চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫৪
আরোবা চৌধুরী আরু
বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে সায়ফান গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ও নাটকীয়ভাবে দুই হাত কোমরে রেখে বলল,
“আরে আরে… সত্যি সত্যি আমাদের সামনে থেকে সরে গেলো রে! মানে বললাম, যেকোনো রুমে গিয়ে যা ইচ্ছে করো, আর এরা সেই কথাই সিরিয়াসলি শুনে নিল! আশ্চর্য ব্যাপার তো, অন্য সময় তো কথা শোনে না একটুও।”
মুখটা আরেকটু ব্যাজার মতো করে যোগ করল,
“ওইটা কি আমার মনের কথা ছিল নাকি? এসব চুম্মাচাটি দেখলে দিলে জ্বালা ধরে ঠিকই… কিন্তু দেখতেও আবার খুব মন্দ লাগে না। !”
পাশে দাঁড়ানো রাজিব আর সহ্য করতে পারল না। ধাম করে সায়ফানের কাঁধে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল।
“তোমারে কি আর বলমু সাইফান… তুই আসলেই একটা লেজকাটা বাঁদর!”
সায়ফান হা করে রাজিবের দিকে তাকাল।
“কেন বাঁদর! আমি দিব্যি মানুষ! পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মানুষ! বান্দর কেন হইমু? এটা বলতে পারতো ভার্জিন থাকতে থাকতে পাগল হয়ে যাচ্ছো, তাই মুখে যা আসে তাই বলছো! তারাতাড়ি একটা বউ পটিয়ে বিয়া কর, নিজের ভার্সেনিটি নষ্ট কর, মাথা ঠিক হইয়া যাবে!”
রাজিব দুই হাত তুলে মাথা নাড়তে লাগল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“হায় হায়… ভাই তুই কি দিয়ে তৈরি বলতো? ”
ওদের ঝগড়াঝাটি দেখে করিডোরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরিন আর মেহরাব পুরো হা হয়ে গেছে । সায়ফান যেভাবে নিজের ভার্জিনিটি প্রকাশ্যে ঘোষণা মারলো, ওরা দুইজনেই মাল্টিফ্লেভার আইসক্রিম খাওয়া বাচ্চার মতো মুখ হাঁ করে তাকিয়ে রেয়েছে।
মেহেরিনের চোখ বড় হয়ে গেছে। মেহরাব ও অস্বস্তিতে পড়ে গেছে।
এগুলো দেখে সায়ফান মাথা চুলকে হালকা হাসার চেষ্টা করল,
“ইশশ রে… এই দুইটা কচি মাল যে এখানে দাঁড়াইছে, মনেই ছিল না। ওরাও জেনে গেলো আমি ভাজিন এখনো! বাহ! বাহ! মানুষর জীবনটা আর গোপন থাকল কোথায়! মিডিয়া না থাকলেও দুইটা ছোট্ট নিউজ চ্যানেল এখানে দাঁড়াই আছে!”
মেহেরিন মুখ ঢেকে হাসছে, মেহরাব শব্দ করে হেসে ফেলল এবার।
সায়ফান এবার মিষ্টি করে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আহারে আমার এত কষ্ট লাগতেছে… তোমরা কত হেল্প করলে নাফুকে সেফ রাখলে! আর আমার ভাই এসে তোমারিই ধুয়ে দিলো সাবান ছাড়া রাগের মাথায়। আর এখন নিজেরা তো রুমে গিয়ে মান-অভিমান ভাঙায় ব্যস্ত!”
