Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় গল্পের লিংক || সিনথিয়া ইসলাম সীমা

অকস্মাৎ প্রণয় গল্পের লিংক || সিনথিয়া ইসলাম সীমা

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১+২
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে টুকটুকে লাল বেনারসি পরিহিতা এক কিশোরী। কিছুক্ষন আগেও যার মন জুড়ে শুধূ পূর্ণতার আকাঙক্ষা ছিলো এখন তার মনে কাজ করছে শুধু ভয়। আচ্ছা সে ভূল করে ফেললো নাতো? তার বড়ো বোন তাকে অনেক বার বুঝিয়েছিল ক্লাস নাইন-টেন এর সময়টা আবেগের। ছেলেমেয়েরা তার অধিকাংশ ভূল এই সময়টাতেই করে থাকে। কিন্তু তার মতে সে যার জন্য বিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে সে তাকে সত্যিই ভালোবাসে। তাই তার এক কথাতেই গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি দিয়েছে সে।

তার পরিকল্পনা ছিল বুরকা পরে আসার কিন্তু রুম জুড়ে মানুষের গাদাগাদি থাকায় কিছুই করতে পাড়ে নি। সবাই একবারে তাকে সাজিয়েই ঘর থেকে বের হয়েছিলো। সেই ফাঁকেই তড়িঘড়ি করে জানালা দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে সে। বেরিয়েই তার প্রেমিক পুরুষের দেওয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত কয়টা বেজেছে তার জানা নেই। কিন্তু এখানে এসে কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির দেখা মিলল না তার। সে ভেবেছিলো হয়তো একটু অপেক্ষা করলেই দেখা মিলবে। সময়ের গতিবেগ বেড়েই চলছে তবু কারো দেখা না পেয়ে এইবার ভয়ে কাঁপছে সে। তার কাছে মোবাইল ও নেই যে, কল করে কিছু জানবে। এখন তার মনে প্রশ্ন জাগছে এক দেখায় কারো জন্য গ্রাম ছেড়ে বোকামি করলো নাতো সে?

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আসলে সে যখন ক্লাস নাইনে পড়তো তখন সরকারি ভাবে রক্ত পরীক্ষার জন্য তাদের স্কুলে দুজন ডাক্তার গিয়েছিলো। তার মধ্যে একজন ছিলেন খুব মিশুক আর অপরজন ছিলেন একবারে নির্জীব। সবাই ঐ নির্জীব লোকটার কাছে পরীক্ষা করতে ভয় পেতো। সেও দোয়া করেছিলো যেন সে এই ব্যাক্তির নিকট যেতে না হয়। অথচ ভাগ্যক্রমে তাকে ঐ লোকটার কাছেই যেতে হলো। যখন লোকটা হাতে সুঁই ফোঁটাতে যাবেন, তখনই সে তার হাত নিয়ে গেলো।এতেই ধমকে উঠল তাকে সাথে বড্ডো বিরক্ত বোধও করলো। আর তা বুঝতে পেরে লোকটাকে অনেক খারাপ মনে করলো সে। তখনই তার অপরপাশের ডাক্তারটা এই ডাক্তারটাকে বললো ওঁকে আমার কাছে পাঠা “অনিল”।

