তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১৯
জান্নাতি আক্তার জারা
সকাল ৬:২১
আরাতের ঘুম ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় শুয়া আবস্থাতে নিজের শরীরের উপর কারো হাত অনুভব করলো। হাতটা নিজের শরীর থেকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে তাড়াহুড়ায় ওঠে বসলো। এদিক ওদিক তাকাতেই নিজের পাশে (মামাতো বোন) মিম কে দেখলো এক হাত দিয়ে আরেক হাত ধরে ব্যথাতূর চোখে চেয়ে থাকতে। আরাত নিজের রুমটা চারদিক ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো, রুমের মেঝেতে বিছানা বিছিয়ে ঘুমে মগ্ন আইরা মায়া সন্ধ্যা। বিছানায় আরেক পাশে আরিশা। গতকাল শপিং শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরে দেখে সন্ধ্যা মিম এসে পড়েছে। গ্রাম থেকে আরাতের মামা মিম কে একা আসতে দেয়নাই। সঙ্গে মিমের মা অর্থাৎ আরাতের মামিও এসেছে।
বাড়িতে ফিরে আইরা আরিশা মায়া ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানা শুয়ে পড়েছে। আরাত বাড়িতে এসে আগে ফ্রেশ হয়ে গরুর মাংস নিয়ে ভাত খেয়ে নিজের মধ্যে এনার্জি এনে। রশ্মির সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে বলতে রুম থেকে বিয়ের শপিংব্যাগ গুলো ড্রয়িং রুমে এনে খুলতে লাগলো। আনহা শেখ, সন্ধ্যা, মিম, কে শপিং গুলো দেখাচ্ছে। আর যার যেইটা দিয়ে দিচ্ছে। শপিংয়ে পর্ব শেষ করে আরো কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ঘুমানোর জন্য নিজের রুমে এসে দেখে, মেঝেতে বিছানা বিছিয়ে । মায়া আইরা মেঝের বিছানায় শুয়ে গল্প করছে। আরিশা আরাতের ছোট্ট বেলকনিতে এসে ফোনে কথা বলায় মগ্ন। আরাত বিছানায় শুয়ে পড়ে । মিম আরাতের পাশে এসে শুয়ে পড়ে। প্রায় ঘন্টাদেরেক শুয়ে থেকে গল্প করে ঘুমিয়ে পড়ে সবাই। আরাতের রাতের সবকিছু সৃতিচারণ হতেই বুঝতে পারলো হাতটা কোনো ছেলের না, মিমের ছিলো। আরাত পুনরায় মিমের দিকে তাকাতেই মিম ব্যাথা পাওয়া হাতটা ঝাড়া দিতে দিতে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“আপু তুমি আমার কোমল হাতটা কে এভাবে ব্যাথা দিলে কেনো?
” সরি রে বুঝতে পারিনাই,আমি ভেবেছি এটা কেনো আচ্ছা বাদ দে, খুব ব্যাথা পেরেছিস?
“কিছুটা!
দুজনের কথা বলার মধ্যে একে একে সবাই জেগে গেলো, আজবাদে কালকে আরিশার মেহেন্দি আনুষ্ঠান, বাহিরে থেকে হইহৌলর আরছে বিয়ে বাড়ি বলে কথা। একে একে সবাই ওঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো। কিচেনে রাবেয়া তালুকদার পরোটা ভাজতেছে, কিচেন রুমের মেঝেতে আরাতের মামি তরকারির সবজি কাটাকাটি করছেন। রাহিমা সুলতানা ডাইনিং টেবিলের প্লেট গুলোতে সবার জন্য গরম গরম পরোটা তুলে দিচ্ছিলেন। মেয়েদের নিচে নামতে দেখে রাহিমা সুলতানা ডাকলেন খাবার টেবিলের দিকে। সবাই খাওয়া শুরু করলো গরম গরম পরোটা রাতের গরুর মাংস দিয়ে। এরমাঝে আনাস আর আশিক নিচে নেমে এলো, আশিক চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে উঠলো,
” হেই গার্লস এইতো তোমাদের কিউট হ্যান্ডসাম চলে এসেছে।
“হুম যেমন হটাৎ করে কপালে দুঃখ চলে আসে, তেমনি মেয়েদের মধ্যে লুচ্চাও চলে আসে লুচ্চামি করতে।
মায়া হাত দিয়ে পরোটা ছিড়ে মুখে তুলতে তুলতে বলল কথাটা। মায়ার কথায় সবাই মুখ চেপে হেসে উঠলো। আশিক মায়ার দিকে তাকিয়ে মায়া কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“শুনো বন্ধুর ভবিষ্যৎ বউয়ের ফ্রেন্ড। জীবনে মেয়েই সব। মেয়ে ছাড়া আমার মতো ছেলেরা নিঃস্ব।অতএব আমার পিছনে খোঁচা না দিয়ে তোমার মনে আমার জায়গাটা পার্মানেন্ট করার চেষ্টা করো কাজে আসবে।
“বন্ধুর ভবিষ্যৎ বউয়ের ফ্রেন্ড মানে?
