বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭০
রানী আমিনা
“আমি কি তোমার সাথে কখনো কোনো ইনঅ্যাপ্রোপ্রিয়েট আচরণ করেছি, যা আমার করা উচিত নয়?”
“ইনঅ্যাপ্রোপ্রিয়েট বলতে…?”
দ্বিধান্বিত স্বরে শুধালো আনাবিয়া। মীর হাতে আরেকটু তরল নিয়ে আনাবিয়ার গলা কাঁধে মিশিয়ে দিতে দিতে বলল,
“মানে…. তোমার সাথে আমি কখনো কোনো বাজে আচরণ করেছি কি না।”
“হু।”
“কি করেছি?”
মালিশ থামিয়ে, কন্ঠে শঙ্কা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলো মীর।
“আমাকে থাপ্পড় মেরেছেন।”
কথাটি বলে নিজের বা গালে হাত বোলালো আনাবিয়া, গতরাতের দৃশ্য গুলো মনে করে একটু শিউরেও উঠলো বোধ হয়। মীর মুখ দিয়ে চ’ জাতীয় শব্দ করে বলল,
“অমন বাজে আচরণ নয়।”
“তো?”
“আচ্ছা, বাদ দাও। ব্যাথা কমেছে?”
“সেটা পরে, আগে বলুন।”
“চুপ থাকো, ব্যাথা কমলে আমি কামরায় ফিরবো, আমার ভীষণ ঘুম পেয়েছে।”
“বাজে আচরণ তো আপনি এখনো করছেন, কথায় কথায় ধমকাচ্ছেন। তো আপনি কোন বাজে আচরণ কথা বলছেন সেটা নির্দিষ্ট করে না বললে আমি কিভাবে বুঝবো?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“সব মিলিয়ে বলো তো, আমি তোমার সাথে কি খুব বাজে আচরণ করেছি? কখনো? বা করতাম?”
আনাবিয়া চুপ হয়ে গেলো, মুখখানা ভার হয়ে এলো তার। মনে পড়লো অনেক গুলো বছর পূর্বে কিমালেবের পানিপথে দুজনের মুখোমুখি হওয়ার নিষ্ঠুর স্মৃতি গুলো, মীরের চোয়ালে তার দেওয়া উত্তপ্ত আঘাত, আর মীরের….. আনাবিয়ার সম্পুর্ন নামটা উচ্চারণ— যা সে কখনোই করেনি, কোনোদিনও না! বুঝতে শেখার পর থেকে কখনো শুনেনি মীরের মুখে তার ‘আনাবিয়া’ নামটি উচ্চারিত হতে, অথচ নামটা স্বয়ং সে-ই দিয়েছিলো!
মুহুর্তেই পূর্বের তিক্ত, বিশ্রী স্মৃতি গুলো জলোচ্ছ্বাসের মতোন ভেঙেচুরে এসে হামলে পড়লো তার মানস্পটে! মনে পড়লো সেই প্রথম বিভীষিকাময় রাত, যে রাতে তার কাছের মানুষগুলোই তাকে দিয়েছিলো ক্ষতবিক্ষত করা যন্ত্রণা! রক্তাক্ত করেছিলো তার বক্ষ পিঞ্জর, পায়ে মাড়িয়ে দিয়েছিলো তার বিশ্বাস! যে রাতে তাকে বিছানায় রেখে মীর রাত্রিযাপন করেছিলো বাহিরে!
আর….. আর তার গর্ভে আসা অপরিপক্ক সন্তানটা! যে এখন ঘুমিয়ে আছে অর্কিড বাগানের মধ্যিখানে!
নিজের অজান্তেই হাতটা তলপেটে গিয়ে পৌছোলো আনাবিয়ার, পরক্ষণেই বুকের ভেতর এক প্রলয়ঙ্কারী যন্ত্রণার অতর্কিত আক্রমণে ছটফটিয়ে উঠলো সে। চোখ ফেটে আসতে চাইলো জল!
হৃৎপিণ্ডটা বোধ করি কেউ খামচে ধরলো, আচমকা দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো তার, শব্দ করে বুক ভরে শ্বাস টানতেই চমকালো মীর, সচকিত হয়ে শঙ্কিত গলায় প্রশ্ন করলো,
“ঠিক আছো তুমি?”
