বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৯
রানী আমিনা
ভোর হতে বাকি আর অল্প কিছু সময়। মীরের কোলে জ্ঞান হারা আনাবিয়া, মাথাটা আলগোছে ঠেকানো মীরের কাঁধের ওপর। মীর সন্তর্পণে উঠছে সিঁড়ি বেয়ে যেন আনাবিয়ার জ্ঞানলুপ্ত মাথা খানা এদিক ওদিক হেলে না পড়ে।
রাস্তায় চলন্ত গাড়ির ভেতর থেকে আচমকা দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে চাওয়ায় মীর রাগের মাথায় একটা শক্তপোক্ত থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছিলো, দুর্ভাগ্যবসত থাপ্পড়টা একটু বেশিই জোরে হয়ে গিয়েছে। মুহুর্তেই জ্ঞান হারিয়েছে সে। শুভ্র চোয়ালে চার আঙুলের দাগ দগদগ করছে। ঠোঁটের কোণ কেটে রক্ত বেরিয়েছে সামান্য।
ওর পেছন পেছন নিঃশব্দে এগোচ্ছে লিও কাঞ্জি। মীর ওদের কে প্রাসাদ থেকে বহিষ্কার করতে চাইলে দুজনে মীরের পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইতে লেগে গেছিলো, তাতে বোধ হয় মন গলেছে মীরের। ফেরার সময়ে লিও কাঞ্জি তাকে অনুসরণ করলেও মীর কিছু বলেনি।
রয়্যাল ফ্লোরে প্রবেশের মুহুর্তে সেখানের রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে একটি আর্টিফিশিয়াল ভয়েস যান্ত্রিক কন্ঠে বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“অ্যালার্ট…. অ্যালার্ট… দ্যা মাইটি কিং…”
মীর বিরক্ত হয়ে লিওকে শব্দটা বন্ধ করতে ইশারা দিলো, মীরের নিঃশব্দ আদেশে তৎক্ষনাৎ সেটি বন্ধ করে দিলো লিও।
মীরকে অনুসরণ করে সামনে আরও এগোতে নিলে মীর হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো ওদের। তারপর ঢুকে গেলো আনাবিয়ার কামরায়।
আনাবিয়াকে শুইয়ে দিলো তার ঝিনুক সদৃশ মোলায়েম বিছানায়। গায়ের ওপর টেনে দিলো চাদর। চোখে পড়লো চোয়ালের ওপর প্রকট হয়ে ওঠা আঙুলের দাগ। মীর বসলো পাশে, হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুয়ে দিলো চোয়ালের দাগ গুলো। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“আ’ম সো সর্যি….. সো সর্যি…!”
আরও কিছুক্ষণ বসে আনাবিয়ার দিকে চেয়ে থেকে অতঃপর উঠে দাঁড়ালো মীর। চলল নিজের কামরায়।
আকাশটা বেশ ঝকঝকে, তুলোর পেজার মতোন থোকায় থোকায় সাদা মেঘ ভেলার মতোন সাঁতরে উড়ছে। মীরের মনটা আজ অকারণেই বেশ ফুরফুরে। এই হঠাৎ সুখের কারণ বুঝতে তার নিজেরই বেগ পেতে হচ্ছে।
বেলা প্রায় দশটা, ব্রেকফাস্ট শেষে পোশাক পরিচ্ছদে নিজেকে আবৃত করে তৈরি হলো মীর। তাকে মিটিং রুমে যেতে হবে। ন’টার সভা ঘুমের কারণে দশটায় রিস্ক্যাজ্যুল হয়েছে। কেন যে আবার একটু ঘুমোতে গেছিলো! ওই এক ঘুমে আজ তার সব রুটিন এলোমেলো হয়ে পড়লো।
বেরোবার পূর্বে একবার আনাবিয়ার কামরায় হানা দিলো সে। মেয়েটা এখনো জাগেনি, ভোর রাতে যেভাবে শুইয়ে দিয়ে গেছিলো এখনো সেভাবেই শুয়ে, এতটুকু নড়চড় হয়নি।