মিম আশিকের দিকে তাকিয়ে বলল কথাটা। আইরা-র মুখে লজ্জা ফুটে উঠলো। সবাই একবার আইরা দিকে তাকিয়ে লজ্জামাখা মুখটা দেখলো। আরিশা বোনের মুখের লজ্জা পাওয়ার দিকে তাকিয়ে আনাস কে একনজর দেখলো। আনাস স্বাভাবিক ভাবে খাবার খাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখানে কি নিয়ে কথা হচ্ছে সেগুলো তার কানে যাচ্ছে না। মায়া আশিক কে ব্যঙ্গ করে বলল,
” চেনা নেই জানা নেই অচেনা মেয়ের মনে পার্মানেন্ট হতে চাচ্ছেন। নিজেকে আর কতটা লুচ্চা প্রমাণ করবেন! মিস্টার লুচ্চা?
“যতটা লুচ্চা হইলে বন্ধুর ভবিষ্যৎ বউয়ের ফ্রেন্ড কে নিজের করে পাওয়া যাবে ।
” আপনার লুচ্চামির উপর ঠাটা পড়বে। এই মায়ার কথাটা মিলিয়ে নিয়েন মিস্টার লুচ্চা।
“ওই বন্ধুর ভবিষ্যৎ বউয়ের ফ্রেন্ড। এভাবে নিজের ভবিষ্যৎ বরের উপর অভিশাপ দিচ্ছো খুব জল্লাদ মেয়ে তো তুমি।
” উফফ সব দোষ আমার, কেনো যে এই লুচ্চার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম আজাইরা।
পরোটা শেষ করে প্লেট নিয়ে কিচেনের দিকে যেতে যেতে বলল মায়া। এতক্ষণে আহিন আলভী কে রাহিমা সুলতানা বাহিরে গার্ডেন থেকে ডেকে নিয়ে এলেন। আরাত আইরা আরিশা সন্ধ্যা একে একে খাবার শেষ করে কিচেনের দিকে গেলো। মিম চেয়ার থেকে ওঠে কিছু একটা মনে পড়তেই চেয়ারে পুনরায় বসে আশিক কে বলল,
“ভাইয়া, বন্ধুর ভবিষ্যৎ বউয়ের ফ্রেন্ড, মানে কাকে বুলালেন ?
আশিক পরোটা খেতে খেতে মিমের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি হেঁসে আনাস কে একবার দেখলো।
“কী বলবো ছোট্ট আপু আমার কপাল টাই খারাপ!
“কোনো ভাইয়া?
“ভগ্য করে একটা মন পেয়েছি, যে মেয়েরে দেখি তারেই ভালো লাগে বাট! যেদিকে তাকায় সেইদিকে শুধু বন্ধুর বউ আর বন্ধুর বউ।
মিম চোখ বড়ো বড়ো করে আশিকের দিকে তাকালো। এতক্ষণে আহিন আলভী চেয়ার টেনে বসে পড়েছে। রাহিমা সুলতানা আহিন আলভী কে ডেকে এনে পুনরায় কিচেনে গিয়েছেন। আশিক সদর দরজার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল, আরাত সন্ধ্যা আইরা তিনজন সদর দরজা দিয়ে বাহিরে গার্ডেনে যাচ্ছে। মায়া আর আরিশা বাহিরের দিকে যেতেই আশিকের কথাটা শুনতে পেলো। মায়া গার্ডেনে যেতে যেতে বিরবির করলো,
“একটা মানুষের মধ্যে কতপ্রকার লুচ্চামি থাকতে পারে, এই লুচ্চা কে না দেখলে অজানা রয়ে যেত।
মায়ার কথায় আরিশা হেঁসে ওঠে মায়া কে বলল,
” আশিক ভাইয়া কিন্তু অনেক ভালো মনের ছেলে হ্যাঁ একটু ফাজলামো করে। বাট ভাইয়া মেয়েদের অনেক সম্মান করে। দেখো না আমাদের নিজের বোনের মতো ভালোবাসে কেয়ার করে।
আরিশা মায়া দুজন কথা বলতে বলতে গার্ডেনে গেলো, মিম ডাইনিং টেবিল থেকে ওঠে পড়েছে আলভী আশিকের দিকে তাকিয়ে মন ভার করে বলল,
” ভাইয়া আপনি যার সঙ্গে ফ্লাট করবেন করুন আমি মেনে নিবো। কিন্তু আমার মায়াবতীর থেকে সবসময় দূরে দূরে থাকবেন।
“আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম ছোট্ট ভাই। এই আনাস তাকবীর ব্রো কে চোখে চোখে রাখিস। নয়তো আমাদের মাফিয়া আলভী ভাই। তাকবীর ব্রো কে গুম করে দিবে।
আশিক সয়তানি হাসি দিয়ে বলল কথাটা। আলভী ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে চেয়ে রইলো আশিকের দিকে। চতুর আহিন চট করে আশিক কে প্রশ্ন করে উঠলো,
” তাকবীর ভাইয়ার কথা কেনো বলছেন ভাইয়া?
আহিনের কথায় আনাস আশিকের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে পুনরায় আহিন কে ধমক দিয়ে বলল,
“আর একটা কথা বললে তোর খাওয়া বন্ধ। চুপচাপ খেতে পারিস না এত কথা বলিস কেনো?
