Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৭

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৭

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৭
আরোবা চৌধুরী আরু

সায়মান গিটারটা ধীরে একপাশে রাখল। চোখের কোণ দিয়ে একবার নাফিসার দিকে তাকাল, তারপর গম্ভীর সুরে বলল—
— “অনেক রাত হয়ে গেছে। যার যার রুমে যা।”
সাইফান সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল—
— “ভাইয়া! কী বল ? এখনই তো এসে বসলাম। আর একটু বসি না।”
সায়মান চোখ কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল সাইফানের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশটা থমথমে হয়ে উঠল।
সাইফান দাঁত কেলিয়ে হেসে, আবার সবার দিকে ঘুরে বলল—

— “এই তোরা এত রাত জেগে কী করছিস? এখানে বসে গল্পের শেষ নেই। তাড়াতাড়ি যা, এত রাত জাগা ভালো না!”
যেন এতক্ষণ সে কিছুই বলেনি, উল্টো অন্যদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে এমন ভঙ্গি।
রিশা মুখ ঘুরিয়ে নিল বিরক্ত হয়ে।
ঠিক তখনই ট্রিন ট্রিন করে সাইফানের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল— রুশনা আপি ভিডিও কল করছে।
সাইফানের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, সাথে সাথে রিসিভ করল।
— “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ!”
একটা টানা, ভরাট কণ্ঠে সালাম দিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলে উঠল—

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— “কেমন আছো আপি?”
রুশনা হেসে উত্তর দিলেন,
— “ওয়ালাইকুম আসসালাম… তোর খবর আছে? তোর কোনো খোঁজ থাকে না কেন রে? এখন জানতে এসেছিস কেমন আছি? পাজি কোথাকার! আমি না ফোন দিলে তোরা ফোনই করিস না!”
এবার হঠাৎ যেন ঝড় বইল সাইফানের চারপাশে।
রিশা চেয়ার থেকে উঠে এসে তার কাঁধে ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল।
রুহি ঠিক পাশে এসে দাঁড়িয়ে মাথার ওপর এক হাত রাখল, স্ক্রিনে তাকিয়ে হেসে বলল—
— “আসসালামু আলাইকুম আপি!”

রিদওয়ান সাইফানের ডানদিকে এসে দাঁড়াল, অর্ধেকটা শরীর একেবারে তার ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে পড়েছে।
রাইহান আবার বাম দিক থেকে হাত দিয়ে টেনে ধরল সাইফানের কাঁধ, আরেকপাশ থেকে মুখ বার করে ক্যামেরার সামনে হেসে দাঁড়িয়ে গেল।
এক মুহূর্তেই পুরো ফ্রেম ভরে গেলো সবাইকে নিয়ে—
কেউ মাথার ওপর হাত রেখে, কেউ কাঁধের ওপর ভর দিয়ে, কেউ আবার উল্টোদিক থেকে মুখ বের করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এক স্ক্রিনে সবাই ভিড় জমিয়েছে।
রুশনা হেসে উঠলেন—

— “আহা! এতগুলো মুখ! একসাথে তোমাদের দেখে মনটা ভরে গেল।”
সাইফান চিৎকার দিয়ে উঠল—
— “ভাইরে ভাই! আমি তো ভর্তা হয়ে গেলাম! তোরা সররে!”
তার চিৎকার শুনে সবাই হেসে গিয়ে একসাইডে সরে দাঁড়াল।
সাইফান তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে সেন্টার টেবিলের ( ওপর রাখল। একটা শোপিসের সাথে ফোনটা কাত করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল—
— “এইবার নে! সবাই মিলে কথা বল!”
ফোনটা টেবিলে রাখতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল চারপাশে।
কেউ পিছনের সোফায় হেলান দিয়ে বসল, কেউ টেবিলের চারপাশে ফ্লোরে বসে গেল। কেউবা আবার সোজা ফোনের সামনে হেঁটে এসে বসে পড়ল, যেন একদম ঝাঁক বেঁধে সবাই ভিডিও কলে হাজির।
রুশনা হেসে বললেন—

