Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৯+২০

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৯+২০

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৯+২০
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

“ আজব তো আপনি কী হার্ট অ্যাটাক করাতে চাচ্ছেন নাকি আমার! ”
“ রাত বিরাতে রান্নাঘরে বসে এতো কী ভাবছো তুমি? ”
“ ক..ই কিছুই ভাবছি না। ”
“ তাহলে এখানে কী করছো? ”
“ ঐ এমনেই, হঠাৎ করেই আজকে রান্নাঘরের কথা অনেক মনে পরছিল তাই একটু সময় কাটাতে আসলাম। ”
“ রিয়েলি! মাথার ঘিলুতে মনে হয় গোলমাল হয়ে গেছে তোমার । রুমে আসো। ”
“ আপনি যান আমি আসছি ”
নিচের দিক তাকিয়েই বললো হীরা। অনিল আঁচ করতে পারলো কিছুটা যে ঐ ঘটনার জন্যই হীরা ঘরে যেতে চাইছে না আর নাতো তার দিক ভালো করে তাকাচ্ছে। সে এগিয়ে গিয়ে হীরার হাত টা ধরে ঘরের দিক হাঁটা ধরলো। হীরাও চুপচাপ চললো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

শুরু হলো এক নতুন সকালের, এহসান ভিলার সকলে তখন রেডি হতে ব্যাস্ত, কিছুক্ষনের মধ্যেই তারা রওনা হবে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। নাজিয়া বেগমরা দুই বোন, বড়ো বোন সাহেরা বেগমের বাড়ি চট্টগ্রামে আর তার বাড়ি ঢাকায়। বড়ো বোনের এক মেয়ে দুই ছেলে- মেয়ে রীতি, আনিকার থেকে দুই বছরের বড়ো। দুই ছেলে বড়োটার নাম নিরব, অনিলের সমবয়সী। ছোট ছেলে রবির বয়স ৯ বছর। তার বোনেরাও তাদের মতো যৌথ পরিবার। সবাই একসাথেই থাকেন। সাহেরা বেগমের স্বামী ঐ বাড়ির বড়ো ছেলে তার ছোট আরো দুজন ভাই আছে। দুজনেই বউ বাচ্চা নিয়ে এখনো ভাইয়ের সাথেই থাকেন। নাজিয়া বেগম আগে প্রায়ই বোনের বাড়িতে যেতেন তবে অনিল বড়ো হওয়ার পর আর তেমন যাওয়া হয়নি তার। পাক্কা ৩ বছর পর আজকে বোনের বাড়িতে যাচ্ছেন তিনি। তাও আবার সবাই মিলে! খুশীর অন্ত নেই তার। সবায় রেডি হয়ে নিচে নামতেই অনিল গাড়ি নিয়ে এলো, সকলে গাড়িতে উঠে বসলো। অনিল ও তার বাবা সামনে বসলো আর হীরা, আনিকা ও নাজিয়া বেগম ব্যাক সিটে বসলেন।

“ আম্মু ছোটো খালামনিরা কখন আসছে? ”
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই রান্নাঘরে থাকা মায়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো রীতি। মেয়ের কথায় সাহেরা বেগম রান্নাঘর থেকে বললেন,
“ রওনা দিয়ে ফেলেছে কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে। ”
“ ওহ ”
বলেই ড্রয়িং রুমের সোফায় গিয়ে আরাম করে বসলো রীতি। এর মধ্যেই তার চাচাতো বোন ইতি এসে উচ্ছাসিত কণ্ঠে বললো,
“ এই রীতি আপু তোমার ঐ খালাতো ভাইটা আসবো নি ? ”
“ হুম আসবে। তবে এইবার অন্তত তুই উনার থেকে নজর এড়িয়ে রাখিস কারণ আমাদের ভাবিও আছে এইবার। ”
“ হুম সেটাই । ঐ মেয়েটাকে দেখলে আমার বড্ডো হিংসা লাগে আমার ছোটবেলার ক্রাশকে কেড়ে নিলো আমার থেকে। ”
শেষের কথাটা কান্নার অভিনয় করে বললো ইতি। তার এমন কাণ্ডে হেসে ফেললো রীতি। ওঁর মাথায় চাটি মেরে বললো,

