Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৬

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৬

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৬
আরোবা চৌধুরী আরু

সায়মান সকলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে এগিয়ে আসলো,,
সায়মানকে দেখে, সাবিহা চমকে উঠে খুশির হাসি মুখে এনে আহ্লাদী গলায় বলে,
“সায়মান আব্বু! তুমি কবে এলে?”
কথা শেষ করেই সে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। সায়মানও এক হাত দিয়ে ওনাকে আগলে নিল।
সায়মানের চোখ যায় আফিয়া বেগমের পাশে দাঁড়ানো নাফিসার দিকে। মেয়েটা মাথা নিচু, চোখ দিয়ে নীরবে টপটপ করে পানি পড়ছে মেঝেতে। সেই দৃশ্য হঠাৎ সায়মানের বুকের ভেতর কেমন ধক করে তোলে, কিন্তু সেই কোমল অনুভূতির সাথে সাথে রাগও জমে ওঠে ভিতরে।
নাফিসার দিকে তাকিয়ে, গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে সে বলে ওঠে,

“এখনো রুমে যাওনি? এখানে কি করছো তুমি? ফ্রেশ হও, তাড়াতাড়ি। আজ থেকে তোমাকে রিশার সাথে টিচার পড়াতে আসবে।”
সায়মানের ধমক শুনে, নাফিসার সাথে ঘরে থাকা সবাই থমকে গেল । কারো মুখে কথা নেই। সাবিহা কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুশি হলেও সায়মানের এমন দৃঢ় আচরণ দেখে, যদিও কথাগুলো তার মনোমতো নয়।
সাবিহা খালেদ মিষ্টি ভঙ্গিতে আবার বলল,
“সায়মান আব্বু, তুমি এই মেয়েটাকে বাসায় তুলেছ কেন? জানো না, আজকালকার মানুষ যেন একদম ভালো না। কাউকে বিশ্বাস করা ঠিক না। তুমি অন্যের দুঃখ দেখে থাকতে পারো না, সেটা আমি জানি… কিন্তু তাই বলে মেয়েটাকে বাড়ি নিয়ে আসার কি দরকার ছিল? কোথাও একটা রেখে আসতে পারতে, কিংবা কোনো কাজে লাগিয়ে দিতে।”
সাবিহার কথায় আফিয়া বেগম তেতে উঠে রাগী সুরে বলল,,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“সাবিহা! ঠিকভাবে কথা বল।”
সাবিহা মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে, কিন্তু সেই সময় সায়মান আবার গলা চড়িয়ে আরো জোরে ধমক দিয়ে বলে ওঠে,
“তোমাকে এখানে দাঁড়াতে বলেছি নাকি আমি? আমি তো তোমাকে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে বলেছি! গো, ২ সেকেন্ডের মধ্যে তুমি রুমে যাবা।”
নাফিসা চমকে উঠে ব্যাগটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরে। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়, ধীরে ধীরে কিন্তু তাড়াহুড়ো মেশানো পায়ে উপরের তলায় নিজের রুমে চলে গেল ।
আফিয়া বেগম সায়মানের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“তুই মেয়েটাকে এভাবে ধমকালি কেন, তেহু?”
সায়মান এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। ঠোঁটের কোণে হালকা শক্তভাব রেখে চোখ ফিরিয়ে নিল।

সাবিহা চুপচাপ খালেদের দিকে তাকালো, ঠান্ডা গলায়, কিন্তু ভেতরে সূক্ষ্ম কটাক্ষ মিশিয়ে বলল,
“আমাদের বাড়িটা তো সবসময় হাসিখুশি, অতিথিপরায়ণ আর সবার জন্য খোলা ছিল… তাই না? ছোট্ট নিয়মটুকু ভুলে গেছি হয়তো আমরা। কাউকে বিশ্বাস করার আগে, আমাদের মন-মানসিকতা ও মানুষের সাথে কিভাবে ব্যবহার করব, সেদিকে খেয়াল রাখা বেশি প্রয়োজন আমি মনে করি। যেখানে পরিচিত মানুষদের বিশ্বাস করে ঠকে যাচ্ছে মানুষ প্রতিনিয়ত, সেখানে অপরিচিত মানুষের থেকে ঠকে যাওয়া বিষয়টা অবাক হওয়ার কিছুই নেই।”
সায়মান এক পলক সাবিহা খালেদের দিকে তাকালো। চোখে দেখে বোঝা যাচ্ছে সে কথাগুলোর আসল মানে বুঝেছে, কিন্তু মুখে কিছু বলল না।