আহিন কিছু বলবে তখনই তাকবীর কে ডায়িং রুমের দিকে আসতে দেখে ভদ্র ছেলের মতো নিজের খাবার খেতে লাগলো। নিমেষেই হৈ-হুল্লোড় পরিবেশ টা নিস্তব্ধ হয়ে উঠলো। তাকবীর ধীর পায়ে ডাইনিং টেবিলের এসে চেয়ার টেনে বসলো। আনাস আশিকের খাওয়া হয়ে গেছে। আনাস আশিক তাকবীর কে বলে উঠে চলে গেলো। তাকবীর একবার আহিন আলভীর দিকে তাকালো। দুজন কে ভদ্র ছেলের মতো ব্রেকফাস্ট করতে দেখে তাকবীর ফোন হাতে নিয়ে আদিল কে ফোন লাগলো। রাহিমা সুলতানা তাকবীরের জন্য কফি নিয়ে আসতে কিচেনে গেলেন। সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো হাবিব আর হানিয়া। হাবিব তাকবীরের সঙ্গে কৌশল বিনিময় করে হানিয়ার ব্যাগ নিয়ে উপরে চলে গেলো। হানিয়া তাকবীরের দিকে তাকিয়ে থেকে কিচেন রুমে বড়োদের সঙ্গে দেখা করতে গেলো।
রাত ৮:১২
পুরো বাড়ি টা ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করছে, এই জোছনার আলোর রাতটাও রংবেরঙের ঝলমল লাইট বলে দিচ্ছে তালুকদার বাড়িতে বিয়ে লেগে গেছে। বাড়ি সাজানো এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে বাদবাকি কালকে এসে সাজিয়ে দিবে। অতিআপন গেষ্টরা অলমোস্ট সবাই চলে এসেছে। বাড়ির গার্ডেন এরিয়ায় ছোট-বড় সবাই চেয়ার পেটে আড্ডা দিচ্ছে। ছোটরা একপাশে আড্ডা দিচ্ছে বড়োরা আরেকপাশে চেয়ার পেটে গল্প করছে।অফিসের চাপ গোডাউনের কাজ সবমিলিয়ে যেন কেউ কাউকে সময় দিতে পারে না আজকে বাড়ির মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে সব ভাইবোন বাড়ির গিন্নিরা সবাই এক্ষেত্রে হতে পেয়ে গল্পে মজিয়ে তুলছে। আরেক পাশে বাড়ির মেয়ে কাজিন বন্ধু সব মিলিয়ে যেন বিয়ের আমেজটা জমিয়ে তুলছে।
আরাত আইরা আরিশা সন্ধ্যা মায়া হানিয়া মিম, চেয়ার গোল হয়ে বসে গল্প করছিলো,হটাৎ আরাতের ফোনটা বেজে উঠলো আরাত ফোনটা হাতে তুলতেই মুচকি হাসি দিয়ে রিসিভ করলো,
“কেমন আছিস?
“আলহামদুলিল্লাহ, বোনের বিয়েতে কেমন থাকতে পারি বল?
আরাতের উত্তরে ওপাশে রশ্মি মলিন হেসে বলল,
” খুব মিস করছি রে তোকে!
“মন খারাপ?
আরাতের হাসি মুখটা রশ্মির মলিন চেহারা দেখে নিমেষেই খারাপ হয়ে গেলো, রশ্মি কে চুপ করে থাকতে দেখে আরাত সবার মাঝখান থেকে ওঠে এসে সাইটে দাড়িয়ে পুনরায় রশ্মি কে ডাকল,
” এই রশ্মি কী হয়ছে তোর, বেশকিছু দিন থেকে লক্ষ করছি তুই কিছু নিয়ে টেনশনে আছিস। কী হয়ছে বল আঙ্কেল তোর আর পার্থর রিলেশন বুঝতে পেড়েছে?
“হুম!
” ও এই কারণে মন খারাপ, আঙ্কেল নিশ্চয় তোকে বকা দিয়েছে এজন্য মন খারাপ করছিস রাইট?
তোর ভাবনাটা যদি সত্যিই আমার মন খারাপের কারণ হতো। তাহলে আমিই হয়তো দুনিয়ায় প্রথম মেয়ে হইতাম ভালোবাসার জন্য বাবার কাছে হাজারো অপমানিত হয়েও খুশি হওয়া ব্যাক্তি। আমি ভালো নেই আরাত আমি ভালো নেই। কেনো তোর কথা শুনলাম না। তোর কথা শুনলে আমার জীবন টা আজ এমন হতো না। এখন আমি কী করবো, আমি যে সত্যিই পার্থ কে ভালোবাসি। ও আমাকে এভাবে ধোকা দিতে পাড়ে না।
“এই রশ্মি আবার কই হাড়িয়ে গেলি কখন থেকে তোকে কিছু জিজ্ঞেস করছি বল?
রশ্মি নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে মুখে মলিন হাসি ফুটে বলল,
” আমার কথা বাদ দে, বল আরিশা আপুর বিয়েতে বেয়াইনসাব দের জন্য আপ্যায়ন আয়োজন কী কী প্ল্যান করছিস?
