প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩০
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
সময়টা দুপুর বারোটা।
প্রচন্ড মাথা ব্যাথা নিয়ে পিটপিট করে চোখ খুললো লামিয়া। শোয়া থেকে উঠে বসে দু হাত দিয়ে মাথার চুল টেনে ধরে। কালকে রাতে কী,হয়েছিলো তা চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করছে। শুধু আবছা মনে পড়ছে সে হালকা লাল পানি ভুলে খেয়ে ছিলো তারপর কি হয়েছিলো তা তাঁর মনে নেই। মাথায় আরো একটু জোড় খাটিয়ে মনে করার চেষ্টা করতেই মাথায় চিনচিন ব্যাথা শুরু হলো। না আর ভাবতে পারছে না মাথা প্রচন্ড ব্যাথা করছে এখনই গোসলে যেতে হবে। গোসল করলে হয়তো মাথা ব্যাথা টা কমে যাবে। ভেবেই সময় দেখার জন্য সামনে ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ বড় হয়ে গেলো। দুপুর বারোটার উপরে বাজে আর সে এতোক্ষণ ঘুমিয়েছে তবুও তাঁর মা জননী এখনো ঝাটা দিয়ে পেটাতে আসে নি। বিষয়টা কেমন খটকা লাগছে।
লামিয়া দ্রুত বিছানা গুছিয়ে জামা নিয়ে বাথরুমে গোসলে চলে গেলো ।
হামিদার রুমে মাথা নিচু করে বসে আছে আয়না। কালকে রাতের ঘটনার পর সবাই চুপচাপ হয়ে বসে ছিলো কারোর মুখে কোনো কথা ছিলো না।
আরিফের বিয়ে নিয়ে কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিলো না কাল। তবুও রাশেদ সাহস করে আনিসুল সাহেব কে বলে দিতে ই আনিসুল সাহেব গম্ভীর গলায় বলেছিলো ” এসব নিয়ে কাল সকালে কথা হবে ” বলেই নিজের রুমে চলে গিয়েছিলেন। হামিদ সাহেব রাশেদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলেছিলো ” আজকে হামিদার সাথে মেয়েটি কে রাখো আগামীকাল সব কিছু শুনে তারপর একটা ব্যাবস্থা করা হবে” বলে সে ও নিজের রুমে চলে গিয়েছিলেন। বড় দু ভাইকে রুমে যেতে দেখে হাশিম ও আজমির সাহেব ও নিজেদের রুমে চলে গিয়েছিলেন। চার ভায়ের মনে যে ঝড় বইছে তা সবাই বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে। তাদের বাবা মারা যাবার পর তাঁরা তাঁদের ছোট্ট বোনকে সবসময় আগলে রেখেছেন। আঁখি ছিলেন চার ভায়ের চোখের মনি। সেই বোন কে এইভাবে মেরে ফেলেছে শুনে তাঁদের মন যে কেমন করছে সেটা একমাত্র তারাই জানে। তাই কাল রাতে কেউ আর কোনো কথা বলে নি এসব নিয়ে। ইসলাম বাড়ির গিন্নিরা নতুন বউ কে নিয়ে হামিদার রুমে এনে দিয়ে যে যার স্বামী দের কাছে দৌড়ে গিয়েছে। নতুন বউয়ের সাথে কেউ কথা বলতে পারে নি বলে তাই আজ সকালে বাড়ির কর্তারা অফিসে বের হওয়ার পর দৌড়ে চার জা হামিদার রুমে এসে বসে আয়না কে এটা ওটা জিগ্গেস করছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আয়না ও মিষ্টি হেসে জবাব দিচ্ছে শাশুড়িদের কথায়।
আয়না কে ছেলের বউ হিসেবে রাশেদা বেগম এর ভীষণ পছন্দ হয়েছে।
আয়নার বাবার নাম পরিবারের কে কে আছে এসব টুকটাক জিনিস নিয়ে কথা বলছে আয়নার সাথে তাঁরা।
।
গোসল শেষ করে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে আয়নায় দাঁড়াতে ই লামিয়ার কালকে রাতের আবছা এক দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠতেই চমকে উঠলো লামিয়া।
কালকে রাতে মাঝ রাস্তায় অবিকল নিজেকে দেখেছে
এটা কি তাঁর মনের ভুল ছিলো নাকি অন্য কিছু।
কিছু একটা ভেবে উড়না নিয়ে দৌড়ে মাহির এর রুমে যেতেই দেখলো তায়েব, তায়েবা ও সেখানে। লামিয়া কে এমন দৌড়াতে দেখে তাঁরা চমকে উঠলো।
লামিয়া দ্রুত তাদের কাছে এসে বললো ” কালকে রাতে কী কী হয়েছিলো বল আমাকে আমির কিছু মনে নেই।”
লামিয়ার কথা শুনে তাঁরা একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকালো।
লামিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে আবারো বললো ” কী হলো বলছিস না কেনো আর আমি কালকে মাঝ রাস্তায় আমার মতো কাউকে দেখেছি, এসব কি মনের ভুল ছিলো? বল না কী হয়েছিলো কালকে?”
