তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৫৫
তাবাস্সুম খাতুন
দেখতে দেখতে ধরণীতে সন্ধ্যা নেমে আসলো। চৌধুরী বাড়ি লাইটিং এ ভরে আছে। মানুষ আসছে একটু পরেই মেহেদী অনুষ্ঠান হবে। গিন্নিরা সবাই মিলে সবার জন্য ড্রেস কিনে আনছে। সবাই এখন রেডি হতে প্রস্তুত।যেহেতু মেহেদী অনুষ্ঠান তাই মেয়েরা মেহেরুন রঙের লেহেঙ্গা আর ছেলেরা মেহেরুন রঙের পাঞ্জাবী পরে আছে। রাত্রি কে নিয়ে নিচে নামলো সিমরান আর জারা। রাত্রি সহ সবাই মেহেরুন রঙের লেহেঙ্গা পড়েছে। গর্জিয়াস মেকাপ সবার মুখে। আত্মীয় স্বজন প্রায় সবাই এসে পড়েছে। অনুষ্ঠান ও শুরু হতে গেলো। গান বাজনা চলতে লাগলো। রাত্রিকে মেহেদী ডিজাইনরা তার হাত সাজিয়ে দিচ্ছে। এমন সময় সামিয়া আর জিহান নেমে আসলো সিঁড়ি বেয়ে। সুন্দর মানিয়েছে তাঁদের এক সাথে। কিছু অল্প বয়সী মেয়েরা যেন জিহান কে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। জিহান গম্ভীর মুখ করে সামিয়ার সাথে নেমে নিচে একপাশে দাঁড়ালো। সামিয়া রাত্রিদের কাছে যেতে চাইলেই জিহান তার হাত ধরলো। সামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কি হাত ধরেছেন কেন?”
জিহান গম্ভীর মুখেই বললো,
“এইখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো তুমি। এইখানে অনেক ছেলে আছে আমি চাইনা কারোর বাজে নজরে তুমি আটকাও।”
সামিয়া মুখটা গোমড়া করে দাঁড়িয়ে রইলো জিহানের পাশে। গানের তালে তালে বাচ্চারা নাচতে লাগলো। সবাই উপস্থিত কিন্তু নিশান আর সিমির কোন খোঁজ নেই। তাজউদ্দিন এসে জিহানের পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
“নিশান আর সিমি কোথায়?”
“রুমেই আছে মনে হয়।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
তাজউদ্দিন আর কিছু বললো না। অতিতি আপ্পায়ন করতে লাগলো। সব ভাই মিলে কাজে ব্যাস্ত দূরের আত্মীয়দের থাকার ব্যবস্থা করছে। কাছের আত্মীয় এখন বাড়িতে চলে যাবে। গিন্নিরা রান্নার দিক টা দেখছে। ফাঁকে ফাঁকে মেয়েদের দেখে যাচ্ছে। তিহান ও পাঞ্জাবী পড়েছে এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার দৃষ্টি দূরে খিলখিল করে হাসতে থাকা সিমরানের দিকে। নিস্পলক চাহুনি তে তাকিয়ে আছে তার দিকে!কিন্তু কেন? সে জানেনা। তবে দেখতে ভালোই লাগছে তাই তাকিয়ে আছে। অনুষ্ঠানে সবার শেষে উপস্থিত হলো নিশান আর সিমি। সিমিকে ধীরে ধীরে হাত ধরে নামাচ্ছে নিশান। সিমিও কিছু না বলে নেমে আসলো। নিশান সিমিকে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো সিমি একটা ঢিলা মেহেরুন রঙের গ্রাউন পরে আছে। চুলগুলো খোঁপা করা মাথায় কাপড় টানা। মুখে কোন রূপ প্রসাধন নেই। নিশান আজকে পাঞ্জাবী পড়েছে ফর্সা গায়ে মেহেরুন রঙের পাঞ্জাবীতে তাকে দারুন মানিয়েছে। নিশানের চুলগুলো জেল দিয়ে সেট আপ করা উজ্জ্বল মুখ। এক কথাই মেহেরুন রঙের পাঞ্জাবীতে নিশানকে চোখ ধাঁধানো সুন্দর দেখা যাচ্ছে। অনেকেই চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। যা সিমির চোখ এরালো না। নিশান নিজের মতো ফোন স্ক্রল করছে সিমি দাঁতে দাঁত চেপে নিশানকে বললো,
“আপনাকে কিভাবে গিলে খাচ্ছে দেখেন?”
