তোমাতেই আসক্ত শেষ পর্ব
তানিশা সুলতানা
বহুদিন পরে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলো ইমা বেগম। আহহা কতোশত স্মৃতি জমে আছে। নিজ জন্মভূমি। বাংলাদেশের বাতাসেও এক প্রকার প্রশান্তি পাওয়া যায়।
কিন্তু ইমা বেগম শান্তি পাচ্ছে না। তার ছেলেমেয়েদের চোখের সামনে না দেখা ওবদি কোনোভাবেই শান্তি পাবে না।
হ্যাঁ আবরারই তাকে বাংলাদেশে ফিরে আসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এবং যে ডাক্তার তার ছেলেমেয়েে দত্তক নিয়েছিলো তার ঠিকানাও দিয়েছে। ইমা এই মুহুর্তে সেই বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। দরজার সামনে বিশাল বড় সাইজের তালা ঝুলছে। ধুলো জমে গিয়েছে বাড়ির উঠোনে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বহুদিন হবে বন্ধ পড়ে আছে বাড়িটা।
তবে কি আবরার তাসনিন ভুল ঠিকানা দিলো?
বুকের ভেতরটা কাঁপতে থাকে তার।।
বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আশেপাশে মানুষ খোঁজার চেষ্টা করে। দেখা যায় খানিকটা দূরে একটা চায়ের দোকান রয়েছে। ইমা সেদিকে যায়।
বৃদ্ধ একটা লোক গভীর মনোযোগে চায়ের পানি গরম করছে। তাকে বলে ওঠে
“চাচা ওই বাড়ির মানুষ কোথায়?
লোকটা ইমার মুখ পানে এক পলক তাকায়। তারপর জবাব দেয়
” তিন মাস হবে তারা লন্ডন চলে গিয়েছে।
ইমার হাত পা কাঁপতে থাকে। লন্ডন চলে গিয়েছে মানে কি? তার বাচ্চারা কোথায় তাহলে?
“ত…তাদের কি সন্তান ছিলো?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” ছিলো না। দুটো বাচ্চা দত্তক নিয়েছে বছর দুয়েক হবে। চান্দের মতো সুন্দর বাচ্চা দুটো। তাদের সঙ্গে নিয়ে চলে গিয়েছে। আর কখনো বাংলাদেশে ফিরবে না।
হতাশ ইমার দুচোখ বেয়ে দু ফোঁটা অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ে। সব শেষ হয়ে গেলো তার।
স্বামী ম/রে গেলো। সন্তানরা চলে গেলো। অসহায় ইমা এখন কোথায় যাবে? কার কাছে থাকবে?
এতো বড় দুনিয়াতে তার আর আপন বলতে কেউ রইলো না।।
হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে চলে যায় সেখান থেকে। বাস ধরে কক্সবাজারে উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ছয় ঘন্টার ব্যবধানে পৌঁছে যায় কক্সবাজার। ফিরে আসে নিজ বাসস্থানে। বাবার বাড়ি।
এখানেও কেউ নেই। বাবা মা মারা গিয়েছে। পড়ে আছে শুধু ছোট্ট একটা ভাঙা ঘর।
এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো ইমার গল্প।
এই ঘরেই এসেছিলো আরিফ। জমি কেনার প্রস্তাব নিয়ে। ইমা খুবই বুদ্ধি করে ঢুকে পড়েছিলো তার জীবনে।
আরিফের সংসার ভেঙেছে, তাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর পাড়ি জমিয়েছে, টাকার পাহাড় গড়েছে, বিলাসিতা করেছে।
শেষ মুহুর্তে শূন্য হাতেই ফিরতে হলো।
কিছুই রইলো না তার।।
ডাক্তাররা ভীষণ চেষ্টা করেছে নরমাল ডেলিভারি করার। কিন্তু সেটা কিছুতেই পসিবল হচ্ছে না। কিছু জটিলতার কারণে সিজার করতেই হবে। আবরার তাতে সায় জানিয়েছে। তবে আদ্রিতা ইনজেকশন নিতে চাচ্ছে না। ইয়া বড় একটা ইনজেকশন দেওয়া হবে তাকে। দেখেই চিৎকার করে কান্না করা শুরু করেছে।
করিডোরে পায়চারি করতে থাকা আবরার দৌড়ে কেবিনে ঢুকে পড়ে। তার পেছন পেছন ঢোকে সিয়াম। আমান আহাদ ইভান বাইরেই রয়েছে।
আবরারকে দেখেই আদ্রিতা জড়িয়ে ধরে আর বলে
“আমি ইনজেকশন নিতে চাই না। আর এই ডাক্তার ইনজেকশন দিবেই।
মেজাজ চটে যায় আবরারের। সে সিয়ামকে উদ্দেশ্য করে বলে
” সব থেকে বড় সাইজের ইনজেকশনটা এর জায়গা মতো ঢুকিয়ে দে তো সিয়াম।।
বাধ্য সিয়াম তখুনি একটা ইনজেকশন হাতে দেয়। এবং ডাক্তারের দিকে এগোতে থাকে।
ডাক্তার শুকনো ঢোক গিলে বলে
