নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪
নাজনীন নেছা নাবিলা
সূর্যের তীব্র আলো জানলার পর্দা ভেদ করে চোখে আসতেই নীলার ঘুম হালকা হয়ে যায়। রাতে ছাদ থেকে এসে কাপড় চেঞ্জ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম এসে তার চোখে ভর করে। আস্তে আস্তে বিছানায় উঠে বসলো নীলা।চোখ ডলে কিছুক্ষণ এভাবে ঝিম মেরে বসে রইল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো কেবল ৯টা বাজে। এমনিতে নীলা ভোরে উঠে নামাজ আদায় করে সবসময়। কিন্তু কাল এত ধকল গেল তারপর দেরি করে ঘুমিয়েছে সেই হিসেবে খুব তাড়াতাড়ি উঠে পরেছে সে।হাই তুলতে তুলতে বিছানা ছেড়ে নেমে কাভার্ড থেকে কাপড় নিয়ে সোজা ওয়াশ রুমে চলে গেল। একদম শাওয়ার নিয়েই রুম থেকে বের হবে সে।
লায়লা ইসলাম রুটি বেলছেন।তার পাশেই দাঁড়িয়ে তাওয়ায় রুটি সেঁকছেন তার বড় জা ইরিন। এবং পাশের চুলায় সবজি রান্না করছেন তাদের ছোট জা রুবিনা আক্তার।তিন জা আপন তিন বোনের মতোন। তাদের মাঝে যেমন ভালোবাসা আছে তেমনি মনোমালিন্যও আছে। কিন্তু নিজের সমস্যা নিজেরাই মিটিয়ে নেন। শশুর মশাই নীলার জন্মের আগেই মারা যান। এবং শাশুড়ি মারা যান যখন নীলার বয়স ছিল কেবল চার। শাশুড়ির ইচ্ছে ছিল নীলাকে নিজেদের মাঝেই বিয়ে দিবেন।তাই মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় আরজি জানিয়ে জান যে ইরফানের সাথে যেন নীলার বিয়ে দেওয়া হয়। এবং পরিবারের সবাই এতে দ্বিমত পোষণ করেন না।এর পর থেকে ইরফান কে বলে দেওয়া হয়েছিল যে নীলা বড় হলেই নীলার সাথে তার বিয়ে দেওয়ার হবে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ইরফানের বসয় ছিল তখন কেবল ১০ এই সম্পর্কে অনেকটা ধারণা ছিল।তাই সেও রাজি হয়ে যায়।নীলার যখন জন্ম হয় তখন সে ছিল ধবধবে সাদা। কিন্তু বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকার কারণে আস্তে আস্তে গায়ের রং উজ্জল শ্যামলায় আসে। এবং পরবর্তীতে এত শরীরের যত্নও নেয়া হয়নি তার।কিন্তু মায়া তো মুখেই রয়ে যায়। ইরফান ছোট বেলা থেকেই নীলা কে খুব যত্নে রাখতো। ইরফানই নীলা কে একবার বলেছিল যে নীলা বড় হলে নীলাকে সে বিয়ে করবে। তখন নীলার বসয় ছিল কেবল ৬ বছর। বিয়ে মানে বুঝতো খাওয়া দাওয়া, নতুন কাপড়। ঠিক যেমন তার পুতুলের বিয়ে হয়। তখন সে ছোট্ট নীলা ইরফান কে বলেছিল ___
ইরফান ভাইয়া আমি তোমার পুতুল বউ হব। এবং তুমি হবে আমার পুতুল জামাই।
নীলার এমন কথা সবাই শুনে হাসলেও ইমরান খান খুব রাগারাগী করেছিলেন নিজের ছেলের সাথে।তার রাগের কারণ সবাই জানতে চাইলে তিনি প্রতি উত্তরে বলেছিলেন__
“আমি চাইতাম না নীলা এসব সম্পর্কে জানুক। সে খুবই ছোট এবং নিষ্পাপ। এখন তাকে যা বলা হবে সে তাই মনে রাখবে। ভবিষ্যতে যদি হিতে বিপরীত হয় তাহলে ওর নিষ্পাপ মন ভেঙ্গে যাবে।”তখন অবশ্য সবাই শান্ততা দিয়েছিলেন এমন কিছু হবে না।