এ কথা শুনে মেহেরিন আর মেহরাব দুজনেই লজ্জায় গুটিশুটি হয়ে গেল। এতটাই যে কোন উত্তরই বের হল না।
রাজিব আবার সায়ফানের কাঁধে এক চাপড় মেরে বলল,
“চল, সিরিয়াস হও। আগে এইড বক্স আন। ওরে একটু ব্যান্ডেজ লাগাই। আর হে—”
সে মেহেরিন আর মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমরা কিছু মনে না করলে, আজ রাতটা আমরা এখানে থাকি। বাইরে যেতে কেউই এখন ফিট না। আর সায়মান স্যারও রুম থেকে বের হবে না….. …”
মেহেরিন আর মেহরাব একই সাথে দ্রুত মাথা নাড়ল,
“জি ভাইয়া, অবশ্যই! কোন সমস্যা নাই। থাকেন। রুম আছে, সব আছে।”
পাশ থেকে সায়ফান সঙ্গে সঙ্গে কথা ঢুকিয়ে দিল,
“রুম থাকলে আগে আমাদের কয়টা খাইতে দাও তো! সারাদিন গরুর মতো দৌড়াইছি, পেটে দানাপানি পেটে যন্ত্রণা আছে খিদের বহুত !”
মেহেরিন মিষ্টি হেসে বলল,
“আছে ভাইয়া। রান্নাঘরে খাবার আছে। আমি গরম করে দিছি।”
সায়ফান দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকাল,
“আহা! এইজন্যই বলি কচি মেয়েরা সবচেয়ে কাজের! দেখো—হালকা কিউট, হালকা নার্ভাস, কিন্তু কাজে হালকা না! আর আমার দামরী চশমা আফা খালি ঝাড়ির দেয় আর জিতে যাই! একটু অমৃতই খেতে দেয় না জীবনটাই বেদনার? ”
মেহরাব এবার আর থাকতে পারল না,
“ভাই—আমার বোনেরে কচি কচি বলতেছেন কেন? একটু ঠিকঠাক কথা বলেন!”
সায়ফান নাক টেনে বলল,
“আরেহ ভাই রাগ করো না… কচি বলছি মানে এভাবে—টাটকা… আঁটি সহ কম বয়সী… মানে… এই যে— তোমরা নতুন!”
রাজিব থতমত খেয়ে হাসতে লাগল,
“থাক থাক! বেশি বোঝাতে যেয়ে আবার খারাপ করে ফেলবি।
রুমটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে । সেই নিস্তব্ধতার ভেতর সায়মান নাফিসাকে খুব ধীরে, খুব সাবধানে বেডের উপর বসিয়ে দিল। মনে হচ্ছে, যদি একটু জোরে ছোঁয়াও, তার বউ ভেঙে যাবে।
নাফিসার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে। চোখ দুটো লাল, মুখ ফ্যাকাশে। সায়মান নাফিসার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ল। চোখ তুলে তাকাতেই নাফিসার বুকের ভেতর জমে থাকা সবকিছু ফেটে বেরিয়ে এল,
সে সায়মানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এত শক্ত করে… যেন কেউ তার কাছ থেকে মানুষটাকে আবার ছিনিয়ে না নেয়।
নাফিসা এবার শব্দ করে কেঁদে দিলো । বুক ভেঙে যাওয়া কান্না।
সায়মান দুই হাত দিয়ে তাকে আগলে রাখল, কাঁধে, পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
সায়মানের গলার স্বর কাঁপছে,
“সরি… আমার বউ… খুব সরি… আমি আর কখনো… কখনো তোমাকে এভাবে একা ফেলে রাখবো না। জীবনে না। আমার ভুল ছিল। অনেক বড় ভুল…”
নাফিসা কোনো উত্তর দিল না। শুধু কাঁদছে। বউয়ের কান্না যেন সায়মানের বুক ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে… সেই কান্নায় ক্ষমা নেই, অভিযোগও নেই, শুধু ভয়… হারিয়ে যাওয়ার ভয়।
সায়মান ওর চুল কানে গুজে দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বউ? অভিমান করছো আমার ওপর?”