তিনি বলতে দেরি আর সে তার কাছে যেতে দেরি নেই। তার কাছে ঐ ডাক্তার টাকে খুব ভালো লেগেছিলো। সে সবার সাথে কতো সুন্দর কথা বলতে বলতেই রক্ত পরীক্ষা করে নিচ্ছেন। অথচ এই লোককে দেখো! কিভাবে হঠাৎ করেই সুঁই ফুটিয়ে দেয়! অপর ডাক্তার টার কাছে যেতেই সে তার থেকে তার নাম, নাম্বার সবকিছু আগে নিলো তারপর কথা বলতে বলতেই পরীক্ষা করে নিলো। তারপর সে আর কোনোকিছু না ভেবেই ক্লাসে চলে গেলো। সেদিন রাতেই সে যখন তার মায়ের ফোন দেখেছিলো তখনই হোয়াটসঅ্যাপ এ একটা নোটিফিকেশন এলো। সাথে সাথেই সে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো এবং দেখলো ঐ ভালো ডাক্তারের কাছ থেকে মেসেজ এসেছে। এভাবেই নিত্যদিন মায়ের থেকে লুকিয়ে ওনার সাথে কথা বলতো সে। একসময় কিশোরী মনকে হারিয়ে বসলো ঐ লোকের পানে। তবে সে যখন এসএসসি পরীক্ষা দিবে এমন সময়ই একদিন তার মায়ের কাছে ধরা পড়ে গেলো সে। আর তাতেই তাকে বিয়ে দিতে লেগে পড়লো তার বাবা- মা। আর আজকেই তার বিয়ে ছিলো অথচ সে তার খালাতো বোনের নাম্বার দিয়ে ঐ লোকের সাথে যোগাযোগ করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।

হঠাৎই অন্ধকারের মাঝে একটা কালো অবয়ব ছুটে আসতে দেখা গেলো। তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ালো সে ভাবলো রনি ( তার প্রেমিক পুরুষ) এসেছে। অথচ সামনে যেতেই সে থমকে গিয়ে বললো:
” ডাক্তার সাহেব, আপনি? আপনার বন্ধু কোথায়?
তার কথার কোনো জবাব না দিয়েই ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আছে অনিল। তারপর কপাল কুঁচকেই বললো:
“তোমার বেশভূষা এমন কেন হীরা? যেনো বিয়ে থেকে পালিয়ে এসেছো?”
“মানে! আপনি জানেন না কিছু। আর উনি কোথায়?
“ও তো আজকেই ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে। আর আমাকে বলেছে তুমি নাকি এখানে অপেক্ষা করবে আমি এসে তোমাকে এই চিঠিটা দিতে”

চিঠিটা তার হাতে দিতে দিতেই বললো অনিল।তার চেম্বারে গিয়ে বিকেলের দিকে এই চিঠিটা দিয়ে গিয়েছিলো রনি। বলেছিলো, “ হীরা এখানে তার জন্য অপেক্ষা করবে হীরার হাতে এটা পৌঁছে দিতে”। সে এদিক সেদিক না ভেবেই সম্মতি জানিয়েছিল। এই রাস্তা দিয়েই বাড়ি ফেরে সে। তাই তার কোনো সমস্যা ছিলো না। তবে এখানে এসে হীরার বেশভূষা দেখে রীতিমতো চমকে গেছে সে। যদিও চিঠিটা সে পড়ার প্রয়োজন মনে করেনি সরাসরি হীরার হাতে এনেই দিয়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি দেখে বুঝতে পারছে তার চিঠিটা পড়ার দরকার ছিলো।
চিঠি হাতে নিয়েই তা চোখের সামনে মেলে ধরলো হীরা। তারপর পড়তে লাগলো চিঠিতে লেখা এক একটা শব্দ। পড়া শেষ হতেই মাটিতে বসে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। তাকে এভাবে কেঁদতে দেখে তৎক্ষনাৎ নিচু হয়ে তার দিকে ঝুঁকে অনিল প্রশ্ন করতে লাগলো:

“কি হলো হীরা? এভাবে কাঁদছ কেন তুমি?”
তার কথায় চিঠিটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে হীরা কাঁদতে কাঁদতে বললো:
“উনি এটা কেন করলো ডাক্তার সাহেব? আমি এহন কি করমু? কোথায় যামু? আমি যদি উনার কাছে টাইম পাসই অইতাম তাইলে উনি আমারে কেন আইতে কইলো? বলেন না ডাক্তার সাহেব?”

