Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৯

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৯

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৯
Fatima Fariyal

আহিয়ার হাতের তালু ঘামছে। অজানা এক ভয়, এক অনিশ্চয়তায় তার আঙুলও বেশ কাঁপছে। তার অন্য হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে আদনান। এই তো, মাত্র কয়েক মিনিট আগেই আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের বিয়ের সব কার্যক্রম শেষ হয়েছে। কাবিননামায় আদনানের স্বাক্ষর হয়ে গেছে। বাকি আছে শুধু আহিয়ার নামটা। কিন্তু কলমটা হাতে নিতেই অজানা আশঙ্কায় বুকটা ধুকপুক করছে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আদনানের ডাকা দুজন সাক্ষী, তার সহকারী। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছে যে আহিয়ার মাথা তাল হারিয়ে ফেলেছে। আদনান আহিয়ার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। কণ্ঠে আশ্বাস, কিন্তু সেই আশ্বাসের আড়ালে একরাশ অধিকার,

“ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি আছি তো। আমার ওপর ভরশা রাখ। সবকিছু আমি সামলে নেব।”
আহিয়া শুকনো ঢোক গিলল। আড়চোখে তাকাল আদনানের দিকে। তার চোখে অদ্ভুত এক তৃষ্ণা, চাওয়া, পাওয়া আর হারানোর ভয় একসাথে মিশে আছে। সেই দৃষ্টিতে মুহূর্তের জন্য বুকটা আরও কেঁপে উঠল। ভয়টাকে বুকে চেপে ধরে, কাঁপা হাতে স্বাক্ষর করে দিল আহিয়া।মুহূর্তে যেন কিছু একটা চিরতরে বদলে গেল। আদনান চোখ বন্ধ করে গভীর স্বস্তির নিশ্বাস নিল। শত অপেক্ষা, অসংখ্য না-বলা অনুভূতির শেষে সে পেল তার বহুদিনের ভালোবাসাকে, তার আহিকে। এখন আর হারানোর ভয় নেই। এখন আর নিজের আবেগকে শাসন করতে হবে না।
ভাবতে ভাবতে আদনানের চোখের কোণে টুপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু জমে উঠল। লোকচক্ষুর আড়ালে সাবধানে চোখ মুছে নিল সে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে তারা কাজি অফিস থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নাদিম আর শাওন তাদের দেখেই তড়িঘড়ি নিজেদের গাড়িতে উঠে পড়ল। মুখের উজ্জ্বলতা দেখেই বোঝা যায়, কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
আদনানের সহকারীরাও বিদায় নিয়ে চলে গেল। গাড়িতে উঠে বসল আদনান আর আহিয়া। ভেতরে কেমন গুমোট একটা পরিবেশ। আহিয়ার বুক ভার হয়ে আছে। এক পলকের মধ্যে সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে গেছে। আজ যে মানুষটা তার সামনে বসে আছে, সে এখন আইনিভাবে তার স্বামী। আহিয়ার চোখ সোজা সামনের দিকে। তবু সে বুঝতে পারছে, আদনান তাকে কেমন করে যেন দেখছে। তার অস্বস্তি হলো, কম্পিত গলায় শুধাল,

“কিছু বলবেন?”
আদনান মৃদু হেসে উঠল। কারণ আজ আহিয়া অন্যদিনের মতো শেষে “আদনান ভাই” যোগ করেনি। মনে মনে সে সন্তুষ্ট হলো, যাক, এতটুকু তো বদল এসেছে। সে একটু ঝুঁকে এলো আহিয়ার দিকে। কণ্ঠ নরম, কিন্তু শব্দে স্পষ্ট দখল,
“তোকে একবার জড়িয়ে ধরব আহি? ফিরিয়ে দিস না প্লিজ। যদিও ফিরিয়ে দেওয়ার অপশন এখন নেই। এখন তুই শুধু আমার। দলিলও আছে আমার কাছে। প্রমাণ চাইলে দেখাতে পারি।”
আহিয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। একদিকে অনুমতি চাওয়া, অন্যদিকে নিঃশর্ত অধিকার, সবকিছু একসাথে মাথার ভেতর ঘুরছে। তাই সে চুপ থাকল। এই নীরবতাকেই সম্মতি ভেবে আদনান ধীরে হাত বাড়িয়ে তার বাহু জড়িয়ে ধরল। আহিয়া হতভম্ব। নড়ার শক্তিটুকুও নেই। আদনান তার কাঁধে মুখ গুঁজে দিল। হঠাৎ আহিয়া খেয়াল করল, আদনানের শরীর কাঁপছে। সে ঢুকরে ঢুকরে কাঁদছে।
আহিয়া সম্পূর্ণ বেকুব হয়ে গেল। অবচেতনে তার পিঠে হাত রাখল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

