Home নির্লজ্জ ভালোবাসা নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬০

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬০

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬০
সুমি চোধুরী

রাত ৩টা ছুঁইছুঁই। হাসপাতালের করিডোর থেকে শুরু করে কেবিনের ভেতরটা পর্যন্ত এক অসহ্য ক্লান্তিতে ডুবে আছে। করিডোরের টিমটিমে আলোয় সবার অবয়বগুলো অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। নেহাল আর সৃজনী অনেকক্ষণ আগেই চলে গেছে, তবে সকালে আবার আসবে বলে গেছে। আরশিকে আইসিইউ থেকে বের করে একটু আগেই সাধারণ কেবিনে শিফট করা হয়েছে। শরীরের অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সেন্স এখনো ফেরেনি। ডাক্তার কড়াভাবে বলে দিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে কোমার ঝুঁকি আছে। তবে এখন সেই ভয় কারো চোখে নেই। সবার মনের কোণে শুধু একটাই আনন্দের ঝলক আরশি বেঁচে আছে,এতেই অদের অনেক।

রৌশনি খান, হিমি খান আর তনুজা খান আরশির কেবিনেই বসে আছেন। তিনজনেরই মাথাটা ঝুলে পড়েছে। দীর্ঘ সময়ের কান্নাকাটি আর উৎকণ্ঠার পর শরীর আর সায় দিচ্ছে না। হয়তো গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছেন তারা। বাইরের করিডোরে আরফা, তুরা আর তিথি ফ্লোরেই একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। রৌদ্র, আয়ান আর শিহাব তিনজনেই দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজে আছে। আনোয়ার খান, আশিক খান আর আরিফুল খান বেঞ্চের ওপর বসেই তন্দ্রাচ্ছন্ন। সারাদিনের সেই বিভীষিকা আর হাহাকারের পর ক্লান্ত চোখগুলো যেন একটু শান্তির ঘুম খুঁজে নিয়েছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ভোরের আলো তখনো ফোটেনি, কিন্তু অন্ধকারের বুক চিরে একটা অদ্ভুত আভা আরশির চোখের পাতায় খেলা করছে। আরশির মনে হচ্ছে সে যেন কোনো এক গভীর অন্ধকার মরণ গুহা থেকে অনেক কষ্টে বেরিয়ে আসছে। তার চারপাশটা বড্ড ভারী,নিস্তব্ধ।আরশি খুব ধীরে ধীরে, পিলপিল করে চোখ মেলল। প্রথম কয়েক মুহূর্ত সবকিছু ঝাপসা মনে হলো। সে শুধু দেখতে পারছে ওপরে সাদা ছাদ, যেখানে একটা ফ্যান খুব ধীর গতিতে ঘুরছে। আরশি তার ঘাড়টা এপাশে-ওপাশে ঘোরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মাথাটা যেন পাথরের মতো অবশ হয়ে আছে। তার মনে হলো শরীরের ওপর দিয়ে যেন আস্ত একটা পাহাড় বয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে না সে কোথায় আছে। তার কানে শুধু নিজের হৃদস্পন্দনের মৃদু শব্দ ভেসে আসছে।

দীর্ঘ লড়াই শেষে আরশি তার ঘাড়টা অনেক কষ্টে ঘোরাল। ঝাপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সে দেখল তার মা, তনুজা খান এবং হিমি খান তার পাশেই বসে আছেন। সবার চোখ বন্ধ, ক্লান্তিতে সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। আরশি কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে, গলাটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।

আরশি কাঁপা কাঁপা হাতে বাম হাতটা একটু এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু হাত নাড়াতেই পাশে থাকা ওষুধের কাঁচের বোতলটা ধাক্কা লেগে ফ্লোরে পড়ে গেল। নিস্তব্ধ ঘরে বোতলটা ঝনঝন করে ভেঙে যাওয়ার শব্দে রৌশনি খান, তনুজা খান এবং হিমি খান ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলেন। তারা তিনজন চোখ মেলেই দেখলেন আরশি তাকিয়ে আছে। আরশির জ্ঞান ফিরেছে দেখে খুশিতে তারা যেন কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেললেন। রৌশনি খান মুহূর্তের মধ্যে আরশির কাছে এসে ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলেন। পরম মমতায় হাতে চুমু খেতে খেতে কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