“ ধুর মেয়ে। এটা যার যার ভাগ্য, আর তোর কয়টা ক্রাশ? একেকদিন একেক টার জন্য কাঁদিস। ”
“ আরে ঐগুলা তো উপন্যাসের নায়ক। আর এটা তো ছিলো বাস্তব।”
“ আরেক বেডির নায়কের উপর ক্রাশ খাইয়া বইয়া থাকিস লজ্জা করেনা! ”
“ আর কে কইছে আরেক বেডির নায়ক! আমি যখন উপন্যাস পড়ি তখন আমি নায়িকারে ডিলিট কইরা নিজেরে নায়িকার জায়গায় বসাই দেই, তো নায়িকা তো আমিই হইলাম। সুতরাং এটা নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছুই নাই। তুমি বুঝবা না উপন্যাস পড়লে বুঝতা। ”
“ আমার বুঝা লাগবো না। তুই শুধু আমার অনিল ভাইয়ার থেকে দূরে থাকবি। ”
“ আচ্ছা আচ্ছা। দেইখো ফিরাও তাকামু না তোমার ঐ গম্ভীর ভাইয়ের দিক। আমার জন্য আমার উপন্যাসের নায়কগুলোই যথেষ্ট। ”
বলেই মুখ ভেঙচি কেটে সেখান থেকে চলে গেলো ইতি। সে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো রীতি। সারাদিন উপন্যাসের নায়কদের কথা বলতে বলতেই মাথা খেয়ে ফেলে এই মেয়ে। আল্লাহ মালুম উপন্যাসের মাঝে কী পায় ওঁ। সেও ভেবেছিলো একবার পড়ে দেখবে তবে সময়ের জন্য পারেনি আর এখন তো তার বিয়েই।

বিকেলের দিকে,
অনিলের গাড়ি এসে থামলো একটা বড়ো সরো দেয়াল করা রাজকীয় দালানের সামনে। গাড়ির শব্দ পেতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলো বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য। মাত্র গাড়ি থেকে নেমেছিলো অনিল এর মাঝেই নিরব এসে তার কাঁধে চাপড় মেরে বললো,
“ কিরে ডাক্তার অবশেষে আমাদের গরীব মানুষদের বাড়িতে এলি। ”
“ হুম আসলাম। তোর আজাইরা কথা গুলো শুনতে। ”
“ আজাইরা কথা আমি কইনা ব্রাদার, এমনেই ডাক্তার মানুষ আবার বিয়াও কইরা ফালাইছস তো বড়লোক তো তুই অবশ্যই। তা তোর বউ কই? ”
তার কথায় চোখের ইশারায় আনিকার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা হীরাকে দেখালো অনিল। সাথে সাথেই নিরব হীরার নিকট এগিয়ে গিয়ে বললো,

“ আসসাামু-আলাইকুম ভাবী, কী অবস্থা আপনার? ”
সালামের জবাব দিয়ে হীরা কিছুটা ইতস্তত করে বললো,
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি? ”
“ এইতো আছি ভালোই। কিরে কুটনি তোর কী খবর? ”
শেষের কথাটা আনিকাকে উদ্দেশ্য করে বললো সে। নাক মুখ সিঁটকে আনিকা জবাব দিলো,
“ দেখুন নিরব ভাইয়া সবসময় এমন সম্বোধন ভালো লাগে না আমার। ”
“ ওহ্ আচ্ছা, সবসময় এমন নাম ভালো লাগে না মানে এখন নতুন নাম চাই তোর? ওকে এখন থেকে কুটনি বুড়ি বলে ডাকবো তোকে । ”

“ ভাইয়া উনাকে কিছু বলছো না কেন তুমি? ”
বোনের কথায় অনিল নিরবকে মিছে মিছে চোখ রাঙিয়ে বললো,
“ এই নিরব থামবি তুই। ”
“ যাহ তোদের ভাই বোনকে কিছুই বলবো না দুইটাই এক। ভাবী চলুন আমরা যাই। ”
বলেই হীরার হাত টা ধরতে নিবে এর আগেই ছু মেরে হীরাকে সেখান থেকে নিয়ে আসলো অনিল। তারপর তাকে আনিকার সাথে বাড়িতে ঢুকতে বললো। সবাই আরো আগেই চলে এসেছিলো তারা আসতেই সেখানে অনিল ও নিরব একা রইলো। অদূরে হীরার যাওয়ার পথে চেয়ে থেকে অনিল এইবার নিরবের উদ্দেশ্যে বললো,

