তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৬
জান্নাতি আক্তার জারা
“আস্তে আস্তে নিজেকে এতটা সার্থপর বানাবো তোমার প্রতি আমার মায়া কে দূরত্ব করবো।
এইবার তুমি ফিরিয়ে দিচ্ছো তো আমাকে। দেখবে একদিন আসবে,আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিবো। সেদিন তুমি আমার মতো করে চাইবে কিন্তু আমি তোমার দিকে ফিরেও চাইবো না, প্রমিস করলাম তোমাকে।
আইরা কথাগুলো বলে আনাস সের থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ছাঁদ থেকে নেমে চলে গেলো। আনাস শুধু আইরা-র যাওয়ার পথে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
আইরা ছাঁদ থেকে নেমে সোজা নিজের জন্য তালুকদার বাড়িতে বরাদ্দ রুমটায় আসলো। আজকে আর আরাতের রুমে গেলো না। কান্না করতে করতে রুমে এসে দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। কান্না করে চোখমুখ ফুলে লাল হয়ে আছে। আইরা হাঁটুতে মুখ গুঁজে একা একা বিরবির করে কান্না করতে লাগলো,
“কেনো আনাস ভাই! কেনো আমাকে ভালোবাসো না। আমাকে ভালোবাসলে কী তোমার খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে। তুমি তো জানো কতটা চাই তোমায় আমি। তারপরও কেনো এত অবহেলা। কেনো আমাকে কলঙ্কের তকমা লাগাচ্ছ! আমি কী দেখতে সুন্দর না। তোমার যোগ্য না! আমি কী চেয়েছি বলো! একটু খানি তোমার আদুরিমাখা অধিকার ঘাঁটিয়ে ভালোবাসা। তুমি তো একা ভালোবাসতে না আমিও তোমাকে ভালোবাতাম। দুজনে ভাগাভাগি করে ভালোবাসা ভাগ করে নিতাম। তোমাকে পাওয়ার লোভে তো আমি নিজেকে ছ্যাঁচড়া বানাইছি। কিন্তু তুমি কী করলে আমাকে ভালোবাসলে না। আমার চরিত্রে দাগ লাগলে। কেনো কেনো! কেনো আনাস ভাই।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আইরা মুখে ওড়না গুঁজে দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে কান্নায় ভেঙে পরলো। বাড়িতে কাছের মেহমান গুলো এখনো থেকে গেছে। তারউপর নতুন মেহমান বাড়িতে উপস্থিত। আইরা চাইলেও চিৎকার করে কান্না করতে পারছে না। চিৎকার করে কথাগুলো বললে হয়তো মনের দুঃখ গুলো চিৎকারের সঙ্গে ফানুশ হয়ে যেতো। দু-হাত দিয়ে অশ্রুভেজা চোখ মুছতে মুছতে ভাঙ্গা গলায় পুনরায় বলে উঠলো,
“তুমি আমার ভালোবাসা কে তাচ্ছিল্য করে ভালোই করেছো, নাহলে আমি নিজেকে চিনতে পারতাম না। আমি এতটাও সস্তা নই, যতটা তুমি ভেবেছ। তোমার ভালোবাসায় পাগল ছিলাম ঠিকই, কিন্তু তুমি তো আমাকে সস্তা ভেবেই নিয়েছো! কিন্তু আর না…
কারো পায়ের আওয়াজ কানে পরতেই আইরা বসা থেকে দ্রুত পায়ে উঠে রুমের দরজা হালকা করে চেপে দিলো। বিছানায় শুয়ে নিজেকে কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরে রইলো। আইরা জানা আসে এতো রাতে কে আসতে পারে আইরা রুমে। খট করে রুমের দরজা খুলার শব্দ শুনা গেলো। আতিফ শেখ মিটিমিটি পায়ে রুমের ডিম লাইট জ্বালিয়ে মেয়ের কাছে এলেন। মেয়ের সামনে সামান্য ঝুকে মেয়ের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলেন। কয়েক সেকেন্ড মেয়ের দিকে তাকিয়ে মেয়ের কপালে ভালোবাসার পরশ রেখে দিয়েন। পরমুহূর্ত আইরার শরীরে কম্বলটা ভালোভাবে জড়িয়ে দিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে রুম ত্যাগ করলেন। আইরা বন্ধ চোখ খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পরলো।