আনাবিয়া ছিটকে সরে গেলো ওর নিকট থেকে। কেমন অদ্ভুত চাহনি দিয়ে সে তাকালো মীরের দিকে, যেন এক অচেনা ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে তার সামনে, এই মীরকে সে চিনেনা, একদমই চিনেনা। একইসাথে ভয়ানক জোরে বুক ওঠানামা করতে রইলো তার! শ্বাস নেওয়ার তীব্র চেষ্টায় প্রাণ বেরিয়ে যেতে চাইলো ওর!
মীর কি করবে বুঝতে পারলোনা, অস্থির হয়ে গ্লাসে পানি নিয়ে ধরলো আনাবিয়ার ঠোঁটের কাছে, ব্যাস্ত গলায় বলল,
“পানি খাও, পানি খাও একটু!”
পরক্ষণেই উচ্চস্বরে হেঁকে ডাকলো,
“কে আছো? দ্রুত হেকিম কে ডাকো!”
বাইরে মহসিন উপস্থিত ছিলো তখনো, মীরের হাঁক শুনে সে দ্রুত পায়ে ছুটলো মেডিক্যাল জোনের দিকে।
আনাবিয়া অতিকষ্টে যৎসামান্য পানি টেনে নিলো ঠোঁট দিয়ে, পরক্ষণেই চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসতে রইলো তার, শরীরের বল হারিয়ে পড়ে যেতে নিলো সে নিচে! মীর জাপটে ধরলো ওকে নিজের সাথে তৎক্ষনাৎ। আতঙ্কিত গলায় বলে উঠলো,
“এই কি হচ্ছে, কি হচ্ছে তোমার? কষ্ট হচ্ছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে?”
আনাবিয়া শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মীরের চোখের পানে, শ্বাস পড়ছে না তার, চোখ জোড়াতে আঁধার নেমে আসতে চাইছে। ওর এমন অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলো মীর, উৎকণ্ঠার ত্রাসে আতঙ্কিত হয়ে বুকে করে টেনে নিয়ে ঝড়ো বেগে দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো সে। আর্তনাদের সুরে গর্জে উঠে ডাকলো লিও কাঞ্জিকে।
মীরের এমন ডাকে লিও কাঞ্জির ঘুম ভাঙলো তৎক্ষনাৎ। দুজনে একে অপরের দিকে চেয়ে হুড়মুড়িয়ে উঠে কোনোমতে গায়ে শার্ট চাপিয়ে ছুটলো বাইরে। আনাবিয়াকে মীরের বুকের ভেতর এভাবে এলিয়ে পড়ে থাকতে দেখে ছুটে এলো দুজনেই।
মীর ততক্ষণে আনাবিয়াকে নিজের সাথে মিশিয়ে টেনে নিয়ে এসেছে বারান্দায়, যেন বাইরের খোলা বাতাসে আনাবিয়া একটু বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে! বারান্দা জুড়ে টানানো পর্দা গুলো টেনে সরানোর সময়ের অভাবে ছিড়ে ফেললো! কাউচের ওপর আনাবিয়াকে কোলে নিয়ে বসে আনাবিয়ার চুলের ভেতর তার আতঙ্কে কাঁপতে থাকা আঙুল গুলো বুলিয়ে দিয়ে অস্থির স্বরে বলল,
“শ্বাস নাও… ব্রিথ বেইবি, ব্রিথ…. বুক ভরে শ্বাস নাও! জোরে জোরে শ্বাস নাও।”
প্রবেশপথের দিকে ব্যাস্ত, উদ্বিগ্ন চোখে চেয়ে বজ্র গলায় বলে উঠলো,
“ওরা এত দেরি কেন করছে? কিসে এত সময় লাগছে ওদের?”
লিও দেরি না করে ছুটলো তৎক্ষনাৎ মহসিনকে তাড়া দিতে। কাঞ্জি অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো পাশে। কি করবে বুঝতে না পেরে ছটফট করতে রইলো চারধারে।
মীর আনাবিয়ার মুখখানা উচু করে ধরে বার বার বলতে রইলো ধীরে ধীরে বুক ভরে শ্বাস নিতে, তাড়াহুড়ো না করতে। আনাবিয়া নিজের হীরকখন্ডের ন্যায় ঝলমলে, বড় বড় চোখ জোড়া মীরের দৃষ্টিপরে অনিমেষে রেখে বুক ভরে শ্বাস নিতে রইলো, তবুও যেন শ্বাস পৌছুতে চাইলোনা ফুসফুস পর্যন্ত! শুধুই দৃষ্টিগোচর হলো তার মীরের অস্থির, ব্যাকুল চেহারা যাতে আনাবিয়ার কষ্ট একটু কমানোর, তাকে একটু স্বস্তি দেওয়ার তীব্র হাহাকার! চিৎকার চেচামেচি করে নিমিষেই প্রাসাদ জাগিয়ে তুললো সে!
