প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৪
সাইয়্যারা খান
শীতের রাতে তৌসিফ বাইরে গিয়েছে তাও কি না পৌষের সাথে গরম দেখিয়ে। একদম নীরব যুদ্ধ চলছে তাদের মাঝে। তৌসিফ কথা লুকায়, এই বিষয়টা পৌষ কোন ভাবেই মানতে পারছে না৷ মানতে পারার কথাও না৷ কেন মানবে সে? কি দায় তার? তার উপর পেখম গজিয়েছে আজ তার। উড়ে উড়ে গিয়েছে কোথাও। পৌষ না করেছিলো কিন্তু শুনে নি। পৌষ পারলে আজ দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতো। তৌসিফ নামক পুরুষ জাতের উপর তার সামান্য সামান্য সন্দেহ আছে। সে জানে তার স্বামীর চরিত্র যথাযথ ঠিকঠাক আছে কিন্তু বাইরের খবর তো আর পৌষ জানে না৷ রনি আর তৌসিফের কিছু কথাবার্তা তখন পৌষের কানে এসেছিলো।
একদমই বেখায়লী ভাবে শুনেছিলো পৌষ। তাদের কথা কাটাই বাছাই করে সারাংশ দাঁড়ায় তৌসিফ কাউকে দেখতে যাবে। সেই দেখার মানুষটা মেয়ে এটা পৌষ নিশ্চিত কারণ রনি স্পষ্ট বলেছিলো মেয়েটা পা’গলামি করছে। রনি যাওয়ার পর থেকেই তাই পৌষ আটকে রাখছিলো তৌসিফকে। তৌসিফ আজ কথা শুনে নি উল্টো চাপা ধমক দিয়েছে পৌষকে। ঠাটবাট পৌষ যতই দেখাক, তৌসিফকে সে ভয় পায় একথা পৌষের চাইতে ভালো আর কেই বা জানে? যতটুকু দৌড় পৌষের ঘুরেফিরে ত্যাড়ামি করা পর্যন্তই। তৌসিফের কথা না শুনলেও চরম পর্যায়ের বেয়াদবি পৌষ এখনও করে নি৷
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আজ পৌষ এক আজব কায়দা করলো। নিজের ঔষধ গুলো খেলো না৷ পায়ের ব্যথা ভালো হয় নি। পৌষ গতরাতে করা তৌসিফের ব্যান্ডেজটা টেনেটুনে খুললো। গজ কাপড়টা ছুঁড়ে ফেললো কোথাও। লাল র ক্ত দেখা যাচ্ছে। পৌষ কপাল কুঁচকে সেখানটায় তাকিয়ে রইলো। তাকে তৌসিফ আদর করে সযত্নে লাগিয়ে দিয়েছিলো এটা। তৌসিফ কথা শুনে নি, বিনিময়ে পৌষ আদর রাখে নি। ফেলে দিয়েছে। এসব আদিখ্যেতার অভ্যাস নেই পৌষের। উল্টো বেশি হলে বদহজম হয়। তৌসিফের অতিরিক্ত আদর, যত্ন কবে জানি বদহজম হয়ে বেরিয়ে আসে গলা দিয়ে। ভাবা মাত্রই গলা জ্বলে উঠে পৌষের। নিজের জখম হওয়া পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় মনে হয় এটা এত বড় পৌষের পা না৷ এটা ছোট্ট একটা কচি হাড়ের পা। ছোট্ট, চিকন একটা পা। সেই পায়ে কালো সুতা দিয়ে বেণী পাকিয়ে পরা নুপুরের মতো। এটা হেমু ভাই বানিয়ে দিয়েছে। সেঝ চাচির পায়ে নুপুর দেখেই ছোট্ট পৌষ বায়না ধরেছিলো তার নুপুর চাই। ওমন ঝুনঝুন করা নুপুর। তার আবদার ধরার জন্য নিদিষ্ট মানুষ ছিলো না। যখন যাকে পেতো আবদারটা করে নিতো পৌষ। তখনও ততটা জ্ঞান হয় নি যে বুঝবে এতিমদের আবদার মানায় না৷ পৌষ আবদারটা করে বড় চাচার কাছে। বাড়ীর একমাত্র মেয়ে তখন পৌষ। বড় চাচার শার্টের কোণা ধরে টেনেটেনে বলছিলো,
“নুপুর কিনে দাও বড়ব্বু। আমি নুপুর পরব।”
