অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৪
নুরিয়া ইসলাম
USC ক্যাম্পাস,
ক্যাম্পাসের ছায়ায় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ইনায়া অপেক্ষা করছিলো তার ফ্রেন্ড সোফিয়ার জন্য। এতদিন ইনায়া একা থাকলেও, সোফিয়ার প্রাণবন্ত হাসি আর সহজ মিশুক স্বভাব অল্প ক’দিনেই তাদের বন্ধুত্বকে গভীর করে তুলেছে।
অন্যদিকে, এরিকের মনে অনেক দিন ধরে চলছিলো টানাপোড়েন। নিজের অনুভূতি বুঝে নিতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেকটা পথ। ইনায়ার জন্য তার ভালোবাসা ধীরে ধীরে গভীর হয়েছে, কিন্তু সে কখনো তা স্বীকার করেনি । অবশেষে, সমস্ত দ্বিধা আর সংশয় ঝেড়ে ফেলে, আজ সে নিজের মনের কথা জানাতে এসেছে ইনায়ার কাছে।
ক্যাম্পাসের ছায়ায় গাছের নিচে একা দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়াকে দেখে, এরিক নিজের পোশাকটা একটু ঠিক করে, ধীর পায়ে এগিয়ে যায় তার দিকে। কোনো কিছু না ভেবে, সে ইনায়াকে পেছন থেকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে, গালে এক চুমু খেয়ে নিজের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়।
হঠাৎ স্পর্শে ইনায়া চমকে ওঠে। পিছন ফিরে দেখে এরিককে, প্রথমবার কোনো ছেলে তাকে ছুঁয়েছে বলে, রাগে আর লজ্জায় তার চোখে জল চলে আসে। কাঁপা হাতে সে এরিককে চড় মেরে দেয়।
ইনায়া চড় মারতেই এরিক হতভম্ব হয়ে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ইনায়ার চোখে আগুন জ্বলে উঠে , সে রাগে এরিকের কলার চেপে ধরে বলে,
“এটা কী করলেন? আমায় কেন ছুঁলেন আপনি? আপনি জানেন না আমি মুসলিম? একজন মুসলিম মেয়েকে তার স্বামী ছাড়া অন্য কেউ ছোঁয়া হারাম!”
একেতো এরিক ইনায়াকে বহু কষ্টের পর নিজের ইগোকে সাইডে রেখে মনের কথা বলতে এসেছে। আর ইনায়া কী করলো তাকে চড় মারলো। আর মেয়েটা কী হারাম হারাম করে সবসময়?এরিক ইনায়ার দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,কী হারাম হারাম করো সবসময় ? এই হারাম আবার কী?
ভালোবাসি বলে ছুঁয়েছি, এতে কোনো পাপ নেই!”
ইনায়া দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠে ,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“চুপ করুন নির্লজ্জ লোক! আপনি নাস্তিক, পাপ-পুন্যের কী বুঝবেন?আপনার কাছে পাপ না-ই হতে পারে, আমার কাছে এটা হারাম! আমি মুসলিম, আমার ধর্মে এসব নিষিদ্ধ। আপনি আমার জন্য হারাম, বুঝলেন? আপনি কী ভেবে ছুঁলেন আমাকে? আমার সম্মান কি এতটাই সস্তা আপনার কাছে?”
এরিক: “সস্তা? না বেবিগার্ল ! তুমি জানো না তুমি আমার জন্য কতটা দামি! আমি তোমাকে ছুঁয়েছি, কারণ আমি সত্যি ভালোবাসি তোমায়। আমি তো কিছু খারাপ করিনি। আর ভালোবাসা কখনো পাপ হয় না!”
ইনায়া: আমি একজন মুসলিম মেয়ে। আমার শরীর, আমার সম্মান আমার ঈমানের অংশ। আপনি যদি সত্যিই ভালোবাসতেন, তাহলে আপনি জানতেন, এই স্পর্শটা আমার ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে।”
এরিক:
“আমি এরিক অ্যাসফোর্ড! আমি কোনো নিয়মের দাস না! আমি যা ভালোবাসি, সেটার জন্য সবকিছু করি। তুমাকে ভালো লেগেছে, ভালোবাসি বলেই ছুঁয়েছি। এটা কোনো অন্যায় নয়!”
ইনায়া পিছিয়ে যায়, হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বলে,
“আপনার ভালোবাসার সংজ্ঞা আমি জানি না, জানতেও চাই না। কিন্তু আপনি আমার জন্য হারাম, আপনি নিষিদ্ধ! আমি কখনোই আপনাকে গ্রহণ করতে পারি না!”
“আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে, একজন নারীর শরীর তার স্বামী ছাড়া কারো না। আপনি কখনোই আমার কাছে হালাল হতে পারেন না।”
এরিক দাঁতে হাত চেপে তার হাতটা দিয়ে গাছে এক পাঞ্চ মেরে বলল,
“তাহলে কী করব? নিজের অনুভূতিগুলো মেরে ফেলব? আমি তো ইচ্ছে করে তোমায় কষ্ট দিতে আসিনি। আমি শুধু… শুধু বলতে চেয়েছিলাম তুমি আমার কাছে কী।”
এরিকের হাত বেয়ে রক্ত পড়ছে কিন্তু এরিকের সেইদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।
ইনায়াঃ “আপনার অনুভূতি, আপনার ভালোবাসা এসব আমার কাছে কোনো মানে রাখে না! আপনি কী ভেবেছেন, আপনার ইচ্ছা হলেই আমাকে ছুঁতে পারবেন? আমি আপনার ভালোবাসা চাই না, আপনার স্পর্শ চাই না!
আপনি আমার জন্য নিষিদ্ধ, হারাম এটা কখনো সম্ভব না! আপনি আমার বিশ্বাস, আমার সম্মান, আমার ধর্ম সবকিছুর সীমা অতিক্রম করেছেন।
দয়া করে, আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন, মিস্টার অ্যাসফোর্ড! আপনি যতই জেদ করেন, আমি কখনোই আপনাকে গ্রহণ করবো না। আমার শরীর, আমার আত্মা কেবল আমার স্বামীর জন্য, আপনার জন্য নয়!”
এই কথাগুলো বলেই ইনায়া সেইখান থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। এরিক রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে, ঠান্ডা গলায় বলে উঠে,
“এত সহজে না বেবিগার্ল। আমার ভালোবাসাকে কী তোমার সস্তা মনে হয় যে বললেই ছেড়ে দিব?
তুমি ভুলে গেছো, আমি এরিক অ্যাসফোর্ড।
আমি যেটা চাই, সেটা পেতে জানি, আর তুমি তো আমার অবাধ্য হৃদয়ের অন্তহীন আশক্তি, এতো সহজে ছেড়ে দিই কী করে। তুমি পালাতে পারো, লুকাতে পারো, কিন্তু আমার ভালোবাসা থেকে মুক্তি নেই।
নিশি নামতেই শহরের ক্লাবগুলো আলোয় ঝলমল করে উঠে। এরিক ক্লাবে গিয়ে একটার পর একটা ড্রিংক করতে থাকে আর ড্রিংকের গ্লাস হাতে নিয়ে রাগে বন্ধুদের বলে উঠে ,
“ও আমায় রিজেক্ট করেছে, এই এরিক অ্যাসফোর্ডকে!
ও জানে না, আমার ছোঁয়া পেতে কত মেয়ে পাগল হয়ে থাকে!
আমি যদি কাউকে কিস করি, সেই দিনটা সেই মেয়ের জন্য লাকি ডে হয়ে যায়।
আর ও বলে কী না আমি ওর জন্য নিষিদ্ধ,হারাম!
না, এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না,আমি।আমি ওকে যখন ভালোবেসেছি তখন ওকেও আমাকে ভালোবাসতেই হবে। আমি ওকে বাধ্য করবো আমায় ভালোবাসতে।
এই বলে এরিক ড্রিংক করতে থাকে।
বন্ধুরাঃ “এরিক, আর ড্রিংক করিস না, অনেক হয়েছে।এইসব পাগলামি বন্ধ কর?”
এলিনাঃ আমি তোকে আগেই সাবধান করেছি,সে অন্য মেয়েদের মতো না।
এ্যালেক্সঃ অনেক হয়েছে এরিক তুই ওই ব্যাকডেটেড মেয়েটার জন্য এতো পাগলামি কেন করছিস?
এরিক রাগে চোখ গরম করে এ্যালেক্সের কলার দুটো চেপে ধরে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই সাহস কোথায় পেলি ওকে ব্যাকডেটেড বলার?কোন কিছু বলার আগে ভেবে নিস ও কাকে বিলং করে? নেক্সট টাইম আমার জিনিস নিয়ে আর যেন তোর মুখে বাজে কথা না শুনি!”