ঢোক গিললো আনাবিয়া, কিন্তু শুকনো! মুখে এতটুকু লালা নেই! গলা বুক শুকিয়ে গেছে এতটুকুতেই। মীর যেন না বলতেই বুঝলো তা, কাঞ্জির দিকে ফিরে পানি নিয়ে আসার আদেশ করলো তৎক্ষনাৎ। কাঞ্জি ছুটে গিয়ে পানি নিয়ে ফেরত আসতেই মীর গ্লাস থেকে অল্প অল্প করে পানি দিতে রইলো আনাবিয়ার মুখে।
“কেমন লাগছে? শ্বাস নিতে পারছো? কষ্ট কমেছে? ভালো লাগছে এখন?”
উদ্বিগ্ন গলায় এক নাগাড়ে প্রশ্ন করলো সে। আনাবিয়া ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারলো এবার একটু, চোখ জোড়া বন্ধ করে ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো ওপর নিচে। শরীর শিথিল হয়ে এলো তার, গা ছেড়ে দিলো মীরের ওপর৷
লিও মেডিক নিয়ে ছুটতে ছুটতে এলো তখুনি। তার পিছে পিছে ছুটে এলো কয়েকজন চিকিৎসক। মহসিনের পেছন পেছন উদ্বিগ্ন চিত্তে ছুটে এলো হেরেম প্রধান, তার পেছনে আরও কতক দাসী। রয়্যাল ফ্লোরের এমন হাঙ্গামা, মহসিনের ছোটাছুটিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলো তারাও!
মেডিক পৌছুতেই মীর আনাবিয়াকে বুকে করে নিয়ে গেলো কামরায়, মহসিনের সাহায্যে উঠিয়ে দিলো কামরার সমস্ত পর্দা, পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক বাতাস যেন প্রবেশ করতে পারে ঘরে!
লোকজন পাতলা হয়ে এসেছে, এতক্ষণ সকলে চিন্তিত মুখে ভিড় করে ছিলো বারান্দা জুড়ে৷ মীরের উৎকন্ঠা, চিৎকার, চেচামেচি, ক্রোধ, অস্থিরতার কারণে উত্তাল হয়ে ছিলো সম্পুর্ন প্রাসাদ। হেরেম সম্পুর্ন সজাগ, দাস দাসীগুলো অপেক্ষায় শেহজাদীর স্বাস্থ্যের পরবর্তী সংবাদ পাবার আশায়।
লোকজনের অত্যাধিক সমাগমের কারণে মীর রাগারাগি করতে শুরু করলে মহসিন সবাইকে বিদায় করে দিয়েছে রয়্যাল ফ্লোর থেকে৷ বর্তমানে বারান্দায় লিও, কাঞ্জি আর মীর ব্যাতিত কেউ নেই।
রেলিঙের পাশে সারি বাঁধা নীলচে মখমলি কাউচের ওপর শরীর এলিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে আছে মীর। চোখ জোড়া বন্ধ, ডান হাত খানা কপালের ওপর ঠেস দেওয়া। সারাদিনের দৌঁড় ঝাপের পর এখনো পর্যন্ত বিছানায় যেতে পারলোনা সে! ক্লান্তি, অবসন্নতায় শরীর ভেঙে পড়ার উপক্রম, কিন্তু মাথা ভর্তি দুঃশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমোনো দায়! চাইলেও যে ঘুম আসবে না!
