Home তুই শুধু আমার উন্মাদনা তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৫৮

তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৫৮

তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৫৮
তাবাস্সুম খাতুন

নিশানের শক্ত হাতের থাবা পড়লো সিমির বাম গালে। চিৎকার করে বললো,
“আর একটা বার তুই তোর ওই মুখ দিয়ে আমাকে খুনি বলেছিস। আমার বাচ্চার হত্যাকারী বলিস। তবে আমি নিজ হাতে এক্ষুনি তোকে এই জায়গায় দাফন দিয়ে দেবো। বুঝেছিস দাফন। এই তুই বুঝিস না?আমার বুক টা ফেঁটে যাচ্ছে। আমার কষ্ট হই না? আমি কি রোবট? আমি মানুষ আমার মাঝেও অনুভূতি আছে। আর তুই বারবার আমার কাঁটা ঘায়ে লবন মাখাচ্ছিস!আমার ধৈর্যর পরীক্ষা নিতে চাস তুই?”

সিমি মাথা নিচু করে নিশানের সম্পূর্ণ কথা শুনলো। নিশান থামতেই চোখ উঁচিয়ে তার দিকে তাকালো। চোখে পানি টলমল করছে দুই এক ফোঁটা গাল বেয়ে গড়িয়ে আসছে, চওড়া গলায় নিশান কে বললো,
“আমার সন্তান কেউ দাফন দিয়েছেন এখন আমাকেও দাফন দিতে চান। দিয়ে দেন। এর থেকে বেশি কিছু তো করতে পারবেন নাহ। আর হাসি লাগছে আপনার কষ্ট হচ্ছে অনুভূতি আছে হুউ।”
নিশান রাগানিত্ব ভাবে সিমির চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরলো সিমি ব্যাথায় চোখ মুখ খিচে হাত দুটো মাথায় নিলো। নিশান দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“বারবার আমার ধৈর্য্যর পরীক্ষা নিস ইশু। নয়তো তোকে দাফন দিয়ে নিজেও দাফন হতে আমার একটা বারের জন্য ও হাত কাঁপবে না। আমি যেমন ভালো ঠিক তেমন বা তার থেকেও বেশি খারাপ।”
সিমি ব্যাথায় কুঁচকে যাওয়া মুখ নিয়ে বললো,
“সবসময় হুমকি আর মারের মধ্যেই রেখেছেন এই ছাড়া আর কি পারেন?”
নিশান সিমির ছেড়ে দিলো। হুট করে সিমিকে পাঁজা কোলে তুলে চৌধুরী ম্যানশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললো,
“হুমকি, মার দিলেও সবশেষে আরো একটা জিনিষ পারি আদর করতে। তোর কি এখন আদর লাগবে।”
নিশানের এইসব কথা শুনে সিমির আরো রাগ হচ্ছে। কান্না ও আসছে তবুও নিজেকে সামলিয়ে কটাক্ষ গলায় বললো,
“আপনার আদর আপনি গুলে গুলে খান। আমার প্রয়োজন নেই।”
নিশান একই ভঙ্গিতে বললো,

“বউ যদি কাছে থাকে তাহলে আদর আমি একা কেন গুলে খাবো। বউ কে নিয়ে একসাথে পারি দিবো গুলে খাওয়ার দেশে।”
সিমি নাক মুখ কুঁচকিয়ে বললো,
“অসভ্য মার্কা কথা ছাড়া আপনার মুখে আর কোন কথা নেই ছিঃ।”
নিশান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,
“তোর জন্য আমি অসভ্যর সব সীমানা ত্যাগ করেছি। আবার নতুন করে ত্যাগ করার প্রশ্ন আসে না জানবাচ্চা।”
সিমি আর কথা বললো না। সে যত বলবে তত নিশান পেয়ে বসবে। হুউ কথার কি ছিরি, তার নাকি আমার সন্তানের জন্য বুক ফেঁটে যাচ্ছে। আমি আপনাকে কখনো ক্ষma করবো না। আপনার জন্য আজ আমার সন্তান চলে গেলো। ভেবে সিমি নীরবে চোখের পানি ফেললো। নিশান রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে সিমিকে বেডে নিয়ে গেলো। সিমিকে নিজের বুকে নিয়ে লাইট অফ করে দিয়ে বললো,