নাফিসা গা ফুলিয়ে একটু পিছিয়ে এলো। কান্না থেমে গেছে, তবে চোখ ভেজা। অসুস্থ শরীরে ও মুখ ফুলে থাকা বউটাকে আরো আদুরে লাগলো সায়মানের কাছে থমকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে এক মায়াভরা হাসি খেলে গেল,
“আমার পিচ্চি বউটা…”
বলে সে দুই হাত দিয়ে নাফিসার গাল ধরল। তারপর ধীরে… খুব ধীরে… তার অধরে আঙুল বুলিয়ে নিজের কাছে টেনে আনল।
পরের মুহূর্তেই, সায়মান নাফিসার ঠোঁটে চুমু দিল।
একবার না
বারবার…
অসংখ্যবার…
নাফিসা কিছুই বললো না। শুধু চোখ বুঁজে তার শ্বাস ফেলে দিল সায়মানের হাতে।
সায়মান এবার অধর সরিয়ে নিয়ে নাফিসার গালে হাত রেখে বলল,
“অভিমান কি শেষ হয়েছে? না হলে আর চুমু দেওয়া লাগবে কি বউ ? দিবো কি আরো চুমু? চুপ কেন? তারমানে এখনো লাগবে চুমু তাই তো ওকে। ”
নাফিসা একটু লজ্জা পেল, মাথা নাড়িয়ে না বলে নরমভাবে তার বুকের সাথে মুখ লুকাতে চাইল।
সায়মান সেটা দেখে মৃদু হাসলো, আগলে নিলো নিজের পিচ্চি বউটাকে।
কিন্তু হঠাৎ… নাফিসা সায়মানের বুক থেকে মাথা তুলে সে দু’হাত দিয়ে নিজের পেটের দিকে ইশারা করল। চোখে কান্না আবার ভাসল, তবে এবার তা দুঃখের না, নরম, মায়া ভরা।
“ওর অভিমান ভাঙান আগে…”
নাফিসার গলা খুব ক্ষীণ… ফিসফিসের মতো।
সায়মানের বুকের ভেতর এক ঝটকা উঠে গেল। তার চোখ হঠাৎ লাল হয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে গেল। কাঁপা হাত তুলে সে নাফিসার পেটের ওপর রাখল। সে আর শ্বাসই নিতে পারছে না।
“এখানে…”
তার কণ্ঠ ভাঙা।
“এখানে আমার…?”
নাফিসা চোখ নামিয়ে নরম করে মাথা নাড়ল।
সায়মানের হাত কেঁপে উঠল। মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেল,
আনন্দ, বিশ্বাস না-হওয়া, বিস্ময়—সব মিশে একাকার।
সে দুই হাত দিয়ে নাফিসার পেটকে আদর করতে লাগল… আঙ্গুল কাঁপতে কাঁপতে পেটের উপর বুলিয়ে দিল।
“আমার অস্তিত্ব…”
তার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“আমার…
আমার সন্তান…”
সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তোমাকে হারাতে পারতাম বউ… তোমাকে আর তাকে… দু’জনকেই…”
পরের মুহূর্তেই সে নাফিসার জামাটা একটু উপরে তুলল, খুব যত্নে, যেন তাকে ব্যথা না লাগে।পেট আলগা করে তারপর সে মাথা নিচু করে নাফিসার পেটেই চুমু দিল।
একবার…
দুইবার…
তিনবার…
অগণিত বার, তার গলার শব্দ রুদ্ধ হয়ে গেল। সে নাফিসার পেটের উপর মাথা রেখে বলল,
“এই আমার অস্তিত্ব।
আমার সন্তান।
আমার বউ…
আমার সব।”
নাফিসা কাঁপা হাতে সায়মানের চুলে হাত রাখল। সেই স্পর্শে সায়মান চোখ বন্ধ করে ফেলল,
যে চোখ গত ১২ ঘন্টা শুধু ভয় দেখেছে, আতঙ্ক দেখেছে, পাগলামি দেখেছে, এখন সেখানে শান্তি, স্বস্তি, মায়া।
নাফিসা ধীরে বলল,
“… আপনি যদি আর আসতে না… আমি…”
“চুপ।”
সায়মান সঙ্গে সঙ্গে নাফিসার মুখে হাত রাখল। চোখের কোণে পানি জমে উঠল।
“এমন কথা আর কখনো বলবে না। তুমি আমার বউ। তোমার ছাড়া আমি শেষ। তোমাদের দুইজন ছাড়া আমি কিছুই না।”
নাফিসা একটু হাসল অন্তরের সায়মান আবার তার মুখে চুমু দিল।
নাফিসা এবার সায়মানের শার্ট আঁকড়ে ধরল,
“আমি ভয় পাইছিলাম… খুব।”
সায়মান তাকে বুকে জড়িয়ে নিল শক্ত করে।
“আর ভয় পাবে না।
আর এক মুহূর্তও তোমাকে চোখের আড়াল হতে দেবো না বউ।
নাফিসা চোখ বন্ধ করল, তার কাঁধে মুখ রেখে। রুমের বাতাস ভারী
সায়মান আবার নাফিসার পেটে চুমু দিল, এবার আরও দীর্ঘ, আরও মায়াভরা।
হঠাৎ সায়মান মাথা তুলে মুখ উঁচু করেন অফিসার দিকে তাকালো, কিছু একটা ভেবে ঠাস করে নাফিসার গালে একটা থাপ্পড় মেরে দিল।
সায়মান দাঁত চেপে, রাগ আর অবিশ্বাসে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“পাকনামো করে প্রেগনেন্ট হতে কে বলেছে তোকে? ইডিয়েট কোথাকার! আমাকে না বলে—আমাকে ঘোল খাইয়ে—আমার অস্তিত্ব নিজের পেটে রাখলি বউ? পুলিশ হয়ে নিজের ঘরের বউয়ের চুরি ধরতে পারলাম না! ছি! ছি! আমি তো পুলিশ নামে একেবারে কলঙ্ক হয়ে গেলাম, বউ!”
নাফিসা পুরোপুরি স্থির হয়ে গেল। অবাক, হতবিহ্বল চোখে সায়মানের দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমার পিচ্চি বউ আমাকে সোজাসুজি ডাকাতি করে নিল রে! আমার মহামূল্যবান ডিএনএ নিজের পেটে স্থাপন করে। কী সাহস দেখে কাজটা করলি বলতো পিচ্চি বউ ?”
নাফিসা ভয়ে কেঁপে উঠল। সায়মানের গলার টোন একটু শক্ত হলেই তার বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। সেই ভয়েই শব্দ করে হু হু করে কান্না শুরু করলো নাফিসা। কাঁদতে কাঁদতে গলা কেঁপে উঠে কথাগুলো বেরিয়ে এলো,
“সরি… ভুল হয়ে গেছে… আর এমন করবো না। আর বাবু নিবো না… এবার থাক…”
কথা শেষ হতেই নাফিসা নিজের দুই হাত দিয়ে চোখ মুছলো। সায়মান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। সেই চাওয়াটায় রাগের সঙ্গে হাসিও মিলেমিশে আছে,
“ইডিয়েট, এখন কান্না করছে আমার মন গুলানোর জন্য। আর বাবু নিবে না মানে? আমার এখনো অনেক বাবু চাই। কিন্তু আমাকে না বলে নিজে নিজে পাকনামো করলে তুলে আচার দিবো। ডিএনএ চুন্নি বউ আমার… মানুষে শুনলে আমার মানসম্মান থাকবে না, ছে ছে।”
সায়মানের কথা শুনে নাফিসা গাল ফুলিয়ে বসে রইল। অভিমানী বাচ্চার মতো ফুঁসে থাকা সেই মুখটা দেখে সায়মানের হাসি চেপেই ধরতে হলো।
“চুরি করে এখন ইনোসেন্ট ফেস বানাচ্ছে! নিজেই বাচ্চা, কথায় কথায় গাল ফুলাই, সে নাকি আমার বাচ্চা সামলাবে!”
