প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৩
জান্নাত নুসরাত
রাত একটা ছুঁই ছুঁই! রাস্তা ধারে ধারে তখন ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আলোকিত। মেইন রোডে গাড়ি চলাচলের মাত্রা খুবই নগন্য। সেই নগন্য গাড়ির মধ্যে একটা গাড়ি অনিকা খানের। হীম শীতল বাতাস তখন বয়ে চলছে প্রকৃতিতে। মর্ডান গেটের সরু রাস্তা দিয়ে কালো কালার মার্সিডিজ ব্যাঞ্জের একটা গাড়ি সুরসুরিয়ে বেরিয়ে আসলো। গাড়ির জানালা খোলা থাকায় বাতাসের সাথে নাকে গিয়ে স্পর্শ লাগল ফুলকলি কোম্পানি এর তৈরিকৃত কেকের সুস্বাদু ঘ্রাণ। আর এতেই জিভ জোড়া লকলক করে উঠল সুফি খাতুনের। খাবারের গন্ধে নাক টেনে স্বাদটা নিজের ভেতর টেনে নিয়ে আহোরণ করলেন তিনি। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা অনিকার দিকে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে জাহির করলেন,”আহ্, খাবারের গন্ধে জিভে জল চলে এসেছে।
অনিকা নিজের চোখের সানগ্লাসটা সামান্য নিচের দিকে নামিয়ে নিয়ে উপহাস করে বলে ওঠল,”কমিয়ে খাও সুফি, দু-দিন পর কবরে যাওয়ার কথা ছিল, এই খাবারের জন্য চলে যাবে দু-দিন আগে।
পেছনে বসা ভিক্টর কথাটুকু শুনে কিটকিট করে হেসে উঠল। এইটুকুতে রেগে বোম হয়ে গেলেন সুফি খাতুন। লাফ মেরে পেছনে ফিরে ক্যাটক্যাটে আওয়াজে বলেন,”খুব দাঁত কেলানো হচ্ছে না, একদম মাড়ি থেকে দাঁত তুলে নিয়ে বিক্রি করে দিব।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
হাসিমাখা মুখখানে নিমেষে চুপসে গেল ভিক্টরের। আধো আলোয় দেখা গেল, অগ্নিকোণ্ডের মতো লাল অগ্নিগিরি মতো ফুলে ফেপে ওঠেছেন তিনি। অনিকা ডান হাত ড্রাইভিং হুইলে রেখে বাঁ-হাতে চাপড় দিল সুফি খাতুনের কাঁধে। শীতিল কন্ঠে আওড়াল,”রিলেক্স ইয়ার..!
সুফি খাতুন রিলেক্স হতে পারলেন না। অনিকা তা পরোয়া না করে গাড়ি চালাতে ব্যস্ত হলো। এক্সিলারেটর এ পা চেপে ধরতেই গাড়ির স্প্রিড বৃদ্ধি পেল। ধীরে ধীরে গাড়ি পুরোনো শাহপরাণ বাজার হয়ে চলে গেল খাদিমপাড়ায়। তারপর ঝড়ের গতিতে এগোলো মীরাবাজার এর দিকে।
পুরো শহর ঘোরা শেষে গাড়ি এসে থামল শুনশান নাছির মঞ্জিলের সামনে। খালি জায়গার একপাশে গাড়ি পার্ক করে রেখে তা হতে বের হলো অনিকা। ঘাড় দু-পাশে কাত করে মটমট করে আওয়াজ করল, সুফি খাতুনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,”রিসেপশন অনুষ্ঠানে এতো ঠান্ডা পরিবেশ মানা যায় না তো, কিছু কী হইছে!
সুফি খাতুন দু-হাত দু-দিকে ঝেড়ে বাতাসের গতিতে উড়িয়ে দিলেন কথাগুলো। বললেন,”বাড়িতে দূর্ঘটনা পুষে রাখলে, দূর্ঘটনা ছাড়া কোনো কাজই সম্পাদন হবে না।
সুফি খাতুনের কথায় সহমত পোষণ করল অনিকা সাথে ভিক্টর। ভিক্টর তো প্রশ্ন করেই বসল,”ছোটবেলায় এই পরিবারের মানুষ কী কোনোভাবে মাথায় চট পেয়েছে?
ভিক্টরের প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করলেন সুফি খাতুন,
“এমন কেন মনে হলো?
“না সবারই মাথার স্ক্রু সামান্য ঢিলে মনে হয়।
সুফি খাতুন সামনে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে ওঠলেন,” হ্যাঁ হতে পারে, আমি ও এমন ধারণা করতেছি, এরা চট পাইছে সবগুলা, দেখো না কিছু হলেই সবাই এক পরিবার হয়ে হামলে পড়ে।
নাছির মঞ্জিলে তখন মাত্র ইমাম সাহেব নব দম্পতির সুখ শান্তি কামনা করে দোয়া শেষ করেছেন, তার মধ্যেই অন্দরে প্রবেশ ঘটল সুফি খাতুন, অনিকা, আর ভিক্টরের। পুরো ড্রয়িং রুমে একবার চোখ বুলিয়ে অবলোকন করে নিল মানুষের সমাগম। অবাক নেত্রে তিনজনই দেখল সোফায় পাশাপাশি কঠিন মুখে বসারত নর-নারীকে! এতটুকু বোধগম্য হলো নিশ্চয়ই কোনো খারাপ ঘটনা ঘটেছে। নিজেদের বিস্ময়ে পরিপূর্ণ চোখ-মুখ স্বাভাবিক করে নিতে সময় লাগল না কারোরই! নিরুদ্বেগ কন্ঠে জানতে চাইল অনিকা,”কী হয়েছে?
অনিকার করা প্রশ্নে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে। মুন্নি আগ বাড়িয়ে গিয়ে সবকিছু বিস্তারিত জানাল তাদের৷ স্টোর রুমের ছিটকিনি লাগানোর কথা শুনতেই সুফি খাতুনের টনক নড়ল! আড় চোখে অনিকার দিকে তাকাতেই দেখলেন পূর্বে থেকে তার পানে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। দু-জনেই একসাথে ঢোক গিলে মৃদু স্বরে বলল,”অহ..!
