Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৫

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৫

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৫
নুরিয়া ইসলাম

সান ফ্রান্সিসকো,
কুয়াশায় ঢাকা বৃষ্টিভেজা রাতের নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গেছে সব আলো, শুধু টুপটাপ বৃষ্টির সুর ভেসে আসছে।
রাস্তার দুইপাশ থেকে ভেসে আসছে সাঁই সাঁই করে চলা গাড়ির আলো আর কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া ক্লান্ত শহরের নিঃশ্বাস…

এরিকের শেডো রাইডারটা গর্জন তুলে ছুটে চলে নির্জন রাস্তায়, কুয়াশার চাদর ভেদ করে।
ইনায়াদের বাড়ির সামনে এসে বাইক থামে,বাইক থেকে নেমে ভেজা পাইপ বেয়ে চুপচাপ ওপরে ওঠে এরিক।
ঘরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। ইনায়া নামাজ পড়ছে। এরিক এতে একটু অবাক হয়, এতো রাতে মেয়েটা না ঘুমিয়ে নামাজ পড়ছে। এরিক ধীর পায়ে এগিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো, এইদিকে ইনায়া নামাজরত অবস্থায় সালাম ফিরাতেই তার চোখের সামনে অনাঙ্ক্ষিত এক মুখ ভেসে উঠলো। সে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নামাজে মনোযোগ দিতে লাগলো। আর এরিক ইনায়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
ইনায়া নামাজ শেষ করে রেগে এরিককের দিকে এগিয়ে গেল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“আপনি পাগল নাকি? এত রাতে একজন পরনারীর ঘরে কী করছেন? সময় দেখেছেন?”
এরিক ইনায়ার কথায় দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো,
“পাগল তো তুমি আমায় বানিয়েছো, জুনিয়র বেবি! ঘুম কেড়ে নিয়েছো আমার, এই দেখো এখন রাত তিনটা বাজে, কিন্তু আমি না ঘুমিয়ে তোমাকে দেখার তৃষ্ণা মেটাতে ৬২০ কিলোমিটার পথ রাইড করে ছুটে এসেছি।
এরিকের কথায় ইনায়া রেগে বলে উঠে,
কোন কিছুতেই আপনার যায় আসে না, তাই না? আমি মুসলিম মেয়ে, রাতদুপুরে ঘরে পরপুরুষ এলে আমার সম্মান কোথায় থাকবে, আমার পরিবারের সামনে?
ইনায়ার কথায় এরিকের মধ্যে কোন রকম ভাবান্তর দেখা গেল না বরং আয়েশি ভঙ্গিতে সোফায় দুই পা এলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেসা করলো,

“তা কী চাইলে এতো রাতে তোমার সৃষ্টিকর্তার কাছে?আমার থেকে মুক্তি?লাভ নেই?”
ইনায়া এরিকের দিকে তাকিয়ে কাট কাট গলায় জবাব দেয়,
“আপনার মতো মানুষকে ভয় পাই না আমি, এরিক। আমার বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তা আমায় রক্ষা করবেন।আপনার ছায়া আমার ওপর পড়বে না।”
এরিক একটু বাঁকা হেসে জবাব দিল,
“তোমার এই ভয়হীন চোখে তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিটা… অদ্ভুত এক শান্তি দেয়, জানো ?
তোমার ঈমানের দৃঢ়তায় আমার মতো পাপীরা আরো একটু গভীরে ডুবে যাক।
তুমি চাও, আমার ছায়া না পড়ুক তোমার উপর,
কিন্তু আমি চাই, তোমার আলোতেই আমি একটু জ্বলি, একটু পুড়ি……আরও একটু নিঃশেষ হই।
এরিকের কথাগুলো শুনে ইনায়া বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,

“আপনার এই নাটকীয়তা আমার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না, এরিক।
ইনায়ার কথা শুনে এরিক রসিকতা করে বলে উঠে,
“তোমার ওপর প্রভাব না ফেললেও, আমার ঘুমের ওপর তুমি খুব বাজেভাবে প্রভাব ফেলেছো,বেবিগার্ল !
তুমি চাইলে নাটক থামিয়ে চুপচাপ তোমার পাশে বসে থাকতে পারি, কেমন?”
ইনায়া এবার চোখ কুঁচকে গলা চড়িয়ে বলে উঠে ,
“আরেকটা কথা বললে, এই বালিশটা ছুঁড়ে মারবো!
এত রাতে মজা করতে এসেছেন, বের হন আমার ঘর থেকে এখনই!”
এরিক হালকা হাসি দিয়ে বলে উঠে,
“তোমার নাম্বারটা বেবিগার্ল, খুব মিস করি তোমায়! এতদিন কথা না বলে থাকা যায়, বলো? ভার্সিটিতে দেখা হলে ভালো কথা কম, ঠুকাঠুকি বেশি হয়।”

