Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ৮

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৮

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৮
নূরায়েশা মাহনূর

বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে পাতায় পাতায় দৃষ্টি খুঁজছে এক বিস্মৃত স্বপ্নের চাবিকাঠি। হঠাৎ, ঝটকা দিয়ে নিভে গেলো চারপাশের সব আলো। এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টির দেহ হালকা কেঁপে উঠলেও তার মন অবিচল। এই বাড়ির প্রতিটি খুঁটিনাটি, প্রতিটি কর্নার তার পরিচিত। কেমন এক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এ অন্ধকারের সঙ্গে। আলো তার অতিথি, আর অন্ধকারই আপন ভিটে।

সে পা টিপে টিপে এগিয়ে এলো টেবিলের পাশে। সেখানে ছোট একটা কাঠের ড্রয়ার আছে, যেটার ভিতর মোমবাতি রয়েছে। অন্ধকারে আলো খোঁজার গোপন গুহা। এই মোমবাতি তার বহু একাকী সন্ধ্যার সঙ্গী। বহুবার আলো জ্বালিয়ে সে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় খুঁজে ফিরেছে শব্দের জ্যোৎস্না।
দৃষ্টি সাবধানে ড্রয়ারটা খুলে হাত বাড়ালো ভিতরে। তার আঙুলে ঠেকলো একটুখানি মোমবাতি, ঠান্ডা আর মসৃণ। কিন্তু… দিয়াশলাইয়ের খোঁজে হাতড়ানোটা বাড়লো। সে এবার আন্দাজ করে টেবিলের উপর হাত বুলাতে লাগলো। তক্তার উপর আঙুলের ছায়া ছুঁয়ে বেড়াতে লাগল চুপিচুপি। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত, কোণ থেকে কোণ। কিন্তু না, দিয়াশলাইয়ের প্যাকেট মনে হয় হাওয়ায় মিশে গেছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

অন্ধকার ঘন হয়ে এলো আরও। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো দৃষ্টি …সেই দীর্ঘশ্বাস না বলা এক ক্লান্তির ছায়া হয়ে ঠান্ডা হাওয়ার মতো বেরিয়ে এলো দৃষ্টির বুকের গহীন থেকে। আলো নেই, আশার আভা নেই তাই হয়তো নিঃশ্বাসও হয়ে উঠেছে একটু বেশি ভারী। দৃষ্টি ঠিক করলো এখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে।
ঠিক তখনই, অন্ধকারের বুক চিরে ভেসে এলো এক অচেনা নিশ্বাস ঠিক তার ঘাড় বরাবর। ঠান্ডা, ভারী, একেবারে কাছ থেকে আসা নিঃশ্বাসের তরঙ্গে গা শিউরে উঠলো দৃষ্টির। মুহূর্তেই থেমে গেলো তার সমস্ত কার্যকলাপ।
দৃষ্টি দাঁড়িয়ে রইলো নিঃস্পন্দে। এতটাই স্তব্ধ হয়ে গেলো মনে হচ্ছে দেহ নয়, এক পাথরের খোদাই মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। সময়টাও থেমে গেছে কিনা কে জানে। নিশ্বাসটা এখন আরও কাছে, আরও গভীর। তার ঘাড়ের পেছনটায় আবছা কোনো অস্তিত্বের শ্বাসের ভার বইছে।

ভয়ের গাঢ় ছায়া আর অভ্যস্ত সাহসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি প্রস্তুত হচ্ছিলো। চুপচাপ অপেক্ষা করছিল, ঠিক যে মুহূর্তে অচেনা অস্তিত্বটা একটু এগোবে অন্ধকার ফুঁড়ে, সে তখন ঝাঁপিয়ে পড়বে, তার অস্তিত্ব রক্ষা করবে এক দুঃসাহসী প্রচেষ্টায়।
কিন্তু…তাকে চমকে দিয়ে হঠাৎই নিঃশ্বাসের ভার সরে গেলো পাশ থেকে। নিঃচিহ্নে কেউ বা কিছু সরে গেলো অন্ধকারেরই গভীরে। চারপাশে আবার নেমে এলো এক রহস্যময় নিস্তব্ধতা। দৃষ্টি এখনো এক জায়গায় স্থির। ভাবছে, সত্যিই কি কেউ ছিলো? নাকি ভয়, ক্লান্তি আর কল্পনার মিলিত প্রতারণা?

তবু নিশ্চিত হতে এক হাত রাখলো টেবিলের উপর। আর ঠিক তখনই… তার আঙুলে ঠেকে গেলো কিছু একটা। ধাতব, গা শীতল, অথচ পরিচিত। আঙুলে ভালোভাবে টেনে নিয়ে স্পর্শ করতেই চিনে ফেললো, এটা একটা লাইটার। দৃষ্টি অবাক হলো। আসলে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। সে তো জানে, এই ঘরে কখনো লাইটার রাখেনি সে! কেবল দিয়াশলাইয়ের কাঠিগুলোকেই আপন করেছে সবসময়। সেই কাঠির টুকরোতেই লুকিয়ে ছিল তার একান্ত কিছু স্মৃতি, অভ্যাস, নির্ভরতা।

তবুও আগপিছ না ভেবে সিদ্ধান্ত নিলো মোমবাতিটা জ্বালিয়েই ফেলবে । লাইটারটায় একটা চাপ দিতেই, চট করে একটুখানি শব্দ হলো। একটা ক্ষীণ আগুনের ঝলক , আর সেই আগুন পুরো স্তব্ধ রাত্রিকে খানিকটা গাঢ় করে তুললো। এক অনাহূত দাগ টেনে দিলো নিস্তব্ধতার গায়ে।
মোমবাতির আলো ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে, দেয়ালে দেয়ালে ঝুলে থাকা ছায়াগুলো ধরা পড়ে গেলো। দৃষ্টি ধীরে ধীরে চোখ বুলালো ঘরের প্রতিটি কোণে, বইয়ের তাকে, জানালার পাশে।
কিন্তু… নাহ, কিছুই নেই। কেউ নেই। তবুও দৃষ্টির মনে হচ্ছিলো, এই ঘরে কেউ ছিলো। তার নিশ্বাসে, বাতাসের ভারে, এক অদৃশ্য উপস্থিতির ছাপ এখনও রয়ে গেছে। সে নিশ্চিত কেউ এসেছে। এখনো কি সে আছে? এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই যদি সরে গিয়ে থাকে, তবে গেলো কোথায়?

একটা গা ঘেঁষা জড়ো শ্বাস ছাড়লো …দৃষ্টি তাতে নিজেকে সামলে নিলো। বেরিয়ে যাবে, ঠিক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল। সেই মুহূর্তেই…দরজার কাছ থেকে এলো এক ফিসফিসে শব্দ। থমকে গেলো দৃষ্টি।চোখের পাতা কাঁপলো না একবারও তবুও তার সমস্ত শরীর স্থির হয়ে গেলো প্রশ্নগুলোর ভারে।
কে?বাহিরের কেউ? নাকি চোর? তবে বাড়ির কেউ হলে, এভাবে চোরের মতো আসবে কেন?মোমবাতির কাঁপা আলোর নিচে, দৃষ্টি চারপাশে তাকিয়ে খুঁজে নিলো একটা মোটা কাঠের লাঠি। ধীরে ধীরে সেই লাঠিটা তুলে নিলো সে হাতে।

এরপর সাবধানে… সে ফুঁ দিলো মোমবাতির দিকে। নরম আলোটা এক মুহূর্তে নিভে গেলো, আর তার সঙ্গে নিঃশেষ হলো শেষটুকু দৃশ্যমানতা। চারপাশে ফিরে এলো সেই অন্ধকার, যেটার সাথে দৃষ্টির প্রাচীন বন্ধুত্ব।
ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে অন্ধকার চিরে এগিয়ে যেতে লাগলো দৃষ্টি। আওয়াজটা যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল, দৃষ্টিও ঠিক সেখানেই গিয়ে থামলো। আর তারপর…
চোখে না দেখেই হঠাৎ এক ঝাঁজালো বিস্ফোরণ হয়ে উঠলো তার হাতের লাঠিটা। কোনো ঘোষণা নেই, কোনো সুযোগ নেই সরাসরি দিগ্বিদিক ভুলে একের পর এক লাঠির বাড়ি চালাতে শুরু করলো দৃষ্টি। কঠিন কাঠের বাড়িতে চারপাশে ভেসে উঠলো অস্পষ্ট চিৎকার,

– আআহ! আরে থামো!
– কী হচ্ছে!
কিন্তু শব্দগুলো ব্যথার আঘাতে এলোমেলো, আধো গলায় শুনালো। রাতটা কেঁপে উঠলো এক অচেনা শোরগোলে। এমন আকস্মিক শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো উজান। তার পেছন পেছন তুবা আর আফরাও বেরিয়ে এলো নিজেদের ঘর থেকে।

