Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৩

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৩

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৩
আয়াত বিনতে নূর

আজ থেকে ঠিক সাত বছর আগে,
তখন তোর বয়স ছিলো মাত্র দশ। একেবারে কাঁচা, নিষ্পাপ, অবুঝ একটা বাচ্চা। দুনিয়ার কোনো হিসাব তখনও তোর মাথায় ঢোকেনি। তুই শুধু জানতিস—আমার পাশে থাকলেই তোর পৃথিবী ঠিক থাকে। সবসময় আমার পিছনে পিছনে ঘুরতিস। আমি এক ঘর থেকে আরেক ঘরে গেলে, তুই ঠিক ছায়ার মতো পেছনে পেছনে চলে আসতিস। আমি বাইরে বেরোতে চাইলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকতিস। আর যদি বলতাম,

“এখন যাবো না, পরে আসবো,”
তাহলেই তোর চোখে পানি জমে যেত।
ছোট আম্মুর কাছে গিয়ে কান্না জুড়ে দিতিস—
“আমি ভাইয়ার সাথে থাকবো… ভাইয়া ছাড়া যাবো না…”
আর ছোট আম্মু তখন হালকা বিরক্তি আর হাসির মাঝামাঝি একটা মুখ করে বলতেন—
“এই মেয়ে তো একেবারে ভাইয়ার লেজ ধরছে!”
আমি তখন তোকে কোলে তুলে নিতাম।
চুলে হাত বুলিয়ে দিতাম।
মাঝে মাঝে কপালে একটা আদুরে টোকা দিতাম।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বিশ্বাস কর, তখন সত্যিই নিজের বোনের মতোই ভাবতাম তোকে। কোনো অন্য কিছু মাথায় ছিলো না। দশ বছর পর্যন্ত—এক ফোঁটা ভিন্ন চিন্তাও আসেনি। তারপর সেই দিনটা… তুই হঠাৎ করেই জেদ ধরেছিলি শাড়ি পড়বি।
কেন পড়বি, কোথায় পড়বি—সেটার কোনো যুক্তি তোর নিজের কাছেও ছিলো না। শুধু মনে হয়েছিল, আজ শাড়ি পড়তে ইচ্ছে করছে।
ছোট আম্মু প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
বলেছিলেন—
“এত ছোট মেয়ে, শাড়ি পড়ে কী করবি?”
তুই তখন ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছিলি—
“আমি পারি!”

ছোট আম্মু রাজি না হওয়ায় তুই ধীরে ধীরে কান্না শুরু করেছিলি। প্রথমে চোখ ভিজেছিল।
তারপর ঠোঁট কাঁপছিল। তারপর হাউমাউ করে কান্না। সেই কান্নার আওয়াজেই পুরো বাড়ি যেন থমকে গিয়েছিল। ফারিসের কথা শুনে নিশিতার চোখ দুটো দূরে কোথাও আটকে গেলো।
সে যেন আর এই ঘরে নেই—সাত বছর আগের সেই দুপুরে দাঁড়িয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য তার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো।
নিজের সেই অবুঝ জেদ, সেই কান্না—সব মনে পড়ে গেলো নিশিতা নিজেই হেসে ফেলল।
তারপর ধীরে গলায় বলল—

“হুম… তারপর আপনি…?”
এতোটুকু বলার আগেই ফারিস কথা কেটে নিল।
সে হালকা নিঃশ্বাস ছাড়লো।
চোখের দৃষ্টি নিচের দিকে নামিয়ে বলল—
“হুম… ওইদিন আমি ভার্সিটি শেষ করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো।”
সে থামল এক সেকেন্ড। তারপর বলল—
“স্ক্রিনে দেখলাম—ছোট আম্মু।”
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একটু রাগ, একটু হাসি মেশানো কণ্ঠ—
“এই ফারিস, তুই নাকি এখানে নেই?
তোর ওই ছোট ছায়াটা শাড়ি পড়ার জন্য
কান্নাকাটি শুরু করেছে!”
ফারিস হেসে ফেলেছিল সেদিন।
বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলেছিল—

