লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১২
অহনা রহমান
কেটেছে দুইদিন। ডাইনিং টেবিলে বসে আছে নাফি। রাজ এবং রুহিও আছে। নাসিমা খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। রাতের খাবার খাচ্ছে ওরা। সবাই চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। এমনিতে নাফি চুপচাপ স্বভাবের। খুব কম কথা বলে সে। ছোট ভাই আর বউয়ের সাথে কথা বলার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সেই বিয়ের দিনই প্রথম এবং শেষবার রুহির সঙ্গে কথা বলেছিলো নাফি। তাও গিফ্ট দেওয়ার সময়। তাও খুবই সামান্য। দুইটা সোনার চুড়ি রুহির হাতে দিয়ে নাফি বলেছিল,
“এটা আপনার জন্য। আমার আম্মার মেয়ে নেই আর আমারও বোন নেই। আশা করছি আপনি সেভাবে থাকবেন।”
ব্যাস! আজকে এতোগুলো দিন হয়ে গেছে নাফি আর একটা কথাও বলেনি রুহির সাথে। আর রাজকে দেখলেই তো নাফির রাগ ওঠে। মন চায় দুইটা ঘুষি মেরে দাঁত মুখ ভেঙে দিতে। ওর সাথে কথা বলার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
অনেক দিন পর আজ আবারও নাফি কথা বলল ওদের সাথে। খাবার টেবিলের নীরাবতা ভেঙে নাফি বলে উঠলো,
“আম্মু কিছু বলেছে তোকে?”
নাফির কথাতে নাসিমা চমকে উঠলেন। সেদিন নাফি যে তাকে বলেছিলো, এটা তো তার মনে’ই ছিলো না। এখন কি হবে?
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নাফির কথায় রাজও অবাক হলো। কই তাকে তো কেউ কিছুই বলেনি।
“না আম্মু কিছু বলেনি। কেন?”
রাজের কথা শুনে নাফি তাকালো মায়ের দিকে। নাসিমা ইশারায় বোঝালেন, “তার মনে ছিলনা।” নাফি আর কিছু বললো না নাসিমাকে। সে প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই আর রুহি গিয়ে ঘুরে আয় কোথাও থেকে। লাইক! কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, বান্দরবান। যেখানে খুশি সেখানে।”
রাজ একবার নাসিমার দিকে তাকালো আরেকবার তাকালো নাফির দিকে। ও আসলে বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা। রুহি ও খাওয়া থামিয়ে অবাক লোচনে দেখতে লাগলো সবটা। রাজ বলল,
“হঠাৎ এই কথা? ঘুরতে যাওয়ার প্লান হয়েছে নাকি?”
নাফি বলল,
“প্লান হয়নি কোনো। এটা আমার তরফ থেকে তোদের জন্য উপহার। তিন-চার দিন কোথাও থেকে ঘুরে আয়।”
রুহি লাফিয়ে উঠলো,
“ইয়েএএএএ ঘুরতে যাবো। আমি বান্দরবান যেতে চাই।”
রাজ খানিকটা অবাক হলেও তেমন মনে নিলো না ব্যাপারটা। নাফির সাথে তার ভালো সম্পর্ক কোনদিনই ছিলো না। তার মা শুধু নাফিকেই ভালোবেসেছে তাকে নয়। যেটুকু বাসে তাও হয়তো লোক দেখানো। আগে এসব নিয়ে ঝামেলা হলেও এখন আর হয়না। কেননা সে এখন সহ্য করে নিয়েছে সব। এখন তার সয়ে গেছে।
নাফি নিজ মনে ভেবে গেল এসব। যদিও তার ভাবনা সম্পুর্ন ভুল। সে মুখে কৃত্রিম হাসি নিয়ে বলল,
“হুম তা কবে গেলে ভালো হয়?”
যেহেতু নাফি সব ব্যবস্থা করছে তাই নাফির কাছেই জিজ্ঞেস করলো রাজ। নাফি একবার মায়ের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ চুপ থাকলো সে। মনে মনে ভেবে নিলো অনেক কিছু। এরপর বলল,
“আজকে তো বুধবার। তোরা নাহয় শুক্রবার সকাল সকাল রওনা হোস।” নাসিমার দিকে তাকিয়ে নাফি আবারও বলল, ” শুক্রবার গেলে ভালো হবে না?”