রাত দুটো দেড়টা ইমাম সাহেবকে নিজের পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হলো তার বাড়িতে। বিয়ে সম্পূর্ণ হওয়ার পর, খাওয়া দাওয়া শেষে কর্তীরা সবাই থম মেরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। ততক্ষণে নিজাম শিকদার আর আরমান নজর লুকিয়ে চলে গেছে শিকদার বাড়িতে। সুফি খাতুন বাড়ির কর্তীদের এমন মুর্মূষ অবস্থা দেখে নিজেই আগ বাড়িয়ে জায়নামাজ নিয়ে আসলেন দো-তলা হতে। ড্রয়িং রুমের কারুকার্যকৃত টাইলসের উপর বিছিয়ে দিয়ে বললেন,”ইরহাম আর নতুন বউ যাও নামাজ পড়ো!
কথাটা শুনতেই ইসরাতের কপালে ভীড় করল ভাঁজ। দুটো গলা দিয়ে কটাক্ষ মিশ্রিত একটা কথা বেরিয়ে আসলো,”জনসম্মুখে আবার কীসের নামাজ!
সুফি খাতু ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন,
“রেওয়াজ এটা, বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীকে নামাজ পড়তে হয়।
নুসরাত কিছু বলতে নিবে জায়িন গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,”হ্যাঁ অবশ্যই নামাজ পড়বে, কিন্তু এটা ওদের নিজেদের রুমে। এমন সবার মধ্যে কার্টুন সেজে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বে কোন দুঃক্কে! সুন্নত দু-রাকাত নামাজ পড়ে কয়েকটা সওয়াব পাওয়ার জায়গায় দ্বিগুণ গুণাহ বাড়ানো তো উচিত না! ওদেরকে প্রাইভেসি দেওয়া উচিত আই থিংক সো, নিজেদের মধ্যে কথা বলুক, এভাবে সং সাজিয়ে এখানে রাখার মানে হয় না!
ইসরাত বলে ওঠল,
“আজকের রাত আমাদের বাসায় থাকুক ওরা, আগামীকাল না হয় ও বাড়ি যাবে।
ঝর্ণা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। এর মধ্যে সুফি খাতুন ধমকে উঠলেন সৌরভিকে,”চাচা শ্বশুর, শাশুড়ী চোখে লাগছে না, সালাম করছো না কেন!
সৌরভি আঁতকে উঠল সুফি খাতুনের ধমকে। নিষ্প্রাণ চোখগুলো নিচে স্থির রেখে মৃদু গলায় সালাম দিল সবাইকে। সুফি খাতুন বলতে নিলেন পা ধরে করো সালাম, তার পূর্বেই নুসরাত আড়মোড়া ভেঙে বলে ওঠল,”হয়েছে অনেক রীতিনীতি, ভাই এখন ঘুমানো প্রয়োজন, আগামীকাল সবকিছু হবে, আজকের জন্য এইটুকুই অনেক বেশি।
সুইমিং পুলের পানিতে পা ভিজিয়ে নিশ্চুপ বসে আছে নুসরাত আর ইরহাম। ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগলেই কাটা দিয়ে উঠছে লোমকূপ! চাঁদের হলদেটে আলোয় দেখা গেল কপালে ভাঁজ ফেলা নুসরাতের চিন্তিত চেহারা। ইরহাম পাশ ফিরে দেখল না নুসরাতের মুখটা। দূর আকাশপানে নেত্রজোড়া স্থির করে শুধাল,”আমি কী এতটা খারাপ?
নুসরাত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ইরহামের দিকে। শব্দ করে শ্বাস ফেলে বলল,”পরিস্থিতি বিরুপ তাই ওর জায়গায় যে কেউ থাকলে এমন রিয়েক্ট করত!
“তুই ও করতি এমন?
ইরহাম প্রশ্নে শেষে নুসরাতের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হলো দু-জনের নিমেষেই। নুসরাত কিটকিট করে হেসে উঠল, যেন ইরহামের প্রশ্ন কোনো মজার কৌতূক! সামনে বসা ছেলেটা নিশ্চুপ দেখল হাসিটা, তারপর অতিকাঙ্ক্ষিত তার জানা উত্তর আসলো,”আমার সাথে এমন কিছু হলে প্রথমে মহিলাগুলো চুলের মুঠি ধরে পিটাতাম, তারপর তুই যদি আমার আসামি হতি তোকে মেরে তোর মুখের মানচিত্র বদলে ফেলতাম।
ইরহাম বিষাদে ভরা হাসল। বলল,
“তুই আজ এমন করলি কেন?
নুসরাত শ্রাগ করে জানতে চাইল,
“কী করেছি আমি?
ভ্রু কুঞ্চিত করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল ইরহাম,
“তুই জানিস না?
“নাহ!
“তুই চাইলেই তো আজ ওর পক্ষে রায় দিতে পারতিস, আমাদের সত্যটুকু তুলে ধরতি সবার সামনে কিন্তু তুই তা করিসনি, আমার হয়ে সৌরভিকে সমাজের নোংরামিতা কথা বলেছিস যাতে এই বিয়েতে রাজী হয়ে যায়! যেখানে তুই সামাজ মানিস না, কোনো সামাজিকতা রক্ষা করিস না, কোনো বিষয়ের মোটেও পরোয়া করিস না, সেখানে আজ তুই আমার হয়ে কথা বলেছিস, আমার হয়ে, কারণ কী ক্যাটফিশ!
নুসরাত দু-হাত উপরে তুলে অলস ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভাঙল। নিরুদ্বেগ কন্ঠে বলল,“আমি নিজের মর্জির মালিক, আমার মন চেয়েছে তাই বলেছি, তোকে আমি তার এক্সপ্লেনেশন কেন দিব? তাছাড়া এই সাউয়ার জাতের ক্যাটফিশ নামে ডাকবি না, আমার বমি আসে!
ইরহাম আকাশ পানে আবারো তাকাল। নুসরাতের কথা না শোনার ভঙ্গি করে মৃদু কন্ঠে বলে ওঠল,”তাহলে আমার প্রশ্নের উত্তরটা আমি দিই!