“আমার ছোট বোন আবার নতুন নাটক শুরু করেছে।”
বন্ধুরা তখন হাসাহাসি করেছিল।
কেউ বলেছিল—
“যা, গিয়ে সামলিয়ে আয়। নইলে কান্নায় বাড়ি ভাসাবে!”
ফারিস সেদিন না বুঝেই বাড়ি ফিরেছিল।
ভাবেনি—এই ছোট্ট জেদী মেয়েটা
একদিন তার স্মৃতির এত গভীরে জায়গা করে নেবে। সে নিশিতার দিকে তাকাল।
চোখে তখন আর হাসি নেই, আছে শুধু স্মৃতি।
নিশিতা চুপ করে শুনছিল। তার নিজের বুকের ভেতরেও অদ্ভুত একটা অনুভূতি জমে উঠছিল।
সে বুঝতে পারছিল— সেই ছোট্ট ঘটনাগুলোই ধীরে ধীরে আজকের এই নীরব, জটিল মুহূর্তগুলোর জন্ম দিয়েছে। ঘরজুড়ে নীরবতা নেমে এলো।

শুধু অতীতের শব্দগুলোই যেন চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
ফারিস কথা শেষ করতেই নিশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তার চোখ দুটো যেন আর এই ঘরে নেই—সাত বছর আগের সেই বিকেলে আটকে গেছে। ফারিস আবার বলতে শুরু করলো—
“আমি তখন ফোন কেটে রিকশা ধরে সোজা
বাড়ির দিকে রওনা দেই।
মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—
এই মেয়েটা আবার কী কাণ্ড করলো!”
রিকশা বাড়ির গলিতে ঢুকতেই দূর থেকেই কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। একটানা, জেদের, শিশুসুলভ কান্না। ফারিস নামতেই ছোট আম্মু দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন—

“এই নে, তোর রাজকন্যা সামলাও।”
ফারিস ঘরে ঢুকতেই দেখে—
নিশিতা মেঝেতে বসে আছে। চোখ দুটো লাল।
নাক টানছে। এক হাতে শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে ধরে আছে, আরেক হাতে চোখ মুছছে।
ফারিস তখন একটু ধমকের সুরে বলেছিল—
“এইটা কী শুরু করেছিস?”
নিশিতা তখন মাথা তুলে তাকিয়েছিল।
ওই ভেজা চোখে কোনো ভয় ছিলো না— ছিলো শুধু অভিমান আর জেদ।
“আমি শাড়ি পড়বো,”

খুব শক্ত গলায় বলেছিলি তুই। ফারিস বিরক্ত হয়ে বলেছিল—
“এত ছোট মেয়ে শাড়ি পড়ে কী করবি?”
নিশিতা তখন ঠোঁট কাঁপিয়ে বলেছিল—
“আমি বড়দের মতো দেখতে চাই।”
এই কথাটায় ফারিস এক মুহূর্ত থমকে গিয়েছিল।
তারপর হালকা হেসে বসে পড়েছিল তোর সামনে।
“আচ্ছা,”

সে শান্ত গলায় বলেছিল,
“কান্না বন্ধ কর। দেখি কী করা যায়।”
ছোট আম্মু তখন অবাক।
“এই ফারিস, মাথা খারাপ হলো নাকি?এত ছোট মেয়ে—”
ফারিস হাত তুলে থামিয়ে দিয়েছিল।
“একদিন না হয় ইচ্ছে পূরণ হোক।”
নিশিতার চোখ তখন হঠাৎ জ্বলে উঠেছিল।
কান্না থেমে গিয়েছিল মুহূর্তেই।
এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলি—
“সত্যি?”
ফারিস হেসে বলেছিল—
“হ্যাঁ, কিন্তু চুপচাপ থাকতে হবে।”