বড় চাচা বোধহয় হ্যাঁ বা না কিছু একটা বলতেন কিন্তু তার আগেই বড় চাচি ধমকে উঠেন। চওড়া গলায় বলেন,
“নুপুর দিয়ে কি করবি তুই? হারিয়ে যাবে। স্কুলে যা তারাতাড়ি।”
পৌষ ছাড়ে না তার বড়ব্বুকে। শার্টের কোণা শক্ত করে ধরে জেদ দেখায়,
“নুপুর কিনে দাও। চলো আমরা যাই।”
বড় চাচি জোর করে শার্ট ছাড়ায়। বেণী গাঁথা চুলটায় টান পড়েতেই পৌষ কেঁদে উঠে। ভীষণ ব্যথা পেয়েছিলো সেদিন। চুলের ব্যথার অবশ্য কারণ ভিন্ন ছিলো। তাকে সেঝ চাচি ছাদ থেকে আচারের বয়াম আনতে বলেছিলো। ছোট হাতে বড় বয়াম আটে নি। বয়াম সহ পৌষ পিছলে পরেছিলো। ছোট্ট পায়ে ভীষণ আঘাত পেয়েছিলো, সাথে লেগেছিলো মাথার পেছনে। সেদিন তার পায়ে, মাথায় এমন সাদা গজ দিয়ে কেউ পেঁচায় নি৷ ডাক্তার ডাকে নি। বড় চাচি বিরক্ত হয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে মাথা আর পা ধুয়ে দেন। সেঝ চাচি তার আচারের শোকে যাতা বলে গালিগালাজ করলেন। পাশেই ছিলেন পৌষের সেঝব্বু। নীরবেই স্ত্রীর কথাগুলো শুনে গেলেন। একটাবারও সতর্ক করলেন না যাতে তার মৃত ভাই-ভাবী তুলে গালিগালাজ না করা হয়।
জ্বর আসার আগেই প্যারাসিটামল খায়িয়ে দেন। নাহয় এই ঝামেলার জ্বর আসলে কে রাতের ঘুম হারাম করবে? তবে জ্বর কিন্তু এলো। পৌষ জ্বরেও ভুগলো। হেমু ভাই তখন শিয়রের কাছে বসে ছিলো। পৌষের স্পষ্ট মনে আছে। পৌষের চুলে হাত বুলিয়ে হেমন্ত বলেছিলো,
“ভাই তোকে সোনা দিয়ে নুপুর বানিয়ে দিব একদিন।”
“সত্যি?”
“তিন সত্যি।”
অথচ হেমন্ত যখন কালো সুতা দিয়ে বেণী পাকিয়ে পৌষের পায়ে পরিয়ে দিলো তখনই তো পৌষ খুশিতে আটখান হয়ে গেলো। ভাইয়ের পিঠ জড়িয়ে কাঁধে চড়ে গেলো। হেমন্ত যখনই দাঁড়াতে নিবে ওকে নিয়ে তখনই বিশ্রী বাক্য শুনতে পেলো সেঝ চাচির মুখ থেকে। পৌষ তখন অর্থ বুঝতো না৷ পরে বুঝেছে। ধীরে ধীরে হেমন্তের থেকে দূর হয়েছে। হাত পর্যন্ত ধরা বারণ। ঐ শুধু মাথায় হাত রাখতো হেমন্ত অথচ পৌষের তো কেউ ছিলো না জড়িয়ে নেওয়ার। দশ টাকার এই নুপুর পৌষকে কিনে দিয়ে কি বুঝ দেওয়া যেতো না? পৌষ কি সোনা তখন আদৌ চিনতো? না তো। পৌষ চিনতো না। পৌষ কত মানুষ চিনলো। যবে থেকে মানুষ চিনতে শুরু করলো পৌষ তবে থেকেই শব্দ হারিয়ে গেলো। বড়ব্বু বড় চাচা হয়ে গেলেন। বড়ম্মু তার বড় চাচি হয়ে গেলো। পৌষকে সবাই খুব জোর দিয়ে বুঝিয়েছিলো তার জন্য আবদার নিষেধ, সে এতিম। পৌষও বুঝেছিলো। একটু বোধহয় বেশিই বুঝেছিলো।
“কি করছো পৌষরাত?”
“ছমির চাচার চারটা গরু ছিলো। একটা গরু একবার বাচ্চা দিলো। চাচা খুশি হলেন৷ পরে বাছুরটা মরে গেলো। বলুন তো কয়টা গরু আছে তাহলে?”
তৌসিফ প্রশ্নে ডুবে গেলো। একটু ভেবে বললো,
“চারটাই রইলো।”
“হয় নি, হয় নি। পাঁচটা রইলো।”
“একটা তো মরে গেলো।”
“তাতে কি? আমি কি বলেছি ওকে কবর দিয়েছে?”
