Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪১

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪১

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪১
জান্নাতি আক্তার জারা

শীত টা বেশিই নেমে গেছে, তাকবীর বিছানায় বসে অফিসের ফাইলগুলো দেখছে, আর বারংবার ফোনে টাইম দেখছে, আরাত নিচে গেছে প্রায় পনেরো মিনিট হবে কফি বানাতে কিন্তু এখনো কফি নিয়ে আসছে না। বিয়ের চাপে দুদিন অফিসে না যাওয়ার কারণে আদিল অফিসের কিছু ফাইল বাড়িতে দিয়ে গেছে। তাকবীর ফাইল গুলো চেক করছিলো,আরাত কে আসতে না দেখে তাকবীর নিজেই ফাইল গুলো বন্ধ করে গুছিয়ে রেখে নিচে নেমে এলো। বাড়ির সবাই কে একসঙ্গে ড্রয়িং রুমে সোফাতে বসে আড্ডা দিতে দেখে তাকবীর আরাতের দিকে তাকালো,

তাকবীর আরাত কে নিজের হাতে কফি বানাতে বললে আরাত কফি বানাতে নিচে চলে আসে, নিচে এসে দেখতে পায় বাড়ির বড় থেকে ছোট এমনকি রশ্মি রাহিমা সুলতানা পর্যন্ত একখানে বসে আড্ডা দিচ্ছে, তাঁদের আড্ডার কিন্দ্রবিন্দ্র হলো রশ্মির কলেজ নিয়ে, রাহিমা সুলতানা আরাত আইরা হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাদবাকি সবাই জানে রশ্মি, একা একা সবাইকে ছাড়া দূর দেশে থাকতে না পারায় জেদ ধরে দেশে ফিরে এসেছে, এজন্য রশ্মি কে আরাতের কলেজে ভর্তি হতে বলছে, আরাত এসব আলোচনা শুনতে পেয়ে কফির কথা ভুলে গিয়ে সবার সঙ্গে আড্ডা দিতে বসে গেছে। তাকবীর আরাতের দিকে একনজর তাকিয়ে পুনরায় কিচেন রুমে চলে গেলো কফি বানাতে, আইরা তাকবীর কে কিচেন রুমের দিকে যেতে দেখে আরাত কে ইশারায় দেখিয়ে দিলো,আরাত সেদিকে তাকিয়ে দ্রুত বসা থেকে কিচেন রুমের দিকে যেতে লাগলো, আরাত কে এভাবে হটাৎ যেতে দেখে সবার মনোযোগ আরাতের যাওয়ার দিকে পরলো, পুনরায় তাকবীর কে কিচেন রুমে দেখতে পেয়ে সবাই আগের ন্যায় আড্ডায় মগ্ন হয়ে গেলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

___” সরি সরি আমার একদম মনে ছিলো না ।
তাকবীর একনজর আরাত কে দেখে নিয়ে কাপে গরম পানি ঢালতে ঢালতে আরাতের কথায় উওর করলো,
___”তোমার বর আছে এটাও তো মনে নেই।
আরাত ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, বুঝতে পারলো না তাকবীর কী আরাতের উপর রাগ করছে এখানে রাগ করার মতো কী আছে। আরাতের কফির কথা মনে ছিলো না বিধায় আড্ডা দিচ্ছিল, আরাত কী বলবে ভেবে পেলো না, তাকবীরের পাশে দাঁড়িয়ে তাকবিরের কফি বানানো দেখতে লাগলো, আরাত কে নিজের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকবীর নিজে থেকে বলে উঠলো,

___” কফি লাগবে?
আরাত সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে না বলল, তাকবীর পুনরায় বলল,
___” অ্যাটলীস্ট বরের মন রাখতে হ্যাঁ বলতে পারতে!
আরাত যেন বিপদে পড়ে গেলো,
___” আচ্ছা ঠিক আছে, বানিয়ে দেন!
___” প্রয়োজন নেই চোখে ঘুম ধরা দিবে না, কাম।
তাকবীর কফি নিয়ে নিজের রুমে যেতে লাগলো, আরাত বোকা বুনে দাঁড়িয়ে রইলো, তাকবীর আসলে চাইছে কী বুঝলো না আরাত, মনে মনে কয়েকটা গালিও দিল, তাকবীর আরাত কে নিজের সঙ্গে আসতে না দেখে পিছনে ফিরে আরাত কে আগের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গম্ভীর গলায় ডেকে উঠলো,

___”কাম অন রাত?
তাকবীরের ডাকে আরাত তাকবীরের পিছনে পিছনে যেতে লাগলো, ড্রয়িং রুমের সবাই একনজর দু’জন কে দেখলো,তাকবীর নিজের মনে সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো আরাত সবাই কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বেশ লজ্জা পেলো, বড়দের সামনে এভাবে তাকবীরের পিছনে পিছনে যাওয়াতে, আরাত কে লজ্জা পেতে দেখে সবাই প্রকাশ না করে মিটিমিটি হাসলেন, তাকবীর রুমে এসে সোজা বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো, চোখ তাঁর সামনে হালকা আলোয় অন্ধকার গার্ডেনে, আরাত রুমে ঢুকে তাকবীর কে দেখতে না পেয়ে বেলকনিতে উঁকি দিলো, তাকবীর কে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুমের মধ্যেই হাঁটাহাটি করলো,কিন্তু না শান্তি লাগছে না কোথাও একটা মিসিং মিসিং লাগছে, পুনরায় বিছানার কম্বল মেলে দিতে লাগলো, মনের মধ্যে তাকবীর কে নিয়ে ভাবনা গুলো কিলবিল করছে, শীতের রাতে কুয়াশার মধ্যে কোন প্রানীটা খোলা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে আরাত বুঝলো না, বিছানায় কম্বল বিছিয়ে দিয়ে আরাত গুটিগুটি পায়ে বেলকনিতে এসে আরাতের পাশে দাঁড়ালো,

___” কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে কেনো, অসুস্থ হয়ে যাবেন তো?
আরাত কে নিজের পাশে একদম আশা করে নি তাকবীর, তাকবীরের জানা মতো তাকবীর নিজে থেকে আরাত কে যতটুকু প্রশ্ন করছে বা কথা বলছে আরাত শুধু ততটুকুই রিপ্লাই করছে, আরাত কে নিজে থেকে কথা বলতে দেখে তাকবীরের মনে ভালো লাগা ছুয়ে গেলো, আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে আছে, তাকবীর আরাত কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে, সামনে গার্ডেনে চোখ রাখলো, কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নীরবতা ভেঙ্গে গম্ভীর হয়ে আরাত কে বলল,

___” এত ফাস্ট নিজেকে চেঞ্জ করছো যে?
আরাত অবাক চোখে জানতে চাইলো,
___” কই নিজেকে চেঞ্জ করলাম?
তাকবীর এক হাত পকেটে গুঁজে, আরেক হাতে কফিতে চুমুক বসাতে বাসাতে বলল,
___” নাথিং।
আরাত তাকবীরের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো, না কিছুই বুঝলো না তাকবীর তো সবসময় এমন গম্ভীর থাকে তারপরও আরাতের মনে হতে লাগলো তাঁর বীর ভাইয়ার মন খারাপ, কিছুক্ষণ চেয়ে থেকেই মনের খচখচানি দূর করতে বলেই উঠলো,
___” আপনার কী মন খারাপ?
তাকবীর আরাতের দিকে তাকালো, ঠোঁটের কোনে এক টুকরো হাসি এনে আরাতের কপালে হাত দিয়ে টুকা দিতে দিতে বলল,

