Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৬

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৬

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৬
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

প্রিয়স্মিতা আর প্রিয়তা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
সাদমান শিকদার চিনি ছাড়া কড়া লিকার দেওয়া তিতকুটে চায় চুমুক দিচ্ছেন যার এক চুমুকেই সারা মুখ তেতো হয়ে যায়। হাই ব্লাড প্রেসার কিনা মেজাজটা ও চড়ে থাকে সবসময়। তিনি খবরের কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতে কর্কশ গলায় বললেন,

“কে এসেছে অনু?”
সাদমান শিকদারের কথার প্রেক্ষিতে প্রত্যুত্তর করলেন না অনুশ্রী বেগম; তখনো ঠায় এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল হুবহু দুটো মুখের দিকে।
প্রণয় ও শুদ্ধ মা চাচিদের পাত্তা না দিয়ে নিজ নিজ সহধর্মিণীদের হাত আঁকড়ে ধরে প্রবেশ করলো বাড়ির ভেতর। চোখ মুখে ঝুলছে তাদের বিস্তর শয়তানি হাসি।
জবাব না আসাতে বিরক্ত হলেন সাদমান শিকদার। মুখের উপর থেকে খবরের কাগজটা সরিয়ে সামনে দৃষ্টিপাত করতেই ৫৫০ ভোল্টেজের ঝটকা খেলে। গলায় পৌঁছানোর চা টা এক লাফে মাথায় উঠে গেল। সাথে সাথেই চোখ মুখ কুচকে কেশে উঠলেন সাদমান শিকদার।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বিস্ময়ে উনার চোখ দুটো ইতিমধ্যে বৃহৎ আকৃতি ধারণ করেছে। মুখ যেন কোনো রা নেই।
অরণ্য, সমুদ্র, রাজ, প্রেম, পৃথম—ওরা নিজেদের মতো শীতকালীন ভাপা পিঠা এনজয় করছিলো। কিন্তু সাদমান শিকদারের এমন রিঅ্যাকশন দেখে তারাও ভ্রু কুঁচকালো।
খালিদ শিকদার, সাজিদ শিকদার ও সোহেব শিকদার সাদমান শিকদারের পাশেই বসেছিলেন। তাই উনার দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের তাকাতেই তারাও বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন।
প্রিয়তা আর প্রিয়স্মিতাকে পাশাপাশি দেখে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো সাজিদ শিকদারের। এই হাড় কাঁপানো শীতের সকালে ও উনার কপালে বেয়ে দর দর করে তরল ধারা নেমে আসতে দেখা গেল।
সকলের রিঅ্যাকশন দেখে ঠোট এলিয়ে শয়তানি হাসলো প্রিয়স্মিতা। এভাবেই তো হাটে হাড়ি ভাঙতে চেয়েছিল। তাই সবাইকে আর একটু চমকে দিতে আচমকা চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

“সারপ্রাইজ!”
এক চিত্কারে কেঁপে উঠলেন সকলে। ঘোর কেটে গেল সবার। ধড়ফড়িয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন সাজিদ শিকদার।
প্রিয়স্মিতা বাঁকা হেসে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো উনার নিকট। উনার ভিত সন্ত্ৰস্ত মুখটা দেখে তার ভীষণ হাসি পেল। তবে হাসলো না। সাজিদ শিকদারের কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে রহস্যময় কন্ঠে বলল,
“আমার সারপ্রাইজটা পছন্দ হয়েছে পাপ্পা? তুমি তো জানো, আমি অলওয়েজ সারপ্রাইজ দিতে বেশি পছন্দ করি।”
Woh Baat Kuch Aise Hain—
“Raaz banana tumhare khoon mein hai, lekin raaz chhupa kar rakhna mere khoon mein nahin hai. Bhale hamara khoon ka rishta kyon na ho.”
“Aur ab jo hoga, woh hamare bas mein nahin hai.”

সাজিদ শিকদার থর থর করে কেঁপে উঠলেন মেয়ের ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্যে। সকলের দৃষ্টি যে উনার ওপর, সেটা উনি না দেখেই বেশ বুঝতে পারছেন।
এই মেয়েটা ওনার অত্যন্ত দুরন্ধর শিকদারদের রক্তে প্রবাহমান বংশীয় কোন কিছুই ছেড়ে আসেনি।
কিন্তু এত বছরের গোপন রহস্য যদি ফাঁস হয়ে যায় তবে এই বয়সে সবটা সামাল দেওয়া উনার জন্য বেশ কষ্টের হয়ে যাবে?
প্রিয়তা ও প্রিয়স্মিতার পাশে এসে দাঁড়ালো। সাজিদ শিকদারের ঘাবড়ে যাওয়া মুখটা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এভাবে ঘামছো কেনো আব্বু? ভয় পাচ্ছো? এটাই ভাবছো তো যে এত বছরের গোপন রহস্য ফাঁস হয়ে গেলে সামাল দেবে কীভাবে?”
প্রিয়তার কণ্ঠ শুনে ভেতর থেকে নড়ে উঠলেন সাজিদ শিকদার।
বাড়ির অন্য সদস্যরা হাঁ করে একবার প্রিয়তার দিকে তাকাচ্ছে তো একবার প্রিয়স্মিতার দিকে। তাদের অবচেতন মন হয়তো অমিল খুঁজতে ব্যস্ত। কিন্তু তাদের অদৃষ্ট মন্দ বিধাতা সৃষ্ট এই দুই বোনের মধ্যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ব্যতীত অন্য কোনো অমিলই পরিলক্ষিত হয় না।
সাজিদ শিকদার কিয়ত্ক্ষণ চুপ থেকে চাপা কন্ঠে আস্তে করে প্রিয়স্মিতাকে বললেন,

“তুমি এখানে কেন? আর তুমি এদেরকে কীভাবে…?”
মুখ দেখে মনে হচ্ছে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন।
উনার ফ্যাকাসে মুখটা দেখে আর হাসি চাপতে পারলো না প্রিয়স্মিতা। হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
চমকালেন সাজিদ শিকদার।
প্রহেলিকা ফোন চাপতে চাপতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো। চেঁচামেচি শুনে ড্রইং রুমের দিকে তাকাতেই পা ফ্রিজ হয়ে গেলো তৎক্ষণাৎ।
অনন্যা বেগম আর ধৈর্য্য ধরতে পারছেন না। নিজের মেয়ের মতো একই চেহারার দুজনকে দেখে মাথা ঘুরছে উনার।
প্রিয়স্মিতাকে পাগলের মতো হাসতে দেখে ধমকে উঠলো পৃথম,
“কী পাগলামি হচ্ছে এগুলো! এখানে আমার বোনের মতো একই রকম দেখতে দুজনে কীভাবে হতে পারে?”
পাশ থেকে শুদ্ধর ভাবলেশহীন কন্ঠের উত্তর,

“কী জানি, হতেও পারে। তবে শালাবাবু একটা কথা ক্লিয়ার করে বলি, ওটা আমার বউ আর এটা আমার বন্ধুর বউ। বাকি আর আমরা কিছু জানি না। আপনাদের ফ্যামিলি ম্যাটার, আপনারাই বুঝেন দেখেন যা ভালো মনে করেন। এসব মেলোড্রামা দেখতে আমরা ইন্টারেস্টেড না।”
প্রণয়ও একই ভঙ্গিতে বলল,
“আপনাদের ড্রামা শেষ হলে আমাদের বউগুলো আমাদের ঘরে পাঠিয়ে দেবেন।”
“ওকে গাইস, কন্টিনিউ।”
বলে ধপাধপ পা ফেলে ওরা দুজন চলে গেলো নিজেদের ঘরে।
শুদ্ধর কথাগুলো শুনে ক্যাচ করে বুকে কিছু একটা বিঁধলো প্রহেলিকার।
এদের সবার কথা শুনে পৃথমের এবার পাগল পাগল লাগছে। সে প্রিয়তা আর প্রিয়স্মিতার দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,