“আলহামদুলিল্লাহ! আমার মা জেগেছে। আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া যে তিনি তোকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।”
তনুজা খান শাড়ির আঁচল দিয়ে দ্রুত চোখের পানি মুছে রৌশনি খানকে সামলাতে চাইলেন। তিনি নিচু স্বরে বললেন।
“আপা, আপনি বেশি উত্তেজিত হবেন না, ডাক্তার কিন্তু নিষেধ করেছেন। আপনি এখানে ওর কাছে থাকেন, আমি বাইরের সবাইকে সুসংবাদটা দিয়ে আসছি।”
বলেই তনুজা খান প্রায় দৌড়ে বাইরে এলেন। করিডোরে বসে থাকা আনোয়ার খানদের সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দাশ্রু নিয়ে বললেন।

“এই যে শুনছেন আপনারা? আমাদের আরশির জ্ঞান ফিরেছে! ওঠেন আপনারা সবাই।”
মুহূর্তের মধ্যে আনোয়ার খানসহ বাকি সবাই এক এক করে চোখ মেলে তাকালেন। আরশির জ্ঞান ফেরার খবরটা শোনামাত্র শিহাবের কলিজায় যেন এক পাহাড় সমান শান্তি নেমে এল। খুশিতে তার চোখ থেকে আবারও পানি গড়িয়ে পড়ল। সবাই সমস্বরে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। এরপর একে একে সবাই কেবিনে গিয়ে আরশিকে দেখে আসতে লাগল।

কিন্তু শিহাবের পা যেন মেঝের সাথে আটকে গেছে। সে যেতে পারছে না। তার বুকটা অপরাধবোধে থরথর করে কাঁপছে। এই মুখ নিয়ে সে কোন সাহসে আরশির সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? আরশি যদি তাকে দেখে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে? হঠাৎ শিহাবের কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে সে চমকে তাকিয়ে দেখল রৌদ্র দাঁড়িয়ে আছে। রৌদ্র শিহাবের কাঁধটা শক্ত করে চেপে ধরে ধীরস্থির গলায় বলল।

“দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যাবি না রুমে? তোর জন্য আমার বোনটা এখনো অপেক্ষা করে আছে। তুই ভয় পাচ্ছিস তো যে তুই গেলে আরশি ঘৃণায় চোখ সরিয়ে নেবে? হাহ্! একবার গিয়েই দেখ না আমার বোন চোখ সরাতে পারে কি না। ও কেমন মেয়ে সেটা আমি জানি। সাহস করে যা শিহাব, এখানে এসে হেরে যাস না।”
রৌদ্রের কথাগুলো শিহাবের মনে এক অদ্ভুত শক্তি জোগাল। এতক্ষণ যে ভয়টা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, তা যেন সাহসে পরিণত হলো। শিহাব মাথা নেড়ে সায় দিল এবং ধীরে ধীরে আরশির কেবিনের দিকে এগোতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি দীর্ঘ পথ। কেবিনের দরজার যত কাছে যাচ্ছে, শিহাবের হার্টবিট তত দ্রুত ধুকপুক করছে। তার মনে হচ্ছে, এই দরজার ওপাশেই তার জীবনের সবচাইতে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।

শিহাব অত্যন্ত ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করল। সে একজন পুরুষ, অথচ আজ তার বলিষ্ঠ পায়ের তলাও থরথর করে কাঁপছে। আরশির বেডের পাশে রৌশনি খান আর তনুজা খান বসে ছিলেন। শিহাবকে ঘরে ঢুকতে দেখে তারা দুজন একে অপরের দিকে তাকালেন এবং পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শিহাব ও আরশিকে কিছুটা একান্ত সময় দেওয়ার জন্য নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
শিহাব আরশির একদম পাশে এসে দাঁড়াল। আরশি তখনো একমনে ওপরের ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর দৃষ্টি স্থির, শূন্য। পাশে যে শিহাব এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা ও হয়তো টেরই পায়নি অথবা নিজের ভাবনার জগতে ও এতটাই ডুবে আছে যে বাইরের পৃথিবীর কোনো সাড়া ওর কানে পৌঁছাচ্ছে না।
শিহাব কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে অত্যন্ত কাঁপা কাঁপা গলায় ডাক দিল।

