টেপ সরিয়ে। বেলকনির দিকে দৌড়ে গাছ দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করছে। এক পা রেলিংয়ে দিয়ে আরেক পা গাছে দিতেই শুভ্র দৌড়ে লামিয়ার হাত চেপে ধরে টেনে নামালো।
এতে লামিয়া আরো যেনো ক্ষেপে গেলো। রেগে
চেঁচিয়ে উঠলো
– বলেছি না আমাকে স্পর্শ করবেন না। বারবার স্পর্শ কেনো করছেন? ছাড়ুন আমাকে।
শুভ্র কিছু না বলে লামিয়ার চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে ফ্লোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।
শুভ্র এগিয়ে আসতেই লামিয়া চোখ মুখ শক্ত করে কোমড় থেকে না*ইফ বের করে তা দিয়ে শুভ্রর বুকে আঘাত করতেই শুভ্র লামিয়ার হাত ধরে ফেলে।
লামিয়া নিজেকে ছাড়ানোর জন্য শুভ্রর পায়ে পারা দিয়ে ধরলো কিন্তু শুভ্র বাঁকা হেসে ফিসফিস করে বললো
– একটু খানি পুঁটি মাছ বোয়াল মাছের সাথে লাগতে আসছে বিষয়টা খুব হাস্যকর হয়ে গেলো না মিস?
বলেই না*ইফ টা কেড়ে নিয়ে নাইফটা লামিয়ার কন্ঠনালী তে চেপে ধরে বললো
– দেই এক টান??
লামিয়া তেজি চোখে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে।
তা দেখে শুভ্র বাঁকা হেঁসে বললো
– উফফ মিস এইভাবে তাকাবেন না, এই বুকে সামথিং সামথিং হয়।
তা শুনে লামিয়া বিরক্ত হয়ে অন্য দিকে তাকালো।
শুভ্র লামিয়ার হাত রেগে আরো জোড়ে চেপে ধরলো।
সে সামনে থাকতে লামিয়া অন্যদিকে তাকাবে তা তার সহ্য হয় না।
কিন্তু এই মেয়ে বারবার সেটাই করে। যা তার পছন্দ নয়।
হাত জোড়ে ধরায় লামিয়া ব্যাথায় চোখ মুখ খিচে নিলো।
শুভ্র না*ইফ টা কন্ঠনালী থেকে সোজা লামিয়ার ঠোঁটের কোণে রেখে এক টান দিতেই গলগল করে রক্ত বেরিয়ে গেলো।
লামিয়া শরীরে শক্তি দিয়ে শুভ্র কে ধাক্কা দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলো । তা দেখে শুভ্র হেঁসে উঠলো।
লামিয়া অবাক হয়ে তাকালো শুভ্রর দিকে। শুভ্রর কপাল থেকে রক্ত পড়ছে। চোখ গুলো ভয়ানক লাল হয়ে আছে।
দেখতে পুরো সাইকো লাগছে লোকটাকে।
লামিয়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে শুভ্র হাঁসি থামিয়ে ঘাড় কাত করে লামিয়ার দিকে তাকাতেই লামিয়া ভয় পেলো কিন্তু বুঝতে দিলো না।
এক পা দু পা পিছিয়ে যেতেই শুভ্র দৌড়ে লামিয়ার কাছে এসে চর মারার জন্য হাত তুলতেই লামিয়া হাত ধরে ফেললো।
তা দেখে শুভ্র মনে মনে হাসলো।
লামিয়া রেগে শুভ্রর পেটে লাথি বসিয়ে দিলো।
শুভ্রর হাত থেকে না*ইফ টা ছেঁড়ে পেটে হাত রেখে দূরে সরে গেলো।
লামিয়া দ্রুত না*ইফ হাতে তুলে শুভ্রর কাঁধে নাইফ ঢুকিয়ে দিলো।
শুভ্র ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে ফেললো।
লামিয়া রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