নাফিসা মুখ ফিরিয়ে নিলো, কিন্তু তার কাঁধের কাঁপুনি, ভরসা চাওয়া দৃষ্টিটা সায়মান ঠিকই বুঝে ফেলে। একটু এগিয়ে এসে সে নাফিসার গাল টেনে ধরলো। তারপর হঠাৎই দুই হাত দিয়ে নাফিসাকে কোলে তুলে নিল।
“চল, বেশি নাটক হইছে। বেডে চলো এবার ।”
নাফিসা ধাক্কা দিতে চাইলেও শক্তি পেলো না। সায়মান সহজে তাকে তুলে নিয়ে বেডে শুইয়ে দিলো। কম্বল ঠিক করে দিতে দিতে নরম গলায় বললো,
“চোখ বুজো। ঘুমাও। আমি আসছি।”
নাফিসা তৎক্ষণাৎ চোখ খুলে ফেললো। ভয় আর কৌতূহল মিশে গিয়েছে তার কণ্ঠে,
“কোথায় যাচ্ছেন…?”
সায়মান থমকে দাঁড়াল। তারপর হালকা হাসি দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“সাওয়ার নিয়ে আসছি।”
এ কথা বলেই সে নিচু হয়ে নাফিসার কপালে আলতো চুমু দিলো।
ওয়াশরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সায়মান দু’বার ঘুরে তাকালো। নাফিসা কম্বল মুড়ি দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে ভয়ের সঙ্গে মায়া ভরা নিশ্চুপ ভালোবাসা।
“রেগে থাকবেন না… পাশে থাকলেই আমি সব পারবো …”
সায়মান দরজায় হাত রেখে থেমে গেল। ঠোঁটে কোণে আবার সেই অভ্যাসের হাসিটা ফিরে এলো।
“বউটা আমার, একদিন আমাকে পাগল করে ফেলবে…”
বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে গেল সে।
নাফিসা বালিশে মুখ গুঁজে লাজে- মুচকি হেসে ফেললো…
সব ভুলিয়ে দেওয়া এই মানুষটার জন্যই তার হৃদয় এভাবে নরম হয়ে যায়।
টেবিলের ওপর খেতে বসেছে সায়ফান আর রাজিব।
অন্য পাশে আরেকটা চেয়ারে মেহেরাব বসে আছে। মেহেরিন ব্যস্ত হয়ে খাবার বেড়ে দিচ্ছে।
মেহেরিন একটু ইতস্তত করে বলল,
“সায়মান ভাইয়া খাবেনা? আর নাফিসার জন্য তো সুপ বানাইছিলাম…”
সায়ফান মুখ ভরা খাবার নিয়ে মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে নাটুকেপনার ভঙ্গিতে বলল,
“মান-অভিমান ভাঙাচ্ছে মনে হয় এখনও। আমি খেয়ে খাবার দিয়া আসছি উপরে। এত টেনশন নিও না। খাবারের থেকে বেশি টেস্ট ওয়ালা জিনিস খাচ্ছে ওরা।”
কথা শেষ হতেই সায়ফান জিভ কাটল, চোখ তুলে সবার দিকে তাকিয়ে, দেখল চারদিকে সবাই চোখ গোল গোল করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে হালকা ভদ্র হাসি দিয়ে বলল,
“আবার মিসটেক হইয়া গেল। সরি। এখানে আন্ডা বাচ্চা আছে, মনে থাকে না।”
রাজিব হেসে দিলো। হাসি দেখে মেহেরাব আর মেহেরিনও দমাতে পারল না, তারাও হেসে ফেলল।
সায়ফান এবার খাবার হাতে নিয়ে প্রথম লুকমাটা মুখে দিতেই চোখ বন্ধ করে বলল,
“আহহা! স্বর্গ! পরমেশ্বর! আল্লাহ মাবুদ! মম!! ধন্ন্য!!”