“আ-আ-আরশি?”
চেনা সেই কণ্ঠস্বর কানে যেতেই আরশি সামান্য কেঁপে উঠল। সে খুব ধীরে ধীরে মাথাটা ঘুরিয়ে শিহাবের দিকে তাকাল। দুজনের চোখ যখন একে অপরের ওপর স্থির হলো, মুহূর্তেই যেন পুরো পৃথিবীটা থমকে গেল। দুজনই একে অপরের চোখের ঘোরে হারিয়ে গেল।
আরশি অপলক দৃষ্টিতে শিহাবকে দেখছে। এই কি সেই উদ্ধত, অহংকারী শিহাব? শিহাবের চোখের নিচের অংশ ফুলে কালো হয়ে আছে, চোখ দুটো অতিরিক্ত কান্নায় টকটকে লাল। সযত্নে আঁচড়ানো সেই চুলগুলো আজ বড্ড এলোমেলো, গায়ের শার্টে রক্তের দাগ আর ধুলোবালি মেখে ময়লা হয়ে আছে। ওকে দেখতে একদম রাস্তার কোনো পাগলের মতো লাগছে। এমন বিধ্বস্ত আর বিদীর্ণ বেশে আরশি কোনোদিন শিহাবকে দেখেনি।

শিহাবের এই করুণ অবস্থা দেখে আরশির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।আরশির সেই মায়াবী চোখের মায়াভরা দৃষ্টি যেন নিঃশব্দে বলছে, “শিহাব আপনার এই অবস্থা কেন? আপনার চোখ এমন ফুলে আছে কেন?” আরশির সেই নির্বাক প্রশ্ন যেন শিহাবের কলিজায় তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মুহূর্তের মধ্যে আরশির বেডের পাশে হাঁটু গেঁড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। একজন অপরাধী যেমন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শেষ আশ্রয় খোঁজে, শিহাব ঠিক সেভাবেই দুই হাত জোড় করে মাথা নিচু করে ডুকরে কেঁদে উঠল।কান্নায় ভাঙা গলায় শিহাব বলতে লাগল।

“আরশি, আমাকে মাফ করে দাও! অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমাকে, তাই না? অনেক অবহেলা করেছি, নির্দয়ভাবে আঘাত করেছি, বিষাক্ত সব কথা শুনিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করো আরশি, তখন আমি তোমাকে বুঝতে পারিনি। মানুষ ঠিকই বলে, পাশে থাকতে মানুষের মূল্য বোঝা যায় না। যখন মানুষটা দূরে কোথাও চলে যায়, তখনই কেবল হাহাকার জাগে। আমার বেলায় ঠিক তাই হলো। তুমি থাকতে আমি বুঝিনি, কিন্তু যখন তুমি আমায় ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছিলে, তখন মনে হচ্ছিল আমার বুকের কলিজাটা কেউ জ্যান্ত ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল তখন আমার।”
শিহাবের চোখের জল আরশির চাদরের ওপর পড়ছে। সে নিজেকে আজ আরশির সামনে বিলীন করে দিয়ে বলতে লাগল।