– বাহিরের মানুষ হয়ে অনেক সাহস দেখিয়ে ফেলছেন। এতো সাহস একটা বাহিরের মানুষের হয় কীভাবে? ভালো ব্যাবহার আর সম্মান করছি দেখে ভাববেন না আমি ভালো মানুষ। আমি মেয়েটা মোটেও ভালো মানুষ নই। কয়েকবার ওয়ানিং দিয়েছিলাম শুনেনি আমার কথা। আমার শরীরের হাত দেওয়া আমি পছন্দ করি না বারবার বলেছি। তবুও বারবার গায়ে হাত তুলছেন কোন অধিকারে?? এইবার ই বলে দিলাম দ্বিতীয় বার এই সাহস যেদিন দেখাতে আসবেন সেদিন আপনার শেষ দিন হবে।
বলেই শুভ্রর পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে আশেপাশে না তাকিয়ে চলে গেলো নিজের রুমে।
রুমের বাইরে থেকে এতোক্ষণ সব শুনেছে মাহির আর তায়েব। লামিয়া বের হতেই তার কাছে এগিয়ে আসতেই দেখলো লামিয়ার চোখ মুখে কঠিন রাগ তাই তারা সামনে যাওয়ার সাহস পায় নি।
রুমে উঁকি দিয়ে দেখলো শুভ্রর হাতে ছুরি বসানো। তা দেখে মাহির তায়েব আতংকে গিয়ে দ্রুত রুমের মধ্যে যেয়ে দেখলো শুভ্রর কপাল থেকেও রক্ত পড়ছে শরীরে অবস্থা দেখে তারাতাড়ি করে ধরলো তাকে।
পিঁপড়ার কামড়ের ব্যাথা আর সহ্য হচ্ছে না তার ওপর মাথাটা ও চিনচিন ব্যাথা করছে।
চোখ বুজে আসছে তার। বুকের মধ্যে কেমন যেনো জ্বালা করছে। নিজের শরীরের ব্যাথার জন্য নয় বরং লামিয়া কে আজকে রাগের মাথায় আঘাত দিয়েছে তার জন্য।
মাহির তায়েব দ্রুত শুভ্র কে ধরে আস্তে ধীরে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে নিজেরা ও গাড়িতে বসলো।
শুভ্রর অবস্থা তেমন ভালো নয়। তাই তারা রাশেদ ফোনে বলতেই রাশেদ দ্রুত হসপিটালে নিয়ে যেতে বলেছে।
তার কথা মেনেই তারা শুভ্র কে হসপিটালে
নিয়ে যাচ্ছে। এই গভীর রাতে।
সকাল হতে না হতেই কালা মিয়া এলাকার মানুষ নিয়ে উপস্থিত হলো ইসলাম বাড়িতে।
বাগানের চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছিলো আনিসুল সাহেব।
এক সাথে এতো মানুষকে বাড়ির গেটে দেখে আনিসুল ভ্রু কুঁচকে চায়ের কাপ রেখে এগিয়ে গেলো সেদিকে।
কালা মিয়া কে দেখে মনে হলো ভীষণ রেগে আছে। তাই আনিসুল সাহেব গলা খাঁকারি বললো
– কী ব্যাপার হঠাৎ সকাল সকাল আমাদের বাড়িতে সবাই এসেছেন কোনো সমস্যা??
কালা মিয়া রেগে বললেন
– সমস্যা মানে ? মেলা সমস্যা।
– কী সমস্যা?
– আপনাগো বাড়ির পোলামাইয়া আমার লাউ চুরি করছে কালকে রাতে।
কালা মিয়ার কথা শুনে আনিসুল সাহেব খানিকটা ভ্রু উঁচিয়ে বললো
– লাউ চুরি করছে আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা?? কোথাও মনে হয় ভুল হচ্ছে কালা মিয়া তোমার।
– না আমার কোনো ভুল হয় নাই ওই চোর আপনার বাড়ির ছেলে মেয়ে ছিলো ডাকেন ওদের ।
বাহিরে শোরগোল শুনে ইসলাম বাড়ির সবাই বেরিয়ে আসলো। হামিদ সাহেব এগিয়ে এসে বললো
– কী সমস্যা বড় ভাই?