এইসকল চিন্তায় এতটাই মশগুল ছিলেন ইরিন যে তাওয়ায় থাকা রুটি পুড়ে যাচ্ছিল তাতে তার কোন হেলদোল নেই।লায়লা ইসলাম তা লক্ষ্য করে রুটি বেলা রেখে সঙ্গে সঙ্গে চুলা নিভিয়ে দিয়ে চিন্তিত স্বরে বললেন___
এই ভাবি কি হয়েছে তোমার?কোন চিন্তায় মগ্ন ছিলে তুমি? রুটি তো পুড়ে কয়লা হয়ে গেল।
লায়লা ইসলামের কথা শুনে রুবিনা আক্তার চুলার আঁচ কমিয়ে তাদের দুজনের দিকে মুখ করলেন।ইরিন আক্তার হুঁশ ফিরতেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তাকে হঠাৎ এইভাবে কাঁদতে দেখে দুই জা মিলে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। একজন তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করছে তো আরেক জন তার পিঠে হাত বুলিয়ে থামানোর চেষ্টা করছে।ইরিন আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বললেন ___
উনি এই ভয়টা পাচ্ছিলেন তা। এখন সত্যি তে পরিণত হলো। আমার নিষ্পাপ নীলার নিষ্পাপ মন ভেঙে গেল।
কথাগুলো বলে আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার বলা কথাগুলো শুনে লায়লা ইসলাম ও রুবিনা আক্তার দুজনের চোখই অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই লায়লা ইসলাম নিজেকে সামলে বড় জা কে ভরসা দেওয়ার জন্য
বললেন ___
আমার মেয়ে কি এতটাই দূর্বল নাকি? তার মাঝে যে আমি মিনু আপুর ছায়া দেখতে পাই।এত সহজেই ভেঙে পড়ার মতো আমাদের মেয়ে নীলা না। তার মাঝে যে মির্জা বংশের রক্ত চলাচল করছে। তাহলে আমরা কান্নাকাটি করে কেন আমাদের মেয়েকে অপমান করব?
লায়লা ইসলামের কথা শুনে ইরিন আক্তার চোখের পানি মুছে ফেলল। তারপর ঠোঁটে হাসি বজায় রাখার চেষ্টা করে বললেন___
“ঠিকই বলেছিস তুই। আমাদের মেয়ে তো কোনো দোষ করে নি। তাহলে সে কেন কষ্ট পাবে।আমি পরের মেয়েকেও দোষারোপ করব না।সকল দোষ আমার নিজের ছেলের যে নিজের জীবন নিজ হাতে নষ্ট করেছে।তার পাপের ফল সে ঠিকই পাবে।”
রুবিনা আক্তারও বড় দুই জায়ের কথায় সায় দিয়ে
বললেন ___
হয়েছে এখন তারাতাড়ি রান্না করোতো। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। সবারই তো ক্ষুদা লেগেছে।আর তোমার ছেলে এবং তার বউ কেও তো দেখছি না।
ইরিন আক্তার আবার চুলা ধরিয়ে রুটি সেঁকতে সেঁকতে বললেন ___
তাদের জীবন তারা বুঝে নিবে। তাদের নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই।
কামিং।
নিজের কেবিনে বসে ছিল মিহাল। দরজায় নক শুনতেই আসার অনুমতি দিল।দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল লিসা।পুরো নাম তার লিসা কায়নাত।সে এই ইউনিভার্সিটির একজন স্টুডেন্ট। অনার্স তৃতীয় বর্ষে অর্থনীতি নিয়ে পড়ছে।তার বাবা মিস্টার ইমন কায়নাত এই ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। বলতে গেলে এই ইউনিভার্সিটিতে তার মন মর্জিতে হয় অনেক কিছুই।সে আবার মিহাল কে পছন্দ করে।মিহাল যখন প্রথমবার তাদের ক্লাস করেছিল তখনই সে মিহাল কে দেখে ক্রাশ খেয়েছিল। এরপর থেকে ক্লাসেই যেই মেয়েই মিহালের দিকে তাকাতো সে তাদের হুমকি দিত। কিন্তু তার আফসোস একটাই মিহাল তার দিকে কখনোই তাকাতো না। দেখতে সে যথেষ্ঠ সুন্দর। গায়ে রং রঙ লাল সুন্দর।কোমর সমান চুল লেয়ার কাটিং করা। লালচে চুল সূর্যের আলোকে চিকচিক করে। ইউনিভার্সিটির সকল ছেলে তার পেছন ঘুরে।