“আমার পরিবর্তন তোমাকে ভয়ংকর কষ্ট দেবে, আনাস ভাই ভয়ংকর।
ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা উপরে আরাত খিদার চোটে ঘুম থেকে নড়াচড়া করে বিছানায় ওঠে বসলো। আরাতের বাজে অভ্যাস দিনদিন বেড়ের চলছে। কোনো অনুষ্ঠানে এতো অচেনা মানুষের ভীরে তার পেট ভরে খওয়া হয় না। খেতে বসে মনে হতে লাগে কেউ হয়তো তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এই যে পেট ভরে না খওয়ার কারণে এখন তার খেসারত হিসেবে পেটের মধ্যে নাড়িভুড়ি হাতুড়ি বাজাচ্ছে। ঘরে সদাই ছিলো সকাল বেলা সবাই কে নিয়ে খেয়ে সব শেষ।
আজকে আরিশার বৌভাত জন্য বাড়িতে রান্না বন্ধ ছিলো। এখন কী খেয়ে নিজের খিদা মিটাবে। আরাত কথা গুলো ভাবছিলো। হটাৎ মনে পড়লো বীর ভাইয়ার জন্য আরিশা আপুর শশুর বাড়ি থেকে টিফিন সেজে দিয়ে ছিলো। ওখান থেকে তো একটু খাওয়ার যায়।
খুশিতে আরাত বিছানা থেকে ধীরে ধীরে নেমে ফোনের ফ্লাস অন করে রুম থেকে বের হইলো। আবার মনে মনে ভাবতে লাগলো। রাত তো গভীর বীর ভাইয়া হয়তো এসে সব খেয়ে নিয়ে এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ছে । নিজের মনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ঠোঁট উল্টে নিচে নামতে ড্রয়িং রুমের লাইট জ্বলছে দেখে বেশ অবাক হলো আরাত। হয়তো বীর ভাইয়া খাবার খেয়ে লাইট বন্ধ করতে ভুলে গেছে। ব্যাপারটা তেমন না ভেবে কিচেন রুমের দিকে এগুতে। চোখ গেলো ডাইনিং টেবিলের উপর। টেবিলে প্লেটে ভাত আর সবজি দেখতে পেয়ে। কোনোদিকে না তাকিয়ে টেবিলে গিয়ে গ্লাসের পানি নিয়ে সামনের একটা বাটিতে হাত ধুয়ে ভাতের প্লেট নিয়ে খেতে শুরু করলো। কয়েক লুকমা মুখে তুলতেই হটাৎ কারো গলা খাঁকারি শব্দে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। তাকবীর কে হাতে করে মাংসের বাটি নিয়ে আরাতের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে। আরাত ভাত মুখে নিয়ে কাশতে লাগলো। তাকবীর দ্রুতপায়ে আরাতের সামনে এসে মাংসের বাটিটা টেবিলের উপর রেখে। জগ থেকে পানি গ্লাসে ঢেলে আরাতের সামনে গ্লাস টা এগিয়ে দিলো। আরাত কাশতে কাশতে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে ছিলো এতক্ষণ।
“পানিটা খেয়ে নাও!
আরাত তাকবীরের হাত থেকে গ্লাস টা নিয়ে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে পানি খেতে লাগলো। তাকবীর স্বাভাবিক ভাবে আরাতের বিপরীত চেয়ার টেনে বসে আরেকটা প্লেটে নিজের জন্য ভাত তুলতে লাগলো। আরাত এতক্ষণে নিজের মধ্যে ফিরে এলো যেন। খিদার চোটে কোনোকিছু না ভেবে চোখের সামনে ভাত দেখে খেতে বসে গিয়েছে। একবারও ভাবনাতে আসলো না প্লেটটা কার জন্য ছিলো। তাকবীর কে দেখে বুঝতে পারলো তাকবীরের প্লেটের খাবার নিজে খেয়ে নিয়েছে। আরাত পানির গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে আমতা আমতা করতে লাগলো,
“সরি বীর ভাইয়া, আপনার খাবার খাওয়ার জন্য!