“আদনান ভাই… কী হয়েছে আপনার? কাঁদছেন কেন? বলুন না। আমি তো আপনার কথা শুনেছি, তাহলে কাঁদছেন কেন?”
আদনান নাক টেনে বলল,
“তোকে ম্যাচিউর ভেবেছিলাম। নিজের বিয়ে করা স্বামীকে কেউ ভাই বলে ডাকে? স্টুপিড!”
আহিয়া আরও অবাক। এই তো কাঁদছিল! এখন আবার বকছে! সে সত্যিই বিভ্রান্ত হলো।
“আপনি পাগল হয়ে গেছেন নাকি? এমন করছেন কেন?”
“পাগল হবো কেন? আমি পাগল হলে তোকে কে ভালোবাসবে?”
“তাহলে কাঁদছেন কেন?”
“খুশিতে। ঠেলায়।”

আহিয়া বুঝল, আদনান সত্যিই আবেগের চাপে এমন উল্টাপাল্টা বলছে। না হলে এমন আদনানকে সে আগে কখনো দেখেনি। পরিস্থিতি সামলাতে সে প্রশ্ন করল,
“এখন কী করবেন? বাসায় গিয়ে কী বলবেন সবাইকে? যদি সবাই রেগে যায়?”
এই প্রশ্নে আদনান নিজেকে গুছিয়ে নিল। তাকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“এখন কাউকেই কিছু জানাব না। আমরা আগে যেমন ছিলাম, তেমনই থাকব। তোর পরীক্ষা শেষ হলে সবার মতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হবে। সবাই সেটাই জানবে। আজকের ব্যাপারটা গোপন থাকবে।”
একটু থেমে সতর্ক কণ্ঠে যোগ করল,

“আর আবেগে পড়ে বান্ধবীদের কিছু বলিস না। তাহলে তোর ভাইয়ের কানে যেতে সময় লাগবে না।”
আহিয়া চুপ। আদনান আবার বলল,
“আমি কী বলেছি বুঝেছিস? নাকি এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে গেছে?”
“বুঝেছি… কিন্তু..”
“কিন্তু কী?”
“তবুও যদি জেনে যায়?”
“তাহলে আমার কাছে দলিল আছে। তাতে স্পষ্টভাবে লেখা, আদনান মীরের স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা পেয়েছে আহিয়া রোজ মীর। সুন্দর করে তোর আর আমার সাক্ষর ও দেয়া আছে। আশা করি এরপর আর তোর কোন প্রশ্ন নেই।”
আদনানের স্বর ঠাণ্ডা। আহিয়া মাথা নেড়ে দিল। অর্থাৎ, তার আর কিছু বলার নেই। আদনান গাড়ি ঘোরাল বাড়ির দিকে। তারা সবে মূল গেট পেরিয়েছে, ঠিক তখনই পিছন থেকে বজ্রকণ্ঠে হুংকার উঠল,

“আদনান!”
আদনান আর আহিয়া দুজনেই একসাথে থমকে গেল। কী হচ্ছে, কিছু বোঝার আগেই আহাদ ঝাঁপিয়ে পড়ল আদনানের উপর। তার চোখে তখন রক্তিম আগুন, মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে আছে। এক হাতে আদনানের শার্টের কলার চেপে ধরে সে গর্জে উঠল,
“তোর সাহস হয় কী করে, এত বড় স্পর্ধা দেখানোর? আমি তোকে মেরেই ফেলব আজ!”
তার হাত শক্ত মুঠি হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল এখনই এক ঘুষি আদনানের মুখে এসে পড়বে। আদনান কিছুই বলল না। চোখে কোনো ভয়ের ছাঁপ নেই, শুধু একরাশ দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস। আহিয়া পাশে দাঁড়িয়ে ভয়ে জমে আছে। তার পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেছে, গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা তীক্ষ্ণ অথচ শান্ত ডাক ভেসে এলো,