মিহাল ডেস্কের উপর রাখা কম্পিউটারে কিছু করছিল তাই তার সামনে কে এসেছে তা সে চোখ তুলে দেখার প্রয়োজন বোধ করলো না। লিসার পরনে কালো শার্ট স্কার্ট এবং সাদা শার্ট। শার্টের প্রথম দুই বোতাম খোলা। শার্ট গায়ের সাথে একদম ফিটিং হয়ে লেগে আছে।লিসা একদম মিহালের ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ায়।মিহাল তাকে চোখ তুলে না দেখায় সে মনে মনে রেগে যায়। কিন্তু নিজের রাগ কন্ট্রোল করে মিষ্টি সুরে বলতে শুরু করল ____
স্যার আইম লি,,
লিসা নিজের কথা সম্পূর্ণ করার আগেই মিহাল নিজের পুরুষালি গম্ভীর কন্ঠে বলল ___
আইএম নট ইন্টারেস্টেড ইন ইওর নেইম।জাস্ট টেইল দ্যা রিজেন হোয়াই ইউ কাম হেয়ার।
মিহালের এমন রূঢ় আচরণে গা জ্বলে উঠলো লিসার।সে কিছু না বলেই হনহনিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল।মিহাল একবার তাকিয়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করলো না।
বাড়ির সকল পুরুষরা খাওয়া দাওয়া করে বের হয়ে গেছে বাড়ি থেকে।এখন বাড়ির মহিলারা এবং মেয়েরা বাকি। নীলা গোসল করে ছাদে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ছাদে গিয়ে দেখলো ইরফান ছাদে থাকা ছোট্ট চৌকি যেখানে মূলত সবাই বসে আড্ডা দেয়, সেখানে শুইয়ে ঘুমাচ্ছে আর শীতে কাঁপছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে নীলার বিন্দুমাত্র খারাপ লাগলো না। নীলা যতই বাহির থেকে শক্ত থাকুক না কেন মন তার খুব নরম। এমন অবস্থায় যেকোন মানুষকে দেখলেই তার খারাপ লাগতো। আর সেই জায়গায় তো তার প্রাণপ্রিয় ইরফান যার জন্য সে কোন এক সময় নিজের জান দিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু নীলার মন-মানসিকতা অনেকটাই ভিন্ন। যাকে ভালবাসবে তার কাছ থেকে ভালোবাসা না পেলেও তার জন্য সে অনেক কিছু করতে রাজি। কিন্তু যদি নিজের সব থেকে ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে একবার আঘাত পায় তাহলে তার দিকে ফিরে তাকাতেও সে রাজি না। এখন যেমন ইরফানের জন্য তার বিন্দুমাত্রও কষ্ট হচ্ছে না। ছাদে না থেকে আবার নিজের ঘরে চলে আসলো। বারান্দায় টাওয়াল শুকাতে দিয়ে কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। নিজেকে এমন শক্ত থাকতে দেখে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করল ____
কোই আমার তো বিন্দুমাত্র কষ্ট হচ্ছে না। আফসোস হচ্ছে যে নিজের মূল্যবান সময় মূল্যহীন অনুভূতি ভালোবাসা প্রতারকদের জন্য নষ্ট করেছি। কিন্তু একটুও কষ্ট হচ্ছে না ধোঁকা পেয়ে। বরং নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে কারণ প্রতারকদের আমি চিনতে পেরেছি। এবং এর সাথে সাথেই মানুষকে ভালোবাসা কিংবা বিশ্বাস করার সাহস হারিয়ে ফেলেছি।