সেদিন ছোট আম্মুর পুরনো একটা হালকা রঙের শাড়ি বের করা হয়েছিল। শাড়িটা তোর গায়ে ঠিকমতো বসছিল না। কোথাও ভাঁজ বেশি, কোথাও কম। তুই বারবার নড়াচড়া করছিলি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে
হঠাৎ তুই হেসে উঠেছিলি। ওই হাসিটা— ফারিস আজও ভুলতে পারেনি।
একেবারে নিষ্পাপ, খাঁটি আনন্দের হাসি।
তুই আয়নার সামনে ঘুরে বলেছিলি—
“ভাইয়া, আমি কেমন?”
ফারিস তখন একটু অস্বস্তি নিয়ে বলেছিল—
“ভালোই তো।”
ছোট আম্মু হেসে বলেছিলেন—

“এই মেয়ে একদিন বড় ঝামেলা হবে।”
সেদিন কেউ বুঝতে পারেনি—
এই ছোট্ট শাড়ি পরা মেয়েটাই একদিন স্মৃতির সবচেয়ে গভীর জায়গায় বসে যাবে।
ফারিস কথা থামাল। ঘরে আবার নীরবতা।
নিশিতা ধীরে ধীরে চোখ তুললো। তার কণ্ঠটা এবার আর হালকা নয়।
“আমি সেদিন খুব খুশি ছিলাম,”
সে বলল,

“কারণ আপনি আমার জেদটা ভেঙে দেননি।”
ফারিস তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
বলল না কিছু। নিশিতা ফিসফিস করে যোগ করলো—
“কিন্তু তখন আমি বুঝিনি…সব জেদ পূরণ হওয়াই সবসময় ভালো না।”
এই কথাটার পর দুজনের মাঝখানে একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।

“তোর কথা ভাবলেই ভালো লাগতো আমার…”
ফারিস কথাটা বলেই থেমে গেলো। কণ্ঠটা ভারী হয়ে এলো, যেন প্রতিটা শব্দ বুক চিরে বেরোচ্ছে।
“নিজের কাছে রাখলেই শান্তি পেতাম আমি।
দিন শেষে যখন সবকিছু এলোমেলো লাগতো,
তখন শুধু তোর মুখটা মনে করলেই মনে হতো—সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নিশিতা নড়লো না। শুধু চোখ নামিয়ে শুনছিল।
“কিন্তু জানিস…”
ফারিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল,

“আমি জানতাম এই বাড়ির কেউ কোনোদিন মেনে নেবে না আমার এই অবসেশন, আমার এই ভালোবাসা।”
সে একটু তিক্ত হেসে বলল—
“এই বাড়িতে ভালোবাসার আগে বয়স দেখা হয়, সম্পর্ক দেখা হয়, সমাজ দেখা হয়।” “সেদিন থেকেই তোকে দূরে দূরে রাখতাম। নিজের কাছে আসতে দিতাম না।
তুই কাছে আসলেই অকারণে রেগে যেতাম,
কথা কাটাকাটি করতাম—

শুধু এই জন্য যে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি।”
ফারিসের চোখ দুটো তখন লাল। কিন্তু চোখের জল নামছিল না।
“নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
নিজেকে বোঝাতাম— এইটাই ঠিক, এইটাই দরকার।”
একটু থেমে সে বলল—

“কিন্তু সব কিছুর মাঝেই তুই আমার জীবনের
অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রইলি। চাইলেও তোকে মাথা থেকে বের করতে পারিনি।”
নিশিতা তখন নিঃশব্দে আঙুল দুটো শক্ত করে ধরলো।
“তোর জন্য পড়াশোনায়ও মন দিতে পারতাম না আমি। বই খুললেই তোর মুখটা ভেসে উঠতো।
লেকচার শুনতে বসলে তোর হাসিটা কানে বাজতো।”
ফারিস মাথা নিচু করে বলল—
“তারপর একদিন ভাবলাম… ভালো যখন বেসেই ফেলেছি, তখন আর তোকে দূরে রেখে নিজেকে শাস্তি দেওয়ার কোনো মানে নেই।”
সে নিশিতার দিকে তাকাল। এইবার চোখে আর দ্বিধা নেই—শুধু স্বীকারোক্তি।
“ভাবলাম, তোর ১৮ বছর বয়স হলেই তোকে বিয়ে করে নেবো। নিজের করে রাখবো।
আইনের বাইরে না গিয়ে, সমাজের চোখে অপরাধী না হয়ে—
শুধু তোর মানুষ হয়ে।”