— “আচ্ছা, আচ্ছা… সবাই একসাথে! আচ্ছা বলো দেখি, কে কেমন আছে?”
তারপর এক এক করে সবাইকে নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন, আর যার নাম আসে সে সামনে ঝুঁকে উত্তর দিচ্ছে।
এদিকে নাফিসা এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। ও শুধু ওদের হাসি-আনন্দ, ঝগড়া-মশকরা দেখে যাচ্ছে নিঃশব্দে।
কিন্তু সায়মান… সে বসে আছে, আর হা করে একটানা নাফিসার দিকেই তাকিয়ে আছে।
তার সেই দৃষ্টি ধরল রাইমা।
প্রথমে অবাক হয়ে সায়মানের দিকে তাকাল, তারপর সায়মান যে দিকে তাকিয়ে আছে, সেদিক অনুসরণ করে তাকাতেই দেখে—নাফিসা।
রাইমার চোখ কুটিল ভঙ্গিতে চিকচিক করে উঠল।
সে মুখ বেঁকিয়ে, দাঁত চেপে, এমনভাবে নাফিসার দিকে তাকাল যেন দৃষ্টিতে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।
হঠাৎ রুশনার কণ্ঠ শোনা গেল ফোনের ভেতর থেকে—

— “শোন, আমি একটা প্ল্যান করেছি। অনেকদিন তো কোথাও ঘোরা হয় না! সামনে গরমের ছুটি আছে, আমি হসপিটাল থেকেও ছুটি নিয়ে নিচ্ছি। তোরা সবাই তোর কাজকর্ম বাদ দিয়ে চল খুলনায় যাই। কয়েকদিন ঘুরে আসি। আব্বুও অনেকদিন ধরে বলছে।”
মুহূর্তেই চারপাশে হইহই করে উঠল সবাই।
— “ওই হ্যাঁ! দারুণ হবে!”
— “খুলনা! ইয়েস!”
তাদের সেই উচ্ছ্বাসেই সায়মানের ধ্যান ভাঙল।
সে হঠাৎ টের পেল, এতক্ষণ সে শুধু নাফিসার দিকেই তাকিয়ে ছিল! ভাবতেই নিজেই চমকে উঠল। আর কোনোদিকে না তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

— “চলো রেডি।”
বলে ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। রেডি লেজ নাড়াতে নাড়াতে তার পিছু পিছু চলে গেল।
ওদিকে রাইমারও ধ্যান ভাঙল সেই চিৎকার-চেঁচামেচিতে। কিন্তু কারো দিকে না তাকিয়ে, মুখটা গম্ভীর করে, নাফিসার দিকে হালকা একটা মুখ ভেংচি দিল।
— “উফ! এসব আদিখ্যেতা আমার একদম সহ্য হয় না!”
বলে গজগজ করতে করতে নিজের রুমের দিকে চলেগেল।
রুশনা আবার ফোনের ওপাশ থেকে হাসতে হাসতে বলল,
— “কিন্তু একটা ব্যাপার হচ্ছে… সায়মানকে রাজি করানোর দায়িত্ব তোদের।”
তার কথার সাথে সাথে সবার মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। কিছুক্ষণ আগের উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই ঠাণ্ডা হয়ে এল।
সাইফান হাত নেড়ে বলে উঠল,

— “আহ! ভাইয়া যাবে না। ভাইয়ার পিছনে লেগে থাকা মানেই সময় নষ্ট।”
রুশনা ভ্রু কুঁচকে দৃঢ় গলায় বললো,
— “আমি জানি না তোরা কীভাবে রাজি করাবি, কিন্তু ওকে নিয়েই চলতে হবে। আমার শর্ত এটুকুই।”
রিশা চোখ ঘুরিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ ভেবে হঠাৎ প্রস্তাব দিল,
— “বড় আম্মুকে দিয়ে রাজি করানো যায় না? উনি বললে ভাইয়া হয়তো মানবে।”
তারপর কৌতূহলী ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল পাশেরজনকে—
— “কি রে, ট্রাই করব নাকি একবার?”