আরাতের মুখে সয়তানি হাসির ঝিলিক খেলে গেলো, এভাবেই দুজন আজকে সারাদিন কিভাবে কেটেছে সবকিছু বলছে। হানিয়া দূর থেকে একবার তাকবীরের বেলকনির দিকে তাকালো, তাকবীর কে নিজের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে নিচে গার্ডেনের এককোণে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাকবীরের চোখ কে অনুসরণ করে সেদিকে তাকালো। এক কোণে আরাত কে ফোনে কথা বলতে দেখে হানিয়া পুনরায় তাকবীরের দিকে তাকালো। তাকবীর কে আগের ন্যায় আরাতের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হানিয়ার মনে আরাতের প্রতি রাগ লাগলো।
আড্ডার মাঝখান থেকে ওঠে সন্ধ্যা তাড়াহুড়ায় তালুকদার বাড়ির ভেতরে যেতে লাগলো, বাড়ির সদর দরজায় আসতেই একজোড়া শক্ত হাত সন্ধ্যার কমোর চেপে ধরে শূন্যয় তুলে নিয়ে নিলো, আরেক হাত দিয়ে সন্ধার মুখ চেপে ধরে গেস্টরুমে এনে দরজা টা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে দোয়ালেন সঙ্গে চেপে ধরলো। সন্ধ্যা মানুষ টাকে চিনতে পেয়ে ছটফটানি আগেই বন্ধ করছে। সামনের ব্যাক্তি রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কী সমস্যা আমার ফোন ধরোস না কেন?
” আমার ইচ্ছা!
সন্ধ্যা গাল ফুলিয়ে নিজের বুলি শেষ করতে সামনের ব্যাক্তি রাগে দোয়ালে সঙ্গে হাত ঘুশি মারতে মারতে রাগে তিরতির মেজাজে বলল,
“তোর ইচ্ছা মা’ই ফুট, বেশি বেড়ে গেছিস তাইনা? খাঁচায় বন্দি হতে মন চাইছে, করবো খাঁচায় বন্দি হ্যাঁ করবো?
” ছাড়ুন গুন্ডা লোক, আপনার যা ইচ্ছা করুন ভয়পাই না আপনাকে!
সামনের ব্যাক্তি মুখে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো, শক্তপোক্ত হাতটা সন্ধ্যার নরম গালে হালকা করে ছোঁয়ে দিতে দিতে দুষ্টু গলায় বলল,
“ও রেয়লি, আমাকে ভয় পাও না গুড। এই অন্ধকার রুমে শুধু তুমি আর আমি কিছু একটা করে ফেললে কেমন হয় বলতো কিউটি?
” প্লিজ হাবীব ভাইয়া আপনার এই গুন্ডা গিরি বন্ধ করুন, সবার সামনে তো সবসময় ভদ্রছেলে সেজে থাকেন। মনে হয় আপনি ভাজা মাছটা উল্টিয়ে খেতে পারেন না অথচ।
“অথচ কী কিউটি?
” অথচ আমার সামনে আপনার খোলস টা পরিস্কার আপনি একটা ভদ্রগুন্ডা।
“এটাও তোর কারণে, এবার আমার কথায় উত্তর দে! তুই আমার ফোন রিসিভ করোস না কেন?
” ফোনে বেশি কথা বললে ব্যালেন্স অপচয় হবে এজন্য।
“একদম ত্যাড়ামি করবি না সন্ধ্যা, নয়তো কিছু একটা করে ফেলবো, যেইটা তোর লাইফের জন্য রিস্ক।
সন্ধ্যা হাত দিয়ে হাবীবের বুকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে অভিমান গলায় বলে,
” কী করবেন আপনি হ্যাঁ, কী করবেন? গুন্ডা লোক একটা!
” তোর এই বয়সে শরিরের জন্য যেইটা হজম হবে না, বিয়ে করে আমার খাঁচায় বন্দি করবো। খাঁচায় বন্দি হয়ে থাকতে পারবি তো?
“গুন্ডা লোক একটা,যান হাসিমুখে কথা বলা মেয়েটাকে বন্দি করেন গিয়ে, আমার কাছে কেনো আরছেন!
হাবীব সন্ধ্যার কথায় ভ্রুকুচকে এলো, কিছুক্ষণ ভাবার পর মনে পড়লো, ছয়-সাত দিন আগে হানিয়া র ফ্রেন্ডের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হওয়ার মেয়েটা আগ বাড়িয়ে কথা বলছিলো। বোনের ফ্রেন্ড বিধায় হাবিব হাসিমুখে মেয়েটার সঙ্গে কৌশল বিনিময় করছিলো মাএ। হাবিব সন্ধার সঙ্গে দেখা করার জন্য লোকেশন দিয়েছিলো। সন্ধ্যা লোকেশন মতো এসে হাবীব কে একটার মেয়ের সঙ্গে হেসে কথা বলতে দেখ। অভিমান করে বাসায় ফিরে গেয়েছে। হাবিব কয়েক বার ফোন দিয়েছে সন্ধ্যা ফোন রিসিভ করে নাই। সেই থেকে হাবীব নিয়ম করে যতটুকু সময় পায় সন্ধ্যা কে ফোন দেয়, কিন্তু ফলাফল শুন্য। হাবিব দেখা করার চেষ্টা করছে কিন্তু সন্ধ্যা সবপথ বন্ধ করে দিয়েছিলো। হাবিব মনস্থির করে নিয়েছিলো, সন্ধ্যা পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবে।
যদি তাড়া এত ছোট মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি না হতো তাহলে তুলিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করতো। তারমধ্য আরিশা বিয়ে খবর পেয়ে হাবীব প্ল্যান চেন্স করে। আজকে তালুকদার বাড়িতে আসার পর থেকে হাবিব অনেক চেষ্টা করছে আলেদা কথা বলার কিন্তু সন্ধ্যা হাবিব কে এক প্রকার ইগনোর করে যাচ্ছে। হাবিব তাকবীরের সঙ্গে কথা বলার জন্য তালুকদার বাড়িতে ধীর পায়ে প্রাবেশ করছিলো হটাৎ কারো তারাহুড়া পায়ের আওয়াজে পিছু ঘুরে দেখতেই হাবিবের মুখে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। এতদিন পাখি কে ধরার জন্য পিছু ঘুরেছে আজকে পাখি নিজে থেকে ধরা দিতে হাজির।
” শুনলাম তুই কলেজে প্রথম দিন কার উপর যেনো ক্রাশ খাইছিস?