নিশিতার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিলো।
“আর তাই আমি নিজের স্বপ্নকে কবর দিলাম,”
ফারিস শান্ত গলায় বলল, যেন অনেক আগেই মেনে নিয়েছে।
“তুই তো জানিস, আমি হতে চেয়েছিলাম প্রফেসর।
জীবনটা বই, ক্লাসরুম, আর ছাত্রদের মাঝে কাটাতে চেয়েছিলাম।”
একটু থেমে তিক্ত হাসি—
“কিন্তু তোকে পাওয়ার নেশায় সেই স্বপ্নটা আমি নিজেই মাটিচাপা দিলাম।”“তখন থেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করলাম— টাকা রোজগার করতেই হবে। অনেক টাকা।”
ফারিসের কণ্ঠ শক্ত হলো।
“আমি জানি ছোট আব্বু কখনো টাকা দেখেই আমার সাথে তোর বিয়ে দেবে না। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম— একটা সময় আসবে,
যখন তার মনে হবে তার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না।”
সে ধীরে বলল—

“আর তখন যদি আমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকি—
একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ হয়ে,
হয়তো সে একবার ভাববে।” “এই ভেবেই আমি বিজনেসে যোগ দিলাম।”
ফারিস চুপ করলো। ঘরটা ভারী হয়ে উঠলো।
নিশিতার বুকের ভেতর তখন একসাথে
ভালোবাসা, ভয়, আর অপরাধবোধ জমে আছে।
সে ধীরে মাথা তুললো। কণ্ঠ কাঁপছিল।

ভালোই চলছিল সব কিছু…
নিয়মের মতো দিন কেটে যাচ্ছিল।
তোর হাসি, তোর রাগ, তোর ছোট ছোট অভিমান—সবকিছুতেই আমার জীবন ভরপুর ছিল।
ঠিক তখনই আমার কাছে সুযোগ আসলো।
আমেরিকায় NS গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির অফিস ওপেনিং। একটা বড় সুযোগ—জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। আমি জানতাম, এই সুযোগটা একবারই আসে।
হাতছাড়া করলে আর কখনো ফিরেও তাকাবে না। আমি সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার সময় আমি
জানতাম— এই সুযোগের মূল্য দিতে হবে তোকে রেখে। তাই আমি চলে গেলাম। তিন বছরের জন্য।
আমেরিকায়। তোকে রেখে।

বিশ্বাস কর, ওখানে গিয়ে একটা দিনও এমন যায়নি— যেদিন তোর কথা মনে পড়েনি। নিউইয়র্কের উঁচু উঁচু বিল্ডিং,রাতভর আলোয় ঝলমলে শহর—
সবকিছুর মাঝেও আমার চোখে ভাসতো শুধু তুই।
কখনো মনে হতো— এই মুহূর্তেই সব ছেড়ে ছুটে আসি। তোর সামনে দাঁড়িয়ে বলি—
“আমি আর পারছি না, নিশি।”
কিন্তু ঠিক পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিতাম।
ভাবতাম— আমি যা করছি, এসব কিছু তো শেষমেশ তোর জন্যই। তোর নিরাপত্তার জন্য।
তোর ভবিষ্যতের জন্য। তোর স্বপ্নের জন্য।
আমেরিকায় থাকা অবস্থাতেই আমি নিহানকে দিয়ে এই বাড়ির কাজ শুরু করি।
প্রতিটা ইট, প্রতিটা দেয়াল—সবকিছুতে তোর পছন্দ জড়ানো। এই বাড়িটা কোনো সাধারণ বাড়ি না, নিশি। এটা তোর স্বপ্নের বাড়ি।