নুসরাত নির্বিকার চিত্তে বলে ওঠে,
“দেয়!
“কারণ তুই নিজেও এইটুকু জানিস, স্বেচ্ছায় কোনোদিন সৌরভি আমাকে মেনে নিত না, তাই বন্ধুত্বকে তুই পেছনে ঠেলে বোনের দায়িত্ব পালন করেছিস। একজন অপরাধীর সঙ্গ দিয়েছিস!
ইরহামের কথা কেটে দিয়ে নুসরাত নির্লিপ্ত গলায় বলে,“একদম ভুল জবাব!
পরপর ইরহামের ঘাড় চেপে ধরল। নিরুদ্বেগ কন্ঠে বলল“শোন ভাই তোর সাথে আমার অতো পিরিত না যে, তোর জন্য এসব করব। তাছাড়া সৌরভি হলো ফক্সগ্লোভ টাইপ ফুল, তোর হৃৎপিন্ডে প্রভাব ফেলে তোকে একদম নিঃশেষ করে দিবে। তোকে শেষ করার জন্য এটা করেছি, হি হি..!
কথাটুকু শেষ করতে পারল না, আকস্মিক দু-হাতে ইরহাম জড়িয়ে ধরল মেয়েলি দেহটা। নুসরাত অবাক হলো, হকচকাল, অতঃপর থমকাল। চোখের আকার এতটা প্রকট হলো, যা দেখে বোঝা গেল অবাকতার রেশ কতটুকু! বিমূঢ় নেত্রে সচ্ছ নীলাভ পানির দিকে তাকিয়ে কাঠ পুতলির ন্যায় বিড়বিড়াল,”এ কেমন পাটার মতো কাজ, হয়েছে কী তোর? মাথার রগ ছিঁড়ে টিড়ে গেছে নাকি? না পিনিক উঠেছে মনে, ছাড় আমায়!
নড়েচড়ে উঠল নুসরাত। মোচড়া মুচড়ি করে ইরহামের হাতের বন্ধন থেকে বের হতে চাইল, পারল না। হাত দিয়ে চিমটি কাটল, তবুও রক্তচোষা প্রাণীর ন্যায় ধরে রাখল তাকে। নুসরাত হাল ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানতে চাইল,”নতুন এ নাটক শুরু করেছিস কেন?
ইরহাম নুসরাতের হোয়াইট কালার হুডির উপর নাক চেপে ধরল। কিৎকাল অতিবাহিত হতেই গুমরে গুমরে কেঁদে উঠল। শব্দ করে নাক টানতেই, কানে আসলো বিরক্ত মিশ্রিত শব্দ,”মেয়ে মানুষের মতো ফ্যাচফ্যাচ করে কান্না করছে বোকাচো*দা একটা! ছাড়, না হয় ক্যাটফিশ হয়ে এখনই কামড়ে দিব তোকে।
“তুই কী কুত্তা?
“হো প্রয়োজন পড়লে কুত্তা হয়ে যাব,ভাউউউ..!
“তোকে এমনিতেই কুত্তা লাগে, আর ভাউ বলতে হবে না। সারাদিন তো কুত্তার মতো ঘেউঘেউ করিস!
“আকাইম্মার বাইচ্চা, তোকে অভিশাপ দিলাম তুই সারাজীবন বউয়ের লাথি খাবি, তোর বাচ্চা একেকটা হবে আমার মতো ভোলাভালা নিষ্পাপ!
ইরহাম হেসে উঠে আবারো ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে উঠল। নাকি সুরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট সুরে উচ্চারণ করল কিছু শব্দ,”দূরের ওই চাঁদটাও জানালা খুলে দিলে ঘরে চলে আসে, ও মনে হয় তার চেয়েও দূরে!
রাত তখন তিনটে ঘড়ির কাটায়। ড্রয়িং রুমে দেয়াল ঘড়িটা টিক টিক করে চলছে, ঘন্টার কাটায় যেতেই এলার্মের মতো বেজে ওঠে জানান দিচ্ছে সময়ের। ইরহাম পা টিপে টিপে আজকের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে চলল। নিরিবিলি, নিস্তব্ধ বাড়িতে আলোর ছিটেফোঁটা নেই। ভেজানো দরজা হাত বাড়িয়ে ঠেলে দিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতেই চকচকে ধারালো একজোড়া ছুরি এসে স্পর্শ করল গলার সরু চামড়ায়। পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় এমন হামলায় মুখ দিয়ে নির্গত হতে চাইল অতর্কিত শব্দ, সেগুলো আলগোছে গিলে নিল সে। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই লালাব আঁখিদ্বয়ের সাথে চোখাচোখি হলো। টিকটিক করে সেকেন্ডের কাটা মিনিটে গড়াল, তবুও কেউ কারোর দিক থেকে চোখ সরাল না। খোলা জানালা বেয়ে বাতাস এসে সৌরভিকে স্পর্শ করতেই পিঠ বেয়ে ঝড়ে থাকা রেশমি সুতোর মতো চুলগুলো উড়ল হাওয়ার তালে। ইরহাম ঘাড় কাত করে ঠোঁট উচিয়ে শ্লেষ করে,”গুণী ব্যক্তিরা বে রোমান্স ইজ ডেড, বাট দেই ডিডেন্ট, আমার বাসর রাতে আমার স্ত্রী আমার মৃত্যুর পরিকল্পনা করে দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে মারার জন্য, মাইন্ড ব্লোয়িং সৌরভি শিকদার!
কথা শেষ হতেই ঠাস করে গালে চড় পড়ল। ইরহাম ভ্রু উচিয়ে সামনে তাকাতেই আধো আলোয় দেখল আরেকটা থাপ্পড় তার গালে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। চোখ বন্ধ করে নিতেই গাল অবস করে দিয়ে ঠাস করে আরো একটা দাবাং মার্কা থাপ্পড় পড়ল। ইরহাম নিজের দেহ স্থির রেখে গ্রীবা বাঁকিয়ে ঝুঁকে আসলো। সৌরভির চোখের পানে তাকিয়ে নির্লজ্জের মতো জানতে চাইল,”রাগ কমেছে?