“ সবসময় ৩ হাত দুরত্ব বজায় রাখবি ওঁর থেকে। ”
“ আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ আল্লাহ তুমি গজব ঢালো এই শা*লার উপরে তোর বোন থাকতে তোর বউ এর দিক নজর দিতে যামু আমি? ছি! ছি! ছি। এই কথা শুনার আগে আমার মর*ণ কেন হলো না বিধি! ”
“ অ্যাক্টিং বাদ দিয়ে চল। আর আমার বোনের দিকে তো আরো আগেই নজর দিবি না। ”
“ নজর দিলেও তোর বোন আমার না দিলেও আমার। ”
“ সেটা আল্লাহ ভালো জানে। ”
“ এই কিরে শা*লা তোর মতি গতি তো ভালো মনে হইতাসে না তুই কী তোর বোনরে দিবি না। ”
“ আগে আমার বোনকে রাজি করা তারপর দেওয়া নেওয়া। আর সম্বোদন ঠিক কর সমন্ধী রে শা*লা কয়- এমন পাগলরে আমার বোন বিয়ে করবে না। ”
“ আরে আগে তোর বোন আমার হোক তারপর সব ঠিক কইরাই কমু। এর আগে চিল দোস্ত। ”
বলেই দুজনে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো।

যেখানে অনিল আছে সেখানে ঘাড়ত্যাড়ামি নেই তা কখনো হয়? সবকিছুতে বেঁকে বসা অনিলের জন্মগত স্বভাব বলেই মনে হয় নিরবের। তবে সেও কম নয় আজ যেভাবেই হোক ওই অনিলকে সে পাঞ্জাবি পড়িয়ে ছাড়বেই। সে উদ্দেশ্যেই অনিলের রুমের দিকে যেতে যেতে বাড়ির সকল ছেলে সদস্যদের বললো,
“ এই চল সবকয়টা আজকে ওই শা*লারে জোর জবরদস্তি করে হলেও পাঞ্জাবি পড়ায়া ছাড়ুম। ”
তার কথায় দেরি না করে সকলে তার সাথে চললো। রুমে বসে ফোন স্ক্রোল করছিল অনিল। সহসা নিরবকে এমন দল বল নিয়ে ঢুকতে দেখে কপাল কুঁচকে গেল তার। কিছু বলতে নিবে এর আগেই নিরব সকল ছেলেপুলেদের উদ্দেশ্যে আদেশ ছুড়লো,

“ এই অরে ধর সবগুলায়, ধইরা শার্টখুল। ”
“ মানে কি এইসবের! ”
“ মানে একটাই হয় তুই ইচ্ছাকৃতভাবে পাঞ্জাবি পড়বি নয়তো আমরা জোর জবরদস্তি করে তোকে পাঞ্জাবি পড়াবো। এখন তুই যেটা চুজ করস। ”
“ একাবর বলেছি না আমার এসবে ইন্টারেস্ট নেই। ”
“ ভাই তুই একবার ট্রাই করে তো দেখ। সকলে একসাথে হইলে অনেক মজা হইবো। ”
তার সাথে সাথে সকলে একসাথে গলা মিলিয়ে বলে উঠলো,
“ হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই এইবার পইরা দেখেন। দেইখেন অনেক মজা হইবো। ”
তাদের কথায় কিছুটা গলে গেল অনিল। বললো,
“ আচ্ছা পাঞ্জাবি দে আমি পড়ে আসছি। ”
বলেই নিরবের হাত থেকে পাঞ্জাবি টা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল সে।