___” পাগল একটা,রুমে চলো।
তাকবীর রুমে চলে গেলো আরাত বুঝতে পারলো না তাকবীর এমন বিহেভিয়ার করে কেনো, আরাত যত তাকবীর কে বুঝতে চাইছে তাকবীর আরাতের ভাবনার উপধে গিয়ে ততই ভিন্ন ভিন্ন রুপ নিয়ে হাজির হচ্ছে, আরাত নিজের ভাবনা থেকে বের হয়ে রুমে চলে এলো, কিন্তু তাকবীর রুমে নেই আরাতের এবার বেশ রাগ উঠে এলো, রাগের মাথায় বিছানায় কম্বলের নিচে শুয়ে থেকে মনে মনে বকাবকি করতে লাগলো, এটা কী মানুষ এত হুটহাট কই হারিয়ে যায় যতসব, বিয়ে হয়েছে দেখে মেনে নিয়েছি নয়তো তোর মতো বেডা রে আমি কী যে করতাম, একমনে কথাগুলো ভাবলেও আরেকমনে ভাবতে লাগলো, আসলেও কী কিছু করতে পারতাম, উঁহু একদম না বেডা যে গম্ভীর সামনে আসতেই তো ভয় করে এই বুঝি ধমক দিবে, এ্যাহ ধমক দিলেও আমিও কমে ছেড়ে দিবো নাকি, আমি এখন ওনার বউ সো আমার সঙ্গে ধমকে কথা বলা যাবে না।

আরাত একা একা হাজারো অযৌক্তিক কথা গুলো ভাবছে মনে মনে,তাঁর ভাবনার মধ্যেই তাকবীর এক হাতে পানির গ্লাস অন্য হাতে ভাতের প্লেট নিয়ে এসে বেডসাইডের উপর রাখতে রাখতে গলা খাঁকারি দিলো, তাকবীরের গলা খাঁকারির আওয়াজে আরাত চোখ ছোট ছোট করে তাকালো তাকবীরের দিকে,
তাকবীর বিছানায় বিপরীত পাশে উঠে বসতে লাগলো
আরাত কাচুমাচু করছে, খাবার নিয়ে এসেছে তাও আবার এক প্লেট, আরাত উঠে যাবে, না থেকে যাবে বুঝতে পারছে না। ভাত দেখে তো খেতে ইচ্ছা করছে, তারপর রাতের খাবার এখনো খাওয়া হয়নাই, ক্ষুধার্ত পেটের সামনে কেউকে খাবার খেতে দেখলে তো পেট নাচানাচি করবেই, খাবার খেতে নিচে নামলে বীর ভাইয়া কী ভাববে ছি,
আরাত এসব নানান ভাবনায় মগ্ন, এখনকার মেয়েরা ভাত খেতে চায় না, হ্যাঁ খাবে জাস্ট হাঁপ প্লেট, আর আরাতের ভাত না হইলে চলবেই না, পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি, তাকবীর আরাতের ভাবনার মধ্যে বলে উঠলো,

___” শুয়া থেকে উঠে বসো।
আরাত বুঝলো না তাকবীরের কথা আগের ন্যায় শুয়ে থাকলো,তাকবীর এবার খানিকটা ধমকে উঠলো,
___” কী হলো উঠতে বলছি না?
তাকবীর আরাতের দিকে তাকাতেই আরাত দ্রুত উঠে বসলো,তাকবীর আরাতের শরীরে কম্বল ঠিকঠাক করে দিয়ে ভাতের প্লেট হাতে নিয়ে ভাত মাখতে লাগে, আরাত অবাকের সঙ্গে সঙ্গে বেশ বিরক্ত মুখে বসে দেখতে লাগলো, আরাত ভেবেছিল উঠে বসতে যেহেতু বলছে ভাতের প্লেটটা আরাতের জন্য হবে। কিন্তু না তাকবীর নিজেই ভাত মাখতে লাগলো, তাহলে আরাত কে উঠে বসার মানে কী, আরাত মন ভার করে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে থাকার মধ্যেই তাকবীর ভাত লোকমা করে আরাতের মুখের সামনে ধরলো,

___” হা করো?
আরাত অবিশ্বাস্য হয়ে তাকবীর কে দেখতে লাগলো, আরাত কে মুখ খুলতে না দেখে তাকবীর পুনরায় ধমকে বলল,
___” আরে বাবা হা করো?
সঙ্গে সঙ্গে আরাত মুখ খুলে ভাতের লোকমা মুখে পুড়ে নেয়,তাকবীর নিজের মনে পুনরায় ভাত মাখতে লাগলো, আরাত ভাত চিবোতে চিবোতে তাকবীর কে বলল,
___” বীর ভাইয়া একটা কথা বলল ?
তাকবীর পুনরায় আরাতের মুখে ভাতের লোকমা দিতে দিতে বলল,
___” ফ্যাস্টাফল আমি তোমার হাসবেন্ড, কোনো ভাইটাই না ওকে, সেকেন্ড আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য তেমাকে কেনো পারমিশন নিতে হবে না ।
আরাত মাথা ঝাঁকালো,পরমুহুর্তে পুনরায় বলল,
___” তাহলে আপনাকে কী বলে ডাকবো?
___”অনলি বীর।

আরাত প্রশ্ন করতে দেরি, তাকবীর উওর করতে দেরি করলো না, আরাত কিছু বললো না মুখ অন্ধকার করে ভাত চিবোতে লাগলো, তাকবীর আরাত কে পুনরায় ভাত মুখে দিতে ধরলে আরাত বাঁধা দেয়,
___” আর না পেট ভরে গেছে।
তাকবীর আরাতের দিকে আরচোখে তাকিয়ে পুনরায় বা হাতে পানির গ্লাস নিয়ে পানি খাওয়াতে লাগলো, আরাত তাকবীরের সঙ্গে আগের থেকে অনেকটা ফ্রি হয়ে গেছে, সবকিছু নরমাল ভাবে নিচ্ছে ভেবে তাকবীরের সবকিছু সহজ হয়ে যাচ্ছে। তাকবীর পুনরায় ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

___” কলেজ যাবে না?
আরাত পানি খাওয়া শেষ করে উওর করলো,
___” হুম।
___” কবে ?
___” আগামীকাল থেকে!
___” ওকে ঘুমাও এখন।

তাকবীর আরাতের এঁটো প্লেটের খাবার নিজে খেতে খেতে আরাত কে ঘুমাতে বলল,আরাতের এতকিছু হজম হচ্ছে না। তাকবীর আরাতের এঁটো খাবার খাচ্ছে, আবার তুলেও খাওয়াচ্ছে, আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কম্বল শরীরে জরিয়ে নিলো, তাকবীর নিজের খাবার শেষ করে প্লেট নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আরাত নিজের অজান্তেই কম্বল মুখের উপরে দিয়ে বলে উঠলো,
___”আমার আল্লাহর আমার নসিবে যাকে লেখেছে খুব সুন্দর খুব মায়াবী, থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাংক ইউ সো মাচ গট সবকিছুর জন্য।
আরাত নিজের অজান্তে আরো ভিন্ন ভিন্ন বকবক করতে লাগলো, তাকবীর রুমে এসে ভিতর থেকে দরজা লক করে দিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়ালো, আরাত তাকবীরের উপস্থিত বুঝতে পেয়ে চুপচাপ শান্ত হয়ে গেলো, তাকবীর আজকে আর নিজেদের মধ্যে দূরত্ব রাখলো না, রুমের লাইট অফ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে আরাত কে নিজের কাছে জরিয়ে নিয়ে শুয়ে পরলো, আরাত কিছুটা কেঁপে উঠলো এতে। আরাত কে কাঁপতে তাকবীর মুচকি হেঁসে আরাতের কানের কাছে মুখ রেখে বলে উঠলো,