“আপনি যদি অন্য মেয়ের সঙ্গে ভেটকাতে ভেটকাতে কথা বলতে পারেন, তাহলে আমি ক্রাশ খাইলে সমস্যা কী আপনার?
” অনেক প্রবলেম, শুধু আরিশা-র বিয়ে টা হতে দে তারপর তোকে আমার খাঁচায় বন্দি করবো, জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ কিউটি।
সন্ধ্যা ঢোক গিললো, হাবিব সিরিয়াস ছেলে একবার মুখ দিয়ে বের করছে তো, ওটা করেই ছারবে সন্ধ্যা মনে মনে,
“হ্যাঁ তখন অল্পএকটু হালকা করে ক্রাশ খাইছিলাম, সেই ক্রাশ আজকে এতবড় একটা বাঁশ হয়ে ধরা দিচ্ছে, হায় আল্লাহ রক্ষা করো এই গুন্ডার থেকে।
মনে মনে কথাগুলো ভেবেই সন্ধ্যা কোচরমোচর করতে লাগলো, হাবিব সন্ধার নড়াচড়া দেখে ভ্রুকুচকে জানতে চাইলো,
” কী প্রবলেম এভাবে খৌউল মাছের মতো নড়াচড়া করছিস কেনো?
সন্ধ্যা আমতাআমতা করে,
“আমার দুই চাপছে!
” সহ্য করে থাক আমার কথা শেষ হয়নাই এখনো ।
সন্ধ্যা চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে একটু রাগ নিয়ে বলল,
“গুন্ডার বংশধর সর সামনে থেকে আমার জুলুম দিয়েছে ,সব জায়গায় গুন্ডাগিরি সালা খাটাশ একটা,
কথাটা বলেই সন্ধ্যা হাবীব কে ধাক্কা দিয়ে ওয়াশরুমে দিকে দৌড়ে চলে গেলো, হাবীব হাবলা-কান্তোর মতো সন্ধ্যার যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো।
গার্ডেনের এক সাইট জুড়ে বড়োরা চেয়ার পেটে বসে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে আর ছোটদের খেলাগুলো ইনজয় করছে। আনাস আশিক হাবিব আদিল আহিন আলভী অর্থাৎ ছেলেরা এক দল আর মেয়েরা বিপরীদ দলে, আইরা আরাত মায়া মিম সন্ধ্যা হানিয়া এক দলের, দু’দল মিলে জুতা চোর খেলবে। যে দল হারবে সেই দলের পানিশমেন্ট কী দিবে বাড়ির বড়োরা ঠিক করবে। ছোটদের পায়ের জুতা খুলে লাইনে সাজিয়ে রাখছে প্রথমে মেয়েরা জুতা চুরি করবে। ওড়না কোমরে ভালো ভাবে বেঁধে বড়ো করে নিঃশ্বাস নিয়ে প্রথমেই ছুটলো হানিয়া। হানিয়া দম নিয়ে যেতেই প্রথমে আলভী কে ছুঁয়ে দুধভাত করে। আলভী প্রথমে দুধভাত হয়ে মন খারাপ নিয়ে বড়োদের পাশের চোয়ার টেনে বসে পড়ে। দ্বিতীয় বার আইরা নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে দৌড়ে যেতেই আশিক মজার ছলে বলে উঠলো,
” এই তোরা কেউ যাস না আমার বন্ধুর বউ আরছে বন্ধুকে সামলাতে দে।
আশিকের কথাটা আইরা কানে যেতেই চোখ বড়ো বড়ো করে ছোটাছুটি বন্ধ হয়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে গেলো।আইরা পিছন ঘুরে বড়োদের দিকে একবার তাকালো। সবাই স্বাভাবিক ভাবে খেলা দেখতে ব্যস্ত তাদের আশিকের কথা কানে পড়ে নাই, আইরা কে নিঃশ্বাস ছেড়ে পিছন ঘুরতে দেখে আতিফ শেখ হাতের ইশারায় মেয়েকে দৌড়ে পুনরায় নিজেদের ঘরে ফিরতে বলছে। আইরা বাবার ইশারা বুঝে পিছন ঘুরে দৌড়ে দিতে যাবে। তখনই আনাস আইরার নিঃশ্বাস ছেড়ে দিয়েছে বুঝতে পেয়ে পিছন থেকে পুরুষালী শক্ত হাত দিয়ে শব্দ করে আইরার পিটে ছুয়ে দিলো। সঙ্গে ছেলেরা আইরা দুধভাত হয়েছে বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। এদিকে আইরা আনাস সের শক্ত হাতে পিটে থাপ্পড় খেয়ে মুখচোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। আনাস হাসতে হাসতে আইরা দিকে তাকাতেই আইরা কে ব্যাথায় চোখ বন্ধ করতে দেখে মুখের হাসি মলিন হয়ে এলো,
” এই ইরা… বেশি ব্যাথা পাইছিস?তোর কী কষ্ট হচ্ছে?