নাসিমা বুঝতে পারছেন না কিছুই। নাফি কেন চাইছে রাজ না থাকুক? কাকে পছন্দ করে নাফি? কি করতে চাইছে নাফি? কেনই বা চাইছে? নাসিমা মনের প্রশ্ন মনে রেখে, মুখে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ। শুক্রবারই যাক। সেদিন সকাল সকাল বের হলেই হবে।”
সবকিছু সমাধান হলো। ফাইনাল হলো, রাজ ও রুহি শুক্রবার যাবে ট্যুরে। কেউ আর একটা কথাও বলল না। কিছুক্ষণ পর রুহি নাসিমাকে বলে উঠলো,
“আম্মু আমার কাজিন হিয়া, ওকে একটু আসতে বলি? ও অনেক সুন্দর সাজাতে পারে। আর গোছগাছও সুন্দর পারে। ফ্যাশন সেন্স ও দারুন। ও এসে আমাকে সবকিছু গুছিয়ে দিতো।”
হিয়ার কথা শুনে নাফির খাওয়া থেমে গেল। সে তো জানেই রুহি ইচ্ছে করেই, হিয়াকে এখানে আনতে চাইছে। যাতে অপদস্ত করতে পারে। রুহির এমন প্রস্তাবে নাসিমা সরল মনে উত্তর দিলেন,
“এটা আবার জিজ্ঞেস করতে হয় মা? এটা তো এখন তোমারও বাড়ি। তোমার বাড়িতে, তোমার বোন আসবে না তো কে আসবে শুনি? আর কখনো এই প্রশ্ন করবা না। তোমার যখন যাকে ইচ্ছে হবে আনতে তুমি এনো।”
রুহি হাসলো, বাঁকা হাঁসি। এই অবস্থানে হিয়ার থাকার কথা ছিলো। কিন্তু ছলনার আশ্রয় নিয়ে আজ সে হিয়ার জায়গায়। এতে তার কোন আফসোস নেই। সে আরও চায়। হিয়াকে একদম নিঃস্ব করে দিতে চায়। হিয়া কাঁদুক ভিষন কাঁদুক। যন্ত্রণায় ছটফট করুক। না পাওয়ার ব্যাথায় হিয়া ডুকরে মরুক। রুহি হিয়াকে এনে দেখাতে চায়, সে কতটা সুখে আছে তার জায়গা নিয়ে। হিয়ার অবস্থান চিরকালই ওর নিচে থাকবে।
রুহি নাসিমাকে নত স্বরে বলল,
“না আম্মু এটা হয় না। এই বাড়ি আপনার। এটা আপনার সংসার। আমি কাকে আনবো না আনবো, আপনাকে জানানো আমার অবশ্যই কর্তব্য। যেটা ভাঙতে পারবো না আমি।”
নাসিমা খুশিই হলেন রুহির কথায়। তিনি গেলেন রুহির কাছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“লক্ষি মেয়েটা!”
রাত তখন গভীর। রুহি এবং রাজ শুয়ে পরেছে। কথা বলছে দুজন। আলোচনায় আজ “ট্যুরে যাওয়ার”। এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে রাজ বলে উঠলো,
“আচ্ছা তুমি হিয়াকে আবার আসতে বললে কেন?”
“আসতে বললাম কেন জানো না? ও দেখুক আমি আর তুমি কতটা সুখে আছি। ও হিংসায় জ্বলে-পুড়ে যাক।”
রাজ রুহির কপালে চুমু খেলো। খুবই গর্বের সঙ্গে বলল,
“এই না হলে আমার বউ? ওকে তো আমি ভার্সিটি থেকেও তাড়াবো। উচিৎ ছিলো খে য়ে ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু তা আর পারলাম কই? এতো দেমাগ ওর!”
রুহি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“দিলে না কেন? ভালোই হতো। ওর সমস্ত আত্মসম্মান ধুলোয় মিশে যেতো। আচ্ছা এখন করা যায় না?”
রাজ অবাক হলো। রুহিকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তুমি কি চাও তোমার স্বামি অন্য নারীর কাছে যাক?”
রুহি বিরক্ত হলো রাজের কথায়। রাজের থেকে সরে গিয়ে বলল,
“তোমাকে কে যেতে বলেছে? তোমার বন্ধু-বান্ধব নেই কেউ? কোনও ভাবে কিছু করা যায় না?”