” ইটস ওকে ।
আরাত হাসার চেষ্টা করে টেবিল থেকে উঠতে যাবে, তাকবীর নিজের প্লেটে সবজি নিতে নিতে গম্ভীর গলায় বলল,
“বাকিটা শেষ করো।
আরাত ভদ্রমেয়ের মতো পুনরায় বসে পড়লো। তাকবীর কে চুপচাপ খাবার খেতে দেখে আরাত মাথা নিচু করে সবজি দিয়ে খেতে লাগলো। তাকবীর খেতে খেতে আরাতের দিকে আরচোখে তাকালো। আরাত কে মাথা নিচু করে খেতে দেখে মাংসের বাটিটা আরাতের সামনে এগে দিলো। আরাত খাওয়ার মধ্যে হটাৎ নিজের প্লেটের সামনে মাংসের বাটি দেখে অবাক চোখে চাইলো তাকবীরের দিকে। তাকবীর কে নিজের মতো করে এখনো খাবার খেতে দেখে আরাত একবার বাটির দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার তাকবীরের দিকে।
” কী! প্লেটে তুলে দিতে হবে?
তাকবীর আরাতের দিকে চোখ তুলে বলল, আরাত তাকবীরের মুখের দিকে চেয়ে মাথা ঝাকিয়ে না বুঝালো এবং মাংস নিজের প্লেটে তুলে নিয়ে খেতে লাগলো। তাকবীর পুনরায় নিজের মতো করে খেতে লাগলো। আরাতের পেটের ক্ষুধা পেটেয় রয়ে যাবে। তাকবীরের সামনে খাবার খেয়ে পেট ভরছে না। তাকবীর বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে নিচে রাতের খাবার খেতে এসেছে। প্রথমে ডাইনিং টেবিলে ভাত সবজি মাংশ প্লেট দিয়ে ঢেকে রাখা দেখতে পেয়ে। অন্য প্লেটে ভাত আর সবজি খাওয়ার উদ্দেশ্য নিতে, চোখে পড়লো মাংস গরম করতে হবে। ভাতের প্লেট রেখে মাংসের বাটি নিয়ে কিচেনের মাংস গরম করতে গিয়ে ছিলো। কিছুক্ষণের মাথায় তাকবীর মাংসের বাটি নিয়ে ডাইনিং টেবিলে আসতে। নিজের জন্য বেরে রাখা ভাত আরাত কে খেতে দেখতে পেলো।
তাকবীরের খাবার খাওয়া শেষ অনেক আগেই। খাবার শেষ করে এঁটো হাত আর প্লেটটা ধুয়ে। সোফায় বসে ফোন ঘাটাঘাটি করছে। তাকবীর কে টেবিল থেকে উঠতে দেখে আরাত নিজের মতো করে ধীরে ধীরে খাবার শেষ করতে লাগলো। খেতে খেতে মনের মধ্যে খজখজ করতে লাগলো গতকাল রাতের বিষয়টা। বীর ভাইয়া কেনো কথাগুলোর বলছিলো। আজকে তো বেশ বীর ভাইয়া সামনে একসঙ্গে খাবার পর্যন্ত খেলো। কই আজকে তো দূরে যেতে বললো না। আরাত কথাগুলো ভাবতে ভাবতে খাবার শেষ করে হাত ধুয়ে রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়িয়ে সিড়ির কাছে এসে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। তাকবীর সোফায় বসা আবস্থাতে ফোন থেকে চোখ উঠিয়ে আরাতের দিকে রাখলো। আরাত তাকবীর কে তাকাতে দেখে কোনো কিছু না বলে সোজা নিজের রুমে চলে গেলো। তাকবীর আরাতের যাওয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
সকাল বেলা আনহা শেখ রাবেয়া তালুকদার, দুইজন মিলে সকালের নাস্তা বানাতে ব্যস্ত। নিত্যদিনের চেয়ে আজকের আয়োজন একটু বেশি। নতুন জামাই এবং নতুন মেহমানের কারণে। রাবেয়া তালুকদার তার ভাইয়ের বউ (রুপোলী বেগম) কে নিয়ে পুরো বাড়ি সুন্দর করে গুছিয়ে নিচ্ছে। কয়েকদিনে বাড়িটা মেহমান দিয়ে ভরপুর ছিলো এখনো আছে। তবে বেশি অর্ধেক মেহমান চলে গিয়েছে। কয়েক-দিনে বিয়ের আনন্দে ঘুম ছিলো না কারো চোখে । আজকে যেন সেই ঘুমকে লুটে নিচ্ছে সবাই। কেমন যেন সবাই কে ফ্রি ফ্রি লাগছে। বাকি সবাই ঘুম থেকে এখানো ওঠে নাই। রাহিমা সুলতানা আর আলভী তালুকদার বাড়িতে এসে দাড়ালো। আনহা শেখ ব্যস্ত হাতে পরোটা ভাজতে ভাজতে আলভী কে বলল,
“আলভী বাবা! যাও তো তোমার আরিশা আপুকে ডেকে নিচে আসতে বলো।