কথাগুলো বলে নীলা এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো।চুল শুকিয়ে মুখে ক্রিম, শরীরে লোশন লাগিয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে নিচে চলে গেল।সে বরাবরই শালীন ভাবে চলতেই পছন্দ করে।তার মতে চুল বের করে মানুষকে দেখিয়ে হাঁটলেই সেটা স্টাইল হয়ে যায় না। গতকাল রাতেও তো শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করে হিজাব পড়েছিল। এবং বিয়ের দিনেও হিজাব না পড়লেও মাথায় ঘোমটা দিয়েছিল।নীলা আস্তে আস্তে রুম থেকে বের হয়ে নিচে চলে গেল।
ইরফানের ঘুম ভাঙল ইবাদের ডাকে।ইবাদ ছাদে এসে নিজের বড় ভাই ঠিক হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে হাসলো তারপর বললো ____
ঠিকই আছে রাজকন্যা কে রেখে যদি শাকচুন্নিকে বিয়ে করা হয় তাহলে কপালে ছাদে থাকাই লেখা আছে।
কথাগুলো বলেই নিজের ভাইকে ডাকতে লাগলো। ইরফান আস্তে আস্তে উঠে বসলো। মাথা তার ভার হয়ে আছে। ঠিকমতো ঘুম হয়নি রাতে । তার ওপর আবার রাতে শীত লেগেছিল ভীষণ।ইবাদ ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে খোঁচা দিয়ে বলল___
যেমন কর্ম তেমন ফল।
থেকে বলেই ছাদ থেকে নামার জন্য দৌড় দিল। ইরফান কিছু বলল না কেবল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো ।কাল নীলার বলা কথায় সে ভীষণ আঘাত পেয়েছিল।তার নীলা কখনোই তাকে আঘাত দিত না। সেই ছোট্টবেলা থেকেই যদি সে ব্যাথা পেতো তাহলে তার কষ্ট দেখে নীলা কান্নাকাটি করতো।তার জ্বর হলেই তার মায়ের সাথে নীলাও সারা রাত জেগে তার সেবা করত। ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে মাথা টিপে দিত। অথচ কাল এমন ভাবে অপমান করার পর একবারও তার দিকে না তাকিয়ে ছাদ থেকে হনহনিয়ে চলে গেল।আর যাকে বিয়ে করে এনেছে সে একবারও তার খোঁজখবর নিল না। ইরফান আর বসে না থাকে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে চলে গেল। নিজের ঘরে গিয়ে দেখল আরশি নীলার এক জামা পরে বসে বসে বিছানায় ফোন চালাচ্ছে। ইরফান কে একবার দেখে তারপর আবার ফোনে মনোযোগ দিল। একবারও জিজ্ঞেস করল না সে সারারাত কোথায় ছিল।
ইরফান আরশির সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ____
নীলার জামা তুমি কেন পরেছো?
আরশি নির্বিঘ্ন ভঙ্গিতে বলল ____
বিয়ে করার সময় তো আর কোন কাপড় নিয়ে আসিনি। আর তোমার শার্ট পড়ে তো আর সবার সামনের যেতে পারবো না। তাই নীলার রুমে গিয়ে তার কাভার্ড থেকে জামা বের করে নিয়ে এসে পড়ে ফেলেছি। তার সবকিছুই তো আমার জানা।
ইরফান অবাক হলো তারপর বলল___
নীলার অনুমতি নিয়েছো?
আরশি হেসে উঠলো তারপর বলল___
নীলা কে ঠকিয়ে আমার কাছে আসার সময় তুমি কি একবারও নীলার অনুমতি নিয়েছিলে?