“ইনজেকশন দিতেই হবে ওনাকে। নাহলে সিজার করা পসিবল হবে না। আর সিজার না করা ওবদি ওনার ব্যাথা কমবে না।
আবরার বুঝলো। সে আদ্রিতাকে জড়িয়ে রেখেই ডাক্তারকে ইশারা করে ইনজেকশন দেওয়ার। ডাক্তারও অতি গোপনে ইনজেকশন পুশ করে। আদ্রিতা বিরবির করে বলে ওঠে
” ব্যাথা পেলাম না আবরার।
আপনি আমার সাথে থাকলে আমাকে জড়িয়ে রাখলে মৃত্যুকেও ভয় পাবো না আমি।
থাকুন না আবরার।।
সেটাই হলো। সিয়াম বেরিয়ে গেলো।।আর আবরার আদ্রিতার হাত জড়িয়ে বসে থাকে পাশেই।
কিছু মুহুর্ত পরেই মিষ্টি কান্নার স্বর কানে ভেসে আসে। সকলের অপেক্ষার সমাপ্তি।
আবরার তাসনিন এর প্রিন্সেস দুনিয়ায় চলে এসেছে। তখুনি আসমান হয়ে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির ফোঁটা জমিনে গড়িয়ে পড়ে। যেনো আবরার কন্যাকে স্বাগতম জানাচ্ছে তারা।।
আদ্রিতার হুশ নেই। সে অবচেতন হয়ে পড়ে আছে। নার্স তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে নেয় বাবুটাকে। তারপর আবরারের কোলে দেয়।
অদ্ভুত এক অনুভূতি। শক্তপোক্ত আবরার তাসনিন কেঁপে ওঠে। তার আঁখিপল্লবে অশ্রুকণা জমে।
ছানাটাকে বুকে জড়িয়ে বিরবির করে বলে
“আমার কলিজা
আমার পাখি
আমার সুখ
তোমার আগমনে আমার জীবন পরিপূর্ণ হয়ে গেলো।।
এই পৃথিবীর সব সুখ তোমার পায়ে কাছে এনে দিবো আমি। কথা দিলাম।
তারপর বাবুকে নিয়ে কেবিন থেকে বের হয় আবরার। আতিয়া বেগম বাইরেই অপেক্ষা করছিলো। ছেলের কোলে বাবুটাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।।
তার ছোট্ট আবরার বাবা হয়ে গেলো।।
যে ছেলেটা তাকে কখনো মা বলে ডাকে নি। কোনোদিন ছেলের মুখটা দেখতে পারবে কি না এটাই জানতো না তিনি।।
আর আজকে সেই ছেলের কোলে তার সন্তান। নিজেকে কোনো মতেই শান্ত করতে পারছেন না তিনি।।
আবরার এক হাতে বাচ্চাকে ধরে আরেক হাতে মাকে আগলে নেয়। কপালে চুমু খেয়ে বলে
“ডোন্ট ক্রাই আম্মু।
আমার মেয়ে কান্না দেখতে একদম পছন্দ করে না।
আতিয়া বেগম আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বাবুকে কোলে নেয়। কিছু মুহুর্ত তাকিয়ে থাকে সুন্দর মুখ পানে।।
” এ যেনো ছোট্ট বর্ষা।
আদ্রিতার কোল জুড়ে তার মা ফিরে এসেছে।
তিন দিন পরে আদ্রিতা এবং বাবুকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। গোটা বাড়ি আনন্দে মেতে ওঠে। সিয়াম ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে আর কবিতা বলছে
“আগের দিন খাইছে বাঘে
আইছে নতুন বছর
আগে ছিলাম সিঙ্গেল আমি
এখন এক ছেলের বাপ
চাইলে আর যায় না পারা
অন্য মেয়ের দেখতে
বউ আমার জনমের খারাপ
চোখ যে তুলে নিবে
সাব্বা হামাগুড়ি দিয়ে সিয়ামের কাছে চলে আসে। আর ঠাস করে থাপ্পড় মেরে দেয় সিয়ামের পিঠে।
” হইছে এক ছেলে
এখণই বাপের গায়ে হাত তুলে বড় হলে কি করবে?
আমান মার্কেটে যাচ্ছিলো। সিয়ামের সামনে থেকে সাম্বাকে তুলে নিয়ে চলে যায় কেনো কথাবার্তা ছাড়া।
আদ্রিতাকে কোলে তুলে নিজ কক্ষে চলে আসে আবরার। টিশা বাবুকে নিয়ে পেছন পেছন আসে।
ঘরটাও গোলাপ ফুলে সাজানো হয়েছে। আদ্রিতা চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলে
“মনে হচ্ছে নতুন করে বাসর ঘর সাজানো হয়েছে।
আবরার কিছু বলে না৷ ওকে বিছানায় বসিয়ে দেয়। টিশা বাবুকে আদ্রিতার কোলে নিয়ে বলে
” খিধে পেয়েছে ওর। খাওয়াও
বলেই বেরিয়ে যায়।
আদ্রিতা তো বাবুকে ঠিকঠাক কোলেই নিতে পারে না খাওয়াবে কি করে?
শেষমেশ আবরার সাহায্য করে।
তোমাতেই আসক্ত পর্ব ৯১
“আবরার জীবনটা কেমন পূর্ণতায় ছেয়ে গেলো তাই না? কি ছিলাম আর কি হয়ে গেলো?
আবরার আদ্রিতার কপালে চুমু খেয়ে বলে
” আগেও তোমাতে আসক্ত ছিলাম
এখনো তোমাতেই আসক্ত আছি।
ইন ফিউচারও থাকবো।

অনেক অনেক অনেক অনেক সুন্দর হয়েছে গল্পটা