নিশান ফোন স্ক্রল করতে করতেই বললো,
“আমি তো আর খাচ্ছি না।”
সিমি ভ্রু কুঁচকে নিশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
“এইটা কেমন উত্তর?”
নিশান কথা কাটিয়ে বললো,
“কিছু খাবি তুই?”
সিমি উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। সেখানে উপস্থিত হলো সিমরান আর জারা। সিমরান একটু কেশে নিশান কে বললো,
“ভাইয়া সিমিকে নিয়ে যাই।”
নিশান চোখ না উঁচিয়েই বলে দিলো,
“অসম্ভব ও প্রেগনেন্ট, বেবি সহ বেবির মাম্মাম আমার হেফাজতেই বন্ধী থাক তোরা যা।”
সিমি কাঁদো কাঁদো মুখ করে ওদের দিকে তাকালো। জারা সিমিকে জড়িয়ে ধরে কানে ফিসফিস করে বললো,
“আমার ভাবিজান কষ্ট পেয়ো না। সয়ে যাও এর থেকে দ্বিগুন কষ্ট আমি পাচ্ছি সিঙ্গেল থেকে।”
সিমি কিছু বলবে এর আগেই সিমরান আর জারা সেই জায়গা ত্যাগ করলো। জিহান সামিয়াকে নিয়ে নিশানদের কাছে আসলো। নিশানকে একটু উঠে আসতে বলতেই নিশান বললো,
“যা বলার এইখানে বল। ইশুকে রেখে আমি কোথাও যাবো না।”
জিহান বললো,
“বেশি না ভাই মাত্র এক মিনিট। সামিয়া বসুক তৎক্ষনে।”
নিশান সিমিকে বললো,
“খবরদার এই জায়গা ছেড়ে ওঠার চেষ্টা ও যেন করতে না দেখি। আমি আসছি।”
বলে নিশান উঠে সাইট এ গেলো। সামিয়া এসে বসলো সিমির পাশে। সিমি কাঁদো কাঁদো সুরে সামিয়াকে বললো,
“সামু জীবনটা তেনাতেনা হয়ে গেলো। ওরা আনন্দ করছে আর আমি স্বামীর আঁচলে বান্ধা।”
সামিয়াও একই সুর তুলে বললো,
“আমিও সেই ঘাটের মাঝি। ওই খাটাস আমাকেও যেতে দেই না। ইসসস কি কষ্ট।”
“সেইম টু ইউ বইনা হেব্বি কষ্ট।”
নিশান আর জিহান সাইটে আসতেই জিহান বললো,
“তোর কথা মতো নীলের সবকিছু ইনফরমেশন করে বাহির করলাম। কালকে বিকালে বাংলাদেশ আসছে মিটিং এটেন্ড করতে। ওর বেশির ভাগ মিটিং পরে ইতালি, কানাডা, ফ্রান্স আর বাংলাদেশ।”
নিশান শান্ত ভঙ্গিতে বললো,
“ব্যাক করবে কবে?”
“কালকে আসবে, আর ব্যাক করবে পশুদিন রাতের ফ্লাইটে।”
“ডান ওর সাথে পশুদিন দেখা করতে যাবো।”
“হুম।”
তারপর আর তাঁদের মাঝে কোন কথা হলো না। নিশান গিয়ে সিমির পাশে বসলো। সামিয়াকে নিয়ে জিহান আরেক পাশে দাঁড়ালো। জারা, সিমরান, রাত্রি সবাই নাচতে লাগলো। যা দেখে সিমি অসহায় কণ্ঠে বলে উঠলো,
“ইসসস কত সুন্দর ভাবে নাচ করছে, আমিও নাচ করবো প্লিজ যেতে দেন।”
নিশান রাগী চোখে সিমির পানে তাকিয়ে বললো,
“তুই কি ভুলে গেছিস? তুই প্রেগনেন্ট!আর সাহস কত বড়ো তোর? এত ছেলের সামনে নাচতে চাস, আবার আমার কাছে পারমিশন নেস!”