বাজিয়ে আরেকটা থাপ্পড় পড়ল। একদলা থুথু এসে পড়ল ইরহামের গালে। গম্ভীর মুখে নিজের কাপড়ে পড়া থুথুর দিকে চাইল ছেলেটা। কোনো প্রকার রিয়েক্ট না করে আলগোছে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে নিয়ে আসলো টিস্যু। বুকের কাছে পড়া থুথু মুছে নিয়ে শীতিল কন্ঠে শুধাল,”ঘৃণা কমেছে একটু?
আরেকদলা থুথু ছিটকে এসে পড়ল গালে। ঘৃণ্য নয়নে তাকিয়ে রইল সৌরভি সামনের নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্র চেহারার উঁচু লম্বা লম্পটটার দিকে। শ্রবণেন্দ্রিয় আবারো বাজল লম্পট টার পুরু স্বর,”চুলের মুঠ ধরে পিটাতে ইচ্ছে হচ্ছে?
কথাটা শেষ করেই ঝুঁকে আসলো তার সম্মুখে। বলল,”নাও চুল ধরে ছিঁড়ে রাগ মিটাও!
ইরহামের বাড়িয়ে দেওয়া মাথার দিকে সৌরভি তাকাল বিতৃষ্ণার চোখে। প্রথমবারের মতো রাগী কন্ঠে হিসহিসাল,”তালাক দিন আমাকে এক্ষুণি!
ইরহাম সোজা হয়ে দাঁড়াল। শুনেনি এমন ভান করে বলে ওঠল,”হুউ, কী শুনতে পাইনি!
সৌরভি নিজের রাগটুকু যতেষ্ট গিলে নিয়ে, শান্ত স্বরে বলল,“তালাকনামা চাই আমি!
“এটা আবার কী, কোনো পরার জিনিস নাকি খাওয়ার জিনিস?
ভ্রু উচাল সামান্য! যেন ভাজ মাছটি কীভাবে উলটে খেতে হয় সেটা সে জানে না! তালাকনামা শব্দটা এই প্রথম শুনল যেন। ইরহামের এমন হেয়ালিতে চ্যাতচ্যাতিয়ে উঠল সৌরভি। চ্যাঁচাল,”জানুয়ার, আমাকে তালাক দেয়!
“বেয়াদবি করো না সৌরভি, তুমি বলো না হয় আপনি!
সৌরভি দু-হাতে ধাক্কা দিল ইরহামের বুকে। বলল,“করব বেয়াদবি, হাজারবার করব, কী করবি তুই ফেরাউন, কী করবি!
ইরহাম গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আবারো বলল,
“বেয়াদবি করছো তুমি, মুখের ভাষা সংযত করো!
“ করব না সংযত, ইবলিশের বাচ্চা কী করবি তুই?
ইরহাম গর্যে উঠল,
“সৌরভিইইই..! বাপ মা তুলে একটা কথা না।
“কেন? ইগো তে লাগে? সম্মানে লাগে? হ্যাঁ লাগবে তো, বাপ-মাকে বলছি তোমার তাই না, কিন্তু আমাকে যখন সবাই বলল তখন তো এমন করে গর্জাতে পারলে না, মাথা ঝুঁকিয়ে বলে উঠেছিলে না, যা ভেবেছে তা সত্যি, এমনই কিছু হয়েছে বলেছ, তাই না? তুই জানিস, তুই একটা ইবলিশ, একটা লম্পট, একটা লুচ্চা, একটা ফেরাউন, শুয়োর,কাপুরুষ!
ইরহাম সৌরভির ধাক্কা দেওয়া হাত চেপে ধরল। হিসহিসিয়ে বলে ওঠল,”এতক্ষণ যাবত অনেক বেয়াদবি সহ্য করেছি, কিন্তু আর না…
“কী করবি তুই বেয়াদবি করলে?
সৌরভি ইরহামকে কেটে দিয়ে জানতে চাইল। ইরহাম একহাতে সৌরভির হাত পিঠে চেপে ধরে বলে ওঠল,”বলে দেখো শুধু..!
“এই যে আমি গলা ফেড়ে বলব তুই একটা বদমাশ, একটা লুচ্চার বাচ্চা, একটা ফেরাউনের বাচ্চা, একটা ইবলিশের বাচ্….
কথা শেষ করার আগেই সৌরভির গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় পড়ল। সৌরভির ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁটজোড়া ওমনই রইল। কানে আসলো ইরহামের শাসানো কন্ঠস্বর,”যা বলার আমাকে বলো, আমার বাপ-মাকে টানবে না সৌরভি, তোমার বেয়াদবী সহ্য করছি আমাকে এতক্ষণ বলছিলে বলে কিন্তু এখন আমার মা-বাবাকে টানছো এখানে, আবার যদি এমন ভুল করো তাহলে এই থাপ্পড় দ্বিতীয়বার তোমার গালে পড়তে দু-সেকেন্ড দেরী হবে না। গট ইট..!
বজ্র কন্ঠে চ্যাঁচাল সে। রাগে শাসানোর জন্য তোলা আঙুল কাঁপল থরথর করে। সৌরভি আবারো কিছু বলতে নিতে যাবে, একহাতে থাবা মেরে চেপে ধরল তার বাহু ইরহাম। সৌরভি নিজের বাহু হতে পুরুষালি হাত টেনে হিঁচড়ে ছাড়াতে নিল, পারল না। তাই নিজের রাগ জাহির করতে চ্যাঁচাল,”আমাকে ছাড় শয়তান, লম্পট কোথাকার, হাত ছাড় আমার! গা স্পর্শ করবি না আমার, নাহলে খুন করে ফেলব।
সৌরভির চ্যাঁচানো কানেই তুলল না ইরহাম। টেনে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়। সৌরভি বিছানা থেকে উঠে বসতেই এক হাঁটুতে ভর দিয়ে উবু হয়ে বসল ইরহাম। একহাতে মেয়েলি হাত জোড়া মুষ্টিতে চেপে ধরে শক্ত দড়ির সাথে বেঁধে ফেলল। সৌরভি পা দিয়ে লাথি মারতে নিবে, তার পা দু-খানা ও বেঁধে ফেলল ইরহাম।
সৌরভি রাগী কন্ঠে চিৎকার দিল,
“জানোয়ারের বাচ্চা হাত বেঁধেছিস কেন, কাপুরুষ আমার হাত খোল, তোকে আজ আমি খুন করব লম্পট! তোর ধ্বংস হবে ফেরাউন,আমি তোকে অভিশাপ দিলাম জাহান্নামে যাবি তুই, জাহান্নামে যাবি, আল্লাহ তোকে এই না ইনসাফির শাস্তি দিবে। তুই শিগগিরই মরবি, তুই মরবি। তুই মরে যা, তুই মর, থুহ..!
