Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৮

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৮

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৮
আয়াত বিনতে নূর

প্রায় অনেকক্ষণ পর ফারিস নিশিতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে। তারপর ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিয়ে নরম স্বরে বলল,
“এখন আমি যাই, নাহলে কেউ দেখে ফেললে ঝামেলা হবে।”
এই কথা বলে ফারিস বেড থেকে উঠে দাঁড়ালো।
নিশিতাও নিজেকে সামলে নিলো, এলোমেলো অনুভূতিগুলো গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করলো।
যাওয়ার আগে ফারিস ঝুঁকে নিশিতার কপালে ছোট্ট একটা চুমু এঁকে দিলো।

নিশিতা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো, মুখে লাজুক একটা হাসি খেলে গেলো। এরপর ফারিস নিশিতার রুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। আর ফারিস চলে যাওয়ার পর নিশিতা পড়তে বসলো।
কিছুদিন ধরে পড়াশোনায় বেশ অনিয়ম হয়ে গেছে তার। পরীক্ষাও আর বেশি দিন বাকি নেই।
তাই মনোযোগ দিয়ে বইয়ের পাতায় চোখ রাখলো।
এদিকে ফারিস নিজের রুমে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে এলো। গায়ে শুধু একটা টাওয়াল জড়ানো আর কিছুই নেই।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

চুল মুছতে মুছতে ক্লজেট খুলে শার্ট, প্যান্ট আর স্যুট বের করে বেডের ওপর রেখে দিলো।
ঠিক তখনই ফোনে নিহানের কল এলো।
ফারিস ফোনটা তুলে রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে
নিহান বলল,
“স্যার, একটু পর তো একটা মিটিং আছে। কী করবো স্যার?”
ফারিস মুহূর্তের জন্য কিছু ভাবলো। তারপর বলল,
“না, ক্যান্সেল করবো না। আমি মিটিং অ্যাটেন্ড করবো কিন্তু বাড়ি থেকেই।
সবাইকে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দিতে বলো।”
“আচ্ছা স্যার,”
বলে নিহান কল কেটে দিলো। ফারিস দ্রুত রেডি হয়ে নিলো। ল্যাপটপ ওপেন করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিডিও কনফারেন্স শুরু হয়ে গেলো।

দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা গড়িয়ে ৭টা ৪০ মিনিট ছুঁয়ে ফেলেছে। নিশিতা হঠাৎ যেন সময়টার দিকে খেয়াল করেই চমকে উঠলো। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠলো। এতক্ষণ পড়তে পড়তে সময় যে এভাবে চলে গেছে, সে
নিজেও টের পায়নি। নিশিতা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো নিচে যাওয়ার জন্য। বই, খাতা, কলম—সব গুছিয়ে যত্ন করে টেবিলের এক পাশে রাখলো।
তারপর রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো।
সিঁড়ির দিকে এগোতেই দেখলো, রিয়াও নিচে নামছে। নিশিতার মনটা একটু হালকা হয়ে এলো—ঠিক তখনই সে ডাকতে যাচ্ছিল।

কিন্তু রিয়া একবার শুধু নিশিতার দিকে তাকালো।
চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। এক মুহূর্তের সেই তাকানো, তারপর কিছু না বলেই চুপচাপ নিচে নেমে গেল। নিশিতার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো। কিছুদিন ধরেই রিয়া তাকে ইগনোর করছে—এই বিষয়টা নিশিতা লক্ষ্য করছিল। কিন্তু কখনো কিছু বলেনি। ভেবেছিল, হয়তো সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু আজকের এই আচরণটা…
এটা নিশিতাকে ভাবিয়ে তুললো।
নিশিতা মনে মনে বলল,

“রিয়ার আবার কী হলো? ওইদিন তো আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। তাহলে এখন এমন করছে কেন?”
হঠাৎ করেই তার গলা শুকিয়ে এলো। একটা শুকনো ঢোক গিলে নিয়ে মনে মনে ফিসফিস করে বলল,
“আমার আগে থেকেই সব বলে দেওয়া উচিত ছিল… কি জানি, কী জানতে পেরেছে!”
এই ভেবে নিশিতা তাড়াতাড়ি নিচে নামলো।
নিচে এসে দেখলো—রিয়া সোফায় বসে আছে।
হাতে ফোন, কী যেন করছে গভীর মনোযোগে।
নিশিতা ধীরে ধীরে গিয়ে রিয়ার পাশে বসলো।
কথা শুরু করবে—ঠিক সেই মুহূর্তেই—