আনহা শেখের কথায় আহিন দোতলা গেলো। রাহিমা সুলতানা কিচেনের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাজে হেল্প করতে লাগলো। আলভী প্রথমে আহিন কে ঘুম থেকে টেনে ওঠালো। ঘুমুঘুমু আহিন কে সঙ্গে নিয়ে আরিশা আর আমান কে ডাকলো নিচে আসার জন্য। এতক্ষণে আহিনের ঘুম শেষ পুনরায় আরাতের রুমে দরজায় দাঁড়িয়ে দুজন সয়তানি হাসি দিলো। দুজন একসঙ্গে দরজায় ঠকঠক করে দিলো কয়েকটা ধাক্কা। ধাক্কা দিয়ে লুকানোর উদ্দেশ্য দুজন দৌড়ে আনাস সের রুমে সামনে দাঁড়াতেই। আনাস সের রুমে দরজা হটাৎ খুলে যাওয়ার দুজন রুমের ভিতরে একিউপরের উপর ধপাস করে পড়ে গেলো ।
আনাস হটাৎ এতো জোরে দরজা ধাক্কানোর শব্দে বাড়িতে কিছু হয়েছে ভেবে। রুম থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্য দ্রুত পায়ে এসে দরজা খুলতেই। আহিন আলভী কে নিজের রুমের ভিতরে পড়তে দেখে আনাস দ্রুত পায়ে পিছনে দিকে সরে গেলো। দুজন পড়ে গিয়ে বেশ ব্যাথাও পেয়েছে। আনাস সের আর বুঝতে বাকি রইলো না এত শব্দর কারণটা। আনাস দু’জন কে তুলতে তুলতে রাগী গলায় বলল,
” একদম ঠিক হয়েছে!তোদের সঙ্গে এটাই হওয়া প্রয়োজন, সকাল সকাল কী করছিস তোরা! এতো শব্দ কেনো?
আহিন আলভী দুজন আনাস সের কথায় উওর না করে চুপচাপ মলিন মুখে দাঁড়ালো। আরাত কে বিছানার ঝারু হাতে নিয়ে আসতে দেখে আহিন আলভী আনাস সের পিছনে গিয়ে লুকালো।
“দুজন বেরিয়ে আয় বলছি! যতদেরি করবি ঝারুপিটা পিটে ততই বেশি পরবে।
আনাস ভ্রু কুঁচকে আরাতের দিকে তাকালো। আহিন আলভী দুজন একসঙ্গে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। আরাত কিছু বলবে তার আগেই দুজন আরাত কে ফেলে রেখে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেলো। আরাত দুজনের পিছনে ঝারু হাতে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করলো। আনাস তিনজনের প্রতি বিরক্তি হয়ে পুনরায় দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলো। তিনজন দৌড়াদৌড়ি করতে করতে পুরো বাড়ি চিল্লিয়ে মাথায় তুলতে লাগলো। এত বড়ো মেয়ে হয়ে আরাত কে লাফালাফি করতে দেখে আদিবা তালুকদার আরাত কে ধমক দিয়ে দাঁড়াতে বলল। আরাত মায়ের ধমকে দাড়িয়ে পিছন ঘুরতেই কারো ঠোঁটের ছোঁয়া আরাতের কপালে পরলো। হটাৎ কান্ডে দুজন থমকে গেলো আরাত চোখ বড়বড় করে অনেকটা দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। তাকবীর কে নিশ্চুপ হয়ে চোখ বন্ধ আর হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। আরাত পুনরায় দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেলো।
তাকবীরের শরীর তিরতির মেজাজে ফুটে উঠলো। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস নিলে দ্রুত পায়ে নিজের রুমে গিয়ে সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে ঝর্নার নিচে দাড়িয়ে।
” তুমি কেনো বুঝতে পারো না রাত, তোমার এত কাছে আসা আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না।তোমাকে হালাল ভাবে ছোঁয়ে দেওয়ার ইচ্ছাটা বহুদিন। বাট তুমি, আমার ভাবনাতে তুমি অন্য কে জায়গা দিয়েছো। বিলিভ মি রাত! তোমার কল্পনার অন্য কাউকে আমার সহ্য হচ্ছে না। সবকিছু থেকে নিজেকে অনেকটা দূর করতে ইচ্ছা করছে। তোমার কথা মনে এলে নিজেকে এতটা এলোমেলো লাগে কেনো রাত!
