Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৬

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৬

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৬
নুরিয়া ইসলাম

সান ফ্রান্সিসকো,
প্রকৃতির কোলে ঘুমন্ত শহরটা ধীরে ধীরে রোদে জেগে ওঠে, এই শান্ত সকালে, ইনায়া ঘুম থেকে উঠে বসার ঘরে এসে বসে থাকে। তখনি তার নাকে ভেসে আসে গরম কফির সুবাস। চুলার পাশে দাঁড়িয়ে ইনায়ার ভাবি মারিয়া ব্যস্ত ব্রেকফাস্ট প্রস্তুত করতে। এমন সময় দরজার ঘণ্টা বেজে ওঠে।
মারিয়াঃ” ইনায়া, দেখতো কে আসলো? আজকে তো আদিলের আসার কথা ছিল, তোর ভাইতো ভোরেই বেরিয়ে গেছে আদিলকে আনতে। ওরাই এসেছে, মনে হয়!”
ইনায়া ভাবির কথা শুনে দরজা খুলে হকচকিয়ে যায়। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক চেনা মুখ। তার হাতে একটা সুটকেস, মুখে কোমল হাসি ফুটে রয়েছে ।
ইনায়ার ভাই পেছন থেকে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলে উঠে,

“দেখো তো কে এসেছে!
ইনায়া হেসে আদিলের দিকে এগিয়ে বলে ওঠে,
“ওহ মাই গড, আদিল!তুই আসবি, আমাকে কেউ বলেনি কেন?”
আদিল ইনায়ার কথা শুনে হেসে বলে ওঠে,
“কাল রাতেই ল্যান্ড করেছি। ভাবলাম তোকে চমকে দিবো। আর হ্যাঁ, একটা ভালো খবর আছে।”
ইনায়া অবাক হয়ে বলে ওঠে,
“কী খবর!”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আদিল আবারও ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে ওঠে,
“আমি তোর ইউনিভার্সিটিতেই চান্স পেয়ে গেছি রে USC-তে! একসাথে পড়ব ভাবতেই মজা লাগছে।”
ইনায়াঃ “কী বলিস?সত্যি নাকি?আমায় কেউ বলেনি কেন?”
আদিলঃ” আমিই বলতে নিষেধ করেছিলাম, তোকে সারপ্রাইজ দিবো বলে!”
তখনি মারিয়া পিছন দিক থেকে বলে ওঠে,
“আরে আদিল! কতদিন পরে দেখা, একেবারে বড় হয়ে গেছো!”
আদিল হেসে মারিয়াকে বলে,
“ভাবি, বড় তো হয়েছি, কিন্তু আপনার হাতের নাশতার স্বাদ এখনও ভুলিনি! আজকে স্পেশাল কিছু আছে তো?”
মারিয়া হাসতে হাসতে বলে, “তোমার জন্য স্পেশাল ব্রেকফাস্ট রেডি করেছি, আগে ফ্রেশ হও, তারপর খেতে এসো!”
ইনায়াঃ
“তাহলে কাল থেকেই ক্যাম্পাস ট্যুর শুরু! USC-তে আমার গাইডেন্স ছাড়া এক পা-ও চলতে পারবি না, বুঝলি?”
আদিলঃ “তোর মতো গাইডেন্স থাকলে ভয় কী!
আদিলের এই কথায় সবাই হেসে দেয়। মুহুর্তেই মধ্যেই শান্ত পরিবেশটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।

USC ক্যাম্পাস,
এরিক ক্যাম্পাসের ভিতরে বাইকের উপর শুয়ে সিগারেটের ধোঁয়া উড়াচ্ছিলো আকাশে।তার চারপাশে তার বন্ধুরা তাকে ঘিরে আড্ডা দিচ্ছে।
এমন সময় এ্যারেন হঠাৎ করে এরিককে ডেকে উওেজিত গলায় বলে উঠে, এটা আমি কী দেখছি? দেখ এরিক তোর বেবিগার্ল একটা ছেলের সাথে হেঁটে যাচ্ছে।

কথাটি এরিকের কর্ণপাত হতেই , সে দ্রুত বাইক থেকে উঠে পড়ে, চোখ থেকে সানগ্লাস সরিয়ে সামনে দৃষ্টিপাত করে । মুহুর্তের মধ্যেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো । ইনায়া একটা ছেলের সাথে কথা বলছে আর কী নিয়ে যেন তারা হাসছে? ইনায়া তো কখনও তার সঙ্গে সহজভাবে কথা বলেনি, একটিবারও হাসেনি ঠিক এভাবে। অথচ আজ, একজন অপরিচিত ছেলের সামনে কী অনায়াসে খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে!
রাগে, এরিকের মাথা প্রায় গরম হয়ে ওঠে। এই মুহুর্তে এরিকের ইচ্ছা করছে পুরো ক্যাম্পাসের সামনে ইনায়াকে থাপড়াইতে । ইনায়া এরিককে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে এরিক গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠে,