রিয়া উঠে দাঁড়ালো। চলে যেতে উদ্যোগ নিতেই নিশিতা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।
তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“কি হয়েছে তোর, রিয়া? আমাকে এভাবে ইগনোর করছিস কেন? আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছিস নাকি?”
নিশিতার কথায় রিয়া ব্যঙ্গ করে হেসে উঠলো।
হাসিটা কেমন তির্যক।
“সিরিয়াসলি নিশি? আমি কিছু লুকাচ্ছি?”
একটু থেমে আবার বলল,

“আর কী হয়েছে—এটা তো তুই ভালো করেই জানিস।”
এই কথা শুনে নিশিতা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল।
এবার আর সন্দেহ নেই—রিয়া কিছু একটা জেনে গেছে। নিশিতা কিছু বলার আগেই রিয়া আবার বলে উঠলো,
“ওইদিন কোথায় ছিলি তুই ভাইয়ার সাথে সারারাত বাড়ি ফিরিসনি। আমাকেও কিছু বলিসনি। কেন নিশি? আমি কি তোর এতটাই পর যে আমাকে কিছু বলা যায় না?”
রিয়ার কথাগুলো নিশিতার বুকের ভেতর ধারালো ছুরির মতো বিঁধে গেল। চোখ ভিজে এলো তার।
কষ্টটা গিলে নিয়ে নিজেকে সামলে বলল,

“আজ তোকে সব বলবো রিয়া। আমার জান, শুধু রাগ করিস না। আমার আগেই বলা উচিত ছিল—সরি দেরি করার জন্য। শান্ত হ, সব বলবো।”
একটু থেমে বলল,
“এখানে বস।”
রিয়া আর কিছু না বলে বসলো। তার অভিমানটা যেন একটু হলেও কমেছে। নিশিতা মনে মনে বলল,
“রিয়াই তো আমার সবচেয়ে কাছের। ওকে বললে কিছু হবে না।”
ঠিক তখনই আমেনা চৌধুরীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“তোদের কি বুদ্ধি হবে না রিয়া, নিশি? এখানে বসে আছিস কেন? এখনও খেতে বসিসনি?”
তারপর আদেশের সুরে বললেন,

“যা, তাড়াতাড়ি গিয়ে খেয়ে নে। আর নিশি—ফারিসকে ডেকে নিয়ে আয় মা। রিয়া, তুই তোর ছোট আব্বু আর আব্বুকে ডাক।” দেরি হয়ে যাবে সবার।
রিয়া কিছুক্ষণ নিশিতার দিকে তাকিয়ে রইলো।
নিশিতা ফিসফিস করে বলল,
“সব বলবো। আগে আম্মুর কথা শোন। নাহলে দুজনেই মার খাবো।”
রিয়া হালকা হেসে উঠে দাঁড়ালো। আফিয়া চৌধুরী নাস্তা পরিবেশন করতে লাগলেন। নিশিতা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করলো। ফারিসের রুমের যত কাছে যাচ্ছে, নিশিতার হৃদস্পন্দন তত দ্রুত হয়ে উঠছে। দরজার সামনে এসে থামলো।

নক করার আগেই দরজা খুলে গেল। পরমুহূর্তেই ফারিস নিশিতার হাত ধরে টেনে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো। দরজা বন্ধ। হঠাৎ এসব ঘটনায় নিশিতা ঘাবড়ে গেল। ফারিসকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রেগে বলল,
“এগুলো কী করছেন? আমি পড়ে যেতাম!”
রাগে তার গাল আর নাক লাল হয়ে উঠেছে। এই রাগী চেহারাটাই ফারিসের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগলো। এক মুহূর্তেই ফারিসের নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়লো। সে নিশিতার কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
তার কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা,

“নিজেকে সামলানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
তারপর হঠাৎই নিজেকে থামিয়ে বলল,
“পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে কাছে আসবি না। মন দিয়ে পড়াশোনা কর।”
নিশিতা বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি নিজে থেকে কখন এসেছি? আপনাকে ডাকতে পাঠিয়েছে তাই এসেছি। আজাইরা কথা বলেন!”
এই বলে সে হনহন করে বেরিয়ে গেল। ফারিস তার যাওয়া দেখলো। ঠোঁট কামড়ে হেসে বিড়বিড় করলো,
“পিচ্চি বউটা… মজা বোঝে না।”