আনিসুল সাহেব বেশ বিরক্ত নিয়ে বললো
– দেখ না কালা মিয়া বলছে আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা নাকি তার বাগানের লাউ চুরি করেছে কালকে রাতে।
আনিসুল সাহেবের কথা শুনে হামিদ সাহেব কালা মিয়ার কাছ থেকে পুরো কাহিনী জানতে চাইলে। কালা মিয়া শুরু থেকে সব বলতে লাগলো।
বাড়ির চার কর্তারা বেশ খানিকটা অবাক হলো কালা মিয়ার কথায় ।
লতিফা বেগম ফুঁসে বললো
– তাঁর মানে সকালে যে লাউ গুলো রান্নাঘরে দেখেছি সেগুলো ওই চার সয়তান চুরি করে এসেছে।
লতিফা বেগমের কথা শুনে তাহমিনা, মনিরা বেগম কিছু একটা ভেবে রেগে বললো
– আজকে চারটারেই জুতো পি*টা করবো।
রাশেদা বেগম বেশ বিরক্ত হলেন তিন জায়ের কথা শুনে। সে বাচ্চাদের গাঁয়ে হাত তোলা পছন্দ করেন না। তাই বিরক্ত হয়ে বললো
– চুপ থাক তোরা শুধু শুধু আগে বাচ্চাগুলো নাম দিবি না। প্রমাণ কী ওরা চুরি করেছে?
লতিফা বেগম তেতিয়ে বললো
– বড় ভাবি আজকে ভুলেও ওদের হয়ে কথা বলবেন না। আর যদি প্রমাণ হয় ওরা চুরি করেছে তাহলে ওদের একদিন আর আমার যে কদিন লাগে।
বলেই সামনে তাকালো।
কালা মিয়া সবাইকে পুরো ঘটনা বলতেই হামিদ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।
গভীর রাতে ঘুমানোর কারণে ইসলাম বাড়ির চার বিচ্ছু এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে যে যার রুমে। তাই বাহিরে কি হচ্ছে না হচ্ছে তারা জানে না।
রাশেদ, আরিফ, লামহা, হামিদা চারজনের রুমে যেয়ে উপস্থিত হলো।
কারণ তাদের চারজনকে নিচে ডাকছে। মায়েরা উপরে আসতে চেয়েছিলো কিন্তু তাঁরা আসলেই চারজন ঝাড়ু জুতোর বারি খাবে তাই রাশেদা বেগম তাদের ডাকতে পাঠিয়েছে।
হামিদা লামিয়াকে ডাকতে এসে আতংকে উঠলো।
ঠোঁটের কোণে বিশ্রীভাবে কেটে আছে! কিন্তু কীভাবে?
তাড়াতাড়ি করে লামিয়াকে ডেকে উঠলো।
ঘুমে টুলতে টুলতে বিরক্ত কণ্ঠে লামিয়া বললো
– কে মরেছে? এইভাবে ডাকছিস কেনো?
হামিদা রেগে পিঠে থাপ্পড় বসিয়ে বললো
– সকাল সকাল এসব কি কথা? মুখে ভালো কিছু আসে না তোর? আর তোর ঠোঁট এইভাবে কেমন করে কাটলো দেখি!
বলেই ঠোঁটে হাত রাখতেই লামিয়া বিরক্ত হয়ে হাত সরিয়ে বললো
– উফফ আপা, এইসব ড্রামা করার জন্য তুই আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়েছিস? তাহলে প্লিজ প্লিজ রুম থেকে বের হ, আমি ঘুমাবো।
বলেই শুয়ে পড়তেই হামিদা টেনে তুললো ওকে।
লামিয়া হাত ঝাড়া দিয়ে বললো
– কি সমস্যা তোর সকাল সকাল এমন করছিস কেনো?