আনাবিয়া ঘুমিয়েছে সবে, চিকিৎসকেরা এখনো ভেতরেই আছে। মহসিনকে ভালোভাবে বুঝিয়ে চলেছে কোন কোন খাবারে তার সমস্যা হতে পারে, কোন গুলো খেলে শেহজাদীর অ্যান্টিডোট নিতে হতে পারে। মহসিন ঘনঘন মাথা নাড়ছে তাদের কথায়।
লিও কাঞ্জি ক্লান্ত পায়ে পায়চারি করে চলেছে বারান্দা জুড়ে, মীরের সাথে আজ সারাদিন ছোটাছুটি করে পরিশ্রান্ত তারাও! কিন্তু চিকিৎসক রয়্যাল ফ্লোর ছেড়ে চলে না যাওয়া পর্যন্ত ওরা কামরায় ফিরতে পারছেনা।
এমন সময়ে সন্তর্পণে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো মহসিন, পেছন চিকিৎসকেরা। মীর সোজা হয়ে বসলো, তারা কাছে এসে আনুগত্য জানাতেই মীর ইশারায় বসতে বলল তাদের ভেতরের প্রধানকে।
“স্যি ফুডের কারণে কোনো সমস্যা হয়েছে তার?”
জিজ্ঞেস করলো মীর। সে আনত চোখে উত্তর করলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, স্যি ফুডে শেহজাদীর পূর্বে কোনো সমস্যা ছিলো না, কিন্তু বর্তমানে তিনি স্যি ফুডের প্রতি কিছুটা সেনসিটিভ হয়ে পড়েছেন, যার কারণে তার শ্বাসনালীতে সামান্য ইনফ্লামেশন ঘটেছিলো। তবে আমরা ধারণা করছি তার শ্বাসকষ্টের মেইন রিজন অ্যানজাইটি, সাডেন অ্যানজাইটি আর শ্বাসনালীর ইনফ্লামেশন দুটোই তার আজকের শ্বাসকষ্টে ভূমিকা রেখেছে। এই ব্যাপার গুলো প্রোপার অভজার্ভেশনে রাখলে ভবিষ্যতে আর কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না আশা করি, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর তাদের সাথে আরও কিছু কথা বলে বিদায় করলো। তারপর ক্লান্ত পায়ে কামরায় ফিরে বালিশটা কোনোমতে টেনে মাথার নিচে দিতেই ঘুম এসে হামলে পড়লো তার দুচোখের পাতায়।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে চোখ রগড়ে বসলো মীর। গায়ের ওপর চাদর দেখে কিঞ্চিৎ অবাক হলো। রাতে শীত শীত অনুভব হওয়া সত্ত্বেও ঘুমের ভারে চাদরটা গায়ে টেনে দেওয়ার মতো ইচ্ছা হয়নি, ওভাবেই ঘুমিয়ে গেছে আবার!
কিন্তু চাদর কখন গায়ে দিলো মনে পড়লো না, ঘুমের ভেতর কোনোভাবে গায়ে চড়ালেও এত গোছালো ভাবে থাকতোনা গায়ে, তবে কি কামরাতে কেউ এসেছিলো?
বিছানা থেকে নেমে আড়মোড়া ভেঙে মীর ট্রাউজারের ওপর একটা রোব চড়িয়ে আনাবিয়ার কামরার দরজায় করাঘাত করলো। ভেতর থেকে আনাবিয়া রিনরিনে স্বরে বলে উঠলো,
“কাম ইন…..!”
মীর দরজা ঠেলে ঢুকলো ভেতরে। আনাবিয়া আয়নার সামনে বসে, সফেদ কেশগুচ্ছে হাতির দাঁতের নকশাদার কাঁকই চালিয়ে গুণগুণিয়ে গান গাইছে। ভেতরের পোশাকের ওপর একটা পাতলা ড্রেসিং রোব জড়ানো।
মীর ভেতরে এলোনা, দাঁড়িয়ে রইলো দরজাতেই। আনাবিয়ার মেঝে ছুঁতে চাওয়া লম্বা চুল গুলোকে মুগ্ধতাভরা চোখে দেখলো কিছুক্ষণ। আনাবিয়া আয়নাতে দেখলো মীরের চাহনি। আয়নার ভেতরে চেয়েই জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলবেন?”
“কেমন আছো এখন?”
“খারাপ থাকতে তো দেননি!”
মীর স্মিত হাসলো, কাল আনাবিয়াকে বুকে জড়িয়ে বেশ পাগলামি করে ফেলেছে, এমনটা করে উচিত হয়নি। অতোগুলো লোক দেখেছে, তার চিৎকার চেচামেচিতে হেরেমের দাসী গুলো পর্যন্ত ছুটে এসেছে।
আনাবিয়া না ঘুমোনো পর্যন্ত ঘুমোতে যায়নি সে, কাউকে ঘুমোতেও দেয়নি৷ আনাবিয়ার অসুস্থতায় এতটা উদ্বিগ্ন হয়ে যাবে ভাবেনি মীর। অন্যরা নিশ্চয় তার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে ছিলো, একটা মেয়ের অসুস্থতায় এতটা উত্তেজিত হওয়া পড়া তার সাথে কখনো যায় না যে!