“Inaya, stop right there.”
ইনায়া এরিকের কথায়,কোনরকম কর্ণপাত না করে এগিয়ে যায়, আদিলের সাথে, ইনায়ার এই অবহেলা এরিকের সহ্য হয় না তাইতো সে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“Are you fucking deaf? I said, stop.”
ইনায়া থেমে যায়, পাশে আদিল একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায়, এরিকের এই রকম আচরণে।
এরিক এগিয়ে এসে রেগে বলে উঠে ,
” Who is this guy?(কে এই ছেলেটা)? আমাকে কী ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করছো নাকি? ভুলেও সেটা করো না, ফল কিন্তু ভালো হবে না আর নেক্সট টাইম, যেন এই হাড্ডিটার সাথে তোমাকে না দেখি।”
ইনায়া এরিকের চোখে চোখ রেখে, দৃঢ় গলায় জবাব দেয়:
“আপনি কে, আমার ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানোর? আমি কার সাথে কথা বলবো, কোথায় যাবো, সেটা আমার সিদ্ধান্ত। আপনার এই বাজে হুমকি-ধমকি আমার ওপর চলবে না, এরিক।”
এরিক রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“আমিই তোমার সব, বেবিগার্ল। তাই আমায় রাগিও না তুমি। তোমার ভালোর জন্যই বলছি।আমার ধৈর্যের সীমা কিন্তু খুব সীমিত।
এরিকের কথাগুলো শুনে ইনায়া কী করবে ভেবে পাচ্ছে না, তাইতো সে নরম সুরে বলে উঠে,
আপনি কিন্তু পাগলামি করছেন এরিক।নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি এত ঝোঁক কেন আপনার?
ইনায়ার কথা শুনে এরিক মুচকি হেসে বলে উঠে,
“নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি ঝোঁক না থাকলে তো জীবনটাই ফিকে হয়ে যাবে, বেবিগার্ল। তাছাড়া নিয়ম ভাঙার মজাই আলাদা।তোমাকে পেতে দুই-চারটা নিয়ম ভাঙলে ক্ষতি কী?”
এরিক এবার আদিলের দিকে তাকিয়ে, আদিলের কলার ধরে নিজের সামনে এনে বললো,
“কে রে তুই শালা?আমার বেবিগার্লের সাথে তোর কী? তুই আমার জিনিসের আশেপাশে ঘুরছিস কেন? ইনায়া শুধু এই এরিক অ্যাফোর্ডের এই কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে নে।নেক্সট টাইম, তোকে আমার বেবিগার্লের আশে পাশে দেখলে, তোর জন্য ক্যাম্পাসটা নিরাপদ থাকবে না।আই প্রমিস।”
এরিক এবার ছেলেটির কলার ছেড়ে দিয়ে ইনায়ার মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ে বললো,

“baby girl, don’t confuse my silence for weakness. I don’t care about your feelings or his.if you’re not with me, you’re with no one. I break things that try to leave me, and trust me, I never regret it.”
(লিসেন টু মি ভেরি কেয়ার ফুলি বেবিগার্ল, আমার নীরবতাকে আমার দুর্বলতা ভেবো না। আই ডোন্ট কেয়ার ইউর ফাকিং ফিলিংস্।)
আমি কিন্তু মোটেও ভালো ছেলে নই বেবিগার্ল ,তাই নেক্সট টাইম আমাকে ইগনোর করার চেষ্টা করলে তার ফল কিন্তু ভালো হবে না।)

ইনায়া এরিককের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিলো,
মিস্টার এরিক অ্যাসফোর্ড এখন এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি আপনাকে চ্যালেঞ্জ করছি , এই ইনায়া শেখ কোনদিনও আপনার ওই অবাধ্য হৃদয়ে বয়ে চলা নিষিদ্ধ প্রণয়াশক্তিতে আশক্ত হবে না। আপনার মোহ কখনো আমার অন্তরকে আবিষ্ট করতে পারবে না।
এরিক ইনায়ার কথা শুনে মুচকি হেসে নেশাগ্রস্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
“চ্যালেঞ্জ একসেপটেড বেবি গার্ল!তুমি আমার থেকে যতই দূরে যাওয়ার চেষ্টা করবে, আমি ততই তোমার কাছে ফিরে আসবো আর প্রতিবার তোমার তোলা সেই দেয়াল ভেঙে চলে আসবো।
কথাটি বলেই এরিক আর এক মুহুর্ত সেইখানে দাঁড়ায় না নিজের বন্ধুদের নিয়ে চলে যতেই আবার পেছন ঘুরে আদিলের দিকে ভয়ংকর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো এরিক।এরিকের দৃষ্টিতে কী ছিল, আদিলের তা জানা নেই? তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো।