“ঘুমিয়ে পর আমি আছি।”
সিমি নরম কণ্ঠে বললো,
“থেকেও কি করলেন। নিরাপদ তো আমি নয়। আপনি থেকেও আমার সন্তান নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলো না। এমনটা না হলেও পারতো। কেন হলো আল্লাহ কেন আমার সন্তান কে আমার থেকে কেড়ে নিলো? উত্তর আছে? এর কোন জবাবদিহিতা দেন আমাকে। আমার সয্য হচ্ছে না কষ্ট হচ্ছে আমার বুকটা জ্বলে যাচ্ছে। আপনি এতটা পরিমান নিষ্ঠুর হয়ে গেলেন নিজের অনাগত সন্তান কে একবারের জন্য ও দেখতে পেলাম না। আমিও একটু বুকে জড়িয়ে ধরতাম তাও দিলেন না আপনি। আপনি বড্ড পচা। আমার কাঠগোড়ায় একমাত্র আসামি আপনি নামক এই মানুষটা।”

সিমির এই হৃদয়বিদারক লাইন গুলো কানে যেতেই বন্ধ চোখের পাতায় বারবার ভেসে উঠছে তার প্রিন্সেস এর মুখটা। সেই নিদারুন আর্তনাদ গুলো। তার ইশু কি জানে? তার আর্তনাদ গুলো? তার প্রিন্সেস কে হারিয়ে কিভাবে বেঁচে আছে এখনো? কেন সে দেই নি তার ইশুকে দেখতে? কারন সে তো সয্য করতে পারবেনা। আর সবথেকে বড়ো কথা এতক্ষণ সে ঐসব কথা বলছিলো যেন সিমি কিছুটা হলেও ভুলতে পারে। তবে সেই পীড়া দার যন্ত্রনা কি সে ভুলতে পারবে? মায়ের মন কখনো সন্তান হারানো পীড়া যন্ত্রনা ভুলতে পারবেনা। সারাজীবন তার ইশু এইটা বয়ে বেড়াবে। নিশান মনে মনে শপথ নিলো যেকোনো কিছুর মূল্যে দিয়ে তার ইশু কে সে স্বাভাবিক করবে। এই দেশ সে ছেড়ে দেবে। তার ইশু কে সদুর দেশে পারি জমাবে। তার আগে কালকে পাপীদের শাস্তি দিয়ে যেতে হবে। তার ইশুকে সামনে বসিয়ে সে শাস্তি দেবে। তারপর তাকে নিয়ে এই দেশের মাটি সে ত্যাগ করে সদুর দেশে উধাও হয়ে যাবে। কারোর ধরা ছোঁয়ার বাহিরে।

এইদিকে সিমি ঘুমিয়ে গেছে ক্লান্ত সে। নিশান সিমির কপালে গভীর এক চুম্বন এঁকে দিয়ে ফিসফিস কণ্ঠে বললো,
“আর দুইটা দিন একটু সয্য করে নে জানবাচ্চা তারপর তোকে নিয়ে আমি নিরুদ্দেশ হবো। যেইখানে শুধু আমার নিরাপদ আস্থানা থাকবে শুধু তোকে ঘিরে। আমি তোকে স্বাভাবিক করে তুলবো। তার আগে নিজের চোখে তুই দেখবি আমাদের বাচ্চাকে যারা খুন করেছে তাঁদের শাস্তি ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে!”

সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে শহর জুড়ে। সকাল হতে না হতেই রাত্রি, অভি,সিমরান হাজির। তাকে জানানো হয়েছে রাতে। সে সেই সময় চলে আসছিলো। কিন্তু অভি বললো,
“ভোরের আলো ফুটুক আমি নিজে নিয়ে যাবো তোমাকে।”
তাই রাত্রি রাত টুকু কোন রকমে কাটিয়েছে।রাত্রি আর সিমরান চৌধুরী বাড়ি প্রবেশ করেই সিমিকে খুঁজতে লাগলো। কিন্তু সিমি এখনো রুম থেকে বেরোই নি। কিচেন রুমে সেলিনা, রোজিনা নাস্তা তৈরী করছিলো। মেহেরিমা আর কিয়া ডাইনিং টেবিল গোছাচ্ছিলো। তাজউদ্দিনরা সহ রুবেল মিলে ড্রইং রুমে বসে খবরের কাগজ পড়ছে। জারা আর সামিয়া নিচে নামছে টুকটাক কথা বলতে বলতে। জিহান নিজের রুমে আছে। নিশান সবাইকে বলে দিয়েছে যেন আগের মতোই সবাই সিমির সাথে সেইভাবেই ব্যাবহার করে। কোন প্রকার দুঃখ প্রকাশ তার সামনে করা যাবে না। তাই সবাই স্বাভাবিক আছে। রাত্রি কে দেখে তাজউদ্দিন উঠে আসলো রাত্রি আর সিমরান কে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বললো,