– নিচে চল, বাবা ডাকছে।
– কেনো?
– গেলেই বুঝবি, তাড়াতাড়ি আয়।
বিরক্ত মুখে পাশ থেকে উড়না নিয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে ওয়ান টাইম নিয়ে ঠোঁটের কোণে লাগিয়ে নিলো। দেখতে বেশ হাস্যকর লাগছে, কিন্তু তাতে তার কিছু যায় আসে না।
চোখ ডলতে ডলতে হেলেদুলে রুমের বাইরে যেতেই দেখলো মাহির, তায়েব, তায়েবাও হেলেদুলে বের হচ্ছে রুম থেকে।
চারজন চারজনের অবস্থা দেখে চারজনের দিকেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
লামিয়া ভ্রু নাচিয়ে বোঝালো — ব্যাপার কী?
তায়েব তায়েবা মাহির ঠোঁট উল্টে বোঝালো তারাও জানে না।
তায়েব হঠাৎ নিচু হয়ে লুঙ্গির কোণা ধরে উঠালো।
সবার চোখ গেলো তায়েবের দিকে।
তায়েব লুঙ্গি পরায় সবাই আরো ভ্রু কুঁচকালো।
যে ছেলে কোনোদিন লুঙ্গি পরে না, সে ছেলে আজ লুঙ্গি পরে ঘুমিয়েছে?
লামিয়া অবাক হয়ে বললো
– তুই আবার সুন্নতে খৎনা করেছিস? কয়বার করিস খৎনা? আগের বার ঠিক মতো হয়নি নাকি?
পাশ থেকে মাহির ঠাট্টা করে বললো
– ওও আগের বার মনে হয় ঠিক মতো হয়নি, তাই অন্তরা চলে গিয়েছে। এইবার আরেক মুরগি ধরবে তাই মনে হয় এইবার একদম ভালো মতো করিয়েছে। এইটাকেই বলে পুরুষ।
তায়েবা হাই তুলে বললো
– তোর মনে হয় ও পুরুষ? পুরুষ হলে গার্লফ্রেন্ড পালায় নাকি? ওরে পুরুষ বলে পুরুষ জাতিকে অপমান করিস না।
তায়েব রেগে বললো
– তখন থেকে কি উল্টা পাল্টা বকছিস? রেগে যাচ্ছি কিন্তু আমি!
লামিয়া মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো
– তাহলে লুঙ্গি কেনো পরেছিস?
তায়েব বিরক্ত হয়ে বললো
– রাতে অনেক গরম লাগছিলো তাই হাওয়া লাগাতে পরেছি!
একসাথে তিনজন ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললো
– ওওও…
এতোক্ষণ চারজনের নাটক দেখছিলো হামিদা, লামহা, আরিফ, রাশেদ।
আরিফ বিরক্ত হয়ে চারজনের মাথায় চারটা চাটি মেরে বললো
– তোদের নাটক শেষ? এখন নিচে চল, নিচে সবাই তোদের জন্য নাটকের স্টেজ বানিয়ে রাখছে।
চারজন ঘুমঘুম চোখে টুলটুল পায়ে নিচে নেমে এল।
নিচে নামতেই দেখলো লতিফা, মনিরা, তাহমিনা বেগম রাগি চোখে তাকিয়ে আছে।
তাদের মুখ দেখে চারজনের ঘুম মুহূর্তেই উড়ে গেলো।
শুকনো ঢোক গিলে সামনে তাকাতেই দেখলো
কালা মিয়া পুরো এলাকাবাসী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির গেটে!
তাদের সঙ্গে হামিদ, আনিসুল, হাশিম, আজমির সাহেব কথা বলছে।
তা দেখে একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে একদম ইনোসেন্ট ফেস নিয়ে দাঁড়ালো। যেনো ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেতে জানে না।
কালা মিয়া তাদের দেখেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললো
– এই চার চোর আর চুন্নি! ওরা আমার লাউ চুরি করছে কালকে রাতে!
