প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩৪
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
সময়টা সন্ধ্যা ছয়টা।
চারদিকে জ্বল জ্বল করছে লাইটের আলোয়। পুরো ইসলাম বাড়ি সাজানো হয়েছে হরেকরকম লাইট আর ফুল দিয়ে। চারপাশে আত্মীয় স্বজন, আনন্দ ও খুশির ছড়াছড়ি। আত্মীয় স্বজনদের ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা সারা বাড়ি দৌড়া দৌড়া ছুটাছুটি করছে।
এর মাঝেই একটি কালো গাড়ি এসে উপস্থিত হলো ইসলাম বাড়ির গেটে।
প্রথমেই গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো নিহিড়। গায়ে তাঁর কালো রঙের পাঞ্জাবি। দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে তাঁকে। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই গাড়ির আরেক পাশের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো নাসির কায়সার।
পরনে তার গোল্ডেন রঙের পাঞ্জাবি বেশ পরিপাটি হয়ে এসেছে। দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে তাকে। তাকে দেখে আশেপাশের সবাই হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
কায়সার তাঁর বাদামী রঙের চোখের মনি ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগলো। তবে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে সেই মানুষটাকে খুঁজে না পেয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বাড়িতে প্রবেশ করলো।
ইসলাম বাড়ির হল রুমে বসে আছে খান ও ইসলাম বাড়ির কর্তারা। তাঁরা বসে বসে এটা সেটা নিয়ে গল্প করছিলো। তাদের সবার গাঁয়ে সবুজ রঙের পাঞ্জাবি ।
হঠাৎ কায়সার কে দেখে কথা তাদের গল্প বন্ধ করে হাঁসি মুখে দাঁড়িয়ে কায়সারের সাথে কৌশল বিনিময় করে বাড়ির সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন। কায়সার ও বেশ ভদ্রতার মুখোশ পড়ে সবার সাথে হাঁসি মুখে কথা বলতে লাগলো।
হামিদার রুমে বসে আছে হামিদা,লামহা আর আয়না। তিনজন কে একরকম সাজানো হয়েছে। সবুজ রঙের লেহেঙ্গা, মুখে ভারি মেকআপ, ফুলের গয়না দিয়ে সাজিয়েছে তাদের। তিনকে দেখতে পুতুলের মতোই লাগছে।
তাদের পাশেই বসে বসে কথা বলছে শারমিন, হাফসা, ফারিয়া,ছবি আর মনিকা।
তাদের গায়ে সবুজ রঙের শাড়ি। তাঁরা ও ফুলের গয়না দিয়েই সেজেছে সবাই একরকম করে। মনিকা জীবনে প্রথম শাড়ি পড়েছে তাই একটু পর পর আয়নায় নিজেকে দেখছে। এতে ছবি বেশ বিরক্ত তাঁর উপর এমনেই এই মেয়ে কে তাঁর সহ্য হয় না তাঁর উপর সেই কখন থেকে ভাব দেখতে হচ্ছে তার। সে ও তো প্রথম শাড়ি পড়েছে কোথায় সে তো এতো ভাব করছে না যত্তসব বিরক্ত। ভেবেই চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে মনিকার দিকে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আজমেরী বেগম হা করে তাকিয়ে আছে নিজেকে দেখে। ঘার ঘুরিয়ে চোখ পিটপিট করে পিছন ঘুরে তাকিয়ে তায়েবা আর লামিয়ার দিকে। তারপর আবার ঘুরে আয়নায় নিজেকে দেখে বললো ” ওমাই গুড নাইস সো বিটিভিফুল লাগতেছেরে আমারে।”
আজমেরী বেগম এর কথা শুনে লামিয়া আর তায়েবা হেঁসে বললো ” হ্যাঁ দাদী অনেক অনেক অনেক বিউটিফুল লাগছে তোমাকে।”
আজমেরী বেগম দাঁত কেলিয়ে হেঁসে একটু ভাব নিয়ে বললো ” আমি বিটিভিফুল তাই আমারে বিটিভি ফুল লাগতাছে বুজছোস সব ই আজমেরী বেগমের রূপের কামাল। ”
আজমেরী বেগম এর কথা শুনে লামিয়া আলমারি থেকে জ্যাকি আর ব্ল্যাকির জামা বের করতে করতে বললো ” হ্যাঁ আজকে তোমার এই রূপের কামালে একটা পটিয়ে নিও আমরা বিয়ে দিয়ে দিবো তারপর বাসর ঘর করে বাম্পার ফলন চাষ করে আমাদের একটা বাম্পার চাচা গিফট করো কেমন?”
লামিয়ার কথায় তায়েবা হিহি করে হেঁসে উঠলো। আজমেরী বেগম রেগে মুখ ঝামটা দিয়ে চলে গেলো। তা দেখে লামিয়া তায়েবা হেঁসে উঠলো।
লামিয়া তায়েবা কে রেডি হতে বলে চলে গেলো রাশেদের রুমে। ব্ল্যাকি আর জ্যাকির জন্য ও সে আজ জামা কিনে এনেছে। তাই ব্ল্যাকি কে তৈরি করতে চলে গেলো রাশেদের রুমে। রাশেদ এর রুমের সামনে এসে
দরজা ধাক্কা দিতেই দেখলো রাশেদ সবুজ পাঞ্জাবি পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে।
” একটা অ্যাম্বুলেন্স বাড়ির বাহিরে দাঁড় করিয়ে রেখো আজকে। ” বলতে বলতে রুমের ভিতরে প্রবেশ করলো লামিয়া।
হঠাৎ লামিয়ার কথা শুনে পিছন ফিরে তাকালো রাশেদ। লামিয়া দাঁত কেলিয়ে তাকিয়ে হাসছে তাঁর দিকে। তা দেখে রাশেদ ভ্রু কুঁচকে বললো ” অ্যাম্বুলেন্স কেনো?”