ইরহাম নির্বিকার চোখ-মুখ নিয়ে বিছানা থেকে নামল। পুরো রুম তন্ন তন্ন করে কিছু খুঁজল। নাইটস্ট্যান্ডের উপর রাখা কস্টেপের দিকে চোখ যেতেই তা হাতে তুলে নিল। এতো অভিশাপ কানে গেল কি না, তা বোঝা গেল না।
ভাবলেশহীন ভাবে হেঁটে এসে সৌরভির ছটফট করতে থাকা মুখের মধ্যে শক্ত হাতে তা আটকে দিল। বিছানা হতে উঠে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে তর্জনী আঙুল চেপে রেখে বলল,”নয়েজ করোনা, চুপচাপ ঘুমাও, আজকের জন্য এইটুকু গালিই যথেষ্ট, আগামীকালের জন্য কিছু বাঁচিয়ে রাখো! এখনো তো সারাজীবন পড়ে রয়েছে গালি দেওয়ার জন্য, একদিনে সব গালি খরচ করে ফেললে পরেরবার কী গালি দিবে! ধীরে সুস্থে গালি দাও, আমি আছি এখানে, তোমার সাথে!
ভাবলেশহীন পায়ে হেঁটে গিয়ে রিলাক্সিং চেয়ারে বসল। ঢিলেঢালা ডেনিম প্যান্টের পকেট হতে হাত বের করে মোটা কালো ভ্রু জোড়ায় সামান্য চুলকে নিল। পরপর আবার ভাঁজ ফেলে জানতে চাইল,”ডিভোর্স চাও তাই না?
গালে হাত দিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে বিছানায় বসে থাকা লাল শাড়ী পরিহিত স্ত্রীর ঝলমল করে উঠা আঁখিযুগলের পানে তাকাল, দেখল উচ্ছাস মিশ্রিত নেত্রজোড়া।। চোখাচোখি হলো দু-জনের আবারো, কেউ কারোর থেকে দৃষ্টি সরাল না। ইরহাম নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে ওঠল,”তা এজীবনে সম্ভব না, ফক্সগ্লোভ আমার! এই জীবন না হয় গালি দিয়েই কাটিয়ে দাও আমার সাথে, পরেরজনমে দেখা যাবে নে কী করা যায়, তোমাকে আমি তালাক দিচ্ছি না, আর ভবিষ্যতেও দিব না।।
সৌরভি লাল শিরা উপশিরা ভেসে ওঠা চোখে দেখল ইসরাতের মতো মুখাবিশিষ্ট ঘৃণ্য শুভ্রলালের মিশ্রণে আলাদা বর্ণের মায়াবী চেহারাটা। ঘৃণা নিয়ে খেয়াল করল যার চরিত্রের ঠিক নেই, যাকে বিনা শব্দে প্রয়োগে লম্পট বলা চলে, চলন বলনে বখাটে। কুচকুচে কালো এক জোড়া ভ্রু এর নিচে জায়গা করে নেওয়া হেজেল চোখ। লাল গাল দুটোর মাঝ দিয়ে দাম্ভিক সরু উঁচু নাক! রক্তাভ বর্ণের ঠোঁটজোড়ার উপরের অংশ সামান্য ভেতরের দিকে। শক্ত চিবুকের সাথে মুখের আকৃতি, গড়ন, ধারাল চোয়াল, সবকিছু যেন মানানসই। চোয়ালে কোনো দাড়ির অস্তিত্ব নেই, চোখের নিচে সামান্য একটু ডার্ক সার্কেল। তারপর আর ঘুরল না সৌরভি মুখটা, এতটুকু লক্ষ করা শেষে বিতৃষ্ণার সাথে সরিয়ে নিল নিজের চোখজোড়া ওই চোখ হতে। মনে মনে ঘৃণ্য কন্ঠে বিড়বিড় করে,”আল্লাহ এই দুনিয়ায় কাপুরুষ, লম্পট, শুয়োরদের সব সৌন্দর্য, টাকা-পয়সা দিয়ে তৈরি করেন!
প্রভাতের কিরণ পূর্বদিক থেকে ঊদিত হচ্ছে। সবুজ ঘাসগুলো বৃষ্টির জন্য সামান্য ভিজে আছে এখনো। সজীব এই সকালে হুরহুর করে বাতাস নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে,একই সাথে কানে ও। কংক্রিটের বড় রাস্তার মধ্য দিয়ে তখনো চলাচল শুরু হয়নি কোনো গাড়ির। রাস্তার মধ্য দিয়ে পরপর দু-বার ধীরে সুস্থে দৌড়াল । তৃতীয় বারের বার তার এই কাজে বিপত্তি ঘটাতে সম্মুখে এসে দাঁড়াল চেনা পরিচিত একটা মুখ। পরিচিত একটা স্বর ভেসে আসলো কানে,”ভাবীআম্মা!
ভাবীআম্মা বলা ছেলেটা দু-হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরার ভঙ্গিতে এগিয়ে আসতেই, আকস্মিক বুক বরাবর একটা লাথি পড়ল। ছেলেটা অতর্কিত এই হামলায় হকচকাল। চোখ দুটোর আকার বৃদ্ধি করে শব্দের সহিত গিয়ে পড়ল কংক্রিটের রাস্তায়। শাসানো কন্ঠস্বর হাওয়ায় ভাসল,”স্টেই এওয়ে ফ্রম মি!