“আমি তখন বুঝতে পেরেছি আরশি, তুমি শুধু আরশি না, তুমি আমার মনের গহীনে একদম গভীরে কোথাও গেঁথে গেছো। আমি আমার ইগোর জন্য, আমার অন্ধ অহংকারের জন্য সেটা বুঝতে পারিনি। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি, তুমি আমার কাছে কোনো সাধারণ মেয়ে না। তুমি আমার সেই আলো, যা না থাকলে আমার গোটা পৃথিবীটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। তুমি আমার সেই হাসি, যা না থাকলে আমার জগতটাই ফ্যাকাসে। তুমি আমার সেই নিশ্বাস আরশি, যা ছাড়া আমি এক মুহূর্ত দম নিতে পারি না। তুমি আমার সেই বেঁচে থাকার স্পন্দন, যা না থাকলে নিজেকে বড্ড একা লাগে, ফাঁকা লাগে, বড্ড শূন্য লাগে।”
শিহাবের কান্নার বেগ এখন বাঁধ মানছে না। তার প্রশস্ত কাঁধ দুটো অপমানে আর অনুশোচনায় বারবার কেঁপে উঠছে। করিডোরের সেই কঠিন শিহাব এখন যেন এক অসহায় শিশু, যে তার সবচেয়ে প্রিয় খেলনাটা হারিয়ে ফেলার ভয়ে ডুকরে মরছে। শিহাবের তপ্ত দীর্ঘশ্বাস আরশির হাতের ওপর গিয়ে পড়ছে, আর সেই উত্তাপ আরশির হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
শিহাব এবার ফুঁসতে ফুঁসতে ভাঙা গলায় বলল।

“আ-আরশি, আমি তোমার দিকে তাকাতে পারছি না। আমার নিজের চেহারাই আমার কাছে ঘৃণ্য লাগছে। আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু একটা বার জাস্ট একটা বার কি আমাকে মাফ করা যায় না আরশি? আমি তোমার কাছে একটা সুযোগ চাইছি। এমন একটা সুযোগ যেখানে আকাশের চাঁদ এনে দেওয়া বাদে আমি তোমার জন্য সব করতে পারব। কথা দিচ্ছি আরশি, নিজের জীবনের সবটুকু নিংড়ে দিয়ে আমি তোমাকে আগলে রাখব। এই দেহে প্রাণ থাকতে আর একটা আঁচড়ও তোমার গায়ে লাগতে দেব না। আমাকে কি সেই একটা সুযোগ তুমি দেবে আরশি?”
শিহাব মাথা নিচু করেই কাঁদতে লাগল। চোখের লোনা জল এবার চাদর ছাপিয়ে টপটপ করে হাসপাতালের ফ্লোরে পড়ছে। সেই শব্দহীন পতনের প্রতিটি ফোঁটা যেন শিহাবের এক একটা দীর্ঘশ্বাস।

আরশি স্থির চোখে শিহাবের এলোমেলো চুলের দিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। যে শিহাব তাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিত, যে শিহাব তাকে ‘বিরক্তি’ মনে করত, সেই মানুষটা আজ তার পায়ের কাছে বসে প্রেমের ভিখারি হয়ে কাঁদছে? আরশি কি তবে মরে গেছে? এটা কি মৃত্যুর পরের কোনো স্বর্গীয় স্বপ্ন? আরশির মনে হলো তার বুকের ভেতর হাজারো অভিমানের পাহাড় এক মুহূর্তেই ধসে পড়ছে। শিহাবের প্রতিটি শব্দ আরশির রক্তাক্ত মনে পশমের মতো নরম পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।

আরশির ভাবনার মাঝেই শিহাব আবারও মাথা নিচু রাখা অবস্থাতেই অবরুদ্ধ স্বরে বলল।
“আরশি, আমি জানি আমি তোমার গায়ে হাত তুলেছি, তোমাকে চরম অপমান করেছি। এর জন্য তুমি আমাকে যা শাস্তি দেবে আমি সব মাথা পেতে নেব। তুমি চাইলে আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারো, আমি উফ শব্দটা করব না। শুধু তার বিনিময়ে আমাকে একটা বার সুযোগ দাও তোমাকে ভালোবাসার। একটা বার সুযোগ দাও আমাকে দেখিয়ে দিতে এই পাথরটা তোমাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসতে পারে।”