মেয়েরা কেউই এখনো তৈরি হয়নি। ছাদে স্টেজ সাজাতে ব্যস্ত এক একজন। শুধু রীতিকে সাজানো হয়েছে, বাকিরা স্টেজ সাজিয়ে গিয়ে তৈরি হবে। ফুলের ঝুড়িটা হাতে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে হীরা তার থেকে ফুল নিয়ে স্টেজে ডিজাইন করছে আনিকা। এর মাঝেই সেখানে উপস্থিত হলো সকল ছেলে সদস্য। সেখান থেকে নীরবের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা ব্লু কালারের পাঞ্জাবি পরিহিত কালো শাল গলায় দেওয়া পুরুষটিকে নজরে আসতেই পৃথিবী থমকে গেল হীরার। ফুলের ঝুড়িটা হাত ফসকে পড়ে গেল মেঝেতে। তার এহেন কাণ্ডে প্রথমে সবাই অবাক হলেও পরবর্তীতে শব্দ করে হেসে উঠলো। তবে হীরা এখনো ধ্যান থেকে বের হতে পারেনি। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অনিলের দিকে। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মুখটার উজ্জ্বলতা যেনো আজ আরও বেড়ে গেছে, মসৃণ গালের ঐ ছোট ছোট দাড়িগুলো যেন আজ একটু বেশিই টানছে হীরাকে, কৃষ্ণ রঙ্গা মোটা ভ্রু যুগলের নিচটায় বিদ্যমান হালকা বাদামি মণিযুক্ত আঁখি যুগলের তীক্ষ্ণ চাহনি আজ যেনো তার সামনে থাকা কিশোরীটিকে নাড়িয়ে তোলার পণ করেছে।

“ আরে ভাবী চোখের পলক তো ফালান। ”
পিছন থেকে একটি ছেলে বলে উঠলো। ছেলেটির কথায় আবারো সবার মাঝে হাসির রোল পড়লো। তবুও হীরার কোন ধ্যান জ্ঞান নেই। এবার অনিল হীরার উদ্দেশ্যে ভ্রু নাচালো। তার ভ্রূ জোড়া নড়তেই হুশ ফিরে পেল হীরা। সাথে সাথেই লজ্জায় নুইয়ে পরলো। লজ্জায় তৎক্ষনাৎ ঘুরে দাঁড়ালো সে। তা দেখতেই আবারও উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সবাই। হীরার গাল দুটো লজ্জায় একদম রক্তিম হয়ে উঠলো।

“আ’ উযু বিকালিমা তিল্লা-হিত তা- ম্মাতি,
মিন কুল্লি শাইত্বা- নিঁও ওয়া হা-ম্মাহ,
ওয়া মিন কুল্লি আইনিল লা-ম্মাহ”
চারপাশ জুড়ে গান বাজনার মাঝেও কানে হাত দিয়ে গুনে গুনে তিনবার অনিল ও তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমটায় বসে দোয়াটা পড়লো হীরা। এর মাঝেই রুমে প্রবেশ করলো অনিল। কিছুক্ষন আগে হীরাই তাকে মেসেজ দিয়ে বলেছে আসার জন্যে। সে আসতেই হীরা তার নিকট এগিয়ে আসলো, মুখে কুলুপ এঁটে হাতের ইশারায় অনিলকে বললো মাথা নিচু করতে। অথচ অনিল মাথা তো নুয়ালই না উল্টো হীরার দিক কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তার এমন কাণ্ডে হীরার মনে মনে রাগ হলেও মুখে কিছু বলতে পারলো না। নিজের ছোট্ট হাত টা দিয়ে পূর্ণ অধিকার নিয়ে অনিলের বড়সড় হাতটা আকড়ে ধরে হাঁটা ধরলো। রুমে রাখা কিছু সোফার মধ্যে একটার সামনে গিয়ে থামলো। তারপর অনিলকে দাঁড় করিয়ে নিজে সোফায় উঠে গেলো। তার এমন কাণ্ডে অনিল কিছু বলতে নিবে এর আগেই হীরার পরবর্তী পদক্ষেপ দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীরে ফুঁ দিয়ে সোফা থেকে নেমে গেলো হীরা। এইবার অনিল ভ্রু দ্বয় কুঁচকে হীরার উদ্দেশ্যে বললো,