কথাটি বলেই এরিক এ্যালেক্সের কলার ছেড়ে দেয়, এ্যালেক্স সাথে সাথে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেয়।
এরিক ঘাড় ঘুরিয়ে সকলের উদ্দেশ্য বলে উঠে,
“তোরাই বল, আমি কোন দিক থেকে কমা? মুখ, বডি, মানি, সোয়্যাগ আমারে না বলার সাহস ওর কোথা থেকে এলো?”
কথাটি বলেই এরিক গ্লাসটা টেবিলে রেখে ডান্স ফ্লোরে গিয়ে বলে উঠে ,
“এই গার্লস, give me some compliments!”
মেয়েরা তখন উল্লাসে বলে উঠে,
“You’re a fucking savage, Eric -no boundaries, no limits, just pure chaos!”
আরেকটি মেয়ে বলে উঠে,
“No one makes my heart race like you do!”
(তোমার উপস্থিতি যথেষ্ট আমার হার্টকে বিট করানোর জন্য।)
এরিক ঠাণ্ডা হেসে, গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলে,
“See? Every girl wants to be my chosen. But her? She says I’m haram…
Maybe I am, maybe I’m the forbidden fire she secretly wants but will never touch.”
“But remember this even if she runs, she can never escape my love.”
( প্রত্যেক মেয়ে এই এরিক অ্যাসফোর্ডকে পেতে চাই কিন্তু আমি শুধু ওকে চাই।আমি ওর সেই নিষিদ্ধ ভালোবাসা, যা রাতের আঁধারে আসে, আলোয় ধরা দেয় না। সবাই আমায় পেতে চাই , কিন্তু তার অস্তিত্বের বিচরণ আমার সর্বাঙ্গে রয়ে যায়।)
ইনায়া রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে চুপচাপ পড়ার টেবিলে বসে আছে। একঘন্টা ধরে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সকালের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এরিক হঠাৎ তাকে কিস করেছিল। ইনায়া প্রচণ্ড বিরক্ত, সকাল থেকে ১০০ বার গাল ঘষেছে, গালটা পুরো লাল হয়ে গেছে। নিজের মনে রাগে গজগজ করছে:
ইনায়াঃ “কি ভাবে নিজেকে? কেন ছুঁলো আমায়? আমার ঘৃণা হচ্ছে উনার স্পর্শে! ছি!
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘Sofia Calling…’
ইনায়া ফোনটা তুলে কানের কাছে ধরে বলে উঠে,
“আসসালামু আলাইকুম, বল, কিছু বলবি?”
সোফিয়া ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় জবাব দেয়,
“আলাইকুম আসসালাম, কি রে, তোর কন্ঠটা এমন গম্ভীর কেন শুনাচ্ছে? কিছু হয়েছে নাকি?”
ইনায়াঃ আর বলিস না, আমি প্রচুর বিরক্ত ওই এরিক অ্যাসফোর্ডের জ্বালায়।
সোফিয়া উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো,
“আরে বল না! কী হয়েছে? ”
ইনায়াঃ “এরিক আজকে নিজের সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে … মানে, হঠাৎ করেই… আমাকে কিস করেছে!”
সোফিয়াঃ
“কী বলিস! তোকে কিস্ করছে তাও আবার ইউনিভার্সিটির পপুলার বয়, ওহ মাই গড, তা বান্ধবী কেমন লাগলো রে, ফার্স্ট কিস!
ইনায়াঃ “মজা করিস না! আমার ধর্মে এইসব হারাম! আমি তো গাল ঘষতে ঘষতে লাল করে ফেলছি!”
সোফিয়াঃ “আরে দোস্ত, এত সিরিয়াস হোস না! আমার মনে হয় এরিক তোকে পছন্দ করে, তাই একটু বেশি এক্সাইটেড হয়ে গেছে!”
ইনায়াঃ “তুই বুঝচ্ছিস না! আমার কাছে এসব খুব বড় ব্যাপার।”
সোফিয়াঃ “আচ্ছা, আচ্ছা, তুই কী করেছিস?
ইনায়াঃ টেনে একটা চড় মেরেছি?
সোফিয়া অবাক হয়ে বলে উঠে,
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৩
এটা তুই কী করেছিস? এরিক কিন্তু খুব ডেঞ্জারাস ছেলে আর অনেক রিচও?যদি তোর কোন ক্ষতি করে দেয়।
ইনায়াঃ আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না। উনি আমার সাথে যা করেছে, এই চড়টা উনার প্রাপ্য ছিলো।
সোফিয়াঃ তাও সাবধানে থাকিস,এইসব ছেলেরা খুব ডেঞ্জারাস হয়।
