রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৯
রিক্তা ইসলাম মায়া
রাত নয়টার ঘরে। রিদ আজ অসময়ে বাড়িতে বসে কাজ করছে। ঘরের দরজা জানালার পর্দা ফেলে নিস্তব্ধ নীরবতায় মনোযোগ সহকারে ল্যাপটপ আর কিছু ফাইল নিয়ে কাজ করছে সে। রিদের ঢাকা হেড অফিস থেকে ম্যানেজারের কিছু জরুরি ইমেল এসেছে তাই রিদ বিকাল থেকে বসে ফাইলগুলো চেক করছে। গায়ের সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা এখনো জড়িয়ে। সে চট্টগ্রামে থাকলে এসব সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা পড়ে থাকে সবসময় বাবার রাজনৈতিক কারণে। আজ বিকেলে হঠাৎ রিদ জরুরি কাজে খান বাড়িতে এসেছিল। তখন থেকেই রুমে বসে কাজ করছে। গায়ের পাঞ্জাবিটাও চেঞ্জ করার সময় পায়নি ব্যস্ততায়। পাঞ্জাবির দুটো হাতা টেনে কনুই অবধি গুটিয়ে রেখেছে। সামনে খালি কফির মগটা পড়ে। সে রুমের খালি সোফায় বসে কাজ করছে। মায়া কিছুক্ষণ পরপর রুমে এসে রিদকে দায়িত্ব নিয়ে কফি বানিয়ে দিয়ে আবার চলেও যায়। রিদকে আপাতত ডিস্টার্ব করছে না। রিদ কাজ করছে বলে মায়া এতক্ষণ বাহির থেকে টইটই করে এসেছে।
কাল রাতে মুরাদপুরের ফ্ল্যাটে থেকে সকালে খান বাড়িতে এসেছে রিদের সঙ্গে মায়া। অসময়ে মায়া ফের ঘরে আসল। রিদকে সেই আগের ন্যায় গম্ভীর মুখে কপাল কুঁচকে কাজ করতে দেখে মায়া কপাল কুঁচকাল। রিদ বিকাল পাঁচটা থেকে রাত নয়টা অবধি টানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে লাগাতার কাজ করে চলেছে। লোকটার কোমর ব্যথা করছে না? নাকি বোরিং লাগছে না? রিদের কাজের ক্ষেত্রে বেশ ধৈর্য আছে বলতেই হবে মায়ার। মায়া রিদকে দেখে বিছানার উপর পা ঝুলিয়ে বসল। খালিঘরে মায়া একাকী কার সাথে কথা বলবে। রিদ যে মনোযোগ সহকারে কাজ করছে মায়ার দিকে তো তাকাচ্ছেই না।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মায়া বার কয়েক রিদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে তাকাতে ঠোঁট উল্টালো। মায়া বিগত পাঁচ ঘণ্টায় এই নিয়ে না হলেও ত্রিশবার এসেছে এই ঘরে। ছয়বার কফি বানিয়ে দিয়েছে রিদকে অথচ রিদ একবারও মায়াকে চোখ উঠিয়ে দেখল না যে বউটা চোখের সামনে ঘুরঘুর করছে কেন? মায়ার প্রয়োজন থাকতে না পারে অন্তত বউকে দেখে একটা হাসিও তো দিতে পারে তাই না। আচ্ছা হাসি দিতে যদি লোকটার কষ্ট লাগে তাহলে মায়াকে তো বউ হিসাবে একবার চোখ উঠিয়ে দেখবে নাকি? মায়ার বানিয়ে দেওয়া কফি তো ঠিকই খাচ্ছে তাহলে মায়াকে এক পলক দেখার সময় পাচ্ছে না? রিদের কাজ কি মায়ার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ? কাল রাতেও মায়ার সাথে দুটো কথা বলেনি রিদ। কেমন পিঠ দেখিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল রাতে। আর আজকে বাড়িতে থেকেও মায়াকে একবার চোখ উঠিয়ে দেখছে না কাজের বাহানায়। আচ্ছা সত্যি কি মায়ার স্বামী কাজ করছে নাকি কাজের বাহানায় মায়াকে ইগনোর করছে কোনটা? আচ্ছা মায়ার স্বামী আবার কোথাও পরকীয়া চালাচ্ছে নাতো? এজন্য মায়াকে এতো ইগনোর করছে? মায়া হঠাৎ কি মনে করে উঠে দাঁড়াল। রিদের সামনে দাঁড়িয়ে রিদের অ্যাটেনশন পাওয়ার চেষ্টা করল। অথচ রিদ চোখ তুলে তাকাল না। সে নত মস্তিষ্কে কাজে ডুবে। মায়ার সন্দেহ বাড়ল। বউকে সামনে রেখে না দেখার ব্যাপারটা মায়ার সন্দেহ তীব্র করল। মায়া হঠাৎ রিদের থুতনি ধরে রিদের মুখটা উপরে তুলে বলল….