” এভাবে কেঁদো না প্লিজ, তুমি আমার সাথে চলো আমি তোমায় বাসায় দিয়ে আসছি।”
“আমারে এহন বাড়ি গেলে মাইরাই ফেলবো। আর এমনিতেও এহন হয়তো বিয়া ভেঙ্গে ঐ লোকেরা চইলা গেছে।”
বলেই হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো হীরা। কিয়ৎক্ষণ এভাবেই কাটলো। সহসা মাথা তুলে হীরা কাতর কন্ঠে বলল:
“আমারে বিয়া করবেন ডাক্তার সাহেব? সত্যি কইতাছি আমি জীবনেও আফনের কাছে কিছু ছামু না। আমার একটা চাকরি অইয়া গেলে না অয় আফনে আমারে ছাইড়া দিয়েন”

“কি বলছো তুমি এসব! বিয়ে কি তোমার কাছে ছেলে খেলা মনে হয়?”
“আমি যা কইতাছি ভেবেই কইতাছি। এখন আপনের ইচ্ছা হলে আপনি রাজি হন। নয়তো আমি আমার পথ বাইছা নেমু।”
বলেই রাস্তার মাঝে গিয়ে দাঁড়ালো সে। বিপরীত দিক থেকে একটি ট্রাক আসছে তাতে ওঁর কোনো হেলদোল নেই। ট্রাক একবারে তাকে ছুঁই ছুঁই অবস্থা চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো সে। সাথে সাথেই হাতে হেঁচকা টান অনুভব করলো। টান দিয়ে রাস্তার সাইডে এনে তাকে ধমকে উঠল অনিল:

“এগুলো কেমন ধরনের পাগলামি হীরা! পাগল হয়ে গেছো তুমি?”
“আফনের কাছে পাগলামি মনে অইলেও আমার কাছে এহন এসব ঝামেলা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় এডাই। ছাড়েন আমারে আফনে আফনের কাজে যান।”

বলেই অনিলের থেকে হাত ছাড়াতে লাগলো সে। আসলে হীরার দিকটাও ভূল নয়। সে যদি এখন বাড়ি ফিরে যায় সেকি আর আগের মতো বাঁচতে পারবে? আমাদের এই সমাজ কী বাঁচতে দেবে তাকে? নাহ কখনোই না বরং একটা কলঙ্ক লাগিয়ে দিবে তার গায়ে। কেউ কেউ তো বলেও ফেলবে ছেলের সাথে নষ্টামি করে এসেছে! কেউই বুঝতে চাইবে না তার সাথে কতটা নির্মম অন্যায় করা হয়েছে। যার জন্য পুরো পরিবার ছেড়ে চলে এলো তার থেকে ধোঁকা খাওয়া চারটে খানি কথা নয়! তবে আমাদের সমাজ তা বুঝতে নারাজ। এটাই আমাদের সমাজের নিয়তি।
এইদিকে তার তার এহেন কাণ্ডে রেগে গেলো অনিল। রাগে কটমট করতে করতেই বললো:

“চলো আমার সাথে। আর একটা কথা বলবে তো পানিতে ফেলে দেবো।”
বলেই হীরার হাত ধরে তাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলো। পথিমধ্যে হীরা বললো,
” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়? ”
” বিয়ে করতে ”
চমকে তাকালো হীরা। এর মাঝেই অনিল আবারও বললো,
“এই আমিময় অসহ্য মানবটিকে সহ্য করতে পারবে তো? ”
কিছুক্ষন চুপ থেকে হীরা বললো,
” পারবো ”
তারপর আর কেউই কিছু বললো না চললো নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

রাত বাজে ১১:০০ টা। এমন সময় প্রায় সব কাজী অফিসই বন্ধ করে যে যার বাড়ি চলে গেছে। অনেক খুঁজাখুঁজি করে অবশেষে একটা অফিস খোলা পেলো অনিল। আর সেটাতেই ঢুকলো তারা দুজন।
এর মাঝেই সেখানে উপস্থিত হলো অনিলের ছোটো চাচা বিল্লাল এহসান। অনিল তাকে বলেছে তাড়াতাড়ি কাজী অফিসে আসতে সেও দেরি না করে তৎক্ষণাৎ চলে এসেছে। তার প্রাণের ভাতিজার কোনো কথাই সে ফেলতে পারে না। আজও পুরো পরিবারকে প্রশ্নের মুখে রেখেই তিনি এখানে চলে এসেছেন। তিনি আসতেই বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন কাজী সাহেব। কিছুক্ষনের মাঝেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলো। তারপর তারা বেরিয়ে পরলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। আসার সময় গাড়ি নিয়ে এসেছেন বিল্লাল সাহেব। সেই গাড়িতেই উঠলো তারা। ব্যাক সিটে চুপচাপ বসে আছে হীরা। মনে পড়ছে কিছুদিন আগের কথা। একদিন অনিল তাকে মেসেজ দিয়ে বলেছিল, ” তুমি এখনো অনেক ছোটো। এসব প্রেম, ভালোবাসা বাদ দিয়ে পড়ায় মনোযোগ দেও”। এই কথা শুনেই হীরা রেগে গিয়েছিলো সেদিন। বলেছিল, আপনার লজ্জা করেনা নিজের বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডকে এসব বলতে। বন্ধু হয়ে কি করে আপনি ওনার থেকে আমাকে দূরে সরানোর ধান্দা করছেন।” অথচ সে ঐদিন বুঝতেই পারেনি তার ভালোর জন্যই অনিল এই কথাগুলো ঐদিন বলেছিল তাকে। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারছে নিজের ভূল।

এহসান মঞ্জিলের প্রতিটি সদস্য ড্রয়িং রুম জুড়ে পায়চারি করছে। চিন্তায় কাহিল দশা এক একজনের। তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ পেয়ে ছুটে গেলো সবাই। বাইরে গিয়ে দেখতে পেলো অনিল ও তার চাচাকে। তারপর চোখ গেলো তাদের পিছনে গুটিয়ে থাকা ফুটফুটে একটি মেয়ের উপর। মেয়েটিকে লক্ষ্য করেই লাফিয়ে উঠলো অনিলের ছোটো বোন আনিকা:
“ভাইয়া তুমি বিয়ে করেছো?”
তার কথার কোনোরূপ উত্তর না দিয়েই বাড়ির ভিতরে ঢুকতে নিলো অনিল। কিন্তু বাধ সাধলেন তার মাতা মহীয়সী। তিনি অনিলকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
“এতোদিন তো আমাদের এতো বার বলার পরেও বিয়ে করিস নি। এখন নিজে নিজেই বিয়ে করে এসেছিস আবার বিয়ের নিয়ম না মেনেই ঘরে ঢুকছিস কেন। চুপচাপ ওর পাশে দাঁড়া যতক্ষন না আমি বলছি ততক্ষন এক পা ও নড়বি না।”

বলেই অনিলকে হীরার পাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন তিনি। অতঃপর বিয়ের সব নিয়ন কানুন শেষ করেই বাড়িতে ঢুকতে দিলেন অনিলকে। বাড়িতে ঢুকেই অনিল নিজের রুমে চলে গেলো। আর হীরাকে বসানো হলো ড্রয়িং রুমে। ভয়ে কাঁপছে হীরা। এমন হঠাৎ করে এই বাড়ির বউ হয়ে এসে পড়েছে সে। সবাই এখন তাকে কী বলবে! তার ভাবনার মাঝেই মাথায় পেলো একটা ঠান্ডা হাতের ছুঁয়া।
অনিলের মা নাজিয়া বেগম হীরার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে জিজ্ঞাস করলেন:
“নাম কি তোমার, মা?”
“হাফসা নূর হীরা”

“মাশাআল্লাহ ভারী মিষ্টি নাম। ঠিক তোমার মতোই।”
তাদের কথার মাঝেই অনিলের বাবা আসিফ এহসান বললেন:
“আচ্ছা, তা আমার এই কাঠখোট্টা, গম্ভীর ছেলেটাকে কীভাবে পছন্দ হলো তোমার? তোমার মতো মিষ্টি মেয়ে ওর ফাঁদে কি করে পড়লে?”
স্বামীর এহেন কথায় রেগে গেলেন নাজিয়া বেগম।

“এসব কেমন কথা বলছেন আপনি!”
পরপরই আনিকা কে ডেকে বললেন:
“ওকে অনিলের ঘরে দিয়ে আয়। ওর বিশ্রাম প্রয়োজন।”

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩+৪