আনিসুল সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন
– কালা মিয়া যা বলছে, সব কী সত্যি?
লামিয়া ইনোসেন্ট মুখ করে বললো
– কি বলো বড় চাচা! আমরা আর কালা মিয়ার লাউ চুরি করবো? আস্তাগফিরুল্লাহ!
পাশ থেকে তায়েবা বললো
– বড় চাচা, আমরা চুরি করবো কেনো? আমাদের দেখে কি চোর মনে হয়?
পাশ থেকে তায়েব বললো
– আল্লাহর কসম বড় চাচা, পশ্চিম দিকে মুখ কইরা বলতাছি, আমরা চুরি করিনি! যদি মিথ্যা বলে থাকি, ঠাডা পরবো আমাদের গায়ে!
তিনজন একসাথে মাথা নেড়ে বললো
– ঠিক ঠিক, একদম ঠিক!
পিছনে দাঁড়ানো হামিদা, লামহা, রাশেদ, আরিফ মুখ চেপে হাসছে।
তাদের পাশে শুভ্র দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে তাকিয়ে আছে।
কালা মিয়া রেগে বললেন
– ওরা মিথ্যা কইতাছে! আমি নিজের চোখে দেখছি ওদের!
হামিদ সাহেব চুপচাপ তাকিয়ে আছেন চারজনের মুখের দিকে।
হঠাৎ পিছন থেকে গম্ভীর গলায় আজমেরী বেগম বললো
– ইসটপপপ কালা! মাই নাতিনগো চোর কইলে ইউরে আই ডিসটিং ডিসটিং কইরা দিমু গুট ইট!
বলেই কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো।
সবাই থম মেরে তাকিয়ে আছে আজমেরী বেগমের দিকে।
লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা হাফ ছেড়ে বাঁচলো দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো আজমেরীর পিছনে।
আনিসুল সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন
– আম্মা, আবার শুরু করলেন ?
আজমেরী চোখ পাকিয়ে বললো
– ওই কালা মাই হাউসে আইয়া মাই নাতিনিগো চোর চুন্নি কইতাছে! আর ইউরা চুপ কইরা হুনতাছোস! ভেরি হেড! ভেরি হেড!
আজমেরী বেগমের ইংরেজি শুনে কালা মিয়া রেগে বললো
– ইউ সেটাপপপ! ইউ নট চেনিং আমারে, আমি ও ইউরে ডিসটিং ডিসটিং কইরা দিমু!
কালা মিয়ার মুখে ইংরেজি শুনে আজমেরী বেগম অবাক হয়ে বললো
– দেহি! তুই ইংরেজি ও পারছ নাকি?
কালা মিয়া বুক ফুলিয়ে বললো
– তুমি কী ভাবছো? ইংলিশ তুমি একাই পারো, আমরা পারি না নাকি?
– কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়ছস তুই?তোর থেইক্কা আমি বেশি পারি ইংরেজি, বুঝছস?
– এহহ! যেই না ইংরেজি পারে, ইংলিশ মেম মনে করে নিজেরে!
আজমেরী বেগম মুখ বাঁকিয়ে বললো
– তুই তো ইংলিশ পারছ ক দেহি, কেমন ইংরেজি পারস শুনি?
কালা মিয়া গলা পরিষ্কার করে বললো
– টুংকাল টুংকাল লেডিস ইস্টর,
হাওয়ার ওডার ওইটার কি আর,
আফ আফা দার ওইটা তোমার,
লাভে ড্রামে ইঁদুর খেদাই!
সবাই থম মেরে তাকিয়ে রইলো।
আজমেরী বেগম থতমত খেয়ে ধীরে বললো
– হায় হায় কালা! ইংরেজি পাইরা আমার বরাবর হইয়া গেলো দেহি!