আরশির চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল শিহাবের কথা শুনে। শিহাব কী বলছে এসব? নিজেকে এভাবে অপরাধী বানাচ্ছে কেন? আরশি তো তার ওপর কোনো রাগ করে নেই। অভিমান? হ্যাঁ, অভিমান হয়েছিল পাহাড় সমান, কিন্তু শিহাবের এই আকুলতা আর কান্নায় ভেজা কথাগুলো শুনে সব যেন শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টির মতো এক নিমেষেই ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। এটাই হয়তো বাস্তব প্রিয় মানুষ যতই আঘাত করুক, যতই বিষাক্ত কষ্ট দিক না কেন, দিনশেষে সেই প্রিয় মানুষের সামান্য একটু আকুলতা আর এক ফোঁটা চোখের জল পেলে মনটা আবারও বেহায়ার মতো তার কাছেই ছুটে যেতে চায়। কারণ এটাই যে খাঁটি ভালোবাসা।

তেমনি আরশিও শিহাব যতই অপরাধ করুক, সে তো শিহাবকেই ভালোবাসে। সে সারা জীবন এই মানুষটার সাথেই থাকতে চায়। আরশি মনের কোণে একবার ভাবল, এই দুর্ঘটনার পরেই যদি শিহাব তাকে বুঝতে পারে, তবে তো সে আরও আগেই এই দুর্ঘটনার শিকার হতে চাইতো। অন্তত শিহাব তো তাকে আরও আগে আপন করে নিত।
আরশি ধীরে ধীরে তার কাঁপা কাঁপা হাতটা শিহাবের হাতের ওপর রাখল। সেই দুর্বল হাতের সামান্য স্পর্শ যেন চিৎকার করে বলছিল আমি আছি আপনার, আর সারা জীবন আপনারই থাকব।শিহাব আরশির সেই বরফশীতল হাতের স্পর্শ পেতেই চমকে মাথা তুলল। সে দেখল আরশি তার দিকে সেই চিরচেনা মায়াবী চোখে তাকিয়ে আছে, যেই চোখে আজ কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ঘৃণা নেই আছে শুধু এক বুক হাহাকার করা ভালোবাসা।
শিহাব আরশির চোখের সেই অব্যক্ত ভাষা বুঝতে পেরে মুহূর্তের মধ্যে আরশির হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় পুরে নিল। সে পাগলের মতো আরশির হাতের তালুতে আর আঙুলে চুমু খেতে খেতে ডুকরে বলে উঠল।

“আমি জানতাম আরশি! আমি জানতাম তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিবে না। আরশি, আমি তোমার চরণে ধরে কথা দিচ্ছি, আর কখনো তোমাকে কষ্ট দিব না। আর কখনো কোনোদিন আমার থেকে তোমাকে দূরে যেতে দিব না আরশি। তুমি আমার, তুমি শুধুই আমার।”
আরশি কোনো রকম গলার স্বরে শক্তি এনে খুব ক্ষীণ কণ্ঠে বলল।
“আমাকে একটু চিত করে শুয়ে দেন?”
শিহাব আরশির সেই আধো আধো কথা শুনে যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেল। আরশি কথা বলেছে! এত বড় একটা ধকলের পর মেয়েটা নিজের গলায় আওয়াজ বের করতে পেরেছে, এটাই শিহাবের কাছে এখন সবচেয়ে বড় মিরাকল। শিহাব তড়িঘড়ি করে নিজের চোখের পানি মুছে ফেলল। সে খুব সন্তর্পণে,যেন কাঁচের তৈরি কোনো দামী জিনিস ধরছে, এমন সতর্কতায় আরশির কাঁধের নিচে হাত দিল।

আরশির সারা শরীর তখনো যন্ত্রণায় নীল হয়ে আছে। শিহাব অত্যন্ত সাবধানে আরশির মাথা আর পিঠ আগলে ধরে তাকে ধীরে ধীরে একদম চিত করে শুইয়ে দিল। শুইয়ে দেওয়ার সময় শিহাবের আঙুলগুলো আরশির গায়ের সাথে লেগে ছিল, সে যেন অনুভব করতে পারছিল আরশির হাড়ের ভেতরের কাঁপুনিটা।
চিত হয়ে শুতেই আরশি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার মাথায় ডান হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ, কিন্তু শিহাবের ছোঁয়া পাওয়ার পর যেন তার সব কষ্ট অর্ধেক হয়ে গেছে। সে ফ্যাকাশে ঠোঁটে খুব হালকা করে একটু হাসার চেষ্টা করল, যদিও সেই হাসিতেও ব্যথার ছাপ স্পষ্ট।শিহাব আরশির মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আলতো করে ওর কপালে হাত রাখল। ওর এলোমেলো চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল।