মাহির গলা পরিষ্কার করে বললো ” কালকে রাতে অনেক কিছুই হয়েছিলো”
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো ” কী হয়েছিলো?”
মাহির তায়েব আর তায়েবার দিকে তাকিয়ে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ” তোর কী মনে হয় ছবি বেঁচে আছে?”
মাহিরের কথায় লামিয়া ভ্রু কুঁচকে ফেললো ” এতো বছর পর আজকে হঠাৎ এই কথা বললি কেনো?”
মাহির লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ” আগে আমার কথার উত্তর দে। ”
মাহির এর কথায় লামিয়া বেশ বিরক্ত গলায় বললো “মৃত মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবে?মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর?”
মাহির লামিয়ার কথা শুনে নিচু গলায় বলে উঠলো ” যদি বলি ছবি বেঁচে আছে?
মাহিরের কথা শুনে লামিয়া ভ্রু নাচিয়ে বললো ” কী বলতে চাইছিস খুলে বল মেজাজ খারাপ লাগছে, সোজাসাপ্টা বলে ফেল ”
মাহির দীর্ঘ শ্বাস ফেলে একে একে খুলে বলতে লাগলো কালকে রাতের ঘটনা।
লাবিবের জ্ঞান ফেরার পর সব কিছু শুনে স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে ছিলো। আবির লাবিবের কাঁধে হাত রাখতেই লাবিব মুখে হাত দিয়ে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলো।
এতো বছর ধরে তাঁর প্রেয়সীকে মৃত ভেবে এসেছে কিন্তু তাঁর প্রেয়সী বেঁচে আছে কতো কষ্ট করেছে তা লাবিব জানতো না। প্রেয়সীকে একনজর দেখার জন্য কতো ছটফট করেছে লাবিব। যেদিন তাঁরা খবর পেলো দূর্ঘটনায় আগুন লেগে শুভ্র আর ছবিব সহ তাদের পরিবার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে সেদিন লাবিব পাগলের মতো আচরণ করেছিলো। প্রায় কয়েকমাস পাগলের মতো ছিলো নিজেকে ঘরবন্দি করে রাখতো খাওয়া দাওয়া ছেড়ে ছবি ছবি করে দিন রাত পার করতো।
তারপর কিছু মাস পর ই তাঁরা ইতালিতে শিফট করেছিলো পুরো পরিবার সহ। সেখানে গিয়ে আস্তে আস্তে লাবিব পরিবর্তন হয়। তবে তাঁর মনের মধ্যে ছবি ছাড়া অন্য কোনো নারী ঠাঁই পায়নি আজ পর্যন্ত।
তারপর তাঁর সাথে পরিচয় হয় লাবিবের বাবার বন্ধু মনিকার সাথে। আস্তে আস্তে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠে দুজনের মধ্যে। মনিকা লাবিব কে প্রেমের প্রস্তাব দিতেই লাবিব বারণ করে দিয়ে বলেছিলো যদি বন্ধুত্ব রাখতে চায় তবে এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।
মনিকা সেদিন লাবিবের কথায় রাজি হয়ে যায় তবে একদিন লাবিব তার হবে এই ভেবে মনিকা এখনো লাবিবের সাথে আছে।
বাংলাদেশে আশার পর লামিয়া কে দেখলে লাবিব এর অনেক কষ্ট হতো। লামিয়ার মাঝে ছবির মুখ খানা দেখতে পেয়ে ছবি কে কল্পনা করে বারবার লামিয়া কে ছুঁয়ে দিতো। কিন্তু যখন জ্ঞান আসতো তখন নিজের ওপর নিজেই সে বিরক্তি হতো।