___” এতটুকু ছুঁয়ে দিতেই পারি, যতদিন আমাকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারবে, ততদিন না হয় অপেক্ষা করলাম তোমার।
তাকবীরের কথায় আরাত কাঁপাকাঁপা গলায় ধীরে ধীরে বলে উঠলো,
___”আপনাকে পাবো বলেই হয়তো প্রথম প্রেমিক কে হারিয়েছি, অগোছালো মেয়েদের কপালে বুঝি যত্নশীল পুরুষ জুটে,ঠিক আপনার মতো?
আরাতের কথায় তাকবীর আগের ন্যায় বলে উঠলো,

___”দুজনের চাওয়াটা যখন এক হয় পাওয়াটাও তখন নিশ্চিত হয়ে যায়, আমি তোমাকে চেয়েছিলাম আর তুমি সত্যিকারের ভালোবাসা চেয়েছিলে।
তাকবীরের কথায় আরাত চট করে বলে উঠলো,
___” আপনি আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসেন?
তাকবীর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা থেক আরাতের এক হাতে নিজের হাত রেখে বলল,
___” সবকিছু বলে বুঝাতে হবে পাগল, ঘুমিয়ে পড়ো অনেক রাত হয়ে এসেছে, ফজরে উঠতে হবে।
আরাতের মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো, প্রথম ভালোবাসা হারানোর কষ্টগুলোর প্রভাব ফেলতে পারলো না। এত তাড়াতাড়ি মন থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, মানুষ বলে ভালোবাসা কে নাকি ভুলে যাওয়া যায় না। কিন্তু আরাতের বেলায় কেনো ভিন্ন, না-কি সঠিক মানুষের ভালোবাসা যত্নই প্রথম ভালোবাসা কে ভুলতে সক্ষম করছে। আরাত চোখ বন্ধ করে বলে উঠলো,

___” আপনি আমার অতীত জানার পরেও যেভাবে আমাকে আগলে রেখেছেন, আপনাকে ঠকানোর ক্ষমতা আমার নেই।
তাকবীর যেন মুচকি হেঁসে উঠলো,
___” আমাকে ঠকালে তুমিই ঠকে যাবে বউ।
আরাত কথা বললো না,চুপচাপ তাকবীরের কথার মানে খুঁজতে লাগলো, তাকবীর আরাত কে চুপচাপ থাকতে দেখে আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম সুরে বলল,
___” ঘুমিয়ে যাও, এতটুকু মাথায় চাপ নিতে হবে না। এই বয়সে অনেক পেঁকে গেছে, সবকিছু বাদ দিয়ে পড়াশোনায় ফোকাস করো।
তাকবীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়াতে আরাতের ঘুম ধরে গেলো, আজকে আর আরাতের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটনো না, খুব সহজেই শান্তির ঘুম চোখে ধরে দিয়ে গেলো। তাকবীর আরাতের কাঁপালে গারো করে চুমু রেখে দিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে বিরবির করলো,
___”তুমি এতটা মায়াবী কেনো রাত, তুমি যখন আমার কথা চুপচাপ মানো, তোমাকে অনেক কিউট লাগে, সারাজীবন এভাবেই থেকে যেও।

আজানের ধ্বনি কানে পরার সঙ্গে সঙ্গে তাকবির সজাগ হয়ে উঠে, নিজের খুব কাছে আরাত কে অনুভব করে তাকবীরের নিভু নিভু চোখমুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠে, তাকবীর বেশ কিছুক্ষণ থেকে আরাতের চোখমুখ পরক করছে, আরাত কিছুটা নড়াচড়া করে উঠতে তাকবীর আগের ন্যায় তাকিয়ে থেকেই বলল,
___” গুড মর্নিং..!
আরাত কারো কন্ঠসর পেয়ে দ্রুত চোখ মেলে তাকায়, নিজের খুব কাছে তাকবীর কে ডেকে হকচকিয়ে গেল
আরাতের বাজে অভ্যাসের মধ্যে এটাও একটা ঘুম থেকে উঠে দু-এক সেকেন্ড সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাবে, দু সেকেন্ড চুপচাপ তাকবীরের দিকে তাকিয়ে মুখে খানিকটা হাসি ফুটে বলল,
___” মর্নিং।
তাকবীর আরাতের মুখের উপরে কয়েকটা এলোমেলো চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে পুনরায় বলল,
___” আজান পড়ছে উঠো,

তাকবীরের হটাৎ ছুঁয়ে দেওয়ায় আরাত বেশ অপ্রস্তত হয়ে যায় বারংবার, তবুও তাকবীর কে বুঝতে না দিয়ে আরাত নিজেকে সামলে নেয়। এবারেও নিজেকে সামলে নিয়ে বিছানা থেকে উঠে পরলো, আরাত ওয়াশরুমে যেতেই তাকবীর বিছানা থেকে উঠে বিছানা ঠিকঠাক করতে লাগলো, তাকবীর পূর্বে থেকেই নিজের বিছানা নিজের কাপড় সবকিছু নিজেই গুছিয়ে রাখে, নিজের রুমে অন্যকারো প্রবেশ
পছন্দ না, আরাত ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে তাকবীর কে টি-শার্টের উপর হুডি পরতে দেখলো, আরাত ওয়াশরুম থেকে বের হতেই তাকবীর ওয়াশরুমে গেল, দুজনের মুখে কথা নেই, কেমন যেন অচেনা লাগছে দুজন কে, তাঁদের সকাল টা এভাবেই শুরু হতে লাগলো, আনাস আইরা কে বাইকে নিয়ে বের হয়েছে, প্রথমে আইরা কে তাঁর ভার্সিটির সামনে নেমে দিবে তারপর আনাস অফিসের চলে যাবে, তাকবীর অফিসের জন্য রেডি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে আরাতের জন্য অপেক্ষা করছে, আরাত কিছুক্ষণ পর রুম থেকে কলেজের জন্য রেডি হয়ে বের হয়ে এলো,তাকবীর আরাতের দিকে তাকাতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো, আদিবা তালুকদার এবং রাবেয়া তালুকদার বেশ অবাক হয়ে আরাত কে দেখতে লাগলো, আরাত কে এর আগে কখনো স্কুল বা কলেজে বোরকা পড়ে যেতে দেখেননি, কিন্তু আজকে হটাৎ আরাত বোরকা পড়তে দেখে আদিবা তালুকদার বলে উঠলেন,

___” কী রে মা বোরকা কেনো পড়েছিস, কলেজ থেকে কোথাও ঘুরতে যাবি?
আরাত চোখ তুলে তাকালো তাঁর মায়ের দিকে, শুধু দু-চোখ দেখা যাচ্ছে তাঁর, হাতে হাতমুজা পায়ে কেস,হটাৎ কেউ আরাত কে চিনতেই পারবে না এটা সেই চঞ্চল আরাত, আরাত একবার তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর ডাইনিং টেবিল থেকে গাড়ির চাবি এবং ফোন হাতে নিয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো, আরাত পুনরায় নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলল,

___” না কলেজে যাবো।
___” লেটস গো।
তাকবীর আরাতের উদ্দেশ্য কথাটা বলে বাড়ির বাহিরে যেতে নিলো, পুনরায় আরাতের কথায় দাঁড়িয়ে পরলো,
___” আমি আর রশ্মি স্কুটিতে যাবো !
___”প্রয়োজন নেই, বাহিরে ওয়েদার কন্ডিশন ভালো না ইলনেস হয়ে পড়বে।
তাকবীরের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরাত বাহানা দিয়ে বলে উঠলো,
___” ভাইয়া আর আইরা আপু তো বাইক নিয়ে বের হয়েছে ওঁদের কিছু হবে না?
আরাতের যুক্তিতে তাকবীর মুচকি হাঁসলো, পুনরায় হাতের ঘড়িতে, টাইম দেখে নিয়ে আরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