এরিকের কথায় ইনায়ার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে দাঁতে দাঁত চেপে গলা শক্ত করে বলে,
“কি ভেবেছেন আপনি? এটা কোনো সিনেমার সিন চলছে? রাত তিনটায় একটা মেয়ের ঘরে ঢুকে প্রেমের সংলাপ ঝাড়বেন, আর আমি মুগ্ধ হয়ে শুনবো? বেরিয়ে যান এক্ষুনি!”
ইনায়ার চিৎকারের মাঝেই দরজায় করাঘাত পড়ে , ওপাশ থেকে মিস্টার তানভীরের গম্ভীর গলা ভেসে আসে,
“দরজা খোল ইনু, কী হয়েছে?”
ভাইয়ের আওয়াজে ইনায়া আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। সে ফিসফিস করে এরিককে বলে,
“দয়া করে, এবার চলে যান! প্লিজ!”
এরিক মুচকি হেসে বলে,

“আরেকটু থাকি না, ভালোই তো লাগছে। দরজায় কে এসেছে, যেই আসুক তাতে আমার কী?”
ইনায়া এবার রাগে এরিকের মাথার নিচের বালিশটা কেড়ে নিয়ে বলে,
“আরেকটা কথা বললে, সত্যি বলছি, দরজা খুলে ভাইয়াকে ডেকে আনবো!”
এরিক দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
“ডাকো তোমার ভাইকে, ভয় পাই নাকি? বরং তোমারই ভয় পাওয়া উচিত, এতো রাতে একটা ছেলে তোমার রুমে! উফফ…সরি, তোমার ভাষায় তো পরপুরুষ! তোমার পরিবার নিশ্চয়ই এটা ভালো চোখে দেখবে না।”
ইনায়া এবার গলার স্বর নরম করে মিনতি করে,
“দয়া করে এমনটা করবেন না, প্লিজ! চলে যান।”
এরিক হেসে বলে,

“যাবো, আগে নাম্বার দাও।”
ইনায়া আর উপায় না দেখে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ফোন নাম্বারটা দিয়ে দেয়।
এরিক খুশিতে ইনায়ার দিকে একটা ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়।
এরিক বেরিয়ে যেতেই ইনায়া দরজা খুলে দেয়। মিস্টার তানভীর হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করেন,
“কি হয়েছে? কীসের এত আওয়াজ?”
ইনায়া আমতা আমতা করে বলে,
“ইয়ে মানে ভাইয়া, আরশোলা ছিল। তুমি তো জানো, আমি আরশোলায় কত ভয় পাই।”
মিস্টার তানভীর বোনের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে বলেন,
“পাগলি, এখনো বড় হলি না! যা, ঘুমা।”

USC ক্যাম্পাসের এক কোণে সবুজ ঘাসে বসে আছে চারজন বন্ধু। বিকেলের হালকা রোদ পড়ছে তাদের উপর , পেছনে USC-এর আইকনিক বিল্ডিংটা দেখা যাচ্ছে। তারা সবাই আড্ডা দিচ্ছে, কেউ ফ্লাস্ক থেকে কফি খাচ্ছে, কেউ হাসছে, কেউ ফোন ঘাটছে। এরিক একপাশে চুপচাপ বসে রয়েছে , কালো হুডি পরে, চোখে সানগ্লাস,হাতে একটা ডার্ক রোমান্টিক বই। বইয়ের নাম: “Savage Hearts”
এ্যারেনঃ “তুই সবসময় এতো ডার্ক রোমান্টিক বই পড়িস কেন?
এরিক বই থেকে চোখ তুলে, ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বললো,
“ভবিষ্যতে কাজে লাগবে তাই। বেবিগার্ল তো আমার খুব ইনোসেন্ট।এই যুগে এতো ইনোসেন্ট হলে চলে নাকি? নিজের ধাঁচে গড়তে হবে না তাকে।”