মেহেরিন হাসল,
“ও এতই কি ভালো লাগলো?”
“মনে হচ্ছে তিন জন্মের ক্ষুধা মিটে গেল,”—হাসি দিয়ে বলল সায়ফান।
খাবার শেষ লুকমা খাওয়া মাত্র সে উঠে দাঁড়াল।
“যাই, উপরে সায়মান ভাইদের খাবার দিয়ে আসি।”
বলেই হাত ধুয়ে খাবার নিয়ে উপরের দিকে গেল। উপরে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে হালকা শব্দ এল দরজার লক খুলছে।
ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে বের হলো সায়মান। ওর পরনে শুধু একটা টাওয়েল। ভিজে চুল থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে প্রথমে বিছানার দিকে তাকাল, নাফিসা ঘুমিয়ে আছে। কম্বল মুড়ি দিয়ে। মুখে শান্তি, ক্লান্তি আর শিশুর মতো।
ঠিক তখনই দরজায় ধাক্কার শব্দ। সায়মান এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই, সামনে দাঁড়িয়ে সায়ফান, খাবারের ট্রে হাতে, মুখে সাত কাত হাসি।
এক সেকেন্ড সায়মানের খালি গা দেখে তার মুখ আরও লম্বা হয়ে গেল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ভাইয়া… এত এনার্জি কেমনে? সারাদিন না খাইয়া-দাইয়া ঘুরছো… আর এখন আবার…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই,
ঠাসসস!
একটা জোর থাপ্পড় পড়ল সায়ফানের গালে।
সায়মান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আর একটা ফাউল কথা বললি—তোর খবর আছে। কি বলতে এসেছিস, বল… আর এখান থেকে বের হ।”
সায়ফান গাল চেপে কাতর মুখে বলল,
“খাবার দিতে এসেছিলাম। খালি এটুকুই। আমাকে এভাবে মাইরা দিলে মানুষের ভালো ভালো করতে নেই ।”
সায়মান একহাতে খাবারের ট্রে নিল, মুখ শক্ত করে বলল,
“তোর ভালো করা লাগবে না। বের হ।”
সায়ফান মুখ ঘুরিয়ে নাটকীয়ভাবে চলে যেতে লাগল।
কিন্তু পা দু’টা ঠিক দরজার ফ্রেম পেরোনোর আগেই,
“এই!”
সায়মানের ডাক।
সায়ফান লাফ দিয়ে ফিরে এসে উজ্জ্বল চোখে বলল,
“বলোন ভাইয়া! কি বলবা! কি কি করলেন এতক্ষণ? সব খুলে বলবা নাকি?”
ঠাসসস!
আবার থাপ্পড়।
সায়মান ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“আমার জন্য একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজারের ব্যবস্থা কর… এখনই।”
সায়ফান দুই গালে হাত দিয়ে ভাঙা কান্না-কান্না গলায় বলল,
“এটা ঠিক না। আমাকে এত মারো কেন? এই গেলে আমার বউ আমাকে চুমু দিবো তার আগেই আমার ফর্সা গালদুইটা যদি লাল টমেটোর মতো করে দেন—তাইলে কেমনে হবে?”
সায়মান ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“তারাতারি দিয়ে যা।”
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫৩
বলেই দরজা ঠাস করে বন্ধ।
সায়ফান বাইরে দাঁড়িয়ে গাল মালিশ করতে করতে বলল,
“হায় আল্লাহ… মানুষ ভালো করলেও দোষ! গায়ে হাত তুললেই না! আমার গাল গদি ছিলো, এখন হলো টমেটো!”
“আর ওনার জন্য সবাই জামা কাপড় রেখে দেই মনে হচ্ছে খালি বলে দিলাম আর হয়ে গেলো। ”