সিমি ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
“আমার নাচতে ইচ্ছা করছে প্লিজ দেন না, ইস নাচতে যদি না দেন তো এত সুন্দর আয়োজন করার কি দরকার ছিলো?”
সিমির কথা শুনে নিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“চল আমার সাথে বদ্ধ রুমে, আমার সাথে নাচ করবি তুই।”
সিমি অবাক কণ্ঠে বললো,
“আপনি নাচতে পারেন?”
নিশান সিমির দিকে ঝুঁকে স্লো ভয়েসে বললো,
“আমার বেবির মাম্মামের জন্য আমি তানভীর চৌধুরী নিশান সবকিছুই করতে পারি,নাচ তো সামান্য বিষয়।”
বলে নিশান সিমির হাত ধরে উপরে উঠে গেলো। সিমিও কিছু বললো না। নিশান সিমিকে রুমে নিয়ে গিয়ে লক করলো। সিমি বেডে চুপ করে বসলো। নিশান সাউন্ড বক্স এ গান চালালো ভেসে আসছে সুন্দর রোমান্টিক গানের লাইন….
“Tere sath bechadni ko bhi aram sa milta hain..
Doob ke tujmain hi toh dil yea samalta hain..
নিশান সিমির কাছে গেলো।সিমির হাত ধরে তাকে নিয়ে আসলো। সিমি অবাক হয়ে নিশানের পানে তাকিয়ে। নিশান সিমির একটা বাম হাত নিশান নিজের কাঁধে রাখলো। সিমির ডান হাত নিজের বাম হাতের আঙুলের মধ্যে নিলো।নিশান নিজের ডান হাত সিমির কোমরে রাখলো। সিমির চোখের দিকে তাকিয়ে গানের রিলিক্স ধরে এক পা এগিয়ে আরেক পা পিছিয়ে নাচ করতে লাগলো…
“Baho main teri meri ah rat thar jaye..
Tujme hi kahi pe meri suvha bhi gujar jaye…
সিমিও নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। নিশান সিমির হাত ধরে তাকে ঘুরিয়ে আনলো। পেছন থেকে সিমিকে জড়িয়ে ধরে পা সামনে পেছনে করতে করতে গানের রিলিক্স ধরে সিমির কানের কাছে ফিসফিস করে গেয়ে উঠলো…
“Jis badka tujko dar hain oh karke dikha dunga..
Aise na mujhe tum dekho sine se laga lunga..
Tumko main chura lunga tumse dilme chupa lunga..
নিশানের গরম নিশ্বাসে সিমি কেঁপে উঠলো। নিশান সিমিকে নিজের দিকে ঘুরালো। সিমির দুই হাত নিজের ঘাড়ে রেখে। সিমির কোমরে হাত দিয়ে এইপাশে ঐপাশে ঘুরতে লাগলো। দুইজনের দৃষ্টি দুইজনের চোখে নিবদ্ধ। গান বেজে যাচ্ছে নিজের মতো। আর তারা দুইজন একে ওপরের চোখে ডুবে যাচ্ছে সেকেন্ড থেকে মিনিট মিনিট থেকে ঘন্টা। যেন চোখের অতল সমুদ্রের ভিতরে তাকিয়ে আছে না বলা কথা গুলো যেন চোখের ভাষায় বোঝার চেষ্টা করছে। এইভাবে কিছু সময় পরে সিমি দৃষ্টি নত করলো।নিশান গান বন্ধ করে দিলো। সিমির লজ্জা লাগছে কতক্ষণ সে নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলো ইসসস কি লজ্জা। নিশান সিমির কাছে আসলো সোজা ভাবে প্রশ্ন করলো,
“তোর কি কোন জায়গায় ব্যাথা লাগছে?”