তৌসিফ নিজের উপর বিরক্ত হলো। সহজ কথাটাও ধরতে পারলো না৷ পরক্ষণেই কপাল কুঁচকালো। সে মাত্রই ফিরেছে আর তার বউ কিনা তাকে এমন ফালতু প্রশ্ন করছে? তৌসিফ সোজা বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
“মাঝরাত হয়ে এলো। তোমার খাওয়া হয়েছে পৌষরাত? নাহলে আমার জন্যও কিছু নিয়ে এসো।”
“খেয়ে আসেন নি?”
“না তো। তুমি না এই সময় খাও? খাওয়া শেষ?”
“না।”
তৌসিফ চোখে হেসে চলে গেলো। পৌষ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেই পায়ে চাপ পরলো। ব্যথা লাগলো তবে পৌষের ভালো লাগলো। ছোট থেকেই কষ্ট পেলে নিজেকে আঘাত করে নিতো পৌষ, এতে নিজের ব্যথায় কষ্টের কথা ভুলে যেতো। আজ অবশ্য কষ্ট নেই কিন্তু চাপা ক্ষোভ আছে তৌসিফের প্রতি যার বহিঃপ্রকাশ এভাবে ঘটাচ্ছে পৌষ। তৌসিফের জন্য ডিম সেদ্ধ আর কেক নিয়ে ফিরে আসে পৌষ। সাইড টেবিলে দিয়ে পানি ঢালতে ঢালতে বললো,
“খেয়ে আমাকে ডাক দিবেন৷ আমি রেখে আসব।”
তৌসিফ মুখ মুছে বসলো। প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি খাবে না?”
“নাহ।”
“আজ ক্ষুধা নেই?”
“না।”
তৌসিফ ডিমটা খেয়ে পানি খেতে খেতে বললো,
“হঠাৎ কি হলো? আমার তোতাপাখি ডাকে না কেন?”
“আপনার তোতার থোতা ভেঙে গিয়েছে।”
তৌসিফ হাসছে। পাতলা ঠোঁট দুটো সামান্য নাড়ে তাতে। পৌষ প্লেট রেখে আসা মাত্রই দেখলো তৌসিফ সাইড টেবিলে কিছু নাড়ছে। পৌষকে দেখেই জিজ্ঞেস করে,
“তুমি মেডিসিন নাও নি?”
“ওসব হাবিজাবি খাই না আমি।”
বলতে বলতে বিছানায় ওঠে পৌষ। শুতে নিতেই তৌসিফ হঠাৎ ওর প্লাজু টেনে তুলে হাঁটু দেখে। যা যতটুকু বুঝার বুঝে সে। আহত কণ্ঠে বলে,
“এরমানে রাতে খাও নি।”
কিছুক্ষণ নীরবে কাটিয়ে তৌসিফ প্রশ্ন করে,
“এসবের কারণ?”
“আমাকে না জানিয়ে আবার কোন মেয়ে দেখতে গিয়েছলেন? দাদার পরম্পরা রক্ষা করতে যান নি নিশ্চিত? তাহলে বলুন, কোথায় গিয়েছিলেন?”
“সামান্য কারণে তুমি এত জেদ দেখালে?”
“আমি তো খুব ঠান্ডা আছি। ছুঁড়ে দেখুন হাত,পাও ঠান্ডা।”
“নিজেকে কষ্ট দিতে ভালোবাসো তুমি?”
“না, এতে অন্যের কষ্ট গায়ে লাগে না।”
“আর আমার? আমার যে লাগছে, তার কি হবে পৌষরাত? নিজেকে কষ্ট দিয়ে আমাকে কতটা পোড়াচ্ছো। তুমি কি টের পাচ্ছো?”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৩
পৌষ শুয়ে নাক পর্যন্ত কম্বল টেনে নেয়। তৌসিফ ঠাই বসে থাকে। একসময় অস্থির হয়ে বলে,
“এত অল্প সময়ে তুমি আর কি জানতে চাও পৌষরাত? আমি তো বলেছি তোমাকে। আর কি বলব? ঐ মেয়ে…ঐ মেয়েটা সোহা ছিলো পৌষরাত। ওর অবস্থা ভালো না। দেখতে যাওয়াটা আমার দায়িত্ব বৈ কিছুই না।”
কথাটা শুনেই এক লাফে উঠে বসে পৌষ। ফটাফট জিজ্ঞেস করে,
“ঐ যে, যে মেয়েটা নিজেকে আপনার প্রেমিকা দাবি করলো সে? তার সাথে কিসের খাতির আপনার? কোন রঙ্গ লীলা দেখেছেন আমাকে?”