কিন্তু গতরাতে তার মাথা খারাপ হয়ে গেছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন দমটা তারই আঁটকেছে, তারই হৃৎপিণ্ড থমকে গেছে, তারই জান ছুটে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে! আনাবিয়ার ব্যাথাতুর, অসহায় দৃষ্টি দেখে তার বুক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো, আরেকটু পেরোলে বোধ হয় কেঁদেও ফেলতো সে!
মীর আনমনে হাসলো আবারও, কিন্তু পরক্ষণেই মিলিয়ে গেলো তার হাসি। সে যা অনুভব করছে সেটা ঠিক নয়। কিন্তু তার মন মানতে চাইছে না। এই মেয়েটা তার আশেপাশে থাকলেও এক অজানা সুখে ভরে থাকে তার মন, এই যে মেয়েটা পাশের কামরাতে ঘুমোয়, মীরের ভেতর এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে।
সে আসার পর থেকে কারণে অকারণে কারো সাথে আর বাজে ব্যাবহার করেনি, কাউকে ধমক দেয়নি, কাউকে বরখাস্ত করেনি। কেমন যেন, শান্তি শান্তি অনুভূতি! নিশ্চিন্তমন, স্বস্তিতে ভরপুর!
না চাইতেও এক অদ্ভুত আকর্ষণ, এক অদৃশ্য সুতো তাকে যেন সর্বক্ষণ টেনে নিয়ে চলেছে এই সফেদ মেয়েটির দিকে। এক অদ্ভুত আত্মিক বন্ধনে যেন আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলতে চাইছে তার সাথে! এই বাঁধন থেকে সে কিভাবে নিজেকে মুক্ত করবে? কিভাবে সম্ভব?
কিন্তু এখনো যে তার অনেক কিছু জানা বাকি, অনেক কিছু শোনা বাকি। সব অজানা, জট পাকানো ব্যাপার গুলো খোলাসা হওয়া বাকি! এই ছোট্ট মেয়েটির সাথে তার কেমন সম্পর্ক ছিলো, সে তার সাথে কি করেছে না জানা পর্যন্ত যে শান্তি পাবে না সে!
“কিছু বলার থাকলে বলুন, নইলে দরজা থেকে সরুন। আপনাকে আমি দেখতে চাইছি না।”
নির্বিকার, রুঢ় স্বরে বলল আনাবিয়া। গতরাতে হানা দেওয়া স্মৃতি গুলো এখনো নেমেসিসের মতোন তাড়া করে চলেছে তাকে! বিষাক্ত স্মৃতিদের তাড়নায় বাজে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছিলোভোরে, বেহায়া মন বার বার চাইছিলো ঘুমন্ত মীরকে একটিবার দেখার জন্য। গুটিগুটি পায়ে সে চোরের মতোন গেছিলো ও কামরায়, অতি যত্নে গায়ে তুলে দিয়েছিলো স্যাটিনের চাদর।
কিন্তু পরক্ষণেই আবার বুক ভাঙছিলো তার, কি করছে সে? এতবার সবকিছু ছেড়ে পালাতে চেয়েও ভুতুড়ে জঙ্গলের গোলকধাঁধার মতোন বারংবার একই স্থানে এসে বাঁধা পড়ছে। কোনোভাবেই এই বন্ধন সে ছিড়তে পারছে না, কিছুতেই না!
তার বাক্যবাণে মীরের চোখের খুশিটা মিলিয়ে যাওয়া সত্বেও নির্বিকার মুখে, কিছুই হয়নি ভাব করে চিরুনী টা ডেস্কে রেখে লেগে পড়লো চুল বাঁধতে।
মীর সত্যিই আহত হলো ওর কথায়, মুখের লেগে থাকা স্মিত হাসিটা আর রইলো না।
“দেখতে চাইছো না কেন? আমি কি করেছি?”