“কি হচ্ছে এখানে? কি সব বলছো তোমরা? আর ভাইয়ারা এগুলো কী বলে গেলো? তোমরা দুজন আসলে কে? আর আমার বোন কোথায়?”
প্রিয়তা আর প্রিয়স্মিতা একসাথে বলল,
“আমরা দুজনেই তোমার বোন।”
“মানে?”
প্রিয়তা রহস্যময় কন্ঠে হাসলো,
“মানে, আই’ম তনয়া শিকদার, প্রিয়তা, ওয়াইফ অফ আবরার শিকদার প্রণয়।”
প্রিয়স্মিতা বলল,
“এন্ড আই’ম মেহেরিমা শিকদার, প্রিয়স্মিতা, ওয়াইফ অফ আবদ্ধ চৌধুরী শুদ্ধ।”
“হোয়াট!”
“ইয়েস! উই আর সিস্টারস অফ প্রতীক শিকদার পৃথম অ্যান্ড ডটার অফ সাজিদ শিকদার।”
পৃথম হতবাক মুখে বলল,
“এটা কীভাবে পসিবল? আমার বোন শুধু একটাই প্রিয়তা। আর তার সাথেই শুদ্ধ ভাইয়ার বিয়ে হয়েছে।”
পাশ থেকে তড়িৎ বেগে মাথা নাড়িয়ে প্রিয়তা বলল,
“নাউজুবিল্লাহ! আমি কেন আমার বোনের জামাইকে বিয়ে করতে যাবো যেখানে আমার নিজস্ব একটা কিউট জামাই আছে?”

পৃথম কিছু বলবে তার পূর্বে সাদমান শিকদার গর্জে উঠলেন,
“একদম চুপ সবাই! একটা ও অযথা বাক্য যেন কারো গলা দিয়ে বের না হয়।”
বজ্র কন্ঠের ধমকে সকলের ফিসফাস বন্ধ হলো। সাদমান শিকদার প্রিয়তা আর প্রিয়স্মিতাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে বললেন,
“সাদমান শিকদারের বাড়িতে দাঁড়িয়ে উল্টা পাল্টা কথা বলার শাস্তি কি তোমরা জানো? তোমরা আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে যা কিছু একটা বলে দেবে আর সেটা আমরা সবাই বিশ্বাস করে নেব—এটা ভাবাটা নেহাত মূর্খামি। সত্যি বলো কে তোমরা? তোমাদের মধ্যে আসল কে? আর দুজনেই একদম হুবহু দেখতে কীভাবে হলে?”
প্রিয়তা প্রশ্ন করল,

“আসল মানে, তুমি কাকে চাও বড় আব্বু?”
“তোমাদের মধ্যে প্রিয়তা কে?”
“আমি।”
“তাহলে ও কে?”
“আমি প্রিয়স্মিতা।”
সাদমান শিকদার কঠিন স্বরে বললেন,

“কিন্তু এই নামের কেউ আমাদের বংশে নেই। তোমার আসল পরিচয় কি? আর ওর মতো দেখতে কীভাবে হলে?”
সাদমান শিকদারের কৌতূহল দেখে রহস্য খেলে গেলো প্রিয়স্মিতার চোখে। সাজিদ শিকদারকে দেখিয়ে বললো,
“ওনাকেই জিজ্ঞেস করুন আমি আসলে কে। আমার থেকে ব্যাটার অ্যানসার উনি দিতে পারবেন।”
সাজিদ শিকদার তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সাদমান শিকদার ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকালেন ভাইয়ের দিকে। ভারী গমগমে আওয়াজে প্রশ্ন করলেন,
“মেয়েটা কে সাজিদ?”

উপস্থিত সকলের চোখ মোখে চাপা কৌতুহল। সকলে সাজিদ শিকদারের পানে চেয়ে আছে উত্তরের আশায়।
সাজিদ শিকদার একবার চোরা চোখে চাইলেন অনন্যা বেগমের দিকে। অনন্যা বেগমের চেহারায় বিস্ময়।
সাদমান শিকদার ভারী আওয়াজে ফের প্রশ্ন করলেন,
“মেয়েটা কে সাজিদ?”
এবার আর নিশ্চুপ থাকতে পারলেন না সাজিদ শিকদার। মাথা নিচু করে ধীর গলায় বলে উঠলেন,
“আমার মেয়ে ভাইজান।”
সাজিদ শিকদারের সরল স্বীকারোক্তিতে উপস্থিত সকলের মাথায় বিনা মেঘে বজ্র পড়ার মতো অনুভূত হলো।
সবার চোখ যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। তবে শান্ত থাকলেন সাদমান শিকদার। তুলনামূলক শীতল কন্ঠে জানতে চাইলেন,

“ও তোর মেয়ে হয় কীভাবে? আর যদি হয়েও থাকে, তাহলে পুরোপুরি প্রিয়তার মতো দেখতে হলো কি করে?”
আবারও নিশ্চুপ হয়ে গেলেন সাজিদ শিকদার।
“কী হলো, উত্তর দে!”
চোখ বন্ধ করে নিজের অসহায়ত্বের পরিমাপ করলেন সাজিদ শিকদার। যেহেতু সব সামনে চলেই এসেছে, তাই আর কথা লুকিয়ে মিথ্যাবাদী সাজার কোন ইচ্ছা নেই। তাই চোখ বন্ধ রেখেই বলে উঠলেন,
“ওরা দুজন আইডেন্টিক্যাল টুইনস ভাইজান। ৯৯.৯৮% সিমিলার জেনেটিক ডিসঅর্ডার আছে তাই একই রকম দেখতে।”

“কীহ!”
অনন্যা বেগমের পা টলে গেলো সাজিদ শিকদারের কথা শুনে।
সাজিদ শিকদার ফের স্বীকার করলেন,
“জি ভাইজান। ওরা দুজন যমজ। তাই একই রকম দেখতে। আর দুজনেই আমার মেয়ে, এই বাড়ির মেয়ে।”
সাদমান শিকদার জিজ্ঞেস করলেন,
“তাহলে এই কথাটা আমরা কেউ জানি না কেন? ডাক্তার বলেছিলো, যমজ মেয়ের মধ্যে একজন মারা গেছে তাহলে কি সেটা মিথ্যা ছিল।”
সাজিদ শিকদার বললেন,
“হ্যাঁ ভাইজান মিথ্যে ছিল, ঐদিন রাতে একটা বাচ্চা মারা যায় নাই। আমি ওদের জন্মের পর দুজনের মধ্য থেকে একজনকে সরিয়ে নিয়েছিলাম।”
“কেন?”
প্রিয়তা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠলো,

“কেনটা উনি বলতে পারবেন না বড় আব্বু। উনার ঐ কথা বলার মুখই নেই। উনি যে কী পরিমাণ দুমুখো সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।”
সাদমান শিকদারসহ সকলে হতবাক চোখে তাকালেন প্রিয়তার দিকে। প্রিয়তা ফের গর্জে উঠলো,
“উনি যে কী পরিমাণ মিথ্যাবাদী, নিজমতলবী আর স্বার্থপর সেটা আপনারা কেউ কল্পনাও করতে পারবেন না। আই জাস্ট হেইট হিম। উনাকে আমার বাবা বলতেও ঘিন্না লাগে। উনি কোনোদিনও আমাদের কাউকে ভালোবাসেন নি। উনি কোনদিনও আমাকে ভালোবাসেননি, না ভালোবাসেছেন ভাইয়াকে, আর না প্রিয়স্মিতাকে। সব উনার লোক দেখানো নাটক ছিলো বড় আব্বু। উনি যদি জীবনে কাউকে সত্যি ভালোবেসে থাকেন, সেটা একমাত্র তৃপ্তি বেগম।
উনি তৃপ্তি বেগমের জন্য সব করতে পারেন, প্রয়োজনে আমাদের তিন ভাইবোনকে খুন করতে ও উনার হাত কাঁপবে না।”