তখনই…এক ঝলক তীব্র আলো এসে পড়লো ঘরের ভেতর।বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে। দৃষ্টির হাতের লাঠি স্থির হয়ে গেলো মাঝআকাশে। আলো পড়তেই পরিষ্কার দেখা গেলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটা বেহাল দশার প্রাণ। একজন কাতর, একজন হকচকানো, আর আরেকজন হাত পা গুটিয়ে ব্যথার নিকুচি করছে।
দৃষ্টি থমকে গেলো। সেকেন্ড খানেকের জন্য মাথার সমস্ত রক্ত উল্টোপথে বইলো। দ্রুত দুই পা পিছিয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো সে। তারপর অস্থিরভাবে টেনে নিলো মাথার আচলটা। আর সেই আচল দিয়েই ঢেকে ফেললো মুখখানা। তারপর হেঁচকা গলায় বলেই ফেললো,

– আরেহ আরেহ আপনারা এখানে কি করছেন?
জিদান, হাত-পা ঢলতে ঢলতে প্রায় কান্নার গলায় চেঁচিয়ে উঠলো,
– সেটা মারার আগে জিগ্যেস করতে হতো!
অত্যন্ত দুঃখি স্বরে কথাটা বলে উঠলো সে। একটু পরেই সে ব্যথা ভুলে যদি কাঁদতে বসে যায় তা দেখেও আশ্চর্য হতো না দৃষ্টি। এর মধ্যেই এসে গেলো উজান।তুবা আর আফরাও পেছনে পেছনে হাজির। দরজার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তারা থমকে গেলো দৃশ্য দেখে।আসিফ, নয়ন আর জিদান মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে, কেউ কোমর ধরে আছে, কেউ হাঁটুতে মালিশ করছে।
আফরা চোখ কপালে তুলে এগিয়ে গেলো। আগে আসিফকে টেনে তুললো সে। আর উজান দুই হাতে একে একে নয়ন আর জিদানকে সামলে তুলতে তুলতে বললো,

– তোদের এই অবস্থা কি করে হলো?
উজানের কথা শুনতেই আসিফ গরম চোখে তাকালো দৃষ্টির দিকেই। ঠিক তখনই পাশ থেকে নয়ন চিৎকার দিয়ে বলে ফেললো,
– সেটা তোর বোনকেই জিগ্যেস কর! এই অবস্থা তো তারই কল্যাণে! উফফফ, কি মারটাই না মারছে… হাড়গোড় সব ট্যাঁড়া হয়ে গেছে রে ভাই!
জিদান বেচারা হাঁ করে করে নিশ্বাস নিচ্ছে। মনের ভিতরেও ব্যথা ঢুকেছে তার। আসিফ হাঁটুতে হাত দিয়ে ঢলতে ঢলতে বলে উঠলো,

– এই মেয়েটা ভয়ংকর ভাই। অন্ধকারে পিটিয়ে আধমরা করে ছেড়েছে রে!
ঠিক তখনই আফরা এগিয়ে এসে বললো,
– দৃষ্টি, তুমি ওদের এইভাবে মারলে কেনো? কী করেছিলো ওরা?
সবাই দৃষ্টির দিকে তাকালো। সে মুখের অর্ধেকটা আচলে ঢেকে রেখেছে, চোখ দুটো শুধু উঁকি দিচ্ছে। দৃষ্টি একটু চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে সরল গলায় বলেই ফেললো,
– আগে ওনাদের জিজ্ঞেস করুন আপু, ওনারা এই রাতের বেলায় অন্ধকারে ফিসফিস করে কি করছিলেন?
সব চোখ এবার ঘুরে গেলো নয়ন, আসিফ আর জিদানের দিকে। তিনজনের মুখেই চোর ধরা পড়েছে রকমের একটা ভঙ্গিমা। চোখ টিপে, ঘাড় চুলকে, কেউ পায়ের আঙুলে ঘষছে মেঝে। এমনভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে তারা একটা কবরস্থানের ভাষণ শুনছে। ঠিক তখনই দূর থেকে এসে হাজির হলো মরিয়ম বেগম।সে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

– কি হইছে আম্মা? উজান বাবা কি হইছে এত শোরগোল কেন? বেগম তো মেলা ডরাইছে, আমারে পাঠাইলো দেখার লাইগা!
মরিয়মের কথার উত্তরে উজান একবার তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
– কিছু হয়নি খালা, আমরা এমনি কথা বলছিলাম তো তাই… যাও, তুমি মায়ের কাছে যাও।
মরিয়ম সন্দেহভরে চারপাশে তাকালো। কিন্তু কিছু না বলেই ধীরে ধীরে ফিরে গেলো। তার বিদায়ের সাথেই ঘরের বাতাস একটু ভারী হয়ে উঠলো। উজান এবার এক পা এগিয়ে এলো। চোখে আগুন, ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো,
– কি করতে এসেছিস এখানে তোরা? সত্যি করে বল।

তিনজন আসলে সত্যিকারের আসামি। চোরের মতো মুখ করে একে অপরের দিকে তাকালো তারা। নয়ন আসিফের দিকে তাকালো আসিফ জিদানের দিকে, আর জিদান বেহাল মুখে ফ্যালফ্যাল করে তাকালো ফাঁকা দেয়ালের দিকে। মনে হলো দেয়াল ফেটে যদি বের হওয়ার রাস্তা মিলে!
দৃষ্টি আস্তে করে হাতে থাকা লাঠিটা দরজার পেছনে রেখে গুছিয়ে দাঁড়ালো। তারপর কারো দিকে না তাকিয়েই বলে উঠলো,

– পরের বার থেকে রাতের বেলায় একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। এরকম ফিসফিস শুনলে চোর ভেবে আবারো মাইর খেতে পারেন।
এই বলে গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেলো দৃষ্টি। দৃষ্টি হেঁটে চলে যাওয়া মানে মঞ্চ ছেড়ে প্রধান চরিত্রের প্রস্থান। এবার জিদানের কলার চেপে ধরলো উজান।
– এই শালা, সত্যি করে বল এখানে কি করছিলি? নাইলে এবার এক ধফা আমার হাতে মাইর খাবি!
জিদান ঘাড় টান করে পেছনে তাকালো। এই ফাঁকে আফরা এগিয়ে এসে আসিফের সামনে দাঁড়ালো। চোখে চড়চড় করে রাগের আগুন নিয়ে বলে উঠলো,

– সত্যি করে বল, কি করতে এসেছিস নাইলে কিন্তু এখন…
আফরার কথায় আসিফ গলা নিচু করে বলে উঠলো,
– আমার দোষ কী! ওরা দুজনেই পাগল হয়ে গেছিলো দৃষ্টিকে দেখতে! আমি কতবার বলেছি, আমি আসবো না তাও টেনে নিয়ে এসেছে আমাকে! তোর কারণেই তো! তোকে কে বলেছে দৃষ্টির সৌন্দর্যের কথা এই হাবাইত্তা গুলারে বলার জন্য? শুনার পর থেকেই পাগল হয়ে গেছে দেখবে বলে।
একটানা কথার শেষে আসিফ নিজেই হাঁপিয়ে পড়লো। এই কথা শুনে উজান আর আফরা তো পুরো হতবাক! এদের মাথা নষ্ট না হলে আর কী! উজান এবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে লাঠিটা আবার হাতে তুলে নিলো। গজগজিয়ে বলে উঠলো,

– আজ তোদের শেষ সৎকার হবে!
আর সেটা দেখেই…নয়ন, আসিফ আর জিদান কোনো কথার অপেক্ষা না করেই লেজ গুটিয়ে দৌড় দিলো। তা দেখে আফরা হেসে উঠলো। উজান চোখ পাকিয়ে বললো,
– দৃষ্টি এই কাহিনি জানতে পারলে কিন্তু এরা কেউই এ বাড়িতে থাকতে পারবে না।

ঘরে একের পর এক পায়চারি করে চলেছে দৃষ্টি। তাদেরকে মারার জন্য বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই তার। চোরের মতো রাতের বেলা ফিসফিস করলে মার খাওয়াটাই তো নিয়তির বিধান। তবু… যে ভাবনাটা তাকে ছায়ার মতো পিছু ছাড়ছে না তা হলো তখন, সেই মুহূর্তে ঘরে সে একা ছিলো না।
কেউ ছিলো। অদৃশ্য কারো শ্বাসের গাঢ় উপস্থিতি ছুঁয়ে গিয়েছিলো তার ঘাড়। তার ত্বক টের পেয়েছিলো সেই শ্বাসের শীতল কাঁপন। সেই অনুভূতি কল্পনা নয়, কল্পনার অতীত এক বাস্তব স্পর্শ।
কে ছিলো সেই ছায়া? উজানের বন্ধুদের কেউ? কিন্তু না, তারা তো একত্রে ধরা পড়েছে। তাদের কেউ হলে চোখে পড়ার আগেই মিলিয়ে যেতো ঘরের কোনো কোণে। আর মার খেয়ে কাতর আত্মা হয়ে পড়ে থাকতো না।
তাহলে কে? কে সেই সাহসী? কে এমন নিরবে ঢুকে তাকে তন্নতন্ন করে বুঝে নিয়ে আবার অন্তর্হান হয়ে গেলো? দৃষ্টি ভাবছে, আবার ভাবছে, বারবার ভাবছে….

ভাবনার অতল থেকে উঠে এসে হঠাৎই দৃষ্টির চোখ আটকে গেলো পড়ার টেবিলের এক কোণে। সেখানে রাখা একটা নীল খাম, নীরব অথচ আতঙ্ক ছড়ানো উপস্থিতিতে আলোকপাত করছে তার অজানা কৌতূহলে।
এটা দৃষ্টি রাখেনি। তার জ্ঞানসীমা, তার অভ্যাস, তার প্রতিদিনের নিরুত্তাপ টেবিল, সেখানে এমন খাম থাকার কথা নয়। তাহলে কে রেখেছে? কার সেই নিরব আগমন যে শব্দের বদলে রেখে গেছে শুধু নীল রঙের এক জিজ্ঞাসা?
এক মুহূর্ত দৃষ্টি স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ চক্রাকারে ছুটে বেড়াতে লাগলো নিজ ঘরের প্রতিটি কোণায়। প্রতিটি জানালার ফাঁক, পর্দার পর্দা, কোথাও মানুষের উপস্থিতি নেই। আছে কেবল অনুপস্থিতির ভয়ানক ঘনত্ব।
ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে সে দরজা-জানালা ঠিকঠাক বন্ধ করে নিলো। তারপর সে একটা ভারী জড়ো শ্বাসে হাত বাড়িয়ে নিলো সেই খাম। খামের ছিঁড়ে পড়া মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা ছোট্ট চিরকুট। দৃষ্টি চোখ মেলে চেয়ে দেখলো চিরকুটটা।

“প্রিয় বিষচন্দ্রিমা,
তোমার রূপলোকের গাঢ় স্নিগ্ধতায় আমি সময়চ্যুত এক আত্মা। মোমের শিখায় ঢেউ খেলানো হলদে ধোঁয়ার আবছায়ায় তোমার অপরূপ বিভা সে এক বিষণ্ণ মোহ, যা আমাকে প্রতিরাতের মত করেই মাতাল করেছে। তোমার রূপে হারিয়ে ফেলে এসেছি আমার সমস্ত নিজস্বতা। ভাবো তো, একখণ্ড মানুষ কেমন করে নিজের সমস্ত সত্তা ভাসিয়ে দেয় কেবল কারো চোখের পাতায় জমা চাঁদরাতে?
তুমি বিধাতার শূন্যগর্ভ একাকিত্ব থেকে জন্ম নেওয়া এক সৌন্দর্যের শোকগাথা। তোমায় দেখলেই মনে হয়, বিধাতা দীর্ঘদিনের নৈঃশব্দ্য ভেঙে নিজ হাতে এক যন্ত্রণার চাঁদ রচনা করেছেন। রূপসী, অপার, অথচ বিষাক্ত কোমলতায় পরিপূর্ণ।

সাঁতার না জেনেও আমি ডুব দিয়েছি তোমার প্রেমের অতল সায়রে। নিঃশ্বাস নিতে নিতে আমি প্রতিবার তলিয়ে যাই আরও এক স্তর গভীরে। তলিয়ে যেতে যেতেও আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবি এই বুঝি অস্তিত্বের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। কিন্তু না এ তো আরও একধাপ গভীর… আরও একধাপ হারানো।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৭

তবু তোমার দিকে বাড়িয়ে দিই হৃদয়ের নির্বাক আর্তি।কারণ আমি বুঝে গেছি, তোমার মোহে হারিয়ে যাওয়াই আমার একমাত্র পরিণতি। আমার সত্তা আজ অবশ; আমার চিন্তাসমূহ বিকারগ্রস্ত। তোমার অলীক ঐশ্বর্যের নিকট আমি এক অসহায় উপাসক!
ইতি,
তোমার অন্তর্গত বিষপিপাসু!”

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৯