“আপনি কি করেছেন সে ব্যাপারেও আমি কোনো কথা বলতে চাইছি না, আপনি দয়া করে আসুন।”
মীর স্থির দাঁড়িয়ে রইলো দরজায়। এই মুহুর্তে, এত কিছুর পর আনাবিয়ার থেকে এমন আচরণ সে কোনোভাবেই আশা করেনি। অবিলম্বে চোয়াল জোড়া দৃঢ় হয়ে এলো তার। আচমকাই নিজের চিরাচরিত গাম্ভীর্যে ফিরে এসে দৃঢ় স্বরে বলল,
“আমি জানিনা আমি তোমার সাথে কি করেছি বা আমার কাজের প্রভাব তোমার ওপর কতটুকু পড়েছে এবং তুমি কতটুকু কষ্ট পেয়েছো তাতে; কিন্তু আমি আমার কাজের জন্য যে কোনো প্রায়শ্চিত্ত করতে রাজি আছি-”
“যে কোনো?”
মীরের কথার মাঝে শুধোলো আনাবিয়া। মীর তাতে ক্ষুব্ধ হলো কিছুটা। কপালে ভাজ ফেলে বলল,
“গুরুজনের কথার মাঝে কথা বলবেনা, এটা অভদ্রতা।”
পরক্ষণেই আবার বলল,
“তোমাকে এই প্রাসাদের গন্ডি থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া ব্যাতিত আর সবকিছুই করতে রাজি আছি আমি। বলো কি চাও আমার কাছে? কি করলে আমি ক্ষমা পাবো?”
“আপনি যেটা দিতে নারাজ সেটাই চাই আপাতত।”
“সেটা তুমি কখনো পাবে না, এই প্রাসাদ এবং আমার নাগাল থেকে দূরে যাওয়া ব্যাতিত আর যে বাসনাই রাখবে আমি পূরণ করবো।”
“তবে আমার কিছু প্রয়োজন নেই। আপনার থেকে আর কোনো কিছু পাওয়ার নেই আমার। অনেক দিয়েছেন!”
মৃদু স্বরে কথা গুলো বলে চোখ নামিয়ে ফেললো আনাবিয়া। আয়নাতে আর দৃষ্টিগোচর হলোনা তার দ্বিধাহীন, সাহসী চোখ জোড়া!
মীর যেন এবার অধৈর্য হয়ে উঠলো, ব্যাস্ত পায়ে ঢুকে পড়লো সে কামরার ভেতর। আনাবিয়ার কাছে এসে এক হাতে আনাবিয়ার আসনখানা টেনে ফেরালো নিজের দিকে,
“তুমি কি আমাকে অপছন্দ করো?”
এমন শক্ত স্বরে এমন প্রশ্ন শুনে আনাবিয়া ভ্রু কুচকালো, মীরের প্রশ্ন উপেক্ষা করে সে বলল,
“আমি একজন পরিণত তরুণী, আপনি হুটহাট আমার কামরায় ঢুকে পড়তে পারেন না। অন্যদেরকে সারাক্ষণ নীতিবাক্য শুনিয়ে নিজেই যদি এমন উদ্ভট, নীতি হীন আচরণ করেন তবে কেমন হয়?”
“গুরুজনেররা প্রশ্ন করলে ভদ্রভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, পালটা প্রশ্ন করতে হয়না, এটা অভদ্রতা।”
আগের মতো করেই বলল মীর। আনাবিয়া নাকের পাটা ফুলালো তাতে। মীর অত্যন্ত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, তার পেটের কাছে আনাবিয়ার গোলগাল মুখখানা। মীরের উন্মুক্ত, পেশিবহুল পেটে একবার দৃষ্টি দিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকালো সে। পরমুহূর্তেই আড় চোখে তাকালো আরেকবার, এবং তৎক্ষনাৎ চোখ সরালো।গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“সরে দাঁড়ান।”
মীর সত্যিই সরে দাঁড়ালো, থমথমে মুখে বলল,
“আমি তোমার নিকট আগেও ক্ষমা চেয়েছি আমার কৃতকর্মের জন্য। আমি জানিনা কি করেছি, কিন্তু হয়তো এমন কিছু করেছি যার কারণে তুমি আমার ওপর অসন্তুষ্ট। তুমি হয়তো আমাকে পছন্দও করোনা, বা আমাকে সহ্য করতে পারোনা। কিন্তু কেউ ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে হয়, ক্ষমা মহৎ গুণ।”
“হু, তারপর?”