সাবিহা খালেদ মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
বিলকিস আরা সায়মানের কথায় সন্তুষ্ট, তিনি কিছু বলবেন বলে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময় সায়মান কথাগুলো বলে দিল।
একটা পরিবারের সকলেই একরকম হয় না; ভিন্ন একজন থাকে। বিলকিস আরা নিজের মেয়ের ব্যবহারে বরাবরই হতাশ, তার মেয়েটা কেন এমন, সে ভাবতে থাকে। ছোটবেলা থেকেই অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ব্যবহারে খুব একটা কোনো পরিবর্তন আনা যায়নি। এগুলো ভেবে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
অন্যদিকে আফিয়া বেগম অনেক খুশি দেখাচ্ছেন, যার ছেলে কথার উত্তর দিয়েছে।
আফিয়া বেগম সায়মানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তেহু, জা ফ্রেশ হয়। আমি তোর খাবার রেডি করছি।”
রাইমা সাবিহা খালেদের দিকে তাকিয়ে, তার মার মুখ কালো দেখে হেসে দিল । তারপর সায়ামানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে,

“সায়মান ভাইয়ের দেখি এই মেয়েটার প্রতি দরদ উতলে পড়ছে।” মুখ ঘুরিয়ে নিল বেলই ।
সায়মান কোনো দিকে না তাকিয়ে, গম্ভীর মুখে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলো। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা রাইহান ও সায়মানকে দেখে একটি হাসি দিয়ে , সালাম দিল, এবং সামনে এগিয়ে এসে সায়মানকে জড়িয়ে ধরলো।
তারপর বললো,,

“কেমন আছো ভাইয়া?”
সায়মানও ওকে জড়িয়ে নিল।
রিদওয়ান দৌড়ে এসে একপাশ থেকে সায়মানকে জড়িয়ে ধরল।
“ভাইয়া! তোমার সাথে কতদিন পর দেখা!”
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রিশা আর রুহি ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। রিদওয়ান রিশার রুমে গল্প করছিল, দুজনের মধ্যে ভালোই বন্ধুত্বের ভাব; আর রুহি ও রাইহান তখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। হঠাৎ নিচ থেকে চিললানো শব্দ শুনে সবাই একসাথে সিঁড়ির দিকে নেমে আসে।
রাইমা ওদের দেখে পিছন পিছন এগিয়ে এসে একটু ন্যাকা সুরে বলল,,

“সায়মান ভাই, কেমন আছো? তুমি আমার সাথে তো কথা বললে না।”
সায়মান দুই ভাইকে আগলে নিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
“খেয়াল করিনি তোকে তখন। বড়দের সাথে কথা বলার সময় সালাম দিতে হয়, জানিস না?”
রাইমা মুখ কালো করে সালাম দিল। সায়মান উত্তর দিলো, তারপর দুই ভাইকে পাশে রেখে বলল,
“আমি বাইরে থেকে এসেছি। আগে ফ্রেশ হয়ে আসি, তারপর একসাথে বসে কথা হবে।”
বলেই সে নিজের রুমে চলে গেল।