লামিয়া আশেপাশে তাকিয়ে ব্ল্যাকি কে খুঁজতে খুঁজতে
জবাব দিলো ” আজকে তোমার এই রূপের আগুনে পুড়ে যাবে একজন তাই বললাম আর কি।” বলেই একটু নিচু হয়ে টেবিলের নিচে থেকে ব্ল্যাকি কে কোলে তুলে দাঁড়ালো লামিয়া।
লামিয়ার কথার মাষে বুঝতে পেরে রাশেদ উচ্চ স্বরে হেঁসে বললো ” তাঁকে পুরানোর জন্যই তো এতো আয়োজন। ”
” বেশি পুরাতে যেও না, জানোই তো বেশি পুরালে ছাই হয়ে যায়। তখন ছাই হয়ে গেলে বাতাসে উড়ে চলে যাবে তখন বেঁধে রাখলে ও লাভ হবে না।” বলেই খাটের উপর বসলো লামিয়া।
রাশেদ হালকা হেসে বললো ” এতো কথা কোথা থেকে শিখেছিস তুই?”
” শিখতে হয় না বড় ভাই, ভিতর থেকে বেরিয়ে যায় কী করি বলো তো?” বলেই ঠোঁট উল্টালো লামিয়া।
তা দেখে রাশেদ হেসে উঠলো। তখনই মাহির জ্যাকি কে নিয়ে প্রবেশ রাশেদের রুমে।
জ্যাকি কে দেখে রাশেদ ভ্রু কুঁচকে বললো ” এই তুই এইটাকে আমার রুমে এনেছিস কেনো?”
মাহির রাশেদ এর দিকে তাকিয়ে বললো ” লামিয়া বলেছিলো ওকে ওর রুমে নিয়ে যেতে কিন্তু গিয়ে শুনলাম ও তোমার রুমে তাই নিয়ে আসলাম। বলেই লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ” তুই এখনো তৈরি হোস নি কেনো?? তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচে আয় মেজ চাচি বলেছে আর বড় ভাই তোমাকে নিচে বড় চাচা ডাকছে নাসির কায়সার এসেছে।
রাশেদ আয়নার নিজেকে একবার দেখে তারপর মাহির কে নিয়ে চলে গেলো।
লামিয়া ফ্লোরে বসে ব্ল্যাকি বিছানায় রেখে শপিং ব্যাগ থেকে গোল্ডেন রঙের একটা জামা বের করে পড়াতে লাগলো। জ্যাকি লামিয়ার সাথে ফ্লোরে বসে আছে।
শুভ্র বাহির থেকে এসে গোসল করে বের হতেই শুভ্রর ফোনে কল আসতেই সে কোমড়ে টাওয়াল পেঁচিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো। এতোক্ষণ রুমে যা যা কথা হয়েছে সব ই সে শুনেছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
লামিয়া জামা পড়াতেই ব্ল্যাকি বেশ নড়াচড়া করতে লাগলো। তা দেখে লামিয়া বেশ আদুরী গলায় বললো
” ব্ল্যাকবেরি আমার এমন করে না সোনা বাচ্চা। আজকে বাড়িতে অনুষ্ঠান সবাই নতুন জামা পড়বে তুমি নতুন জামা না পড়লে খারাপ দেখায় না সোনা ময়না। দেখো কি সুন্দর একটা গোল্ডেন ফ্রোক এনেছি তোমার জন্য। ছোট্ট ছোট্ট দুটো ক্লিপ এনেছি দেখেছো? এইভাবে নড়াচড়া করে না আমাকে জামা পড়াতে দাও সোনা বাচ্চা আমার।”
লামিয়ার কথা শুনে ব্ল্যাকি গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। এইদিকে শুভ্র মুচকি হেসে ভেজা চুল ঝাড়া দিয়ে রুমে প্রবেশ করে বললো
” আপনার দেখি বাচ্চা পালার অভিজ্ঞতা আছে দেখি মিস। ”
হঠাৎ শুভ্রর গলা শুনে চমকে উঠে পিছনে ঘুরে তাকালো লামিয়া। শুভ্র কে এই অবস্থায় দেখে লামিয়া দ্রুত হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে বললো ” অসভ্য লোক এমন অর্ধ নেংটা হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? আর আপনি এখানে কেনো?”
শুভ্র আলমারি থেকে পাঞ্জাবি বের করতে করতে বললো ” এই প্রশ্ন টা আমার ও আপনি কি করছেন ছেলেদের রুমে?”
” আমি ব্ল্যাকি কে জামা পড়াতে এসেছিলাম।”
” তা বেশ ভালো কথা কিন্তু আপনি এমন চোখে হাত দিয়ে রেখেছেন কেনো?”