“এখন তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিবে, এবং আমি কি করলে তুমি আবার আমাকে পছন্দ করবে সেগুলো বলবে, আমি তাই করবো।”
আনাবিয়া বিরক্তি নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। মীরের মুখভঙ্গি থমথমে, এর অর্থ সে অনেক সিরয়াস৷ আনাবিয়া ভ্রু কুচকে বলল,
“আমি কাকে পছন্দ করবো, কাকে করবোনা এটা নিশ্চয় আমার ব্যাক্তিগত ব্যাপার!”
“না, আমি যাকে বলবো তুমি তাকে পছন্দ করবে৷”
“অহ্ আচ্ছা! তো আপনার মতে আমার কাকে পছন্দ করা উচিত?”
“আমাকে।”
“আচ্ছা…! আর কাকে অপছন্দ করা উচিত?”
“বাকি সবাইকে৷”
আনাবিয়া উঠে দাঁড়ালো, পোশাকের পাতলা আবরণের ফাঁক ফোকড় দিয়ে দৃষ্টিগোচর হলো তার শরীরের ঢেউ খেলানো অবকাঠামো। চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো মীর।
“আপনি হঠাৎ আমার পছন্দ অপছন্দ নিয়ে কেন পড়েছেন? আমি আপনাকে পছন্দ করলে তাতে আপনার লাভ কি? পছন্দ না করলেও বা ক্ষতি কোথায়?”
বুকে হাত বেধে প্রশ্ন করলো আনাবিয়া। মীর কোনো সদুত্তর দিতে পারলোনা। বারকয়েক এলোমেলো ভাবে এদিক ওদিক চাইলো, যেন খুঁজে চলল প্রশ্নের উত্তর। পরক্ষণে ঘড়ির দিকে নজর যেতেই বলে উঠলো,
“আমার দেরি হচ্ছে, যেতে হবে। আমার অনেক প্রশ্ন বাকি আছে, সেগুলোর উত্তর এসে শুনবো। মহসিন দুজন দাসীকে তোমার খেয়াল রাখার জন্য নিযুক্ত করেছে, তাদেরকে তাড়িয়ে দিবে না। ভালো মেয়ের মতো খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম করবে, আমি ফিরে এসে তোমার সারাদিনের কাজের হিসাব নিবো, মাইন্ড ইট।”
বলেই মীর বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। আনাবিয়াকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সুযোগ দিলোনা।
তৈরি হয়ে বের হতেই দেখা মিললো আরমানের। তার হাতে একটা লেডিস টোট ব্যাগ। লিও জোরজবরদস্তি করে ছিনিয়ে নিতে চাইছে৷
মীরকে দেখেই তড়িঘড়ি সোজা হয়ে দাঁড়ালো তিনজনে। মীর এগিয়ে এসে ব্যাগটির দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা কার? একটা লেডিস ব্যাগ নিয়ে তোমরা তিনজন ফেরোশ্যাস ম্যেল কি করছো?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, এটা শেহজাদীর রেস্টুরেন্ট উৎখাত করার সময়ে পেয়েছি, ওখানের একটা পিচ্চি মেয়ে বলল এটা নাকি শেহজাদীর। তাই আমি যত্ন করে এই পর্যন্ত বয়ে নিয়ে এসেছি, কিন্তু লিও…”
“কিন্তু লিও এটা নিয়ে আপনার কাছেই হস্তান্তর করতে চাইছিলো ইয়োর ম্যাজেস্টি, কিন্তু আরমান দিতে রাজি না হওয়ায় একটু টানাটানি হয়েছে….এই আরকি!”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৯
আরমানের মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে বলে উঠলো কাঞ্জি।কাঞ্জির এমন ডাহা মিথ্যা কথায় আরমান চোখ বড় বড় করে তাকালো ওর দিকে। স্পষ্টতই ওরা ব্যাগটা হিজ ম্যাজেস্টির থেকে গোপন করতে চাইলো, অথচ এখন কিনা সাধু সাজলো! নারাজ হয়ে আরমান তাকিয়ে রইলো নিচের দিকে।
মীর লিওর দিকে সন্দেহের দৃষ্টি দিয়ে ব্যাগটা এক প্রকার ছিনিয়ে নিলো ওর হাত থেকে। তারপর সেটা নিজের কামরার গোপন কোনো অংশে লুকিয়ে রেখে এগোলো মিটিং রুমের উদ্দ্যেশ্যে।