লামিয়ার সাথে কোনোদিন তার মাঝে বন্ধুত্ব বা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে নি। ছোট্ট থেকেই কেউ কাউকে দেখতে পারতো না কারণ শুভ্রর সাথে মারামারি করতো দেখে লামিয়া লাবিব কে দেখতে পারতো না আর ছবির সাথে লামিয়ার মারামারি লেগে থাকতো দেখে লাবিব লামিয়া কে দেখতে পারতো না।
এইসব ভেবে লাবিব শুকনো ঢোক গিললো। মনটা ছটফট করছে ছবি কে দেখতে তাই গাঁয়ে টিশার্ট জড়িয়ে দৌড় লাগালো ইসলাম বাড়ির দিকে। তাকে এইভাবে দৌড়াতে দেখে আবির, সাফওয়ান, ফাহিম,হাফসা, ফারিয়া, শারমিন ও তাঁর পিছু পিছু গেলো।
ছেলের এমন অবস্থা দেখে লুবনা বেগম কেঁদে উঠলো।
পাশ থেকে সাবরিনা বেগম আঁচল দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে বললো ” পাগলা কে সামলানের জন্য আল্লাহ আবার আমাদের কাছে ছবি কে ফিরিয়ে দিয়েছে। তাঁর আর কান্না করিস না।”
জা এর কথা শুনে লুবনা বেগম চোখের পানি মুছে আবার কাজে হাত লাগালেন।
।
বিছানায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে ছবি। কালকে রাতে সবাই নিজের রুমে যাবার পর আজমেরী বেগম ছবি কে ছবির রুমে নিয়ে এসেছিলেন।
ছোট্ট বেলায় ছবি যখন ই নানু বাড়ি আসতো তখনই ছবি কে আজমেরী বেগম একটা রুম দিয়ে দিয়েছিলেন। বেবি পিংক কালার পুরো দেয়াল জুড়ে।
সব কিছু আগের মতোই সাজানো। নিজ হাতে সাজিয়েছিলেন আজমেরী বেগম এই রুম টা। এখনো ঠিক তেমন ই আছে যেমনটা সে লন্ডন যাবার আগে রেখে গিয়েছিলো। আর থাকবে নাই বা কেনো আজমেরী বেগম প্রতিদিন নিজে এই রুম পরিস্কার করে রেখে যান। নানুমার এমন পাগলামী দেখে ছবি হালকা হাসলো।
হঠাৎ দরজা ঠেলে কেউ হুরমুর করে ভেতরে প্রবেশ করতেই ছবি চোখ খুলে সামনে তাকাতেই দেখলো লাবিব কে। এলোমেলো চুল চোখ মুখে অস্থিরতা ছাপ, আগের চেয়ে বেশ সুন্দর হয়েছে তা ভেবে মনে মনে হাসলো ছবি।
লাবিবের পিছন পিছন দৌড়ে আসলো ইসলাম আর খান বাড়ির ছেলেমেয়েরা। লাবিব এখনো ওইভাবেই দাঁড়িয়ে আছে দেখে তাঁরা ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
লাবিব যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না তাঁর সামনে ছবি বসে আছে।
এলোমেলো পায়ে লাবিব ছবির কাছে এসে কাঁপা কাঁপা হাতে ছবির গালে হাত রাখতেই ছবি সরে গেলো।
তা দেখে লাবিব বেশ অবাক হলো।
লাবিব কিছু বলার আগেই দৌড়ে লামিয়া এসে উপস্থিত হলো। তাঁর পিছন পিছন তায়েব, তায়েবা মাহির। সবাই লামিয়ার দিকে তাকালো। ছবি লাবিবের থেকে চোখ সরিয়ে লামিয়ার চোখে চোখ রাখলো।
লামিয়া অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে ছবির দিকে। এ মেয়ে সত্যি ছবি। যদি ছবি বেঁচে থাকে তাহলে শুভ্র ও ভাই ও কী বেঁচে আছে??