রাজ বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে হিয়ার সঙ্গে প্রেম করলেও, তার মনে ছিলো হিয়ার উপর জমে থাকা রাগ। সে মূলত হিয়ার উপর প্রতিশোধ নিতেই এমন করেছিলো। তবে তার কখনোই মনে হয়নি সে হিয়াকে ধ র্ষ ন করবে। হিয়ার সম্মান কেড়ে নেবে। কিন্তু রুহি তো ওর বোন। আর সবচেয়ে বড় কথা একটি মেয়ে। একটি মেয়ে হয়ে আরেকটি মেয়ের এমন ক্ষতি? রাজ অবাক না হয়ে পারলো না। সে রুহির মন রাখতে বলল,
“আচ্ছা আগে ঘুরে আসি। তারপর দেখছি কি করা যায়।”
“এমন কিছু করবে যাতে ও আর মুখ দেখাতেই না পারে।”
এইজন্যই বোধহয় বলে, নারী সবচেয়ে বড় শত্রুই হলো নারী।
রাত তখন অনেক। হিয়ার দুচোখে ঘুম নেই। শুধু আজ না! বিগত তিনরাত সে ঘুমাইনি (দিনের বেলায় ঘুমানো অন্য ব্যাপার)। হিয়া বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলো। তবুও দুচোখে ঘুম এলো না বেচারির। নাফি কি করবে? নাফি কি নীরব থেকে হিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে দিলো? নাফি যদি প্রত্যাখ্যান করে, হিয়া কিভাবে মুখ দেখাবে? অবশ্য তিনদিন অলরেডি হয়ে গেছে। নাফি যদি হিয়ার প্রপোজাল গ্রহনই করতো, তাহলে নিশ্চয়ই কোনো না কোনও উত্তর পাঠাতো। কিন্তু নির্দয়-নিষ্ঠুর পুরুষ নাফি তো কোন সাড়াশব্দই করলো না।
নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হলো হিয়া। সে বিছানা ছেড়ে উঠলো। এইবার সারা রুম জুড়ে পায়চারি করতে লাগলো। হিয়া ভাবলো, সেকি একবার নাফিকে কল করবে? পরক্ষণেই ভাবলো না না এটা একটু বেশিই ছ্যাঁচরামি হবে না? কি ভাববে নাফি?
হিয়া মনে মনে একশোটা গালি দিলো নাফিকে। পরিকল্পনা করলো,নাফির সামনে যদি কখনো পরে তো বলবে,
“ওটা ডেয়ার ছিলো। আসলে সে নাফিকে ভালো-টালো বাসে না। ট্রুথ-ডেয়ার খেলতে গিয়ে ও এরকম ডেয়ার পেয়েছে।”
হিয়া নিজেকেই বাহবা দিলো। জামার কলারটা উঁচু করে ভিষন ভাবের সহিত বলল,
‘বাহ হিয়া বাহ! তোর কি দারুণ বুদ্ধি। ওয়াও!”
কিছুক্ষণ পর হিয়া আবারও বিছানায় গেল। উপুড় হয়ে ধপাস করে শুয়ে পরলো বিছানায়। ওর পায়ের সাথে বারি খেয়ে, মাটির ফুলদানি টা নিচে পরে ভেঙে গেল। তাতে শব্দও হলো বিকট। হিয়া বিরক্ত হলো। সব খারাপ তার সাথেই ঘটতে হয়? আশ্চর্য! এমনিতে তার কিছুই ভালো লাগছে না। ডেয়ার-ফেয়ারের কথা তো মন কে শান্তনা দেওয়ার জন্য বলেছো। হিয়া অভিনয় করে হোক অথবা সত্যি সে প্রপোজ তো করেছিলো নাফিকে। আর এটাও সত্যি যে নাফি তাকে রিজেক্ট করেছে। নাফি রিজেক্ট করে হিয়াকে যে অপমানটা করলো, এটার শোধ কিভাবে নেবে হিয়া?
হিয়া আবারও উঠলো বিছানা ছেড়ে। রুমের মাঝে আবারও শুরু করলো পায়চারি। একা একা বিরবির করতে লাগলো সে। ঠিক তখনই শুনতে পেল বড় চাচার কন্ঠস্বর। তিনি দরজায় শব্দ করছেন আর বলছেন,
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১১
“হিয়া আম্মু ঠিক আছো তুমি? কিছু ভাঙার শব্দ হলো। কি হয়েছে?”
হিয়া হতাশ হলো। নিজের কপাল চাপড়ে বলল,
“মরার উপর খাঁড়ার ঘা?”