“ কী হলো এটা! ”
“ আপনাকে বদ নজর থেকে বাঁচালাম। ”
হাত দুটো পেটের দিকটায় ভাঁজ করতে করতে উত্তর করলো হীরা। ভাব এমন যেনো খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে ফেলেছে। এইবার সেখান থেকে একটা হাত চিন্তিত ভঙ্গিতে থুতনির মাঝে রেখে বললো,
“ আপনার নাহ ৩০ টা পাঞ্জাবি কেনা দরকার। ”
“ কেন? ”
“ আপনি প্রতিদিন একটা একটা করে নতুন পাঞ্জাবি পরবেন আর আমি প্রতিবার আপনাকে দেখে মুগ্ধ হবো।”
তার এমন নিঃসঙ্কোচ কথাবার্তায় মনে মনে বেশ হাসলো অনিল। তবে সরাসরি বললো,

“ প্রতিদিন দেখলে পরে বিতৃষ্ণা তৈরি হয়ে যাবে। অকস্মাৎ সবকিছুই সুন্দর। ”
বলেই ছাদের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো সে। দরজার বাইরে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো,
“ কিশোরী দের কান্ড কারখানা খুবই ডেঞ্জারাস ”
এইদিকে অনিল যেতেই হীরা তড়িঘড়ি করে রেডি হতে শুরু করলো। আসলে ছেলেরা সব ছাদে যেতেই তাদেরকে কাজে লাগিয়ে মেয়েরা সব রেডি হতে এসে পরেছিল তবে হীরা আসার সময় খেয়াল করেছে প্রায় সবগুলো মেয়েই অনিলের দিকে কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। তাকানোটা যদিও স্বাভাবিক কারণ অনিল এমনেই সব ছেলেগুলোর থেকে সুদর্শন সাথে এই প্রথম সবাই তাকে পাঞ্জাবি তে দেখেছে তাই ওমন ভাবে তাকিয়ে ছিলো। তবে হীরার ব্যাপারটা একদমই ভালো লাগে নি তার ডাক্তার সাহেব কে শুধু সেই দেখবে অন্য মেয়েদের এমন নজরে বড্ডো বিরক্ত হচ্ছিলো সে। তাই তার মা সবসময় তাকে বদনজর থেকে বাঁচানোর জন্য যেই দোয়াটা পড়তেন সেটা পড়েই অনিলকে ফুঁ দিয়ে দিয়েছি। এতক্ষণে নিশ্চিন্ত সে।

স্টেজ সাজিয়ে গুছিয়ে একদম নিশ্চিন্তে বসে আছে যুবকদল। অথচ মেয়েদের আসার কোনো নাম নেই তারা সাঁজতে সাঁজতেই আজকে রাত কাটিয়ে দেবে এসব বলতে বলতেই রীতির পাশে বসে হাসাহাসি করছিলো ছেলেরা। এর মধ্যেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো কাঁচা হলুলের মাঝে ব্লু কালারের লেহেঙ্গা পরিহিত সকল মেয়েদল। তন্মধ্যে সকলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে ছোট্ট শরীরের অধিকারী পিচ্ছি কিশোরীটির পানে নজর আটকালো অনিলের। একদম পা থেকে মাথা অব্দি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো কিশোরীটিকে।

“ দোস্ত রে মানুষ কয় শাড়ীতেই নাকি নারী,
তোর বোনরে দেইখা তো মনে হচ্ছে লেহেঙ্গাতে নারীরা পরী ”
সহসাই কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো নিরব। তার কথায় এইবার হীরার থেকে চোখ সরিয়ে তার দিক অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো অনিল যেনো তাকে কাঁচা গিলে খেয়ে ফেলবে। তার এমন চাহনিতে ভরকে গেলো নিরব কাঁধে চাপড় মেরে মেকি হেসে বললো,
“ আরে রাগছিস কেন বন্ধু মজা করলাম জাস্ট। ”
“ দুনিয়াতে তুই ই মনে হয় একমাত্র লাভার যে কিনা মেয়ের ভাইয়ার কাছে মেয়ের ব্যাপারে এসব বলিস! ”
“ ইয়েস ব্রাদার আ’ম অলওয়েজ ইউনিক। কিন্তু তোর বোন টাই বুঝলো না। ”
শেষের কথাটা অতি আফসোসের স্বরে বললো নিরব। তা দেখে হেসে ফেললো অনিল। অতঃপর উঠে পরলো সবাই শুরু হতে লাগলো হলুদের প্রধান পর্ব।

নাচ,গান ও হলুদ পড়ানোর পর্ব শেষ হলো রাত বারোটার দিকে । এতক্ষন যাবৎ একে একে সকল যুবক যুবতী কাপল ড্যান্স করছিলো। কখনো দুজন দুজন করে কখনো বা সবাই মিলে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিরব ও আনিকার ড্যান্সটা বেস্ট লেগেছে হীরার কাছে। “ PALAT TERA HERO IDHAR HAIN ” গানের মধ্যে নাচছিল নিরব, মাঝ খানে আনিকাকে বসা থেকে টান মেরে নিয়ে তাকেও যোগ করলো নাচে। প্রথমে আনিকা বিরক্ত হলেও সবার সামনে বাধ্য হয়ে বেচারি অনিচ্ছা সত্ত্বেও নেচেছে। আর তাদের এই নাচটাই সবাই অনেক পছন্দ করেছে। নাচ গানের পর্ব শেষ হতেই বাড়ির বড়রা সকলে নিচে চলে গেলো। ছেলে মেয়েরা ছাঁদের মধ্যেই রয়ে গেলো। এর মধ্যেই সেখানে খাতা কলম নিয়ে হাজির হলো নিরব, উদ্দেশ্য “চোখ টিপ” খেলবে। ছাদের মাঝখানে এক পাশে মেয়েরা আরেকপাশে ছেলেরা গোল করে বসেছে। নিরব আসতেই তার থেকে খাতা নিয়ে গুটি কয়েক কাগজের টুকরা ছিড়ে সেখানে বিভিন্ন বর্ণ লিখলো এবং একটার মধ্যে চোখ এঁকে দিলো তারা। তারপর একটা নির্দিষ্ট পেজ এ সবার নাম লিখে সেখানে পয়েন্ট লিখার জায়গা রেখে খেলা আরম্ভ করলো। প্রথমে চোখ পেলো ইতি। সে আনিকাকে সবার অগোচরে চোখ মারলো। আনিকা বেশ সময় নিয়ে বললো,

“ আমি মরেছি, আমি মরেছি ”
তারপর তার ডান পাশ থেকে একেকজন অনুমান করে বলা শুরু করলো কে চোখ পেয়েছে। মাত্র কয়েকজন সঠিক বলতে পেরেছে আর যারা বলতে পারে নি তারা শূন্য পেয়েছে। দ্বিতীয়বারে চোখ পেলো অনিল। এক প্রকার বাধ্য হয়েই এসব খেলায় অংশ গ্রহণ করেছে সে। তাকে নাচতে বলায় বলেছিলো নাচ ব্যাতিত যা বলবে তাই করবে আর তার দরুণ এসব খেলতে হচ্ছে তাকে। এইদিকে হীরা এই প্রথম এসব খেলা খেলছে আনিকা যেভাবে যেভাবে বুঝিয়েছে সেভাবে সেভাবেই খেলছে সে। সবার দিক চোখ রাখছে তবে ছেলেদের দিক ভুলেও তাকাচ্ছে না। হঠাৎ কী ভেবেই যেনো অনিলের দিক তাকালো সাথে সাথেই তাকে চোখ মারলো অনিল। শিউরে উঠলো হীরা, ব্যাপারটা হজম করতেই বেশ সময় লাগলো তার। এক পর্যায়ে কাঁপা গলায় থেমে থেমে বললো,

“ আ. আমি মরেছি। ”
আবারও একই ভাবে সবাই অনুমান করে বললো কে চোখ পেয়েছে। এইবার মেয়েরা কেউই পারলো না। তবে মেয়েরা না ধরতে পারলেও হীরার বলার ধরণ দেখেই ছেলেরা সকলেই ব্যাপারটা ধরে ফেললো। এমন করেই আরো ৩/৪ বার খেলা হলো অথচ হীরা একবারও চোখ পেলো না। ৫ বারের বেলায় ও না পাওয়ার আশা নিয়েই ভাঁজ করা কাগজ টা মেললো তবে খুলতেই সেখানে চোখ আঁকা দেখে খুশি হয়ে গেলো সে। কিন্তু বুঝতেই পরলো না তার এই হাসি মুখ দেখে সকলেই আন্দাজ করে ফেললো ব্যাপারটা। পাশে থাকা আনিকা টুপ করে বলেও ফেললো,
“ আমি মরেছি, আমি মরেছি। ”