পিছন থেকে লামিয়া ফিসফিস করে বললো
– দাদী, এই কালার থেকে তোমাকে আমি বেশি ইংরেজি শিখাবো, তুমি শুধু আমাদের বাঁচাও
আজমেরী পান খাওয়া দাঁত কেলিয়ে হেসে বললো
– মনে থাকে জানি।
বলেই রাইফেল কালা মিয়ার বুকে তাক করে বললো
– বহুত ইংরেজি কইছস, এহন ডিসটিং ডিসটিংয়ের লেইগ্গা তৈরি হ!
আনিসুল সাহেব এইবার বেশ বিরক্ত হলো, তাই আজমেরী বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো
– আম্মা আপনি কী বাচ্চা? নামান এটা, কী শুরু করছেন?
আজমেরী বেগম চোখ পাকিয়ে আনিসুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো
– ইউ গো, হর সামনে থেইক্কা! এই কালার বুকে ডিসটিং ডিসটিং কইরা বুক ফুটা কইরা দিমু আমি!
কালা মিয়া এইবার একটু ভয় পেয়ে গেলো।
এই অর্ধপাগল বুড়ি মহিলাকে দিয়ে ঠিক নেই, যেকোনো সময় কিছু একটা কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারে সেটা সে বেশ ভালো করেই জানে।
তাই একটু পিছিয়ে গিয়ে আনিসুল, হামিদ, হাশিম, আজমির সাহেবদের দিকে তাকিয়ে বললো
– দেহো আনিসুল, আমি মিছা কথা কই নাই। কাল রাইত্তে তোমগো বাড়ির পোলামাইয়াই আছিলো। তুমি প্রমাণ চাও, কও, আমি দেহাই।
বলেই তায়েবের দিকে আঙুল তাক করে বললো
– ওইডা আজমিরের পোলা না?
আনিসুল সাহেব মাথা নাড়লো।
তা দেখে কালা মিয়া বললো
– আজমিরের পোলা যেই লুঙ্গি পরছে, ওইডা আমার লুঙ্গি। কাল রাইত্তে ওরে আমি ধরছিলাম। পরে দিশা না পাইয়া আমার লুঙ্গি নিয়া দৌড় দিছে!
কালা মিয়ার কথা শুনে সবাই একসাথে তায়েবের দিকে তাকালো।
লামিয়া, মাহির, তায়েবা রাগে কটমট চোখে তায়েবের দিকে তাকালো।
তায়েব নাটকীয় ভঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে বললো
– নাআআ! এটা মিথ্যা! তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো! এটা আমার লুঙ্গি! আমি কালকে গুলিস্তান থেইকা কিনে আনছি!
পাশ থেকে মাহির গম্ভীর মুখে বললো
– হ্যাঁ চাচা, আমরা তায়েবের আবার সুন্নতে খৎনা করছিলাম। তাই নতুন লুঙ্গি কিনছে কালকে।
তায়েব রেগে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই লামিয়া তার পায়ে পারা দিয়ে কটমট চোখে তাকালো।
মাহিরের কথা শুনে সবাই হা করে তাকিয়ে আছে।
আজমেরী বেগম মাহিরের কথা বিশ্বাস করে তাড়াতাড়ি রাইফেল নামিয়ে তায়েবের হাত ধরে নিজের পাশে টেনে এনে আদর ভরা গলায় বললো
– ও দাদুভাই, তুই আবার খৎনা করছস কেনো? আগের বার কী কোনো সমস্যা হইছিলো নাকি?
বলেই আজমির সাহেবের দিকে চোখ রাঙিয়ে বললো
– তোর লেইগ্গা আমার নাতিনে এই বয়সে আইয়া খৎনা করছে! কতো কইরা কইছিলাম ওই ব্যাডা কাটা পারবো না, কিন্তু না! তুই আমার কথা অমান্য করছোস! দেহ এখন পোলাডার এই অবস্থা!
