Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ২

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২
নূরায়েশা মাহনূর

সময় গড়িয়ে রাত নেমে এসেছে চুপিসারে। অন্ধকার নামার আগে আরেক কাণ্ড ঘটে গেছে বাড়ির ভেতরে। উজানের মা অরুণা বেগম সেই যে ছেলেকে দেখে মুখ ফিরিয়েছেন এখনও পর্যন্ত উজানের সাথে একটি কথাও বলেননি। আর বলার কথাও না পাঁচটা বছর কেটে গেছে অথচ একটাবারও ছেলে খবর নেয়নি!

পাঁচটি দীর্ঘ বছর, জীবনের পরিক্রমায় যেখানে একজন মা শত আঘাতেও অপেক্ষার আলো জ্বেলে রাখে সেখানে অরুণা শুধু অপেক্ষা করেনি বুকের গভীরে জমে উঠেছে ভাষাহীন অভিমান। এই পাঁচ বছরে উজান একটিবারও খোঁজ নেয়নি তার, একটি চিঠি, একটি ফোনকল, এমনকি স্বপ্নেও নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়নি। এমন নির্লজ্জ নিরুত্তরতা একটি মায়ের হৃদয়ে যে কী দহন সৃষ্টি করে তা প্রকাশের ভাষা বাংলা ভাষার কবিদের হাতেও মেলে না।
অভিমানে জমাট হয়ে থাকা সেই বছরগুলো একেকটা কালো পাথর হয়ে বুকে চেপে বসেছে অরুণার। তবে, মজার ব্যাপার হলো এই পাঁচ বছরে উজান কোথায় ছিল, কী করেছিল তা কেউ জানে না। আর উজান নিজেও এ নিয়ে মুখ খুলেনি। কিন্তু তার মা? অরুনার প্রতিটি নিঃশ্বাসের হিসেব ছিল উজানের কাছে। ছায়ার মতো দূর থেকে দেখেছে, শুনেছে, বুঝেছে তবুও… যোগাযোগ করেনি।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

উজানও ভুলে যায়নি কেন সে গিয়েছিলো। তাকে কিছু না জানিয়েই দৃষ্টির সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করে দিয়েছিল সবাই! কী মজার কথা! মনে হয় ওর জীবনটা এক ফরমায়েশি নাটক, চাইলেই বিয়ের দৃশ্য নামিয়ে ফেলা যায় মঞ্চে। অথচ ছোটবেলা থেকেই দৃষ্টির পরিবারের কেউই উজানের সহ্যসীমার মধ্যে ছিল না। উজান দৃষ্টির পরিবারকে সহ্যই করতে পারে না। তা শুধু শৈশবের ঝগড়াঝাঁটি বা মানসিক দূরত্বের কারণে নয়। শুধু একটা কারণ নয় বহু কারণ জমে আছে তার পেছনে। যে কারণগুলো আজও উজানের চোখে লেলিহান আগুন হয়ে জ্বলছে।

ফিরে এসে উজান অনেক চেষ্টাই করেছে মায়ের অভিমান ভাঙাতে। শত ছুতোয় কাছে যেতে চেয়েছে, তার অভিমান ভাঙাতে চেয়েছে। তেল দেয়া রুটি থেকে শুরু করে চা বানিয়ে দেওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু অরুণা বেগম মনে মনে শপথই করে নিয়েছেন যতই পাক্কা অভিনয় করুক না কেনো উজান অরুনার মন গলানো যাবে না। ফলাফল আজকে সারাদিনে মায়ের দুয়ারে ব্যর্থ হয়ে নিজের কক্ষে ফিরে এসেছে উজান।
রুম ভাগাভাগি করা হয়েছে। উজানের সঙ্গী জিদান। নয়ন আর আসিফ অন্য ঘরে। আফরা আর তুবা একসাথে অন্য রুমে। তবে এই পুরো বিশাল নাটকের মধ্যে দৃষ্টি সেই যে অদৃশ্য হলো আর বের হলো না। সেই অপমানের পর থেকে নিজের ঘর থেকে এক কদমও বের হয়নি। উজান তাকে “কাজের লোক” বলে অপমান করেছিল! আর সেই অপমানের ভারেই আর একটিবারও দৃষ্টি উজানের মুখোমুখি পড়েনি।