“আরাম লাগছে আরশি? কোনো কষ্ট হচ্ছে? আমি কি ডাক্তার ডাকব?।”
আরশি শিহাবের কথায় দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না সূচক বুঝাল। পর মুহূর্তে আরশি কাঁপা কাঁপা গলায় আকুলতা নিয়ে বলল।
“আ-আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবেন?”
শিহাব এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে খুব সন্তর্পণে আরশির আরও একটু ঘেঁষে এল এবং অত্যন্ত মমতায় আরশিকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। আরশি শিহাবের চওড়া বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। এতক্ষণ শরীরের প্রতিটি কোষে যে তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছিল, শিহাবের ওই উষ্ণ ছোঁয়ায় তা যেন স্বর্গীয় সুখে পরিণত হলো। শিহাব কাঁদতে কাঁদতে আরশির কপালে বারবার চুমু খেয়ে বলল।

“আই লাভ ইউ আরশি, আই লাভ ইউ সো মাচ! এই দেহে প্রাণ থাকতে আর হারাতে দিব না তোমাকে। একদম বুকের সাথে পিষে রাখব, তোমাকে ছাড়া আর কিচ্ছু চাই না আমার। এই জীবনটা আমি তোমার সাথেই পার করতে চাই। আমার প্রথম ভালোবাসা মোহ ছিল নাকি অন্য কিছু, তা আমি আর জানতে চাই না। কিন্তু আমার এই দ্বিতীয় ভালোবাসাটা নিয়ে আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বাঁচতে চাই।”
শিহাব কাঁদতেই থাকল। তার চোখের গরম পানি আরশির মাথার চুল ভিজিয়ে দিচ্ছে। শুধু শিহাব না, আরশিও নিঃশব্দে কাঁদছে। আরশির চোখের পানিতে শিহাবের বুকের শার্ট ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

ভালোবাসা সবার জন্য শুধু হাসি হয়ে ধরা দেয় না, কারো চোখে জল হয়েও ধরা দেয়। যেমন আজ আরশি আর শিহাব কাঁদছে। এই কান্না কিন্তু দুঃখের নয়, এ যে পরম পাওয়ার সুখের কান্না। আজ শিহাব আর আরশি যে মুহূর্তে আছে, এই অনুভূতি যাদের জীবনে আসে তারাই শুধু জানে এই মুহূর্তটা কতটা স্বর্গীয় শান্তির হয়। প্রিয় মানুষ এমন এক আশ্রয়, যার কাছে পৃথিবীর সেরা সুখটুকু জমা থাকে। আর সেই প্রিয় মানুষকে ফিরে পাওয়ার যে আনন্দ, তা কোনো ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৯

তবে আজ শিহাব যা করেছে, ভালোবাসার এমন আকুতি যেন প্রত্যেকটা ছেলের ভেতরে থাকে। কিন্তু শিহাবের মতো ভুলটা যেন কেউ না করে। শিহাব তো আরশিকে বোঝেনি, যখন হারাতে বসেছিল ঠিক তখনি সে তার মূল্য বুঝেছে। শিহাবের ভাগ্য ভালো যে সে আরশিকে হারিয়েও আবার ফিরে পেল। কিন্তু এইরকম ভাগ্য সবার হয় না। তাই মানুষকে সময় থাকতে মূল্য দেওয়া উচিত, কারণ এই নিঃশ্বাসের কোনো বিশ্বাস নেই৷ কথাটা হয়তো প্রত্যেকটা পাঠকই অনুভব করতে পারছেন।

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬১