নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৪
সুমি চোধুরী
বাতাসের প্রতিটি স্পন্দন যেন হঠাৎ বরফ-ঠান্ডা হয়ে গেছে। চারপাশের সমস্ত শব্দ, সমস্ত গতি, এক অদৃশ্য প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। মনে হচ্ছে এই মহাবিশ্বের কোনো এক গোপন সুইচ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।
কেবল পরিবেশ নয়, সেই নীরবতার ভারে সময় নিজেও যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেছে। যেন কোনো এক মন্ত্রবলে,এই মুহূর্তটি পৃথিবীর জীবনপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু একা দাঁড়িয়ে আছে।
রৌদ্রের হাত থেকে টপটপ করে র*ক্ত ঝরছে, তবুও সে দাঁতে দাঁত চেপে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে।ঠিক তার সামনেই শিহাব ক্রোধে ফুঁসছে, যেন একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড।কিছুক্ষণ আগেই রৌদ্র যখন ঘরে প্রবেশ করে, শিহাব তাকে দেখে মুহূর্তে আগুনের মতো জ্বলে ওঠে। কোনো কিছু চিন্তা না করেই সে রৌদ্রকে আঘাত করা শুরু করে যেন বহুদিনের জমে থাকা প্রতিশোধ চরিতার্থ করছে। অবাক করা বিষয় হলো, রৌদ্র একটি বারের জন্যও শিহাবের গায়ে হাত তোলেনি। সে শুধু মার খেয়েছে এবং শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু শিহাব সে কথায় কর্ণপাত করেনি।একপর্যায়ে শিহাবের প্রবল ধাক্কায় রৌদ্র ছিটকে মেঝেতে পড়ে যায়। দুর্ভাগ্যবশত, তার হাত গিয়ে লাগে ডাস্টবিনে ফেলে রাখা ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোর ওপর। তীক্ষ্ণ কয়েকটি কাঁচের অংশ তার হাতের তালুতে বিঁধে যায়।
শিহাব আবারও রৌদ্রকে মারতে উদ্যত হলো, ঠিক তখনই রৌদ্র দ্রুত বলে উঠল।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ভাই, আমার শান্ত হ। আমি এখানে কোনো ঝামেলা করতে আসিনি। তোর জীবনটা আমি যেমন এলোমেলো করে দিয়েছিলাম, ঠিক সেইভাবেই সবকিছু আগের মতো গুছিয়ে দেব। শুধু তাই নয়… আমি… আমি… হ্যাঁ! তুরাকেও তোর জীবনে ফিরিয়ে দেব।”
রৌদ্রের যেন শেষের কথাটুকু বলার সময় গলা কেঁপে উঠল। তার এই কথা শুনে শিহাব এক মুহূর্তে থমকে গেল। রৌদ্র তাকে বলল তার জীবন আগের মতো করে দেবে, তুরাকে তার জীবনে ফিরিয়ে দেবে বিষয়টা যেন শিহাবের কাছে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো।মুহূর্তেই শিহাব রাগে রৌদ্রের শার্টের কলার চেপে ধরে,ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল।
“আমাকে কি তুই বোকা পেয়েছিস? তুই আমার জীবন ঠিক করে দিবি, এইটাও আমার বিশ্বাস করতে হবে হাহ্! বল, তুই আমার বিরুদ্ধে নতুন কী প্ল্যান করছিস?”
রৌদ্রের হাতে কাঁচের আঘাতে র*ক্ত ঝরছে, সেই যন্ত্রণার মধ্যেও অসহায় ও অনুতপ্ত স্বরে বলল।
“ভাই, বিশ্বাস কর! আমি কোনো প্ল্যান করছি না, আমি সত্যি তোর জীবন ঠিক করে দেব। আমি তুরাকে বাড়িতে দিয়ে এসেছি। বিশ্বাস না হলে তুই আমার বাবাকে কল কর। আমি এটাও বলে এসেছি, তোদের দুজনের বিয়ের কথা।”
রৌদ্রের কথায় শার্টের কলার থেকে শিহাবের হাত আলগা হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে শার্টের কলার ছেড়ে দিলো। শিহাব হাতটা ছেড়ে দিতেই রৌদ্র আবারো নিচু, দুর্বল আন্তরিক কণ্ঠে বলল।
“আমি জানি, আমি যা করেছি তোর সাথে, তা অনেক অন্যায় করেছি। তুই আমাকে মাফ করে দিস, শিহাব। আমি কথা দিচ্ছি, তোর বিয়ে তুরার সাথেই হবে। আমি আর আসব না তোদের মাঝে, চলে যাব অনেক দূরে। পারলে তুই আমাকে জাস্ট মাফ করে দিস। আর হ্যাঁ, তুরাকে ভালো রাখিস। এইখানে তুরার কোনো অপরাধ নেই। তুরা আমাকে ঘৃণা করে, তুরা তোকে চায়। তাই আমি তোর কাছে অনুরোধ করব, এই সব বিষয় নিয়ে কখনো তুরাকে কোনো কথা বলবি না। তুরা অনেক ভালো মেয়ে। তুরাকে পেলে তুই সত্যি ভাগ্যবান হবি। আমি তোদের জন্য সবসময় দোয়া করব। আসি রে এখন।”
কথাটা বলেই রৌদ্র চলে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে শিহাব তার হাত ধরে আগের চেয়ে শান্ত,কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
“দাঁড়া তুই আমার সাথে খারাপ কাজ করেছিস, তার জন্য আমি তোকে সাজা দিয়েছি। তাই বলে আমি এতটাই পাষাণ নই যে তোকে আমি এই রক্তাক্ত হাতে যেতে দেব।”
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।ধীরে ধীরে রাস্তাঘাট আর শহরের প্রতিটি কোণায় আলো জ্বলে উঠছে। চারপাশের এই কৃত্রিম আলো যেন ঘরের ভেতরের চাপা উত্তেজনার বিপরীতে এক শান্ত ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে।হলরুমে সকলেই তখন চিন্তিত মুখে বসে আছে। সবার চোখে-মুখে গভীর উদ্বেগের ছাপ, কারণ রৌদ্র এখনও ফেরেনি। সকলের এই চিন্তাভাবনার মাঝেই সদর দরজা দিয়ে হলরুমে প্রবেশ করলো রৌদ্র।
রৌদ্রকে দেখেই সকলে তাৎক্ষণিক দাঁড়িয়ে গেল। রৌদ্রের মুখে মারের স্পষ্ট ছাপ, এক দেখাতেই বোঝা যাচ্ছে কেউ তাকে আঘাত করেছে। আবার হাতে ব্যান্ডেজ দেখে সবাই অবাক ও স্তম্ভিত হয়ে গেল। রৌদ্রের মা রৌশনি খানের কলিজা যেন শুকিয়ে গেল।মুহূর্তে তিনি দৌড়ে এসে রৌদ্রের দুই গালে হাত দিয়ে অস্থির উদ্বিগ্ন ও ব্যাকুল স্বরে বলল।
“তোর কী হয়েছে বাবা? তোর এই অবস্থা কে করেছে? আর হাতে ব্যান্ডেজ কিসের? হাত কাটল কীভাবে?”
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে নামলো তুরা। রৌদ্রের এমন অবস্থা দেখে তুরার বুকটা হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠলো। তুরা নিচে নামতেই রৌদ্র এক পলক তার দিকে তাকালো। তারপর আবার রৌশনি খানের উদ্দেশ্যে বলল।
“কিছু হয়নি মম। এটা আমার পাপের সাজা। চিন্তা করো না, আমি ঠিক আছি।”
তারপর আবার বাড়ির সকল পুরুষের উদ্দেশ্যে বলল।
“তোমরা সবাই তুরার বিয়ের ব্যবস্থা করো। শিহাব তুরাকে বিয়ে করবে, আমি বলে এসেছি। তাই যা করার তাড়াতাড়ি করো।”
কথাটা বলেই রৌদ্র নিজের রুমের দিকে যেতে উদ্যত হলো। আবার হঠাৎ কী মনে করে যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেলো এবং সকলের উদ্দেশ্যে বলল।