” তো আমি কি আপনার মতো বেহায়া যে চোখ খুলে আপনার ওই অর্ধ নেংটা শরীর দেখতে যাবো?”
” এতো হ্যান্ডসাম ছেলে কে দেখতে একটু বেহায়া হলেন সমস্যা কী?? তবে সচরাচর এমন দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় না কিন্তু মিস।”
” আপনি সত্যিই একটা অসভ্য লোক।”
” দেখুন সবসময় অসভ্য অসভ্য বলবেন না। যেদিন সত্যি অসভ্য হবো তখন কিন্তু আপনার উপর ভারি পড়বে মিস।”
লামিয়া বেশ বিরক্ত হয়ে উল্টো দিকে ঘুরে দ্রুত জামা পড়াতে লাগলো ব্ল্যাকি কে। এই লোকটার সাথে কথা বলার মোটেও আগ্রহ নেই তার। সবসময় বিরক্ত আর অসভ্য কথা বলবেই এই লোক। ভেবেই নাক মুখ কুঁচকে গেলো।
শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো ” তোকে জ্বালাতে যে আমার শান্তি লাগে তুই যদি জানতি তোর এই রাগি চোখ দুটো, তোর রাগি মুখটা দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমার সাথে কথায় না পেরে যখন বিরক্ত হয়ে মুখ কুঁচকে চলে যাস তখন বেশ শান্তি লাগে আমার কি করে বোঝাই আমি তোকে বল তো?”
শুভ্র হালকা হেঁসে লামিয়া কে জ্বালাতে আবার বলে উঠলো ” আমার মেয়ের জন্য একটা মাম্মা লাগবে মিস!”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া উল্টো দিকে ঘুরে ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো ” তো খুঁজুন আমাকে কেনো বলছেন?”
” না মানে আমার মেয়ে কে আপনার মতো আদর যত্ন করবে এইরকম একটা মানুষ লাগবে।”
” দারাজে অর্ডার করুন পেয়ে যাবেন।” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো লামিয়া।
” টাকা দিয়ে দারাজ থেকে আনার দরকার কী? আপনি আমার এতিম মেয়েটার মা হয়ে যান। আর আমি না হয় আপনার এতিম ছেলের বাপ হয়ে গেলাম কী বলেন?”
শুভ্রর কথায় লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো ” আপনার এই আজগুবি কথা ছাড়া আর কোনো কথা নেই? আর আমার ছেলে কোথা থেকে আসলো?”
” কেনো জ্যাকি আপনার ছেলে না?”
” আমার ছেলের জন্য আমি আছি ওর কোনো বাপ লাগবে না। তাই আমার ছেলের বাপ সাজতে আসবেন না। ” লামিয়া বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠে বলেই ব্ল্যাকি কে একটা গোল্ডেন পুঁতির মালা বের করে গলায় পড়িয়ে দিলো।
শুভ্র একটা গেঞ্জি আর ট্রাউজার পড়ে বললো ” দেখুন আমাদের সম্পর্ক খারাপ হলেও আমাদের ছেলে মেয়েদের সম্পর্ক কিন্তু খারাপ না। ছেলে মেয়ে দুটো সবসময় এক সাথেই থাকে। তাই বলেছিলাম আপনি আমার মেয়ের মা আর আমি আপনার ছেলের বাবা হলে ক্ষতি হবে না। আমার মেয়ে ও একটা মা পেয়ে যাবে আর আপনার ছেলে ও আমার মতো একজন হ্যান্ডসাম বাবা পেয়ে যাবে। ছোট্ট একটা সংসার নিয়ে বেশ চলে যাবে তারপর না হয় আমাদের সম্পর্ক ভালো হলে আপনি আমাকে কিছু দিবেন আমি আপনাকে কিছু দিবো তারপর সেই থেকে জন্ম হবে আপনার আর আমার ছোট্ট একটা শিশু। ”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া দু কানে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুভ্রর দিকে ঘুরে চিৎকার করে উঠলো
” চুপপপপপপপপপপ, থাকুন অসভ্য লোক। তখন থেকে উল্টো পাল্টা বলে যাচ্ছেন। আপনি শুধু অসভ্য না মস্ত বড় বেয়াদব একটা লোক। দেখতে দেখা যায় ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেতে জানেন না। ফালতু লোক, ঘুষি মেরে নাকের নকশা পাল্টিয়ে ফেলবো।” বলেই চোখ খুলে রাগি দৃষ্টিতে তাকলো শুভ্রর দিকে। দেখে মনে হচ্ছে কাঁচা গিলে ফেলবে।
শুভ্র মনে মনে হাসলো তারপর গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক পা দু পা করে এগিয়ে আসতে লাগলো লামিয়ার দিকে। লামিয়া তা দেখে ভ্রু কুঁচকে পিছনে যেতেই শুভ্র ফট করে লামিয়ার হাত ধরে তাঁর কাছে নিয়ে এসে বললো ” চুপ থাকবো কেনো? আর উল্টোপাল্টা কিছু বলি নি। সত্যি বলেছি আপনি চাইলে আমার মেয়ের মা হতে পারেন। আর আমি আপনার ছেলের বাবা হতে রাজি আছি। ”
লামিয়া শুভ্রর থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাইলো কিন্তু শুভ্র আরো জোড়ে চেপে ধরতেই লামিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” ছাড়ুন আমাকে সবসময় ধরা ধরি জড়াজড়ি কোন ধরনের অভ্যদ্রতা?”