‘ আপনি কি পরকীয়ায় আসক্ত?
অসময়ে মায়া অযৌক্তিক প্রশ্নটা করল রিদকে।
রিদের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে দীর্ঘ সময় নিয়ে ল্যাপটপ স্ক্রিনে তাকিয়ে কাজ করার কারণে। মায়া হঠাৎ রিদের মুখটা উপরে তোলায় রিদের মনোযোগ নষ্ট হয়। মায়ার হঠাৎ করা প্রশ্নটার কারণ রিদ বুঝতে না পেরে নাক মুখ কুঁচকে বলল…
‘হোয়াট?
মায়া নিজের কথায় দৃঢ়। সে পুনরায় রিদকে একই সন্দেহ করে বলল…
‘কারও সাথে চক্কর চালান আপনি আমার অগোচরে? আমি কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ কিন্তু শুধু নামে বদনাম না কাজেও বদনাম। পরকীয়া চালালে এক্ষুনি স্বীকার করুন। পরে কিন্তু খবর আছে বলে দিলাম।
কথাটা মায়া রিদকে শাসিয়ে বলল। রিদ মায়ার কথাটায় পাত্তা না দিয়ে মায়ার হাতটা নিজের থুতনির থেকে সরিয়ে পুনরায় কাজে মনোযোগী হতে চেয়ে বলল….
‘ডোন্ট ডিস্টার্ব মি, আউট।
মায়া অল্প স্বল্প অপমানিত বোধ করল। রিদ কাজে ডুবে যেতে চাইলে মায়া ফের বাঁধা দিয়ে চট করে রিদের ল্যাপটপের শাটার বন্ধ করে দিয়ে বলল….
‘ আপনি আগে বলুন আমি আগে নাকি আপনার কাজ আগে। কে গুরুত্বপূর্ণ?
‘রিত।
রিদের ধমকে মায়াও একই সুর টেনে বলল…
‘বলুন।
রিদ মায়ার দিকে কটমট করে তাকাল। মায়া ফের বলল…
‘ঐভাবে পরে তাকাবেন আগে বলুন আমি আগে নাকি আপনার কাজ আগে? যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি আমাকে উত্তর দিবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করবই। আমার হোক আছে আপনাকে ডিস্টার্ব করার।
রিদ বিরক্তি ভঙ্গিতে মায়াকে ইগনোর করতে চেয়ে ল্যাপটপের শাটার খুলে বলল…
‘ আমার কাজ আগে। এবার যাও।
রিদের উত্তরে মায়া চেতে গিয়ে ঠাস করে ফের রিদের ল্যাপটপের শাটার বন্ধ করে দিয়ে বলল…
‘ আপনার কাজ আগে হলে আপনি আমাকে বিয়ে করেছেন কেন তাহলে?
‘ ভুল করেছি। পাগলা কুত্তায় কামড়েছিল তাই ইনজেকশনের বদলে তোমাকে বিয়ে করেছিলাম।
‘আমি ভুল?
‘রিত, আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে, কিন্তু।
রিদ বিরক্তি ভঙ্গিতে কথাটা বলল। মায়া আগের নেয় চেতে উঠে বলল…
‘আমি কিন্তু বাপের বাড়ি চলে যাব নেতা সাহেব।
রিদ মেজাজ নিয়ে মায়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত হলো। অনেকক্ষণ যাবত এক জায়গায় বসে থেকে কাজ করার অভ্যাস তার আছে। কিন্তু একঘেয়েমি লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে কাজ করতে। এমনই তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে অতিরিক্ত কাজের চাপে। কিন্তু এখন হঠাৎ কাজের মধ্যে মায়া ডিস্টার্ব করায় রিদের মনোযোগ ছুটে যায় এজন্য মূলত রিদ মায়ার উপর ক্ষেপে যাচ্ছিল। কিন্তু বউ বাপের বাড়ি চলে যাবার হুমকি দেওয়ায় রিদ খানিকটা শীতল হলো। এমনই বউ ডিস্টার্ব করলে সে ঐভাবে রাগটা দেখাতে পারে না। এখন আবার বউটা বাপের বাড়ি চলে গেলে আরেক সমস্যা। রিদ শান্ত চোখে মায়ার দিকে তাকাতে মায়া ফের একই প্রশ্ন করে বলল….