কিন্তু উজানের এই অপমানের পেছনেও ছিল এক গভীর ক্ষত। উজান ভুলে যায়নি একদিন এই দৃষ্টিই নিজ মুখে বলেছিলো সে উজানকে বিয়ে করতে চায় না। অথচ সময় নামক খেলোয়াড় দৃষ্টিকে এনে দাঁড় করিয়েছে এক চক্রব্যূহে, যেখানে সমস্ত ঘৃণা, সমস্ত অস্বীকার মিলেমিশে গেছে এক অদ্ভুত প্রেমের মিশেলে।
দৃষ্টি জানে সে উজানকে ভালোবেসে ফেলেছে। সেই একরোখা, জেদি, মুখফুটে কিছু না বললেও চোখে ঝড় বয়ে বেড়ানো মানুষটাকে। কিন্তু দৃষ্টির এই প্রেম এখন শুধু নিজের কাছেই সীমাবদ্ধ। কারণ সেই যে দিন উজান তাকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলো সেদিন থেকেই তার আত্মসম্মান নামের দেয়ালটাতে একটা কফিন আঁকা হয়ে গেছে।

রাতের খাবার শেষে ঘরগুলো নিস্তব্ধতায় ভরে উঠলো। একে একে সবাই নিজের কক্ষে চলে গেলো। সারাদিনের ক্লান্তিতে সকলেই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ পরে দরজা ঠেলে ঘর থেকে বের হলো উজান ।তাদের বাড়িটা শহরের সীমান্ত পেরিয়ে মফস্বল এলাকায়। এখানে অন্ধকার একটু বেশি গাঢ়। আর বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক তার ইচ্ছেমতো খেয়ালিপনা করে।নেটওয়ার্ক তো আত্মসম্মানী প্রেমিকার মতো করে মন চাইলে আসে, না চাইলে একদম নিখোঁজ।

কিন্তু এই মুহুর্তে উজানকে একটি জরুরি কল করতেই হবে। ফোনটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো উজান। দুই হাতে ফোনটা মাথার উপরে ধরে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়ালো মনে হচ্ছে সে আল্লাহর রহমত বর্ষণের অপেক্ষায় আছে। অবশেষে নেটওয়ার্ক বাবাজি একটু করুণা করলেন। একটা দাগ! উজান বিজয়ের হাসি হাসলো কিন্তু তৎক্ষনাৎ তা মিলিয়ে গেল। আবার একটুখানি উঠে এল… প্রেমিকাকে রাগ ভাঙাতে হলে যেমন বহুবার চেষ্টা করতে হয়, ঠিক তেমনই আজ উজানও নেটওয়ার্কের মানভঞ্জনের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
অবশেষে একরাশ ব্যর্থতার ভিতর থেকে উঠলো সেই কাঙ্ক্ষিত একটি দাগ। নেটওয়ার্ক বাবাজি মৃদু ভঙ্গিতে নিজের চাঁদমতো মুখখানা দেখালো। উজান না থেমেই কোনো রকমে দরকারি কলটা শেষ করলো। এরপর শ্বাস ছাড়ল ধীরে,পাঁজরের মধ্যে থেকে একটা ভার নেমে গেলো।

ফোনটা শেষ করে ঠিক ঘরের দিকে পা বাড়াতে গিয়েই হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। মনে হলো কি যেন দেখলো সে। কোনো ধরণের শাব্দিক ব্যাখ্যা দিতে না পারলেও, চোখ বলছে এইমাত্র সে কিছু দেখেছে। অসাধারণ, অপার্থিব, চুম্বকের মতো কিছু। মনকে সামলে আবার পিছনে ফিরলো।
উঠোন পেরিয়ে ওপাশের বারান্দা। সেই বারান্দার পাশঘেঁষা ঘরের খোপজানালা। সেখানে এক ধোঁয়াটে, ক্লান্ত মোমবাতি ধিকিধিকি জ্বলছে।মোমের কাঁপা কাঁপা আলোয় আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে এক স্বর্গীয় নারী অবয়ব।চুলগুলো এলিয়ে পড়েছে কাঁধ বেয়ে। লালপাড়ের সাদা কাপড়ের প্রান্তে আগুনের আভা ছুঁয়ে ছুঁয়ে খেলছে আলোছায়ার খেলা। চোখ জোড়া নিচু, পাতার পর পাতা উল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সে পড়ছে! তীব্র মনোযোগে, অথচ কী এক অভিমানী উদাসিনতায়।সে বুঝতে পারছে না তার চেহারায় মোমের আলো পড়ে সোনালী আভায় ভরিয়ে তুলেছে তাকে।
উজান চমকালো সাথে থমকালো তার পাজোড়া। এক চিলতে বাতাসে শরীরের সমস্ত শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়লো কেমন এক অজানা স্রোত। সে বেখেয়ালে দুহাতে ধরে ফেললো বারান্দার কারুকাজ করা কাঠের রেলিংগুলো। মুখটা সামান্য সামনে বাড়িয়ে দিলো, দৃশ্যটা আরো ভালো করে দেখতে চাইল।
অদ্ভুত সুন্দর! অস্পর্শযোগ্য! উজানের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। কী একটা বলতে চাইলো অথচ শব্দেরা গলায় এসে থেমে গেলো । এই রূপ… আশ্চর্য রকমের সুন্দর।

বেদনাদায়ক সুন্দর! উজান তাকিয়ে রইলো স্থির এক বিষ্ময় নিয়ে।
আচমকা বিদ্যুৎ ফিরে আসতেই সারা বাড়িটা ঝলমল করে উঠলো এক ঝলক আলোয়। নিস্তব্ধ নিশির গায়ে হঠাৎই কেউ ঢেলে দিলো ধবধবে আলোর ঝাঁপটা। আর সেই আলোতেই স্বপ্নের মত বসে থাকা রমনী হঠাৎ হেসে উঠলো। ক্ষীণ, মৃদু, কিন্তু অজস্র অর্থভরা এক হাসি। তার পর মোমবাতিটা নিভিয়ে দিলো এক ফুঁ দিয়ে।
– উজান! এই উজান! কোথায় গেলি?
জিদানের চিৎকারে উজানের ধ্যান ভাঙলো। ছেলেটার গলায় নিশ্চিত মাইক লাগানো। তার ফিসফিসে কথাও একজন অনায়াসে শুনে ফেলবে । এসেই দাঁড়ালো উজানের পাশে।

– এই তুই এখানে কি করিস? আমাকে অন্ধকারে একা রেখে? পুরো ভুতুরে অবস্থা ছিল ওটা!
হাঁপাতে হাঁপাতে অভিযোগ করলো জিদান।
– নেটওয়ার্ক পাচ্ছিলাম না তো… তাই একটু বের হলাম।
সংযত গলায় বলল উজান। বলতে বলতেই চোখটা সরে গেলো আপনাতেই সেই জানালার দিকে। ঠিক তখনই একটা অস্বস্তির রেখা আঁকা পড়লো উজানের মুখে। জানালাটা… বন্ধ! যেখানে একটু আগেও বই হাতে বসে ছিল দৃষ্টি, যেখানে মোমের আলোয় তার মুখে আঁকা হয়েছিল এক অনির্বচনীয় ছবি সেই জানালা এখন নিঃশব্দে আঁটা।
উজান ভ্রু কুঁচকালো। তার মানে? দৃষ্টি কি তাকে দেখে ফেলেছে? হঠাৎই বুকের ভেতরে এক অচেনা দোল খেলে গেল।

– ওইদিকে কি দেখোস?
জিদানের প্রশ্নটা শেষ হওয়ার আগেই ধরাম! তার বুক বরাবর নেমে এলো এক শক্ত মুষ্টির আঘাত। উজান এক দমে কিল বসিয়ে বললো,
– তোর এত কিছু জানতে হবে কেন শালা? সামনে থেইকা সর!
বলেই ধপাধপ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলো। হয়তো জানালাটা বন্ধ হয়ে গেছে বলেই এমন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে উজান। নাকি… দৃষ্টির চোখে নিজেকে আহাম্মকের মতো ধরা পড়ে যাওয়ার অপরাধবোধ?সে নিজেও বুঝতে পারছে না ঠিক। জিদান চোখ কুচকে মুখ বাকিয়ে বলে উঠলো,

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১

– হায় আল্লাহ! আমি আবার কী করলাম?
বলে অবুঝের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে উজানের পেছনে পেছনেই ঘরে ঢুকে পড়লো সেও।
দূর থেকে সবই দেখলো দৃষ্টি আলতো খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে। উজান এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিল?তাকে… তাকিয়ে দেখছিল? না… এটা অসম্ভব! উজান তো তাকে সহ্যই করতে পারে না। অপমান করেছে তাকে । তাহলে এখন কেন তার চোখে এমন তাড়িত চাহনি ?
দৃষ্টি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। একটা ক্লান্ত, ওজনবাহী শ্বাস। উজান আদৌ তাকিয়ে ছিলো? নাকি দৃষ্টির মন বলছে উজানকে তাকাতে! নীরব প্রশ্নগুলোকে নিজের বুকেই চাপা দিয়ে ধীরে দরজায় খিল লাগালো সে। তারপর নিরবে শুয়ে পড়লো…

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