“আর হ্যাঁ,আমি থাকবো না বিয়েতে। আমার মতো মানুষের এই বিয়েতে থাকার মুখ নেই। তাই সবাইকে আমি বলে রাখছি, আমি সুইজারল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছি। আমি আজ রাতেই সব ব্যবস্থা করে রাখবো।”
কথাটা বলেই রৌদ্র এক মিনিটও দেরি না করে বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।আসলে রৌদ্র জানে, সে এই বিয়েতে থাকতে পারবে না। তার ভেতরের দুর্বার ভালোবাসা তাকে বারবার বাঁধা দেবে, তুরাকে অন্য কারো হতে দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। এই বিয়েতে থাকলে হয়তো তার পুরোনো পাগলামি আবারো জেগে উঠবে। কারণ, তুরাকে সে সত্যিই ভালোবাসে, সম্ভবত নিজের জীবনের চেয়েও বেশি। আর ঠিক এই কারণেই, নিজের সেই তীব্র ভালোবাসা কোরবানি দিয়ে, তুরার ভালোর জন্য সে এত বড় এবং কঠিন সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। সুইজারল্যান্ডে ফিরে যাওয়াটা তার জন্য পালানো নয়, বরং ভালোবাসার এক চরম আত্মত্যাগ।
রৌদ্রের প্রস্থানের পর হলরুমের সেই মুহূর্তটা যেন এক ভারী নীরবতার চাদরে মুড়ে গেল। বাড়ির সকলে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো বা বসে থাকলো। কারো মুখে কোনো কথা সরলো না, যেন তারা সবাই একটি নাটকের শেষ দৃশ্যের আকস্মিকতায় স্তব্ধ।উপস্থিত সকলের মধ্যে আনোয়ার খানের অবস্থা ছিল সবচেয়ে করুণ। ছেলেকে তিনি বাইরে যতোই কড়া আর রূঢ়ভাবে দেখান না কেন, ভিতর থেকে তিনি ছেলেকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন। ছেলের র*ক্তা*ক্ত মুখ, আর তার ওপর এই চিরতরে চলে যাওয়ার ঘোষণা সব মিলিয়ে আনোয়ার খানের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, যা তার চাপা বেদনা প্রকাশ করছে।
অন্যদিকে, রৌদ্রের সুইজারল্যান্ড ফিরে যাওয়ার কথা শুনে তুরার বুকেও এক অজানা ব্যথা মুচড়ে উঠলো। যদিও রৌদ্রের প্রতি তার এক ধরনের ক্ষোভ বা দূরত্ব আছে, তবুও তার এই চূড়ান্ত বিদায়ের সিদ্ধান্তে তুরা কেন যেন গভীর খারাপ লাগা অনুভব করলো। রৌদ্র চলে যাবে এই চিন্তাটা তার কাছে কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হলো।
আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না রৌশনি খান। ছেলের এই করুণ অবস্থা আর বিদায়ের খবরে তাঁর মায়ের হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেল। তিনি শাড়ির আঁচল মুখে গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। সেই কান্নার শব্দ হলরুমের থমথমে পরিবেশকে আরও ভারি করে তুললো। এরপর তিনি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, সেই অশ্রুভেজা চোখ নিয়েই, প্রায় ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
রাত দশটা ১০:০০টা রৌদ্রের হাতে গভীর ব্যথা, আর সেই সাথে তার শরীর জ্বরে পুড়ছে। সে অতি কষ্টে সেই অসহ্য বেদনা নিয়ে বিছানায় একটু শুয়ে ছিল এবং মুহূর্তেই ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। কিন্তু সেই ঘুমের মধ্যেই জ্বর বেড়েছে। রৌদ্র অসহনীয় যন্ত্রণায় বিছানায় ছটফট করছে।
অন্যদিকে, তুরার চোখে একটুও ঘুম নেই। কেন যেন চোখ বন্ধ করলেই কেবল রৌদ্রের মুখটাই বার বার ভেসে উঠছে। আর রৌদ্র চলে যাবে এই ভাবনায় তার বুকটা খালি কেঁপে উঠছে। হঠাৎ তুরা নিজের অজান্তেই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, রুম থেকে বের হলো। টিপটিপ পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রৌদ্রের রুমের দরজার সামনে। তুরা নিজেও জানে না, ঠিক কী কারণে সে এখানে এসেছে।তুরা দরজায় হালকা ধাক্কা দিতেই সেটি খুলে গেল। দরজা খোলা দেখে তুরা অবাক হলো তার মানে রৌদ্র দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তুরা টিপটিপ করে রুমে প্রবেশ করলো। ঘরে ঢুকেই দেখলো, রৌদ্র বিছানায় শুয়ে অস্বাভাবিকভাবে ছটফট করছে।রৌদ্রকে এমন করতে দেখে তুরা মুহূর্তেই তার কাছে ছুটে গেল এবং ভয়ে ভয়ে তার শরীরে স্পর্শ করলো। স্পর্শ করতেই তুরা চমকে উঠলো এবং ভয়ে হালকা দূরে ছিটকে গেলো। রৌদ্রের শরীর যেন জ্বরে আগুনের মতো পুড়ছে এত তীব্র তাপ, মনে হলো যেন শরীরে চাল দিলে তাতেই খই ফুটে যাবে।
তুরা আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। সে দৌড়ে ওয়াশরুমে গেল এবং দ্রুত এক পাত্রে ঠান্ডা জল নিয়ে এলো। তুরা যেন পাগলের মতো হয়ে গেছে, কারণ রৌদ্রের শরীরে যে জ্বর, এভাবে থাকলে আরও বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে। তুরা একটি তোয়ালে ভিজিয়ে তাড়াতাড়ি রৌদ্রের তপ্ত কপালে রাখল।একটু ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করতেই রৌদ্র জ্বরের ঘোরেই কেঁপে উঠলো এবং মুহূর্তেই পাশে থাকা তুরার একটি হাত শক্ত করে ধরে ফেললো। রৌদ্রের এই আকস্মিক স্পর্শে তুরা নিজেও চমকে উঠল, তার সারা শরীর যেন ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল।
তুরা কাঁপা কাঁপা হাতেই রৌদ্রের কপালে জলপট্টি দিতে থাকলো। হঠাৎ তার চোখ গেল রৌদ্রের কাটা হাতের দিকে। দেখলো রৌদ্র কেমন যেন বারবার হাতটা নড়াচ্ছে, হয়তো প্রচণ্ড ব্যথা করছে। তুরা রৌদ্রের মাথায় জলপট্টি রাখা অবস্থাতেই আস্তে করে তার হাত ছাড়িয়ে নিলো। এরপর সে রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে এসে একটা ব্যথার ট্যাবলেট নিলো। তারপর চুপিচুপি নিচে এসে রান্নাঘর থেকে ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে এক প্লেট খাবারও নিলো। তুরা নিজেও জানে না,কেন সে এমন করছে, আর কেনই বা সে রৌদ্রকে সেবা করার জন্য এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
তুরা সাবধানে এক প্লেট খাবার এবং ব্যথার ট্যাবলেট নিয়ে রৌদ্রের রুমে প্রবেশ করলো। ঘরে এসে সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। এত জ্বরের ঘোরে থাকা রৌদ্রকে এখন সে কীভাবে ডাকবে? আর ব্যথার ট্যাবলেট খাওয়াতে গেলে তো আগে তাকে ভাত খাওয়াতে হবে। রৌদ্র তো কিছু খায়নিই, শুধু রৌদ্র কেন, আজকের দিনে এই বাড়ির কেউই দুশ্চিন্তায় ঠিকমতো ভাত মুখে তোলেনি। এই পরিস্থিতিতে রৌদ্রকে জাগানো বা খাওয়ানো, দুটোই যেন তার কাছে কঠিন পরীক্ষা মনে হলো।
তুরা কী করবে এখন? বাড়ির কাউকে ডাক দেবে? কিন্তু এত ধকল যাওয়ার পর হয়তো সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অনেক কিছু ভেবে তুরা একটি লম্বা শ্বাস নিলো। সে খাবারের প্লেটটি পাশে রেখে রৌদ্রের পাশে এসে বসলো, আলতো করে নম্র ও মৃদু স্বরে ডাক দিলো
“রৌদ্র ভাইয়া শুনছেন? এই রৌদ্র ভাইয়া?”
প্রথম ডাকে রৌদ্র উঠল না। তুরা এবার সামান্য সাহস সঞ্চার করে রৌদ্রের শরীরটা হালকা ঝাঁকিয়ে আগের চেয়ে সামান্য উঁচু স্বরে ডাক দিলো।
“রৌদ্র ভাইয়া,শুনছেন?”