“বেলাডোনা!
পিছু ডাকা নুসরাত ঘাড় বাকিয়ে তাকাল। উপহাস করে জানতে চাইল,”আমাকে বলছেন পশ্চিম আবরার পূর্ব?
“প্লিজ এভাবে নামের বিকৃতি ঘটাবেন না, বেলাডোনা!
পরপর আবার নাহিয়ান বলল,
“এভাবে কারোর সামনে নিজের পা তোলা অসম্মানজনক, আর আপনি তো হলেন সম্মানীয় সৈয়দ পরিবারের কন্যা, আপনার কাছ থেকে এমন উগ্রতা আশা করা যায় না!
নুসরাত নাক ফুলিয়ে বিরক্তি লুকাল। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল,”এক পাগলের ভাত নেই, আরেক পাগল হাজির।
নাহিয়ান তা শুনল না। গদগদ ভঙ্গিতে গ্রীবা বাঁকিয়ে ঝুঁকে আসলো। বলল,”আপনার এই প্রতিভা দেখে আমি আপনার প্রেমে পড়ে গেলাম, আমাকে বিয়ে করে নিন বেলাডোনা!
নুসরাত নিজের হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙল। দু-হাতের আঙুল চেপে মটমট করে শব্দ করে, ঘাড় কাত করে বলে,”এই প্রস্তাব আমার পছন্দ হয়নি, তাই ঠোকরালাম! আপনার এই প্রস্তাবের বদলে আপনি চাইলে আপনাকে আমি একটা লাথি মারতে চাইব। আমার একজীবনের বহু চাওয়ার মধ্যে একটা চাওয়া আপনাকে লাথি মেরে এই গ্রহের বাহিরে ফেলে দেওয়া।
নাহিয়ান হুহু করে হেসে উঠল। তাকে ভেঙ্গিয়ে নুসরাত নিজেও খে খে করে হেসে উঠে। নাহিয়ান নিজের কৃত্রিম হাসি গিলে নিয়ে বলে ওঠে,”ইট’’স মাই প্লেজার নুসরাত! আপনি আমাকে কেন লাথি মারতে চাইছেন কারণ কী জানতে পারি? আমার জানামতে আমি তেমন কিছু করিনি এখনো পর্যন্ত আপনার সাথে, শুধু বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি।
“আজকাল পায়ের মধ্যে চুলকানোটা বেশি হচ্ছে, তাই পুরুষ মানুষ দেখলেই পিটিয়ে পায়ের চুলকানো কমানোর ক্রেভিং হচ্ছে।
“অহ, বুঝতে পারলাম! কিন্তু তৌফকে মেরে এমন রাস্তায় ফেলে দেওয়ার কারণ কী!
“আপনাকে বলতে বাধ্য নই, দূরত্ব বজায় রাখতে বলবেন একে। নাহলে এমন মার মারব, পরেরবার উঠে দাড়ানোর পর্যায়ে থাকবে না।
নাহিয়ান নুসরাতকে পলক বিহীন নেত্রে দেখল গণে গণে ত্রিশ সেকেন্ড। অতঃপর সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,”আপনি নিজেকে যতটা বাচাল, বোকা, ছন্নছাড়া দেখান তা আপনি না, আপনি ভীষণ ধূর্ত বেলাডোনা, অর আই সে নাইট ফক্স!
নুসরাত হেসে উঠল। নাহিয়ান তৌফকে মাটি থেকে টেনে তুলতে তুলতে বলল,”আপনার কাছে একটা প্রস্তাব রাখতে চাচ্ছি!
নুসরাত ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল কী! যতটুকু সে ধারণা করতে পারছে এই মাথামোটা, গোবরটা তাকে প্রস্তাব দিবে আবার, কোনো সমযোতার সাথে, কিন্তু সমযোতাটা কী হতে পারে! নুসরাতের চিন্তায় ব্যঘাত ঘটিয়ে নাহিয়ান বলে ওঠল,”গল্ফ খেলা জানেন আপনি?
নুসরাত উপর নিচ মাথা দোলাল। নাহিয়ান আবারো শুধাল,”টেনিস?
“হ্যাঁ জানি!
“কোনটায় পারদর্শী আপনি?
“ গল্ফে।
তৌফকে ছেড়ে দিয়ে, নাহিয়ান দু-হাতে উচ্ছাসে তালি বাজাল। বলে ওঠল,“তাহলে আজ আমরা টেনিস খেলব। এবং এই খেলায় যে হারবে তাকে প্রতিপক্ষের যেকোনো প্রস্তাব বিনা বাক্যে মেনে নিতে হবে।
নুসরাত হেসে উঠল শব্দ করে। বলল,
“ওওও, আপনি তাহলে বিয়ের প্রস্তাব এভাবে দিতে চাচ্ছেন পূর্ব?
নাহিয়ান মাথা দোলাল উপর নিচ। নুসরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,”যান ,টেনিস কোর্টে যান, আমি র্যাকেট আর টেনিস বল নিয়ে আসছি।
নুসরাত দশ মিনিটের মাথায় হাতে করে টেনিস বল আর র্যাকেট নিয়ে হাজির হলো মাঠে। একটা র্যাকেট নাহিয়ানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,”লেট’স স্টার্ট দ্যা ম্যাচ।
নাহিয়ান নিজের বক্সে গিয়ে দাঁড়াল। অতঃপর বলল,
“অহ হ্যাঁ, পাঁচটি ম্যাচ খেলব, যার আগে তিন পয়েন্ট হবে সেই বিজয়ী!
নুসরাত মাথা দোলাল। ডান হাতে শক্ত করে র্কেট চেপে ধরে দাঁড়াল নিজের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায়। শান্ত স্বরে জানতে চাইল,”কে শুরু করবে?