নাফিসা ধীরে ধীরে রুমে প্রবেশ করল। দরজার পিছনে ঠোঁটের কোণে এক মৃদু কম্পন, চোখে আভাস মিশ্রিত। ব্যাগটা বেডের উপর রেখেই সে মুখ ঢেকে দুই হাত দিয়ে কুপিয়ে কান্না শুরু করল। নিঃশ্বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের জল ফোঁটা ফোঁটা মেঝেতে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল সব আবেগ এক সঙ্গে ঝরে পড়ছে।
তার অনেক খারাপ লাগছিল, সাবিহা খালেদ ঠিকই বলেছে, সে ভুল কিছু বলেনি। ও চাইনা ওর জন্য এই বাড়িতে কোন ঝামেলা হোক। ও তো সায়মানকে বলেছিল, ওর একটা কাজ খুঁজে দিতে, এ বাড়িতেও কতদিনই এভাবে থাকবে। ওর মনে পড়লো, সায়মানের সেই কঠোর ধমক, সেই তীক্ষ্ণ ভঙ্গি… সেটাই সবচেয়ে কষ্ট দিচ্ছিল।
মনের ভিতর এক অদ্ভুত চাপা অভিমান। সায়মানের প্রতি যে এক অজানা আবেগ, ভেতরে যে এক মৃদু রাগ আর ঘনিষ্ঠ আকর্ষণ মিশে আছে—সেটি হঠাৎ মাথার মধ্যে ঝড়ের মতো উড়ে বেড়াচ্ছিল। নিঃশ্বাস নিতেই বুকটা কেমন টাইট লাগছিল। ও সায়মানকে বলবে, ওকে একটা কাজ দেখে দিতে অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। ও কারো বাসায় বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। ওর ভাবনার মাঝেই,

হঠাৎ দরজার কাছে ছোট্ট শব্দ শুনতে পেল। তাকিয়ে দেখে, কেউ উঁকি দিচ্ছে। নাফিসার চোখ বড় হয়ে গেল। একজোড়া কৌতূহলী, ছোট্ট চোখের সাথে তার চোখের সংযোগ ঘটে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। তারপর সে মাথা একটু সরিয়ে নিল, যেন লজ্জা লুকাতে চাইছে।
নাফিসা চোখ মুছে, মৃদুস্বরে বলল, “কে ওখানে?”
হঠাৎ শুনতে পেল একটি ছোট্ট, মিষ্টি গলা—“এখানে কেউ নাই।”
নাফিসার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল। মৃদু মজা নিয়ে বলল, “এখানে কেউ নাই? আমি তো কারো কথা শুনতে পেলাম যে বলল এখানে কেউ নাই।”

এই সময় রাহিল ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকে বলল, “আমি বলেছি তো কথাটা।”
নাফিসার দিকে তাকিয়ে সে একটু হাসল, হাত দিয়ে ইশারা করে বলল কাছে আসার জন্য। রাহিল গুটিগুটি পায়ে নাফিসার দিকে এগিয়ে আসছে—ছোট্ট, গোলমোলু এবং কিউট। নাফিসার মনে হলো, এই প্রথম ওর সঙ্গে সত্যিই মিষ্টি বন্ধুত্বের সূচনা হচ্ছে।
নাফিসা তার গোলমোলু হাত দুটো ধরে বলল, “তোমার নাম বুঝি রাহিল?”
রাহিল চোখ বড় বড় করে তাকালো, একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমার নাম জানলে কিভাবে?”
নাফিসা হেসে বলল, “আমি জানি, রিশা আপু তোমার নাম আমাকে বলেছে।”
রাহিল একটু শান্ত হয়ে বলল, “ও আচ্ছা… বুঝেছি।”
নাফিসা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, “কি বুঝেছো?”
“এটা বুঝেছি, রিশা আপু আমার ব্যাপারে তোমাকে বলেছে। তাই তো?” আচ্ছা তুমি এখন থেকে আমাদের বাড়িতে থাকবে?

হঠাৎ নাফিসার মন কিছুটা খারাপ হয়ে গেল। তারপর মৃদু মুচকি হাসি বাঁচিয়ে রাহিলের দিকে তাকাল, “জানিনা… আমি জানি না আমি এখানেই কি থাকব।”
রাহিল হাত বাড়িয়ে বলল, “তুমি কি আমার বন্ধু হবে?”
নাফিসা হাসি দিয়ে তার হাত বাড়াল, “কেন নয়! এত গোলমোলু একটা বন্ধু আমারও দরকার।”
দুইজন এক ঝলক সময় শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে এবং হাসি দিয়ে কথা বলল। তারপর রাহিল নিচে চলে গেল। নাফিসা বেডের দিকে ফিরে, ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিয়ে ফ্রেশ হতে রুমে চলে গেল, মনে হালকা স্বস্তি ও নতুন বন্ধুত্বের আনন্দ নিয়ে।