মীর চিন্তিত হলো সামান্য, এগিয়ে গেলো বিছানার নিকট। আনাবিয়ার মুখপানে ঝুঁকে পর্যবেক্ষণ করলো কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষিত হচ্ছে কিনা! স্বাভাবিক ঠাহর করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। চোখ বুলালো আনাবিয়ার কামরার চতুর্দিকে।
কামরাটিকে আবিষ্কারের পরেই মহসিনকে বলে সম্পুর্ন ঝকঝকে তকতকে করিয়েছে। মীরের কড়া আদেশে প্রত্যেকটা বস্তু যথাস্থানে রেখে মহসিন দাসীদের নিয়ে পুরো কক্ষটির কোণ ধরে ধরে খুটিয়ে খুটিয়ে পরিষ্কার করেছে।
মীর সন্তুষ্ট হলো মহসিনের কাজে৷ চোখ পড়লো তার আনাবিয়ার কামরার পশ্চিম দিকের দেয়ালের ওয়াল আলমিরায়। সেখানে কয়েক তাকে সারি সারি বই সাজানো। মীর নিঃশব্দে এগিয়ে গেলো, মনোযোগী চোখে দেখলো বই গুলো। ডিকেন্স, সিলভিয়া প্লাথ, ফ্রস্ট, শেক্সপিয়র, জন ডান, শেলী, শার্লট ব্রন্টে- ইত্যাদি ইত্যাদি….. এমনকি ইলিয়াড, অডিসি! মিথোলজির খুব ভক্ত দেখি!
মৃদু হাসলো মীর, পাশে তাকাতেই ‘সান্স অ্যান্ড লাভার্স’ নামটিতে চোখ আটকালো। বইটা হাতে নিয়ে মনে মনে আনাবিয়ার উদ্দ্যেশ্যে বকাবকি করলো মীর, এই পঁচা বই এই মেয়ের হাতে কে দিয়েছে?
বইটা যথাস্থানে রেখে দিয়ে কামরা থেকে বেরোবার উদ্দ্যেশ্যে পা বাড়ালো সে, তখনি চোখ গেলো পাশেই পড়ে থাকা একটি পার্পল ডায়েরির দিকে। ভিন্টেজ ডায়েরি, ঠিক মীরের হাতে তৈরি চামড়ার ডায়েরি গুলোর মতোন। কিন্তু এটার ওপর যে মখমলি মোড়ক দেওয়া!
মীর বের করলো সেটা। ওপরে কোণায় নকশাদার স্বর্ণখচিত হরফে লেখা ‘For my soul, my Shinzo.”
মীর ডায়েরি টা মেলতে চাইলো, পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলালো। অপরের ব্যাক্তিগত লেখা দেখাটা অনুচিত হবে৷ স্বস্থানে রেখে দিতে গেলেই নজরে পড়লো ডায়েরির পৃষ্ঠার ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকা এক টুকরো কাগজের কোণা। মীর টেনে বের করলো সেটা। সামনে ধরতেই নিজের হস্তাক্ষর দেখে বিস্মিত হলো সে,
“ফিরতে রাত হবে, প্লিজ মান কোরোনা প্রাণ আমার! আজ রাতের মতোন একটু একা খেয়ে নিও! আমি জলদি ফিরে আসবো কথা দিচ্ছি।
লাভ ইয়্যু, মা’ মোস্ট গর্জিয়াস, মোস্ট বিয়্যুটিফ্যুল হোয়াইট অর্কিড।”
চিরকুটটি পড়ে বিস্ময়ের সীমা রইলোনা মীরের। সে কি আনাবিয়ার সাথে কোনো অবৈধ প্রেমের সম্পর্কে জড়িত ছিলো? নইলে এমন লেখা সে কোন পরিস্থিতিতে লিখবে? একটা ঢোক গিলে মীর ডায়েরি টা মেলে ধরলো সামনে। গোল গোল হস্তাক্ষর দেখে চেনা ঠেকলো তার নিকট। দ্রুতই নিজের পকেট থেকে বের করলো সযত্নে রেখে দেওয়া সেই ছোট্ট চিরকুটটি,
“Seak the soul beneath your name”
মীর মিলিয়ে দেখলো দুইটি লেখা, এই চিরকুটটি যে আনাবিয়ারই লেখা! কিন্তু আনাবিয়া তাকে এমন চিরকুট কেন দিয়েছিলো? কি খুঁজতে বলেছিলো সে মীরকে? কি হারিয়েছে মীরের? তার স্যোল, তার আত্মা?
