মাটির পিঞ্জর পর্ব ১
নূরায়েশা মাহনূর
৫ বছর আগে যে মেয়েকে বিয়ের আসরে রেখে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলো উজান আজ ঠিক ৫ বছর পরে হঠাৎ সামনাসামনি সেই মেয়েকে দেখেই থমকে দাড়ালো সে।
পাঁচ বছর একটা দীর্ঘ সময়। কত ঋতু, কত ভোর, কত অশ্রু সরে গেছে এই ব্যবধানের অলিগলি বেয়ে। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছিল দৃষ্টি। হঠাৎই তার গতি থেমে গেল। চোখের সামনে এসে দাঁড়ালো এক সুদৃঢ় পুরুষ অবয়ব। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই, চোখে চোখ পড়লো।
উজান! অবিশ্বাস আর স্মৃতির দোলাচলে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইলো দৃষ্টি। কিছু মুহুর্তের জন্য দৃষ্টি বুঝতে পারলো না সে ঠিক দেখছে নাকি স্বপ্ন। আর তখনই তার ভাবনায় ছেদ পড়লো উজানের রাশভারি বাঁজখাই কন্ঠস্বরে।
– তুই… এখনো কি আমাদের বাড়িতেই থাকিস?
দৃষ্টি একটুও অবাক হলোনা উজানের এমন প্রশ্নে। কারণ উজান স্বভাবতই এমন ঠোঁটকাটা। যখন যা ইচ্ছে হয় বলে দেয়। বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না সামনে দাঁড়ানো মানুষটির মনোজগতে সে কথার অভিঘাত কতটা প্রবল হতে পারে।
তবে আজ দৃষ্টি যে একেবারেই অবাক হয়নি, তা নয়। অবাক হওয়ার বিষয়টা ভিন্ন। এই পাঁচ বছরে উজান একবারও ফিরে আসেনি, এমনকি কারও সাথে যোগাযোগও রাখেনি। কিন্তু হঠাৎ এইভাবে কোনো আগাম সংবাদ না দিয়ে চলে আসবে এটা সে কল্পনাও করেনি। নিজের বিস্ময়কে সংযত করে কিছু বলার জন্য ঠোঁট আলগা করছিলো দৃষ্টি কিন্তু তার আগেই উজান নিজেই বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– যাকগে তোর কথা শোনার সময় নেই। মা কোথায়?
– বড়মা নিজের ঘরে আ….
কথাটা শেষ করা হলো না দৃষ্টির। তার ঠোঁট থেকে শব্দের রেখা ঝরে পড়ার আগেই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকে উপেক্ষা করে উজান সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো দোতলার দিকে।এই দীর্ঘ পাঁচ বছর উজানের কাছে কোনও হিসেবের মধ্যেই পড়ে না । দৃষ্টি স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
তবে এই নীরবতা কেবল বাহ্যিক। তার ভেতরে এখন অদ্ভুত এক টানাপড়েন। উজানকে এতদিন পর হঠাৎ সামনে দেখে তার কি খুশি হওয়া উচিত ? নাকি… এমন উপেক্ষা আর নির্লজ্জ ব্যবহারে কষ্ট পাওয়া উচিত ?
হ্যাঁ, কষ্টই পেয়েছে দৃষ্টি। তাকে একটিবারও জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না কেমন আছে সে। একটুও কি মনে হয়নি উজানের, এই মেয়েটা এতদিন তার অপেক্ষায় ছিল? চোখ দুটো বুজে এলে দু’ফোঁটা জল অজান্তেই গড়িয়ে পড়লো দৃষ্টির গাল বেয়ে।
চোখ ভরা জল আর ভারী বুক নিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো দৃষ্টি। নিচে নামতেই দৃষ্টির চোখে পড়লো কয়েকটি অপরিচিত মুখ। স্বভাবতই ভ্রু কুঁচকে উঠলো তার। চোখের কোণে হিসেব কষলো, দুজন তরুণী আর তিনজন যুবক। মোট পাঁচজন আগন্তুক।
সঙ্গে সঙ্গেই শাড়ির আঁচলটা টেনে মাথায় একটা ঘোমটা দিলো দৃষ্টি । তারপর আঁচলটাকেই হাতে গুঁজে মুখটাও আড়াল করে নিলো। শুধু তার চোখদুটো উন্মুক্ত রইলো। নীরবেই চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে নিলো । এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে তারপর অচেনা মানুষগুলোর সামনে গিয়ে থেমে দাঁড়ালো দৃষ্টি। কণ্ঠে দৃঢ়তা মিশিয়ে বললো,
– আপনারা কারা? এখানে কী চান?
দৃষ্টির এমন দৃপ্ত কণ্ঠস্বরে অপরিচিত যুবক-যুবতীরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো। তাদের দৃষ্টি কৌতূহলী, আবার খানিকটা দ্বিধান্বিতও। শেষমেশ সেই দল থেকে একটি মেয়ে এগিয়ে এসে বললো,
– আমরা… উজানের ফ্রেন্ড।
এতক্ষণে নিজের ভাবনার ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো দৃষ্টি। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো সে। তড়িঘড়ি করেই স্বর নরম করে বললো,
– আপনারা উজান ভাইয়ের বন্ধু আগে বলবেন না? এখানে উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আসুন ভিতরে এসে বসুন।
বলেই ঘোমটার নিচে মুখ আড়াল করে বৈঠকখানার দিকে এগিয়ে গেলো দৃষ্টি। তার পেছন পেছন আগন্তুক ছেলেমেয়ের দলও ধীর পায়ে হাঁটা ধরলো।
উঠোনের পাশ ঘেঁষে লম্বালম্বি এক বারান্দা। যার শেষপ্রান্তেই অবস্থিত পুরনো কাঠের বৈঠকখানা। বারান্দার ছায়া লেগে আছে চারপাশে। সেখানে বসানো বেতের মোটা-মোটা হ্যান্ডল দেওয়া সোফাগুলো। সময় আর ব্যবহার দুটোই যাদের চিহ্ন ফেলে গেছে।
একেক করে এসে বসে পড়লো ছেলেমেয়েগুলো। কেউ কৌতূহলে চারপাশ দেখতে লাগলো, কেউ আবার চুপচাপ বসে রইলো। সকলেই অপেক্ষা করছে উজানের আগমনের।
– তোমার নাম কী?
দুজনের মধ্যে একজন তরুণী হঠাৎই প্রশ্নটা করে বসল। প্রশ্নটা শুনে দৃষ্টি একটু চমকে উঠলো বটে, কিন্তু মুখাবরণ ঠিক রেখেই আঁচলটা আরও খানিকটা টেনে নিলো মাথার দিকে। চোখ নামিয়ে সংযত কণ্ঠে বললো,
– আমার নাম দৃষ্টি, মাহেরা দৃষ্টি।
মেয়েটি হেসে বললো,
– আমি আফরা। আর ও হচ্ছে তুবা।
বলতে বলতেই পাশে বসে থাকা আরেকজন মেয়ের দিকে ইশারা করলো সে। দৃষ্টি একবার তাকালো তুবার দিকে। সতর্ক দৃষ্টিতে সে কিছু মাপছে চোখের পর চোখে। এরপর আফরা পেছন ফিরে তিনজন ছেলের দিকে তাকিয়ে একে একে পরিচয় করিয়ে দিলো,
– ও হচ্ছে জিদান, আর তার পাশে আসিফ… আর ওটা নয়ন।
ছেলেগুলো বিনয়ের হাসি ছড়িয়ে মাথা হেলালো।
দৃষ্টি কেবল একটিবার মাথা নাড়ল। আফরার কথায় দৃষ্টি আড়চোখে একবার ছেলেগুলোকে একে একে দেখে নিলো। চোখে নির্লিপ্ততা, তবু ভেতরে টের পাওয়া যায় সজাগ এক সতর্কতা। কিছু বলার আগেই সে নম্র স্বরে বলে উঠলো,
– আপনারা বসুন, আমি নাস্তার ব্যবস্থা করছি।
ঠিক তখনই পাশ থেকে তুবা একটু অস্থির সুরে বলে উঠলো,
– উজান কই রে আফরা? আমাদের রেখে কোথায় গেলো?
দৃষ্টি চোখ নামিয়ে হালকা হেসে জবাব দিলো,
– উনি বড়মার সাথে দেখা করতে গেছেন। আপনারা বসুন এই তো চলে আসবে।
বলেই দৃষ্টি ঘুরে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক সেই সময় আফরা আবার বলে উঠলো,
– ওহ ভালো কথা, তুমি উজানের কী হও?
– ও এই বাড়ির কাজের লোক। ওকে এত ইম্পর্টেন্স দেওয়ার কিছু নেই।
উজান! তার স্বর রুক্ষ, নিরাসক্ত। অথচ সেই একটুখানি বাক্য দৃষ্টির হৃদয়জুড়ে বাজলো বজ্রের মতো। পায়ের গতি থমকে গেলো দৃষ্টির। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য কুয়াশা নেমে এলো। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। চোখ নামিয়ে দ্রুত আঁচলের প্রান্তে চোখের জল লুকাতে চাইলো।
কিন্তু আফরার চোখ সে দৃশ্য এড়াতে পারলো না। আফরা মুহূর্তকাল তাকিয়ে রইলো দৃষ্টির দিকে। দৃষ্টি কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে সরে গেলো। তার সরে যাওয়া মাত্রই জিদান হঠাৎ বলে উঠলো,
– দোস্ত, ওকে দেখে তো কাজের লোক মনে হয় না। বেশ পরিপাটি দেখতে…
তুবা সঙ্গে সঙ্গেই বিরক্ত স্বরে চাপা তিরস্কার ছুঁড়ে দিলো,
– তোকে এত কিছু দেখতে কে বলেছে জিদান? উজান যখন বলেছে কাজের লোক,তখন কাজের লোকই হবে তাই না?
তুবার কথায় মুখ বন্ধ করলো জিদান। তবে তার চোখে দ্বিধা। কি জানি হয়তো কাজের লোকই! ভেবেই অন্য কথায় মনোযোগ দিলো।