“মন্ত্রীমশাই!”
ডাকটা শুনেই আহাদের হাত থেমে গেল। মুখে কৃত্রিম একটা হাসি টেনে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। মাত্র চার ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে রিদিতা। চোখে কড়া দৃষ্টি, মুখে কোনো আবেগ নেই। শাহীন আগেই ফোন করে রিদিতাকে সব জানিয়ে দিয়েছে, তাই আনিকা আর নীলাকে সাথে নিয়েই সে দ্রুত বাসায় ছুটে এসেছে। কিন্তু ঢোকার সাথেই এই দৃশ্য চোখে পড়ে। আহাদ আদনানের বাহুতে হাত রেখে হাসিমুখে বলল,
“বিশ্বাস করো জানু, আমি কিছু করিনি। আমি তো কোলাকোলি করছিলাম। আদনান একদিকে আমার বড় ভাই, আরেকদিকে ভগ্নিপতি হয়েছে। আমি কী করে ওর গায়ে হাত তুলতে পারি বলো? আমি তো অভিনন্দন জানাচ্ছিলাম!”

রিদিতা ঠোঁট শক্ত কটমট করে তাকিয়ে রইল। আহাদ বুঝে গেল, এই হাসি কাজে দেবে না। সে ধীরে ধীরে আদনানের কলার ছেড়ে দিল। কিন্তু রিদিতার চোখের দিকে ঠিকঠাক তাকানোর সাহস হলো না। মাথা একটু নিচু করে অপরাধী বাচ্চাদের মতো ঠোঁট পাউট করে আবার ছাড়ল, মুখটাকে বিভিন্ন ভঙ্গি করতে লাগল। মনে পড়ে গেল গতরাতের কথা।
প্রেয়সী তার গলা জড়িয়ে ধরেছিল। গলায়, কাঁধে, গালে ছোট ছোট অজস্র চুমু এঁকে দিচ্ছিল। সেই অপ্রত্যাশিত ভালোবাসায় আহাদের মনে সন্দেহ জেগেছিল। এখন সেই সন্দেহ আরও গাঢ় হলো, এই আল্লাহর বান্দি তো স্বামীর ডাকে এতো সহজে ধরা দেয়ার মহিলা না। সে কথাটা চেপে রাখতে পারল না।

“কী ব্যাপার রিদি রানি? কী মতলব আঁটছেন বলেন তো? আপনি তো এমন আহ্লাদী দেখানোর মানুষ না। হঠাৎ স্বামীর প্রতি এত ভালোবাসা?”
রিদিতা তার বুকে মুখ লুকিয়ে নিল।
“আমি কী আপনাকে ভালোবাসি না? আপনার তাই মনে হয়?”
আহাদ তার সামনের চুলের গোছা সরিয়ে দিয়ে ধীরে বলল,
“না, ভালোবাসেন। কিন্তু স্বামীর ডাকে এত সহজে ধরা দেওয়ার মানুষ তো আপনি না। অন্যদিন তো খুঁটি-পালা, জানলা-দরজা ধরে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো খুঁট দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাহলে আজ এত সহজে সাড়া দিলেন কেন? কাহিনি কী?”