“ইয়োর ম্যাজেস্টি…”
বাহির হতে লিওর গলা শুনে হুশে এলো মীর। ঘড়িতে দেখলো দশটা দশ। তাকে এখুনি বেরিয়ে যেতে হবে। দুটো চিরকুটই পকেটে ঢুকিয়ে ডায়েরিটা যথাস্থানে রেখে সে বেরিয়ে পড়লো কামরা থেকে।
সভাসদদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফাঁকে হঠাৎ ঝকঝকে আকাশ জুড়ে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামতে দেখে বিস্মিত হলো মীর। অন্যমনস্কতা বৃদ্ধি পেলো তার। একটু আগেও সুর্যের আলো পুড়িয়ে দিচ্ছিলো সবকিছু, তবে হঠাৎ বৃষ্টি এলো কোথা থেকে।
লিও কাঞ্জি ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিলো জানালার পাশে। বৃষ্টির শব্দে তারাও তাকালো বাইরে। এই বৃষ্টি তাদের চেনা, লিও চমকে তাকালো কাঞ্জির দিকে। চোখাচোখি হতেই কাঞ্জি শঙ্কিত স্বরে আওড়ালো,
“শেহজাদী….!”
“উনি তো কামরায় ঘুমাচ্ছিলেন!”
মীর নিজেও কপালে ভাজ ফেলে তাকিয়ে ছিলো জানালার বাইরে। লিও দ্রুত পায়ে তার কাছে এসে চাপা, আতঙ্কিত স্বরে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, সামথিং ইজ নট রাইট…..!”
“কি বলতে চাইছো?”
সচকিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো মীর।
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদী…. উন্-উনি হয়তো ঠিক নেই।”
বলল লিও। মীর দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে দেখলো ওকে ক্ষণিক, পরক্ষনে কিছু স্মরণে আসতেই আতঙ্ক ভর করলো তার মুখপরে, মুহুর্তেই চেয়ার ছেড়ে উঠে জোর কদমে বেরিয়ে গেলো মিটিং রুম ছেড়ে।
সভাসদেরা মীরের এই আকস্মিক অন্তর্ধানে সাথে সাথে জায়গা ছেড়ে দাঁড়িয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকালো একে অপরের পানে।
ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে মীর যখন রয়্যাল ফ্লোরে পৌছোলো তখন আনাবিয়ার তারস্বরে চিৎকার করে কান্না কানে এলো তার। ভীষণ শঙ্কা নিয়ে বড় বড় পা ফেলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো সে আনাবিয়ার কামরায়।
ডান পাশের চোয়ালে হাত রেখে উচ্চস্বরে কেঁদে চলেছে আনাবিয়া। ওর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে মহসিন আর কয়েকজন দাসী। তারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে আনাবিয়াকে শান্ত করার, কি হয়েছে জানার! কিন্তু কান্নার দমকে আনাবিয়ার মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না৷
মীর আসতেই সরে দাঁড়ালাও তারা, মীর তড়িঘড়ি আনাবিয়ার কাছে এসে আতঙ্কিত গলায় শুধোলো,
“এই কি হয়েছে? এভাবে কাঁদছো কেন?”
আনাবিয়া চোয়ালে হাত চেপে রেখেই উচ্চস্বরে কেঁদে আর্তনাদের সুরে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“তুমি মারলে কেন আমায়?”