আগের মতোই আনিকার ডান পাশ থেকে বলা শুরু হলো। বলতে বলতে একদম শেষ অব্দি সকলে হীরাকে বলতে লাগলো তা দেখে মুখটায় আঁধার নেমে এলো হীরার। ভাবলো চোখ পেয়েও লাভ হলো না শূন্যই পেতে হবে তাকে। তবে সে তো জানেনা তার এই আঁধার মুখটা যে অপরপাশে বসে থাকা পুরুষটির একবারেই সহ্য হয় না। সবার বলা শেষ হতেই যখন অনিলের পালা এলো তখন সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে এই প্রথম ভূল উত্তর করলো,
“ আমি নিরবকে ”

কথাটি কর্ণপাত হতেই তার দিক চকিত চাইলো হীরা। তৎক্ষনাৎ এতক্ষণের আঁধার নামা মুখটায় খুশির ঝলক দেখা দিলো। তবে পরক্ষনেই আবার অনিলের কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। একটাও শূন্য পায়নি অনিল এইবার প্রথম পেলো- “ আচ্ছা উনি কী তাকে বাঁচাতে ইচ্ছে করে ভূল বললো? নাহলে সবায় ই তো বুঝে গেছিলো সে চোখ পেয়েছে, উনি তো আরো আগে বুঝার কথা ছিলো! তার ভাবনার মাঝেই খেলা কন্টিনিউ করা হলো। অবশেষে খেলার শেষে পয়েন্ট গুনে অনিল রাজা আর হীরা রানী হলো। হীরার তো খুশির অন্ত নেই, খুশির রেশ চোখে মুখে ভাসছে তার। এর মাঝেই তাকালো অনিলের দিক, হাসলো অমায়িক- মনে পরলো অনিলের চোখের ইশারা করে বুঝিয়ে দেওয়া প্রত্যেকটা মুহূর্ত। অনিল যদি তাকে না ইশারা করতো তাহলে সে প্রত্যেকটা তেই শূন্য পেতো। আর এখন একদম রানী হয়ে গেছে তাও আবার অনিলের রানী। তার ডাক্তার সাহেবের রানী! ভাবা যায়!

“ দোস্ত আমার পুরাই দেওয়ানা হইয়া গেছে দেখি! বউয়েরে লুকাইয়া লুকাইয়া ইশারা করে! দেখি দেখি সবই দেখি। ”
কথাটা বলেই অনিলের দিক বাঁকা চোখে তাকালো নিরব। মেয়েরা সব নিচে গেছে ট্রুথ অর ডেয়ার খেলার জন্য বোতল খুঁজতে। এই ফাঁকেই অনিলকে জ্বালানোর সুযোগ টা মিস করলো না সে। তার কথায় অনিল আকাশের দিকে তাকিয়েই বললো,
“ ওঁর ঐ স্নিগ্ধ মুখ খানায় আঁধার নামার ব্যাপারটা একেবারেই সহ্য হয় না আমার। ”
কিছুক্ষন থেমে আবারও বললো,

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৭+১৮

“ ঐ আঁধার দূর করতে আমি সকল আলো এনে দিতে প্রস্তুত আর এ তো ছিলো সামান্য একটা পয়েন্ট! ”
“ বাহ বাহ! ভালোবেসে তো পুরো উপন্যাসের নায়ক হয়ে গেলি। ”
“ উপন্যাসের নায়ক গুলোর চরিত্রও কিন্তু বাস্তবের কোনো এক পুরুষের ভালোবাসার থেকেই কল্পিত হয়। ”
“ বাস্তবে কী এখন আর কেউ কাউকে এতো ভালোবাসে! এখনকার ভালোবাসা পুরাটাই তামাশা। ”
“ কাপুরুষের ভালোবাসায় বিষাক্ত হয় চারিপাশ,
সুপুষরা ভালোবাসলে নারী পায় নতুন করে বাঁচার আশ্বাস ”
“ তুই সুপুরুষ তা ভাবীর হাসিমুখ দেখেই আমি কনফার্ম। ”
“ হতে পারে ”

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২১+২২