এ্যালেক্স একটু মুচকি হেসে এক চোখ টিপে বললো,
“তোর ওই বেবিগার্ল তোকে হ্যান্ডেল করতে পারবে তো?
এ্যালেক্সের কথায় এরিকের ঠোঁটের কোনে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠে, সে একটু মুচকি হেসে বলে উঠে,
“আমি আছি কী করতে? সব শিখিয়ে দেব, একদম নিজের মতো করে।”
এ্যারেন ভ্রু কুচকে বলে উঠে, “তাহলে তুই ওকেও নিজের মতো ডার্ক করে তুলবি,নাকি ?”
এরিকঃ “ডার্ক না, একটু রিয়েলিস্টিক বানাবো। ইনোসেন্ট মেয়েরা আমার সহ্য হয় না।তাদের একটু বদলাতে ইচ্ছে করে।”

এরিকের এই কথা শুনে এ্যারেন, এ্যালেক্স, জুলি, এলিনা চারজনেই এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
তারা নিঃশব্দে একে অপরের দিকে তাকায়, কারো চোখে বিস্ময়, কারো মুখে চাপা হাসি, কারো দৃষ্টিতে মিশে থাকে অজানা কৌতূহল।
এ্যারেন তো সবার সামনেই বলে দেয়, শালা ডেঞ্জারাস আছে। দেখিস ভাই, মেয়েটাকে বেশি হার্ড করিস না।
এ্যারেনের এই কথায় চারজনেই হেসে দেয়।
এ্যারেনের কথায় এরিক ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে , সানগ্লাস নামিয়ে একটু নিচু গলায় বলে,
“হার্ড না হলে তো আসল ফিলই আসে না। তাছাড়া,
কোমল ভালোবাসা আমার জন্য না।

USC লাইব্রেরির কোণায় বসে পড়ছিল ইনায়া আর সোফিয়া। দু’জনেই নোট লিখছে, চারপাশে হালকা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ, অলিভিয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এসে হাজির হলো ইনায়ার সামনে । সে সরাসরি ইনায়ার দিকে এগিয়ে যায়, রাগে বলতে থাকে,
“তুই জানিস, এরিক আমার সাথে কথা বলে না শুধু তোর জন্য! তুই না থাকলে আজ ও আমার হতো! সব তুই নষ্ট করেছিস!”
ইনায়া শান্ত কন্ঠে জবাব দেয়,
“তুমি যদি ভেবে থাকো এরিক আমার জন্য তোমার সাথে কথা বলছে না , তাহলে, সেটা তোমার সমস্যা। আমি তোমাকে বা এরিককে নিয়ে কখনোই কিছু ভাবিনি না ভবিষ্যতে ভাববো।”
অলিভিয়াঃ “ একদম মিথ্যা কথা বলবি না, তুই চুরি করেছিস ওকে! তোর জন্য ও আমার থেকে দূরে চলে গেছে!”
এই বলে ইনায়ার বইটা ছিনিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দেয় অলিভিয়া।
সোফিয়াঃ “অলিভিয়া! এটা কী করলে?”

ইনায়াঃ এরিক কোনো জিনিস না, যে চুরি করা যাবে। সে যদি তোমাকে এড়িয়ে চলে তাহলে তাকে সরাসরি গিয়ে জিজ্ঞেসা করো, বারবার আমায় বিরক্ত করতে এসো না।
অলিভিয়া রেগে বলে উঠে,
“তুই আমার সবকিছু নিয়ে নিয়েছিস! তোর মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই?”
ইনায়া ঠাণ্ডা গলায়, স্পষ্টভাবে জবাব দেয়ঃ
“দেখ, আমি এরিককে ভালোবাসি না। ওর সাথে আমার কিছুই নেই। তোমার নিজের কষ্টের দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়ে লাভ নেই।”
অলিভিয়া চোখ রাঙিয়ে ইনায়াকে শাসিয়ে বলে উঠে,

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৪

“শোন ইনায়া, আমার এরিকের আশেপাশে তোকে আর একবারও দেখলে, আমি কিন্তু তোকে ছাড়ব না।
তুই জানিস না, আমার রাগ কতটা ভয়ংকর হতে পারে।নিজের ভালো চাইলে আমার এরিকের থেকে দূরে থাক।”
এই বলে ইনায়াকে শাসিয়ে অলিভিয়া সেই স্থান ত্যাগ করে।অলিভিয়া চলে যেতেই, ইনায়া ছেঁড়া বইয়ের পাতা কুড়িয়ে নেয়, নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সোফিয়া পাশে বসে তার কাঁধে হাত রাখে দু’জনেই আবার পড়ায় মন দেয়।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৬