তাকবীর ভোরে উঠে মসজিদে গিয়ে ফজরে নামাজ আদায় করে পুনরায় বাড়ি তে এসে মর্নিং ওয়ার্ক জন্য ট্র্যাকসুট পড়ে বের হয়েছিলো। ঘামযুক্ত শরীর নিয়ে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই আরাতের কপাল এসে তাকবীরের ঠোঁট ছোঁয়ে গেলো। তাকবীর সঙ্গে সঙ্গে হাতমুট করে চোখ বন্ধ করল নিজেকে সামলাতে। প্রায় আধাঘন্টা সময় নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে কোট-প্যান্ট পড়ে নিজেকে পরিপাটি করে নিয়ে চললো আফিসের উদ্দেশ্য।
আরিশা আর আমান নিচে নেমে আসতে রাবেয়া তালুকদার আরিশা কে বলল, রাফিদের ডেকে দেওয়ার জন্য। আমান রাফি কে ডাকতে গেলো আরিশা আশিক আর হাবীব কে ডাকলো ঘুম থেকে ওঠার জন্য। সবাই ঘুম থেকে ওঠে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে আসলো সকালের নাস্তা করার জন্য। উপর থেকে আনাস নেমে এলো, রাফি আমান মাহির আরশ আশিক হাবীব আনাস একসঙ্গে নাস্তা করতে লাগলো। আরিশা একবার আরাত দের ডাক দিয়ে নিজেও সবার সঙ্গ বসলো। রাহিমা সুলতানা আর রাবেয়া তালুকদার মিলে সবার প্লটে পরোটা তুলে দিচ্ছে। সবার খাওয়ার মধ্যে হটাৎ গান গাওয়ার আওয়াজে সিঁড়ির দিকে বিস্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলো সবাই।
“হাতে চুড়ি ছমছম বাজে, বসেনা মন কোনো কাজে
প্রেম আসে যায় মনে, তোকে না পাওয়ার কারণে …..
মিম উচ্চস্বরে গান গাইতে গাইতে হাতের কাঁচের চুড়ি গুলো নারেচড়ে দেখতে দেখতে নিচে নামছে। মিমের সঙ্গে সন্ধ্যা ওড়না ঠিক করতে করতে নামছিলো। সবাই কে ওঁদের দিকে বিস্মত হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে সন্ধ্যা মিমের হাত চেপে ধরলো। মিম সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে কী হয়ছে জানতে চাইলো। সন্ধ্যা ইশারায় সামনে তাকাতে। মিম সামনে তাকালো। সবাই কে নিজের দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে মিম লজ্জা পেয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিচের দিকে তাকালো। মিমের মুখের রিয়াকশন দেখে সবাই এবার শব্দ করে হেঁসে উঠলো। সবার হাসিতে আরো বেশি লজ্জা পেয়ে গেলো। মিম ওর বাবা-মা একমাত্র মেয়ে। গ্রামে মিমদের একতালা বাড়ি। বলতে গেলে পুরো বাড়ি মিমের রাজত্ব। মিমের পূর্বথেকে অভ্যাস পুরো বাড়ি একা-একা নাচানাচি করবে গান গাইবে। সেই অভ্যাস থেকে আজকে উচ্চ স্বরে গান গাইতে গাইতে নিচে নামছিলো। মাথায় ছিলো না এটা গ্রাম না মিমের ফুফুর বাড়ি। হটাৎ সবার সামনে গান গেয়ে লজ্জা পেয়ে মিম ডাইনিং টেবিলে যেতে চাইলো না। আশিক মিম কে ডাকলো,