___” ওর বউ ও বুঝে নেবে লেটস গো।
___”কিন্তু রশ্মি?
___”আসতে বলো।
তাকবীর সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলো, আরাত অভিযোগের চোখে ওর মা আদিবা তালুকদারের দিকে তাকালো, আদিবা তালুকদার এবং রাবেয়া তালুকদার এতক্ষণ দুজন কে দেখছিলেন,রাবেয়া তালুকদারের মনে ছেলেকে নিয়ে কিছু ভয় ছিলো, ভেবেছিলো তাকবীর বিয়ের পড়েও হয়তো সবসময় গম্ভীর থাকবে, কিন্তু না ওনার ধারণা ভুল, তাকবীর আরাতের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বলছে, এবং আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে,আদিবা তালুকদার মেয়ে কে বুঝালেন,

___” যা মা তাকবীর নয়তো রেগে যাবে, স্বামীর
কথা মেনে চলতে হয়।
আরাত মায়ের কথায় মুখ অন্ধকার করে বড় বড় পা ফেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, রশ্মি কে সঙ্গে নিয়ে মিন গেইটের সামনে দাঁড়াতেই দেখলো তাকবীর গাড়ির ডাইভিং সিটে বসে ফোন স্ক্রল করছে, রশ্মিরাত পিছনে বসতে গেলে তাকবীর ফোনে চোখ রেখেই আরাতের উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
___” রাত সামনে এসে বসো।

আরাত রশ্মির দিকে তাকালো, রশ্মি চোখের ইশারায় সামনে বসতে বলে, সে পিছনে বসলো,আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে মুখ ভার করে সামনে সিটে বসে পরলো, তাকবীর তখনও ফোনে মগ্ন, আরাত সিট বেল বেধে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর আরাতের দিকে না তাকিয়ে ফোন রেখে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো,তাকবীরের মার্সিডিজ এসে দাঁড়ালো আরাতের কলেজের সামনে, আজকে থেকে শুধু আরাতের না রশ্মিরাত দুজনের কলেজ। রশ্মি গাড়ির মধ্যে থেকে গাড়ির কাঁচভেদ করে কলেজের বাহিরে দেখতে লাগলো, আরাত গাড়ি থেকে নামতে যাবে, হটাৎই নিজের হাত তাকবীরের হাতের মধ্যে বন্দী দেখতে পেলো,আরাত হতবিহ্বল হয়ে তাকবীরের দিকে তাকালো , তাকবীরের এক হাত স্টিয়ারিং এর উপর,আরেক হাতে আরাতের হাত বন্দী, তাকবীরের চোখ সামনে, আরাত রশ্মির দিকে পিছু ফিরে তাকানো, রশ্মি দুজন কে একনজর দেখে নিয়ে মুখটিপে হেঁসে গাড়ি থেকে নেমে গেলো, রশ্মি কে নামতে দেখে আরাত নিজের হাত ছাড়াতে লাগলো, তাকবীর আরাতের দিকে তাকাতেই আরাত একদম শান্ত হয়ে এলো, তাকবীর আরাত কে চমকে দিয়ে আরাতের মুখ দু-হাতে নিজের মুখের কাছাকাছি এনে হুট করে নিকাবের উপরেই ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো,আরাত এখনো হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে,

___” হয়েছে আর মুখ অন্ধকার করতে হবে না, এইজন্যই মুখ অন্ধকার ছিলো তাইনা শান্তি এবার, উফফ পাগল মেয়ে একটা, তোমার আদর চাই বাসাতে বলতে পারতে, আমি ডিপলি ছুঁয়ে তৃপ্তি নিতাম?
আরাত ভেবাচেকা খেয়ে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে আছে, তাকবীর আরাত কে গাড়ি থেকে নামতে না দেখে পুনরায় দুষ্টু হেঁসে বলে উঠলো,

___” আর লাগবে?
তাকবীরের কথায় আরাত তারাহুড়ায় গাড়ি থেকে নামতে নিলো, তাকবীর পুনরায় আরাতের হাত টেনে ধরে নিজের মুখোমুখি করলো,আরাত কে নিকাবের আড়ালে ঘনঘন চোখের পাতা ফেলতে দেখে, তাকবীর গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___” ইউ আর ম্যারেড, তোমার নজর অলওয়েজ ক্যারিয়ার আর হাজবেন্ডের উপর থাকবে বুঝেছো?
আরাত মাথা ঝাকালো, হ্যাঁ মনে থাকবে, তাকবীর আরাত কে নিজের হাত থেকে মুক্ত করে দিলো, আরাত গাড়ি থেকে নেমে পড়তেই তাকবীর শো শো করে গাড়ি নিয়ে আরাতের চোখের আড়ালে চলে গেলো, আরাত ধীর পায়ে রশ্মির পাশে এসে দাঁড়ালো, রশ্মি কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে আরাতের জন্য অপেক্ষা করছিলো,
___” চল?

আরাতের কথায় রশ্মি চমকে উঠলো, রশ্মি এতক্ষণ অন্য ভাবনায় মগ্ন ছিলো,জীবনটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছে, এই যে আরাতের কলেজে রশ্মি পড়তে চাইছিলো না একমাত্র কারণ মাহির, রশ্মির মনে হচ্ছে এক কলেজে পড়াশোনা করলে তাঁদের দেখা হবে, হয়তো কারণবশত রশ্মিরাতের বন্ধনটা হারিয়ে যেতে পারে, নিজের উপর বিশ্বাস আছে তো কিন্তু মন কখন কী চায়, এটা কী আর মানুষের জানা থাকে, নিজের শরীর নিজের মন তবুও মাঝেমাঝে অন্যর জন্য ছটফটিয়ে উঠে, তাহলে সেই মন কে কী করে বিশ্বাস করা যায় জানা নেই রশ্মির, কিন্তু বাড়ির বাদবাকি বড়রা তো জানে না রশ্মির জীবনের বদলে যাওয়ার মোড়, তাঁদের ইচ্ছা রশ্মিরাত পুনরায় আগের মতো হয়ে উঠুক, একসঙ্গে হাসিখুশি থাক তাইতে ইচ্ছা না থাকা সত্বেও একি কলেজে পথ চলা দুজনের, রশ্মিরাত কলেজের মাঠে হেঁটে চলছে , প্রথমত আরাত কেউ চিনতে পারছে না দ্বিতীয়ত রশ্মি কে প্রথম দেখছে সবাই, সবার কাছে দুজনেই অচেনা, দূর থেকে সন্ধ্যা রশ্মি কে দেখতে পেয়ে মিরা কে সঙ্গে নিয়ে রশ্মিরাতের কাছে এসে দাঁড়ালো, সন্ধ্যা আরাত কে চিনতে না পেয়ে রশ্মি কে বলল,

___” রশ্মি আপু আরাত কই,আর কলেজে এসে কেমন লাগছে, ইশ এজন্য আমি বিয়ে এত তাড়াতাড়ি করতে চাইছি না, বিয়ে করলে ঠিকমতো কলেজ আসা হবে না পুরোপুরি বন্দী জীবন কাটাতে হবে হুউ,
___” নিজের বকবকানি বন্ধ কর আর ক্লাসে চল।
আরাত কথাটা বলে রশ্মির হাত ধরে ক্লাসের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো, সন্ধ্যা প্রথমে আরাতের কন্ঠ শুনে বুঝতে পারলো বোরকা পড়া মেয়েটা আর কেউ না আরাত, সন্ধ্যা রশ্মিরাতের পিছনে পিছনে যেতে যেতে পুনরায় বলল,
___” আরাত তুই বোরকা পড়েছিস কেনো?
আরাত হাঁটতে হাঁটতে উওর করলো,
___” কেনো আমার বোরকা পড়াতে বুঝি
আকাশে সূর্য উঠছে না?