আমি চেয়েছিলাম—
এখানে ঢুকলেই তুই নিজের মতো করে নিশ্বাস নিতে পারবি। যেখানে প্রতিটা কোণ শুধু তোর জন্য।
তিন বছরের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে গেলো।
একদম যেমনটা আমি চেয়েছিলাম—
যেমনটা তোর প্রাপ্য। তারপর আমি দেশে ফিরলাম। দেশে ফিরে সবার আগে আমি কারো কাছে যাইনি।
চৌধুরী বাড়িতেও না। আমি সোজা চলে এসেছিলাম এখানে। এই বাড়িতে। দেখতে—সব কিছু ঠিক আছে কি না।
তোর স্বপ্নের কোনো জায়গায় যেন একটুও খুঁত না থাকে। সব ঠিক দেখে… তবেই আমি চৌধুরী বাড়িতে গেলাম। আর সেখানে গিয়ে—

তিন বছর পর তোকে দেখলাম। বিশ্বাস কর, নিশি…
ওই এক মুহূর্তে আমার দেহে যেন প্রাণ ফিরে এসেছিল। তোর মুখটা দেখেই মনে হয়েছিল—
এই তিন বছর আমি আসলে বেঁচেই ছিলাম না।
এক মুহূর্তের জন্য তোকে দেখে তিন বছর না দেখে থাকার তৃষ্ণা কিছুটা হলেও মিটে গিয়েছিল।
কিন্তু আমি চাইনি— আমার ফিরে আসাটা তোর পড়াশোনার ওপর কোনো প্রভাব ফেলুক।
আমি চাইনি— তুই বিভ্রান্ত হোস।
তাই তোকে চাইলেও কাছে রাখতে পারিনি।

নিজের ইচ্ছেতেই তোকে দূরে রেখেছি। গম্ভীর থেকেছি। রুক্ষ থেকেছি। নিজেকে এমনভাবে বানিয়েছি— যেন তুই আমাকে ভয় পাস, ভালো না বাসিস।কারণ আমি জানতাম—
আমি যদি একটুও নরম হই, তুই আর আমি—কেউই সামলাতে পারবো না। আমার আসার কিছুদিন পরই… তুই আমাকে প্রোপজ করলি।
সেই দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন ছিল, নিশি।কারণ তোর মুখে ভালোবাসার কথা শুনে আমি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিলাম—আর বাইরে থেকে আমাকে শক্ত থাকতে হয়েছিল।আমি তোকে না বলতে বাধ্য হয়েছিলাম
ভালোবেসে।

বিশ্বাস কর নিশি… ওই দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত দিন ছিল। একদিকে আমি আকাশ ছুঁই ছুঁই খুশি ছিলাম— এই জেনে যে তুইও আমাকে ভালোবাসিস। যে অনুভূতিটা আমি সাত বছর বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলাম, আজ সেটার প্রতিধ্বনি তোর মুখে শুনেছি। কিন্তু একই সাথে আমি ভেঙেও পড়েছিলাম। কারণ সময়টা তখনও হয়নি তোকে আপন করে নেওয়ার।
তুই তখনও অনেক ছোট। তোর সামনে তখন পুরো একটা জীবন পড়ে ছিল— পড়াশোনা, স্বপ্ন, নিজের একটা পরিচয়। আর আমি শুনেছিলাম—
আমি দেশে ফেরার পর নাকি তুই পড়াশোনায় ঠিক মন বসাতে পারছিলি না। এই খবরটা আমাকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, নিশি।
আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
ভয় পেয়েছিলাম—

আমার উপস্থিতি তোর ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছে কি না। সেই ভয় থেকেই… তোকে নিজের থেকে দূরে রাখার জন্যই ওই দিন আমি তোকে মেরেছিলাম।
বিশ্বাস কর, হাত তুলেছিলাম— কিন্তু হৃদয়টা ওখানেই রক্তাক্ত হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম—
এভাবে কষ্ট দিলে তুই আমাকে এড়িয়ে চলবি।
আর ঠিক সেটাই হলো।
তুই আমার থেকে দূরে দূরে চলা শুরু করলি।
আমাকে এড়িয়ে যেতি। চোখে চোখ রাখতিস না।
সবাই ভাবতো— ফারিস তো সেটাই চেয়েছিল।
কিন্তু কেউ জানতো না— আমি ভিতরে ভিতরে কতটা ভেঙে পড়ছিলাম। তুই যখন আমাকে ইগনোর করতিস— আমার অস্তিত্বটাই যেন প্রশ্নের মুখে পড়ে যেত।
আমি ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী—