কিন্তু কথা বলতে গিয়ে চোয়ালে প্রচন্ড ব্যাথা পেলো সে, দ্বিগুণ জোরে চিৎকার শুরু করলো সে। মীর ব্যতিব্যস্ত হয়ে আনাবিয়ার হাত সরিয়ে দিলো চোয়ালের ওপর থেকে। আঙুলের ছাপ অস্পষ্ট কিন্তু চোয়ালটা ফুলে আছে বেশ! মীর স্পর্শ করার উদ্দ্যেশ্যে হাত বাড়ালে আনাবিয়া এক ঝটকায় ওর হাত সরিয়ে দিয়ে আরও জোরে চিৎকার করতে শুরু করলো। মধ্যিখানে একবার অস্ফুট আর্তনাদের সাথে বলে উঠলো,
“আমি ডান দিকে ঘাড় ফেরাতে পারছিনা!”
মীর মহসিনকে উদ্দ্যেশ্য করে ব্যাস্ত স্বরে বলল,
“মহসিন, জলদি হেকিম ডাকো!”
মহসিন আনুগত্য জানিয়ে বেরিয়ে গেলো সাথে সাথেই। দাসীগুলো তখনো কি করবে ভেবে না পেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো জড়সড় হয়ে। আনাবিয়া কান্নার ফাঁকে ওদের দিকে একবার শকুনি চোখে তাকালো, পরক্ষণেই চিৎকার করে মীরকে বলল,
“ওদেরকে আমার সামনে থেকে সরাও৷”
মীর ইশারা দিতেই দাসীগুলো আনুগত্য জানিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো কামরা ছেড়ে৷ ওরা বেরিয়ে যেতেই আনাবিয়ার ক্রন্দনরত মুখখানার দিকে অসহায় চাহনি দিয়ে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“খুব যন্ত্রণা হচ্ছে?”
আনাবিয়া উত্তর দিলোনা কোনো, কাঁদতেই রইলো। মীর অস্থির হয়ে উঠলো আরও, ভেতর থেকে এক অজানা ছটফটানি ব্যাস্ত করে তুললো তাকে, আনাবিয়ার কাছাকাছি সরে এসে তাকে শান্ত করার নিমিত্তে কাতর স্বরে বলল,
“ক্ষমা করো আমাকে, আমি বুঝতে পারিনি এত জোরে লেগে যাবে! রাগের মাথায় করে ফেলেছি। আ’ম সর্যি, আ’ম ভেরি সর্যি! আর কখনো করবোনা! কান্না থামাও প্লিজ, চুপ করো!”
ক্ষণিক বাদেই বাইরে শোনা গেলো মহসিনের কন্ঠস্বর, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইছে সে। মীর অনুমতি দিতেই দ্রুত পায়ে একজন নারী চিকিৎসক নিয়ে প্রবেশ করলো সে৷
প্রৌঢ়া নারীটি ক্ষণিকের জন্য আনাবিয়ার ক্রন্দনরত, মোহনীয়া, শুভ্র মুখশ্রীর দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। মহসিন গলা খাকারি দিতেই হুশে এলো সে৷ দ্রুত আনাবিয়ার কাছে গিয়ে ওর ফুলে ওঠা চোয়ালটা পর্যবেক্ষণ করলো মনোযোগী চোখে।
পর্যবেক্ষণ শেষে মহসিনের নিকট প্রয়োজনীয় পথ্য আর অয়েন্টমেন্ট দিয়ে সাথে গলা ঘাড়ে মালিশের জন্য একটা বিশেষ তৈল দিয়ে বিদায় নিলো সে।
আনাবিয়া যন্ত্রণায় কেঁদে চলেছে তখনো, মীর ওর চোয়ালে আঙুলের আলতো স্পর্শ করে অস্থির গলায় বলে উঠলো,
“আর কাঁদেনা, মেডিসিন নিলেই ঠিক হয়ে যাবে, এবার একটু শান্ত হও, শান্ত হও প্লিজ!”
“তুমি আমাকে মারলে কেন?”