“আম্মুরা এত সকালে কেন আসছো? একটু বেলা হলে আসতে পারতে!”
রাত্রি বিচলিত কণ্ঠে বললো,
“বড়ো মামা আমাদের সিমি কোথায়? সে এখন কেমন আছে?”
তাজউদ্দিন স্বাভাবিক ভাবে বললো,
“তোমার ভাই আছে সিমির কাছে। তাই নিশ্চিন্তে থাকো।”
তাজউদ্দিন অভিকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“কেমন আছো অভি তুমি?”
অভি হাল্কা হেসে জবাব দিলো,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো মামা। আপনি কেমন আছেন?”
“আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আসো ভিতরে আসো।”
তিনজনে ড্রইং রুমের সোফায় বসলো। টুকটাক সবাই কথা বললো। ডাইনিং টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হলো। সবাই বসলো এমন সময় নিশান সিমিকে নিয়ে নিচে নামলো। সিমি আসতেই রাত্রি আর সিমরান দৌড়ে সিমিকে জড়িয়ে ধরে বললো,

“আহ জানু অনেক মিস করছি। এত ক্ষণ পর্যন্ত উপরে থাকা উচিত ছিলো না তোর।”
সিমি হাল্কা হাসার চেষ্টা করে বললো,
“তোর না পশুদিন বিয়ে হলো। আর আজকেই চলে এলি যে? শশুর বাড়ি পছন্দ হই নি নাকি?”
রাত্রি সিমির কানে ফিসফিস করে বললো,
“আমার শশুর বাড়ি ভালো। জামাই ভালো সবকিছু ভালো। তাই আবার বাপের বাড়ি টপকে এলাম। তোদের খবর জানতে হিহিহিহি।”
নিশান নিজের চেয়ারে গিয়ে বসেছে। এইদিকে সিমরান ফিসফিস করে বললো,
“বুঝছোস সিমি ওই কিসের ইঙ্গিত দিলো?”
সিমি মাথা নেড়ে বললো,
“আমি কি গাধা যে বুঝবো না। যাই হোক সু খবর তাড়াতাড়ি আসুক আমিন। ”
সিমরান ও দ্রুত বললো,
“আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এর কোলে বছরে বছরে একটা করে বেবি আসুক আমিন।”
এর মধ্যে নিশান ধমক দিয়ে বললো,
“গল্প না করে নাস্তা কর বেয়াদব।”

রাত্রি আর সিমরান নিজের জায়গায় বসলো। সিমিও বসলো। সবাই স্বাভাবিক ব্যাবহার করছে। সিমি সবাইকে দেখছে আর ভাবছে হয়তো আমাকে মনে করাতে চাচ্ছে না আমি এক সন্তান হারা মা। তাই এত অভিনয় পাকা খেলোয়াড় তার পরিবার। বলে মুচকি হাসি দিলো। এইদিকে সিমরানের সামনে তিহান বসে আছে। সিমরান মাথা নিচু করে নিজের নাস্তা খাচ্ছে। কিন্তু তিহানের চোখ বারবার সিমরানে আটকাচ্ছে। মেয়েটাকে একদিন না দেখে তার নিশ্বাস তাও যেন নিতে পারছিলোনা। আজকে দেখে ভালো লাগলো। নিশ্বাস গুলো যেন আগের তুলনায় বেড়ে গেলো। সবার খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলো। সিমি তেমন একটা খাই নি নিশান জোড় ও করলো না। ওর খাওয়া শেষ হতে নিশান বললো,

তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৫৭

“ড্রইং রুমে বসে গল্প কর আড্ডা দে। এইছাড়া আর কিছু করা যাবে না। কোথাও যাওয়া যাবে না।”
সিমি গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লো। নিশান নিজের রুমে গেলো। সবাই যে যার কাজে চলে গেলো। নিশান রুমে ঢুকে নিজের ল্যাপটপ অন করলো। এই চৌধুরী ম্যানশনের প্রতিটা কোনায় তার হিডেন ক্যামেরা লাগানো আছে যা কেউ জানেনা। নিশান কীবোর্ড এ হাত চালাতে চালাতে একটা ভিডিও অন করলো। যেইটা কালকের ড্রইং রুম আর সিঁড়ির কাছে যেইখানে তেল ফেলানো হয়েছে। নিশান তাকিয়ে রইলো। দশ মিনিট পরে সেখানে সেলিনা আসলো এইদিকে ওইদিকে তাকালো। সিঁড়িতে উঠলো শাড়ির আঁচলে থাকা তেলের বোতল বাহির করে ঢেলে দিলো। তারপর আস্তে আস্তে সিমির রুমে গেলো তাকে ডাক দিলো কি বললো। তারপর আবারো নিজের মতো চুপ করে চলে গেলো। নিশান সাথে সাথে ল্যাপটপ অফ করে দিলো। তার রাগে মাথা ফেঁটে যাচ্ছে। এইরকম কিছু হবে সে কল্পনা করতে পারি নি। তার মা এতটা নিচ কাজ করতে পারলো কি?একবারও বুক কাঁপে নি? যদি আমি জানতে পারি কি অবস্থা হবে?

তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৫৯