মাটির পিঞ্জর পর্ব ৭
নূরায়েশা মাহনূর
– ভাই আপনে সারাদিন কই ছিলেন? ঘটনাতো একটা ঘইটা গেছে!
ছেলেটার উত্তেজনায় ভেজা কণ্ঠে, সাইফ তার হাতে ধরা চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে তাকালো ধীরে। তার চাহনি বিষন্ন দুপুরের মতো নিস্তেজ। কিছু বলার আগেই ছেলেটা আবার হন্তদন্ত হয়ে বলে উঠলো,
– আপনারে কতবার কল দিলাম ভাই, কল তো ধরলেন না! আজকে বিশাল ঘটনা ঘটছে, বিশাল!
সাইফের ধৈর্যের সুতো এবার চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে উড়ে গেল। চোখে একরাশ বিরক্তি নামিয়ে প্রশ্ন করলো ঠান্ডা গলায়,
– সেই কখন থেকে তুই ঘটনার প্যাঁচাল পারতেছিস, আসল ঘটনা কী হইছে সেটা বল। আর নইলে সামনে থেকে সর।
– আজকে ভাবি আমারে একটা থাপ্পড় দিছে।
শব্দটা বাতাস ছেঁদে সাইফের বুকের ঠিক মাঝ বরাবর এসে আঘাত করলো। চোখ মেলে ছেলেটার দিকে চমকে তাকালো সাইফ। হাতে থাকা চায়ের কাপটা তার রাগের ভার সহ্য করতে না পেরে ছ্যাঁক করে মাটিতে ছিটকে পড়লো। আর ঠিক পর মুহূর্তেই সাইফ ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেটার কলার চেপে ধরলো। চোখে আগুন, চোয়ালে কামড়ে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠলো সে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– ওই কু*ত্তা*র বাচ্চা! কি করছোস তুই আমার জানরে?কি করছোস বল? বিরক্ত করছোস? খারাপ কথা বলছোস? নাকি চোখ তুলে তাকাইছোস? কি করছোস বল শালা?
কণ্ঠে হুঙ্কার, চোখে দহন! সাইফ এমন ভাবে কলার চেপে ধরেছে,ছেলেটার নিঃশ্বাস পর্যন্ত বুকের মাঝেই আটকে গেছে। চোখ ফুলে উঠছে, মুখে রক্তচাপ! প্রাণপণে ছেলেটা হাত-পা ছুঁড়ে মুক্তির চেষ্টা করছে,কিন্তু সাইফের হাত পাথর হয়ে বসে আছে তার গলায়। এমন অবস্থা দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরও দুজন ছুটে এসে টেনে ধরলো সাইফকে। তাদের মুখে আতঙ্ক। মিনতির মিশেলে বলে উঠলো,
– ভাই ভাই, প্লিজ শোনেন, ও ভাবিরে কিছু বলে নাই ভাই! পুরো কথা তো শুনেন আগে… আগে তো শুনেন ভাই!
কিন্তু সাইফের চোখে রক্তজমাট বেধেছে। তাকে ধরে রাখাটা পাগলা ষাঁড়ের রাগ থামানোর মতো। সম্ভব না, তবুও বাধ্য ছেলেগুলো টেনে, ঘামে, ভয় আর অনুনয়ের ছেঁড়া গলায় কোনো রকমে থামালো তাকে।
সাইফ থেমেছে বটে, কিন্তু সেই থামা হিমশীতল আগ্নেয়গিরির আগের স্তব্ধতা। চোখে এখনো আগুনের রেখা, কণ্ঠে রক্ত মেশানো কাঁচ…সে ধীরে ছেলেটার দিকে ঝুঁকে গিয়ে বলে উঠলো,
– ভালোয় ভালোয় সব বলে ফেল… আমার ময়না পাখিরে কি করছোস? আর যদি একটুও ঘুরাইয়া বলস, খু/ন কইরা এইখানেই পুইতা রাখুম।
ছেলেটা হাপাতে হাপাতে, প্রায় হাঁপ ধরে উঠে বললো,
– ভাই, ভাই প্লিজ… আমি কিছু করি নাই! একটা পোলার লগে গ্যাঞ্জাম হইছিলো ভাই। ওই পোলারে মারতে গেছিলাম, হঠাৎ ভাবি আইসা পড়ছে। উনার হাতে ব্যথা লাগছে তখন ভাই! আমরা কেউ জানতাম না ভাবি ওইখানে আসবে… আমি তো জাস্ট জিগ্যেস করছিলাম ভাবি এখানে কী করেন… তখনই ভাবি আমারে এক থাপ্পড় দিছে ভাই! আমার কোনো দোষ নাই ভাই, আল্লাহর কসম আমি কিছু করি নাই!
