চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৯+২০
আয়াত বিনতে নূর
দেখতে দেখতে রাতের কালো অন্ধকারটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠল। জানলার পর্দা ভেদ করে নরম কমলা রঙের আলো ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তেই যেন চারদিকে এক শান্ত, প্রশান্ত আবহ ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই পাশের মসজিদ থেকে আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এল—
“আল্লাহু আকবার…”
আজানের শব্দ শুনতেই নিশির চোখ পিটপিট করে খুলে গেল। দু’চোখে ঘুমের ভার থাকলেও অন্তরের ভেতরটা যেন কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ধীরে সুস্থে উঠে বসল বিছানায়, চোখের কোণে এক চিলতে হাসি। আজকে…
হ্যাঁ, আজ সেই বিশেষ দিন। কলেজের Anniversary Annual Function। একদিকে তার মনটা প্রচণ্ড ভালো, উত্তেজনায় ভরে আছে…
অন্যদিকে বুকের ভেতর কেমন হালকা ভয়—
কারণ বহু বছর পর আবার নাচতে যাচ্ছে সে।
এতদিন পর স্টেজে ওঠা—সেটাই বড় কথা, তারচেয়ে বড় কথা—
যদি ফারিস জেনে যায়?
যদি সে জানতে পারে যে নিশি এখনো নাচে তাহলে? নিশির কপালে আবার কি রাগ, কি ভুল বোঝাবুঝির ঝড় নেমে আসবে কে জানে!
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এইসব ভাবনা মাথায় ঘুরলেও এখন এসব নিয়ে বেশি না ভেবে নিশি ওয়াশরুমে চলে গেল।
মুখে ঠান্ডা পানি ছিটাতেই যেন মনের ভেতরের ভারগুলো একটু হালকা হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে অজু করে বের হয়ে এসে মাথায় ঠিক মতো উড়না ঠিক করল।
তারপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে বসে গেল।
নামাজ শেষ করে সালাম ফেরানোর পর মনে হল—
এই শান্তি… এই প্রশান্তি…
কেবল এই মুহূর্তই তার জীবনের সবচেয়ে শান্ত জায়গা। জায়নামাজ ভাজ করে টেবিলের উপর রেখে সে পড়তে বসল।
যত ব্যস্ততাই থাকুক, যত কাজই থাকুক—
নিশি পড়তে বসতে কখনো ভুলে না।
আজও তার ব্যতিক্রম হল না।
কিন্তু যতই বই খোলে, মনটা ঠিক বইয়ের পাতায় আটকে থাকতে চাইল না।
চোখ যাচ্ছে লাইনের দিকে, মন ছুটে যাচ্ছে অন্যদিকে।
ভাবনা এসে ভর করল—
আজকের অনুষ্ঠানটা নিয়ে সে সত্যিই এক্সাইটেড।
কিন্তু মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ভয়ও আছে।
ফারিস… লোকটা এমন কেন?
কারও প্রতি যেন কোনো মায়াই নেই।
শুধু কাজ, কাজ আর কাজ।
শরীরজুড়ে গম্ভীরতা, রাগ, নীরবতা—
যেন মানুষটা অনুভূতি বোঝেই না।
তারপরও কি ভাবে যেন নিশিতা তাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
হয়তো ছোটবেলা থেকেই ফারিসকে দেখে দেখে,
তার কঠোর চেহারার আড়ালে লুকানো নরম মানুষটাকে খুঁজতে খুঁজতেই…
কবে যে ভালোলাগা ভালোবাসায় গড়িয়েছে—তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি।
কিন্তু ফারিস তো কখনোই তার সাথে ঠিকমতো কথা বলে না।
হাসে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে কি আদৌ বোঝে নিশি তাকে কতটা চায়?
তারপর আবার তিন বছরের জন্য বিদেশে চলে গেল।
ফিরে এসে আগের মতোই গম্ভীর, দূরত্ব বজায় রেখে চলা মানুষ।
বাড়ির সবার সাথেই তার কথা-বার্তা সীমিত।
এ যেন এক রহস্যময় মানুষ, যাকে নিশি খুব বুঝতে পারে না— তবুও মনটা তার দিকেই ছুটে যায়।
এভাবেই ভাবতে ভাবতে কখন সময় চলে গেছে টেরই পেল না।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে—
৭:৩০ বাজে।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
অহনার কল।
নিশি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে অহনার চিরচঞ্চল কণ্ঠ—
“কি রে নিশু, কি করিস?”
নিশির ঠোঁটে এক মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
“এই তো… বসে আছি। তুই কি করিস?”
“আমি তো রেডি হয়ে যাচ্ছি। আর তুই? রেডি হবি কবে?”
“এই তো, এখনই হবো। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়। আমি আর রিয়া একটু পরই বের হবো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, আসতেছি। তোরা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা।”
অহনা বলে ফোন রেখে দিল।
ফোন নামিয়ে নিশি একবার ঘরটার দিকে তাকাল।
মনে হল— আজকের দিনটা যেন তার জীবনে নতুন কিছু লিখতে যাচ্ছে।
পড়ার টেবিল থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল নিশি।
মাথায় যেন হাজারটা ভাবনা, তবুও মুখে শান্ত ভাব।
হাতে নরম তুলোর টাওয়ালটা তুলে নিয়ে সে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটল।
দরজা বন্ধ করতেই ভেতরের উষ্ণ বাষ্প আর হালকা সুবাসিত বডিওয়াশের গন্ধ একসাথে মিলেমিশে এক প্রশান্ত পরিবেশ তৈরি করল।
নিশি শাওয়ার অন করতেই পানি ঝরে পড়ার শব্দ পুরো ঘরটা ভরিয়ে দিল।
একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে সে চোখ বন্ধ করল—
মনে হল, আজকের দিনের সব উত্তেজনা, ভয়, দুশ্চিন্তা যেন এই পানির স্রোতেই ধুয়ে মুছে যাচ্ছে।
বেশ অনেকক্ষণ শাওয়ার নিয়ে যখন সে বের হল, তখন তার গাল দুটো টকটকে গোলাপি হয়ে আছে।
চুল ভিজে গিয়ে কোমর ছাড়িয়ে পিঠে লেগে আছে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আলমারির ড্রয়ার খুলল।
সেখান থেকে বের করল হালকা গোলাপি রঙের সুন্দর একটি গোল কাট জামা।
জামাটার নরম ফ্যাব্রিক আর সাদামাটা এলিগেন্স তার চেহারাটাকে আরো উজ্জ্বল করে তুলল।
এরপর ড্রয়ার থেকে হেয়ার ড্রায়ার বের করল।
চুলগুলো কোমর থেকে নিচে ঝুলে আছে—
সেগুলো আলতো করে আঙুলে আলাদা করে নিয়ে শুকাতে লাগল।
ড্রায়ারের উষ্ণ বাতাসে চুলগুলো ধীরে ধীরে ফুলে উঠতে লাগল।
বেশ সময় নিয়ে ঠিকভাবে শুকিয়ে সে চুলগুলো খোপা বেঁধে নিলো। তারপর জামার সাথে ম্যাচিং করে হালকা গোলাপি রঙের সুন্দর হিজাব জড়িয়ে নিল।
তার মুখের স্নিগ্ধতায় সেই রঙটা যেন আরও নরম, আরও শান্ত সৌন্দর্য এনে দিল।
ঠোঁটে দিল হালকা গোলাপি লিপগ্লস—
ঠিক যেন সকালের প্রথম আলো।
নিজের শু-র্যাক থেকে পছন্দের জুতোর জোড়াটি বের করে পরল। এরপর কলেজ ব্যাগ খুলে বই-খাতা বের করে রেখে দিল।
যা যা দরকার—আনারকলি, ড্যান্স জুয়েলারি, সেফটি পিন, স্কিন টেপ,
সব একে একে ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল।
সব ঠিক করে নিয়ে সে রিয়ার রুমে গেল।
দরজা খুলতেই নিশি থমকে গেল—
রিয়া পুরোপুরি রেডি!
চুল বাঁধা, ড্রেস পরে সেজেগুজে বসে আছে।
নিশি অবাক হয়ে বলল,
— “কি রে রিয়া! তুই তো দেখি আমার আগেই রেডি হয়ে গেছিস! আমি ভেবেছিলাম পড়ে পড়ে এখনো ঘুমাচ্ছিস!”
রিয়া ঠোঁট উঁচু করে হাসল,
— “ঘুমাইব? আজ! আজকে?”
নিশি হাসতে হাসতে বলল,
— “আচ্ছা চল, নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
রিয়া মাথা নেড়ে সাথে বেরিয়ে এল।
দুই বোন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখল,
ডাইনিং টেবিলে আফিয়া চৌধুরী নাস্তা সাজাচ্ছেন।
টেবিলজুড়ে গরম পরোটা, ডিম ভাজি, সবুজ সালাদ, চায়ের কাপ—সব সুন্দরভাবে সাজানো।
রিয়া আর নিশি চুপচাপ গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল।
নিজেদের প্লেটে খাবার তুলে খেতে শুরু করল।
খেতে খেতেই আফিয়া চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
— “তোরা কোথায় যাবি নাকি? কলেজের ড্রেস না পড়ে নরমাল কাপড় পরেছিস যে!”
ঠিক তখনই
ফারিস এসে নিশির সামনের চেয়ারটা টেনে বসল।
তার গম্ভীর মুখ, চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি—
নিশির বুক ধক করে উঠল। একবার তাকিয়েই দ্রুত মাথা নামিয়ে নিল। ফারিসের চোখে স্পষ্ট সন্দেহের ছায়া।
তারপর সে রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আম্মু যা জিগ্যেস করছে, তার উত্তর দে।”
রিয়া গলা শুকিয়ে একটু কেঁপে উঠল। তারপর শুকনো হাসি দিয়ে বলল,
— “আসলে আম্মু… আজকে অহনার জন্মদিন।
তো তাই আমরা নরমাল ড্রেস পরেছি।”
আফিয়া চৌধুরী আর কিছু বললেন না।
ফারিসও নীরব মুখে খাবার তুলে খেতে শুরু করল।
রিয়া নিশির কানে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
— “জোর বাচান বেঁচে গেলাম ভাই।”
নিশি ছোট্ট করে “হু” বলল।
তার হৃদস্পন্দন তখনো দ্রুত।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নিশি আফিয়া বেগমকে জিজ্ঞেস করল,
— “বড় আম্মু, বাকিরা কোথায়?”
আফিয়া মিষ্টি হেসে বললেন,
— “তোর বড় আব্বু আর তোর আব্বু রেডি হইতেছে।
আর আমেনা রান্নাঘরে।”
নিশি মাথা নেড়ে আবার খাওয়ায় মন দিল।
তখন রিয়া বলল,
— “আম্মু, আজকে ফিরতে একটু দেরি হবে।
তাই চিন্তা কইরেন না।”
নিশি তাড়াহুড়ো করে উঠে বলল,
— “চল রিয়া! দেরি হয়ে যাবে।”
ফারিস সেই মুহূর্তে নিশির দিকে তাকিয়ে রইল—
তীক্ষ্ণ, গভীর, সন্দেহভরা চোখে।
নিশি এক সেকেন্ডও আর তাকাল না—
প্রায় দৌড় দিয়ে বাইরে চলে গেল।
আফিয়া চৌধুরী বললেন,
— “৯টা বাজে! এখন কলেজ গিয়ে কি করবি?”
নিশি তাড়াহুড়োর স্বরে বলল,
— “ক্লাস আছে বড় আম্মু। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
দু’জনে দৌড়াতে দৌড়াতে গাড়িতে উঠে পড়ল।
এদিকে চৌধুরী ভিলার ডাইনিং টেবিলে একে একে সবাই জড়ো হতে লাগল।
হালকা কথাবার্তা, কফির গন্ধ, চামচের শব্দ—
সব মিলেমিশে সকালের ব্যস্ততায় বাড়ি চলছিল।
ফারিসকে দেখা গেল মোবাইলে কিছু স্ক্রল করছে।
খাবারও খাচ্ছে। কিন্তু মাঝে মাঝে তার ভ্রু কুঁচকে উঠছে—
স্পষ্ট বোঝা যায়,
নিশির ব্যাপারে তার মনে কিছু একটা সন্দেহ জেগেছে।
ডাইনিং টেবিলের চারপাশে সকালের আলোটা নরমভাবে ছড়িয়ে আছে।
কোথাও কফির গন্ধ, কোথাও টোস্ট পোড়ার হালকা সুবাস—সব মিলেমিশে এক শান্ত গৃহস্থ সকালের ছাপ।
এই সময় হঠাৎই আরাফাত চৌধুরী মুখ তুললেন।
গম্ভীর, কিন্তু হতাশ মিশে থাকা কণ্ঠে বললেন—
— “দেখো ফারিস, তোমার বয়স তো আর কম হচ্ছে না। কিছুদিন পরেই ২৯।
এবার বিয়েটা করে নেওয়া উচিত তোমার।”
টেবিলের সবাই খানিক থেমে গেল।
আরাফাত আবার বললেন—
— “আরিশার সাথে বিয়েটাও তুমি ভেঙে দিলে।
মেয়েটা কী অবস্থায় লন্ডনে চলে গেলো—তা কি তুমি ভেবেছো? আরিশার বাবার সাথে আমাদের সম্পর্কটাও নষ্ট হয়ে গেলো।
তুমি চাইলে আমি ওনার সাথে কথা বলতে পারি—”
কথা এখানেই থেমে গেল।
কারণ ফারিসের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।
এমনভাবে অ্যাক্সপ্রেশন জমে উঠেছে—
যেন ভেতরে ভেতরে ভয়ংকর রাগ টগবগ করছে।
তার বাহুর পেশিগুলো টান টান হয়ে উঠেছে,
চোখে সেই পরিচিত তীক্ষ্ণ লালচে ঝিলিক।
এমন রাগ সে খুব কমই দেখায়, কিন্তু দেখালে—
পরিস্থিতি থমকে যায়। টেবিলে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে।ফারিস কয়েক সেকেন্ড নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল।
তারপর ধীরে,
কিন্তু বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল—
— “আমার জন্য কোনটা ভালো… সেটা আমি জানি, আব্বু। আর আমার ব্যাপারে তোমার এত ভাবার দরকার নেই। আর যদি বিয়ে নিয়ে এত লাফালাফি করো… তাহলে আমি আবার আমেরিকা চলে যেতে বাধ্য হবো।”
সে একটু ঝুঁকে, আরও নিচু গলায় বলল—
— “I repeat… I hope you understand.”
এ কথা বলে সে রাগে ঠোঁট চেপে ধরে চেয়ারটা ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
একবারও পিছনে না তাকিয়ে সোজা চলে গেল।
টেবিলে হঠাৎ যেন পাথর নেমে গেলোর মতো নীরবতা। সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে ফারিসের চলে যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে রইল।
আফিয়া চৌধুরী বিরক্ত হয়ে চেয়ার থেকে উঠলেন।
— “দিলে তো সকাল সকাল ছেলের মেজাজটা খারাপ করে! সারাদিন বাইরে থাকে…
সকালে একটু খেয়ে বের হতে দিলেই তো আর হলো না! নিজের মনটাকে একটু বুঝ দিতেও পারো না!”