শুভ্র লামিয়ার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটু ঝুঁকে লামিয়ার কানে ফিসফিস করে বললো ” একদিন আমি চরম অভ্যদ্রতা করবো আপনার সাথে এবং সেদিন অসভ্যতার সীমা অতিক্রম করবো কিন্তু আপনি সেদিন আমার এই অসভ্য আর অভ্যদ্রতা কে সাঁই দিবেন। সেদিন ধরাধরি, জড়াজড়ি ছাড়াও অনেক কিছু হবে। সেদিন নিজ থেকে আপনি আমার কাছে আপনাকে বিলিয়ে দিবেন মিস।” বলেই লামিয়া কে ছেঁড়ে সরে দাঁড়ালো শুভ্র।
লামিয়া শুভ্রর কথা শুনে শান্ত চোখে তাকিয়ে বললো ” স্বপ্ন দেখতো তো আর টাকা লাগে না। আপনি স্বপ্ন দেখতে থাকুন। তবে বেশি দেখবেন না কারণ নিষিদ্ধ জিনিস নিয়ে স্বপ্ন দেখলে ক্ষতি আপনার ই হবে আমার না। ” বলেই জ্যাকি আর ব্ল্যাকি কে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শুভ্র বাঁকা হাসলো।
হল রুমে বসে কায়সার কথা বলছে সবার সাথে। তবে চোখ বুলাচ্ছে আশেপাশে। হঠাৎ সিঁড়ির দিকে চোখ যেতেই দেখলো সবুজ রঙের একটা পাঞ্জাবি পড়া কুকুরের উপর। গলায় বেশ চকচকে একটা চামড়ার বেল্ট লাগানো তাঁর মধ্যেই একটা ছোট্ট ঘন্টা ঝুলানো যেখানে ছোট করে লেখা জ্যাকি। তাঁর পিছন পিছন দৌড়ে নিচে নামছে বড় লোম ওয়ালা কালো কুচকুচে একটি বিড়াল গায় তাঁর গোল্ডেন এর ফ্রোক। কানের দু সাইডে ছোট্ট ছোট্ট বৌ ক্লিপ লাগানো, গলায় গোল্ডেন পুঁতির মালা তাঁর মাঝেই ছোট্ট একটা ঘন্টা।
কায়সার হা করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। এইদিকে ব্যাকি আর জ্যাকি দুজন দৌড়া দৌড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামছে যার কারণে তাদের গলার ঘন্টার শব্দ হচ্ছে। সবাই চোখ তুলে জ্যাকি আর ব্ল্যাকি কে দেখে তাকিয়ে আছে সেদিকে। কী সুন্দর লাগছে তাদের। আনিসুল সাহেব তা দেখে মুখ দিয়ে চু চু শব্দ করে জ্যাকি কে ডাকতেই জ্যাকি দৌড়ে আনিসুল সাহেব এর দিকে দৌড়ে গেলো সাথে ব্ল্যাকি ও।
এইদিকে কায়সার জ্যাকি কে দেখেই চিনতে পেড়েছে এই সেই কুকুর যার কারণে প্রথম লামিয়ার সাথে দেখা হয়েছিলো । কায়সার হাত বাড়িয়ে জ্যাকির মাথায় হাত বুলাতেই জ্যাকি খেউ খেউ করে উঠলো কায়সারের দিকে তাকিয়ে।
তা দেখে কায়সার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। হামিদ সাহেব তা দেখে বললো ” ওর নাম জ্যাকি। আমার ছোট্ট মেয়ে কুরিয়ে এনেছিলো বাড়িতে। আমাদের পরিবারের সদস্য ধরতে গেলে। তোমাকে কখনো দেখে নি তো তাই চেঁচিয়ে উঠেছে কিছু মনে করো না। ”
হামিদ সাহেব এর কথা শুনে কায়সার ঠোঁট টেনে হেঁসে বললো ” না না আংকেল সমস্যা নেই।”
বলেই জ্যাকির দিকে তাকালো। জ্যাকি খেউ খেউ করতে করতে বাহিরে চলে গেলো সাথে ব্ল্যাকি ও।
মেহেদী অনুষ্ঠান শুরু হবে কিছুক্ষণ পরে। তাই রাশেদা বেগম শারমিন কে তাড়া দিয়ে বললো হামিদা সবাই কে বাগানে নিয়ে যেতে। শারমিন রাশেদা বেগম এর কথা মতো উপরে চলে গেলো হামিদা, লামহা আর আয়না কে আনতে।
তায়েবা তৈরি হয়ে লামিয়ার রুমে পা রাখতেই লামিয়া কে ভ্রু কুঁচকে গেলো তাঁর। কারণ নবাবজাদি এখনো তৈরি হয় নি। তা দেখে তায়েবা রেগে পিছন থেকে ধাম করে কিল মেরে বসলো। হঠাৎ পিঠে কিল পড়তেই লামিয়া চোখ মুখ কুঁচকে পিছন ঘুরে তায়েবা কে দেখে রেগে বললো ” বান্দীর নাতীন এতো জোরে কিল মারলি কেন?”