লামিয়া নিজেকে শান্ত করলো। কারোর সামনে অস্থির হওয়া যাবে না।
লামিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে আসলো ছবির সামনে। ছবি লামিয়া দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে । লামিয়া ভালো মতো ছবির দিকে তাকিয়ে দেখলো ছবির চোখ হাসছে।
লামিয়া ছবির পায়ে থেকে মাথা পর্যন্ত তাকালো। ছবির পরনে তার সেলোয়ার সুট।
লামিয়া এইবার বাঁকা হেঁসে উঠলো। সবাই চুপচাপ হয়ে বসে আছে তাদের দিকে তাকিয়ে। লামিয়া আর ছবি কে দেখে মনে হচ্ছে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ হতে আর বেশি সময় নেই। প্রচন্ড ঝড় আশার আগে আবহাওয়া যেমন ঠান্ডা থাকে তেমন ঠান্ডা লাগছে রুমের চারপাশে। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। মাহির লামিয়া কে সব বললেও শুভ্রর কথা টা চেপে গেছে কারণ শুভ্র তাদের বারণ করে দিয়েছিলো অনেক আগেই।
লামিয়া আর ছবি একজন আরেকজনের দিকে শুধু তাকিয়ে আছে। আর সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে।
এইভাবেই কেটে গেলো কয়েক মিনিট।
রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। রুমের মধ্যে জড় হয়ে বসে আছে খান ও ইসলাম বাড়ির ছেলে মেয়েরা। লামিয়া সেই কখন থেকে ঠোঁট কামড়ে হাসছে সামনে বসে থাকা ছবি কে দেখে। লাবিব লামিয়ার দিকে বেশ বিরক্ত হয়ে তাকালো।
শুভ্র সবেই রুমে এসে লামিয়ার পাশে এসে বসলো। লামিয়া কে এমন হাসতে দেখে সে বেশ শীতল দৃষ্টিতে তাকালো লামিয়ার দিকে। বেশ স্নিগ্ধ লাগছে তাঁর শ্যামবর্ণের রমণীর কে। ভেজা চুল গুলো থেকে টুপ টুপ করে পানি ঝড়ছে। এই মেয়েকে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার ভেজা চুলে দেখলো সে। এই মেয়েকে ভেজা চুলে দেখলে তাঁর কেমন মাতাল মাতাল লাগে ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দিতে। ভেবেই হালকা হাসলো শুভ্র।
প্রায় এক ত্রিশ মিনিট ধরে লামিয়া বসে বসে হাসছে দেখে ছবি একবার শুভ্র এর দিকে তাকিয়ে দেখলো শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে তাই সে, হালকা হেসে লামিয়ার উদ্দেশ্য বললো
– ওহ্ এখনো বেঁচে আছিস তাহলে?? আমি তো ভেবেছিলাম তাঁকে না পেয়ে এতো দিনে মরে গিয়েছিস।
ছবির এমন কথায় তার দিকে ঘুরে তাকালো লামিয়া, ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হেঁসে কপালের সামনে থাকা চুল গুলো কানের পিছনে গুজে হাঁসি মুখে জবাব দিলো
– খাঁটি গরুর দুধ চায়ের সাথে পাইনাপেল বিস্কুট খেয়ে এখনো মরি নাই , আর তুই ভাবছিস তাঁকে না পেয়ে মরে গিয়েছি। ছ্যাঁঃ শালার কি চিন্তা ভাবনা তোর।
লামিয়ার কথায় শুভ্র আবারো হাসলো। ছবির সামনে যে সে মচকাবে না তা সে ভালো করেই জানে।
এইবার লামিয়া ছবির দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো ” তুই কীভাবে বেঁচে গেলি?”
ছবি হালকা হেসে বললো ” ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছি সেদিন। কেনো আমাকে দেখে কী তুই খুশি না এতো গুলো বছর পর আমাকে দেখে অন্তত আমার গলায় ঝুলে পড়ার কথা।”
লামিয়া হালকা হেঁসে বললো ” তোর গলায় ঝুলবো আমি? মাথা খারাপ নাকি আমার যে তোর গলায় ঝুলতে যাবো। তুই আমার কপি করা জিনিস ভুলে গিয়েছিস? কপি করা জিনিস আমার পছন্দ নয়। আর তুই কি না ভাবছিস আমি তোর গলায় ঝুলে পড়বো, হাহ।”
লামিয়ার কথায় ছবি হো হো করে হেঁসে উঠলো ” সিরিয়াসলি লামিয়া আমি তোর কপি নাকি তুই আমার কপি মনে কর তো। আমি কিন্তু তোর একদিন এর বড় তাই তুই আমার কপি।”
ছবির এমন কথায় লামিয়া কিছু বললো না। চুপ করে কিছুক্ষণ রইলো । শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। লাবিব বেশ বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার উপর।
” শু…শুভ্র ভাই কোথায়?” বেশ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠলো লামিয়া।
লামিয়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো ছবি তারপর হাই তুলে বললো ” মরে গিয়েছে সেই আগুনে! কেনো তুই খুশি না? কিন্তু তোর তো খুশি হবার কথা তাই না?”