বলে দ্বিগুণ জোরে কেঁদে উঠলো আনাবিয়া! মীর ঘূর্ণাক্ষরেও টের পেলোনা তার হাতের প্রথম আঘাতের যন্ত্রণা আনাবিয়ার চোয়ালের থেকে অন্তরে বেশি পীড়া দিচ্ছে!
“মারবো না তো কি করবো? তুমি গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে চাইছিলে কেন? রাস্তায় আছড়ে পড়লে আস্ত থাকতে তুমি?”
কিঞ্চিৎ ধমকের সুরে বলল মীর৷ তাতে কান্নার বেগ আরও বাড়লো আনাবিয়ার। দুহাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কান্না করতে রইলো সে!
বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়লো আবার। মীর অস্থির হয়ে উঠলো, কিভাবে, কি করলে এই মেয়েটি আর কাঁদবেনা! কি করলে একটু শান্ত হবে!
মীর ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বসলো আনাবিয়ার গা ঘেঁষে, আনাবিয়ার মুখ থেকে জোর করে হাত সরিয়ে আনাবিয়াকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো, চোয়াল দ্বয় নিজের দুহাতে আকঁড়ে ধরে ব্যাকুল স্বরে বলল,
“আচ্ছা, আর কখনো মারবোনা, কোনো দিনও না! মাফ চাইছি তোমার কাছে, তুমি বললে পায়েও ধরবো। তবুও চুপ করো, কান্না থামাও! তোমার কান্না আমার সহ্য হচ্ছে না, কষ্ট হচ্ছে আমার, চুপ করো!”
এমন সময় খাবারের ট্রে হাতে কামরায় প্রবেশ করলো মহসিন। হেকিম বলে গেছেন পেট ভরে খাবার খেয়ে পথ্য নিতে। সে তাই শেহজাদীর পছন্দের সী ফুড গুলো হাজির করেছে।
খাবারের ঘ্রাণ নাকে আসতেই নড়েচড়ে বসলো আনাবিয়া, গতকাল দুপুরের পর এক্কটা দানাপানি পেটে পড়েনি তার, পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড়চ্ছে যেন! ঘ্রাণে ক্ষিদেটা আরেকটু মোচড় দিয়ে উঠলো তার।
কান্নার বেগও এবার একটু কমলো বোধ হয়। কিন্তু ফোঁপানো কমলোনা। মহসিন বিরাট ট্রে খানা সরাসরি বিছানার ওপর উঠিয়ে দিয়ে, ওষুধ পত্র গুলো মীরের নিকট বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো কামরা ছেড়ে৷
আনাবিয়া ক্ষণিকের জন্য অন্যমনস্ক হলেও আবারও মীরের হাতের থাপ্পড়ের কথা মনে করতেই ফুঁপিয়ে উঠলো উচ্চস্বরে। মীর দ্রুতবেগে ট্রে থেকে একটা চিংড়ির ঝলসানো মাংসল মস্তক উঠিয়ে নিয়ে ভরে দিলো আনাবিয়ার মুখে। ক্ষুধার্ত আনাবিয়া চিংড়ির স্বাদে প্রথমটায় কান্না থামিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে খেতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। মীর একের পর এক চিংড়ি চালান দিতে রইলো ওর মুখের ভেতর, যেন খাবারে ঠেসে তার মুখগহ্বর ভর্তি করে তারস্বরে চিৎকার কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা!
কিন্তু মুখভর্তি খাবার নিয়ে চিবোনোর ফাঁকে আবার মীরের থাপ্পড়ের কথা মনে পড়তেই ঠোঁট ফুলিয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলো সে।
মীরের হাসি পেলো, ঠোঁট টিপে হেসে বা’হাতে নিজের কান স্পর্শ করে বলল,
“এই কানে ধরছি, আর কোনোদিন এমন কাজ করবো না আ’ সয়্যার!”