তায়েবা ও রাগ দেখিয়ে বললো ” অনুষ্ঠান একটু পর শুরু হবে আর তুই এখনো তৈরি হোস নি কেনো??”
লামিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” তাই বলে এমন কিল মারবি??”
” হ্যাঁ মারবো কোনো সমস্যা?”
তায়েবার কথা শুনে লামিয়া ক্ষেপে গিয়ে তায়েবার শাড়ির আঁচল টান দিতেই তায়েবা চিৎকার করে উঠলো
” এই এই ভাই ছাড় আমার আঁচল দেখ আমি কিন্তু অনেক কষ্টে শাড়ি পড়েছি প্লিজ ছেঁড়ে দে আর করবো না”
” করার আগে মনে থাকে না?” বলেই আঁচল ছেঁড়ে শাড়ির কুচি তে হাত দিতেই রুমে প্রবেশ করলো তায়েব, মাহির, ইমন আর ইভান।
তায়েবা আর লামিয়ার অবস্থা দেখে তাঁরা ভ্রু কুঁচকে তাকালো তাদের দিকে।
লামিয়া তায়েব দের দেখে তায়েবার আঁচল ছেঁড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
” ভাই এদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই তো?”
তায়েব ফিসফিস করে বললো মাহিরের কানে।
” হ্যাঁ আমারও তাই মনে হচ্ছে কোনো না কোনো সমস্যা আছে।”
মাহির আর তায়েব এর কথা শুনে তায়েবা আর লামিয়া ক্ষেপে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো দুজনের দিকে। তাদের এমন অগ্নি দৃষ্টি দেখে মাহির আর তায়েব ভয়ে ঢোক গিললো।
” ইভান দরজাটা বন্ধ করে আয় তো!” বেশ শীতল কন্ঠে বললো লামিয়া।
” দরজা বন্ধ করবো কেনো?” ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো ইভান।
মাহির আর তায়েব ভয়ে আস্তে আস্তে করে পিছনে যেতে যেতে বললো ” মাফ করে দে বোনরা মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছে।”
” তাই তো আপ্যায়ন করবো জানি দ্বিতীয়বার মুখ ফসকে কেনো হো*গা ফসকে ও না বের হয়। ” বলেই শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুজলো তায়েবা।
” বাঁচতে চাইলে পালা ভাই নয়তো আজকে মেরে আমাদের উগন্ডা পাঠিয়ে দিবে।” বলেই দৌড় দিলো মাহির। তাঁর পিছন পিছন তায়েব।
তাদের এমন দৌড় দেখে ইভান,ইমন হেঁসে বললো ” তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচে আয় আপুদের নিয়ে যেতে বলেছে ফুপি। ” বলেই চলে গেলো তাঁরা।
লামিয়া তায়েবার দিকে তাকিয়ে বললো ” তুই নিচে যা আমার দেরি হবে। তোরা বড় আপাদের নিয়ে বাগানে যা আমি পরে আসছি। ”
তায়েবা মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো নিচে।
বাগানে বসে আছে শুভ্র, রাশেদ, আরিফ, সাফওয়ান,আবির, জাহিদ, ফাহিম,তায়েব, মাহির, ইভান, ইমন, সামির। বসে বসে তাঁরা টুকটাক কথা বলছে। এখনো কোনো মেয়েরা আসে নি। জ্যাকি আর ব্ল্যাকি দৌড়া দৌড়ি করে বেশ ক্লান্ত হয়ে বসে আছে শুভ্রর সাথে। তাদের সবার গায়ে সবুজ পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা। এক এক জন কে দেখতে কম লাগছে না।
আশেপাশে কিছু মেয়েরা গিলে খাচ্ছে তাদের।
হঠাৎ তাদের মাঝে আগমন ঘটলো মিলি আর তিহার তাদের গাঁয়ে ও সবুজ রঙের শাড়ি। মিলি স্লিভলেস ব্লাউজ পড়ে বেশ সেজে গুজে এসেছে। তাদের দেখেই রাশেদ তাদের বসতে বললো তাদের সাথে। তিহা রাশেদ এর সাথে বসলো আর মিলি শুভ্রর সাথে বসতেই শুভ্র বিরক্ত হয়ে তাকালো মিলির দিকে। তাই মিলি বেশ দূরত্ব রেখে বসে কথা বলতে লাগলো সবার সাথে।
কিছুক্ষণ পর শারমিন, ছবি, মনিকা, হাফসা, ফারিয়া তায়েবা মিলে হামিদা, লামহা আর আয়না কে নিয়ে এসে বসালো সেখানে। সাফওয়ান, আবির আর আরিফ কে নিয়ে ও বসানো হলো তাদের সাথে।
সাফওয়ান, আরিফ আর আবির অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের প্রেয়সীদের দিকে। তা দেখে হামিদা, লামহা, আয়না লজ্জায় মুখ নিচে করে রেখেছে।
শারমিন হালকা হেঁসে পাশে তাকাতেই তাঁর হাঁসি উড়ে গেলো। কারণ পাশেই রাশেদ তিহার সাথে বসে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। তা দেখে শারমিনের চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো। হঠাৎ তিহা হাসতে হাসতে রাশেদের কাঁধে হালকা থাপ্পড় মারতেই শারমিন জ্বলে উঠলো।
রাশেদ হাসতে হাসতে সামনে তাকাতেই শারমিনের চোখ মুখ শক্ত দেখে ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে তাকালো তাঁর দিকে। শারমিনের মুখ দেখে মনে হচ্ছে এখনই কেঁদে দিবে। রাশেদ তা দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করতেই তাঁর টনক নড়ে উঠলো। শারমিন তিহার দিকে তাকিয়ে আছে বিষয়টা বুঝতে পেরে রাশেদ মনে মনে সয়তানি হাঁসি দিয়ে তিহার সাথে আরো হেঁসে হেঁসে কথা বলতে লাগলো শারমিন কে জ্বালানোর জন্য। ওইদিকে শারমিন রেগে বোম হয়ে আছে রাশেদ কে হিহি করে হাসতে দেখে ইচ্ছে করছে রাশেদের দাঁত ভেঙে দিতে । শারমিন আর দাঁড়াতে পারলো না রেগে মেগে দ্রুত হেঁটে রাশেদের সামনে যেয়ে দাঁড়ালো। রাশেদ আর তিহা হাঁসি থামিয়ে শারমিনের দিকে তাকালো।
শারমিন কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাশেদ এর দিকে। তা দেখে রাশেদ মুখে বিরক্তি ভাব এনে বললো ” কিছু কী বলবেন?”