নাহিয়ান দাম্ভিকতার সাথে বলল,
“আপনি শুরু করেন।
নুসরাত কটাক্ষ করে হাসল। বিড়বিড় করল,
“টেনিস ম্যাচ জেতার প্রথম রুলস, প্রতিপক্ষকে সবসময় প্রথমে জিততে দিতে হবে, বোঝাতে হবে অপটু তুমি এই খেলায়।
বল শূণ্যে বাঁ-হাতে চেপে ধরে ডানহাতে খুবই ধীরে আঘাত হানল বলে, বলটা খুব দূরে পড়ল না গিয়ে, নিজের বক্সেই পড়ে গেল। বলটা হাতে তুলে উঠে দাঁড়াতেই চোখে ভাসল উপহাস মিশ্রিত নাহিয়ানের হাসি। নাহিয়ান বলল,”আমি যতটুকু ভেবেছি তার থেকে বেশি খারাপ আপনি এই খেলায়। বলটা এদিকে দিয়ে দিন মিস!
নুসরাত টেনিস বল ছুঁড়ে দিল নাহিয়ানের দিকে। উল্টোদিকে ঘুরে পুরুষালি নজরের অগোচরে হাসল। বলল,”শুরু করুন পূর্ব!
নাহিয়ান বল শূণ্যে তুলে র্যাকেট দিয়ে আঘাত করল বলে, সেটা উড়ে নেট ভেদ করে এসে পড়ল নুসরাতের বক্সে। নুসরাত সেটা ফেরানোর চেষ্টা করল না, জিততে দিল নাহিয়ানকে। হাতে তুলে নিল টেনিস বল, ডান হাতে শক্ত করে র্যাকেট চেপে ধরে তা ঘুরিয়ে নিয়ে আসলো পুরো শক্তির সাথে। আঘাত করল টেনিস বলে সাথে বিড়বিড় করল,”টেনিস ম্যাচ জেতার দ্বিতীয় রুলস, নিজের প্রতিপক্ষকে জিততে দেওয়ার আনন্দ অনুভব করতে দেওয়া, তাকে আকাশে উড়ানো অতঃপর সকল আনন্দ মাটিতে গুড়িয়ে দিয়ে তার বিজয়ের হাসিটাকে বাতাসে মিলিয়ে দেওয়া।
টেনিস বল নেট ভেদ করে উড়ে গিয়ে পড়ল দাম্ভিক হাসির তোড়ে কুঁচকে যাওয়া নাহিয়ানের উঁচু নাক বরাবর। সাথে সাথে এক পয়েন্ট যোগ হলো নুসরাতের। নাহিয়ান চিৎকার দিয়ে বলছে,”আপনি আমার নাক ফাটিয়ে ফেলেছেন নুসরাত!
পরপর বল তুলে ছুঁড়ে মারল নুসরাতের দিকে। শীতিল স্বরে আওড়াল,”দারুণ খেলেন আপনি, অতোটা অপটু না আপনি।
পরের ম্যাচে দু-পক্ষই বলটা র্যাকেটের সাহায্যে একে অন্যের দিকে ছুঁড়ে দিল অনেকবার। শেষবার র্যাকেট স্পর্শ করে নুসরাতের বক্সে এসে পড়ে গেল টেনিস বল। এবারের পয়েন্টটা যোগ হলো নাহিয়ানের নামে।
তৃতীয় ম্যাচ শুরু হলো। ম্যাচ শুরু হতেই বল ছুঁড়ে দিল সে, নাহিয়ান প্রস্তুত না থাকায় প্রথমবারেই পয়েন্ট এসে যোগ হলো তার কব্জায়।
নাহিয়ান র্যাকেট শক্ত করে দু-হাতে চেপে ধরে বলে ওঠল,”আমাদের কিন্তু ড্রো, এই ম্যাচে যেই জিতবে সেই উইনার, এবং তার কন্ডিশন প্রতিপক্ষকে মানতে হবে।
নুসরাত নিজেও দু-হাতে শক্ত করে র্যাকেট চেপে ধরল। নাহিয়ানের ছুঁড়ে দেওয়া টেনিস বল সেকেন্ডের ভেতর এসে স্পর্শ করল নুসরাতের র্যাকেটে। তা শব্দ করে র্যাকেট দিয়ে আঘাত করতেই গিয়ে পড়ল নাহিয়ানের বক্সে, নাহিয়ান নিজেও আবার ফিরিয়ে দিল। চোখে ঘোলাটে দেখল, এক মুহুর্তের জন্য ধ্যান সরে যেতেই নুসরাতের শক্ত করে ধরে রাখা র্যাকেট ছুটে গেল সামান্য, বল পিছনের দিকে চলে গেলে, তীক্ষ্ণ চোখে বলটার গতিবেগ লক্ষ করে, র্যাকেট ঘুরিয়ে এনে ঠাস করে বলে বসাল। ঠোঁট নেড়ে বলল,”চেক….
বল শু করে উড়ে গেল নেটের ওপাশে। নাহিয়ানের কপালে লাগতেই নুসরাত চ্যাঁচাল,”মেট!
নুসরাত হাত ঝাড়ল। জইতে যাওয়ার খুশি চোখে-মুখে একটুও ভাসল না। গলার আওয়াজ বাড়িয়ে বলে,
“শুনুন পূর্ব, নিজের প্রতিপক্ষকে কখনো বোকা মনে করবেন না, প্রথমেই আপনি যদি ধরে নিন সে আপনার থেকে অসহায়, নির্বোধ, বোকা, কম শক্তিশালী তাহলে আপনি ওই মুহুর্তে গেমে হেরে যাবেন। ম্যাচের শর্ত অনুযায়ী ছিল যে জিতবে তার কথা মানা হবে, তাহলে আমি জিতেছি, সেই অনুযায়ী আমার কথা আপনাকে মানতে হবে।
নুসরাত কিৎকালের জন্য থামল। সময় নিয়ে ভাবার ভান করল। অতঃপর দৃঢ় কন্ঠে বলল,”আমার নজরের সামনে যেন আপনার এই চেহারা আমি জীবনেও না দেখি।
নাহিয়ান দু-হাত ঝেড়ে হাসে। নুসরাতের দিকে নির্মিশেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, গম্ভীরতার সহিত বিড়বিড় করে,”আপনি যতই আমাকে, আমার প্রস্তাবকে ঠোকরান না কেন, আমি ঠিক ততই আপনার দিকে আকর্ষিত হয়ে, আপনাকে নতুনভাবে, নতুন স্পৃহা নিয়ে আমার হওয়ার জন্য প্রস্তাব দিব।
সৈয়দ বাড়ির ভেতর তখন হইচই বেঁধে গেছে। ফজরের নামাজ পড়া শেষে যখন লিপি বেগম শুয়েছিলেন আকস্মিক তার বড় ভাইয়ের কল আসলো। জানা গেল রোমানা খাতুনের শরীর খুব একটা ভালো নেই, বিয়েতে চেয়েও আসতে পারেননি। সন্তানেরা কঠিন নিষেধাগা জারী করেছিল, তাই তাদের মুখের দিকে চেয়ে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উপস্থিত হননি। নিজে আসতে পারেননি বলে কী হয়েছে, সক্কাল সক্কাল মেয়ে জামাইকে ফোন দিয়ে দাওয়াত দিয়েছেন নাতী আর নাতবৌ নিয়ে হাজির হতে খান বাড়িতে, যেকোনো মূল্যে আজকের ভেতর। সৈয়দ বাড়ির বর্তমান পরিস্থিতি উনার অজানা, তাই তাড়া দিলেন বেলা পড়ার আগে শীগগির পৌঁছানোর জন্য।
শাশুড়ীর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন হেলাল সাহেব। একটা বাক্য মুখ ফুটে রোমানা খাতুন বললেই সেটা যেন তার জন্য শিরোধার্য! তাই গতকাল রাতের ঘটনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বড় ছেলে, ছোট ছেলে, স্ত্রী, আর ছেলের বউকে নিয়ে তৈরি হচ্ছেন শ্বশুরের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। আরশের নানা বাড়ি ধারাবহর। কিছুটা গ্রামাঞ্চলের দিকে। খালি ফসলী জমির মধ্যে পুরোনো জমিদারের বাড়ির মতো একটা বিলাসবহুল চার তলা বাড়ি হেলাল সাহেবের শ্বশুরের। হাতে র্যাকেট নিয়ে সৈয়দ বাড়ির সামনে হাজির হতেই দেখল আহান লাগেজ ঠেলে ঠেলে নিয়ে এসে পার্ক করা গাড়িতে রাখছে। নুসরাত অদেখা করে চলে গেল দু-পা, পরমুহূর্তে আবার ফিরে এসে ঠা করে খুলে রাখা গেটের সম্মুখে দাঁড়াল। গলা উচিয়ে ডাকল আহানের নাম। জানতে চাইল,”কোথায় যাচ্ছিস তুই?
আহান গাড়িতে লাগেজ রেখে হাত ঝাড়ল। বলল,
“আমি যাচ্ছি না, বড় ভাইয়া নানু বাড়ি যাচ্ছে তার।
নুসরাত ঠোঁট উচিয়ে বাঁকা হাসল। বলল,
“পিও অনিকা আপো যাচ্ছেন?
“না গতকাল উনাদের বাসায় চলে গেছে উনি!
নুসরাত দু-হাত তুলে দোয়া করল। তারপর আমিন বলে দোয়া শেষ করে বলল,” আপদ বিদেয় হয়েছে, যাক আল্লাহ বাচাইছে।
আহান দৌড়ে নুসরাতের সান্নিধ্যে এসে জানতে চাইল,
“তুমি গতকাল রাতে কান্না করছ নাকি?
নুসরাত ঠোঁট উচিয়ে, মুখ ভঙ্গি বিচ্ছিরি করে বলল,
“কী আমি..!
আহান ঘাটাল না নুসরাতের মুখের রিয়েকশন দেখে আর। তার মধ্যে হেলাল সাহেব আসলেন। নুসরাতকে দাঁড়ানো দেখেই মুখ মোচড় মারলেন, তা অগোচর হলো না তার। সে পনিটেল বাঁধা চুল বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,”এমন মুখ মোচড় মারতে মারতে দেখবেন একদিন মুখই ত্যাড়া হয়ে গেছে।
“তুই আমাকে বলছিস?
“ না, গাছে বসা কাককে বলছি!
হেলাল সাহেব কাঠখোট্টা স্বরে বলেন,
“বেয়াদব!
নুসরাত নির্লিপ্ত মুখে তাকিয়ে হাসে। বলে,
“ধন্যবাদ।
হেলাল সাহেব নাক দিয়ে গরম শ্বাস ফেললেন। জিজ্ঞেস করলেন,” ওইটার খবর কী?
নুসরাত বুঝল কার কথা জিজ্ঞেস করছেন। তারপরও বলল,”কোনটার?
“তোর ভাইয়ের!
আলসী গলায় বলল,
“নিজ দায়িত্বে জেনে নিন, আমি বলতে পারব না।
কথা শেষে নিজেদের বাগানের দিকে তাকাল। দেখল কমলা গাছের কয়েকটা ডাল শুকিয়ে গেছে। আহানকে উদ্দেশ্য করে বলল,”যা কাঁচি নিয়ে আয়, গাছগুলো কাটব!
হেলাল সাহেব প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে আরাম করে দাঁড়ালেন। নুসরাতকে অদেখা করে ভাবাবেগহীন কন্ঠে বললেন,”কাঁচির কী দরকার তোর জবান দিয়েই কেটে ফেল সবকিছু।
নুসরাত দু-ভ্রু তুলে হুহু করে হেসে উঠল।বলল,
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪২
“আপনারটা বের করুন, আমার থেকে দ্বিগুণ ধারালো।
“কাঁচির মতো ফ্যাচফ্যাচ করে চলে জিভ!
“আপনার থেকে কম ফ্যাচফ্যাচ করে চলে।
“তোর সৌভাগ্য যে, তোর কাঁচির মতো জবানে আমি বোম ছুঁড়ে ফেলছি না!
নুসরাত ঠোঁট এলিয়ে অমায়িক হাসল। বলল,
“আপনার তো দূর্ভাগ্য, আপনাকে আমি রকেটের পেছনে বেঁধে মহাকাশে ছেড়ে দিচ্ছি না..!