এই পরিচয়টা তখন অর্থহীন মনে হতো।
এভাবেই দিনের পর দিন কেটে গেলো।
আমি আগে থেকেই জানতাম— নাভিদ তোকে ভালোবাসে। আমি জানতাম, নিশি। সব জানতাম।
কিন্তু জানাটা আর নিজের চোখে দেখা—
এই দুইটার যন্ত্রণা এক না। ওই দিন… তোদের দুজনকে একসাথে দেখে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।
রাগ মাথায় উঠে গিয়েছিল। ভেতরের সাত বছরের সংযম এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল।
রাগের মাথায় তোকে ওই দিন এতো গুলো কঠিন কথা শুনিয়েছিলাম।
একবারও ভাবিনি— প্রতিটা শব্দ তোর হৃদয়ে ছুরি হয়ে ঢুকছে।তুই জানিস নিশি—
এই সব কিছুর মাঝেই আমার সাত বছরের ভালোবাসাটা চোখের আড়ালেই থেকে গেলো।
কখনো প্রকাশ পেলো না। কখনো তুই দেখতে পেলি না আমি কতটা ভালোবাসি তোকে।
তুই শুধু দেখলি—

আমার রাগ। আমার অভিমান। আমার গম্ভীর মুখ।
কিন্তু দেখলি না— রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটানো এক মানুষকে। দেখলি না—
নিজেকে দোষ দিয়ে নিজেকেই শাস্তি দেওয়া একজনকে। ফারিসের কণ্ঠে তখন স্পষ্ট অভিমানের সুর। চোখের দৃষ্টি শক্ত হলেও
ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে পড়েছে।
একটু থেমে সে আবার বলল—
—আজ তোকে সব কিছু প্রকাশ করলাম নিশি।
একদম সব। —বিশ্বাস কর,
এই গম্ভীর… বদমেজাজি ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরীও
ভালোবাসতে জানে। আর পাগলের মতো ভালোবাসে তোকে।
—কেনো বাসি? কি কারণে বাসি?

তোর মধ্যে কি আছে—এগুলো আমি নিজেও জানি না। শুধু জানি— তুই আমার।আর আমারই থাকবি।
শুধু আর শুধু ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী। আজ আমি তোকে সবটা বললাম নিশি। আজ আমার আর কিছু লুকানো নেই। আজ আমি তোর কাছে পানির মতো স্বচ্ছ। এই রহস্যময় মানুষটা আজ তোর সামনে নিজের সব দেয়াল ভেঙে দিলো।একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে
শেষ কথাটা বলল—
—এবার খুশি তো তুই…
বউ?
নিশিতা একধ্যানে ফারিসের কথাগুলো শুনে গেলো। একটা শব্দও সে মিস করেনি। সব কথা শেষ হতেই সে যেন বরফের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। না কাঁদছে। না হাসছে। শুধু দাঁড়িয়ে আছে—
ভাঙা আর গড়া অনুভূতির মাঝখানে। কারণ কিছু কথা এমন হয়, নিশি— যেগুলো শুনে মানুষ কাঁদে না। বরং স্তব্ধ হয়ে যায়।

নিশিতা মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের করতে পারলো না। চেষ্টা করেও শব্দ বের হলো না।
কথা বলে কিছু প্রকাশ করতে পারছে না—কারণ তার ভেতর এক অজানা জটিল অনুভূতি ঘুমিয়ে আছে, যা এখন হঠাৎ করে জেগে উঠেছে।
তার চোখ বড় হয়ে গেলো, চুলকানি কণ্ঠে কেঁপে ওঠলো।
দেখে সে নিজেই অবাক—এই লোকটা তাকে এতোটা ভালোবাসে। কিন্তু শুধু দুই বছর নয়, শুধু এক মুহূর্ত নয়। সাত সাত বছর। সাত বছর ধরে সে নিশিতাকে ভালোবেসেছে—নিশিতার জন্য নিজের সবকিছু লুকিয়ে রেখেছে, নিজের সুখ, নিজের চাহিদা, নিজের অনুভূতি—সবই লুকিয়ে রেখে শুধু নিশিতার জন্য জ্বলে গেছে।
নিশিতা নিজের মনে কেঁদে উঠতে চাইল, কিন্তু চোখের জলকেও ঠেকালো। কতোটা কষ্ট সে নিজের ভালোবাসা ফারিসকে জানাতে পারে নাই।