থাপ্পড়ের শোকে কাতর হওয়া আনাবিয়া মীরকে হাসতে দেখে রেগে মেগে প্লেট থেকে একটা চিংড়ি উঠিয়ে ছুড়ে মারলো ওর মাথায়!
আনাবিয়া এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে আছে বিছানায়৷ ওষুধের প্রভাবে ঘুম এসে গেছে তার, ঘুমের মাঝেও ক্ষণিক পর পর ফোপাচ্ছে সে। চোয়ালের ফোলা ভাব ইতোমধ্যে কমেছে সামান্য৷ মীর ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়লো একটা। মাথায়, মুখে তার এখনো লেগে আছে আনাবিয়ার ছোড়া খাবারের অংশ। এই মেয়েকে নাকি সে ছোট বেলা থেকে টেক কেয়ার করেছে, কেমন টেক কেয়ারে এ মেয়ে একটা ডাকাতে পরিণত হয়েছে মীর স্মরণে আনতে পারলোনা। খাওয়াতে গিয়ে এক দফা মারামারি লেগে গিয়েছে তার সাথে।
মীর ঘড়ি দেখলো, দুটো বেজে গিয়েছে। কিন্তু মিটিংটা খুবই জরুরি। সভাসদেরা এখনো সেখানেই অবস্থান করছে, এখনি পৌছোনো প্রয়োজন। নিজের কামরায় ফিরে গায়ে লেগে থাকা খাবার সাফ করে পোশাক পরিবর্তন করে সে তৎক্ষনাৎ আবার বেরিয়ে গেলো মিটিং রুমের উদ্দ্যেশ্যে।
বাহির থেকে মীর যখন ফিরলো তখন রাত হয়েছে বেশ। বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে। ধীর, শ্রান্ত পায়ে সে এসে হাজির হলো বারান্দায়। লিও কাঞ্জি ফ্লোরে পা রেখেই এক প্রকার টলতে টলতে নিজেদের কামরায় গিয়ে ধুপ ধাপ শুয়ে পড়েছে।
বারান্দায় আনুগত্যের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মহসিন। মীর শুধোলো,
“বাঘিনী ঘুমিয়েছে?”
“ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি! আমি জানিনা তিনি এই মুহুর্তে কি করছেন। তবে ঘাড়ের ব্যাথা তাকে বড্ড পীড়া দিচ্ছে, রাতে খাবারও খাননি।”
“কি বলো? তেলটা মালিশ করাওনি?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদী কাউকে তার পাশে ঘেঁষতে দিচ্ছেননা। আপনার আদেশ মতো আমি শেহজাদীর জন্য হেরেম থেকে বেঁছে কয়েকজন দাসী নিযুক্ত করেছিলাম, কাজে কর্মে বেশ পটু। কিন্তু তারা কেউ শেহজাদীর কামরাতে ঢুকতে পর্যন্ত পারেনি। বাধ্য হয়ে তাই আমি তাদেরকে হেরেমে ফিরে যেতে বলেছি।”
অপরাধীর সুরে বলল মহসিন। মীর ফোস করে শ্বাস ছাড়লো। সারাদিনের ক্লান্তিতে তার চোখ জোড়া ভেঙে আসতে চাইছে, এখন কোনোক্রমে বিছানা পর্যন্ত যেতে পারলেই সে খুশি। কিন্তু এ কোন মুসিবত!
মীর কামরায় এলো। বাহিরের পোশাক ছেড়ে হাতে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে চেষ্টা করলো ক্লান্তি তাড়ানোর। গায়ের ওপর একটা রোব জড়িয়ে সে নক করলো আনাবিয়ার কামরার দরজায়। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না আসায় আবারও নক করে ডাকলো,
“প্রিন্সেস!”
ক্ষণিক অপেক্ষার পর আরেকবার করাঘাত শেষে বলল,
“আমি কিন্তু ভেতরে আসছি।”
কিয়ৎক্ষণ অপেক্ষার পরেও কোনো উত্তর না পেয়ে নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে সে বলল,
“এলাম!”
ঢুকতেই চোখে পড়লো বিছানায় চিৎপাত শুয়ে সে, কানে এয়ারবাড গুজে ফুল সাউন্ডে মিউজিক চালিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। মিউজিকের আওয়াজ এত দূর থেকেও কর্ণগোচর হচ্ছে মীরের। শুভ্র চুলগুলো আলগোছে এলিয়ে আছে বিছানার ওপর, পরনের লেটুস শর্টস সেঁটে আছে তার শরীরের সাথে, লেটুস ক্যামি টপ টার ফাঁকফোকর দিয়ে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে তার অসাধারণ শরীরি সৌন্দর্য!
ক্ষণিকের জন্য মীরের দৃষ্টি আঁটকে গেলো আনাবিয়ার শুভ্র, মোলায়েম গণ্ডদেশে! পরক্ষণেই তার স্ফিত বক্ষের মধ্যিখানের বিভাজিকায় না চাইতেও নজর পড়লো মীরের। অপ্রস্তুত হয়ে কেশে উঠলো সে৷
দৃষ্টি সংযত করে ভেতরে এলো, আনাবিয়ার গলা পর্যন্ত চাদর টেনে দিয়ে কান থেকে ইয়ারবাড দুটো খুলে বেড সাইডের ওপর রেখে দিয়ে সে নরম স্বরে ডাকলো,
“হ্যালো, স্লিপিং বিউটি।”
আনাবিয়ার কপাল কুচকে এলো তাতে। মীর আবার বলল,
“উঠুন, আপনার মেডিসিন বাকি আছে।”
আনাবিয়া কোনো রকমে একবার চোখ মেলে নাক কুচকে পাশ ফিরে নয়া উদ্যমে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলো।
“কথা না শুনলে বা দিকের চোয়ালও ফুলানোর ব্যাবস্থা করবো৷ উঠো!”
মীরের নরম স্বর পরিবর্তিত হয়ে রুঢ় হলো। আনাবিয়া তেজি চোখে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে নিলো মীরের দিকে, তখুনি শিরাতে টান পড়ায় ব্যাথায় চিৎকার দিলো সে।
“ঠিক হয়েছে!”
বলল মীর৷ দরজা ঠেলে বাইরে গিয়ে মহসিনকে বলল খাবার প্রস্তুত করতে। ফিরে এসে হেকিমের দেওয়া তেলটা হাতে নিয়ে আনাবিয়ার নিকট এসে বলল,
“দাসীগুলোকে ফেরত পাঠিয়েছো কেন?”
“প্রথমত আমি কারো স্পর্শ পছন্দ করিনা, দ্বিতীয়ত ওদেরকে আমার পছন্দ নয়৷”
মীর ওর পাশে বসতে বসতে বলল,
“কারো স্পর্শ পছন্দ নয়, তাহলে এখন কি করবে? তেলটা মালিশ না করলে তোমার ব্যাথা কমবে না, কে মালিশ করবে? প্রিফারেন্স থাকলে বলো, তাকে আনাই।”
“জানিনা আমি।”
ঘাড় আঁকড়ে ধরে বিরক্তি নিয়ে বলল আনাবিয়া, পরক্ষণেই মীরের হাত থেকে ছোট্ট বোতলটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি নিজেই করে নিবো, আপনি এখন যেতে পারেন।”
“তুমি তো আমাকে সবসময় ‘আপনি’ সম্বোধন করো, সকাল বেলা ‘তুমি তুমি’ বলে ফেনা তুলে দিচ্ছিলে যে! কি ব্যাপার? খুলে বলো।”
“কি খুলবো? বলতে হলে খুলতে হবে কেন?”
মীর এক বিরক্তিকর আমোদে তাকালো আনাবিয়ার দিকে, বলল,
“বোতলের ছিপি।”
“সে তো আমি এমনিও খুলছি, না খুলে মালিশ করা গেলে তো কেউই কষ্ট করে খুলতো না৷”
বলে ছিপি খুলে বোতল থেকে কিছুটা তেল হাতের তলায় ঢাললো আনাবিয়া। মুহুর্তেই উৎকট এক গন্ধে ভরে গেলো তার কামরা। সাথে সাথে হাতে নাক চেপে আনাবিয়া বলল,
“ইয়াক, এই তেল আমি কখনোই আমার গায়ে ছোয়াবো না! এর যে দুর্গন্ধ তাতে বোঝাই যাচ্ছে যেখানেই লাগাবো সেখানে আপনার গায়ের মতোন কালাভুনা হয়ে যাবে৷”
মীর ক্ষুব্ধ চোখে তাকালো, কালাভুনা মানে? হোয়াট ইজ কালাভুনা! সে কি এতই কালো?
নিজের হাত দুখানা সামনে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো মীর, সে তো এখন শ্যামলা! সে তো কালো হয় এক্সট্রিম লেভেলের উত্তেজিত হলে। যখন তার অত্যন্ত মেজাজ গরম হয়, যখন তার সব কিছু ভেঙে চুরে ফেলতে ইচ্ছা করে, যখন তার……
“ফ’ ইয়োর কাইন্ড ইনফর্মেশন আমি কালো নই, আমি শ্যামলা। নিজে চোখ ধাধানো সফেদ রঙ পেয়েছো বলে কালোকে অপমান করবেনা। নইলে বিয়ের পর দেখবে তোমার বাচ্চাকাচ্চা সব কালো হয়েছে। রিভেঞ্জ অব ন্যাচার।”
নারাজ গলায় বলল মীর। আনাবিয়া হাতের তেলটুকু নাক মুখ কুচকে আবার বোতলে ফেরত পাঠাতে পাঠাতে বলল,
“সে আমি এমনিও জানি। কিন্তু ওটা রিভেঞ্জ অব ন্যাচার হবে না, হবে আমার কপাল, ইনেভিটেবিলিটি অব ফেইট!”
মীর আর তর্কে জড়ালোনা। আনাবিয়ার হাত থেকে ছো মেরে বোতলটা নিয়ে বলল,
“মালিশ করতেই হবে, এদিকে এসো।”
“একদম না, ওই বিশ্রী লিকুইড আমি আমার গায়ে ছোয়াবো না, সরুন এখান থেকে!”
আনাবিয়া বিছানায় পেছন ঠেলে পিছিয়ে যেতে চাইলো। মীর ওকে খপ করে ধরে হ্যাচকা টানে নিজের সামনে বসিয়ে বলল,
“একদম নড়াচড়া করবেনা, নইলে কিন্তু পা উঠিয়ে দিবো তোমার গলার ওপর, এক চাপে দুজন হয়ে যাবে।”
আনাবিয়া সত্যিই চুপটি করে বসলো, ওকে শান্ত হয়ে বসতে দেখে মীর বলল,
“মহসিন খাবার নিয়ে এলে ভালো মেয়েটির মতোন খেয়ে নিবে, কোনো দুষ্টুমি করবেনা৷ খাওয়া শেষে তোমার সাথে আমি কথা বলবো, কিছু বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন৷”
আনাবিয়া চিন্তায় পড়লো, কিসের কথা বলতে চাইছে মীর তার সাথে? কি পরিষ্কার হবে? কোন বিষয়ে?
কিন্তু পরক্ষণেই মীরের দক্ষ হাতের মালিশ ঘাড়ে পরতেই আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে এলো আনাবিয়ার। সারাদিনের যন্ত্রণা শেষে একটু আরাম পেয়ে ওর ভালো লাগলো প্রচন্ড। কি থাপ্পড় টাই না দিয়েছে! মনে হচ্ছে ডান দিকে ঘাড় ফেরায়নি ও কতকাল!
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৮
মালিশের মধ্যেই মীর গলা খাকারি দিয়ে নরম স্বরে প্রশ্ন করলো,
“আমি কি তোমার সাথে কখনো কোনো ইনঅ্যাপ্রোপ্রিয়েট আচরণ করেছি, যা আমার করা উচিত নয়?”

Next part gulo please taratari dinna