___” আরে আমি এ কথা বলেছি, তুই হটাৎ এতটা হাজি হয়ে যাবি ভাবি নাই?
___” হ্যাঁ আমি হাজির মু**ত পেরে এসেছি এজন্য।
___” বুঝলাম না এত তেজ দেখাচ্ছিস কেনো, আমাকে কী তোর বর পেয়েছিস?
আরাত এবার খানিকটা থেমে গেল, সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে পুনরায় বলল,
___” আসার পর থেকে তুই একটার পর একটা বাজে বকে যাচ্ছিস তো রেগে যাবো না?
সন্ধ্যা আরাত কে পাত্তা না দিয়ে রশ্মির পাশে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
___” বিয়ে হয়ে গেছে দেখে ভাব নিচ্ছেস,তুই ভুলে যাচ্ছিস তাকবীর ভাইয়া আমার ফুপাতো ভাই সো আমি তোর ননদ, ননদের সঙ্গে খারাপ ব্যাবহার করলে তোকে শশুর বাড়িতে ভুগতে হবে বলে দিলাম।
আরাত রশ্মির দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলল,

___”রশ্মি ওকে বাজে বকতে বন্ধ কর বলে দিলাম?
আরাতের কথায় রশ্মি এতক্ষণে কথা বলে উঠলো,
___” তোদের মধ্যে আমাকে ঢুকাচ্ছিস কেনো, তোদের কোম্পানি ভিন্ন হলেও প্রোডাক্ট এক।
রশ্মির কথায় দু’জনেই চুপচাপ হয়ে গেলো,সত্যিই তাই আরাত আর সন্ধ্যা যেন একি রকম চঞ্চল হাসিখুশি সবসময় বাড়ি মাতিয়ে রাখে, তিনজন একসঙ্গে কথা বলতে বলতে ক্লাস রুমের দিকে এগুচ্ছে, তাঁদের সঙ্গে আরেক জন আসছে তাঁদের খেয়াল নেই, মিরা তাঁদের পিছনে পিছনে হাঁটছে আর তিনজনের খুনসুটি গুলো দেখছে, ছোট বেলা থেকে বাবা-মা আর ভাই ব্যতীত কারো সঙ্গে খুব সহজে ফ্রি হতে পারে না, তাঁর যত চঞ্চলতা সবকিছু বাড়ির ভেতরে, প্রথমবার নিজে থেকে সন্ধ্যা আর আরাতের সঙ্গে বন্ধুত্বর হাত বেড়ে দিয়েছিলো,সেই থেকে আরাতের সঙ্গে এতটা ফ্রি হতে না পারলেও সন্ধ্যার সঙ্গে বেশ ফ্রি হয়ে গেছে, তারউপর যখন জানতে পারে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে আরাতের রিলেশনশিপ চলছে, তখন থেকে কিছুটা ফ্রি হয়ে গেয়েছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাঁর মন কে আরাতের সঙ্গে কথা বলতে ব্যাঘাত দিচ্ছে, মনের মধ্যে নিজের ভাইয়ের অপরাধের কাছে আরাতের সামনে কথা বলার সাহস মিলছে না। হ্যাঁ রশ্মির নামটা এতদিন শুনেই এসেছিল আজকে মেয়েটাকে নিজ চোখে দেখছে, মানতেই হবে রশ্মি বড্ড সুন্দর, আরাতের থেকেও রূপবতী, আরাত লালটি ফর্সা আর রশ্মির শরীরের রং একদম ফর্সা। চারজন ক্লাস রুমে এসে বসে পরলো, তাঁদের কে ঘিরে আশেপাশে ছেলেমেয়ের কানাঘুঁষা শুরু হয়ে গেলো, আজকে তো একদম রশ্মিরাত দুজন কেউ পেয়ে গেলো তাঁদের আলোচনার মুক্ষম অস্ত্র হিসেবে। রশ্মিরাত তাঁদের আলোচনায় কান না দিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে লাগলো, তাঁদের হইচইপূর্ণ আসর শেষ করতে ক্লাসে টিচার প্রবেশ করলো,
মাহির কলেজে দূরে করে পা রাখে, নিজের ক্লাসে আসতেই আরশ কে উৎফুল্লতা মুখে নিজের দিকে আসতে দেখলো, আরশ মাহিরের ঘারে হাত রেখে বলল,

___” এত লেট হলো কেনো?
মাহির নিজের ঘার থেকে আরশের হাত সরাতে সরাতে বলল,
___” মেন্টাল ডিস্টার্ব।
মাহির রাফির কাছে গিয়ে বসলো, রাফি একনজর মাহির কে দেখে নিজের মনে বইয়ে মুখ গুঁজানো। আরশ মাহিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,
___” আরাত আজকে কলেজে এসেছে।
আরশের কথায় মাহির কে কিছু বলতে বা আরশের দিকে তাকাতে দেখা গেলো না। কিন্তু রাফি বিরক্ত মুখে আরশের দিকে তাকালো,আরশ পুনরায় মাহির কে বলে উঠলো,
___” রশ্মি এসেছে..!
সঙ্গে সঙ্গে মাহির আরশের দিকে বিরক্ত হয়ে তাকালো,
___” বাজে না বকে বস, স্যার এলো।

মাহির দ্রুত পিছনে ঘুরে দেখে হ্যাঁ সত্যিই ক্লাসে স্যার আসতাছে, নিজের জায়গায় ঠিকঠাক হয়ে বসে পরলো, মাহির হয়তো আরশের কথাটা সিরিয়াস ভাবে নিলো না, রাফি সবকিছু জানার পর থেকে মাহিরের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে আছে, কথা বলা বাদ দিয়ে দিছে,মাহিরের সঙ্গে, মাহিরের এতেও যেন জায় আসে না, তাঁর শুধু রশ্মি কে চাই, এটা কি সত্যিই ভালোবাসা নাকি পাগলামো, আমি তো বলবো এটাকেই আসক্ত বলে,কেনো কিছুর উপরে আসক্ত হয়ে গেলে, বাদবাকি ফিকে মনে হয়।

ভার্সিটির ক্লাস শেষ হয়েছে, সময়টা অফ পিরিয়ড চলছে,কেউ কেউ তো বেরিয়ে গিয়েছে, আইরা মায়া ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়ছে, মাঠের সাইটে একটা টক দোকান বসেছে, মায়ার মন খারাপ দেখে আইরা মায়া কে নিয়ে প্রথমে দোকান থেকে বাদাম কিনে নিলো, পুনরায় দুজন মিলে মাঠের ঘাসের উপর বসে পরলো, মিটিমিটি রোদ, শীতের দিনে এই রোদটা যেন অলস করে তুলে আমাদের, যেখানে বসবো সেখান থেকে উঠতে মন চায় না, দুজন মাঠের মধ্যে বসে বাদাম চিবোতে লাগলো, মায়া গতকাল রাতে কী হয়েছে, আশিক ওর বাবার কাছে কী বলেছে সবকিছু আইরার কাছে বলে মনটা হালকা করলো, আইরা বাদাম চিবোতে চিবোতে সবকিছু শুনলো,কিন্তু কোনো কথা বলল না, এতকিছু শোনার পর আইরা কে কথা বলতে না দেখে মায়া বেশ বিরক্ত মুখে তাকালো আইরার দিকে,