” ছোট আপু লজ্জা পেতে হবে না, এসে পড়ো।
সন্ধ্যা মিমের হাত টেনে নিয়ে আসলো। দুজন পাশাপাশি চেয়ারে বসলো। মিম মাথা নিচু করে চুপচাপ খেতে লাগলো। আরশ আজকে মিমের লজ্জিত হওয়া মুখটা বারবার দেখছে আর নিজে নিজে মুচকি হাসতে সে। রাফি আনাস দুজনের চাওনি সিঁড়ির দিকে। দুটো মানুষ একজনের আসার অপেক্ষা করছে। সন্ধ্যা আর হাবীবের চোখাচোখি তো চলছে।
আশিক আজকে আর বেশি বকবক করছে না। আশেপাশে কারো কমতি অনুভব হচ্ছে তার। আরাত দ্রুতপায়ে এসে চেয়ার টেনে বসে নিজে পরোটা তুলে নিয়ে তাড়াহুড়া করে মুখে তুলতে লাগলো। এতে সবার মনোযোগ আরাতের দিকে গেলো। সন্ধ্যা আরাত কে বলল,
” আসলি তো এখন! আমাদের সঙ্গে আসতে বললাম ঢং করে আসলি না কেনো?
আরাত সন্ধ্যার কথায় পুনরায় আশেপাশে তাকিয়ে । একনজর মাহিরের দিকে তাকালো। আমার ইচ্ছা বলে নিজের খাওয়ার মনযোগ দিলো। আনাস সের নাস্তা করা শেষ টেবিল থেকে উঠে পরেছে সে। সবার ব্রেকফাস্ট শেষ প্রায়। ঠিক তখনই সারারাত কান্না করা আইরা বিসঙ্গ মুখটাতে পানির ছুটানি দিয়ে নিচে নেমে এলো। রাফির চোখ আইরা দিকে। আইরা চোখমুখের আবস্থা দেখে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো যেন। আইরা কিচেনের দিকে তাকিয়ে আনহা শেখ কে বলল,
” আম্মু আমি বাড়িতে গেলাম!
“বেইয়ান আপনাদের গ্রামটা আমাদের ঘুড়িয়ে দেখাবেন না?
রাফির কথায় আইরা খাবার টেবিলের দিকে তাকালো। বেশ বিরক্তি লাগলো রাফির কথায়। রাফি আইরা দের গ্রামের অলিগলি সব চেনা। তারপরও ইচ্ছা করে আইরা কে নিয়ে ঘুরতে চাইছে। আনহা শেখ মেয়ের কথায় ধমকে উঠলেন,
” তোমার কী সমস্যা আইরা! ও বাড়ি তে কেউ নেই তোমার আব্বু এই বাড়িতে। তুমি বাড়িতে একা একা কী করবা। আজকে রাফি দের সঙ্গে গল্প করো আড্ডা দেও রাফি কে সময় দেও।
“আম্মু ওনাকে সময় দেওয়া জন্য, আশিক ভাইয়া-রা রয়েছে তো! আমার এত মানুষ ভালো লাগছে না আমি বাড়ি যাবো।
আইরা কথায় আনহা শেখ এবার রেগে গেলেন।
” সবসময় একা থাকতে থাকতে তুমি সবার সঙ্গে মিশতে ভুলে গেছো, সবকিছু তোমার মার্জি মতো চলবে না। যাও নাস্তা শেষ করো আর সবাই কে নিয়ে পুরো গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাও।
আনহা শেখের কথায় আইরার চোখের পানি এসে গেলো। আরিশা বোনের হয়ে আনহা শেখ কে বলল,
“আম্মু ও থাকনা প্লিজ! ওদের আরাত সন্ধ্যা ঘুরিয়ে আনবে।
আইরা টেবিলে গিয়ে চুপচাপ নাস্তা করতে লাগলো। আনহা শেখ আইরা কে একবার দেখে পুনরায় কাজে ব্যস্ত হয়ে পরলো। রাহিমা সুলতানা আইরা কে চুপিচুপি বলল,
” এত রেগে আছো কেনো! প্রবলেম কী হুম ?