ঠিক তখনই রাজীব বের হয়ে এসে অবাক হয়ে বলল,
“ভাইয়া, একা একা দাঁড়িয়ে হাসছো কেন?”
ফারিস মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে বলল,
“কিছু না। নিচে চল, অফিসে দেরি হচ্ছে।”
নিচে গিয়ে দেখলো—সবাই টেবিলে বসে গেছে।
নিশিতা আর রিয়া আবার আগের মতো হাসছে।
বাড়িতে যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। কিন্তু নিশিতা আজ একবারও ফারিসের দিকে তাকাচ্ছে না।
ফারিসের মনে হলো,

“এতটা রাগানো বোধহয় ঠিক হয়নি।”
ঠিক তখনই আরাফাত চৌধুরী বললেন,
“আজ তালুকদার বাড়িতে পার্টি। সন্ধ্যায় সবাই রেডি থেকো।”
নিশিতা আর রিয়ার চোখে আনন্দ ঝিলমিল করে উঠলো। হঠাৎ করেই নীরবতার ভেতর রিয়ার কণ্ঠ ভেসে উঠলো— কণ্ঠে একটু আবদার, একটু অভিমান।
“আব্বু, আমাদের তো এখনও শপিং করা হয়নি।
আমি আর নিশি মিলে শপিংয়ে যাই না?”

রিয়ার কথায় টেবিলের সবাই একবার করে তাকালো। নিশিতার চোখে মুহূর্তের জন্য একটা ঝিলিক খেলে গেল। পার্টি মানেই নতুন পোশাক—এই ভাবনাটা তাকে একটু হলেও আনন্দ দিল।
আরাফাত চৌধুরী কিছু বলতে যাবেন—ঠিক তখনই ফারিস তার আগেই গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
“কোনো দরকার নেই। যা কেনার আছে, আমি কিনে নিয়ে আসবো।”
কথাটা এমনভাবে বললো,
যেন এই বিষয়ে আর কোনো আলোচনা হতেই পারে না। ফারিসের কথায় রিয়া চুপ করে গেল।
আর কিছু বলার সাহস পেলো না। নিশিতা বাইরে থেকে কিছু না বললেও, মনের ভেতরটা ফুঁসে উঠলো। নিশিতা মনে মনে বলল,

“আপনার কথা শুনতে আমার বয়েই গেছে।
নিজের পছন্দে কিছু করার অধিকারও নেই নাকি?”
মুখটা আপনাআপনি ভেংচিয়ে এলো তার।
কিন্তু সে সেটা লুকিয়ে রাখলো। খাওয়া দাওয়া শেষ হলে আরাফাত চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরী অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। রিয়া চেয়ার থেকে উঠে দ্রুত উপরে উঠতে লাগলো। তার পায়ের শব্দে স্পষ্ট বিরক্তি। নিশিতা কিছু না ভেবে রিয়ার পেছনে পেছনে যেতে নিলো। রিয়ার সাথে কথা বলাটা তার এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।
ঠিক তখনই ফারিস নিশিতাকে ডাকতে
উদ্যত হলো—কিন্তু তার আগেই আমেনা চৌধুরী ড্রয়িং রুমে এসে পড়লেন।
ফারিস আর নিশিতাকে ডাকবার সুযোগ পেলো না।

যে কথাটা বলতে চেয়েছিল, সেটা মনেই ধামাচাপা পড়ে গেল। ফারিসের মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। কিছু না বলেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। এদিকে চৌধুরী বাড়ির ভেতর, আমেনা চৌধুরী খাবারের প্লেট গুছিয়ে নিতে নিতে বিরক্ত স্বরে বলে উঠলেন,
“ওই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারি না।
গত দুইদিন ধরে কী যে হলো তনয়ার—আল্লাহই ভালো জানে।
ওফ্ফ!”

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৭

কথাগুলো নিশিতার কানে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সে থমকে দাঁড়ালো। কিন্তু তারপর নিজেকে বুঝিয়ে নিলো— এই বাড়িতে এসব কথা নতুন কিছু নয়।
সে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে চুপচাপ উপরের দিকে উঠে গেল। তার মাথার ভেতরে তখন একটাই কথা ঘুরছে— রিয়া ঠিক কী জানে? আর ফারিস ভাইয় কেন এমন আচরণ করছে? নিশিতার মনে অজানা একটা অস্বস্তি জমে উঠলো।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৯