যে বাবাকে প্রিয়তা এত ভালোবাসতো, সম্মান করতো, সেই বাবার প্রতি প্রিয়তার এমন কটু বাক্য প্রয়োগ দেখে সকলে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো।
প্রিয়তা হাতের উল্টোপিঠে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা অশ্রু মুছে বললো,
“উনি কোনোদিনও এক সেকেন্ডের জন্যও আমার আম্মুকে ভালোবাসেন নি। শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করে গেছেন। ভালোবাসার নামে ঠকিয়েছেন। দিনের পর দিন মিথ্যা বলেছেন। উনি এতটাই খারাপ মানুষ যে আমার আম্মুকে ভালোবাসা আর সম্মান তো দেনই নি, উল্টে জন্মের পর আমার আম্মুর থেকে সন্তান চুরি করেছেন।”
“জানো আম্মু, উনি তোমার মেয়েকে চুরি করে কোথায় নিয়ে দিয়েছেন?”
বলে অশ্রু চোখে অনন্যা বেগমের দিকে চাইলো প্রিয়তা।
অনন্যা বেগম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। প্রিয়তা চোখ মুছে বলা আরম্ভ করলো,

“এই মানুষটা তোমার নবজাতক মেয়েকে তোমার পাশ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে উনার প্রথম স্ত্রীকে দিয়েছেন।”
“আম্মু, তোমার কোল খালি করে উনি উনার প্রথম স্ত্রীর কোল ভরিয়েছেন। আর দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তোমাকে অন্ধকারে রেখেছেন এটা বলে যে তোমার মেয়ে মৃত। তোমার মেয়ে মরেনি আম্মু—ওই দেখো তোমার মেয়ে বেঁচে আছে। উনি আমাকে মিথ্যা বলেছেন, তোমাকে মিথ্যে বলেছেন, প্রিয়স্মিতাকে মিথ্যা বলেছেন, আমাদের সবাইকেই মিথ্যা বলেছেন।”
“উনি সিলেটে চাকরি করতে যান না আম্মু। উনার সংসার আছে ওখানে। উনার একমাত্র ভালোবাসার মানুষ, যার জন্য উনি যা কিছু করতে পারেন।”

“ওই দেখো, ওই মেয়েটা তোমার মেয়ে আম্মু। তোমার মেয়ে। তোমার মেয়ে মরেনি, বেঁচে আছে।”
অনন্যা বেগম জলটলমলে চোখে একবার প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে আরেকবার প্রিয়স্মিতার দিকে তাকালেন। কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না। তার পূর্বেই চেতনা হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।
“আম্মুউউউউ!”
দৌড়ে গিয়ে প্রিয়তা ও প্রিয়স্মিতা জড়িয়ে ধরলো অনন্যা বেগমকে।
পৃথম অশ্রু চোখে ঘৃণা নিয়ে চেয়ে আছে বাবার দিকে। যে বাবাকে সে নিজের দীর্ঘ ৩১ বছরের জীবনে আইডল মনে করতো, সেই বাবাই এত নীচ—ভাবতেই ঘৃণায় শরীর গুলিয়ে আসে পৃথমের!
এখন তো মনে হচ্ছে ওরাই যথেষ্ট ভালো; ওরা যাই করে থাকুক অন্তত ওদের চরিত্র খারাপ না।
ঘৃণায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো পৃথম। তার হাত নিশপিশ করছে। কিন্তু বাবা তো!
পৃথম দৌড়ে এসে অনন্যা বেগমকে কোলে তুলে নিলো। বোনদের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আয় তোরা আমার সাথে।”

বলে মাকে কোলে নিয়ে ঘরে চলে গেলো পৃথম। প্রিয়তা আর প্রিয়স্মিতাও গেলো পিছু পিছু।
উপস্থিত এত মানুষের অদ্ভুত দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারছেন না সাজিদ শিকদার। উনার হাঁটুর বল ফুরিয়ে আসছে। কলিজাটা টুকরো। ছেলে-মেয়েগুলোর কাছে আজ সে অপরাধী, চরিত্রহীন, নিকৃষ্ট। সত্যিই তো তাই।
লজ্জায় অপমানে সাজিদ শিকদারের চোখ ভিজে উঠলো। তিনি ফের বসে পড়লেন সোফায়।
সাদমান শিকদার ছোট ভাইয়ের দিকে তেড়ে গিয়ে বললেন,
“তুই আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করেছিস! তোর কলিজা কত বড়? কোন বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করেছিস তুই?”
“আর তোর সাহস কী করে হলো আমার বংশের মেয়েকে চুরি করার?”

খালিদ শিকদার পেছন থেকে জাপটে ধরলেন সাদমান শিকদারকে। সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন,
“শান্ত হোন ভাইজান। বেশি চিত্কার দিলে আপনার বিপি হাই হয়ে যাবে।”
“আপনি তো বলতেন আপনার সেজো ভাইয়ের মতো ভাই হয় না। পুরো সিলেট ওর ওপর দিয়ে রাখছিলেন। এখন বুঝলেন তো, আপনার ভাই অফিস সামলাতে যেতো না, বউ সামলাতে যেত।”
সাদমান শিকদার যেন আরও রেগে গেলেন।
সাজিদ শিকদার চোখের জলে ঝাপসা হয়ে যাওয়া চশমা খুলে চোখ মুছলেন। সাদমান শিকদারের পানে চেয়ে ভাঙ্গা কন্ঠে বললেন,
“আমার জীবনটা আপনি তছনছ করে দিলেন ভাইজান। বাড়ির এতগুলো মানুষের সামনে আমায় কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। বাড়ির বাচ্চাদের সামনে ছোট করলেন।
আসল সত্যিটা তো আপনি খুব ভালো মতো জানতেন। মানলাম আমি অনন্যার সাথে ন্যায় করেছি, আমার ভালোবাসার কথা গোপন করেছি। আমার সব অন্যায় আমি স্বীকার করলাম। কিন্তু আপনি বলুন, সব দোষ কি আমার?”

“আমি তো অনন্যাকে কখনো বিয়ে করতেই চাইনি। মনে পড়ে ৩৫ বছর আগের কথা? আমি আপনার হাতে পায়ে ধরে বলেছিলাম আমি অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসি। জবাবে আপনি কী বলেছিলেন?”
“আজ যা কিছু হয়েছে তার জন্য একমাত্র আপনি দায়ী ভাইজান। আমি অনন্যাকে ঠকাতে চাইনি। আমি তৃপ্তিকে ভালোবাসতাম, তৃপ্তির সাথেই সংসার করতে চেয়েছিলাম। আমি তৃপ্তির সাথেই সুখে থাকতাম। আমি অনন্যার সাথে একদম নিজেকে জড়াতে চাইনি। তাকে বিয়ে করতে আপনি আমাকে বাধ্য করেছিলেন ভাইজান। আমাকে আপনি বলির পাঁঠা বানিয়ে জবাই করেছেন।”
“হ্যাঁ, আমি মানছি আমার সন্তান চুরি উচিত হয়নি। কী করতাম বলেন? আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে একটা পূর্ণ সংসারের বড় লোভ হয়েছিলো।”

“যদি অনন্যা আমার জীবনে না আসতো, আমি হয়তো কখনো বাবা ডাক শুনতে পেতাম না। সন্তান সুখ আমার কপাল থেকে উঠে যেত। আমার জীবনে চাঁদের টুকরোর মতো তিনটে বাচ্চার বাবা হতে পারতাম না। কিন্তু তবুও আমি ভালোই থাকতাম। কারো কাঠগড়ায় অপরাধী হয়ে দাঁড়াতে হতো না। নিজেকে প্রশ্ন করুন ভাইজান, ভালোবাসা অপরাধ নয়। এই বাড়িতে আগেও সবাই ভালোবেসেছে, এখনও সবাই ভালোবাসে। কাউকে আপনি আটকাতে পেরেছেন, কাউকে পারেন নি।”
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে উঠে চলে গেলেন সাজিদ শিকদার।
সাদমান শিকদার নিশ্চুপ।