বিকেলের আলো এখন ধীরে ধীরে স্টাডি রুমে ঢোচ্ছে। সূর্যের হালকা সোনালি রোদ জানালার কাচ দিয়ে নরমভাবে ভেতরে ঢুকে পড়ছে। বাতাসে এক ধরনের শান্তি এবং নরম গরম ভাব, যেন পড়াশোনার জন্য আদর্শ সময়। রুমের একপাশে নাফিসা বই হাতে বসে আছে, আর অন্য পাশে রিশা আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছে, তার মন পুরোপুরি পড়ার দিকে নয়, চোখে ঘ্রাণ মিশ্রিত অলসতা।
অবশেষে আকাশ রিশার দিকে তাকালো। তার চোখে ধরা পড়ল এক গভীর মনোযোগ, আর তার সুরে গম্ভীরতা—“পড়া দাও তোমার।”

রিশা চমকে উঠে বলল, “জি, স্যার! কি দিব? আমি কি?
তোমাকে যে পড়াটা কিছুক্ষণ আগে দিলাম, ওটা?”
রিশার মন যেন মুহূর্তেই মহা মুশকুলে পড়ে গেল। সে নিজেই ভাবল, “এই ব্যাটা ব্ল্যাক ডায়মন্ড—তার দিকে তো তাকাই না, যখন তাকাবে তখন শুধু বলবে—‘পড়া দাও, পড়া দাও।’”
নাফিসা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আজই তার প্রথমবার আকাশের সাথে দেখা। “আকাশ ভাইয়াকে দেখেই ভালো লাগেছে তার অনেক সুন্দর করে পড়া বুঝিয়ে দেয় ।”
রিশা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার, পড়াতে হয়নি।”
আকাশের চোখে ভ্রু একটু ভাঁজ হলো, “তোমাকে আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়ে গেছি। এবার পড়া না করলে আমি আন্টিকে গিয়ে বলবো।”

রিশা দ্রুত বলল, “সরি, স্যার! প্লিজ, এমন করবেন না। আমি এখনই পড়া করে দিচ্ছি।”
আকাশ সুর বাড়িয়ে বলল, “তোমার কাছে পাঁচ মিনিট আর আছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পড়া করে দাও, না হলে তোমার খবর আছে।”
রিশা হালকা গলায় বিড়বিড় করে গালি দিতে দিতে পড়া শুরু করল, মনে মনে ভাবল, “এই ব্যাটা কখন তার ভালোবাসা বুঝবে, আল্লাহ জানে।”
আকাশ, রিশার দিকে একটি দৃঢ় দৃষ্টি রাখল। চোখে মৃদু সতর্কতা, কিন্তু ভেতরে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। হঠাৎ সে কিছু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রুমের বিকেলের নরম আলো তার চোখে মিশে গেল, আর সেদিনের মুহূর্ত যেন সময়কে থামিয়ে দিল।

রাতে খাবারের সময়, খাবারের টেবিলের চারপাশে ধীর ধীরে আলো ফেলে যাচ্ছিল ল্যাম্পের কোমল সোনালি আলো। সাবিহা বেগম বারবার নাফিসার দিকে তাকাচ্ছিল, চোখে সেই গভীর, কিছুটা কৃষ্ণচক্ষুর মতো দৃষ্টি। নাফিসা নিজেকে জড়োসড়ো করে বসিয়েছিল, মনে হচ্ছিল যেন তার শরীরের প্রতিটি কোণেই অস্বস্তি মিশে আছে। সে কষ্ট করে খাবার শেষ করল, মুখে অল্প হাসি আর চোখে লুকানো ভয়।
বেগম এটা বুঝতেই, নাফিসার পাশে এসে হালকা করে তার কাঁধে হাত বুলিয়ে ভরসা দিলেন। “চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে,” মনে মনে বলছিলেন তিনি। সেই ছোট্ট স্পর্শে নাফিসার বুকের মধ্যে একটু শান্তি এসে ঠেকল, যেন অজান্তেই তিনি কিছুটা সাহস পেলেন।

সায়মান, অন্যদিকে, কারো দিকে চোখ তুলল না। সে নিজের মতো গভীরভাবে খাবার চালিয়ে যাচ্ছিল, মন একেবারেই অন্যখানে ভেসে বেড়াচ্ছিল। তার গম্ভীর ভঙ্গি, নিঃশব্দ উপস্থিতি টেবিলে এক ধরনের ভারাক্রান্ততা সৃষ্টি করছিল।
খাওয়া শেষ করে, বাড়ির ছোটরা সবাই দোতলার করিডোরে জড়ো হয়েছিল। সেখানে নানা আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা আর একেবারে চুপচাপ থাকা মুহূর্তের মিশ্রণ। বাতাসে ছিল বিকেলের ধীর আলো মিশে যাওয়া, আর কিছুটা খাওয়া-দাওয়ার স্বস্তি।
সায়ফান আজ সারাদিন বাড়িতে ছিল না। রাতে এসে, কোনো রকম ফ্রেশ হয়ে, সে খাবারের টেবিলে সকলের সাথে যোগ দিয়েছিল। এখন তার পরনে আছে থ্রি-কোয়াটার প্যান্ট আর , একটু ঢিলা টি-শার্ট। চুলগুলো এলোমেলো, যেন সারাদিনের ক্লান্তি আর হট্টগোলের ছাপ।

এসে ধপাস করে সে সোফার ওপরে শুয়ে পড়ল। একই সোফায় বসে ছিল রাইমা। সে তাকাল, দেখল রাইমা ফোনে ব্যস্ত। এক শয়তানি হাসি দিয়ে সায়ফান তার পায়ের ডগা দিয়ে রাইমাকেগুতো দিল,
“ওই… রাম ছাগল , তাড়াতাড়ি আমার পা টিপে দে,” সায়ফান খানিকটা হেসে, খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল। রাইমা একটু চটচটে মুখ নিয়ে তাকিয়ে থাকল, তারপর চোখ-মুখ কুঁচকে ঠোঁট তেড়ে বলল—“পারছিনা ভাইয়া!” বলার সাথেই, সায়ফান শক্ত করে পা দিয়ে গুতো দিল। রাইমা সঙ্গে সঙ্গে ধপাস করে নিচে পড়ে গেল, চিৎকার করে উঠল।
রুহি আশ্চর্য হয়ে চেঁচিয়ে বলল—“এইতো লেগেছে!” তারপর সাইফানের দিকে তাকিয়ে একটুখানি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—“একমটা কেন করলি?”

সায়ফান চোখ-মুখ কুঁচকে রুহির দিকে তাকাল। কিন্তু ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গি নিয়ে, কোনো উত্তর দিল না। শুধু একটি ছোট হাসি এবং অদ্ভুত ধীরভাবেই নিজের অবস্থায় অচল থেকেও রুমের মধ্যে একটি অদ্ভুত ভার বজায় রাখল।
রিদওয়ান, যে সব কিছু ঘনিষ্ঠভাবে দেখছিল, সাইফানের দিকে তাকিয়ে বলল—“ভাইয়া, ঠিক করেছ।”
সায়ফান হালকা হাইফাই ভঙ্গিতে, রিদওয়ানকে উত্তর দিল—“এই না হলে কি, আমার ভাই?”
রিশাও কিছু বলল না। সায়ফানের এই হঠাৎ কাজে সে একেবারেই সহমত, আর রাইমাকে সে তেমন পছন্দও করে না। নাফিসা, টেবিলের পাশে চুপচাপ বসে, সবাইকে তাকিয়ে দেখছে—সবার ছোটখাটো রাগ, হাসি আর দুষ্টুমি।
হঠাৎ করিডোরের দরজার প্রবেশ করল সায়মান ও রাইহান। রাইহান একরকম জোর করে সায়মানকে টেনে এনেছে। তাদের হাতে একটি সাথে রেডি ও আছে , যা সবার চোখ মুহূর্তেই তাদের দিকে ঘুরে গেল।
রাইহান গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে রুহির পাশে বসল। রুহি প্রথমে চমকে পাশে তাকালো, কিন্তু কিছু বলল না, চুপচাপ বসে থাকল।