আনাস সের আইরা কে ঘিরে ব্যাকুলতা কন্ঠ শুনে আইরার খিঁচে যাওয়া চোখমুখ স্বাভাবিক হয়ে গেলো। বন্ধ চোখ চট করে খোলে অবাক হয়ে তাকালো। আনাস পুনরায় ব্যাকুল কন্ঠে বলে উঠলো,
“কী রে কথা বলছিস না কেনো, তোর কী বেশি ব্যাথা করছে?
আইরা-র কিছু পাওয়ার আশায় মুখটা ঝলমল হয়ে উঠলো, আইরা মুখে হাসি টেনে মাথাটা নাড়িয়ে না বুঝালো। আনাস সের মুখটা এবার স্বাভাবিক হয়ে এলো। আইরা কে নিজের দিকে নিভু নিভু অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে গলা খাঁকারি দিলো আনাস। আইরা আনাস সের গলা খাঁকারির শব্দে লজ্জা পেয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে এদিক ওদিক তাকালো। তখন সবাই আইরা দুধভাত হয়েছে বলে চিল্লাতে ব্যাস্ত, আইরা লজ্জা মাখা হাসি নিয়ে দৌড়ে নিজের বাবার পাশে চোয়ার টেনে বসলো। আতিফ শেখ সেই প্রথম থেকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, মেয়ের মুখে ঝলমলানি হাসি দেখে আতিফ শেখ একটা তৃপ্তির হাসি দিলেন। আনাস আইরা দৌড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে পুনরায় খেলায় মগ্ন হয়ে গেলো। তৃতীয় নিঃশ্বাস নিয়ে মায়া দৌড় লাগালো, আশিক সয়তানি হাসি দিয়ে মায়ার মনোযোগ পাওয়ার জন্য বলে উঠলো,
” এইতো বন্ধুর ভবিষ্যৎ বউয়ের ফ্রেন্ড চলে এসেছে,ও রুপসি তোমাকে দেখার পড়ে আমার চোখে আশেপাশে সবকিছু ফিকে মনে হচ্ছে। কী রুপ গো তোমার রুপাসি কন্যা। চুরি করে নিয়ে যা-ও তোমার যত ইচ্ছা জুতা। আমার মনটা চুরি করলেও আজ আমি বাঁধা দিবো না।
আশিকের কথায় আনাস হাবিব বিরক্ত হয়ে আশিক কে শাসাতে শাসাতে মায়ার পিছু নিলো। রাবেয়া তালুকদার চিৎকার দিয়ে মায়া কে জুতা নিয়ে দৌড় দিতে বলতেই ছেলেদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে সেদিকে তাকালো, সঙ্গে সঙ্গে মায়া দু’হাতে চারটা জুতা নিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরে এলো, আহিন মায়ার পিছু আসতে নিলেই মায়া নিঃশ্বাস ছেড়ে দিলো আর সন্ধ্যা নিঃশ্বাসের উপর নিঃশ্বাস নিয়ে আহিন কে দুধভাত করে জুতার কাছে গিয়ে ছুটাছুটি করতে লাগলো। ছেলেদের সবকিছু মাথায় উপর দিয়ে গেলো, একেই আশিকের কথায় বিরক্তি তারউপর রাবেয়া তালুকদার কথায় মনোযোগ নষ্ট, এখন পুনরায় সন্ধ্যা কে নিঃশ্বাস নিয়ে আহিন কে দুধভাত করে জুতা নেওয়ার জন্য ছুটাছুটি করতে দেখে।
এদিকে বাবা-মার কাছে বসে আরিশা ভিডিও কলে আমান কে তাদের খেলা দেখাচ্ছে। আমান দের বাড়িতে কাজিন আত্মীয়-স্বজনের হৌয়চয়ে আমান ল্যাপটপ সঙ্গে করে নিয়ে ছাঁদের এক কিনারার বসে ভিডিও কলে, শশুর বাড়ির খেলাগুলো দেখছিলো। আমান একা একা ছাদে বসে থাকার মধ্যেই রাফি মাহির আরশ আরো দুজন কাজিন ছাঁদে উপস্থিত হইলো। রাফি রা আমানের সঙ্গে ল্যাপটপ ওদের খেলাগুলো দেখছিলো। এদিকে সন্ধ্যা জুতা নেওয়ার জন্য ছুটাছুটি করতে আশিক পুনরায় একি সুরে বলে উঠলো,
” বিপক্ষে দল যদি হয় বন্ধুর বউরা তাহলে আমার বন্ধুদের হার নিশ্চিত। বন্ধু বিয়ের আগেই এভাবে হেরে যাস না, নয়তো সারাজীবন আফসোস করতে হবে।
“মেয়েদের কাছে হারে যাবো ইম্পসিবল দোস্ত তবে ভবিষ্যত বউ হইলে আলেদা বিষয় তার কাছে হারে যেতে আমার কেনো প্রবলেম নেই।
আশিক ছুটাছুটি করতে করতে হাবিব কে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলতেই, হাবিব সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে আশিকের কথায় বাঁকা হেসে উওর করলো, সন্ধ্যাও সয়তানি হেসে হাবিব কে চোখ টিপ দিলো, হাবিব সঙ্গে সঙ্গে বিষম খেয়ে দাঁড়িয়ে পরলো, সুযোগ টা কাজে লাগিয়ে সন্ধ্যা দু-হাত জরিয়ে তিনটা জুতা নিয়ে দৌড়ে নিজেদের ঘরে ফিরে এলো। এবার আনাস রাগি চোখে আশিক হাবিবের দিকে তাকিয়ে বললো,
” আমি আর তোদের দলে খেলবো না, তোরা গো হাঁড়া হেরে যাবি, যদি এমন ফাজলামো করিস তাহলে খেলার প্রয়োজন দেখছি না তো?