‘ আপনি বলুন আমাকে কেন বিয়ে করেছেন যদি আপনার কাজ আমার থেকে আগে হয় তাহলে?
রিদ শান্ত এবং শীতল দৃষ্টি মায়ার উপর রেখে বলল…
‘আমার জীবনে অশান্তির অভাব ছিল। সেজন্য বিয়েটা করেছি অশান্তিতে থাকার জন্য। এখন তাই আছি। আর কিছু?
‘আমি অশান্তি?
‘সন্দেহ আছে?
রিদের বারবার অপমানজনক কথায় মায়া ঠাস করে রেগে যায়। আঙুল তুলে রিদকে শাসিয়ে বলল…
‘ আজকের পর থেকে আপনি আমার সাথে আর কথা বলবেন না। নিষেধ। আমি আপনার বউ না।
রিদের শান্ত উত্তর…
‘ওকে।’
রিদের সম্মতিতে মায়ার রাগে যেন ঘি পড়ল। মায়া তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল…
‘আপনার সাথে আমার সবকিছু শেষ, কাটাকাটি। আপনিও আমাকে চেনেন না, আমিও আপনাকে চিনি না। এবার থেকে আমি রাতে আম্মুর সাথে ঘুমাব।
‘ওকে যাও।
‘আমি মোটেও বেহায়া না যে বারবার আপনার কাছে আসব। উঁহু।
মায়া রিদকে শাসিয়ে মুখ বাঁকিয়ে চলে যেতেই রিদ বন্ধ ল্যাপটপের শাটার টেনে খুলল। মায়ার হুমকি ধামকিতে রিদ পাত্তা দিল না। দেখা যাবে কিছুক্ষণ পর মায়া নিজ থেকে রিদের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। মায়া যদি নাও আসে তাহলে রিদ নিজের কাজ শেষ করে মায়াকে গিয়ে নিয়ে আসবে মায়ের রুম হতে। এখন ঘুমাতে চাচ্ছে ঘুমাক। রিদ ল্যাপটপ খুলতেই ফাইলগুলো পুনরায় ওপেন হলো। রিদ নিজের কাজে মনোযোগ বসাল। মায়া আর রিদের রুমে আসেনি। তবে সুফিয়া খান দুবার রিদের রুমে এসেছে রিদের খাওয়ার খোঁজ করে। রিদ জানিয়েছে সে আপাতত এখন খাবে না। হাতের কাজ শেষ করে পরে খাবে।
সুফিয়া খান রিদের খাবার তুলে রাখল। রিদ হাতের কাজ শেষ করতে করতে রাত প্রায় বারোটার ঘরে। ফাইলপত্র গুছিয়ে রিদ লম্বা শাওয়ার নিয়ে কালো টি-শার্ট ও ট্রাউজার পরে বের হলো। হাতের তোয়ালিয়ায় মাথা মুছতে মুছতে বিছানার পাশে বসল। ফোনটা চার্জে। সে একহাতে ফোন নিয়ে ফোনের নোটিফিকেশন চেক করছে। সময় তখন ১২:১৩। সেই নয়টায় মায়ার দেখা পেয়েছে রিদ তারপর আর দেখা হয়নি। রিদ ভাবল রাতের খাবার খেয়ে সে মায়াকে নিয়ে আসবে সুফিয়া খানের রুম থেকে অথচ রিদের ভাবনার মাঝেই মায়া খাবার ট্রলি ঠেলে ঘরে ঢুকল। রিদ দরজার দিকে পিঠ করে ফোনের ইমেল চেক করছে। তার ঘরে কেউ এসেছে সেটা রিদ বুঝতে পেরেও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়নি। রিদ মনে করেছে সুফিয়া খান এসেছে। যেহেতু তার জন্য এখন রাতে খাবার নিয়ে আসার কথা সুফিয়া খানের। হঠাৎ কেউ পেছন থেকে দু-হাতে রিদের গলা জড়িয়ে রিদের বাম গালে শব্দ করে চুমু খেয়ে আহ্লাদ করে বলল…
‘ আপনি আমার প্রাণের স্বামী। আই লাভ ইউ জানু।
এইতো কিছুক্ষণ আগেই মায়া রিদের সঙ্গে ঝগড়া করে রুম থেকে বেরিয়েছিল। আর আসবে না বলে রিদকে হুমকি ধামকিও দিয়ে গেছে। অথচ এতো অল্প সময়ের মাঝে রিদ ভিলেন থেকে প্রাণের স্বামীতে চলে আসল মায়ার? রিদ সন্দিহানে কপাল কুঁচকাল। মায়ার হুটহাট মুড সুইং হয় সেটা রিদ জানে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মায়ার মুড ভয়ংকর লেভেলের সুইং হয়েছে। রিদ হাতের তোয়ালে রেখে গলায় জড়িয়ে ধরা মায়ার হাতের উপর হাত রেখে বলল…
‘কি ব্যাপার? মতলব কি? হঠাৎ এতো মহব্বতের কারণ?
‘আমার কোনো মতলব নেই। আমিতো আপনার জন্য এসেছিলাম।
‘আমার জন্য?
‘ হুমম। আমি তো আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী তাই।
মায়া রিদের অপর গালে একই ভাবে শব্দ করে চুমু খেলো। মায়ার হঠাৎ বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসা দেখাতে রিদ শিওর হলো মায়া কোনো মতলবে তার কাছে এসেছে ভালোবাসা দেখাতে। রিদ মায়ার হাত গলা থেকে টেনে বিছানায় বসাল নিজের মুখোমুখি। কপাল কুঁচকে রিদ বলল…
‘তোমার মতলবটা শুনাও তো শুনি।
‘মুক্তা আপু প্রেগন্যান্ট। ফাহাদ ভাই বাবা হবে।
‘তো?
রিদের কাছে মুক্তার প্রেগন্যান্ট হওয়ার ব্যাপারটা স্বাভাবিকই লেগেছে। যেহেতু মুক্তা ফাহাদ দুজনই বিবাহিত সেই ক্ষেত্রে তাদের বাচ্চা হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। রিদ তখনো মায়ার মতলবের কারণটা বুঝল না। মায়া ফের একই প্রসঙ্গে বলল…
‘আপনি কিন্তু ফাহাদ ভাইয়ের বড় ভাই।
‘তো?
‘ আপানর ছোট ভাই আপনার আগে বাবা হচ্ছে এতে মানুষ কিন্তু আপনাকেই মন্দ বলবে।
রিদ এবার বুঝতে পারল মায়ার হঠাৎ তার প্রতি বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসা দেখানোর কারণটা। রিদ বুঝেও না বোঝার মতো করে রইল। এই প্রসঙ্গে সে মায়াকে লাই দিতে চায় না। রিদ বলল…
‘কেউ যদি মন্দ বলে তাহলে সেটা আমায় বলবে তোমার তো সমস্যা নেই। তুমি নিশ্চিতে থাকো। কেউ তো আর তোমাকে নিন্দা বলতে যাচ্ছে না তাই না?
রিদের কথায় মায়া প্রতিবাদ করে বলল…
‘আমি আপনার বউ এবং সবচেয়ে কাছের শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনাকে কেউ মন্দ বললে আমার গায়ে লাগবে না বুঝি?
‘না।
‘কেন গায়ে লাগবে না?
‘আমি বলেছি তাই।
আমি জ্বলে উঠে বলল…
‘ আপনি বললেই হলো নাকি? আমি মোটেও এমন বউ নই যে স্বামীর নিন্দায় চুপ থাকব। প্রয়োজনে প্রতিবাদ করব। আপনি কি কারও থেকে কম নাকি? দরকার হলে আমরা একটা বেবির জায়গায় পাঁচটা বেবি নিব। তারপরও পিছিয়ে থাকব না। আর না আপনার নিন্দা হতে দিব না।
মায়া কথাটা এমনভাবে বলল যেন সে বেবি বেশি নেওয়ার প্রতিযোগিতায়। আর এতে মায়াকেই ফাস্ট হতে হবে, হারলে চলবে না। রিদ মায়ার কথায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল…
‘ তুমি কি কোনো কম্পিটিশনে নেমেছ রিত? যে সবার থেকে বেশি বেবি নিয়ে তোমাকেই ফাস্ট হতে হবে??
‘ অবশ্যই কমপিটিশন আছে। দাদাভাই চ্যালেঞ্জ করেছে উনার চার বেবি নেওয়ার রেকর্ড ভাঙার পুরুষ খান বাড়িতে নেই। তাই আমি চিন্তা করেছি আমরা পাঁচটা বেবি নিব। দাদাভাইয়ের থেকে একটা বেশি। আপনার নাক যাতে না কাটা যায় এজন্য আপনার কথাটা ভেবেই আমি এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।
রিদ বুঝতে পারল মায়ার মাথাটা আরাফ খান খাচ্ছে। রিদের সঙ্গে আরাফ খান কথায় পারে না বলেই মায়াকে দিয়ে রিদকে জ্বালানোর নতুন ফন্দি আঁটেছে আরাফ খান। মায়ার মুখেও আজকাল আরাফ খানের নামটা শোনা যাচ্ছে বেশি। তারমানে মায়া দিনভর আরাফ খানের সঙ্গেই আড্ডা মারে। মায়াকে আরাফ খানের সঙ্গে ছাড়াতে না পারলে তিনি আরও উল্টাপাল্টা বুঝাবেন মায়াকে। রিদ মায়ার প্রসঙ্গ এড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল…
‘আচ্ছা বুঝেছি আপনি আমার ভালো বউ। স্বামীর কথা অনেক চিন্তা করেন। এবার ছাড়েন।
রিদকে উঠে যেতে দেখে মায়া তৎক্ষণাৎ দু-হাতে রিদের এক হাত টেনে ধরে বলল…
‘আরে কই যাচ্ছেন। বসুন না। একটা ইমপর্ট্যান্ট টপিক চলছে। কথা শেষ না করে যাওয়া যাবে না। বলুন আপনার কয়টা বেবি চাই পাঁচটা নাকি আরও বেশি?
রিদ মায়ার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল…
‘লজ্জা শরম বাকি আছে নাকি সব বিক্রি করে দিয়েছো?
রিদের কথায় মায়া সেইভাবেই উত্তর দিয়ে বলল…
‘যেদিন আপনাকে বিয়েটা করেছিলাম সেদিনই লজ্জা শরম বিক্রি করে আপনাকে চকলেট খাইয়েছিলাম। মনে নেই আমাদের প্রথম দেখায় আপনি রাস্তায় এক্সিডেন্ট করে পড়ে আমার কাছে চকলেট চেয়েছিলেন আর আমি ব্যাগ থেকে খুলে আপনাকে একটা চকলেট খাইয়েছিলাম? ঐটা আসলে আমি লজ্জা শরম বিক্রি করেই কিনেছিলাম।
রিদ বুঝল মায়া বেবির বিষয়ে বেশ সিরিয়াস নিয়েই কথাগুলো বলছে। কিন্তু রিদের এই মুহূর্তে বেবি চাই না এটাও স্পষ্ট। কিন্তু এই কথাটা মায়াকে এখন সরাসরি বললে সে বুঝবে না বরং রিদের সঙ্গে অভিমান করে বসে থাকবে। রিদ ফের মায়ার হাত ছাড়িয়ে বলল…
‘আচ্ছা বুঝেছি, এবার ছাড়ো।
রিদ হাত ছাড়াতে চাইলেও মায়া ছাড়ল না। বরং মায়া রিদের হাত চেপে লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। রিদকে টেনে সোফায় বসিয়ে খাবার ট্রলি থেকে প্লেট নিয়ে খাবার তুলল প্লেটে। রিদের গরুর মাংস খেতে পছন্দ করে। কম জ্বালে গরুর মাংস ভুনা করে দিলে সেটা সুন্দর করে খেয়ে নেয় রিদ। মায়া সাদা ভাতে ভুনা গরুর মাংস নিয়ে রিদকে বলল…
‘আজকে আমি খাইয়ে দিই? বউয়ের হাতে খেলে নাকি ভালোবাসা বাড়ে।
মায়ার বেবি চাই আর এই বিষয়ে রিদ যেন আপত্তি না করে সেই জন্য মায়া রিদকে অতিরিক্তের চেয়েও বেশি যত্ন নিচ্ছে খাতিরদারি করে। রিদ এসব বিষয়ে বুঝেও নিরুত্তর রইল। বরং মায়ার কথায় রিদ তৎক্ষণাৎ হা করল। রিদের হা করাতে মায়া হাত ধুয়ে সাদা ভাতে অল্প মাংস নিয়ে মাখিয়ে রিদের মুখে দিল। রিদ চুপচাপ খাচ্ছে। দুজনের বিগত দিনের মান অভিমানের কারণে দুজনের ঠিকঠাক সংসারটা করা হচ্ছে না। নয়তো রিদের প্রতি মায়ার যত্ন নেওয়ার ব্যাপারটা রিদের মনে প্রশান্তি কাজ করে। এই যেমন এখন মায়া রিদকে খাইয়ে দিচ্ছে সেটাও রিদের ভালো লাগার একটা দিক। মায়া এবার ঠিক করেছে যতকিছুই হোক না কেন?
সে এবার রিদের সঙ্গে সংসারে মনোযোগী হবে। আর সংসার করতে গেলে প্রথমে মায়াকে একটা বেবি নিতেই হবে, এটা বিশ্বাস করেই মায়া রিদের প্রতি মনোযোগ বাড়াচ্ছে। তখন রিদের সঙ্গে ঝগড়া করেই মায়া নিচে বসার ঘরে গিয়ে দুটো খবর জানতে পারে। একটা মুক্তা প্রেগন্যান্ট দ্বিতীয়টা কাল আয়ন আর জুই আসবে খান বাড়িতে। রিদ মায়ার সঙ্গে জুই আর আয়নেরও পারিবারিকভাবে মেজবানের আয়োজন করা হবে। রিদ মায়ার সঙ্গে আয়ন জুইয়ের অনুষ্ঠান রাখার অবদানটা আয়নের মা সুলতানা চৌধুরী রেখেছেন। তিনি দু-দিনের মধ্যে স্বামী আর ছোট মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে খান বাড়িতে ফিরবেন সেটাও জানিয়েছেন।
মায়ার পরিবারকেও রিদ মায়া, আয়ন জুইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের বিষয়টা জানানো হয়েছে। তাঁরা আপত্তি করার সুযোগ পায়নি। মায়া পরিবারের সঙ্গে রাগ করে চলে এসেছে শ্বশুরবাড়িতে। জুইকেও জুইয়ের বাবা এখনো মেনে নেয়নি তাই তাঁরা আপত্তিটা করবে কোথায়? কাল থেকে খান বাড়িতে মেহমান আসা শুরু হবে। খান বাড়ি থেকে কার্ড ছাপিয়ে রিদ মায়ার বিয়ের মেজবানের দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে চারপাশে। সবাই এখন থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। মায়া রিদের পাশে সোফায় বসল। রিদ মায়ার মুখোমুখি ঘুরে বসেছে খেতে। মায়া সময় নিয়ে রিদকে খাইয়ে দিচ্ছে। এর মাঝে মায়া হঠাৎ বলল…
‘ অনুষ্ঠানের দিন আমি কি পড়ব? শাড়ি নাকি লেহেঙ্গা?
‘শাড়ি।
‘আপনি পছন্দ করে দিবেন নাকি?
‘আমি নিয়ে আসব।
রিদ হা করল। মায়া রিদের মুখে লোকমা তুলে দিয়ে বলল…
‘তাহলে হলুদের অনুষ্ঠানে কি পড়ব?
‘হলুদের অনুষ্ঠান আবার কিসের?
‘আম্মু বলেছে অনুষ্ঠানের আগের দিন রাত্রে বাড়িতে
আমাদের মেহেদী আর হলুদের মিলিয়ে দুটো ফাংশনের একটা অনুষ্ঠান রাখা হবে। আপনি কিন্তু সেদিন ত্যাড়ামি করতে পারবেন না। সুন্দর করে আমার সাথে বসে হলুদ আর মেহেদী লাগাবেন বুঝেছেন? আমি কিন্তু এখন আপনার সব কথা শুনি। আপনারও উচিত আমার শখ পূরণ করার। জানেন? আমার কতো শখ ছিল বড় অনুষ্ঠান করে আমাদের আবার বিয়েটা হবে, আপনি বরযাত্রী নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসবেন এবং আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন কিন্তু তার কিছুই হচ্ছে না শুধু আপনার ত্যাড়ামির কারণে।। তাই আমি আবদার করছি প্লিজ এবার আর কোনো ত্যাড়ামি করবেন না। আমার জন্য হলেও একটু সহ্য করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কেমন?
রিদ কিছু বলল না। শুধু মায়ার দিকে তাকিয়ে হা করে মায়ার হাত থেকে লোকমাটা মুখে তুলল। গম্ভীর গলায় বলল….
‘তোমার যা যা লাগবে লিস্ট করে দিও আমি এনে দিব।
‘আপনি মেয়েদের শপিং বুঝবেন না। আম্মু বলেছে জুই আসলে আমাদের নিয়ে শপিংয়ে যাবে তখন।
রিদ মায়াকে বাধা দিয়ে বলল…
‘তাহলে কোনো অনুষ্ঠান করতে হবে না।
রিদের হঠাৎ মর্জি ঘুরে যেতেই মায়া বলল..
‘আপনার মিনিটে মিনিটে মর্জি নড়ে কেন?
‘ তুমি কথা শুনলেই তো হয়। শোনো না কেন?
‘আচ্ছা শুনব। আমি কালই আপনাকে একটা লিস্ট করে…
রিদ মায়াকে থামিয়ে দিয়ে বলল…
‘কাল সন্ধ্যায় আমি গাড়ি পাঠাব। তুমি রেডি হয়ে থেকো।
মায়া অবাক চোখে রিদের দিকে তাকিয়ে বলল…
‘আপনি আমাকে শপিং করতে নিয়ে যাবেন? সত্যি?
রিদ মায়াকে আর উত্তর দিল না। বরং ফের হা করে মায়ার বাড়িয়ে দেওয়া লোকমাটা মুখে তুলল। রিদ বলল…
‘তুমি খেয়েছ?
মায়া ভাত মাখিয়ে ফের লোকমা বানিয়ে রিদের মুখের সামনে ধরে বলল…
‘আপনাকে খাইয়ে আমি খাব।
মায়ার বাড়িয়ে দেওয়া লোকমাটা রিদ মায়ার মুখে দিকে ঠেলে দিয়ে বলল…
‘স্বামী স্ত্রী একই প্লেটে খেলে মহব্বত বাড়ে।
মায়া রিদের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের লোকমাটা মুখে তুলে বলল…
‘ আপনাকে আমি কত্তো ভালোবাসি যদি আপনি বুঝতেন তাহলে আমার সাথে এতো ত্যাড়ামি করতেন না নেতা সাহেব। বরং বেশি বেশি ভালোবাসতেন।
‘আমিও তোমাকে ভালোবাসতেই চাই। কিন্তু তুমিই তো আমার লোড নিতে পারো না।
রিদের কথায় মায়া থমথমে খেয়ে যায়। মায়া মনের মিল কিংবা নরমাল ভালোবাসার কথা বলেছিল কিন্তু রিদ কথাটা ঘুরিয়ে অন্যভাবে নিয়েছে। মায়া থমথমে মুখে রিদের মুখে লোকমা বাড়িয়ে বলল…
‘আমি কিন্তু কথাটা পজিটিভ বুঝিয়েছি।
রিদ মায়ার কপালে দুই আঙুলে টোকা দিয়ে মায়ার বাড়িয়ে দেওয়া লোকমাটা মুখে নিয়ে বলল…
‘আমিও তো পজিটিভই বুঝলাম। কেন তুমি বুঝি নেগেটিভ শুনেছ না? সারাদিন মাথায় এসবই চলে?