ছবির এমন কথায় হঠাৎ লামিয়া রেগে উঠলো। চোখ বন্ধ করে রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করলো।
তা দেখে ছবি বাঁকা হেঁসে আগুন ঘি ঢালার মতো কথা বলে উঠলো ” জানিস আজ সে বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের বিয়ে হয়ে যেতো। শুভ্র ভাই আমাকে বলেছিলো যে বড় হয়ে গেলে আমাকে বিয়ে করবে আমাদের মধ্যে কী সু…. ।
ব্যাস আর কিছু বলতে পারলো না লামিয়া রাগে জ্ঞান হারিয়ে ছবির গলা চেপে ধরলো শক্ত করে। হঠাৎ এমন হওয়ায় সবাই ভয় পেয়ে গেলো।
হামিদা দ্রুত লামিয়া কে সরিয়ে আনতে চাইলে ও পারলো না।
লামিয়া রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠলো ” কয়জন লাগে তোর হাহ প্রথমে লাবিব তারপর শুভ্র কয়জন লাগে? আমার থেকে আমার জিনিস কেড়ে নিয়েছিস তুই। তোর জন্য আমি ওই মানুষটাকে এখনো ঘৃণা করি। আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিস তাঁকে। তাঁর মৃত্যুর আগেও আমি তাঁর সাথে কথা বলতে পারিনি শুধু মাত্র তোর জন্য ছবি। তুই আমার সব কেড়ে নিয়েছিস। আমার জীবন থেকে আমার ভালোবাসার মানুষ আমার জীবনের রং আনন্দ সব নিয়ে গিয়েছিস। সব ছিনিয়ে নিয়ে বলছিস আমার খুশি হবার কথা? আমার খুশি আমার সব কিছু নিয়ে নিয়েছিস তুই। কোনোদিন ও ক্ষমা করবো না তোকে আর না ওই অশুভ্র পুরুষটাকে।
আমাকে ভালোবাসা শিখিয়ে তোর ছলনা তে পড়ে আমাকে তাঁর কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো। শুধু মাত্র তোর জন্য আমাকে সরিয়ে দিয়েছে মাফ করবো না আমি তোদের কাউকে ঘৃণা করি আমি তোদের।”
শুভ্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। লামিয়ার চোখে পানি চিকচিক করছে। ভাঙা গলায় কথা গুলো বলছে লামিয়া। তাঁকে ঘৃণা করে শুনে শুভ্রর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। তাঁর ভিতর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে তাঁর রমণীর চোখের পানি আর এমন কথায়।
এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
লাবিব এতোক্ষণ সব কথা শুনে ভীষণ রেগে গিয়েছে লামিয়ার উপর। তাঁর উপর ছবির গলা চেপে ধরায় লাবিবের আরো রাগ উঠছে। হামিদা ও লামিয়া কে সরাতে পারছে না দেখে লাবিব লামিয়ার হাত শক্ত করে ধরে সরিয়ে অনলো ছবির থেকে। ছবি ছাড়া পেয়ে কেশে উঠে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। লামিয়া রেগে আবার তেড়ে যেতেই লাবিব রেগে লামিয়ার হাত ধরে শক্ত হাতে জোড়ে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো লামিয়ার গালে। গালে জোড়ে থাপ্পড় পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে লামিয়ার শ্যামবর্ণ গাল নীল হয়ে উঠলো।
লাবিব এর এমন কাজে সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকালো।
এদিকে শুভ্র ভীষণ রেগে গিয়েছে।
লামিয়ার গাল নীল হতে দেখেই মূহুর্তেই শুভ্রর দু চোখ রক্তিম হয়ে উঠলো। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করলো।
লামিয়া ছলছল চোখে লাবিব এর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে উঠলো ” আজকে সে থাকলে হয়তো আমার গাঁয়ে হাত তোলার সাহস পেতেন না লাবিব ভাই।”