আজমির সাহেব ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলো মায়ের দিকে।
পিছন থেকে হামিদা, রাশেদ, আরিফ, লামহা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেট ফেটে হাসছে, কিন্তু হাসতে পারছে না। শুভ্রও পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
তায়েব এখন একেবারে হতবাক। কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না।
ঠিক তখন আজমেরী বেগম হুট করে তায়েবের লুঙ্গি ধরে বললো
– দাদুভাই, লুঙ্গি তুল তো দেখি, এইবার ঠিক মতো কাটছে নি কিনা দেখি!
বলেই টান দিতেই তায়েব লুঙ্গি চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো
– দাদী, কী করছো! ছাড়ো লুঙ্গি! আমারও তো লজ্জা আছে নাকি!
আজমেরী বেগম কপাল কুঁচকে বললো
– আমার কাছে কীয়ের লজ্জা? আয় দেহি এইবার ঠিকঠাক কাটছে কিনা!
তায়েব এবার আজমেরী বেগমের কাছ থেকে এক লাফে দূরে সরে গেলো।
তা দেখে আজমেরী বেগম এগিয়ে আসতেই আনিসুল সাহেব বিরক্ত হয়ে বললো
– আহা মা, এসব কী করছেন! দিন দিন বাচ্চা হয়ে যাচ্ছেন নাকি? তায়েব এখন বড় হয়েছে, ছাড়ুন ওকে।
তারপর কালা মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো
– তোমার ভুল হচ্ছে মনে হয়। ও তো বলছে এটা ও কিনে এনেছে।
কালা মিয়া হেসে বললো
– আমার ভুল না আনিসুল। ওই লুঙ্গি পুরাতন। তুমি ওই লুঙ্গি চেক করে দেখো ইন্দুরে কেটে ওই লুঙ্গি ফুটো করছিলো, তোমাগো ভাবি সেলাই দিছে! দেখো, চেক কইরা দেখো!
এইবার হামিদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললো
– রাশেদ, দেখ তো কালা ভাই যা বলছে, সত্যি নাকি?
রাশেদ গিয়ে তায়েবের লুঙ্গি চেক করতেই দেখলো কালা মিয়া যা বলছে একদম ঠিক।
রাশেদ মাথা নেড়ে ইশারা করলো, মানে প্রমাণ মিলেছে।
ব্যাস! হয়ে গেলো প্রমাণ। কালা মিয়া সত্যি বলেছে।
তায়েব, তায়েবা, মাহির, লামিয়া শুকনো ঢোক গিলে পিছন ফিরতেই, শক্ত মোটা পেয়ারা ডালের বারি এসে পড়লো চারজনের পিঠে!
– ও মা গো!
বলেই একসাথে চিৎকার করে উঠলো।
পেছনে তাকিয়ে দেখে লতিফা, মনিরা, তাহমিনা বেগম হাতে মোটা মোটা পেয়ারা গাছের ডাল!
চারজনের চেঁচানো শব্দ শুনে সবাই তাকিয়ে দেখে বাড়ির তিন বউ ডালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তা দেখে বাড়ির কর্তারা কালা মিয়া আর সবাইকে নিয়ে বাড়ির বাহিরে চলে গেলো।
আজমেরী বেগম রেগে চেঁচিয়ে উঠলো
– খবরদার! মেজো বউ, সেজো বউ, ছোট্ট বউ একটা বারি দিছো দিছো, আর একটা বারি পড়লে আমি এই বাড়িতে পারমাণবিক বোম ফাটাইয়া দিমু!
কে শুনে কার কথা?
আজ তিনজন মা যেন অগ্নিরূপে রূপান্তরিত।
তা দেখে লামিয়া চেঁচিয়ে উঠলো
– মাতা রানীরা ক্ষেপে গেছে আজকে! পালা, নয়তো ওই ডান্ডা পিঠে মেরে ঠান্ডা বানাইয়া দিবে আমাদের!