দ্বিতীয় তলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে হাই তুললো প্রণয়। শুদ্ধর পানে তাকিয়ে ক্লান্ত কন্ঠে বললো,
“সিন শেষ। ক্লান্ত লাগছে, শাওয়ার নিতে হবে… যাই আমি।”
শুদ্ধ শরীর টানটান করে জবাব দিল,
“হুম। দেখে ভালোই মজা পেয়েছি। আচ্ছা চল, কাল গোসল করিনি—গা দিয়ে কেমন পাঁঠা পাঁঠা গন্ধ বেরোচ্ছে।”
প্রণয় মুখ বিকৃত করে বললো,

“ছি, শালা! একটু পর তোর গা দিয়ে শুয়োর পঁচা গন্ধ বেরোবে।”
প্রণয়ের খোঁচার পাত্তা দিলো না শুদ্ধ। সজোরে পেটে একটা গুঁষি মেরে ওপরে চলে গেলো।
এত কেচ্ছা কাহিনি দেখে প্রহেলিকার মাথা ভনভন করে চক্কর দিচ্ছে। এই বাড়ির পুরুষদের যেন কেচ্ছার কোনো শেষ নাই। তবে প্রিয়তার কয়েকটি কথায় প্রহেলিকার মনে অন্য সন্দেহ হচ্ছে। সে মনের সন্দেহ মনে পুষে রাখা পছন্দ করে না, তাই মনে মনে কিছু একটা ভেবে অনন্যা বেগমের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই দেখলো প্রিয়তা এদিকেই আসছে।
সাথে সাথেই পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো প্রহেলিকা। প্রিয়তাকে ওপরে উঠতে দেখে সন্তর্পণে পিছু নিলো।
প্রিয়তা রাগ–অভিমান ছুঁড়ে ফেলে ফুরফুরে মনে নিজের জামা কাপড় বের করে স্যুটকেস ভরতে ভরতে গলা ছেড়ে গাইছে—

“আহা কত্ত কী যে ভাবি আমি কেমন হবে আমার স্বামী,
দুই চোখে ঘুম নাই রে আমার দুই চোখে ঘুম নাই রে।
আমার মনটা করে উরু উরু, বুকটা করে দুরু দুরু—
বিয়ে হয়ে গেলো রে আমার, বিয়ে হয়ে গেলো রে।”
প্রহেলিকা বেশ অবাক হলো প্রিয়তাকে দেখে। মনেই হচ্ছে না সে একটু আগে কাঁদছিলো। তবে বেশিক্ষণ মনের কৌতূহল চেপে রাখতে পারলো না। সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেই বসলো,
“এসব গুছিয়ে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
প্রিয়তা কাপড় গোছানো থামিয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো প্রহেলিকার দিকে। অতঃপর বিশাল একটা ভেটকি মেরে বললো,

“নিজের আসল ঘরে যাচ্ছি বড় আপা।”
প্রহেলিকা চমকে উঠে বললো—
“কিন্তু তোর ঘর তো এটাই!”
প্রিয়তা লজ্জা পাওয়ার ভান করে ঠোঁট টিপে হেসে বললো,
“যাহ, কী বলো না দুষ্টু আপা! বিয়ের পর থোড়াই না বাপের ঘরে মেয়েরা থাকে।”
প্রহেলিকা চকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“হোয়াট! বিয়ে?”
প্রিয়তা আরও দশ গুণ নেতিয়ে গিয়ে ঢং করে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ গো হ্যাঁ, বিয়ে করে নিয়েছি। তাই এখন বাক্স–পেটরা গুছিয়ে স্বামীর ঘরে যাচ্ছি।”
প্রহেলিকার বুকটা কেমন অজানা ভয়ে মুচড়ে উঠলো। কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কে তোর স্বামী?”
প্রিয়তা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,
“তোমার ভাই।”
“কী!” — প্রহেলিকার চোখ কপালে।

প্রিয়তার স্যুটকেস গোছানো শেষ। তাই বিছানায় বসে থাকা কোকোকে কোলে নিয়ে বেরোতে বেরোতে বললো,
“হ্যাঁ গো, হ্যাঁ। তোমার বড় ভাইকে পটিয়ে বিয়ে করে নিয়েছি। তোমাকে কত্ত ভালোপাসি—তোমার সাথেই চিপকে থাকবো বলে তোমার ভাইকেই বিয়ে করে নিয়েছি। তাই আজ থেকে ভাবি ডাকবা।”
প্রিয়তার হেয়ালি শুনে মেজাজ খারাপ হলো প্রহেলিকার। পিছু পিছু হেঁটে যেতে যেতে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“দেখ প্রিয়তা, হেয়ালি করবি না। আমার উত্তর না দিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?”
প্রিয়তা সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠতে উঠতে নাক সিঁটকে বললো,
“ছিহ! নিজের বড় ভাইয়ের বউকে কেউ নাম ধরে ডাকে? মেজো আম্মু তোমাকে সংস্কার তো একদম শেখাতে পারেনি।”
প্রহেলিকা বিরক্ত হয়ে বললো,

“এই প্রিয়, দাঁড়া! দাঁড়া বলছি—তুই ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস? ওদিকে তো ছাদ!”
বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো প্রিয়তা। প্রহেলিকার দিকে ফিরে চোখ রাঙিয়ে বললো,
“বড় ভাবি লাগি তোমার। এরপর থেকে সম্মানের সহিত বড় ভাবি বলে ডাকবে। তুমি যেমন আমার বড় আপু লাগো, আমিও তেমন সম্পর্কে তোমার বড় ভাবি লাগি, ওকে? আর কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না।”
এ কথা বলে ছাদ পেরিয়ে প্রণয়ের ঘরের দিকে চলে গেলো প্রিয়তা।
প্রহেলিকার গলা শুকিয়ে গেলো অজানা আশঙ্কায়। সে যা ভাবছে—তাই হবে না তো?
শীতের সকালে ঠান্ডা ঠান্ডা পানিতে শরীর ভিজিয়ে সকল ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলেছে প্রণয়। টানা ২৫ মিনিট লং শাওয়ার নিয়ে মাইন্ড রিল্যাক্স করেছে।
ঠান্ডা মাথায় পরবর্তী সব ছক কষে ফেলেছে তার নেক্সট মিশ(…………)। সে খুব ভালো মতো জানে এবার তাকে কী করতে হবে।
এ সকল জটিল ভাবনা চিন্তা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল প্রণয় শাওয়ার শেষ করে।
কোমরে সফেদ টাওয়াল জড়িয়ে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ওয়াশরুম থেকে বের হলো প্রণয়। উন্মুক্ত ফর্সা কাঁধ পিঠ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে স্বচ্ছ জলের ধারা। নিয়মিত জিম করার ফলে বুক এবং কাঁধের পেশিগুলো আগের থেকেও বেশি টানটান হয়েছে।

“এই ঘরে যখন আমি যাই, মাঝে মাঝে একটা ব্যাটা দেখতে পাই, ফর্সা রঙা পায় আবার টাওয়াল পরেছে, বড় বড় লোম ওয়ালা পায় আবার টাওয়াল পরেছে, চাচাতো জামাই আমায় পাগল করেছে।”
গান শুনে পা থামিয়ে দিলো প্রণয়। কপালে ভাঁজ ফেলে পাশে তাকিয়ে দেখলো প্রিয়তা কোকোকে কোলে নিয়ে বিছানায় বসে আছে। আবার নির্লজ্জের মতো হা করে তাকিয়েও আছে।
প্রণয় ঝাড়া মেরে চুলের পানি ফেলে ওয়ার্ডরোব থেকে শার্ট প্যান্ট বের করতে করতে বললো—

“টিজ করছিস?”
প্রিয়তা বললো—
“ও মা! আপনি এত তাড়াতাড়ি বুঝে গেছেন!”
প্রণয় বললো—
“লাভ নেই।”
বলে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো প্রণয়।
পাত্তা না পেয়ে প্রিয়তার মনের বেলুনটা মাঝ আকাশেই ফাটাস করে ফেটে গেলো।
তবে প্রিয়তাও হেরে যাওয়ার পাত্রী কোথায়! লাভ তো সে করেই ছাড়বে। বন্ধ দরজার পানে চেয়ে মনে মনে পৈশাচিক হাসলো প্রিয়তা। পাশের সেন্টার টেবিল থেকে প্রণয়ের ফটো ফ্রেমটা তুলে হাতে নিলো। ছবিটার ওপর হাত ভুলাতে ভুলাতে শয়তানি হেসে বললো—

“কতক্ষণ আর চোখ থাকতে অন্ধ সাজার অভিনয় করবেন শুয়ামি? সোজা আঙুলে যদি ঘি না ওঠে, তাহলে চামচ দিয়ে কীভাবে ঘি তুলতে হয় সেটা আপনার ইস্তিরি খুব ভালো মতো জানে।”
প্রণয়ের থেকে মুঠেও পাত্তা না পেয়ে মুখ চুন করে গালে হাত দিয়ে বসে আছে প্রিয়তা। ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে সামনের লম্বা চওড়া পরিপক্ক পুরুষটার দিকে।
প্রণয় হাত দিয়ে ব্যাক ব্রাশ করে করে চুলে জেল অ্যাপ্লাই করছে। তার গেটআপ দেখেই বুঝা যাচ্ছে কোথাও হয়তো যাবে।
প্রিয়তা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিয়ে সুর তুলে গান ধরলো—

“রুক্ষ এলোমেলো চুলগুলোয় মনটা চায় যেন হাত বুলাই, দু হাতে আদর করি গালটাকে, হৃদয়ে বেঁধে রাখি সুখটাকে, তোমায় দেখি শুধু না ফেলে পলক, হে যুবক।”
“হেই সুদর্শন যুবক! ক্যান আই টাচ ইওর এলোমেলো চুলগুলো?”
প্রণয় বললো—
“ফ্লার্টিং করছিস?”
প্রিয়তা—
“ইয়েস।”
প্রণয়—
“বেয়াদব।”
প্রিয়তা বুকে হাত চেপে বিছানায় হেলে পড়লো—
“hayy koi Insan ka baccha Itna handsome bhi ho sakta hai!”
প্রিয়তা গড়াগড়ি খেয়ে টুকটুক করে এগিয়ে গেলো প্রণয়ের কাছে। প্রণয়-এর পায়ের পাতায় ভর দিয়ে শরীরে শরীর ঘেঁষে দাঁড়ালো।
সদ্য জেল দেওয়া চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে প্রিয়তা বললো—

“এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছেন হুম? জানেন না বিবাহিত পুরুষদের এত সাজা বারণ?”
প্রণয় বিরক্ত হলো না। চুল ঠিক করতে করতে বললো—
“আরেকটা বিয়ে করতে যাচ্ছি।”
প্রিয়তা মুখ বাঁকালো। মনে মনে জ্বলে উঠলেও মুখে প্রকাশ করলো না। প্রণয়ের ডার্ক রেড ঠোঁটে তর্জনী ছুঁইয়ে বললো,
“হুস! একদম এসব অলক্ষণে কথা বলবেন না। আমি এমনিতে আপনার চন্দ্রমল্লিকা, রেগে গেলে কিন্তু মঞ্জুলিকা হয়ে যাই শিকদার সাহেব—ভুলে যাবেন না!”

প্রণয় গভীর চোখে তাকালো প্রিয়তার চঞ্চল দুই চোখের গভীরে। দিন দিন মেয়েটার ভীষণ সাহস বাড়ছে, সে কী মেয়েটাকে ইদানিং একটু বেশি আদর দিয়ে ফেলছে?
প্রণয়ের ভারী তপ্ত নিশ্বাস এসে আছড়ে পড়ছে প্রিয়তার চোখে-মুখে। কালচে লাল ঠোঁট দুটো গাল ছুঁই ছুঁই দূরত্বে। গভীর বাদামি চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রিয়তার মনে হচ্ছে তার শরীরটা আপনা-আপনি গলে পানি হয়ে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে আসছে, বুক ধরফর করছে।
নিজে থেকেই কথা বন্ধ হয়ে গেলো প্রিয়তার।
বেশিক্ষণ ওই নেশা-ডোবানো চোখে তাকিয়ে থাকতে পারলো না। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো। ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তে রাঙা হয়ে উঠলো।

এতক্ষণ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেও লাল লাল গাল দেখে ভেতর ভেতর হাঁসফাঁস করে উঠলো প্রণয়। প্রিয়তার শরীর থেকে ছুটে আসা তীব্র মেয়েলি ঘ্রাণ নাক বেয়ে সোজা হৃদপিণ্ডে ধাক্কা দিচ্ছে। ঢোঁক গিললো সে।
দুই হাতে কোমর চেপে ধরে হ্যাঁচকা টানে একদম কাছে নিয়ে এলো প্রণয়। প্রিয়তার মুখের উপর ঝুঁকে গিয়ে বেসামাল কণ্ঠে বললো,
“রূপ দেখিয়ে পাগল বানাচ্ছিস?”
কেঁপে উঠলো প্রিয়তা। শার্ট খামচে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বললো,
“আ… আপনি পাগল হচ্ছেন!”
“হ্যাঁ। খুব বিশ্বাস কর—নিজেকে সত্যিকারের পাগল লাগছে।”
“তাহলে?”

“তাহলে কী করবো বল? তোকে কাছে টেনে নেবো। সইতে পারবি তুই? সামলাতে পারবি আমায়? এক রাতে তোর এই ছোট্ট শরীরে অগণিত দাগ পড়বে! কাঁদবি তুই, ছটফট করবি—তখন আমি-ও সাহায্য করতে পারবো না। তুই যে বড্ড নরম, বড্ড আদুরে… তোকে ব্যথা দিয়ে তৃপ্তি পেতে ইচ্ছে করে না।”
প্রণয় আর কিছু বলবে তার আগেই ড্রেসিং টেবিলের ওপর কর্কষ আওয়াজে ফোন বেজে উঠলো।
তীক্ষ্ণ শব্দে ঘোর কেটে গেলো দু’জনের। একই সঙ্গে বিরক্ত হলো তারা। প্রণয় বিরক্ত চোখে তাকালো ফোনের দিকে।
ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে তৎক্ষণাৎ গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেওয়ার বাসনা জাগলো তার মনে।
কিন্তু দুঃসাহসী যন্ত্রটা তখনো বেজেই চলেছে।

“হ্যালো।”
“স্যার…”
“ওকে, গ্রেট জব। আই উইল কাম আপ টু ৩০ মিনিটস।”
“ওকে স্যার।”
প্রণয় ফোন কেটে দিয়ে শান্ত চোখে তাকালো প্রিয়তার দিকে। এখন আর গালে গোলাপি আভাটা নেই।
সে লম্বা শ্বাস ফেলে কাকে জানি ফোন দিয়ে বলল।
“২ মিনিটের মধ্যে এক বাটি নারকেল তেল নিয়ে আয়। নাইলনের মোটা মোটা দু’টো দড়ি নিয়েও—তাড়াতাড়ি আয়।”

বলে ফোন কেটে দিলো।
কথা শুনে চোখ বড় বড় করে ফেলল প্রিয়তা।
দুই মিনিটের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে ঘরে প্রবেশ করলো তন্ময়। এক হাতে তেল আর এক হাতে দড়ি।
প্রিয়তার মুখের রঙ উড়ে গেলো এগুলো দেখে। সে ঢোক গিলে ভয়ার্থ চোখে তাকালো প্রণয়ের দিকে—প্রণয়ের মতিগতি তার সুবিধার লাগছে না।
তন্ময় শয়তানি হেসে মনে মনে বিড়বিড় করলো—
“বার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার ঘুঘু তোমার বধিবে পরান…”
প্রণয় প্রিয়তার হাত ধরতে যেতেই ফস করে হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিলো প্রিয়তা।
প্রণয় শার্টের হাতা গুটিয়ে পিছু নিতে নিতে বললো,
“একদম পালাবি না! দাঁড়া! ধরতে পারলে তোর খবর করে ছাড়বো!”
প্রিয়তা দৌড়াে দৌড়ে সিঁড়ি নামতে নামতে বলল—
“আমি আপনার পায়ে পড়ি প্রণয় ভাই! আমার মতো এত সুন্দর কিউট সুইট একটা বাবুর সাথে এমন নির্দয় আচরণ করবেন না। আল্লাহ সইবেন না! আমি মাত্র দুই দিন আগে হেয়ার স্পা করেছি—পাক্কা ৫০,০০০ টাকা নিয়েছে! একটা টাকাও কম মানেনি!”

“তুই দাঁড়াবি কিনা বেয়াদব! তুই কি ভাবছিস তোকে ধরতে পারবো না? চুলে তেল দিস না কয় হাজার বছর! দাঁড়া বলছি!”
কিন্তু প্রিয়তা কি আর এসব শোনার পাত্রী?প্রথমে তিন তলা,তারপর দুই তলা, তারপর এক তলায় দৌড়ে নেমে গেল প্রিয়তা। পেছনে প্রণয়। আর প্রণয়ের পেছনে তেলের বাটি নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হাপাচ্ছে তন্ময়। সবাই হাঁ করে উপভোগ করছে সেই দৃশ্য।
ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে অফিসের কাজ করছিলো প্রেম। প্রিয়তা দৌড়ে এসে তার পেছনে লুকালো আতঙ্কিত কন্ঠে বললো,
“ছোড়দা! প্লিজ বাঁচাও! তোমার জল্লাদ ভাই আমার গর্দান নেবে!”
প্রেম ভাইয়ের সাথে তর্ক করার সাহস রাখে না—এই বাঁদরকে নিয়ে তো নয়ই। তাই চুপচাপ সরে পড়লো।
“সব মীরজাফরের দল!”
বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দৌড়ালো প্রিয়তা।
প্রিয়স্মিতা ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে ওদের দুজনের দিকে। বিষয়টা যে তার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না, এটা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

“জান, দাঁড়া বলছি—তর চুল আর ঘোড়ার লেজের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই!” বাড়ির চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে পুকুরপাড়ে এসে খপ করে প্রিয়তাকে ধরে ফেললো প্রণয়।
প্রিয়তা কান্নামিশ্রিত কন্ঠে ঠোঁট উল্টে বললো,
“প্লিজ প্রণয় ভাই! আমি চুলে তেল দেবো না। পুরো স্পা খারাপ হয়ে যাবে, প্লিজ।
কতো এক্সপেন্সিভ এক্সপেন্সিভ হেয়ার কেয়ার প্রোডাক্ট ইউজ করেছে জানেন—সব খারাপ হয়ে যাবে এই ৪০ টাকার নারকেল তেলের জন্য!”
কিন্তু প্রণয় ওর কথা কানেই নিলো না। হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে এনে পুকুরপাড়ের বাঁধানো বেঞ্চে বসালো।

তন্ময় শয়তানি হেসে বোনের দিকে তাকালো। এই মহিলা তাকে অনেক জ্বালিয়েছে, তার হালকা প্রতিশোধ আরকি।
“এই নাও দাদান, তেল! একদম খাঁটি—টিন থেকে নিয়ে এসেছি,” বলে তেলের বাটি এগিয়ে দিলো তন্ময়।
প্রণয় প্রিয়তার কোনো কাকুতি-মিনতি শুনলো না। হাঁটু-ছাড়া সিল্কি লতানো চুলগুলো পুরো তেলের ড্রামে চুবিয়ে দিলো। বেচারি প্রিয়তা হাত-পা ছড়িয়ে কান্নাই করে দিলো শেষ পর্যন্ত।
প্রণয় তন্ময়কে চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝাতেই চলে গেলো তন্ময়।
প্রণয় প্রিয়তার তেলতেলে গালে টপাটপ দু’টো চুমু খেয়ে লম্বা চুলগুলোতে দুপাশে দু’টো বেনুনী করতে করতে বললো,

“চুলে তেল না দিলে চুলের গোঁড়া দুর্বল হয়—জানিস না? এখন থেকে আগের মতো প্রতি সপ্তাহে দু’দিন তোকে মাথায় তেল দিয়ে দেবো, কেমন?”
প্রিয়তা মুখ বাঁকালো,
“আদিখ্যেতা!”
“কিছু বললি?”
“বললাম, আহা! আমার প্রতি কী ভালোবাসা!”
“এই নাও দাদান!” বলে প্রণয়ের হাতে বড় দু’টো চকলেট দিলো তন্ময়।
প্রণয় একটা তন্ময়কে দিয়ে বললো,
“এটা তোর।”
তন্ময় তো খুশিতে আটখানা হয়ে চকলেট নিয়ে দৌড় দিলো। প্রণয় অন্যটা প্রিয়তার হাতে দিয়ে গাল টেনে বললো,
“আমি না আসা পর্যন্ত যদি এই তেল চুল থেকে নড়েছে—তাহলে তোর একদিন আর আমার যে ক’দিন লাগে। কী বললাম?”

“আমার একদিন না হলে আমার যে ক’দিন লাগে।”
“ভেরি গুড। আমি রাতে এসে হেয়ার ওয়াশ করিয়ে চুলে সিরাম লাগিয়ে দেবো। এর বেশি ওস্তাদি যেন না হয়, ওকে?”
“ওকে।”
“ব্রেভ গার্ল! নে—একটা হামি দে,” বলে গালটা এগিয়ে দিলো প্রণয়।
প্রিয়তা মনে মনে জ্বলে গেলে ও সুযোগটা লুফে নিল—কষিয়ে একটা চুমু খেলো প্রণয়ের গালে।
“টাটা প্রিন্সেস,” বলে প্রিয়তার কপালে চুমু দিয়ে চলে গেলো প্রণয়।
মনে মনে রাগে লুচির মতো ফুলে উঠলো প্রিয়তা। এই হাড়ে বজ্জাত ব্যাটা এক চুলও পাল্টায়নি!
প্রিয়তা নিজের বেনুনী দু’টো ধরে দেখলো—সেগুলো দিয়ে তেল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। হাত ভর্তি তেল দেখে নাক সিঁটকালো প্রিয়তা, বিড়বিড় করে প্রণয়কে গালমন্দ করতে করতে বলল,
“ইশ! বেয়াদব ছেলে! তোর কপালে বউ জুটবে না—দেখিস! অবলা পেয়ে নির্যাতন করে দিলি তো!
আহহা! আমার স্পা! এ্যাঁ…

শালা খচ্চর ব্যাটা! নিজে তো জীবনে মাথায় তেলের একটা ফোঁটাও দেয় না—আর আমায় তেলচিটচিটে শাকচুন্নি বানিয়ে গেলো! ইসস! ধুর! স্বামী না—স্বামী না—আপনি একটা আসামী!”
প্রিয়তা কথা শেষ করতে পারলো না। চারপাশ থেকে খিলখিল করে হাসির শব্দ ভেসে এলো। প্রিয়তা চোখ তুলে ওপরে তাকিয়ে দেখলো অরণ্য, সমুদ্র, তন্ময়, রাজ আর প্রেম দাঁড়িয়ে হাসছে।
এদের হাসি দেখে গা জ্বলে গেলো প্রিয়তার। সবগুলো শত্রু! প্রিয়তা মুখ বেঁকিয়ে চলে গেলো।
“ওহ মাই সান! আমি ওয়েটিং ফর ইউ। জানো আমি কতক্ষণ ধরে তোমার অপেক্ষা করছি? দেখো তোমার কুত্তাগুলো আমায় কীভাবে বেঁধে রেখেছে। আমাকে এভাবে হার্ট করা তোমার একদম উচিত হচ্ছে না মাই সান।” বিকৃত হেসে কথাগুলো বললো ডিকে, তার ঠোঁট ফেটে মুখ দিয়ে রক্ত মিশ্রিত লালা পড়ছে।
প্রণয় ওর সামনের চেয়ারে পা তুলে বসে আছে। তার তীক্ষ্ণ বাঁকা দৃষ্টি ডিকে-র উপর নিক্ষিপ্ত। এটা কে এক চুলও বিশ্বাস নেই।

“কী ভাবছো মাই সান? আমাকে এক চুলও বিশ্বাস নেই? হাহা! এই জন্যই আমার তোমাকে এত পছন্দ। এই গোটা আন্ডারওয়ার্ল্ডে তুমি একজন, যে এই ডিকে-কে হাঁড়ে হাঁড়ে চিনতে পেরেছো।”
“পেনড্রাইভটা কোথায়?”
প্রণয়ের প্রশ্ন শুনে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন ডিকে বস। তার ছোট ছোট ধারালো চোখ দুটো যেন উড়ন্ত কোনো হিংস্র বাজ-এর।
প্রণয় কথা বলে টাইম ওয়েস্ট করার মতো টাইম নেই তাই। সোজা মাথায় গান পয়েন্ট করে বললো, “ডোন্ট টক টু আননেসেসারি। জাস্ট সে হোয়্যার দা পেনড্রাইভ ইজ, আদারওয়াইজ আই উইল শ্যুট ইউ।”
“তুমি হ্যাভ লস্ট ইয়োর গোল্ডেন টাইম, মাই সান। ইউ আর স্ট্যান্ডিং অ্যাট দা ফাইনাল এজ অফ ডিসট্রাকশন, অ্যান্ড ভেরি সুন ইউ উইল বি ফিনিশড।”
“তুমি আমাকে মারতে পারবে না। জাস্ট বিকজ, আমাকে মারার সাথে সাথেই পেনড্রাইভটা ৫৮টা দেশের সরকারের হাতে নিজে থেকে পৌঁছে যাবে। অটো সিস্টেম মাই সান।”
তীব্র ক্রোধে ফেটে পড়লো প্রণয়। সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে ঠাস ঠাস করে শ্যুট করে দিলো ডিকে বস-এর হাতে পায়ে।

ফিঙ্কি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। তবুও মাথার আগুন যেন ঠান্ডা হলো না প্রণয়ের।
প্রণয়ের অবস্থা দেখে আরও জোরে হেসে উঠলো ডিকে বস। ব্যথাতুর শব্দ না করে উল্টো রহস্যময় কণ্ঠে বললো, “আমাকে তুমি আটকে রাখতে পারবে না মাই সান। বাই দা ওয়ে, শুনলাম তুমি নাকি বিয়ে করেছো। কংগ্রাচুলেশনস মাই সান। এনজয় ইওর ম্যারিড লাইফ। বাট রিমেম্বার, ইউ উইল বি ফিনিশড ভেরি সুন।”
প্রণয়ের রাগ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলো। সজোরে লাথি মারলো ডিকে-র মুখ বরাবর। তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না ডিকে। উল্টো বললো,

“গত সপ্তাহে তোমার পাচার করা ৪,০০০ মেয়ে জার্মান সোলজারদের হাতে আটক হয়েছে। তাদের মধ্যেকার অনেকেই নাকি আবার তোমার টিমের অনেক জনকে দেখেছে। তাদের স্কেচও পৌঁছে গেছে ৫৮টা কান্ট্রিতে। এ এস আর এর সাম্রাজ্য ঘড়ির কাঁটার সাথে টিক টিক করছে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।”
ডিকে-র কথা শুনে প্রণয় ঘাবড়ালো না, তবে দুই ভ্রুর মাঝে হালকা দুই চার লাইন রেখা দৃশ্যমান হলো। অতঃপর,
“জাভেদ! জাভেদ!”
“ইয়েস স্যার।”

“এটা যদি এখান থেকে পালিয়েছে, গুলি করে তোমার খুলি উড়িয়ে দেবো। মাইন্ড ইট! যত গার্ডস লাগে লাগাও, বাট এটা যাতে না পালায়।”
“ওকে স্যার।”
“হুম।” বলে বেরিয়ে গেলো প্রণয়।
ডিকে বস-এর ঠোঁটে এখনো লেগে আছে পুরোনো সেই রহস্যময় শয়তানি হাসি।
কনকনে শীতের মধ্যেও এসি চলছে ফুল পাওয়ারে। প্রণয়ের ব্লাঙ্কেটের নীচে মুখ ঢুকিয়ে আদুরে বিড়াল ছানার মতো গুঁটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে প্রিয়তা। কাঁথা কম্বল সব কিছু থেকেই তীব্র একটা ‘প্রণয় ভাই, প্রণয় ভাই’ গন্ধ আসছে। এই ঘ্রাণের আবেশে ঘুমটাও জবর লেগেছে প্রিয়তার। নিষ্পাপ মুখখানা এখনো তেলে চিকচিক করছে।
খাট ছাড়িয়ে মেঝেতে ঝুলছে সকালের তেল চিটচিটে বেনুনী দুটো।
ঘুমের মধ্যেই আচমকা ঠোঁট কেঁপে উঠলো প্রিয়তার। শরীর জুড়ে তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেলো। অতঃপর,

“ভূত! শাকচুন্নি! পিশাচ! ব্রহ্মদিত্য! ও মা গো! ও বাবা গো! ও ভাইয়া গো! ও আপু গো! কই তোমরা? বাঁচাও আমায়! এ্যাঁ ঠান্ডা ভূত আমায় খেয়ে ফেললো।”
শীতের রাতে উদরে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে এসব বকতে বকতে ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলো প্রিয়তা।
সাথে সাথেই মুখ চেপে ধরলো প্রণয়। চাপা গলায় ধমকে উঠে বললো,
“একদম চুপ! মাঝরাতে এভাবে চিত্কার করে মানুষকে কী বুঝাতে চাস?”
প্রণয়ের কণ্ঠ শুনে চুপ হয়ে গেলো প্রিয়তা, তবে সকালের অত্যাচারের কথা মনে পড়তেই অভিমানে ফুলো ফুলো গাল দুটো আরও খানিক ফুলে উঠলো।

সামনের নির্দয় মানুষটার সাথে তার মত বাচ্চা মেয়ের কোন সম্পর্ক থাকতেই পারে না তাই এই মানুষটার সাথে একটাও কথা বলবে না এই শপথ নিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে শুয়ে পড়লো প্রিয়তা।
প্রিয়তাকে অভিমানে ফুলতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রণয়। টি-শার্ট সরিয়ে ঠান্ডা হাতটা উদরে চেপে ধরে ফের পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। সুরভিত ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বললো,
“অভিমান করলে কিন্তু তোকে দারুণ লাগে।”
ভীষণ আদর আদর পায়!
পুরুষালী স্পর্শে সারা শরীর ঝিন ঝিন করে উঠলো প্রিয়তার। প্রণয়ের কন্ঠে যেন ঘোর মাদকতার আভাস পেলো প্রিয়তা।

“কী হলো, চুপ করে আছিস কেন জান? আমার দিকে ফির, তোকে একটু মন ভরে দেখি।”
প্রিয়তা ঢোঁক গিললো। সে শরীরের কাঁপন সামলাতে পারছে না। বেহায়া শরীরটা বারবার কেঁপে কেঁপে নির্দয় পুরুষটাকে জানাচ্ছে সে শিহরিত হয় তার ছোঁয়ায়।
প্রণয় প্রিয়তাকে চেপে আরও কাছে নিয়ে এলো। দু’জনের দেহের দূরত্ব নেই এক চুল ও।
“জায়ায়ায়ায়ান”
প্রিয়তা এতো আদর উপেক্ষা করতে পারছে না তবু ও নিশ্চুপ থেকে ঘাপটি মেরে পড়ে রইল।
প্রিয়তার জবাব না পেয়ে অধৈর্য হলো প্রণয়। প্রিয়তার কাঁধের টি-শার্ট টেনে সরিয়ে শব্দ করে চুমু খেলো। অন্তর্বাসের চিকন কালো ফিতাটা টেনে ধরে জোরে টান দিলো। ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথেই ফরসা চামড়ায় শব্দ করে আঘাত আনলো ফিতাটা।
চোখ বন্ধ করে ব্লাঙ্কেট খামচে ধরল প্রিয়তা। ঠোঁট দিয়ে আপনা আপনি ব্যাথাতুর শব্দ বেরিয়ে গেল,
“উফ্ফ!”

আঘাত প্রাপ্ত স্থানে সময় নিয়ে চুমু খেলো প্রণয়,অবুঝ কণ্ঠে শুধালো,
“ব্যথা পেয়েছো জান?”
“আপনি যে ব্যথা না দিয়ে আদর দেন না এটা আমি বেশ জানি।”
ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসলো প্রণয়। মসৃণ কাঁধে গাল ঘষে দিয়ে বললো,
“বড়দের আদর ছোটদের জন্য বরাবরই কষ্টদায়ক হয় জান। এই আদরে ব্যথাটা প্রচুর। তো তুই ছোট হয় বড়দের আদর চাস কেনো?”
“আহ! আস্তে! আপনার দাড়িতে খোঁঁচা লাগে প্রণয় ভাই, ব্যথা পাই।”
“তাহলে আরও বেশি ব্যথা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছিস কেনো? আর কেনোই বা আমাকে বারবার সিডিউস করার চেষ্টা করিস।”

“সিরিয়াসলি জান! তোমাকে দেখলেই আমি সিডিউস হয়ে যাই। তুই এত নরম, এত সুন্দর, এত লোভনীয় যে নিজের পুরুষত্ব দমিয়ে রাখা খুব কষ্ট। তার উপর তুই যেগুলো করিস, তোকে কি করতে মন চায় বল।”
প্রিয়তার সমগ্র সত্তা কাটা দিয়ে উঠছে প্রণয়ের কথায়। এসব কী বলে এই লোকটা! উনার মতো দাদাম একটা ব্যাটা কে নাকি তার মতো বাচ্চা মেয়ে সিডিউস করার চেষ্টা করে? আস্তাগফিরুল্লাহ! সমাজ এটা মানবে?
“এই ফির এদিকে!”
প্রিয়তা ফিরলো না। আরও গুটিয়ে গেলো।
“প্রিন্সেস!”

“একদম আদরের লোভ দেখাবেন না। আমি মোটে ও লোভিত না। আপনি কী করেছেন আমি কিচ্ছু ভুলে যাইনি। রাতে আসবেন বলে মাঝরাতে এসেছেন, আর আমি মাথায় তেলের ড্রাম নিয়ে এখনো ঘুরছি।”
“আচ্ছা, সকালে ধুয়ে দেবো। এখন ফির আমার দিকে। আই নিড টু মেন্টাল পিস জান। আই’ম ক্রেভিং ফর ইউ।”
বদজাত লোকটার ওপর অভিমান করেও থাকতে পারে না প্রিয়তা। প্রণয় আর ধৈর্য ধরতে পারলো না। টেনে তাকে ঘুরিয়ে দিলো নিজের দিকে।
আঁধো আলো আঁধারিতেও প্রিয়তার মায়াময় মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে প্রণয়। বুকটা জুড়িয়ে যাচ্ছে প্রশান্তিতে। আহ! এই ছোট মেয়েটাতে এত সুখ কেন? এত মায়া মায়া লাগে না? এই মেয়েটার অভাব এত তীব্রতার সাথে পোড়ায় কেন? জানে না প্রণয়। শুধু জানে সবটুকু দিয়ে এই মেয়েটাকে আগলে রাখতে হবে।
প্রিয়তার ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো প্রণয়। সামনে পড়া চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে আহত কন্ঠে বললো,

“আমার সব সুখ তোর মাঝে। আমার সুখটুকু নিয়ে কখনো পালাস না জান। কখনো আমায় ভুল বুঝিস না। পুরো পৃথিবীর সবাই আমায় নিকৃষ্ট বলে ঘৃণা করলেও তোর চোখে আমি কখনো ঘৃণা দেখতে পারবো না। তোর মনে আমার জন্য ঘৃণা জন্ম নেওয়ার আগে তুই আমাকে শেষ করে দিস। এই দেখ এখানটায় তোর বাস, এখানে চোখ বন্ধ করে ছুরি চালিয়ে দিস তবু ও ঘৃণা করিস না।”
প্রিয়তার হাতটা টেনে বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরে কথাগুলো বলল প্রণয়।
হাসলো প্রিয়তা। প্রণয়ের দুই গালে হাত রেখে আত্মবিশ্বাসের সহিত বললো,
“আমার প্রণয় ভাই কখনো ভুল করতেই পারে না। স্বয়ং আল্লাহ্‌র ফেরেস্তা এসে বললেও একথা আমি বিশ্বাস করবো না। হি ইজ আ পারফেক্ট ম্যান অ্যান্ড অলসো আ পারফেক্ট হিউম্যান বিয়িং।”
জবাব শুনে প্রণয়ের হাসি মলিন হয়ে গেল। এসব নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে করলো না। শরীর এখন আরাম চায়।
প্রণয় নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে ক্লান্ত কন্ঠে বললো,

“অনেক বকবক করে ফেলেছিস। এখন তুই আমার বুকে আসবি নাকি আমি তোর বুকে যাবো?”
“কেনো? বুকে নিলে কী হবে?”
“আমার সব ক্লান্তিরা বিশ্রাম নিতে চায় জান। তোর গাঁয়ের গন্ধে ঘুমাতে চায়।”
প্রিয়তার ভীষণ মায়া লাগলো।
“আচ্ছা আসুন।” বলে দুই হাত মেলে দিলো প্রিয়তা।
বলতে দেরী কিন্তু প্রিয়তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরী হলো না প্রণয়ের। নিজের ভারী শরীরের সবটুকু ভার ছেড়ে দিলো প্রিয়তার ওপর। জড়িয়ে ধরে আবেশে নাক মুখ ডুবিয়ে দিলো প্রিয়তার বুকে।
প্রিয়তা হাঁ করে নিঃশ্বাস ফেলল। প্রণয়ের শরীরের ভারে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। তবুও বড্ড ভালো লাগছে এত সুখও বুঝি তার কপালে লেখা ছিল।
প্রিয়তা দুই হাতে আস্তে আস্তে প্রণয়ের চুল টেনে দিতে লাগলো। চওড়া কপালে নীচু হয়ে চুমু খেয়ে বললো,

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৫

“বয়সে তো বুড়ো হয়ে গেছেন, তাহলে কাজ কর্ম এমন বাবুদের মতো কেন?”
প্রণয়ের ঘুমু ঘুমু কন্ঠে জবাব দিলো,
“তোর জন্য।”
“হয়েছে, আর আদর দেখাতে হবে না। ঘুমান।”
প্রণয় আর কিছু শুনলোই না। তার পূর্বেই ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো। কত দিন পর আবারও হাই পাওয়ারের স্লিপিং পিলস ছাড়াই ঘুম এলো। এটাই বুঝি মানসিক সুখ।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৬ (২)

1 COMMENT

  1. ❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤
    Tank you so mach apu tara tari dewar jonno ajker episode ta kub valo laglo
    Porer porbo ta o tara tari diyen plz

Comments are closed.