সিমি মাথা দুইপাশে নাড়িয়ে বললো,
“না আমি ঠিক আছি।”
নিশান উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“বসে থাক আমি খাবার আনছি।”
এই বলে নিশান নিচে নামলো। একটা প্লেটে খাবার বেড়ে উপরে নিয়ে আসলো। সিমিকে নিজের হাতে খাইয়ে দিলো। সিমি মিনমিনে সুরে প্রশ্ন করলো,
“আপনি এত সুন্দর নাচ কিভাবে শিখলেন?”
নিশান সরল সোজা জবাব দিলো,
“আমি আগেই বলেছি। তোর জন্য আমি সবকিছুই করতে পারি। নাচ সামান্য বিষয়।”
“যারা প্রশিক্ষণ নেই তারাও মনে হয়। এত ভালো নাচতে পারে না।”
“তাতে তোর কি?”
“তাহলে আপনি কিভাবে পারলেন?”
“আমি একটা শব্দ বারবার রিপিট করি না ইশু। চুপচাপ খেয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পর।”
সিমি আর কিছু বললো না। সম্পূর্ণ খাবার শেষ করে ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে গেলো। ঢিলা একটা জামা পরে বেড়িয়ে আসলো। সোজা বেডে শুয়ে পড়লো নিশান সিমির পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
“ঘুমিয়ে পর।”
“আপনি খাবেন না?”
“সময় হলে খেয়ে নেবো। তুই ঘুমা।”
রাত নয়টা বেজে চার মিনিট। আত্মীয় স্বজন ও কমবেশি চলে গেছে। দূরের আত্মীয়রা আছে। অনুষ্ঠান শেষ অনেক আগেই। খেয়ে সবাই ঘুমাচ্ছে। নিশানের রুমেও নিশানের জন্য খাবার পাঠানো হয়েছে। সিমি ঘুমিয়েছে বেশ কিছুক্ষন হচ্ছে। নিশান সোফায় বসে নিজের সম্পূর্ণ খাবার খেয়ে আবারো বেডে গেলো। সে সিমিকে সোজা রেখে তার পেটের উপর থেকে জামাটা হাল্কা উপরে তুললো। সিমির পেট খানিকটা বড়ো হয়েছে। নিশান হাত দিলো পেটে কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো। নিজের কান নিয়ে গেলো সিমির পেটে বুঝতে পারলো তার বেবির নড়াচড়া ছোট্ট প্রাণ কিভাবে নড়ছে পেটের ভিতরে। নিশানের খুব ভালো লাগলো। এত ভালো যে চোখের কোনে নোনা জল গড়িয়ে পড়লো। নিশান ঐভাবে থেকেই ফিসফিস করলো,
“আমার প্রিন্সেস তুমি কেমন আছো?তোমার পাপা তোমাকে আদর করতে আসছে। মাম্মা কিন্তু ঘুমাচ্ছে জ্বালাতন করবে না। চুপ করে থাকো বুঝেছো?”
বেবি তো শুনতেও পাবে না। কথাও বলতে পারবেনা। এইটা জেনেও নিশান তার অস্তিতের নড়াচড়া অনুভব করে ফিসফিস কথা বলে শান্তি পাচ্ছে। নিশান সিমির পেটে একটা চুমু দিয়ে আবারো ফিসফিস করলো,
তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৫৪
“তুমি চুপচাপ থাকবে ঠিকাছে প্রিন্সেস? মাম্মা কে কষ্ট দেবে না একদম। তুমি তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে আমাদের মাঝে আসো।তোমার পাপা অনেক আদর করবো প্রিন্সেস। তুমি জানো প্রিন্সেস তোমার ছোট্ট প্রাণ অনুভব করে আমার কত ভালো লাগছে? যেন বুকের ভিতরে চাপা পাথর সরে ফুলের বাগান তৈরী হয়েছে। বেশি নড় না মাম্মা ঘুমাচ্ছে তো। তুমিও ঘুমাও। পাপা আছে তোমাকে রক্ষা করার জন্য মাই প্রিন্সেস।”
বলে সিমির উদরে ঠোঁট ছুঁয়ে সিমির জামা নামিয়ে দিলো। সিমির পাশে শুয়ে তাকে বুকের মাঝে টেনে নিলো। আগলিয়ে নিলো সুন্দর করে। যেন কোন বিপদ তাঁদের ছুঁতে না পারে।