রৌদ্রের এবার ঘুম ভাঙল, সে পিটপিট করে চোখ খুলল। তুরাকে নিজের পাশে আবিষ্কার করতে দেখে সে যেন চমকে উঠলো। পরক্ষণেই সে শরীরের তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে পারলো। শরীর কেমন দুর্বল, আর মাথায় জলপট্টি। রৌদ্রের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে তুরাই তার মাথায় জলপট্টি দিয়েছে। তবে অবাক করার বিষয় হলো, তুরাকে এই গভীর রাতে নিজের ঘরে থাকতে দেখে। রৌদ্র বিস্মিত ও দুর্বল কণ্ঠে বলল।
“তুই এখন এই সময় আমার রুমে?”
রৌদ্রের কথা শুনে তুরা কী বলবে বুঝতে পারলো না। সে তো নিজেই জানে না, কেন সে এখানে এসেছিলো। তুরা এসব কিছু ভেবে একটি দীর্ঘশ্বাস নিলো, তারপর পরিস্থিতি সামাল দিতে অস্বস্তি ও দ্রুততার সাথে মিথ্যা কথা বলল।
“আসলে আমার জল তেষ্টা পেয়েছিল, তাই নিচে যাচ্ছিলাম। এমন সময় আপনার রুম থেকে শব্দ পেলাম। এসে দেখি আপনি বিছানায় ছটফট করছেন। পরে দেখলাম আপনার জ্বর এসেছে, তাই মাথায় জলপট্টি দিয়েছি।”
রৌদ্র দুর্বলতা নিয়েই তুরার দিকে তাকালো তিক্ত, হতাশা মেশানো কণ্ঠে বলল।
“তাই? আমার কষ্ট হলে তোর কী? থাকতে দে না এমন! আমি ম*…….(সম্পুর্ণ কথাটা ছিলো আমি মরে গেলেই তো তোর ভালো হবে কিন্তু রৌদ্র কথাটা শেষ করতে পারলো না কেনো পারলো না চলেন তার কারনটা জেনে নেই)
মুহর্তে তুরা রৌদ্রের কথা শেষ হতে দিলো না। সে মুহূর্তেই ক্ষিপ্র গতিতে রৌদ্রের দিকে এগিয়ে এলো আর সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ চেপে ধরলো। তুরার বুক তখন তড়তড় করে কাঁপছে। বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে সে রৌদ্রের চোখের দিকে তাকালো। রৌদ্রও তুরার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।তুরা দম বন্ধ করা চাপা ক্রোধ ও উদ্বেগের মিশ্রণ স্বরে বলল।
“এসব উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না?”
কথাটা বলেই তুরা থমকে গেল। সে এমন করল কেন? রৌদ্রের মুখে মরার কথা শুনে তার এত খারাপ লাগলো কেন? এই দ্বিধায় তুরা সাথে সাথে রৌদ্রের মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলো। রৌদ্র তখনো তুরার দিকে তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে। তুরা একবার রৌদ্রের দিকে তাকালো, পরক্ষণেই অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নিলো। পরিস্থিতি হালকা করার জন্য সে দ্রুত অসহজ ও দ্রুত স্বরে বলল, যেন নিজের অনুভূতি ঢাকতে চাইছে।
“ওই… ওই আরকি… এসব উল্টাপাল্টা কথা বলা ভালো না। আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, তাই আমি বলতে নিষেধ করলাম।”
রৌদ্র দুর্বলতা সত্ত্বেও তুরার চোখ থেকে দৃষ্টি সরালো না। সে তীক্ষ্ণ, জিজ্ঞাসু ভারি ও দুর্বল কণ্ঠে বলল।
“আল্লাহ বিরক্ত হবে, নাকি তুই কষ্ট পেয়েছিস? কোনটা?”
তুরা যেন ধরা পড়ে গেলো। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সামান্য কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,যেন অস্বীকার করতে চাইছে।
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৩
“আজব! আমি কেন কষ্ট পাবো? আমার একটুও কষ্ট হয়নি। আচ্ছা, এসব বাদ দিন। আমি আপনার জন্য খাবার নিয়ে এসেছি, খেয়ে নিন। আর ব্যথার ট্যাবলেট নিয়ে এসেছি, সেটাও খেয়ে নিন। আমি যাচ্ছি।”
কথাটা বলেই তুরা উঠে যেতে উদ্যত হলো। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়িয়ে গেলো। তার সারা শরীরে যেন এক শীতল শিহরণ বয়ে গেল। বুকটা তার আগের চেয়েও জোরে তড়তড় করে কাঁপতে লাগল। কারণ……..