এগুলো বলে তিনি অপার বিরক্তিতে নিজের রুমে চলে গেলেন।
রাজীবও নিঃশব্দে ফারিসের পিছু নিল।
আরাফাত চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে গভীর শ্বাস ছাড়লেন—
— “এই ছেলেটাকে নিয়ে আমি আর পারি না।
রাজীবকে তো তাও সামলানো যায়…
কিন্তু ফারিস—
দিন দিন একেবারে অবাধ্যের শেষ সীমায় চলে যাচ্ছে।”
অফিসে এসে কাজ করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল।
টেবিলের উপর হাত রেখে মাথা একটু নিচু করল।
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক শয়তানি, সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠল।
নিজের সাথে নিজেই বলল—
— “আমার জান-পাখিটা তো এখনও ছোট…
কিন্তু বড় করবো—
নাহলে এই বিয়ের পেসার আর সহ্য হচ্ছে না।”
তারপর হালকা ঠোঁট কামড়ে আরও নরম গলায় বলল—
— “আর একটু বড় হ…
তোকেই বিয়ে করবো আমি।
আমার পিচ্চি বউটা।”
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক মায়া… আর চাপা মালিকানা।
দেখতে দেখতে তিনটা বেজে গেছে।
নিশি আর রিয়া ক্যাম্পাসে পৌঁছাল। আজ কলেজ যেন রঙে রঙে ভরে উঠেছে— ফাংশনের স্টেজ বানানো হয়েছে, চারদিকে সাজসজ্জা, ব্যস্ততা, হাসির শব্দ। রিয়া আর অহনা নিশিকে নিয়ে গ্রিন রুমে ঢুকল।
— “নিশি, তুই আগে আনারকলিটা পর।”
— “হ্যাঁ, এখনই সাজাতে হবে।”
নিশি আনারকলি পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই
রিয়া দু’হাত কোমড়ে রাখল।
— “এই আনারকলির সাথে হিজাব? তুই পাগল নাকি?”
অহনাও চোখ বড় করে বলল—
— “কোথায় দেখেছিস আনারকলির সাথে হিজাব?”
নিশি লাজুকভাবে বলল—
— “আমি… আমি তো হিজাব ছাড়া থাকতে পারি না…”
— “আরে আজকে ফাংশন!”
— “আজকে সাজবি ঠিকঠাক!”
একে অপরকে ইশারা করে দু’জনই তার চুল খুলে দিল। নিশির কোমর ছাড়ানো সিল্কি কালো চুলগুলো মেঝের আলোয় ঝিলমিল করতে লাগল।
রিয়া সুন্দর করে চুল আঁচড়ে দিল। অহনা চোখে গাড় করে কাজল টেনে দিল—
চোখ দুটো যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।
নিশি শুরু থেকে না না করছে—
এত সাজুগুজু সে পছন্দ করে না।
কিন্তু রিয়া আর অহনা কে শোনে কার কথা!
ঠোঁটে মেরুন লিপস্টিক লাগানো হলো।
কপালের মাঝখানে ছোট্ট কালো টিপ।
ব্যস— নিশি যেন রূপকথার রাজকন্যা।
নিজেকে আয়নায় দেখে নিশি অবাক হয়ে বলল—
— “না… মন্দ লাগছে না।”
অহনা হাসল,
— “মন্দ না? তুই আজকে পুরো শো স্টপার।”
রিয়া লাফ দিয়ে বলল—
— “আজকে হলে ঢুকলেই লোকজন থমকে যাবে।”
আর নিশিতার গাল লাল হয়ে গেল লজ্জায়।
তারপর তাদের তিনজনে ডাকা হলো………
এদিকে অডিটোরিয়াম রুম পুরোটা যেন উৎসবের রঙে রঙিন। দিব্যি বড় বড় ফুলের তোড়া, রঙিন ফিতা আর সিলভার-গোল্ডেন লাইটে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে পুরো রুমে ঢুকলেই মনে হয়—আজ যেন কোনো রাজকীয় আয়োজন।
স্টেজের সামনে অল্প অন্ধকার, আর ওপরে স্পটলাইটের নরম আলো, যেন কারো অপেক্ষায় বসে আছে। একটার পর একটা পারফরম্যান্স চলছে। কেউ গান করছে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করছে, কেউ আবার দল বেঁধে নাচছে।
প্রতিটি পারফরম্যান্স শেষে করতালির শব্দে পুরো হল কেঁপে উঠছে।
দুপুর কেটে বিকেলের দিকে যখন পরপর ৫ জন পারফরমার শেষ করলো, তখন ঘোষকের কণ্ঠে ভেসে এল—
“Next performance by Nishi, Riya and Ahona.”