সায়মান, তার গম্ভীর ভঙ্গি বজায় রেখেই, করিডোরের এক সাইডের সোফায় বসল। ধীরে ধীরে রেডির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো ,
সায়মান ভাইয়া একটা গান গাও প্লিজ রিশা হঠাৎ সায়মানের উদ্দেশ্য বলে উঠলো।
তাইফান হঠাৎ এক লাফ দিয়ে উঠে বসল। মুখে হালকা উচ্ছ্বাস, চোখে চঞ্চলতা, “ভালো কথা বলেছিস, শুটকি! যাই, একটা যা গিটার টা নিয়ে আয় ।”
রিশা ভেংচি কাটল, হাত দুটো হালকা করে কাঁপিয়ে বলল, “এই ধলা বিলাই, আইডিয়াটা আমি দিয়েছি, আর এখন এনে দেওয়ার দায়িত্বও তোমার! বুঝেছিস তো?”
সায়ফান ভ্রু কুঁচকে, একটু কঠোর ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল, “খুব বাড় বেড়েছিস তুই, তাই না? বুঝেছি, কোথা থেকে এসব শিখিস! আর হ্যাঁ, তুই আর ওই চশমা বেটির লগে মিশবি না। শুধু লোকের ইজ্জত ধরে টানাটানি করে ওই বেটি চশমা!”

রিশা কিছু বলতে উদ্যোগ নিতেই,
সায়মান হঠাৎ গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে ছুড়ে বলে উঠল, “হামবি তোরা!” মুহূর্তেই করিডোরে উপস্থিত সবাই চুপ হয়ে গেল, যেন হঠাৎ সময় থেমে গেছে।
রিদওয়ান, যে সব কিছু গভীরভাবে দেখছিল, দ্রুত দাঁড়াল এবং বলল, “আমি যাচ্ছি, গিটার নিয়ে আসি।”
রিদওয়ান যেন অপেক্ষাই করছিল—ঝটপট উঠে গেল, কোণার দিকে রাখা গিটারটা তুলে নিয়ে চলে এলো সায়মানের সামনে।

“এই নাও ভাইয়া, আজ আর পালিয়ে বাঁচবা না।” সে হেসে বললো।
মুহূর্তেই সবাই একসাথে সায়মানকে ঘিরে ফেলল।
রুহি, রিশা, আর রাইমা প্রায় একসাথে বলল,
“প্লিজ ভাইয়া, গান গাও! অনেকদিন তোমাকে গাইতে শোনা হয়নি।”
তাদের চোখে সেই শিশুসুলভ কাকুতি-মিনতি।
সায়মান “আগে গাইতো… এখন আর গান গায় না তার গিটার টা সাইফানকে দিয়ে দিয়েছে সাইফান ও গান গাইতে পারে কিন্তু, সায়মানের গানের গলা বেশি ভালো।”
কিসায়মান গম্ভীর মুখে বলল, বিরক্ত করবি না তোরা, তাতেই থামবে কে!
তারা আরও এগিয়ে এসে একসাথে, “প্লিজ প্লিজ ভাইয়া!” স্বরে এমন আন্তরিকতা যেন না বললে পৃথিবীই থেমে যাবে।

নাফিসা চুপচাপ এক কোণে বসে সব দেখছিল। ওর চোখে হালকা বিস্ময়,
সায়মান গান গাইতে পারে?
দৃষ্টিতে অজান্তেই কৌতূহল ঝিলিক মারল।
ঠিক তখন সাইফান উঠে গিয়ে সায়মানের পাশে বসে পড়ল।
“প্লিজ ভাইয়া…” বলে সে হঠাৎ সায়মানের পা টিপে দিতে শুরু করল।
তারপর রিদওয়ানের দিকে ঘুরে,

“এই বসে আছিস কেন? বড় ভাইয়ের হাতটাও টিপে দে তাড়াতাড়ি।”
রিদওয়ানও হেসে এগিয়ে এসে হাত টিপতে লাগল।
“ সায়মান এবার বিরক্ত হয়ে বলল তারপর গভীর গলায় ধমকে উঠল—
“ছাড় আমাকে, আমি গান গাইবো না। ফোর্স করবি না!”
এক মুহূর্তে ঘরে যেন নীরবতা নেমে এলো।
সাইফান আর রিদওয়ান ভয়ে ভয়ে পিছিয়ে গেল।
সবাইয়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে কালো ছায়া নেমে এল। হতাশ হয়ে সবাই আবার নিজেদের জায়গায় বসে পড়ল।
রাইহান ধীরে ধীরে বলল,

“ভাইয়া… প্লিজ একটা গান গাও। আর বলবো না।
দেখো, সবার মন খারাপ হয়ে গেছে।”
সায়মান দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
“আচ্ছা…”
শব্দটা শোনামাত্র যেন ঘরে নতুন আলো জ্বলে উঠল। সবাই চিৎকার করে আনন্দে লাফিয়ে উঠল।সাইফান হঠাৎ দুষ্টুমি করে রিশা আর রাইমার মাথার ফাঁকে নিজের দুই হাত ঢুকিয়ে ওদের মাথায় ভর দিল। দুইজন চেঁচিয়ে উঠল
“আআআহ!
রাইহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“এই, ফাজলামো বাদ দে। ভাইয়ার হাতে গিটার দে।”
সায়ফান ওদের ছেড়ে দিয়ে, চুপচাপ গিয়ে বসে পরলো, আর ওরা দুই জন সাইফানের দিকে আগুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো ।

রিদওয়ান গিটারটা সায়মানের হাতে দিল।
ঘরে সবাই নীরবে বসে পড়ল।
চোখগুলো যেন অদৃশ্য সূতার মতো টেনে নিয়ে গেল সায়মানের দিকে।
রাইহান হঠাৎ রুহির হাত চেপে ধরল।
রুহি চমকে তাকাল তার দিকে, তারপর চারদিকে একবার দেখে নিল—সবাই সায়মানের দিকে ব্যস্ত।
রাইহান যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে সায়মানের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু হাত ছাড়েনি।
রুহির গাল হালকা লাল হয়ে গেল, চোখ সরিয়ে আবার সায়মানের দিকে তাকাল।
সায়মান আলতো করে দু-একটা সুর বাজাল।

গিটারের নরম তারের শব্দে ঘরে এক ধরনের মায়াবী নীরবতা নেমে এলো।
তারপর সে চোখ তুলল—নাফিসার দিকে।নাফিসাও তাকিয়েছিল তার দিকেই।দুই জোড়া চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল। সায়মানের চোখে তীক্ষ্ণতা, আর নাফিসার মনে যেন হঠাৎ ঢেউ তুলল সেই দৃষ্টি।
তার বুকের ভেতর ঢক ঢক শব্দ যেন নিজের কানেই শোনা যাচ্ছিল।
সবাই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে শুনতে লাগল, যেন সময় থমকে গেছে।
সায়মান গভীর শ্বাস নিল।
তারপর সুরের সাথে মিলিয়ে গাইতে শুরু করল—
তার কণ্ঠে ভরাট উষ্ণতা, যেন প্রতিটি শব্দ ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে মিশে যাচ্ছে। নাফসের দিকে একটি দৃষ্টিতে তাকিয়ে,