প্রশ্নটা চারদিকে ঘুরে বেড়াল, কেউ মাথা নাড়ল, কেউ আবার চুপচাপ বসে থাকল। শেষমেশ আলোচনা গুটিয়ে এলো, আরেকটু হেসে-ঠাট্টা করেই সবাই এক এক করে যে যার রুমে চলে গেল।
সবাই সরে গেলেও নাফিসা দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে যেন দ্বিধার ছায়া, ঠোঁট কামড়ে বুকের ভেতর এক অজানা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
রিশার থেকে শুনে নিয়েছে — সায়মানের রুমটা কোনদিকে।
নিজের রুমের দিকে না গিয়ে ধীরে ধীরে সায়মানের রুমের দিকে পা বাড়াল।
প্রতিটা পদক্ষেপে বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন আরও জোরে শোনা যাচ্ছিল। হাতের তালু ঘেমে উঠছে, হাঁটুগুলো কেঁপে উঠছে সামান্য।
অবশেষে দরজার সামনে এসে থেমে গেল।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিল।
তারপর কাঁপা হাতে ধীরে ধীরে হাত তুলে নক করল দরজায়…
ওপাশ থেকে সাথে সাথেই উত্তর এল,

— “কাম ইন।”
দরজা নক করার সাথে সাথেই জবাব পেয়ে নাফিসা অবাক হয়ে গেল। যেন সে আগেই জানত নাফিসা আসবে।
এক মুহূর্ত দ্বিধায় থমকে দাঁড়াল,
রুমে নরম আলো জ্বলছে, পর্দার ফাঁক দিয়ে হালকা চাঁদের আলো এসে মিশে গেছে। টেবিলের পাশে সায়মান বসে আছে, গা হেলিয়ে একরকম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন কিছুই অপ্রত্যাশিত নয়।
ওই এভাবেই বসে পিছনের দিকে না তাকিয়ে , গম্ভীর সুরে বলল—
— “এসো।”

সায়মান কীভাবে বুঝল যে সে এসেছে—বিষয়টা যতভাবছে তো অবাক হয়ে যাচ্ছে নাফিসা।
ধীরে ধীরে রুমে প্রবেশ করার পরপরই একটা বিশেষ গন্ধ তার নাকে এসে লাগল। গন্ধটা এত পরিচিত, মনে হলো যেন বহুদিন ধরে নিজের ভেতরে মিশিয়ে রেখেছে। হ্যাঁ, এটাই সেই গন্ধ—যখনই সায়মান তার আশেপাশে আসে, তখনই সে এই গন্ধটা টের পায়।
মাথা তুলে তাকাতেই দেখে সায়মান এখনো চেয়ার ঘুরিয়ে উল্টো হয়ে বসে আছে। সে একবারও নাফিসার দিকে তাকায়নি।
নাফিসা চোখ সরিয়ে চারপাশে তাকাল। মুহূর্তেই বিস্ময় ভর করল তাকে।
রুমটা বিশাল, যেন নাফিসা যে রুমে থাকে তার থেকেও বড়। একদিকের পুরো দেয়ালজুড়ে সারি সারি বই সাজানো—অসংখ্য বইয়ে ভর্তি এক বিশাল বুকশেলফ। আরেক কোণায় একটা দরজা, দেখে মনে হচ্ছে আরও একটা ঘরে যাওয়ার পথ।
চারপাশে নীরব আলো, আসবাবপত্রে এক ধরনের গম্ভীর শৃঙ্খলা। নাফিসা বিস্ময়ে চারিদিক দেখছে, অবাক হয়ে প্রতিটা জিনিস লক্ষ্য করছে।
হঠাৎ পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল নাফিসা।

— “Any problem? কেন এসেছ? বল।”
সায়মান ঠান্ডা গলায় বলে উঠল, তারপর ধীরে ধীরে তার চেয়ারের দিক ঘুরিয়ে নাফিসার দিকে তাকাল।
কণ্ঠস্বরের ভার আর দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা নাফিসার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে অস্থিরভাবে মাথা নিচু করে নিল, হাত দুটো বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীরের প্রতিটি ভঙ্গিমায় অস্বস্তি আর লজ্জার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সায়মান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল নাফিসার দিকে। তার চোখ যেন ভেদ করে যাচ্ছিল নাফিসার ভেতরটা। নীরবতা ভারি হয়ে উঠল চারপাশে—কেবল দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ কানে আসছিল।
অবশেষে অনেকটা সাহস জোগাড় করে, থেমে থেমে, ভাঙা ভাঙা স্বরে নাফিসা বলল—

— “আমার… আপনার সাথে… ক-কিছু কথা বলার আছে।”
কথাটা বলতে গিয়ে যেন জিভ জড়িয়ে গেল, গলা শুকিয়ে এল। শব্দগুলো বের হলো তোতলাতে তোতলাতে, তবুও বুকের গভীর থেকে সাহস সঞ্চয় করে এগুলো বলল সে।
নাফিসার তোতলানো কণ্ঠস্বর ঘরে গড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো মিশে ছিল টেবিল ল্যাম্পের হলদে আলোয়, ঘরটা যেন এক অদ্ভুত নীরব আবেশে ঢেকে গেল। হালকা বাতাসে পর্দা দুলে উঠে একবার নাফিসার গালে ছুঁয়ে আবার মিলিয়ে গেল।
সেই আবহে ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল সায়মান। ভারী ভঙ্গিতে এক পা, তারপর আরেক পা—অল্প অল্প করে এগিয়ে এল নাফিসার দিকে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন কাঠের মেঝে হালকা শব্দ তুলে চারপাশের নীরবতাকে আরও তীব্র করে তুলল।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এসে দাঁড়াল নাফিসার একেবারে সামনে। নাফিসার মনে হলো, চারপাশের আলো-হাওয়া সবকিছু এক মুহূর্তে থেমে গেছে। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা স্পষ্ট টের পাচ্ছিল নাফিসা। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ এতটাই জোরে হচ্ছিল, যেন তা বাইরে বেরিয়ে আসবে।
সায়মান কোনো কথা বলল না, শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। আর সেই নীরব দৃষ্টি, সেই আবহ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন থেমে যাওয়া সময়ের মতো স্থির হয়ে থাকল।
সায়মান দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে নাফিসার দিকে খানিকটা ঝুকে এল, ভুরু দুটো নাচিয়ে বলল নিচু গলায়,

— “এবার বল, কি বলতে এসছো?”
হঠাৎ এতটা কাছে চলে আসায় নাফিসার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। চারপাশ যেন থমকে গেল এক মুহূর্তে। সে অস্থিরভাবে চোখ নামিয়ে নিল, মাথাটা নিচু করে রাখল, কিন্তু তাতেও যেন রক্ষা নেই। সায়মানের গরম নিঃশ্বাস তার মুখের উপর ছুঁয়ে যাচ্ছে, একেকটা হাওয়ার ঢেউ গালে এসে লাগছে।
নাফিসার মনে হলো বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনটা যেন বাইরে বের হয়ে আসবে। কানে কানে বাজতে লাগল শুধু ধুকপুক শব্দ। ঠোঁট শুকিয়ে গেল, হাতের তালু ভিজে উঠল ঘামে। সে বোঝে না—এটাকে ভয় বলবে, লজ্জা বলবে, নাকি এক অচেনা টান?

এক মুহূর্তে মনে হলো, সায়মান যদি আরেকটু ঝুঁকে আসে তবে সে হয়তো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে, কথার জাল গুলিয়ে ফেলবে, কিংবা না বলেই ফাঁস করে দেবে বুকের গোপন কথা।
নাফিসা কেবল নিজের মাথাটা নিচু করে রাখল, চোয়াল কেঁপে উঠল হালকা। চোখে জল আসতে চাইছে অথচ হাসির মতোও এক অদ্ভুত কাঁপন জমে আছে ভেতরে। সায়মানের এতটা কাছাকাছি আসা যেন তাকে একইসাথে শ্বাসরুদ্ধ আর নিরাপদ অনুভূতি দিচ্ছে।
সায়মান ধীরে নাফিসার থেকে একটু সরে দাঁড়াল। নাফিসা অস্থির চোখে তাকাল, মাথা উঁচু করে দেখল সে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসের নরম ছোঁয়া আর হালকা আলোয় তার বুকের ধুকপুক স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কণ্ঠ কেঁপে নাফিসা বলল,

— “আমি এই বাড়িতে থাকতে চাই না… আমার জন্য কোনো ঝামেলা হোক আমি চাই না। আমার একটা কাজ দেখে দিবেন প্লিজ…”
চোখে পানি টপটপ করে পড়তে শুরু করল, প্রতিটি শব্দ যেন কণ্ঠের ভেতর আটকে গেছে। সে কিছুতেই যেতে চায় না, নিঃশব্দে হাত মুছে নিজের সাহস জোগাচ্ছিল।
সায়মান ধীরে তার দিকে তাকাল, চোখে গভীর মনোযোগ, মুখে অল্প স্বচ্ছন্দ্য। শান্ত সুরে বলল,
— “আমি আগেও বলেছি, আমার বেশি কথা পছন্দ না।”
নাফিসা কিছু বলতে গেলে, হঠাৎ সায়মানের তীক্ষ্ণ ধমক থামিয়ে দিল তার শব্দ।

— “আর একটা কথা শুনতে চাই না। পড়াশোনার দিকে ফোকাস কর। অন্য সব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো।”
নাফিসা চমকে উঠল, বুকের ধুকপুক আরও বেড়ে গেল। চোখ বড় করে তাকাল, কিছুই বলতে পারল না।
সায়মান আবার ধমক দিয়ে বলল,
— “Go to your রুম. Right now।”
নাফিসা হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর কোনো দিকে তাকানো ছাড়াই দ্রুত পা বাড়াল। মৃদু ছেঁড়ে পড়া চাঁদের আলো তার পথ আলোকিত করছিল, কিন্তু সে শুধু নিজের রুমের দিকে দৌড়ে চলল, প্রতিটি ধাপের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছিল আশঙ্কা আর অস্থিরতা।

সায়মান নাফিসার যাওয়ার দিকে একবার ধীরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। চোখে অজানা এক ভারমিশ্রিত অনুভূতি—হঠাৎ বুকের ভেতর যেন ব্যথা ছুঁয়ে গেছে। সে নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখল, যেন এই ক্ষণিকের অস্থিরতা বাইরে বের না হতে পারে। মৃদু কিন্তু তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে, যেন তার ভিতরের শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ ফুটে ওঠে।
অন্যদিকে নাফিসা রুমে ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই বেডের ওপর বসে পড়ল, পেছনের দেওয়ালে পিঠ ঠেসে। শরীর কেঁপে উঠছে, চোখে জল জমে আছে, আর নিঃশ্বাস জোরে জোরে বের হচ্ছে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে, সায়মানের দিকে থাকা অভিমানের ছাপও আরও জোরে ধরা দিচ্ছে। সে মনে মনে বলছে—এই লোক! খালি ওকে ধমক দিয়ে, কোনো দিকের কোমলতা নেই।

বেডের পাঁজরের ওপর হাত রেখে সে গভীর নিঃশ্বাস নিল, চোখ বন্ধ করে নিজের অনুভূতি সঞ্চয় করার চেষ্টা করল। তবুও মনে হচ্ছে, সায়মানের কণ্ঠের তীক্ষ্ণতা, তার ধমক, এই মুহূর্তেও সঙ্গী হয়ে আছে। নাফিসা নিজের মনে ছোট্ট গলায় বলল, “এই লোকটা কেন সবসময় এভাবে…?” কিন্তু সেই অভিমান আর অস্থিরতাও যেন অদ্ভুতভাবে তার হৃদয়কে আরও কাছে টেনে আনে।

পরের দিন, ক্যান্টিনে টিফিন টাইম। সোনালি বিকেলের আলো বড় বড় জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসছে, যার সঙ্গে মিলিয়ে আসে কাচের ওপর হালকা ছায়া। ছোট ছোট টেবিলগুলো ভর্তি, ছাত্রছাত্রীদের চিৎকার-চেঁচামেচা আর হাসির শব্দ যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। টেবিলের ওপর ছড়ানো রয়েছে হালকা খাবারের বক্স, প্লাস্টিকের বোতল আর কিছু খোসা খাওয়া স্যান্ডউইচ।
এক পাশে বসে আছে মেহরাব, মেহেরিন, নাফিসা, জারিন, রিশা, রিদওয়ান। তারা সবাই এক গোষ্ঠীতে মিশে আছে, সিনিয়র জুনিয়র মিলিয়ে একটি টিম বানিয়েছে। সবাই খেতে খেতে একে অপরের গল্প শোনাচ্ছে। নাফিসার চোখে হাসি, তবে কানে-কানে তার মনোযোগ চারপাশের চঞ্চলতা ও বন্ধুদের কথায় ছড়িয়ে গেছে।
হঠাৎ টেবিলের পাশে থেমে আসে আওয়াজ। কিছু ছেলে-মেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, তাদের পদচারণার শব্দ কানের কাছে ক্লিক-ক্লিক করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন ছেলে, চোখে একটু চাহিদার ছাপ, আঙ্গুল উঁচিয়ে নাফিসার দিকে নির্দেশ করে—

— ” দাঁড়াও!”
মুহূর্তেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। হাসি-আনন্দ থেমে যায়। নাফিসা ভীত চোখে তাকায়, হাত দুটো জড়োসড়ো করে নিজের পায়ের কাছে আঁকড়ে ধরে। রিশার দিকে তাকায়,
রিদওয়ান তার দৃষ্টিতে সতর্কতা নিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “রিয়াদ, কি প্রবলেম আমাকে বল।”
রিয়াদ, হালকা হাসি দিয়ে বলল—
— “এই মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে।”
সবাই চোখ মেলে তাকালো। জারিন অবাক হয়ে প্রশ্ন করল—
— “সবার কি , তোর মত ভাবিস ? ও পিচ্চি ওর দিকে চোখও তুলে তাকাবি না।”
মেহরাব তার কণ্ঠে দৃঢ়তা এনে বলল—

— “আপনারা সিনিয়র, আমার তাই ভদ্র ভাবে বলছি, এখান থেকে যান।”
রিয়াদ ও তার বন্ধুরা হাসতে হাসতে শুরু করল একে অপরের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ রিয়াদ নাফিসার হাত চেপে ধরল। নাফিসা চমকে উঠল, মেহরিনও পাশে এসে তার হাত শক্ত করে ধরে রক্ষা করতে চায়। নাফিসা চেষ্টা করে হাত ছাড়াতে, কিন্তু রিয়াদ বলল—
— “আজ থেকে তুমি আমার গার্লফ্রেন্ড, বুঝেছ?রিয়াদ যা বলে , তাই হবে।”
রিশা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। রাগে তার চোখ জ্বলে উঠল। নাফিসার হাত ধরার সঙ্গে সঙ্গে সে আগুনের মতো সামনে ঝাপিয়ে পড়ল, দুই হাত দিয়ে বাড়ি মারল রিয়াদের দিকে।
মেহরাব সাথে সাথে রিয়াদের মুখে একটি ঘুসি মারল। রিয়াদ অবাক হয়ে হাত মুখে নিয়ে তাকাল—

— “এইতো সাহস কি করে হলো আমার গায়ে হাত দেওয়ার?”
রিশা চেঁচিয়ে বলল—
— “তোর যেমন সাহস হলো, ওর হাত ধরার !”
হঠাৎ রিয়াদ মেহরাবকে আঘাত করল। রিদওয়ান এগিয়ে গেলে, রিয়াদের সঙ্গে থাকা ছেলেরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। একে একে হাতাহাতি, ঘুসি-ঠেস। জারিন এক ছেলের চুল ধরে ঘুরাচ্ছে, রিসা পাশ থেকে পানির বোতল দিয়ে অন্য ছেলের পেছনে আঘাত করছে।
মেহরিন নাফিসার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, ভয়ে কাঁপছে। রিয়াদের সঙ্গে থাকা একটি মেয়ে নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল—

— “তুই হচ্ছে যত নষ্টের গোড়া, তোর জন্য এখানে ঝামেলা।”
মেহরিন ফুঁসে উঠল—
— “মুখ সামলায়ে কথা বল!”
নাফিসা হঠাৎ লক্ষ্য করল রিয়াদ হাতে কাচের স্প্রাইট বোতল তুলে মেহরাবের মাথার দিকে আঘাত করতে চলেছে।
সে কি করবে বুঝতে পারছে না, হঠাৎ ঝাপ দিয়ে পাশে থাকা কাচের স্প্রাইট বোতল তুলে রিয়াদের মাথার উপরে মারল।
সেকেন্ডের মধ্যে চারপাশ নিস্তব্ধ। সবাই হতবাক হয়ে নাফিসার দিকে তাকিয়ে আছে। নাফিসা কাঁপছে, নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে, ভাবছে—”আমি কি এটা করেছি?”

রিশা, রিদওয়ান, জারিন, মেহরাব, মেহরিন—সবাই অবাক হয়ে হা করে তাকিয়ে আছে। সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে ছোট্ট নাফিসা, এক এক মুহূর্তে সবাইকে স্তব্ধ করে দিল। ক্যান্টিনের ছেলে-মেয়েরা, যারা মারামারি দেখছিল পাশে দাঁড়িয়ে থেকে , এখন তাকিয়ে আছে শুধুই নাফিসার দিকে।
প্রতিটি নিঃশ্বাস ভারী, হাহাকার ভরা। চারপাশের আলো, চিলচিল করে পড়া সূর্যের আলো, টেবিলের বেলা,রিয়াদ হঠাৎ নিজের মাথায় হাত তুলে দেখল। চোখ ফুলে উঠল, মন কেঁপে উঠল। হাত ধীরে ধীরে সামনে নিয়ে এলো, আর মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারল—তার হাত রক্তে ভরে গেছে। রক্তের লাল ঝলকানি তার চোখে এসে ধরা দিল, যেন পুরো ক্যান্টিনটাই এক মুহূর্তে থমকে গেছে। চারপাশের শব্দগুলো হঠাৎ স্তব্ধ, হাহাকার আর চিৎকারের মধ্যে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে।

রিয়াদের চোখ ধাঁধিয়ে উঠল, সে নিজের অবস্থাটা সামলাতে পারছে না। ধীরে ধীরে সে পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো,নাফিসার দিকে তাকালো সেই দৃষ্টিটা, সেই উপস্থিতি যেন সবকিছুর ভারী চাপকে আরও বাড়িয়ে দিল। রিয়াদ হঠাৎ তার পা স্থির করতে পারল না। মন ও শরীর একসাথে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল, অথচ কিছুতেই রোধ করতে পারছিল না।
হঠাৎ, একটি দুর্বল শব্দ—“আহ…” শোনা গেল।

আরেক মুহূর্তের মধ্যে রিয়াদ দমবন্ধ হয়ে, ভারসাম্য হারিয়ে, ধীরে ধীরে পিছলে পিছলে মাটিতে গিয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ, নিঃশ্বাস অস্থির, এবং পুরো শরীর শিথিল হয়ে গেল। সে অজ্ঞান হয়ে গেল।
সেই দৃশ্য দেখেই চারপাশে উপস্থিত সবাই চমকে উঠল। প্রথমে কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলতে পারল না। ক্যান্টিনের শব্দগুলো—চিৎকার, গার্গলিং, হাঁটার শব্দ—সবই যেন হঠাৎ থমকে গেল।
নাফিসা, সামান্য সময় আগে নিজের সাহস ও শক্তি দিয়ে রিয়াদের মোকাবিলা করেছিলো, হঠাৎ নিজের চোখে বিশ্বাস করতে পারল না। ধুকপুক করছে বুক, হাত কেঁপে ওঠলো । আরেক মুহূর্তের মধ্যে তার চেতনাও মিলিয়ে গেল

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৬

—নির্দিষ্ট কোন শব্দ বা ঘটনা না, শুধু রিয়াদের অজ্ঞান হওয়ার দৃশ্যই তাকে স্তব্ধ করে দিল।নাফিসা নিজে ও অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
তখনই সবাই একসাথে এগিয়ে আসল। মেহরাব, রিশা, মেহরিন, রিদওয়ান, জারিন—প্রত্যেকে এক মুহূর্তে নাফিসার পাশে পৌঁছাল।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৮