রিদিতা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“বলতে পারি… কিন্তু ওয়াদা করেন, আপনি রাগ করবেন না।”
“ওয়াদা।”
“এভাবে না। সুন্দর করে ওয়াদা করেন।”
“সুন্দর করে ওয়াদা।”
“আরে… কসম দিতে বলছি। সত্যি সত্যি কসম!”
“সত্যি সত্যি কসম।”
“ধুর! বলবই না, যান!”
সে উঠতে চাইতেই আহাদ তার শাড়ির আঁচল ধরে টেনে নিল। ধীরে কাছে এনে একটু উঁচু হয়ে তার ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আমার চুমুর কসম, রাগ করব না। রাগ করলে আর চুমু খেতে দিওনা। যাও!”
রিদিতা একটু হেসে ফেলল, “সত্যি তো?”
“আরেকটা খাবো?”
“না না, বলছি!”
আহাদ তাকে টেনে নিজের উরুর ওপর বসাল। এবার রিদিতা আর দ্বিধা করল না।
“আহিয়া আর আদনান ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে আপনি আর কোনো ঝামেলা করবেন না প্লিজ। একবার ভাবুন তো, আহিয়াকে আদনান ভাই যতটা ভালোবাসে, আর কেউ কি ততটা পারবে? অন্য কোথাও বিয়ে দিলে আহিয়া কি সুখী হবে? না তো! আর..”
“আর?” আহাদ গম্ভীর গলায় বলল।
“আর, কথায় কথায় আদনান ভাইয়ের গায়ে হাত তোলাটা আমার ভালো লাগে না। শত হলেও আদনান আপনার বড়।”

“আর?”
“আপনার রাগটা কমান। আপনি রেগে গেলে, আপনাকে ভয় লাগে আমার।”
“আর?”
রিদিতার ভ্রু কুঁচকে গেল। বুঝতে পারল আহাদ ইচ্ছে করে এমন করছে। সে এবার আলত করে গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“ভালোবাসি.. ভীষণ ভালোবাসি। আপনার কল্পনার সীমা ছাঁপিয়ে, আরও অধিকাতর ভালোবাসি।”
আহাদ তাকে নিজের সাথে টেনে নিয়ে হেসে ফিসফিস করল, “এটা শুরুতেই বলা যেত না? শুধু শুধু কতগুলো শব্দের অপব্যাবহার হলো। এখন শব্দগুলো বদদোয়া দিলে কী হবে? হুহ?”

“আপনি আছেন তো, কিছু হবে না।”
“আমি-ই তো আপনার সর্বনাশের মূল কারণ, অথচ আপনি আমাকেই অজুহাত দিচ্ছেন?”
“আপনি এত খারাপ কেন?”
“আসেন, খারাপের নমুনা দেখাই।”
রিদিতা হেসে সরে গেল, “আপনি কিন্তু কসম দিয়েছেন।কসম ভুলবেন না!”
“আজকের মতো সব সময় ডাকে সাড়া দিলে ভুলব না।”
“বজ্জাত বেডা।”
“আমি বজ্জাত?”
“তা নয়তো কী!”
“আচ্ছা?”

রিদিতা মাথা নাড়ল। আহাদ এবার দুষ্টমি করে রিদিতাকে শুড়শুড়ি দিতে লাগল। রিদিতা হাসতে হাসতে নুইয়ে পড়ল। সেও পাল্টা শুড়শুড়ি দিতে চাইল কিন্তুু আহাদ রাজার সাথে কী আর সে পারে? এই মধ্যরাতেও দুজনের দুষ্টুমিতে ঘর ভরে উঠল হাসি আর কলরবে।
এই মুহূর্তে সেই রাতের কথা মনে করে আহাদ একটু শব্দ করেই হেসে উঠল। কিন্তু রিদিতার চোখের দিকে তাকিয়ে তার হাসি আবার উবে গেল। এক পা এগোতেই, রিদিতা তার পাশ কাটিয়ে আহিয়ার হাত ধরে টেনে ভেতরে চলে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল তার মুখের উপর। আহাদ দরজায় কপাল ঠেকিয়ে অনুনয় করতে লাগল। তার অবস্থা দেখে শাহীন আর আনিকা মুখ টিপে হাসল। নীলা হাসতে চাইলেও পারল না। বুকের ভেতর দমিয়ে রাখা যন্ত্রণাটা তাকে যেন দিন দিন গ্রাস করছে।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৮

আদনান এক ঝলক আহাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। তখনই নাদিম আর শাওন এসে হাজির হলো। তাদের হাটু কাঁপছে কারন আহাদ তাদের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন চোখ দিয়েই তাদের গিলে ফেলবে।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫০