চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২২
আয়াত বিনতে নূর
ফারিসের ধীরে ধীরে জমে থাকা রাগ মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়লো। সে নাভিদের দিকে ধেয়ে গেলো, কোনো কথা শোনার সুযোগ না দিয়ে,
একে একে হাত বাড়িয়ে নাভিদের কলার ধরে শক্ত করে চেপে ধরলো। ফারিসের চোখে আগুন, কণ্ঠে কাঁপুনি—
“জানোয়ার! তোর সাহস কি করে হয় নিশিকে টাচ করার?”
কথাগুলো বলে ফারিস আর নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না।
একেবারে তীব্র, অচঞ্চল রাগে সে নাভিদের দিকে ঘুষি মারতে শুরু করলো।
প্রতিটি ঘুষি যেন তার ভেতরের ক্ষোভ, অধিকারবোধ, এবং নিশির জন্য আত্মরক্ষার একরাশ শক্তি ফুটিয়ে তুলছিল।
নাভিদ হতভম্ব হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। সে বুঝতে পারছিলো না কী হলো, কোথা থেকে এই শক্তি, এই রাগ এসেছে।
ফারিসের চোখে যে আগুন জ্বলছিল, তা যেন পৃথিবীর কোনো আইনকানুন, সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নিশিতার জন্য শুধুই নাভিদের শাস্তি চাইছে।
ফারিস থেমে একটু গম্ভীর হয়ে বললো—
“এই বাস্টার্ড! শোন, আজকের পর যদি তোকে কখনো ওর সাথে দেখেছি… ওই দিনই তোর শেষ দিন হবে।”
ফারিসের কথাগুলো শুনে রাজীব, রিয়া, নিশিতা আর অহনা—সকলেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশের বাতাসে অদ্ভুত নীরবতা। কেউ কিছু বলতে পারছিল না, কেবল ফারিসের রূপ দেখার ভয়ে সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
অহনার মনেই ধীরে ধীরে একটা ভয়ের ছায়া নেমে এলো। সে নিজেকে বলছিলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—“এখন জানি না আমার নিশিতার সাথে কি হবে…
ফারিস ভাই কি আসলেই এত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে?” তার হৃদয়ের আঙিনায় এক অজানা উত্তেজনা আর উদ্বেগ মিশ্রিত হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
এদিকে ফারিস ধীরে ধীরে নাভিদকে ছাড়লো। নাভিদ চুপচাপ মাটিতে লুটিয়ে থাকলেও, চোখে সজীব শিহরণ।
রাগী দৃষ্টি দিয়ে ফারিস নিশিতার দিকে তাকালো—মুহূর্তে তার চোখে কেবল নিশিতার নিরাপত্তার জন্য অচিন্ত্য রাগ আর আবেগ ফুটে উঠলো।
তারপর চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে ফারিস রাজীবের দিকে চেয়ে বললো—
“তুই রিয়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যা। আর আমি কিছু শুনতে চাই না।”
রিয়া কিছু বলতে পারলো না। সে নিঃশব্দে রাজীবের হাতে হাত রেখে গাড়িতে উঠে বসলো। রাজীবও চুপচাপ। গাড়ির ভিতরে নিঃশব্দতা, শুধুই দূরের গাড়ির হালকা শব্দ আর চারপাশের বাতাসের নীরবতা।
রাজীব একবার অহনার দিকে তাকালো, যেন নিশ্চিত করতে চাচ্ছিল—ও ঠিক আছে, শান্ত আছে। তারপর চাবি ঘোরালো, গাড়ির ইঞ্জিন গর্জন শুরু করলো, এবং তারা ধীরে ধীরে সরে গেলো।
ফারিস সেই সময় একটানা নিশিকে দেখছিল। তার চোখে মিশ্র অনুভূতি—রাগ, উদ্বেগ, যত্ন, এবং নিশ্চিন্তি।
নিশিতার কিছুটা ভয় পেয়েছে, কিন্তু ফারিসের দৃষ্টিতে যেন সে বুঝতে পারছে—যে কেউ যদি তার কাছের মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, ফারিস কখনো চুপ থাকবে না।
“চারপাশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসলেও ফারিসের চোখে রাগের ছাপ থেকে যায়। নিশিতার ছোট্ট কাঁপা হাত, ধীরে ধীরে নিজের ব্যাগ সামলানো”
—এ সব তাকে মনে করালো কেন সে এত রাগ অনুভব করেছে। কারণ নিশি শুধুই তার প্রিয়, এবং সে কখনো চাইবে না কেউ তার ক্ষতি করুক।
নিশিতা আবাক হয়ে এখনও দাড়িয়ে রইলো। তার মাথায় কিছু ডুকছেনা কি থেকে কি হয়ে গেল। নিশিরার ভাবনার মাঝে ফারিস নিশিতার গালে স্বজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলো। নিশি ছলছল নয়নে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ফারিস গম্ভীর কন্ঠ বলল……
—” খুব ইচ্ছে না তোর ছেলেদের সাথে কথা বলার”।
তোকে আমি এর আগেও ওয়ানিং দিয়েছি কিন্তু তুই শুনিসনি। এবার তোর ইচ্ছে আমি শেষ করবো চিরকালের জন্য। তোকে আমি নিষেধ করার পরেও তুই নাচ করেছিস।
তারপর ফারিস নিশিতার হাত ধরে নিয়ে যেতে গেলে।নিশিতা কান্নারত কন্ঠে বলল
—”ছাড়ুন আমার হাত’। আপনি কে আমাকে টার্চ করার। একদম ছুবেন না আমাকে। কি সমস্যা আপনার ? আমি একবার না হাজার বার ছেলেদের সাথে কথা বলবো। আপনার কি তাতে?
এই কথা শুনে ফারিসের রাগ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। রাগের মাথায় সে আবারও নিশির গালে স্বজোরে চড় বসিয়ে দিলো।
চড়টা প্রচণ্ড ছিল, কিন্তু আজ আশ্চর্যজনকভাবে নিশির চোখে-মুখে কোনো ব্যথার ছাপ দেখা গেলো না।
মনে হলো, শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণাটা বহু আগেই তাকে অসাড় করে দিয়েছে।
নিশিতা ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল—
“শুনুন ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী,
আপনি আমার কেউ না। তাই দয়া করে আমার জীবনে ইন্টারফেয়ার করা বন্ধ করুন।”
এই কথাটা ফারিসের অহংকারে সোজা আঘাত করলো। ফারিস হঠাৎ নিশির মুখ চেপে ধরে রাগে গর্জে উঠলো—
“কি বললি তুই?
আমি তোর কেউ না?”
এক সেকেন্ড থেমে, কণ্ঠটা ভারী হয়ে এলো—
“হ্যাঁ, হয়তো তোর কাছে আমি তোর কেউ না।
কিন্তু আমার কাছে তুই আমার পুরো পৃথিবী।”
ফারিসের চোখে তখন আগুন আর অসহায় ভালোবাসা একসাথে জ্বলছে।
সে বলতে লাগলো—
“তোকে দিয়েই আমার দিন শুরু হয়,
আর তোকে দিয়েই আমার দিন শেষ হয়।
আর এটাকে যদি ভালোবাসা বলে, তাহলে তাই।”
একটু থেমে গলা ভারী করে বলল—
“এই আগুনে আমি সাত বছর ধরে পুড়েছি নিশি।
তুই কি জানিস তার মানে কী?”
তারপর রাগ আর কষ্ট মিশিয়ে বলল—
“আমি তোকে কোনো ছেলের সাথে সহ্য করতে পারি না। আর নাভিদের সাথে তো একদমই না।
কতোবার বলবো আমি, হ্যাঁ?”
ফারিসের চোখে তখন দাবি, অধিকার আর একতরফা ভালোবাসার জেদ।
নিশি কোনোভাবে নিজেকে ফারিসের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলো।
তারপর ব্যঙ্গ করে হেসে বলল—
“আপনি ভালোবাসেন? তাও আমাকে?”
একটু থেমে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল—
“ভালোবাসা— মাই ফুট।”
তার চোখে একফোঁটা অনুভূতি নেই, শুধু দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
“আমি আপনাকে ভালোবাসি না, ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী। তাই আপনার এসব কথার কোনো মূল্য নেই আমার কাছে।”
এই কথায় ফারিস এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও,
পরক্ষণেই কঠিন কণ্ঠে বলল—
“আই ডোন্ট কেয়ার তুই আমাকে ভালোবাসিস কি না।”
চোখে অদ্ভুত এক উন্মাদ দৃঢ়তা নিয়ে সে বলল-
“আমি তোকে ভালোবাসি—
যেদিন থেকে এটা বুঝেছি, সেদিন থেকেই ভেবে নিয়েছি তুই আমার, আর আমারই হবি।”
শেষ কথাটা প্রায় ঘোষণা করার মতো—
“আমার কাছে আমার ফিলিংসের ভ্যালু সবার আগে।
তুই বাসলি কি বাসলি না—
ওটা দেখার সময় আমার নেই।”
নিশিতা ফারিসের কাছ থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে চলে যেতে উদ্যত হলো।
কিন্তু কয়েক পা যেতেই ফারিস ঝাঁপিয়ে পড়ে নিশিকে কাঁধে তুলে নিল। নিশি ছটফট করতে লাগলো।
ফারিস নিশির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“আমাকে আর রাগাস না পাখি।
এমনিতেই তোকে অনেক আঘাত দিয়ে ফেলেছি…
আর আঘাত করতে চাই না।”
কথাটা শেষ করেই সে নিশিতা গাড়ির ব্যাক সিটে প্রায় ছুড়ে মারলো।
নিশতা রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসে চিৎকার করে বলল—
“আপনি কি পাগল? আমার কথা শুনতে পান না?”