USC ক্যাম্পাস ক্যানটিন,
ক্যানটিনের কর্নার টেবিলে বসে আছে ইনায়া, আদিল আর সোফিয়া। সবার সামনে রয়েছে কফির কাপ আর কিছু স্ন্যাকস।
সোফিয়া কৌতূহলভরা গলায় ইনায়াকে কানের কাছে গিয়ে বলে,
“উহু…ইনায়া, কে রে এই হ্যান্ডসাম হাঙ্ক? নতুন ফ্রেন্ড না কী…!”
ইনায়া হেসে বলে,
“উফ, সোফিয়া! কাজিন আমার। আদিল।
পাকিস্তান থেকে এসেছে, USC-তে অ্যাডমিশন নিয়েছে।”
আদিল সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন মৃদু হাসে, কিন্তু তার দৃষ্টি স্থির থাকে সোফিয়ার চোখে।
সোফিয়া একটু চমকে যায় আদিলের এই দৃষ্টিতে,
“ওহ…ভেরি ইন্টারেস্টিং। তো আদিল, USC কেমন লাগছে এখন পর্যন্ত?”
আদিল এবার চোখ সরিয়ে বলে,

“অনেক ভালো লাগছে। তবে পরিবেশটা অনেক…নাটকীয়।”
সোফিয়া হেসে ফেলে,
“ওয়েল, নাটক তো USC-র DNA-তে আছে!”
আদিল অবাক হয়ে বলে ওঠে ,
“মানে, ঠিক বুঝলাম না!”
সোফিয়াঃ কিছুদিন থাক এমনিতেই বুঝে যাবে।
ঠিক তখনই ক্যানটিনে প্রবেশ করে এরিক ও তার বন্ধুরা। এরিকের চোখ মুহূর্তেই খুঁজে নেয় ইনায়াকে।এরিকের এতো বলার পরও ইনায়াকে আদিলের সাথে দেখে এরিকের চোখের দৃষ্টিতে একরাশ আগুন জ্বলে ওঠে । সে দেখে, ইনায়া হাসছে, আদিলের দিকে ঝুঁকে কথা বলছে।
এরিকের মনের ভিতর হিংস্র স্রোত বয়ে যায়।
সে তার মনে বলে উঠে,

“বেবিগার্ল…তুমি বারংবার আমার ইগোকে আঘাত করছো। বারংবার আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছো। অনেক হয়েছে,তোমার ঘাড় ত্যাড়ামো। তোমার ঘাড় ত্যাড়ামো আমি ছুটাচ্ছি।
এরিক একটা ঠাণ্ডা শ্বাস নেয়, চোখে সানগ্লাস রেখে এগিয়ে যায় টেবিলের দিকে।
সে হঠাৎ ইনায়ার টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে বলে,
“Wow, looks like we’re all making new friends these days.”
সোফিয়া চমকে তাকায়, ইনায়া বিরক্ত চোখে তাকায় তার দিকে।
এরিক ইনায়ার দিকে না তাকিয়ে আদিলের দিকে তাকিয়ে বলে,
“Hi there, never seen you around. Exchange student or just… temporary entertainment?”
আদিল উঠে দাঁড়ায়, শান্তভাবে বলে,
“That’s none of your business.. And I don’t appreciate that tone.”
এরিক ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলে,

“attitude? হুম ভালোই,শালা আমায় অ্যাটিটিউট দেখাচ্ছে।
এরিকের এইরকম ভাবলেশহীন কথা শুনে আদিল একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায় কিন্তু সোফিয়া বিষয়টা বুঝতে পারে।
এরিক এবার টেবিলে বসে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে বলে,
“তুমি তো দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছো আজকাল, বেবিগার্ল!
তোমার সাথে কথা বলারও সময় পাই না, এখন দেখি নতুন নতুন মানুষও জুটে গেছে পাশে।
তবে বন্ধু হোক বা শত্রু আমার কথা ভুলে গেলে কিন্তু চলবে না। আমি কিন্তু খুব পজেসিভ তোমায় নিয়ে , আর আমার জিনিসের আশেপাশে কেউ ঘোরাঘুরি করুক এটা আমি একদম পছন্দ করি না। তুমি কি জানো, তোমার এই ‘ফ্রেন্ড’কে নিয়ে সবাই কতো গল্প করছে?তাই বলছি,
তুমি যদি আমার কথা না শোনো, তাহলে কিন্তু আমাকেও নিজের আসল রূপে আসতে হবে।
আর আমি নিজের আসল রূপে গেলে, সেটা কারও জন্যই ভালো হবে না, বিশেষ করে তোমার জন্য। তুমি কি বুঝতে পারছো, আমি কী বলতে চাইছি?এরিকের কণ্ঠে ছিল মিশ্র রাগ কিন্তু চোখে ছিল স্পষ্ট হুমকি।
ইনায়া এরিকের কথায় হেসে বলে ওঠে , “আপনি বরং নিজের কাজ নিয়ে ভাবেন, এরিক। আমি কার সাথে থাকবো, সেটা আমার ব্যাপার।”

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৫

এরিক একটু ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে,
“ঠিক আছে, এরপর তোমার সাথে যা হবে, তার জন্য আমাকে দোষ দিও না।
আই প্রমিস, ফলটা হবে একেবারে স্পেশাল।
Just wait and watch, বেবিগার্ল।
কথাটি বলেই এরিক ও তার বন্ধুরা দ্রুত গতিতে ক্যাম্পাস ত্যাগ করল।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৭