___” তুই কী মানুষ, আমি আমার লাইফের প্রবলেম শেয়ার করলাম, আর তুই আমাকে সান্তনা না দিয়ে বাদাম চিবোতে লাগছিস?
___” তো কী করবো, এতকিছু হয়ে গেছে, তুই এখন বলছিস, এখানে আমার কী করার আছে?
___” বোন একটু প্রবলেমের সলিউশন দে?
আইরা কলেজ ব্যাগ নিয়ে মাঠ থেকে উঠতে উঠতে বলল,
___”পারবো না, দেখা করার সময় বলছিলি?
মায়া বিরক্ত মুখে রাগ নিয়ে বলল,
___” হ্যাঁ আমি যদি জানতাম ওই লুচ্চা আমার বাড়িতে ঢুকে যাবে, তাহলে তো তোকে আগেই বলতাম, আমাদের পাহারাদার হওয়ার জন্য।
আইরা মায়ার ব্যঙ্গ করে বলা কথায়, মায়া কে জ্বালাতে বলল,

___” পাহারাদার না, তোদের রোমান্স দেখতে লুকিয়ে থাকতাম বিছানার নিচে, দেখতাম বিয়ের আগে লুকিয়ে প্রেমিকার রুমে ঢুকে কিভাবে কট খায়, ইশ আমার বান্ধবী কট খেয়ে গেলো, আর আমি দেখতে পারলাম না, এই আফসোস আমি কই রাখি..!
আইরার কথায় মায়া রাগী চোখে তাকালো, আইরা বরাবরই চুপচাপ প্রকৃতির মেয়ে হয়েও মায়ার বেলায় মজা নিচ্ছে, মায়ার কাছে এর থেকে দুর্দশা আর কী হতে পারে। মায়া আইরা কে রেখে একা একা চলে যেতে যেতে বলল,
___” লাগবে না তো সলিউশন, আমার সঙ্গে কথা বলবি না বলে দিলাম।
মায়া কে রাগ করে যেতে দেখে আইরা মায়ার পিছনে একটু উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
___”আমার কাছে একটাই সলিউশন, তোরা বিয়ে করে ফেল, বিয়ের পর পাঁচ দশটা বেবি নিয়ে আঙ্কেলের সামনে আসবি, দেখবি তোদের প্রবলেম সলভ।
সঙ্গে সঙ্গে মায়া পিছনে তাকালো, মায়া কে তাকাতে দেখে আইরা দাঁত কেলিয়ে হেঁসে উঠলো,

___” কী দারুণ না আমার প্লান, বল বল?
মায়া আইরার দিকে দৌড়ে এলো,আইরা কে মারতে, মায়া কে দৌড়াতে দেখে আইরাও পৌঁছন ঘুরে দৌড়াতে লাগলো, এভাবেই কিছুক্ষণ মাঠের মধ্যে দুজন ছুটাছুটি করলো, মায়া আইরা কে ধরতে না পেয়ে হাঁটুর উপর দুহাত ভর দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো, আইরা মায়ার কাছে এসে সিরিয়াস হয়ে বলল এবার,
___” শোন প্রবলেম জীবনে এসেই থাকে, এটার মোকাবেলা করতে হয়, আমাদের মতো সাধারণ মেয়েরা মৃত্যু কে না বদনাম কে ভয় পায়, আশিক ভাইয়া কে বল আঙ্কেলের সঙ্গে বাদাবাদি না করে দুই পরিবার কে নিয়ে বসতে,এভাবে আঙ্কেলের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেখা করবি, দেখবি আঙ্কেলের বিপরীত দলের কেউ তোর বদনাম ছুটিয়ে দিলো,তখন আঙ্কেল তো সমাজে চোখে ছোট হয়ে যাবে, আর তোর কথা নাই বা বললাম, আশিক ভাইয়া তোকে সত্যিই ভালোবাসে, আশা করি তোর দিকটা ভাইয়া বুঝবে।
মায়া এতক্ষণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আইরার কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো, এখন কিছুটা মুখে হাসি ফুটে উঠলো, মায়া আইরা কে জরিয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

___” আই লাভ ইউ আইরা,তুই দুনিয়ায় সবচেয়ে বেস্ট ফ্রেন্ড, সত্যি এখন মনটা কিছুটা ফুরফুরে লাগছে রে, আই লাভ ইউ সো মাচ বান্ধবীহহ।
___” হয়েছে হয়েছে আর পাম দিতে হবে না, তোর চাপকে ধরাতে আমি বাস্ট হয়ে যাব।
মায়া আইরা কে ছেড়ে দিলো, ছেড়ে দিয়ে হেঁসে উঠলো, আইরা মায়ার প্রবলেম সলভ করতে পারলো না ঠিকই কিন্তু দুটো কথা বলে ফ্রেন্ডের মলিন মুখে হাসি ফুটালো,এটাই হয়তো বেস্ট ফ্রেন্ডের বন্ধন, যা রক্তের না হয়েও হাসিখুশি রাখতে সক্ষম করে,

সন্ধ্যা মিরা রশ্মিরাত চারজন মিলে ছুটির শেষে ক্লাস থেকে বের হয়ে করিডর দিয়ে হাঁটতে লাগলো, ইতিমধ্যে মিরার সঙ্গে টুকিটাকি বেশ খাতির জমে গেছে সবার, মিরা আগের মতো কিছুটা সহজ হয়ে গেছে, মিরা মাহিরের বোন এটা বাড়িতে কিন্তু কলেজে রশ্মিরাতের ফ্রেন্ড, ক্লাসে সন্ধ্যা মিরার সঙ্গে রশ্মির পরিচয় করে দিয়েছে, সেই থেকে তাঁদের একটা ভালো সম্পর্ক হয়েছে, চারজন মিলে কলেজ মাঠ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, মাহির আরশ রুপা আর তাসিন হটাৎ রশ্মিরাতের সামনে পড়ে যায়, মাহিরের নজর রশ্মির উপর, রশ্মি এক নজর মাহির কে দেখে সামনে হাঁটতে লাগলো, আরাত মাহির দের আগমন বুঝতে পেয়েই চুপচাপ মাটির দিকে মাথা করে সামনে হাঁটতে লাগলো, রশ্মিরাত সামনে হাঁটছে, মাহির রা তাঁদের পাশ কেটে গেলো, মাহির আরশ রুপা তাসিন পিছনে ঘুরে রশ্মিরাতের দিকে তাকিয়ে আছে, এদিকে রশ্মিরাতের পিছনে মিরা আর সন্ধ্যা ঘুরে মাহির দের দিকে এক পলক তাকালো,দুই দল শুধু একি উপরের পাশ কেটে চলে গেলো, কারো মনোযোগ সামনে, তো কারো মনোযোগ পিছনে দিকে, রাফি ক্লাস থাকা অবস্থায় নিজের বাসায় ফিরে গেছে।

আরশ রা সামনের দিকে পা বাড়ালোও মাহির আগের ন্যায় রশ্মিরাত কে যতদূর দেখা যায় তাকিয়ে দেখছে। আরাত কলেজ মাঠ থেকে বের হয়ে বড় করে নিঃশ্বাস নিলো, এতক্ষণ যেত দম আটকে রেখেছিল, দমটা ছেড়ে দিয়ে যেন নিজেকে স্বস্তি দিলো, রশ্মি স্বাভাবিক, তাঁর মধ্যে নেই কোনো ভাবান্ত
মিরা সন্ধ্যা নিজেদের বাড়ির রাস্তার দিকে চলে গেলো রশ্মিরাত রিকশা ডেকে রিকশা তে উঠে গেলো, দুজনেই চুপচাপ নীরব হয়ে আছে, রিকশা তালুকদার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই রশ্মিরাত রিকশা নেমে পড়লো, রশ্মি ভারা মিটিয়ে দিচ্ছে, আরাত আগে আগে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো,রশ্মি নিজেদের বাড়িতে না গিয়ে তালুকদার বাড়িতে ঢুকে গেলো, দুজন আগপাছ হয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার রশ্মি কে নিয়ে পরল,রশ্মির কলেজের প্রথম দিন কেমন কাটলো, এ-সব জিজ্ঞেস করতে লাগলো, আরাত মলিন মুখে তাকবীরের রুমে না গিয়ে নিজের রুমে চলে এলো,সবকিছু যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, কোথাও যেন পিছুটান রয়ে গেছে,পরিবার ঘর সবকিছু রেখে দূরে কোথাও একা সময় কাটাতে মন চাচ্ছে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা একটা করে পিন খুলতে লাগলো, আর নিজের চেহারা আয়নায় দেখতে লাগলো, বোরকা খুলে রেখে আরাত ওয়াশরুমে গেলো, চোখমুখে পানি ছুটিয়ে দিতে, না ছটফট কমছে না সবকিছু অসহ্য লাগছে, আরাত মুখে পানি ছুটিয়ে দিতে গিয়ে গোসল করে বের হয়ে এলো, তয়েলা পড়ে রুমে এসে জামা চেঞ্জ করে নিয়ে চিরুনী হাতে নিয়ে নিজের বেলকনিতে দাঁড়ালো,গার্ডেনের একপাশ ফুলের বাগান, শীতের মধ্যে ফুলগুলো মনে হয় টকবক করছে তাঁজা, আরাত সেদিকে তাকিয়ে মাথার চুলগুলো আঁচড়াতে লাগলো, গাড়ির শো শো শব্দে আরাত মেইন গেটের দিকে তাকালো, তাকবীরের মার্সিডিজ তালুকদার বাড়িতে ঢুকতে দেখে আরাত মাথা আঁচড়ানো বন্ধ করে সেদিকে তাকিয়ে রইলো, তাকবীর গাড়ি থেকে বের হয়ে পুনরায় গাড়ির মধ্যে উঁকি দিয়ে কিছু একটা বের করে হাতে রাখলো, আর একটা রঙ্গিন ওড়না নিজের ঘাড়ের উপর ঝুলিয়ে রাখলো, আরাত কপাল কুঁচকে তাকিয়ে দেখতে লাগলো তাকবীরের কান্ড, তাকবীর বাড়ির ভিতরে যেতে নিয়েও কী যেন মনে করে দাঁড়িয়ে গেলো, পুনরায় আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বেলকনির দিকে তাকালো, আরাত কে আরাতের রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে, নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, তাকবীর গটগট পায়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, আরাত কিছু না বুঝে পুনরায় মাথা আঁচড়াতে লাগলো,
কয়েক সেকেন্ড পর আরাত হটাৎ নিজের পিছনে কারো উপস্থিত বুঝতে পেয়ে ঘুরে দাঁড়াতে যাবে, তখনই তাকবীর আরাত কে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিলো, আরাত প্রথমে চমকে উঠলেও তাকবীর কে দেখে বলে উঠলো,

___” আরে আরে, কী করছে, ছাড়ুন বলছি?
___” হুঁশ একটা কথাও না।
তাকবীর আরাত কে কোলে তুলে নিয়ে নিজের রুমের দিকে যেতে লাগলো, আরাত চুপচাপ তাকবীরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, ভেজা চুল থেকে দু-এক ফোঁটা পানি মেঝেতে পড়ছে, তাকবীর নিজের রুমে এসে আরাত কে বিছনার উপর নেমে দিয়ে ওয়াশরুমে চলো গেলো, ওয়াশরুম থেকে তোয়ালে নিয়ে এসে আরাত কে পিছনের দিকে ঘুরতে বলল,
___” ওদিকে ফিরো!
আরাত ঘুরে বসতেই তাকবীর আরাতের মাথার চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে বেঁধে দিলো, আরাত মাথায় হাত দিতে দিতে বিরক্ত সুরে বলল,

___” আরে ভিজা মাথা বেঁধে দিচ্ছেন কেনো, চুল শুকাতে হবে, তোয়ালে খুলেন ?
তাকবীর ধমকে উঠলো,
___” চুপচাপ বসো, ভেজা চুলে শীত করবে, আর একটা কথাও না, হাত বাড়িয়ে দেও?
___” হাত বাড়িয়ে দিবো কেনো?
___” এত কোশ্চেন করো কেনো?
___” উওর জানার জন্য।
আরাতের কথায় তাকবীর আরাতের দিকে তাকালো, তাকবীর কে তাকাতে দেখে আরাত কাচুমাচু করে হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
___” সরি।

তাকবীর আরাতের দিকে তাকিয়ে থেকেই সঙ্গে করে নিয়ে আসা এক ডজন কাঁচের নীল চুড়ি আরাতের নরম হাতে পরিয়ে দিতে লাগলো, আরাত অবাক চোখে একবার হাত তো আরেকবার তাকবীর কে দেখছে, চুড়ি পড়ানো শেষ হতেই আরাত হাত মুখের সামনে নিয়ে ঝমঝম আওয়াজ করতে লাগলো, মুখে লেগে আছে খিলখিল হাঁসি, তাকবীর পুনরায় নিজের ঘাড় থেকে ওড়না নিয়ে আরাতের মাথায় সুন্দর করে পড়িয়ে দিতে দিতে ছোট করে বলল,
___” মাশাআল্লাহ, সবসময় এমন হাসিখুশি থাকবে?
আরাতের হাসি মুখ বন্ধ হয়ে গেলো, অবাক হয়ে তাকবীরের কাছে জানতে চেয়ে বলল,
___” আপনি শপিংমলে গিয়েছিলেন?
তাকবীর আরাতের পাশে বসতে বসতে ছোট করে বলল,
___” নো।
___” তাহলে চুড়ি ওড়না কই থেকে নিয়ে আসলেন?

আরাত কে নিজে থেকে একটার পর একটা প্রশ্ন করতে দেখে তাকবীর আরাতের মুখের দিকে চেয়ে রইলো, তাকবীর কে মুখের কাছাকাছি নিজের মুখ কে পর্যবেক্ষণ করতে দেখে আরাত চোখ নামিয়ে নিলো , তাকবীর হুট করেই আরাতের কোলে মাথা রেখে, আরাতের হাত নিজের মাথার চুলের মধ্যে গুঁজে দিতে দিতে গম্ভীর গলায় বলল,

___” রাস্তার দুইশো টাকার ওড়না আর এক মুঠো কাঁচের চুড়ি তোমার মুখে হাসি ফুটানোর জন্য এনাফ।
আরাত ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি রেখে তাকবীরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো, তাকবীর নিজের চোখ বন্ধ করে অর্ধাঙ্গীর ছোঁয়া অনুভব করতে লাগলো, মূলত তাকবীর বাসায় ফিরার পথে জ্যামে আটকে পড়ে,বিরক্ত চোখে রাস্তার ওদিক এদিক তাকাতেই রাস্তায় একটা ভ্যান দোকানে ওড়না ঝুলছে, ওড়নাটা দেখা মাএই আরাতের কথা মনে পড়ে গেলো, তাকবীর মুচকি হেঁসে মাথা নিচু করে, পরমুহুর্তে গাড়ি থেকে নেমে দোকানের সামনে চলে এলো, কেনো যেনো তাকবীরের মন জয় করে নিলো দুইশো টাকার ওড়না,সঙ্গে দোকানের মধ্যে কাঁচের চুড়ি ছিলো, প্রথমে তাকবীর কয়েক ডজন চুড়ি নিতে চেয়েও রেখে দিলো, মন বলছে, একসঙ্গে সবকিছু পেয়ে গেলে সেই জিনিসের মর্ম বুঝা যায় না। তাকবীর চুড়ি গুলোতে হাত বুলিয়ে নীল চুড়ি হাতে তুলে নিলো,এটা বেশ মানাবে আরাতের হাতে। তাকবীর চোখ বন্ধ রাখায় আরাত তাকবীরের মুখ পরক করছে, কারো কন্ঠ শুনে আরাত দরজার দিকে তাকালো, আহিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দুজন কে ডাকছে,

__” আরাত আপু,কাকিমনি নিচে ডাকছে তোমাদের?
আহিন কথাটা বলে চলে গেলো, তাকবীর এখনো আরাতের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, আরাত কাচুমাচু করতে লাগলো, না তাকবীর তাও উঠছে না উপায় না পেয়ে আরাত ডেকেই উঠলো,
___” বীর ভাইয়া?
তাকবীর সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকালো,
___” তুমি বড় হবে কবে?
আরাত ভেবাচেকা খেয়ে তাকালো,তাকবীর গম্ভীর গলায় আরাত কে প্রশ্ন করে কিছুক্ষণ আরাতের মুখের দিকে চেয়ে থেকে উঠে বসলো, আরাতের মাথা থেকে তোয়ালে খুলে দিয়ে বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,
___” চলো !

ডাইনিং টেবিলের আইরা আরাত তাকবীর আহিন খেতে বসেছে, তাঁদের খাওয়ার মধ্যে আদিবা তালুকদার ফোন হাতে নিয়ে কিচেন রুম থেকে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে আরাত কে বলল,
___” আরাত, মিম ফোন করেছিল তোর মামি আইরা কে সঙ্গে নিয়ে তোদের চারজন কে গ্রামে যেতে বলল!
মায়ের কথায় আরাত একবার তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর নিজের মতো খানা খাচ্ছে এদিকে তাঁর মনোযোগ নেই,আরাত পুনরায় আইরার দিকে তাকালো, আইরার মুখে যাওয়ার জন্য খুশি লেগে আছে, আরাত ওর মা কে বলল,

___” আমি তোমাকে একটু পড়ে জানাবো!
___” যেতে চাইলে আজকে রাতেই বেরিয়ে পড়তে হবে, জলদি জানাস?
আদিবা তালুকদার পুনরায় কিচেন রুমের দিকে চলে গেলেন, আইরা খাবার শেষ করে উপরে আনাস কে জানাতে গেলো, আরাত নিজের খাবার শেষ করে তাকবীরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো, তাকবীর একনজর আরাত কে দেখে নিয়ে দ্রুত নিজের খাবার শেষ করল, রুমে এসে দাঁড়াতেই আরাত তাকবীর কে বাহানা ধরে বলে উঠলো,
___” চলেন না নানুবাড়ি ঘুড়তে যাবো?
তাকবীর আরাত কে দেখতে লাগলো, আরাত পুনরায় একি সুরে বলে উঠলো,
___” প্লিজ চলেন?
___” একটা শর্তে যাবো!
আরাত শর্তের কথা শুনে খানিকটা ঘাবড়ে গেলো, আরাত কে ঘাবড়াতে দেখে তাকবীর দুষ্টু হেঁসে আরাতের সামনে নিচু হয়ে বলল,

___” কপালে চুমু রেখে দিও।
তাকবীরের কথায় অর্থ বুঝতে পেয়ে আরাত অন্যদিকে তাকিয়ে মন ভার করে বলল,
___” পারবো না।
তাকবীর সোজা হতে হতে বলল,
___” ওকে নো প্রবলেম, কোথাও যাওনা নেই।
আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আচ্ছা ঠিক আছে,
___” কী ঠিক আছে, আমি তো ঠিক নেই?
___” না মানে, ওই আরকি, আপনি নিচু হন।
তাকবীরের কথায় আমতা আমতা করতে করতে আরাত চোখ খিঁচে বন্ধ করে বলল কথাটা, তাকবীর দুষ্টু হেঁসে আরাতের সামনে নিচু হয়ে দাঁড়ালো, আরাত চোখ খুলে হালকা করে কাঁপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে রুম থেকে দৌড়ে পালালো,তাকবীর আরাত কে পালাতে দেখে শব্দ করে হেঁসে উঠলো, সেই হাসির শব্দ কারো কানে পড়লো না।

আইরা রুমে ঢুকে আনাস কে বিছানায় বসে কোলের মধ্যে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করতে দেখে আনাস এর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
___” শুনছো?
আনাস ল্যাপটপে চোখ রেখেই ছোট করে উওর করলো,
___” হ্যাঁ?
আনাস কে নিজের কাজে মনোযোগী থাকতে দেখে আইরা পুনরায় বলল,
___”আরে শুনো না?
আনাস এবার ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে আইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
___ “কী হয়েছে এমন করছিস কেনো ?
আইরা মুখে হাসি টেনে, আনাস এর হাত ধরে বলে উঠলো,
___” তাকবীর ভাইয়া আর আরাত তোমার নানুবাড়ি যাবে, চলো না আমরাও যাবো?
আইরার কথা শুনে আনাস পুনরায় ল্যাপটপে চোখ রেখে বলল,
___” অন্য একসময়, ভাইয়া আমি একসঙ্গে অফিস মিস করতে পারবো না, ভাইয়া আর বুড়ী ফিরে এলে আমরা ঘুরতে যাবো।

___” কী হবে একসঙ্গে ঘুরতে বের হইলে, মামা রা তো আছেই, আদিল ভাইয়া এদিক সামনে নিবে।
আনাস এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে আইরার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
___”তোর মামা কে?
আইরার স্বাভাবিক উত্তর,
___”কেনো, ছোট মামা আর বড় মামা।
___”তোর বিয়ে হয়েছে?
আনাস এর কথায় আইরা দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” না বিয়ের কথা চলছে।
আনাস বিরক্ত গলায় বলল,
___” ইরা একদম মজা করবি না!
আইরা মুখ ভার করে উওর করলো,
___” তো কী বলবো, তুমি আমার সঙ্গে মজা নিচ্ছো আর আমি চুপচাপ দেখবো?
___” এত কথা জানি না, তুই আমার বাবা কে আজকে থেকে বাবা বলে ডাকবি!
আরাত সয়তানি হেঁসে উঠলো,

___”ডাকতে পারি একটা শর্তে?
আনাস আইরার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো, আইরা আনাস এর মুখের সামনে ঝুঁকে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” তুমি আমাকে তুমি বলে ডাকবে?
___” ইম্পসিবল, ছোট থেকে তুই বলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, আমি পারবো না।
আইরা সোজা হয়ে মুখ অন্ধকার করে বলল,
___”তাহলে আমি তোমার সঙ্গে এক ঘরে থাকবো না।
আনাস অবাক হয়ে বলল,

___” কার সঙ্গে কী মেলাচ্ছি?
আইরা উত্তর করলো না, মুখ অন্ধকার করে আগের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো, আনাস আইরার হাত হুট করে টেনে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো, আনাস দুহাত দিয়ে আইরা কে বুকে বন্দী করে নিয়ে সয়তানি হেঁসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ভয়েস স্লো করে বলে উঠলো,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪০

___” বউ আমার না স্পেশাল প্রেম প্রেম পাচ্ছে,
তুমি কী আমাকে আদর…
___” উঁহু চুপ…
আনাস কে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে আইরা আনাস এর মুখে হাত চেপে ধরে লজ্জা পেয়ে আনাস এর বুকে মুখ গুঁজালো, আইরার বাচ্চামিতে আনাস শব্দ করে হেঁসে উঠে,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪১ (২)