চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২৩
আয়াত বিনতে নূর
নিশি যখন বুঝতে পারলো তার সাথে কি হচ্ছে, সে ছটফট করতে শুরু করলো। কিন্তু ফারিসকে এক বিন্দুমাত্র সরাতে পারলো না। ফারিস নিজের কাজে মগ্ন, তার চোখে ভয়ের ছাপও নাই।
কিছুক্ষণ পর, ফারিস নিশিতাকে ছেড়ে
দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
— এবার বুঝলি কতোটা ভালোবাসি তোকে। তোকে নিজের করে পাওয়ার জন্য নিজের স্বপ্নগুলোকে বিসর্জন দিয়েছি জান। আর এখন যদি তুই আমার না হস, তাহলে তুই কারও হবি না।
এইদিকে নিশিতা এই কোন ফারিস ভাইকে দেখছে।নিজেই বুঝতে পারছেনা। লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে আছে। ফারিস নিশিতার দিকে একবার তাকিয়ে বাকা হাসি দিয়ে ফারিস তারপর বসল সামনের সিটে এবং গাড়ি চালানো শুরু করল। হাইস্পিডে গাড়ি এগোতে লাগলো।
নিশিতা ভাবনার থেকে বের হয়ে, নিশিতা কান্না ভেজা চোখে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— দেখুন ফারিস ভাই, আমি কিছু করিনি। আপনি রাগ করবেন এজন্য আপনাকে কিছু বলিনি। আমি নাভিদের সাথে কথাও বলিনি। বিশ্বাস করুন ফারিস ভাই।
নিশিতার এই কথায় ফারিস আরও বিরক্ত হয়ে বলল,
— ইডিয়েট, আমি তোর ভাই না। আর একবার ভাই বলে ডাকলে পরিমাণটা খুব খারাপ হবে। তুই আমাকে চিনিস না।
নিশিতা ভয়ে কাঁপতে লাগল। তারপর বাইরের দিকে তাকিয়ে হাত জড়িয়ে বলল,
— আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? এটা তো বাড়ির রাস্তা না। আপনি প্লিজ আমাকে বাড়ি নিয়ে চলুন।
ফারিস আর কোনো উত্তর দিল না। পুরো রাস্তা নিরবতা ঘিরে রাখলো, শুধু হাইস্পিডে গাড়ির আওয়াজ বাজছে চারপাশে।
ঢাকা শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাচ্ছিল। ফারিসের কালো মার্সিডিজটা যখন শহরের শেষ প্রান্ত পেরিয়ে আরও ভেতরের দিকে ঢুকলো, নিশিতার বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কা জমতে শুরু করলো।
চারপাশে হাইওয়ের আলো ফুরিয়ে গিয়ে জায়গা নিচ্ছে গাছপালা, ফাঁকা জমি আর নীরবতা।
হঠাৎ করেই গাড়িটা থেমে গেল। নিশিতা অবাক হয়ে জানালার বাইরে তাকালো।
তার চোখের সামনে যে দৃশ্যটা ভেসে উঠলো, তা সে কল্পনাও করেনি।
ঢাকা শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে, সবুজে ঘেরা এক বিশাল বাগানবাড়ি। ডুপ্লেক্স বাড়িটা যেন আধুনিকতা আর স্বপ্নের নিখুঁত মিশেল। নরম আলোয় বাড়িটার সৌন্দর্য আরও ফুটে উঠেছে। শহরের ভিড় থেকে এত দূরে এমন একটা জায়গা—সচারাচর দেখা যায় না।
নিশিতা গাড়ি থেকে নামার আগেই ফারিস দরজা খুলে দিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারিস হঠাৎ করে নিশিকে কোলে তুলে নিল।
— “ফারিস ভাই…!”
নিশির গলা কাঁপছিল, কিন্তু ফারিস একটুও থামলো না।
কাঁধে তুলে নেওয়া অবস্থায় নিশির চোখ চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। সে লক্ষ করলো—বাড়িটার সাজসজ্জা অদ্ভুতভাবে তার নিজের পছন্দের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। রঙ, আলো,
খোলা জায়গা—সব কিছু যেন তার মনের মতো করে বানানো।
“কিন্তু… এটা কীভাবে সম্ভব?”
নিশিতার মাথার ভেতর প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
বাড়ির ছাদের উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
“SKY ANGEL”
নিশি থমকে গেল।
এই নামের মানে সে বুঝতে পারলো না, কিন্তু অদ্ভুত একটা অনুভূতি বুকের ভেতর কাঁপন তুললো।
বাড়ির একপাশে বিশাল একটা সুইমিং পুল।
চারপাশে প্রচুর গাছপালা, আর তার মাঝখানে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে গোলাপ ফুল।
লাল, গোলাপি, সাদা—নানান রঙের গোলাপ যেন পুরো জায়গাটা দখল করে আছে।
নিশির মনে হলো, এই বাড়িটা শুধু ইট-পাথরের তৈরি না—এর ভেতরে কোনো এক অজানা গল্প লুকিয়ে আছে। ফারিস গটগট করে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লো।
নিশিতার বুক ধকধক করছে, সে কিছু বলতে পারছে না। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে একমাত্র বড় রুমটাতে নিয়ে গিয়ে ফারিস হঠাৎ করেই নিশিকে বেডের উপর ছুড়ে মারলো।
নিশির শরীরে ব্যথার ঝাঁকুনি খেললো।
সে উঠে বসে, কাঁপা কণ্ঠে বলল—
— “কেন এনেছেন আমাকে এখানে আপনি? আমাকে এখনই বাড়ি পৌঁছে দিন। সব কথা আমি বাড়ি গিয়েই সবাইকে বলবো…”
এই কথা বলে নিশিতা উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে যেতে চাইলে—
ঠাস!
ফারিস স্বজোরে এক চড় বসিয়ে দিল নিশির মুখে।
নিশি আবারও ভারসাম্য হারিয়ে বিছানায় পড়ে গেল। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে।
ফারিস রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল—
— “কি বলবি বাড়ি গিয়ে? কাকে বলবি?”
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে নিজের রাগটা সামলে নিল।
গলা ঠান্ডা করে বলল—
— “দেখ, বেডের উপর যা যা আছে সেগুলো পড়ে রেডি হয়ে নিচে আসবি। ত্রিশ মিনিট সময় দিলাম। দেরি করবি না।”
এই বলে ফারিস বাইরে বেরিয়ে দরজাটা তালা দিয়ে নিচে নেমে গেল।
নিচে গিয়ে সে ফোন বের করে নিহানকে কল দিল— — “কোথায় তোমরা?”
— “এই তো স্যার, চলে এসেছি।”
ফারিস আর কিছু না বলে কল কেটে দিল। ফোন পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে ঠোঁটের কোণে ঠাণ্ডা হাসি ফুটে উঠলো।
— “যেটা কিছুদিন পর হওয়ার কথা ছিল, সেটা আজই হবে। ফাইনালি… তুই ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরীর হবিই।”
এদিকে উপরের ঘরে নিশি দরজা খোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। লক খুলছে না।
শেষমেশ ক্লান্ত হয়ে দরজার সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো সে। চোখ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
ফিসফিস করে বলল—
— “আমার সাথে এমন কেন করছেন, ফারিস ভাই?”
হঠাৎ তার মনে পড়লো—ফারিস তাকে রেডি হতে বলেছে। দেরি হলে আবার মার খেতে হবে—এই ভয়টা তার শরীরটা শিউরে উঠলো।
নিশি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বেডের দিকে তাকালো।
সেখানে রাখা— লাল-খয়েরী রঙের একটা সিল্কের শাড়ি, পাশেই ভারী একটা জুয়েলারি বক্স,
আর সাজগোজের সব জিনিস।
কাঁপা হাতে নিশি শাড়িটা তুলে নিল।
শাড়ি পরতেই সে আরও অবাক হয়ে গেল।
শাড়িটা যেন তার শরীরের মাপে বানানো। প্রতিটা ভাঁজ, প্রতিটা আঁচল নিখুঁতভাবে বসে গেল।
লজ্জা আর অস্বস্তিতে নিশির বুক ধকধক করতে লাগলো। তার সাজতে ইচ্ছে করছে না, তবুও ভয় তাকে বাধ্য করলো।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে ঠোঁটে গাঢ় খয়েরী রঙের লিপস্টিক দিল। এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে খোঁপা বাঁধলো। তারপর জুয়েলারি বক্স খুললো। ভেতরে তাকিয়েই নিশি বুঝে গেল—
কম করে হলেও দশ-বারো ভরি সোনার গহনা।
নিশির চোখ ভরে উঠলো, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ এলো না।
এই বাড়ি, এই সাজ, এই প্রস্তুতি—
সবকিছু যেন কোনো অজানা ভবিষ্যতের দিকে তাকে ঠেলে দিচ্ছে।
কিন্তু নিশি জুয়েলারি বক্স থেকে আর কিছু নিল না।
ভারী গয়নাগুলো একে একে উপেক্ষা করে সে শুধু হাতে দুটো সোনার চুড়ি পরলো।
চুড়ির নরম ঝনঝন শব্দটা ঘরের নিস্তব্ধতায় অদ্ভুতভাবে কানে লাগলো।
তারপর গলায় হালকা ডিজাইন করা একটা সোনার হার পরলো—যেটা খুব বেশি চোখে পড়ার মতো না, কিন্তু অস্বীকার করারও উপায় নেই।
নিশির মনে হলো, সে যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে সংযত রাখছে।
যেন বলছে—
“আমি পুরোটা মেনে নিচ্ছি না… আবার পুরোটা অস্বীকারও করছি না।”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে দেখলো।
লাল-খয়েরী শাড়িতে নিশিকে আজ অন্যরকম লাগছে—পরিণত, নীরব, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভাঙা।
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
তার মনের একপাশ ফিসফিস করে বলছে—
“তুই তো এটাই চেয়েছিলি নিশি। ফারিসকে, তার ভালোবাসাকে। তাহলে এখন এত কষ্ট পাচ্ছিস কেন? যাকে ভালোবাসিস, তাকেই অস্বীকার করছিস কেন?”
কিন্তু ঠিক তখনই তার মস্তিষ্ক কঠোর স্বরে বাধা দিল—
“না।
যা হচ্ছে, ঠিক হচ্ছে না।
ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় না।
আজ এই একটা সিদ্ধান্ত… এই একটা মুহূর্ত
তোর পুরো জীবনের পথ বদলে দিতে পারে।”
নিশিতার বুকের ভেতর চাপা একটা কান্না জমে উঠলো। সে গভীর শ্বাস নিল, আবার ছাড়লো।
চোখের কোণে পানি জমে উঠলেও সে ফেললো না।
নিচতলায় তখন অন্য দৃশ্য।
ফারিস কাজী সাহেবের সাথে নিচু স্বরে কথা বলছিলো। তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, চোখে অদ্ভুত এক প্রত্যয়।
হঠাৎ সে নিহানের দিকে তাকিয়ে বলল—
— “নিহান, তুমি গিয়ে উপরে মেমের দরজাটা খুলে দাও। আমি ওকে আটকে রেখে এসেছিলাম।”
নিহান এক মুহূর্ত থমকে গেলেও কিছু জিজ্ঞেস করলো না।
শুধু মাথা নুইয়ে বলল—
— “জ্বি স্যার।”
সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
উপরে নিশি তখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
মনের ভেতরের দ্বন্দ্বটা যেন আর সহ্য হচ্ছে না।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২২
ঠিক তখনই—
ক্লিক।
দরজার লক খোলার শব্দ।
নিশির শরীরটা কেঁপে উঠলো।
সে দরজার দিকে তাকালো, পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে। দরজার হাতল ধীরে ধীরে নড়লো…
তার মাঝেই————