তিনজনই এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো।
মনে যেন অদ্ভুত ঝড়—ভয়, উত্তেজনা, আনন্দ…সব মিলেমিশে একাকার।
নিশি হাতের তালু দুটো ঘামে ভিজে গেছে।
রিয়ার ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে।
অহনার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ যেন বাইরে পর্যন্ত শোনা যায়। ঠিক তখনই ঘটলো ছোট্ট একটা দুর্ঘটনা।
রিয়া পাশের টেবিলটার সাথে হঠাৎ ধাক্কা খেলো।
টেবিলের কোণায় ধাক্কা খেয়ে রিয়ার পায়ে হালকা ব্যথা লাগলো।
— “এই রিয়া! তুই ঠিক আছিস?” নিশি তড়িঘড়ি করে রিয়ার পা চেক করলো।
— “তুই নাচতে পারবি তো? ব্যথা পাইলি, এখন নাচতে গেলে যদি বাড়ে?”
রিয়া ব্যথা সহ্য করেও হাসার চেষ্টা করলো।
— “আমি ঠিক আছি রে। চিন্তা করিস না, পারবো। আজকে আমাদের নাচ মিস করা যাবে না কিছুতেই।”
অহনা মাথা নেড়ে বলল,
— “যা ব্যথা সহ্য করতে পারিস, তোর মতো সাহসী কেউ নাই।”
ঠিক তখনই স্টেজের দিক থেকে আবার ডাক—
“Nishita, Riya & Ahona, please come on stage.”
তিনজন একে অপরের হাত চেপে ধরলো।
তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলো স্টেজের দিকে।
স্টেজে উঠতেই আলো তাদের মুখে পড়লো।
দর্শকের বিশাল ভিড় দেখে নিশির বুকটা কেঁপে উঠলো।
কিন্তু গান শুরু হতেই সব ভয় যেন মিলিয়ে গেলো।
🎵 গান বাজলো—
রিদমের সাথে সাথে তিনজনই নাচ শুরু করলো।
নিশির মুভমেন্ট ছিলো আগেই সুন্দর।
কিন্তু রিয়া আর অহনা আজ এমন চেষ্টা করছে যে
দর্শক বুঝতেই পারছে না—ওরা নতুন।
তাদের তিনজনের মুভমেন্ট এক সাথে মিলে একটা অসাধারণ সমন্বয় তৈরি করলো।
পুরো হল যেন নিশিদের নাচে থমকে গেছে।
কেউ কথা বলছে না, কেউ নড়ছে না—
শুধু দেখছে… চোখ বড় করে।
নৃত্য শেষ হতেই হল কেঁপে উঠলো করতালিতে।
তিনজন নিচে নেমে আসতেই বন্ধু-বান্ধবদের অভিনন্দনের ঝড়।
ফারিস আর রাজীব ঢাকা শহর থেকে একটু বাইরে গিয়েছিলো একটা বড় ব্যবসার ডিল ফাইনাল করতে।
সব কাজ দ্রুত শেষ করে তারা যখন গাড়িতে উঠে বাসার দিকে রওনা হলো, তখনই ফারিসের ফোনে কল এলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো—
“Afia Chowdhury calling…”
ফারিস ফোন ধরলো।
— “হ্যাঁ আম্মু বলো।”
আফিয়া চৌধুরীর উদ্বিগ্ন কণ্ঠ,
— “তোরা কোথায় বাবা? তোমাকে বলতেই চাচ্ছিলাম—নিশিতা আর রিয়াকে বাসায় নিতে যাস। ফোন করলাম, কেউ ধরছে না। মেয়েগুলোকে না বললে কিছুই মনে থাকে না!”
ফারিস হাসলো।
— “আচ্ছা ঠিক আছে আম্মু, নিয়ে আসবো।”
কল কেটে ফারিস রাজীবকে বললো—
— “এখান থেকে নিশিদের কলেজ যেতে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট লাগবে। জোরে চালা।”
রাজীব বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
— “ঠিক আছে ভাইয়া!”
একটু গতি বাড়িয়ে দিলো।
অডিটোরিয়ামের ভিতর তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
দর্শকদের মাঝেমধ্যেই টুকটাক ফিসফাস শোনা যায়, কিন্তু সেই আওয়াজও মিলিয়ে যায় যখনই ঘোষকের কণ্ঠ ভেসে আসে—
“Next, solo performance by Nishi Chowdhury.”