মায়া থমথমে মুখে রিদের সঙ্গে আর কথা বাড়াল না। বেশি কথা বাড়ালে রিদ লাগামহীন হয়ে যাবে। সরাসরি আলোচনায় বসে যাবে তখন মায়ার সঙ্গে। মায়া রিদকে খাইয়ে নিজে খেয়ে নিল। খাবার ট্রলি নিচে রান্নাঘরে রেখে আসল। ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে রিদকে ঘরে কোথাও দেখল না মায়া। ওয়াশরুমের দরজাটাও বাহির থেকে লাগানো, বারান্দার দরজা খোলা তার মানে রিদ বারান্দায় আছে। ফোনটা চার্জে নেই মানে হয়তো ফোন নিয়েই বারান্দায় গেছে রিদ কথা বলতে। মায়া রুমে খাবারের স্মেল পেল। রিদ ঘরে খাবারের স্মেল সহ্য করতে পারে না। তাই মায়া সারারুমে রুম স্প্রে করল। বিছানাটা গুছিয়ে সুন্দর করে ঝেড়ে নিল।
পরিপাটি বিছানা করে রিদের রাখা ভিজা তোয়ালেটা বারান্দায় মেলে দেওয়ার জন্য বারান্দায় গিয়ে মায়া দেখল রিদ আবছায়া অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। মায়া আবছায়া অন্ধকারের মাঝে ভিজা তোয়ালেটা গ্রিলে মেলে দিল। রাতে বাতাসে তোয়ালেটা শুকিয়ে যাবে আর গন্ধ ছাড়াবে না। মায়া বারান্দায় ভিজা তোয়ালে ছড়িয়ে চলে যেতে নিলে হঠাৎ ওড়নায় টান পেতেই মায়া পিছন ঘুরে তাকাল। আবছায়া অন্ধকারে দেখল রিদ বারান্দার গ্রিলে পিঠ ঠেকিয়ে কানে ফোন চেপে অপর হাতে মায়ার ওড়না টেনে ধরে আছে। মায়া রিদের ওড়না চেপে ধরায় স্বাভাবিক ভাবেই মায়া পিছন ঘুরে তাকাল। রিদের দিকে তাকাতে অন্ধকারে রিদের বাদামী রঙের চোখগুলো হঠাৎ জ্বলে উঠল মায়ার চোখে কিসের নেশায়। রিদের এসব নেশাক্ত দৃষ্টি মায়া বুঝে। সংসার জীবনে মায়াকে বেশ কয়েকবার রিদের এসব দৃষ্টিতে পড়তে হয়েছে। মায়া রিদের থেকে ওড়না টেনে হাঁসফাঁস করে বলল…
‘আপনি কথা বলুন আমার ঘরে কাজ আছে।
মায়া রিদের থেকে ওড়না ছাড়িয়ে চলে যেতে চাইলে লম্বা হাত বাড়িয়ে রিদ তৎক্ষনাৎ মায়ার কনুই টেনে নিজের কাছে টানল। মায়াকে বুকে চেপে ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে রিদ বলল….
‘আপনাকে পরে ফোন দিচ্ছি মিস্টার নওশাদ।
রিদ কল কেটে হাতের ফোনটা বারান্দার সোফার উপর ঢিল মেরে ফেলে মায়াকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরতে মায়া রিদের বুকে মোচড়ামুচড়ি করে নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে বলল…
‘ছাড়ুন। দাদাভাই ডাকছে উনাকে গরম পানি করে…
মায়ার বাকি কথা শেষ করার আগেই রিদ দু-হাতে মায়াকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে দুজনের অধর মেলাল। রিদের ছোঁয়ায় মায়ার আজও শরীর ছেড়ে দেওয়ার অভ্যাস আছে। মায়া শরীর ছেড়ে দিতেই রিদ মায়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে দু-হাতে আগলে নিলো মায়াকে। মায়া যখন নিঃশ্বাসের অভাবে ছটফটিয়ে উঠছিল তখন রিদ বিরক্ত হয়ে মায়াকে ছেড়ে মায়ার গাল চেপে ধরে চাপা স্বরে বলল…
‘স্টুপিড নিশ্বাস আটকে কে চুমু খায়?
‘আপনাকে কে বলেছে চুমু খেতে? ছাড়ুন।
রিদ ক্ষেপে গিয়ে ফের মায়ার ওষ্ঠ চেপে ধরতে ধরতে বলল…
‘তুই মর নিশ্বাস আটকে বেয়াদব।
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৮
ভালোবাসার মাঝেও মায়া রিদের ধমক খেল। মায়াকে আর সুযোগ না দিয়ে রিদ মায়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াল। রিদ এক হাতে মায়ার গায়ের ওড়নাটা টেনে ফ্লোরে ফেলে মায়ার ঠোঁট থেকে গলায় নেমে গেল কয়েক মিনিটের মাঝে। মায়ার গলায় কামড়ে ধরে রিদ বলল…
‘বেবি চাও অথচ স্বামীর কাছে আসতে চাও না। আমি ছাড়া বেবি হবে তোমার জান?