“আরে রাগ করিস না দোস্ত, এবার আমরা সিরিয়াস নে দেখ মিম আরছে, ভালো হয়ে দাড়া।
আশিক কথাটা বলতেই আনাস বিরক্তি মুখে পুনরায় লাইনে দাঁড়িয়ে গেলো, আইরা বাবার পাশে বসে আনাস সের বিরক্তি হওয়া মুখ দেখে মুচকি হাসলো। মিম কে দৌড়াতে দেখে ফোনের ওপাশ থেকে আরশ আরিশা কে বলে উঠলো,
” নতুন ভাবি এই পিচ্চিটা আপনার কে?
“আরিশা আরশের কথায় হেঁসে উওর দিলো,
” ওইটা আমার মামাতো বোনের কাজিন, মানে আরাতের মামাতো বোন!
সঙ্গে সঙ্গে আরশ রাফি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরাত মানে কলেজের মেয়েটা না? আমাদের বেয়াইন!
আরশ শেষের বেয়াইন কথাটা মাহিরের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি সুরে বলল,মাহির আরশের দুষ্টুমি তে পাওা না দিয়ে ফোন বের করে এক সাইটে চলে গেলো। এদিকে আশিক আবারো বলে উঠলো ,
” দোস্ত আমি সিরিয়াস ভাবেই খেলছি। বাট এই ছোট আপুকে দেখে মায়া হচ্ছে, নিয়ে যেতে দে একটা জুতা নয়তো মনে কষ্ট পাবে।
আশিক কথাগুলো বলতে বলতে চঞ্চল মিম এক দৌড়ে এসে না থেমে দু-হাতে চারটা জুতা নিয়েই দৌড়। আশিক কথা গুলো শেষ করার আগেই মিম জুতা নিয়ে দৌরে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আনাস হাবিব, মিমের পিছনে না দৌড়ে আশিকের দিকে দৌড়ে গিয়ে দুজন এলোপাতাড়ি কিলাতে লাগলো। এদিকে মেয়েরা সব জুতা নিয়ে এসে জিতে গেলো, এবার ছেলেদের পালা বাট মেয়েরা জিতে গিয়ে আর খেলবে না বায়না ধরে। ছেলেরা পুনরায় খেলতে চায় মেয়েরা আর খেলবে না অতএব জিত মেয়েদের হয়ে গেছে। আশিক, হাবিব আনাস সের হাতে এলোপাতাড়ি মার খেয়ে হাত-পা দেখতে দেখতে বলে উঠলো,
“তোমাদের আমরা সুযোগ দিয়েছি এজন্য জিতে গেছো, এখন আবার চিটিং করছো কেনো?
মায়া আশিকের কথায় ফরন কেটে বলে উঠলো,
” আমরা চিটিং করছি না আমরা জিতে গেয়েছি, এখন আপনাদের পানিশমেন্ট পাওয়ার পালা,
” ওই বন্ধুর ভবিষ্যৎ বউয়ের ফ্রেন্ড তুমি তো জল্লাদ’তের সঙ্গে সঙ্গে চিটিংবাজ আছো!
মায়া আশিকের কথায় চিল্লায়ে উঠে আশিকের দিকে তেড়ে যেতেই, বড়োরা চেয়ার থেকে ওঠে এসে। হাসি মুখে মেয়েদের সার্পোট টেনে আনহা শেখ বলে উঠলো,
“এই তোমরা ঝগড়া করো না, আমরা ঠিক করেছি মেয়েরা জিতে গিয়েছে এজন্য ছেলেদের পানিশমেন্ট হিসাবে আমাদের এখন একটা গান গেয়ে শুনাতে হবে।আনহা শেখের কথায় কোথায় থেকে আদিল এসে উপস্থিত হইলো, আদিল কে দেখে হাবিব জিজ্ঞেস করলো,
” খেলতে খেলতে কই হাড়িয়ে গেয়েছিলি ?
“আমি জানতাম তোমরা হেরে যাবে এজন্য আগেই নিজের মান সম্মান রক্ষা করতে উধাও হয়েছিলাম ।
আদিলের খোঁচা দিয়ে কথা বলায় আনাস রাগি গলায় আশিক কে দেখিয়ে দিতে দিতে বলল,
” ওইটার মতো কেলানি মিস করতাছিস বুঝি?
“না না ভাইয়া, আমাকে তাকবীর স্যার আর্জেন্ট তার রুমে ডেকে ছিলো,এজন্য খেলায় অংশ নিতে পাড়ি নাই।
ওদের কথার মধ্যে আদিবা তালুকদার তাড়া দিয়ে ওঠলো, ছেলেদের গান গাওয়ার জন্য, আনাস আশিকের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
” ওর জন্য আমাদের হেরে যেতে হইছে, ওকে বলো গান গেয়ে শুনাতে।
কথাটা বলেই আনাস সোজা তালুকদার বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, আদিল আলভীকে দিয়ে গেস্টরুম থেকে আশিকের গিটার টা নিয়ে এসে, আশিক কে দিয়ে এক লাফে চেয়ারের উপর উঠে হাতটা মাইকের মতো করে মুখের সামনে নিয়ে চিল্লিয়ে বলে উঠলো,
“লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান অ্যাটেনশন প্লিজ, এখন আমাদের সুপ্রিয় গায়কের গলায় গান শুনার জন্য আই ইউ রেডি গাইস?
” ইয়েয়য়য়য়স……
মেয়েরা সবাই একসঙ্গে চিৎকার দিয়ে উঠলো আশিকের গলায় গান শুনার জন্য, বড়োরা পুনরায় চেয়ার পেতে বসে পরলো। আশিক গিটার টা নিয়ে সবাইকে দেখে নিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিলো। পরিবেশ টা নিরব হয়ে গেলো। সবাই চুপিসারে চেয়ার টেনে বসে পরলো। আশিক কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ভেবে নিলো বড়দের সামনে কী গান গাওয়া যায়। কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে চুপচাপ চোখ টা বন্ধ করল। গিটারের টুংটাং শব্দ তুলে ঠান্ডা গলায় গেয়ে উঠলো
এ কূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে
“জীবন দরিয়ায় ”
__বাপের বাড়ি ছাইড়া কন্যা ”
শশুর বাড়ি যায়….. হায় ”
“পুতুল খেলার ছেলেবেলা ”
মনে পইড়া যায়……
ও…..পিছু ফিরা চায় রে কন্যা”
পিছু ফিরা চায় ____বিধি রেরররররররর….বিধিরেরেরে…হোওও বিধিরেরেরে।
“এইটা বিয়ের বাড়ি, নাকি মৃত্যু বাড়ি তোমরা এভাবে শোক পালন করছো কেনো ?
আনাস সের রাগী কথায় সবাই চোখ মুছতে মুছতে আনাস সের দিকে তাকালো, সবার চোখে পানি। আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার আনহা শেখের কাছে বসে আনহা শেখ কে সামলাচ্ছে। রাহিমা সুলতানা আনাস সের কথায় চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির ভিতরে গেলেন সবাইকে স্বাভাবিক করতে পানি আনার জন্য। আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার দূরের চেয়ারে বসে চোখের চশমাটা খুলে পরিস্কার করে নিয়ে পুনরায় পড়ে নিলেন। কিছুক্ষণ আগে তাদের চোখেও পানি এসে গিয়েছিলো। সত্যি মেয়ে বড়ো করে তাদের কে অন্যর হাতে তুলে দেওয়া টা কলিজা কাঁপানো অনুভূতি। যে মেয়েকে নিজের হাতে এত আদর যত্ন করে বড়ো করা হয়। প্রকৃতির নিয়ম অনুসরণ করে সেই মেয়ে কে অন্যর হাতে তুলে দিতে হয়। হয় না আগের মতো মেয়ে কাছে ডেকে আদর করা। শুনা হয় না আর মেয়ের ছোট্ট ছোট্ট আবদার গুলো।ছোট্ট মেয়েটা বড়ো হয়ে সেও সংসার সামলাতে শিখে যায়।
এটাই তো নিয়ম এই যে মেয়েটা আজকে সবার সঙ্গে হেঁসে খেলে আড্ডা দিচ্ছে দুইদিন পড়ে আর পাবে না। চাইলেও নিজের ইচ্ছা মতো হুটহাট এবাড়ি থেকে ওই বাড়িতে যেতে পারবে না। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলেও একটা পিছুটান রয়ে যায়, সেই ছোট্ট থেকে বড়ো হওয়ার হাজারো সৃতি জড়ানো বাড়িটাও কটুম বাড়ি হয়ে যায়। এটাই তো বিধির নিয়ম। বিয়ের বাড়ির আনন্দটা যেন গানের কয়েকটা লাইন, হটাৎ তালুকদার বাড়িকে কাঁদিয়ে তুললো। মেয়ের বিদায় হওয়ার আগের মেয়েকে ধরে ডুকবে কেঁদে উঠলেন আনহা শেখ।
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১৮
বড়ো মেয়েটা তার কাছে বেশি আদুরে তার আর আতিফ শেখের ভালোবাসার প্রথম অংশ। প্রথম মাতৃত্বর সাধ আরিশা কে ঘিরে ছিলো। আনহা শেখের হাত ধরে ছোট্ট আরিশা দুই-এক পা ফেলে হাঁটা ধরছে প্রথম মা বলে ডেকেছে।আজ সেই ছোট মেয়েটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে। তার-ও একটা ছোট্ট সংসার হতে চলছে। কথাগুলো ভেবেই আনহা শেখ পুনরায় আরিশা কে জরিয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিয়েছে। আনাস আনহা শেখের কাছে গিয়ে ফুপি কে নিজের সঙ্গে জরিয়ে ধরে বুঝাতে লাগলো।