অন্য একটা ছেলের কথা শুনতেই সাইফের মাথায় ঠিক তখনই বিস্ফোরণের আগুন জ্বলে উঠলো। চোখ লাল, রক্তচাপ গলার শিরায় টগবগ করছে।
“দৃষ্টি… কোনো ছেলের জন্য ব্যথা পাইছে?” এই একটা ভাবনা তার সমস্ত হৃৎপিণ্ড হিংস্রতা দিয়ে পিষে দিলো। না, দৃষ্টি এমন না। দৃষ্টি কোনো ছেলের জন্য আগ বাড়িয়ে ঝামেলায় যাবার মেয়ে না। দৃষ্টির ব্যাপারে এই ধারণা সাইফের আত্মসম্মানকেও অপমান মনে হলো। চোখের শিরা ফুলিয়ে সাইফ আবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলো,
– কোন ছেলের জন্য… তোদের ভাবি ঝামেলায় ঢুকছে? ভালো করে বল। ওই ছেলের খুলি খুলে দেখমু মগজে কি তার।
ছেলেটা এবার কিঞ্চিৎ অভিমান নিয়ে চোখ নিচু করে, গলা হালকা কাঁপিয়ে বললো,
– আমি আর কিছু বলমু না ভাই। আপনে তো আগে থেইকাই আমারে অবিশ্বাস করছেন…
এই বলাটার সাথে সাথেই শটান ! একটা ঝড়ো চড় ছেলেটার গালে আছড়ে পড়লো। মনে হলো ঠিক মেঘে মেঘে বৃষ্টির বদলে বজ্রপাত হলো ।
আজ বেচারার দিনটাই মনে হয় গ্রহের দোষে বাঁকা।
সকালে ঘুম ভাঙে মুখ ধুইয়ে আর বিকেলে বাড়ি ফিরে চড় ধুইয়ে, গালি মাখিয়ে! কে কখন এসে চড়ে বসিয়ে দিচ্ছে, কেনো দিচ্ছে কিছুরই আগাগোড়া ঠাহর করতে পারছে না সে।
গালে হাত বুলাতে বুলাতে কাঁদো কাঁদো মুখে ভেজা চোখে তাকালো সাইফের দিকে… কিন্তু সাইফ এখন কষ্ট বা কান্না বোঝার মনোস্থিরে নেই। তার মাথা এখন পুড়ে যাচ্ছে রাগের আগুনে। সাইফ গর্জে উঠলো,
– প্রেমিকার মতো অভিমান মারানো হইতাছে শালা…
থাবড়াইয়া কান জ্বালাইয়া ফালামু, তাড়াতাড়ি বল
ওই ছেলে কে? নাম বল, ওই ছেলের জন্মপত্র হাতে চায় আমার!
ছেলেটা এবার গালে হাত রেখে কাঁচুমাচু মুখে, গলার স্বর একেবারে হালকা করে বলে উঠলো,
– ভাই… আমি চিনি না, ওই পোলা কইছিলো ভাবি নাকি ওর হবু বউ! নাম কইলো উজান… উজান চৌধুরী.. চৌধুরী বাড়ির পোলা হইবো ভাই, ভাবির কোনো পরিচিত হইতে পারে…
এক লহমায় সাইফের মুখের সমস্ত রক্ত টেনে নিলো কোনো অদৃশ্য ছায়া। চোখ ফাঁকা হয়ে গেলো, ঠোঁট শক্ত হয়ে এঁটে গেলো একসাথে।
– উজান!!
নীরব, তীক্ষ্ণ এক বিড়বিড় কিন্তু সেই উচ্চারণে শতবর্ষের জমানো বিষ মিশে আছে। সাইফের ঠোঁট থেকে শব্দটা বের হতেই, চারপাশের বাতাস কাঁপলো এক অদৃশ্য আতঙ্কে।
উজান… আবার? এত বছর পর? এই নাম তার জন্য কাঁটার মুকুটের মতো যার প্রতিটি শিরা গেঁথে আছে এক মৃতপ্রায় অধ্যায়ে। সাইফ নিজেকে সামলে নিতে চাইল। চোখ বন্ধ করে এক গাল দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। শুভ্র পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিলো ধীরে ধীরে, যুদ্ধের আগে হাত হালকা করছে সৈনিক।
তারপর ছেলেটার দিকে তাকিয়ে, চোখে অনাথ-শান্ত এক বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে হাতের ইশারায় ডাকলো। ছেলেটা আঁতকে উঠে দুহাতে নিজের লাল হয়ে যাওয়া গাল ঢেকে ফেললো। এইবার যদি ডান গাল যায়!কিন্তু সাইফ শান্ত গলায় বলে উঠলো
– আরে মারবো না রে, আয় এদিকে।
একটা হাত ছেলেটার ঘাড়ে রাখলো স্নেহমাখা ভঙ্গিতে,
আরেকটা হালকা চাপ দিয়ে বললো
– চল, তোর ভাবিরে দেখে আসি।
ছেলেটা থমকে গেলো। এই মাত্র যে লোক তাকে চপেটাঘাতে ইতিহাসে নাম লেখাতে বসেছিল,সে-ই এখন কাঁধে হাত রেখে হাসছে? লোকটার রাগের রং লাল, আর হাসির রং ভয়!
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সাইফের দিকে তাকিয়ে বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ তার পিছু নিলো…মনটা শুধু বললো, এই লোকের মতিগতি বুঝা ক্যালকুলাসের থিওরি মুখস্থ করার চেয়েও কঠিন!
ছেলেটার নাম ইমন। সাইফের ছায়ার মতো সারাক্ষণ পাশে ঘোরাফেরা করে সে। কে বলে ডান হাত? ইমন তো সাইফের নিঃশ্বাসেরও এক ধাপ আগে চলে!
সবচেয়ে কাছের লোক। আস্তে করে বলা যায় ছোট ভাইয়ের মতো৷ তবে কাজের ভেতর ভয়াবহ রকমের পাকা। সাইফকে ছাড়া তার দিনের শুরু হয় না,আর সাইফও ইমনকে ছাড়া কিছু জানে না।
এই ছেলেটার একমাত্র দায়িত্ব পুরো এলাকার খবর হজম না করে সাইফের কানে ঠিক সময়ে ঢুকিয়ে দেওয়া। কে কার সাথে দেখা করলো, কে কোন গলির মোড়ে কী ফিসফাস করলো, কার মুখে সিগারেট কার চোখে সন্দেহ, সব থাকে ইমনের খাতায়! তবে খাতা চোখে দেখা যায় না, ওটা থাকে মাথার ভেতর, একটা চলন্ত ডেটাবেস। সাইফের সাথে ছায়ার মত লেগে থাকাই ইমনের একমাত্র কাজ।
– এই তোরা কি করছিস সবাই?
ঘরের কোণায় আসিফ,নয়ন,জিদান, তুবা চারজনে আধবৃত্তে বসে কী একটা চুপিচুপি আলোচনা করছিলো। আলোচনার রেশ তখনও কানে বাজছে, এমন সময় বৃষ্টির গন্ধের মত আচমকা ঢুকে পড়লো আফরা। হাঁফাতে হাঁফাতে সে এক ভিন্ন জগৎ থেকে ফিরে এসেছে।
– কি রে? এমন হাঁপাতে হাঁপাতে কার পিছু ছেড়ে এলি?
তুবা ঠাট্টা করলেও আফরার মুখে থেমে থাকা উত্তেজনার রেখা মোছা গেল না।
– একটা গুরত্বপূর্ণ কথা বলার ছিল। মনে হলো না বললে ভয়ংকর পাপ হয়ে যাবে। এইজন্যই এলাম!
চারজনে একসাথে তাকালো আফরার দিকে। মনে হচ্ছে ওর মুখেই লেখা ইতিহাসের এক অব্যাখ্যেয় ঘটনা শোনার অপেক্ষায়। আফরা কোলের বালিশটা শক্ত করে চেপে ধরে বসল। চোখে মুখে এইমাত্র ভিনগ্রহ থেকে ফিরেছি ধাঁচের এক উত্তেজনা।
– কী রে বল! এমন মুখ বানিয়েছিস কেন?
তুবার প্রশ্নে আফরা একবার চোখ মেলে তাকিয়ে গভীর শ্বাস টেনে ঘোষণা করলো,
– আমি দৃষ্টিকে দেখেছি!
এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর সবাই একযোগে শ্বাস ছেড়ে বিরক্তির ছায়া ফেলল চেহারায়। নয়ন পাশ থেকে বলে উঠলো,
– আরে ধুর! মানুষই তো দেখেছিস, উড়ন্ত জিন তো না!
জিদান হাসতে হাসতে বলে উঠলো,
– এমনভাবে বলছিস মনে হচ্ছে ভাগ্যক্রমে আসমানের অপ্সরা নেমে এসেছিল আর তুই চোখের দেখা পেয়ে গেছিস!
আফরার চোখ আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো । সে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
– হ্যাঁ, ঠিক তাই! অপ্সরাই দেখেছি আমি যদি তোরা ওকে দেখতিস, তাহলে বুঝতি আমি কি দেখেছি!
তুবা এবার একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– মানে?
– মানে আমি ঠিকই বলছি। দৃষ্টি অসম্ভব সুন্দর। চোখের সামনে একেবারে আসমানের পরি যেন! এমন রূপবতী আমি আমার এইটুকু বয়সে এখনো দেখিনি।
তুবা চোখ ছোট করে বলল,
– পাগল হয়ে গেছিস নাকি, পাড়া মহল্লায় এত সুন্দর মেয়ে হয় নাকি! মহল্লার মধ্যেই এত রূপবতী আসছে শুনলে তো রূপচর্চার দোকানগুলোই লজ্জায় বন্ধ হয়ে যাবে!
আফরাকে ব্যঙ্গ করে কথাটা বলে উঠলো তুবা। আফরা এবার মুখে একধরনের নিখাদ ভাব এনে বলল,
– আমি ঠাট্টা করছি না তুবা। দৃষ্টিকে দেখে আমার বুঝতে বাকি নেই, আমরা এতদিন প্রসাধনীর নিচে চাপা মুখগুলোকে সুন্দর বলে ভুল করতাম। কিন্তু দৃষ্টি এই সব কিছু থেকে আলাদা। তার চেহারায় বিন্দুমাত্র মেকাপের প্রলেপ নেই তবুও এমন দীপ্তি! যেন মেঘমুক্ত পূর্ণিমার রাত। অসম্ভব সুন্দরী দৃষ্টি তোদের সবার ধারনার থেকেও কয়েক ধাপ বেশি সুন্দর!
কি এমন রূপ! এক নজর দৃষ্টিকে দেখে আফরা বাস্তবতা আর কল্পনার মাঝখানে থমকে গেছে। তার কথায় এক অদ্ভুত উন্মাদনা যা সংক্রমিত হলো বাকিদের মধ্যেও।
নয়ন, জিদান আর আসিফ একটু আগেও যারা ঠাট্টা করলো তারা এখন চুপচাপ। আফরার বর্ণনায় এক অলৌকিক সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ গল্প, কিন্তু গল্পটা অদ্ভুতরকম বাস্তব! তুবা অবশ্য চুপ করে বসে নেই। তার মনে এখনো সংশয়। চোখ ছোট করে, ঠোঁটে ঠাস ঠাস ভাব এনে বলল,
– এই আফরা, তুই ঠিকঠাক আছিস তো? মাঝে মাঝে ভাবি তোর চোখে হয়তো ফিল্টার বসানো, তাই যা দেখিস তাই এডিটেড লাগে!