বলেই সবার দিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে নিজের রুমে চলে গেলো।
লাবিব অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে লামিয়ার যাওয়ার দিকে। সে লামিয়া কে আঘাত করতে চায় নি কিন্তু রাগ কন্ট্রোল করতে পারে নি সে।
লামিয়া যেতেই শুভ্র আচমকা লাবিবের মুখে ঘুষি মারতেই লাবিব পিছিয়ে গেলো। নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে তাঁর।
শুভ্র লাবিবের কলার ধরে আরো একটা ঘুষি মারতেই লাবিব শুভ্রর নাকে ঘুষি মেরে বসলো।
রাশেদ,সাফওয়ান,আরিফ,আবির তাদের কে ফেরাতে চাইলো কিন্তু পারলো না।
শুভ্র রাগে হিসহিসিয়ে বললো ” বলেছিলাম না ওর গায়ে হাত তুলবি না। তোকে কে সাহস দিয়েছে ওর গায়ে হাত তুলতে।”
লাবিব নাকের রক্ত মুছে নিয়ে বললো ” লাবিব কে কারোর সাহস দিতে হয় না ভুল করলে শাস্তি পেতে হবে।”
“লামিয়া ভুল কিছু করে নি, ভুল ছবি করেছে আর সেই শুরু থেকে করে আসছে, এখনো করছে শাস্তি দিতে হলে তোর টা কে দে। আমার জিনিস এর উপর আবার হাত বাড়ালে খোদার কসম লাবিব আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”
” ওও তোর জিনিস ? এতো অধিকার? তা কষ্ট দিয়েছিলি কেনো? তোর দেওয়া কষ্টে যখন ছটফট করতো গলা কাটা মুরগীর মতো তখন কোথায় ছিলো ওর ওপর তোর অধিকার? তোর দেওয়া কষ্টে একটা নরম স্বভাবের মেয়ে যখন পাথরে পরিণত হতে লাগলো তখন কোথায় ছিলি, কষ্ট দেবার সময় মনে ছিলো না? আরে ভাই তুই নিজেই তো ওর মন ক্ষত বিক্ষত করে দিয়েছিস, আর এখন আসছিস আমাকে বলতে। হাঁসি পেলো তোর কথা শুনে। ”
লাবিব এর কথায় শুভ্র শক্ত চোখে, শক্ত গলায় বললো “আমি ক্ষত বিক্ষত করি নি। ছবি কে জিগ্গেস কর আমাদের মাঝে যতো ভুল বোঝাবুঝি যতো ঝামেলা যতো দূরত্ব লামিয়ার মধ্যে আমার জন্য ঘৃণ সব কিছু সৃষ্টি করেছে ছবি।”
বলেই বেরিয়ে গেলো শুভ্র। সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কী থেকে কী হয়ে গেলো। ছবির ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বসে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে এসব এ তার কোনো আগ্রহ নেই।
লাবিব ছবির দিকে তাকালো তার ভীষণ রাগ লাগছে। শুভ্র যা বলছে তা ভুল বলে নি। শুভ্র যেদিন এ বাড়িতে পা দিয়েছিলো সে সেইদিন ই জেনেছে আবরার ই শুভ্র। শুভ্র বেঁচে আছে, তবে শুভ্র বলে নি ছবি বেঁচে আছে। লাবিব অনেক বার ছবির কথা জিজ্ঞেস করেছিলো কিন্তু শুভ্র বলেছে মারা গিয়েছে।
ছবি কে কল্পনা করে লাবিব যতো বার লামিয়া কে ছুঁয়েছে ততো বার ই শুভ্রর সাথে লাবিব এর মারামারি হয়েছে।
লাবিব রেগে গটগট পায়ে চলে গেলো রুম থেকে।
সবাই তা দেখে উচ্চ স্বরে হেঁসে উঠলো। বহু বছর পর ছোট্ট বেলার কাহিনী দেখে তাদের ভেতর শান্তি লাগছে।
চারজন এর একজন ও এখনো পাল্টায় নি সেই আগের মতোই আছে। ছবি আজকে ইচ্ছে করে লামিয়া কে রাগিয়ে দিতে এইসব বলেছে সবাই জানে।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৯
সবাই ছবির দিকে তাকাতেই ছবি হেঁসে বললো “আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে গিয়েছে কী এমন খায় যে এতো শক্তি আমার ও তা খেতে হবে।”
ছবির কথা শুনে আরো একবার হেঁসে উঠলো সবাই।