“আইএম ফাইন আন্টি!
রাফি আইরা কে বলল,
“সরি বেইয়ান! আমার জন্য আন্টি আপনাকে বকা দিলেন।
” মুখের দিকে না চেয়ে দ্রুত খাবার ফিনিস করে বাহিরে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আসেন।
আইরা কথায় রাফির মুখে হাসি ফুটে উঠলো, একে একে সবাই রুমে চলে গিয়েছে রেডি হতে। আইরা একা একা ব্রেকফাস্ট করছে। রুপালী বেগম আইরা কে বলল,
“তোমরা কোনে বেড়াতে যাবে?
” জানি না আন্টি!
“তোমাগেরে গ্রামে নদী নাই?
“হ্যাঁ আন্টি বাড়ি থেকে কিছুদূর হেটে যাওয়ার পর সামনে নদী পাওয়া যাবে।
” ও আচ্ছা তাহলে তো ভালোই হয়! শুনো আইরা এইযে মেলা সুন্দর পোলাডা আসে’না! আরশ নাম ওর সঙ্গে আমার মাইয়া কে একটু কাছাকাছি রেখো আচ্ছা?
রুপালী বেগমের কথায় রাবেয়া তালুকদার কে একটু বিরক্তি হতে দেখা গেলো। এতটুকু মেয়ে কে বিয়ে দেওয়ার জন্য রুপোলী বেগম ছেলে দেখা শুরু করছে। গ্রামের মেয়েদের একটু জলদি বিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের সঙ্গে রুপোলী বেগম যোগ হয়ছে এই বয়সে মিম কে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আইরা বুঝতে না পেয়ে বলল,
“কেনো আন্টি?
” আরে মাইয়া তুমি বুঝো না কে! নদীর পাড় দিয়ে দুজন একসাথে কথা কতে কতে গেলে প্রেম হবো দুজনের মধ্যে।
আইরা তব্দা খেয়ে তাকালো রুপোলী বেগমের দিকে। এতক্ষণ যাবত আনাস সোফাতে বসা ছিলো। রুপালী বেগমের কথা কানে পরতেই। ডাইনিং টেবিলের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে আইরা কে বলে উঠলো,
” নদীর পানি সুকিয়ে গেছে! তোদের যাওয়া লাগবে না।
আইরার যেন আনাস সের কথা কানে পড়ে নাই, নিজের মতো করে পরোটা খেতে আছে। রুপোলী বেগম অবাক হয়ে আনাস কে জিজ্ঞাস করলো,
” তাতে কী আনাস বাবা! নদীর পানি সুকিয়ে গেছে তা যাক। ওরা তো যাবে প্রেম করতে। রাস্তা ধার নদীর ধার দিয়ে হাঁটে কথা কইতে কইতে ওদের তো প্রেম হবো।
আনাস নিজের মামির কথায় বিরক্তি হয়ে বলল,
” মামি কেউ রাস্তা দিয়ে কথা বলে হেঁটে যাওয়া কে প্রেম বলে না।
” আহারে বোকা পোলা রে তুমি তো মোর কথা বুঝো নাই! ওরা হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের মতো ফ্রি হয়ে যাবো। তারপর দুজন দুজনের নাম্বার নিয়ে ফোনে কথা কইবো। এমনেই তো দুজনের মধ্যে গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি হবো তাইনা?
আনাস রুপোলী বেগমের কথায় মাথা ঝাকিয়ে হুম বুঝাইতে। কোমরে একহাত রেখে আরেক হাত দিয়ে কপাল ঘুষতে ঘুষতে ভ্রু কুঁচকে আইরা দিকে তাকালো। মনে মনে কিছু একটা ভাবতেই নিমেষেই কুঁচকানো ভ্রু সোজা হয়ে গেলো।
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৫
“তোদের সঙ্গে আমিও যাবো! তোদের একা ছাড়লে বড়আব্বু রেগে যাবে।
আইরা প্লেটের দিকে তাকিয়ে আনাস কে উওর করলো ,
” বড়মামা কে বলে দিবো, তোমার প্রয়োজন নেই।
আইরা টেবিল থেকে উঠে কারো দিকে না তাকিয়ে রেডি হতে নিজের রুমে চলে গেলো। আনাস আইরার যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো শুধু।