ইরফান স্তব্ধ হয়ে গেল। তার ভেতর দিয়ে এক ঝড় বয়ে গেল। ভেতরটা কেমন খাঁ খাঁ করে উঠলো। প্রতি উত্তরে কিছু বলার জন্য খুঁজে পেল না। তাই আর কথা না বলে কাভার্ড থেকে নিজের কাপড় নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল।
ডাইনিং টেবিলে বসে নীলা আবির আর ইবাদ তিন জন মিলে খাবার খাচ্ছে।ইবাদ নিচে এসেই সবার সামনে বলে দিল ইরফান কাল সারারাত ছাদেই কাটিয়েছে। কথাটি শুনে সকলেই নীলার দিকে দৃষ্টিপাত করলো। কিন্তু নীলা নিজের মত খাবার খাচ্ছিল। এমন ভাব করছিল যেন সে কিছুই শুনেনি। অথচ কিছুক্ষণ আগেই সে নিজ চোখেই দেখে এসেছিল।সবাই নীলার ঠান্ডা ব্যবহার দেখে নিশ্চিত হলো যে তাদের মেয়ে অনেক আগেই নিজেকে সামলে নিয়েছে তাই কেউ আর এই বিষয়ে কোন কথা বলল না। সিঁড়ি দিয়ে নব দম্পতি নেমে আসছে। কেউ তাদের দিকে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করল না। সবাই মিলে একসাথে খেতে লাগলো। ইরফান এসে নীলার সামনাসামনি বসলো। দৃষ্টি তার নীলার দিকে আটকে আছে।আরশি ইরফানের পাশের চেয়ারে বসলো। ইবাদ খেয়াল করলো আরশি নীলার জামা পরেছে যা তার মোটেও পছন্দ হলো না।তাই আরশির দিকে ভ্রু জোড়া কুচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো
এই মহিলা আপনি আমার নীল আপুর জামা কেন পড়েছেন?
আরশি ঠিক পছন্দ হলো না ইবাদের তাকে মহিলা বলে সম্বোধন করায়। কিন্তু সবার সামনে নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। ইবাদের কথায় সবাই আরশির দিকে তাকালো এমনকি নীলা নিজেও।আরশির পরনে তার কেনা সব থেকে পছন্দের ড্রেস দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো তার মুখে।আরশি ন্যাকামি করে বললো____
বারে আমি কি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এর জামা পড়তে পারি না? আর নীলার এই ড্রেসটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আর সম্পর্কে তো সে এখন আমার ননদ হয়। এবং আমি নিজের কোন ড্রেস আনিনি।
নীলা মুচকি হেসে বলল ____
কেন নয় ভাবি অবশ্যই তুমি পারো। আর তাছাড়াও সব সময়ের মতো তোমার নজর আমার ব্যবহার করা প্রিয় জিনিসের প্রতি রয়ে গেল। এখন যদি তোমার সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস নিতে সমস্যা না হয় তাহলে আমারও তোমাকে দান করে দিতে কোন সমস্যা নেই। সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস আবার আমার স্ট্যান্ডার্ড এর সাথে যায় না। তুমি বরং তোমার কাছে রেখে দাও।
নীলার এমন কথায় আরশির মুখ চুপসে গেল। উপস্থিত সবাই মিটমিট করে হাসলো। কেবল অবাক নয়নে ইরফান নীলার দিকে তাকিয়ে রইল।তার জানা মতে আরশি নীলার সবথেকে কাছের।নীলা আরশির জন্য নিজের অনেক পছন্দের জিনিস বিসর্জন করেছে। কেউ যদি আরশির দিকে তুলে তাকিয়ে কথা বলেছে তাহলে নীলা তার প্রতিবাদ করেছে।অথচ আজ নীলা নিজের আরশি কে সকলের সামনে অপমান করলো।
সবাই আবার খাবার খেতে মনোনিবেশ করল। এর মাঝখানে নীরবতা ভেঙে ইবাদ বলে উঠলো জানো নীলা আপু আমার একটা গান মনে পড়ে। নীলা ইবাদের দিকে তাকালো এবং মিষ্টি সুরে জিজ্ঞেস করল
“কোন গান?”
ইবাদ সুর দিয়ে গাইতে লাগলো ____
“কিশোরী কিশোরী কিশোরী কিশোরী
তোকে না পাইলে জানিনা কী করি
কিশোরী কিশোরী কিশোরী কিশোরী
হয়ে যা, হয়ে যা শুধু আমারই।”
ইবাদের গান শুনে নীলার ঠোঁটে প্রসারিত হলো। খুব মিষ্টি একটি হাসি উপহার দিল ইবাদ কে। উপস্থিত সবাই মুচকি হাসলো।আরশির সহ্য হলো না নীলার এমন খুশি তাই সে আগ বাড়িয়ে ইবাদ কে জিজ্ঞেস করলো___
“আর আমাকে দেখে কোন গান মনে পড়ে তোমার?
ইবাদ কিছুটা বিরক্ত বোধ করল তারপর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি আসতেই বলতে শুরু ___
আপনাকে দেখে আমার একটি গান মনে পড়ে।
আরশি উৎফুল্ল হয়ে বললো___
তাড়াতাড়ি বল কোন গান।
ইবাদ গানের সুর ধর___
খিচুড়ি খিচুড়ি খিচুড়ি খিচুড়ি,
আমার ভাই বিরানি রেখে বেছে নিল খিচুড়ি।
খিচুড়ির গান শুনলে আমার পায়ে যে বমি,
খিচুড়ি খেতেই বলি দূরে যা এখনই।
উপস্থিত সবাই হেসে উঠলো। আসলে ইবাদের থেকে অপছন্দের খাবার হল খিচুড়ি। এগুলো কিছু অপছন্দ করলে সে সেটি খিচুড়ির সাথে তুলনা দেয়। আরশি আবার অপমান বোধ করলো।
নীলা হাসতে হাসতে বলল ___
উফ্ ইবাদ তুই তো বাংলাদেশের ফিউচার সিঙ্গার ।
ইরফানের রাগ উঠে গেল।একেই কাল রাতের করা নীলার কাজ। তারওপর তার অপছন্দের জিনিস করা আবার আরশির ওপরও রাগ উঠেছিল সব মিলিয়ে এখন জোর গলায় বলে উঠলো ____
মানলাম আমি তোকে বিয়ে করিনি নীলা। তাই বলে তুই কষ্ট পেয়ে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে তা আমি ভাবতে পারিনি। তোকে আমি কি করে সামলাবো?
ইরফানের এমন নির্লজ্জ মার্কা কথাবার্তায় উপস্থিত সবাই অবাক দৃষ্টিতে ইরফানের দিকে তাকিয়ে আছে।কেবল আরশির ঠোঁটে হাসি।ইরিন আক্তার নিজের ছেলেকে কিছু বলতে যাবেন তার আগেই লায়লা ইসলাম তাকে ইশারা দিয়ে থামিয়ে দিলেন। তিনি দেখতে চান তার মেয়ে প্রতিউত্তরে কি বলে।
নীলা শব্দ করে হেসে উঠলো ইরফানের কথায়।তার হাসি দেখে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে গেল। তারপর নিজের হাসিকে নিজের আয়ত্তে এনে ইরফানের চোখে চোখ রেখে বলল ____
পুরুষ মানুষদের যদি সোনার থালা দান করা হয় তাহলে তারা সেই থালা নিয়ে বেহায়াদের মতন ভিক্ষা করে বেড়ায়। আর সেই জায়গায় তো আমি নিজেই ডায়মন্ড ছিলাম। তোমার মতো এমন কাপুরুষ আমাকে কি করে সামলাতো ইরফান ভাই?
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩ (২)
নীলার বলা কথা শুনে ইরফানের মুখে তুলা খাবার গাল দিয়ে নামে না।আরশি অবাক দৃষ্টিতে নীলার দিকে তাকিয়ে আছে। বলার মতন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। আর উপস্থিত বাকিরা অট্ট হাসিতে ফেটে পরে। ইরফানের মুখ লজ্জায় এবং রাগে লাল হয়ে যায়। খাবার না খেয়েই সেই চেয়ার থেকে উঠে নিজের রুমে চলে যায়। আরশি এখনো নীলার দিকে তাকিয়ে আছে।