বলেই দৌড় দিলো।
পিছনে মাহির, তায়েব, তায়েবা আর তাদের পিছনে লতিফা, মনিরা, তাহমিনা বেগম ডাল হাতে দৌড়াচ্ছে।
আজমেরী বেগম কোমর থেকে বাঁশি বের করে “পু পু” করতে করতে তাদের পিছে দৌড়াচ্ছে।
লতিফা বেগম চেঁচিয়ে উঠলো
– দাঁড়া বলছি, কিছু বলুম না, দাঁড়া!
লামিয়া দৌড়াতে দৌড়াতে চেঁচিয়ে বললো —
– হ, সাপের কাছে যেয়ে বলবো, ছোবল দাও না ছোবল দাও! তাই না? আমি এ কথা বিশ্বাস করি না!
এদিকে তাহমিনা বেগম বেশ বিরক্ত তার দু সন্তান নিয়ে। সে কোন দিকে যাবে বুঝতে পারছে না। একজন উত্তরে গেলে আরেকজন দক্ষিণ যায়।
তাহমিনা বেগম হাঁপাতে হাঁপাতে বললো
– তোরা একদিকে দৌড়া, আমি হাঁপানি মানুষ, দৌড়াতে পারি না!
তায়েব আবার মায়ের ভক্ত। মায়ের কষ্ট সহ্য হয় না তার। তাই দৌড়ে গিয়ে মায়ের হাত ধরে বললো
– মা, কী হইছে? বসো, কষ্ট হচ্ছে?
তাহমিনা বেগম সোজা তাকিয়ে রইলো ছেলের মুখে,
তায়েবকে দেখে তায়েবা ও দৌড়ে এসে বললো
– বেশি কষ্ট হচ্ছে তোমার।
তাহমিনা বেগম শীতল দৃষ্টিতে তার দুই ছেলেমেয়ে দিকে তাকিয়ে আস্তে করে পা থেকে জুতা খুলে পেটাতে শুরু করলো।
মাহির দৌড়াতে দৌড়াতে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলো। মনিরা বেগম ঝট করে ধরে ফেললেন।
মাহির মিষ্টি মুখ করে বললো
– মা, এইবারের মতো ছাড়ো না মা, ভুল হইছে!
মনিরা বেগম হেসে বললো
– কয়বার মাফ চাইছো?
– হাজারবার মা!
– তাইলে হাজারবারের পরও বারবার ভুল করছো কেন?
বলেই ঝাড়ু হাতে নিয়ে পিঠে মারতে লাগলেন।
এইদিকে লামিয়া দৌড়াতে দৌড়াতে শুভ্রর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো। শুভ্র দ্রুত হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো।
লামিয়া চোখ তুলে তাকাতেই দেখে শুভ্রর কপালে ব্যান্ডেজ, মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে। শুভ্র বাঁকা হেসে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। তা দেখে লামিয়া ভ্রু কুঁচকে কিছু বলার আগে।
ধাম!
জুতোর বারি এসে লামিয়ার পিঠে। লামিয়া চিৎকার দিয়ে ছিটকে দূরে, আর লতিফা বেগম ধরেই ফেললো।
ধাম ধুম করে কিল পড়ছে, চারজনের পিঠ লাল টুকটুকে।
বাড়ির তিন বউ একসাথে অগ্নি হয়ে উঠেছে আজ ।
কেউ ফিরাতে পারছে না।
ঠিক তখনই গেট দিয়ে বাড়ির কর্তারা প্রবেশ করলো।
সব দেখে দৌড়ে এসে সবাইকে থামালো।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৩
আজমেরী বেগম সেই সময়ও বাঁশিতে “পু পু” দিতে দিতে মাথা ধরিয়ে ফেলেছে।
আনিসুল সাহেব রেগে গিয়ে আজমেরী বেগমকে ধমক দিয়ে সবাইকে ঘরে পাঠালেন।
তায়েব, তায়েবা, মাহির, লামিয়া চারজনকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলেন।
শুভ্র সব দেখে মুচকি হেসে ভিডিও গুলো কাউকে
WhatsApp-এ পাঠিয়ে শান্তভাবে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো।