সময়ের কাঁটা তখন ৪টা ৩০ মিনিট ছুঁই ছুঁই।
নিশির বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি শুরু হলো।
তার হাত দুটো ঠাণ্ডা হয়ে এলো, মাথার ভেতর চিন্তারা গুলিয়ে যাচ্ছিলো।
তবু সে কারো সামনে ভয় দেখাতে চায়নি।
রিয়া তার হাতটা চেপে ধরলো।
— “তুই পারবি নিশু।”
অহনা ছোট্ট করে হাসলো,
— “তোকে দেখবে পুরো হল। এখন নেমে যাস না, আজ তোকে জিততেই হবে।”
নিশি জানত— আজকের নাচটা তার কাছে শুধু পারফরম্যান্স নয়…
এটা যেন তার মন, তার ইচ্ছে, তার স্বপ্নের একটা প্রকাশ। গভীর একটা শ্বাস নিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো।
অডিটোরিয়ামের ফ্লোরের ওপর তার অনারকলির ঘের ছুঁয়ে ছুঁয়ে সরে গেলো।
চুলগুলো তার পিঠে নরম স্রোতের মতো পড়ে আছে।
স্টেজে ওঠার সময় তার হৃদস্পন্দন যেন আরও বেড়ে গেলো—
ধুক… ধুক… ধুক…
স্পটলাইট তার চোখে পড়তেই সামান্য চোখ কুঁচকালো। মুহূর্তের জন্য দর্শক, চেয়ার, আলো—সবকিছু যেন অস্পষ্ট লাগতে লাগলো।
সে শুধু নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনলো।
পরের মুহূর্তেই সাউন্ড সিস্টেমে মিউজিক বেজে উঠলো—
🎵 “Ore Priya…”
সুর উঠতেই নিশি চোখ বন্ধ করলো।
এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা— তারপর… নাচ শুরু।
তার প্রথম স্টেপেই বোঝা গেলো—
এই মেয়েটি নাচে শুধু দক্ষ না…
সে যেন নাচের মধ্য দিয়েই কথা বলে।
তার হাতের প্রতিটি ভঙ্গি, আঙুলের প্রতিটি বাঁক, চোখের কোমল নড়া—
সব কিছু যেন আলাদা একটা গল্প বলছিলো।
দর্শক সিটে বসা সবাই চুপ করে গেছে।
কারো মোবাইলের স্ক্রিনও নড়ছে না।
সবাই নিশির দিকে তাকিয়ে আছে।
এই দিকে পর্দার আড়ালে থাকা নাভিদ যার দৃর্ষ্টিতে আছে মুগ্ধতে যদি অন্য কেউ দেখে তাহলে কি হবে?? সেই ব্যাপারে কারও কি কোন ধারণা আছে????
এরিমাঝে ফারিস আর রাজীবের গাড়ি তখন কলেজের সামনে এসে থামলো। গেটের উপরে ঝোলানো ব্যানারে লেখা
“ANOWAL FUNCTION 2025”
ফারিস কপাল কুঁচকে লেখার দিকে তাকালো।
মনে মনে প্রশ্ন— নিশি এখানে? আজ তার ফাংশন? সে আমাকে বললো না কেন?
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান অনুভূত হলো।রাগে মাথার মস্তিস্কটা যেন ছিরে যাচ্ছে—
যেন কারো চেনা নাম, চেনা মুখের আভাস পাচ্ছে সে ভিতরে। রাজীব লক্ষ্য করলো ফারিসের চেহারা বদলে গেছে।
তার চোখে সেই নির্লিপ্ত ব্যবসায়ী পুরুষের ছাপ আর নেই— বরং যেন কিছু খুঁজে পাওয়ার তাড়না।
রাজীব ধীরে বললো,
— “ভাইয়া, কিছু হয়েছে?”