আর এতদিন ধরে ফারিসও তাকে ভালোবেসে চুপচাপ ছিল। এই দুইজনের মধ্যে যে দীর্ঘ বেদনাময় দূরত্ব, তা এখন শুধু হৃদয়ের ভেতর অনুভূত হচ্ছে। নিশিতা ভেবেছিলো—ফারিস তার জন্য কীভাবে সহ্য করেছিল। ফারিসের কষ্টটা কতোটা ভয়ংকর ছিল, তা ভাবতেই নিশিতার বুক ভেঙে গেল। সেই সাত বছরের একাকীত্ব, নিঃশব্দ ভালোবাসা, আত্মত্যাগ—সব তার চোখের সামনে ফুটে উঠলো। তার বুক ভারী হয়ে এলো, চোখে জল জমলো। দম ফুরিয়ে আসছে।

চোখ বন্ধ করে নিশিতা নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু আর সম্ভব হলো না।
এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে, না ভেবে, ফারিসের দিকে ছুটে গেলো নিশিতা। নির্ভিক হয়ে, তার সমস্ত আবেগ, সমস্ত বেদনাকে নিয়ে ফারিসকে শক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরলো। ফারিসও অপেক্ষা করলো না।
তার শক্ত বাহুতে নিশিতাকে আঁকড়ে ধরে রাখলো।
দুজনের হৃদয় এখন এক হয়ে গেছে—নিঃশব্দে, কিন্তু ভয়ংকর গভীরভাবে। ফারিস অনুভব করলো—নিশিতার স্পর্শে তার সমস্ত সাত বছরের কষ্ট, সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত ভালোবাসা এক মুহূর্তে ক্ষরণ হয়ে যাচ্ছে। আর নিশিতা বুঝলো—ফারিসের সেই দীর্ঘ সময়ের প্রেম ও ত্যাগকে এক মুহূর্তের জন্যও হালকাভাবে নেওয়া যায় না। দুজন একে অপরের সান্নিধ্যে দাঁড়িয়ে রইলো, শব্দহীন, নিঃশ্বাসহীন,
একটি গভীর, অন্তহীন আবেগের মধ্যে।
ফারিস শান্ত গলায় বলল, কিন্তু কণ্ঠে প্রেম আর হালকা বিরক্তি ছিল—
—ধুর, পাগলি মেয়ে…! কান্না করছিস কেনো?
আমি তোকে বলেছি—কান্না করবি না।
নিশিতা কাঁদতে কাঁদতে চুপচাপ ফারিসের বুকের সঙ্গে লেগে রইলো। ফারিস আবারও তার কণ্ঠকে আরও কোমল করলো—

— “তোকে ভালোবাসার কোনো ব্যাখ্যা নেই, মাই লিটল হার্টবিট। শুধু জানি, মন থেকে ভালোবাসি…
আর তোকেই ভালোবেসে যাবো আজীবন।
এই বলে ফারিস নিশিতাকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।নিশিতার ঠোঁটের মাঝে কিছু কথা চুপচাপ হয়ে গেলো, তারপর ফারিসের বুকে মাথা রেখে বলে উঠে —
“হাজারো কল্পনার ভিড়ে…আমার সকল অনুভূতি শুধু আপনাকে ঘিরে, ফারিস ভাই।”
ফারিসের বুকের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে নিশিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল—
—খুব ভালোবাসি আপনাকে, ফারিস ভাই।
খুব ভালোবাসি…কখনো আপনাকে ছেড়ে যাবো না।
আর কখনো কষ্ট পেতে দিব না।”
ফারিস অল্প হেসে নিশিতার গালে হাত বুলিয়ে চোখের পানি মুছে দিলো। কপালে নরম চুমু দিলো।
তার চোখে উষ্ণতা, কোমলতা আর প্রেমের গভীরতা সব ফুটে উঠল।