” আপনার সাথে আমার কথা আছে রাশেদ ভাই !”
বেশ রাগি কন্ঠে বলে উঠলো শারমিন।
” কিন্তু আমার সাথে আপনার কোনো কথা নেই আপু।”
বেশ শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো রাশেদ।
রাশেদের মুখে হঠাৎ আপু ডাক শুনে ভরকে গেলো শারমিন । রাশেদ শারমিনের চেহার দিকে তাকালো তাঁর বেশ হাঁসি পাচ্ছে শারমিনের মুখ দেখে। কিন্তু রাশেদ হাঁসি আটকে রেখে আবার তিহার সাথে কথা বলতে লাগলো। শারমিন অসহায় চোখে তাকালো রাশেদের দিকে, রাশেদ তা দেখে ও না দেখার ভান করে তিহার সাথে কথা বলছে। শারমিন তা দেখে আর কিছু না বলে চোখ ভর্তি পানি নিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে। রাশেদ শারমিনের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললো ” যতোটুকু আমাকে কষ্ট দিয়েছিস ঠিক সেইটুকুই আমি তোকে ফিরিয়ে দিবো। ” বলেই উঠে দাঁড়িয়ে সাফওয়ান দের কাছে এগিয়ে গেলো।
জীবন প্রথম ছবি কে শাড়িতে দেখে হা করে তাকিয়ে আছে লাবিব। ছবি তাঁর দিকে একটু ও ফিরে তাকাচ্ছে না দেখে বেশ রাগ হলো লাবিব এর। মেয়েটার এতো রাগ আর এতো ঘাড়ত্যাড়া ছোট্ট থেকে যা ভাবলেই রাগ উঠে লাবিব এর। এতো বছর পর দেখা হয়েছে কোথায় একটু আদর ভালোবাসা দিবে তা না করে সে মুখ ফুলিয়ে থাকে সবসময়। আর রাগ করবি ভালো কথা কর না রাগ মানা তো করি নি কিন্তু রাগ করে দূরে সরিয়ে দিয়ে এমন সেজে গুঁজে শাড়ি পড়ে সামনে এসে রং ঢং করার মানে কী?? উফফ এইটা কেমন শাস্তি দিচ্ছে এই মেয়ে আজ যে নিজেকে কন্ট্রোল করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ভেবেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে ঘাড়ে হাত রেখে শুকনো ঢোক গিলে চোখ খুললো। লাবিব এর ফর্সা গাল , নাক, কান লাল টুকটুকে হয়ে আছে।
লাবিব এর পাশে শুভ্র, জাহিদ, তায়েব, মাহির, ইভান, ইমন বলে আছে। লাবিব কে এমন হাঁসফাঁস করতে দেখে তাঁরা বাঁকা চোখে লাবিব এর দিকে তাকালো। লাবিব এর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তাঁরা সবাই উচ্চ শব্দে হেঁসে উঠলো। তা দেখে লাবিব বিরক্ত হয়ে বললো
” এমন পাগলের মতো হাসছিস কেনো তোরা??”
” কন্ট্রোল ভাই কন্ট্রোল” বলেই হেঁসে উঠলো শুভ্র তাঁর সাথে বাকি সবাই।
” তোরা কি থামবি? নিজের জ্বালায় ভালো লাগে না তার উপর তোদের জ্বালা।” বলেই মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকালো লাবিব।
” লাবিব বেবিইইইই” বলতে বলতে শাড়ি ঠিক করতে করতে লাবিব এর দিকে এগিয়ে আসলো মনিকা।
তাঁকে দেখেই লাবিব বিরক্ত হয়ে বিরবির করে বলে উঠলো ” ওই যে এসে পড়েছে কুখ্যাত সর্বনাশা ছেড়ি।”
লাবিব এর কথা শুনে শুভ্র রা হেঁসে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।
পাশ থেকে তায়েব মজা করে বলে উঠলো ” চলো ভায়েরা আমরা উঠি তাদের একটু আলাদা সময় দেও।”
তায়েব এর কথা শুনে লাবিব রাগি দৃষ্টিতে তাকালো তায়েব এর দিকে। মনিকা তা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। সবাই হাসতে হাসতে চলে গেলো অন্যদিকে।
“আমাকে কেমন লাগছে?” বেশ লাজুক স্বরে বলে উঠলো মনিকা।
লাবিব ছবির দিকে তাকিয়ে বললো ” সুন্দর লাগছে।”
“শুধু সুন্দর?”