আফরা চোখ পাকিয়ে তুবার দিকে তাকালো, গলা নামিয়ে বলল,
– আমি কিছুর বাড়াবাড়ি করি না তুবা। আমি দৃষ্টির চোখে চাঁদ দেখেছি, মুখে দেখেছি প্রাচীন কোনো শিল্পীর নিখুঁত তুলির ছোঁয়া।
– তুই বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছিস আফরা।
আফরা তুবার দিকে এমনভাবে তাকাল, মনে হলো এখনই একটা চটাস করে কষিয়ে দিবে। তবুও গলা নিচু করেই বলল,
– মোটেও না তুবা । তুই যদি একবার দেখতি, শুধু একবার তাকিয়ে দেখতি দৃষ্টিকে… তাহলে বুঝতি আমি কিছুই বাড়িয়ে বলিনি।
তুবা ভ্রু কুঁচকে বলল,
– তুই এবার একটু অতিরিক্ত বলছিস আফরা।
আফরা গম্ভীর মুখে মাথা ঝাঁকাল,
– মোটেও না তুবা। দৃষ্টিকে দেখার পর আমি বুঝেছি,
রূপ কথার রাজকন্যা মানে কি। ওর চোখে এমন এক নিঃসীম গভীরতা, তাতে ডুবে গেলে সাতার জানা লোকও হাবুডুবু খাবে। চোখদুটো নিস্তব্ধ জোছনার রাতে কুয়াশায় মোড়ানো জলরাশি।
তুবা এবার কিছুটা চুপ। কিন্তু তুবা চুপ মানে যুদ্ধবিরতি,
পরাজয় না। সে ঠোঁট কামড়ে বলল,
– তাহলে তো দেখতেই হবে মেয়েটাকে…
আফরা হেসে ফেলল,
– দেখবি, দেখলেই বুঝবি। আর দোষ দিবি না আমায়, বরং আমারে ধইরা বলবি, তুই ঠিকই কইছিলি, রূপে ভরা একখান রূপকথা দেখছি ।
পাশ থেকে নয়ন ফিসফিস করে জিদানকে বললো,
– ভাই দৃষ্টিরে না দেখলে মনে হয় আমাদের লাইফটাই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট থাকবে! কিছু কালার লাগে ভাই, কিছু উজ্জ্বলতা…
জিদান মাথা নেড়ে বলে উঠলো,
– দৃষ্টিকে না দেখলে আমাদের জিন্দেগির “দৃষ্টিভ্রম” হয়ে যাবে ভাই। একবার তো দেখতেই হবে।
মাঝে থেকে আসিফ নিজেকে লয়াল আর জেন্টেলম্যান প্রমাণ করতে ফিসফিস করে উত্তর দিল,
– দৃষ্টি যদি এমন হয়, তাহলে পলক পড়ানোই গুনাহ আমাদের দোস্ত! দেখতে হবে না আমাদের বাদ দে।
– তুই চুপ থাক বেডা!
বলেই আসিফকে ধমকে উঠলো নয়ন। সবাই যখন দৃষ্টির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তুবার ভেতরে তখন বাজছে ভিন্ন সুর। দেখতেই হবে মেয়েটাকে! এমন কী রূপ হলো যে আফরা বেহুঁশ! একটা অদ্ভুত জেদ চাপলো তার। তুবা মনে মনে বলে উঠলো,
– দেখবো ঠিকই… কিন্তু আমি প্রমাণ করেই ছাড়বো চাঁদ বলে যেটা ভাবতেছো, ওটা আসলে হাই পাওয়ার টিউবলাইট!
ছেলেগুলোর মনেও জল্পনা। কে আগে দেখবে দৃষ্টিকে? তুবা তো একপা আগেই। আর ছেলেগুলো? দৃষ্টি তো তাদের সামনেই ঠিক ভাবে আসে না। এইভাবে নিজের চেহারা দেখাবেও না। তাহলে তাদের বোধহয় ইচ্ছেটা ইচ্ছেই থেকে যাবে…. নাকি! তাদের মধ্যেও কেউ কেউ তুবার মতোই গোপনে চক কষছে! এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। রূপের সাক্ষাৎ হয় কি না, আর কার ভাগ্যে পড়ে সেই দৃষ্টির মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ!
চৌধুরী বাড়ির দোতলার ঠিক একেবারে কোণার ঘরটা অন্য দশটা ঘরের মতো নয়। বড় নয়, বিলাসী সাজও নেই, তবুও তার ভেতরে গুমরে কাঁদে সময়, আর নিরবে বেঁচে থাকে এক জীবন্ত আত্মা।
এটা দৃষ্টির ঘর না, না! ভুল হলো। বইয়ের ঘর। আর এই ঘরের পুরো ধমনিতে কেবল বইয়ের পাতার শব্দ। বই ভালোবাসে দৃষ্টি। ভালোবাসে মানে এই নয় যে সে গল্প পড়ে সময় কাটায়, সে বই পড়ে বেঁচে থাকে।
তার বাবার রক্তেই মিশে ছিলো এই অভ্যাস। তিনি ছিলেন নিরব পাঠক, শব্দের জাদুকর। বই ছিলো তার কাছে ধ্যানের মতো, আর সেই ধ্যানই উত্তরাধিকার সূত্রে এসে নিভে যাওয়ার আগেই জ্বলে উঠেছে দৃষ্টির ভেতরে।
তাদের বাড়িতেই তার বাবার একটা বড় লাইব্রেরি ছিলো। একটা সময় ছিলো যেখানে সকাল বেলা চায়ের কাপে ধোঁয়ার পাশাপাশি উড়তো বইয়ের পাতার গন্ধ। কত হাজার বই ছিল সেখানে, কত শেলফ, কত গল্পের ঘর!এখন কেমন আছে সেই লাইব্রেরি,দৃষ্টি জানে না। জানারও ইচ্ছে করে না সবসময়। কারণ কিছু স্মৃতি জ্বলন্ত প্রদীপ হয়ে জ্বলে থাকুক, আর কিছু থাকুক মনের কোণে সযত্নে ঢাকা ধুলোমাখা বাক্সের মতো।
তবে দৃষ্টির স্বপ্ন খুব স্পষ্ট, নিজের একটা লাইব্রেরি হবে। শুধু ঘর নয়, একখানা বিশাল মহল হবে বইয়ের। সেখানে থাকবে হাজার হাজার বই, বইয়ের ঘ্রাণে মোড়া হবে বাতাস, ছাদ থেকে নামবে কাঠের ঝুল বারান্দা, আর টেবিলের উপর পড়ে থাকবে পঠিত-অপঠিত কত শত পৃষ্ঠা। এমন একটা লাইব্রেরি, যেটার নাম উচ্চারণ করলেই শহরের জ্ঞানপিপাসুরা চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নেবে। এ স্বপ্ন দৃষ্টির বহুদিনের। আর দৃষ্টি শপথ করেছে সে এটা করবেই।
কারণ এই স্বপ্নে শুধুই ইট কাঠ নেই,আছে বাবার মতো হয়ে ওঠার এক দুরন্ত লালসা। আর সেই লালসায় আগুন জ্বেলে আজও বইয়ের পাতার নিচে মুখ গুঁজে বসে থাকে দৃষ্টি।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ৬
প্রায় প্রতিদিনের মতোই আজও সে এসেছে তার প্রিয় আশ্রয়ে, চৌধুরী বাড়ির কোণার বইয়ের ঘরটিতে।
দিনভর ব্যস্ততার ফাঁকে সময় হয়ে উঠেনি, তাই রাতের নিস্তব্ধতাকেই সে বেছে নিয়েছে। দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘরে পা রাখলো। পেছনের চুল গুঁজে রাখা, চোখজোড়া একটু ক্লান্ত, তবুও বইয়ের ঘ্রাণে ঢুকতেই প্রাণ ফিরে পেলো যেন।
বইয়ের স্তূপে হাত চালিয়ে সে খুঁজে বেড়াচ্ছে একটা পুরোনো, হলুদে মলিন হয়ে আসা প্রচ্ছদের বই। তখনই ছটফট করে হঠাৎই নিভে গেলো সব আলো। পুরো চৌধুরী বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেল।
দৃষ্টি কেঁপে উঠল। মুহূর্তে বুকের ভেতর ছুটে চলল হৃৎপিণ্ড। চারপাশ এক নিমেষে জমাট বেঁধে গেল নিস্তব্ধতায়। আর তখনই..