ফারিস কোনো কথা বলল না।
দ্রুত পায়ে গেট পার হয়ে কলেজ ভবনের দিকে এগিয়ে গেল। রাজীব ভয় মিশ্রিত বিস্ময়ে তার পেছনে পেছনে দৌড় দিলো।
বিকেল হওয়ায় করিডোর প্রায় খালি।
কোথাও স্যারের কক্ষের দরজা বন্ধ, কোথাও দুই-একজন স্টুডেন্ট চুপচাপ গিয়ে বসছে।
দেয়ালের ওপর পোস্টার, রঙিন লাইট, ব্যানার—সবকিছুতেই উৎসবের ছোঁয়া। ফারিস হাঁটছে দ্রুত, দম ফেলারও সুযোগ নেই যেন।
তার বুকের মধ্যে চাপা একটা ব্যথা— কেন জানি সে বোঝে না… কিন্তু কোনো অদ্ভুত শক্তি তাকে অডিটোরিয়ামের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
সোজা দরজা ঠেলে সে ঢুকে পড়লো অডিটোরিয়ামের সামনে।
দরজা খুলতেই ভেসে এলো—
গানের সুর। দর্শকদের বিস্ময়ের শব্দ।
আর স্টেজের আলো ঝলমলে করে উঠলো।
ফারিস দরজায় দাঁড়িয়েই থমকে গেলো।
— ফারিসের চোখে যা দেখা গেলো
স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে—
একজন লাল অনারকলি পরিহিতা যুবতী।
তার চুল সিল্কি ঢেউয়ের মতো পিঠে নেমে গেছে।
খোলা চুল নাচতে নাচতে দোল খাচ্ছে, আলোয় ঝিলমিল করছে।
তার চোখে গাঢ় কাজল… কপালে কালো টিপ…
ঠোঁটে মেরুন লিপস্টিক…
তার মুভমেন্ট এত কোমল যে মনে হচ্ছিলো—সে যেন বাতাসকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
ফারিস শ্বাস নিতে ভুলে গেলো।
মনে হলো, পৃথিবী হঠাৎ চুপ করে গেছে।
শুধু সে আর নিশি—
এই পুরো বিশাল অডিটোরিয়ামে যেন দুজনই আছে।
তার মনে হল—
এই মেয়েটাকে কেউ এত সুন্দর করে নাচতে পারে?
এমনভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে?
এটা কি সত্যিই নিশি?
মুহূর্তটা ফারিসের জন্য সময় থমকে যাওয়ার মতো।
তার চোখের পলক পড়ছে না।
তার বুকের ভেতর একটা রহস্যময় টান—
একটা অদ্ভুত অনুভূতি—
যেন কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে তার ভেতর।
রাজীব পাশে দাঁড়িয়ে ফারিসের মুখ দেখলো।
ফারিসের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে, ঠোঁট ফাঁকা…
সে যেন বাকরুদ্ধ।
রাজীব প্রথমবার বুঝলো—
ফারিস কাউকে এভাবে দেখছে।
নিশির প্রতিটি ঘুর্ণন ফারিসের হৃদয়ে গিয়ে লাগছিলো। তার প্রতিটি স্টেপে ফারিসের চোখের দৃষ্টি আরও গভীর, আরও মুগ্ধ হয়ে উঠছিলো।
অডিটোরিয়ামের আলো ঝলমল করছে, দর্শকদের নিঃশ্বাসও যেন আটকে আছে।
সবার মাঝখান থেকে ফারিসকে আলাদা করছিলো শুধু একটাই জিনিস—
তার চোখের দৃষ্টি। সে তাকিয়ে আছে…
শুধু নিশির দিকে। যেন দুনিয়ার সব আলো, সব সুর, সব গন্ধ সবকিছু মিলেমিশে এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে—
নিশি।তার নাচ…
তার হাসি…তার ঘুর্ণনে উড়ে যাওয়া চুল…
সবই যেন ফারিসকে কোথাও ডুবিয়ে দিচ্ছিলো।
ফারিসের শ্বাস ভারী হয়ে এলো।
দৃষ্টি নড়ল না একবারও।
এতদিনের কঠোর, নিস্পৃহ, শান্ত-স্বভাবের ফারিস—
আজ যেন কোনো অচেনা অনুভূতিতে বন্দী হয়ে গেলো।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৭+১৮
ফারিস মনে মনে বললো…
এই মেয়েটা…
কি অসাধারণ! কী সুন্দর একটা প্রাণ…
আর আমি… আমি কখনো বুঝতেই পারিনি…
সে এতটা আলাদা, এতটা আলোয় ভরা……..