লাবিব বিরক্ত হয়ে বললো ” না অনেক সুন্দর লাঘছে বলেই উঠে চলে গেলো।”
লাবিব তাকে সুন্দর লাগছে বলেথে তা শুনে মনিকা খুশিতে লাফিয়ে শাড়ি আঁচল এক হাতে ধরে নাচাতে নাচাতে হাঁটতে লাগলো লাবিব এর পিছনে।
সবাই বাগানে কিন্তু লামিয়া নেই ভেবেই শুভ্র ভ্রু কুঁচকে মাহির কে বললো ” সবাই এইখানে কিন্তু লামিয়া কোথায়?”
” ও এখনো তৈরি হয়নি রুমে আছে তৈরি হয়ে চলে আসবে।”
শুভ্র তা শুনে বেশ চিন্তিত হলো। কারণ কায়সার বাড়িতে উপস্থিত আছে। অবশ্য শুভ্র আশেপাশে কিছু মানুষ লাগিয়ে দিয়েছে যারা সব দিকে নজর রাখছে। তবুও শুভ্রর মন খচখচ করছে তাই আর কিছু না ভেবে হাঁটা ধরলো বাড়ির দিকে।
” এই ছবি ফুলের ডালা টা তো বাড়িতে রেখে আসছি নিয়ে আয় তো একটু।”
ছবি মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো বাড়ির দিকে মেহেদী ডালা আনতে।
আসার পর থেকেই চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাঁর রাতের ঘুম হারাম করার মানুষ টি কে খুঁজছে কিন্তু একবার ও তার দর্শন পায় নি দেখে কায়সার বাড়িতে প্রবেশ করলো। পুরো বাড়ির মানুষ এখন বাগানে তাই এইটাই সুযোগ তার বুলবুলি কে খোঁজার।
লামিয়া কে খুঁজতে সিঁড়ির দিকে যেতে লাগলো কায়সার।
ছবি ফুল ভর্তি ডালা নিয়ে উপরের থেকে সিঁড়ি বেঁয়ে নিচে নামতে লাগলো। হঠাৎ শাড়ির আঁচল বেজে পড়ে যেতে নিলেই কেউ তার কোমড় আঁকড়ে ধরলো। ছবি ভয়ে চোখ বুঁজে খামচে ধরলো লোকটির বুকের কাছের পাঞ্জাবির অংশ। হঠাৎ কোমড়ে কারোর শীতল স্পর্শ পেতেই ছবি চোখ মেলে তাকাতেই তাঁর চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। তাঁকে ধরে আছে আর কেউ না কায়সার। এতো দিন শুধু এই লোকটার নাম ই শুনে এসেছে কিন্তু সামনাসামনি কখনো দেখা হয়নি কিন্তু আজকে একদম সামনে থেকে দেখছে সে।
কায়সার বেশ শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে ছবির দিকে। ছবির টনক নড়তেই ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো।
কায়সার তখন ও বেশ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছবির দিকে। ছবি কিছু ভেবে পিছন তাকাতেই দেখলো শুভ্র দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাকে কিছু ইশারা করছে।
ছবি শুভ্রর ইশারা বুঝতে পেরে শান্ত হলো। তারপর বেশ শক্ত গলায় বলে উঠলো ” আপনি এখনে কি করছেন সবাই তো বাগানে আছে।”
কায়সার এখনো তাকিয়ে আছে ছবির দিকে। ছবি কায়সারের মুখের সামনে তুরি বাজাতেই কায়সারের ধ্যান ভাঙলো
” হ্যাঁ, হ্যাঁ। না মানে বাড়িটা ঘুরে দেখছিলাম তা ছাড়া কিছুই না। ”
” বাড়িতে এখন কেউ নেই আর আপনি খালি বাড়ি ঘুরে দেখছেন?”
” হ্যাঁ আসলে অনুষ্ঠান তো এখনো শুরু হয়নি তাই। ”
ছবি কিছু বলার আগেই পিছন থেকে শারমিন বলে উঠলো ” তোর এতোক্ষণ লাগে মেহেদী আনতে তাড়াতাড়ি আয়। ”
ছবি কায়সারের দিকে তাকিয়ে বললো ” বাড়ি ঘুরা শেষ তাহলে এখন চলুন। ” বলেই ফ্লোর থেকে মেহেদী তুলে নিয়ে শারমিনের পিছন পিছন চলে গেলো। কায়সার ও আর উপরে না গিয়ে চলে গেলো ছবির পিছনে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে গাদা ফুলের মালা লাগাচ্ছে লামিয়া। সবুজ আর গোল্ডেন এর মধ্যে একটা কাতানের আনাড় কলি পড়েছে লামিয়া। চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লাল খয়েরি রঙের লিপস্টিক। চুল গুলো আজ ফ্রান্স বেণী করে বাঁধা, সামনে দিয়ে লেয়ার কার্ট চুল গুলো সবসময়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
বেণীর মধ্যে ফুল লাগানো শেষ করে আয়নায় তাকিয়ে নিজের দেখে হাত ঘড়ির কালেকশন থেকে একটা গোল্ডেন ঘরি বের করে হাতে পড়ে নিয়ে কাতানের উড়না এক সাইডে নিয়ে পিন লাগিয়ে নিলো। আরেক সাইডে বেণী করা চুল এনে সামনে রাখলো।
আয়নায় নিজেকে দেখে ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বাঁকা হেঁসে তারপর ফোন হাতে নিয়ে চলে গেলো বাগানের দিকে।
ছবি বেশ বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে লাবিব এর দিকে।
লাবিব সেই কখন থেকে ছবির আঁচল ধরে রেখেছে। ছবি যেখানে যাচ্ছে লাবিব আঁচল ধরে তাঁর পিছন যাচ্ছে।
দূরে দাঁড়িয়ে কায়সার চোখ মুখ শক্ত করে তাকিয়ে আছে লাবিব এর দিকে।
ছবি বেশ বিরক্ত হয়ে বললো ” কি সমস্যা আপনার আঁচল ধরে আছেন কেনো? ছাড়ুন আঁচল সবাই দেখছে। ”
” দেখুক সবাই তাঁতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি ছাড়বো না আঁচল।”
” কেনো ছাড়বেন না?”
” আমাকে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছিস কেনো তুই?”
” আমি আপনাকে কী দিয়ে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছি একটু বলবেন?”
” তোর এই রূপ দিয়ে।”
” মানে?” চোখ মুখ কুঁচকে বললো ছবি।
ছবির কথায় লাবিব জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে অসহায় চোখে তাকিয়ে বললো ” আটার রুটি খাসির মাংস, তোর রূপে আজ আমি ধ্বংস।”
লাবিব এর কথায় ছবি হতভম্ব হয়ে তাকালো তাঁর দিকে। মানে এইটা কি কোনো শায়েরি বললো নাকি অন্যকিছু। না এই লোকটা কে নিয়ে আর পারা যাবে না ভেবেই বিরক্ত হয়ে হাঁটতে লাগলো ছবি। লাবিব ও ছবির আঁচল ধরে হাঁটতে লাগলো ছবির পিছন পিছন।
তায়েব স্পিকার মাইক হাতে নিয়ে কিছু বলার জন্য ফুঁ দিতেই লাবিব ছবির আঁচল ছেঁড়ে তায়েবের হাত থেকে দ্রুত স্পিকার মাইক হাতে নিয়ে গেয়ে উঠলো
~ এইযে বিয়াইন ভাব নিয়েন না
একটা মাত্র বেয়াই কেনো
দেইখা দেখেন না? এই যে
বিয়াইন সাব মাইন্ড খাইয়েন না
কালা চশমা পড়লে কিন্তু বেইল পাবেন না।।
লাবিব এর গান শুনে সবাই যে যার কাজ রেখে তাকিয়ে আছে লাবিব এর দিকে। এইদিকে ছবি বেশ রাগি চোখে তাকিয়ে আছে লাবিব এর দিকে। লাবিব বেশ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো ছবিব দিকে। ছবি কপালে হাত রেখে এগিয়ে গেলো লাবিব এর কাছে। লাবিব এর হাত থেকে স্পিকার মাইক হাতে নিয়ে লাবিব এর দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠলো
~ সারাজীবন পড়ছো লুঙ্গি পেন্ট পর নাই
আমায় দেখে বলদা বিয়াই গলায় লাগায় টাই
বিয়ার বেল নাই বেল নাই, বেল নাই রে এসে
বিয়ার বেল নাই বেল নাই বেল নাই রেএ।
গেয়েই বাঁকা হেঁসে স্পিকার মাইক লাবিব এর হাতে দিয়ে উল্টো দিকে হাঁটা দিতেই বাগানের সব লাইট হঠাৎ অফ হয়ে গেলো। লাইট অফ হতেই সবাই চেঁচামেচি শুরু করলো লাইট অফ হলো কেনো। শুভ্র নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সামনে ধরতেই কায়সার কে না দেখতে পেয়ে ভিতরে কেমন খটকা লাগলো। কারণ এখানেই কায়সার দাঁড়িয়ে ছিলো তবে এখন কোথায় গেলো।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩৩ (২)
শুভ্র আর কিছু না ভেবে আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো কায়সার কে। কোথাও কায়সার কে না পেয়ে শুভ্রর বুক মোচড়ে উঠলো। সামনে তাকাতেই দেখলো ছবি দাঁড়িয়ে আছে লাবিব এর সাথে তাহলে কায়সার কি লামিয়া কে নিয়ে চলে গিয়েছে না না আর কিছু ভাবতে পারলো না। শুভ্র দৌড় লাগালো গেটের কাছে। শুভ্র কে এইভাবে দৌড়াতে দেখে রাশেদ ও দৌড়ে গেলো শুভ্রর পিছন পিছন।