অবাক চাঁদের আলোয় দেখো
ভেসে যায় আমাদের পৃথিবী
আড়াল হতে দেখেছি তোমার
নিষ্পাপ মুখখানি
ডুবেছি আমি তোমার চোখের অনন্ত মায়ায়
বুঝিনি কভু সেই মায়া তো আমার তরে নয়
ভুলগুলো জমিয়ে রেখে বুকের মণিকোঠায়
আপন মনের আড়াল থেকে
ভালবাসবো তোমায়, ভালবাসবো তোমায়
তোমার চিরচেনা পথের ঐ সীমা ছাড়িয়ে
এই প্রেম বুকে ধরে আমি হয়তো যাবো হারিয়ে
চোখের গভীরে তবু মিছে ইচ্ছে জড়িয়ে
একবার শুধু একটিবার হাতটা দাও বাড়িয়ে
ডাকবেনা তুমি আমায় জানি কোনোদিন
তবু প্রার্থনা তোমার জন্য
হবেনা মলিন, হবেঃ না মলিন
হাজার বছর এমনি করে
তার গলার গভীর, উষ্ণ কণ্ঠ ধীরে ধীরে ঘর ভরিয়ে দিল।
প্রথম কয়েকটা লাইনেই যেন সবাই স্থির হয়ে গেল—কারো মুখে হাসি নেই, আবার বিষাদও নেই—শুধু এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।
রুহি রাইহানের হাত এখনও অনুভব করছিল।
তার বুকের ভেতরেও যেন সুরের সাথে সাথে অজানা কিছু নড়েচড়ে উঠছিল।
কিন্তু চারদিকে কেউ খেয়াল করছে না জেনে ওর মনে একধরনের নিরাপত্তা, আবার একধরনের অস্বস্তিও কাজ করছিল।

রাইহানও চুপচাপ বসে, চোখ সায়মানের দিকে রেখেছে, কিন্তু হাতের চাপটা ঠিকই ধরে রেখেছে—যেন সে বুঝিয়ে দিচ্ছে, আমি এখানে আছি।
রিশা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সায়মানের দিকে। ব্ল্যাক ডায়মন্ড কে অনুভব করছে মনে মনে।
সাইফান, যিনি একটু আগেও দুষ্টুমি করছিলেন, এখন একদম চুপ—গানের প্রতিটি লাইনে মাথা আস্তে আস্তে দুলছে।
নাফিসা—সে যেন সময় ভুলে গেছে।
গানের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সুর তার ভেতরে ঢুকে গভীরে কোথাও নরম কিছু ছুঁয়ে দিচ্ছে।
সায়মানের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এখনও তার মনে রয়ে গেছে।
কখনও সে চোখ নামিয়ে নিচ্ছে, আবার পরের মুহূর্তেই অজান্তে তাকিয়ে ফেলছে তার দিকে।
নিজের হৃদস্পন্দন সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে—ঢক ঢক… ঢক ঢক—সুরের সাথে যেন তাল মিলিয়ে বাজছে।
গানের মাঝপথে সায়মান হালকা চোখ বন্ধ করল, নিঃশ্বাস টেনে নিল।

তার বুক ওঠানামা করছে ধীর ছন্দে—প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন মাইক্রোফোন ছাড়া করেও সবাই শুনতে পাচ্ছে।
তারপর চোখ খুলে আবার সুরে ফিরল, এবার কণ্ঠে যেন একটু বেশি গভীরতা, একধরনের আবেগের ভার।
রিদওয়ান এক কোণে হেলান দিয়ে বসে, ঠোঁটে হালকা হাসি—মনে মনে গর্ব করছে বড় ভাইয়ের জন্য।
রাইমা হাতের আঙুল গুটিয়ে নিজের হাঁটুর উপর রেখেছে, তার চোখে যেন গানটা গল্প হয়ে বয়ে যাচ্ছে।
শেষ লাইনগুলো গাইতে গাইতে সায়মানের কণ্ঠ ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো—যেন এক ফিসফিসানি।
আকাশের চাঁদটা আলো দেবে
আমার পাশে ক্লান্ত ছায়া
আজীবন রয়ে যাবে
তবু এই অসহায় আমি

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৫

তারপর শেষ সুরটা গিটারে টেনে আঙুল থামিয়ে দিল।
ঘরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদম নীরবতা—
শুধু সবার নিঃশ্বাস আর বুকের ধুকপুক শব্দ।
তারপর হঠাৎ করতালিতে ঘর ভরে গেল।
রুহি ধীরে ধীরে হাত ছাড়িয়ে নিল, কিন্তু মুখে হাসি লুকাতে পারল না।
নাফিসা একবার চোখ নামিয়ে আবার চুপচাপ……….

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৭