— “কান্না করে না, বউ।” আমি তোকে কি আদর কম করি যে এমন কান্না করছিস? তুই বললে, এখানেও আদর করতে পারি।
নিশিতা ফারিসের কথা শুনে হেসে ফেলল।
চোখের পানি আর কান্না মিলিয়ে মিশে গেলো হাসির আলোতে। ফারিস আবার নিশিতার গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে বলল—
—একটু আদর করি, বউ পাখি?
আমার না, খুব আদর আদর পাচ্ছে…
নিশিতা তার সমস্ত কষ্ট, সমস্ত প্রতীক্ষা, সমস্ত ভালোবাসা একসাথে ফারিসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো।
এই মুহূর্তে তারা শুধু দুজন।

নিশিতার গলায় অসংখ্য চুমু দিতে দিতে ফারিস তার সমস্ত আবেগ প্রকাশ করছিল।
প্রতিটি চুমু, প্রতিটি স্পর্শ—সবই ছিল তার দীর্ঘ সাত বছরের ভালোবাসার ঘ্রাণ। নিশিতাও আর অধৈর্য ধরে রাখতে পারলো না। চোখে চোখ রেখে, নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে, সে নিজের আবেগ ফারিসের কাছে খুলে দিলো। ফারিস আর অপেক্ষা করলো না।
নিশিতাকে কোমলভাবে কোলে নিয়ে রুমের দিকে এগোলো। বাইরে তখন ঝড়ের আর্তনাদ।
বাতাস জোরে বইছে, বারান্দার ঝোপঝাড়ে লতাগুলোর দোলনায় তাল মিলাচ্ছে।
প্রকৃতিই যেন এই মুহূর্তের সাক্ষী।
ঘরের চার দেয়াল, জানালার কাঁচ—সবই তাদের আবেগের সঙ্গে কম্পমান। রাত যত গভীর হলো, ফারিস নিশিতাকে আদরে ভরাতে থাকলো।

শরীরের প্রতিটি স্পর্শে ছিল শীতলতার আর উত্তাপের এক অদ্ভুত মিলন। কিন্তু শুধু শারীরিক নয়—দুটি মন, দুটি হৃদয়, দুটি আত্মা একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল।
ফারিস নিশিতার চোখে তাকিয়ে বলছিল—কথা না বলেও সব বোঝা যায়। নিশিতার স্নিগ্ধ হাসি, চোখের জল, বুকের ধক ধক—সবই ফারিসের দীর্ঘ সাত বছরের প্রার্থনার প্রতিফলন। ঘড়ির কাঁটা যখন রাতের শেষ প্রহরে পৌছালো, তখন ফারিস নিশিতাকে ধীরে ছাড়লো। কোনো ঝঞ্ঝা নেই, কোনো শব্দ নেই—শুধু নিস্তব্ধতা আর শান্তি।
প্রকৃতি, বাতাস, ঘরের চার দেয়াল—সবই তাদের আবেগের সাক্ষী। ফারিস ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিশিতার বুকে মাথা রেখেছিল।
নিশিতাও তার হাত জড়িয়ে ধরে শান্তির নিঃশ্বাস নিতে লাগলো। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু হৃদয় অম্লান।
শুধু এই মুহূর্তটাই তাদের, কেবল এই মুহূর্তেই তারা সম্পূর্ণ। রাতের অন্ধকার, ঝড়ের আওয়াজ, ঘরের শান্ত নিস্তব্ধতা

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩২

—সব মিলিয়ে একটি মহিমান্বিত রাত তৈরি হলো। সাত বছরের অপেক্ষা, সাত বছরের ভালোবাসা, এবং সমস্ত আবেগ—সব মিলিয়ে তারা একে অপরের মধ্যে মিলিত হলো।
ফারিস নিশিতার বুকের সঙ্গে মাথা রেখে গভীর নিদ্রায় নেমে গেল।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৪