চোখে আগুন নিয়ে সে বলতে লাগলো—
“আমি আর কতবার বলবো—
আমি আপনাকে ভালোবাসি না,
বাসি না, বাসি না!”
গলা ভেঙে উঠে এলো—
“I just hate you…
Just hate you, ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী!”
নিশির বুক হাপরের মতো উঠানামা করছে।
সে থামলো না।
“আর আমি একবার না, হাজারবার ছেলেদের সাথে কথা বলবো, নাচবো।
আপনার তাতে কি যায় আসে?
হ্যাঁ, কি যায় আসে?”
নিশিতার প্রথম কথাগুলোতে ফারিস তেমন রিয়েক্ট করলো না। কিন্তু শেষ কথাটায় যেন তার মাথার ভেতরের সব কিছু ছিঁড়ে গেল।
হঠাৎ সে নিশির বাহু শক্ত করে চেপে ধরে গর্জে উঠলো—
“এই! নিশি!
এই তুই কি বললি?
হ্যাঁ? কি বললি?”
চোখে উন্মত্ততা নিয়ে সে বলতে লাগলো—
“তুই আমার—
জাস্ট আমার, ওকে?”
দাঁত চেপে সে বলল—
“আর হ্যাঁ, আমার যায় আসে।
অনেক যায় আসে। তোকে অন্য ছেলেদের সাথে দেখতে পারি না। আমার সহ্য হয় না।”
একটু থেমে অহংকারে ভরা কণ্ঠে যোগ করলো—
“এই দ্য গ্রেট ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরীর যায় আসে।”
তারপর হঠাৎ এক ভয়ংকর সিদ্ধান্তের মতো বলল—
“আর এখন আর না। তোকে আমি বিয়ে করবো নিশি। হ্যাঁ, বিয়ে করবো।”
এই কথায় নিশিতা ছলছল চোখে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইলো। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সে নরম হবে… কিন্তু হঠাৎ অতীতের সব অপমান, প্রত্যাখ্যান, কষ্ট একসাথে মনে পড়ে গেল।
রাগ আর দুঃখে সে এক ঝটকায় ফারিসের হাত নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে কান্নায়
ভেঙে পড়লো।
“আমি আপনার ভালোবাসা চাই না।
না… আর চাই না।”
কাঁপা গলায় সে বলল—
“আপনার করা অপমান, আপনার দেওয়া প্রত্যাখ্যান— সব আমি মেনে নিয়েছিলাম।”
চোখ মুছতে মুছতে গর্জে উঠলো—
“কিন্তু আপনার মতো একটা জানোয়ারকে
আমি নিশিতা চৌধুরী বিয়ে করবো না। কিছুতেই না।”
তার কণ্ঠে জমে থাকা যন্ত্রণা বিস্ফোরিত হলো—
“আমি কতবার বেহাইয়াদের মতো আমার ভালোবাসা প্রকাশ করেছি,
আর আপনি কী কী বলেছেন, আমার সাথে কী কী করেছেন— মনে আছে আপনার?”
নিশিতার এই তিক্ত কথাগুলো ফারিসের কানে যেতেই তার মুখের আদল পাল্টাতে লাগলো।
চোখে রাগ এমন ভয়ংকর রূপ নিলো যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললো সে।
হঠাৎ ফারিস নিশিতাকে গাড়ির সাথে চেপে ধরলো।
নিশিতার চোখ থেকে নোনা পানি গড়িয়ে গাল বেয়ে পড়তে লাগলো।
ফারিস রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠাণ্ডা, ভয়ংকর কণ্ঠে বলল—
“You are mine.
Only mine.”
সে এক নিশ্বাসে বলে গেল—
“আগে কি হলো, না হলো— তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার লাইফে তোর জায়গা
অনেক আগেই তৈরি হয়ে গেছে।”
চোখ দুটো সরু করে সে বলল—
“আর তোর কি মনে হয়,
এই ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী বেঁচে থাকতে
তোকে অন্য কারো হতে দিবে?”
ঠোঁটে নিষ্ঠুর হাসি—
“No. Never.”
শেষ কথাটা প্রায় হুমকির মতো—
“একটা কথা মাথায় রাখবি, তুই শুধু আমার।
জাস্ট আমার। আর কারও না।”
এক মুহূর্ত থেমে যোগ করলো—
“আর হ্যাঁ,
আমি জানোয়ার— শুধু তোর জন্য।
আর কারও জন্য না।
Okay?”
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২১
গাড়ির ভেতর তখন শুধু নিশিতার কান্না
আর ফারিসের বিকৃত ভালোবাসার নিঃশ্বাস।
কথা গুলো শুনে নিশিতার সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যায়,অনবরত নিশিতার ঠোঁট কাপতে থাকে।
ফারিস নিশিতার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ফারিস নিজেকে সামলাতে না পেরে নিশিতাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিশিতার কাপতে থাকা
ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়…………….
