Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৫

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৫

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৫
অহনা রহমান

সকাল সকাল হিয়া তল্পিতল্পা গুছিয়ে বের হলো রুম থেকে। সে কিছুতেই থাকবে না এই বাড়িতে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে নাসিমার সামনে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। নাসিমা বই পড়ছিলেন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে। তিনি যখন দেখলেন হিয়া রেডি-টেডি হয়ে বের হয়েছে। নাসিমা অবাক হলেন। তিনি উঠে হিয়ার কাছে গেলেন দ্রুত। ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বললেন,

“কি হয়েছে মা? কোথায় যাচ্ছো? ব্যাগ কেন হাতে?”
হিয়া জানতো এমন কিছুই হবে। সে আগে থেকে সব সাজিয়েই রেখেছিলো। হিয়া সাজানো কথা গুলো এক এক করে বলতে লাগলো,
“আন্টি আমার ভার্সিটিতে অনেক জরুরি একটা কাজ পরে গেছে। আমাকে এখনই যেতে হবে। আন্টি বিশ্বাস করুন, আমি কারো উপরে রেগে নেই। কারো উপরে অভিমানও করিনি। কিন্তু আমাকে যেতে হবে। সমস্যা নেই… আমি আবারও আসবো।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

হিয়া কথাগুলো এক নিশ্বাসে বললো। নাসিমা খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন হিয়ার দিকে। তিনি বেশ বুঝতে পারছেন, হিয়া এখন থেকে যাওয়ার জন্য এসব বলছে। রাজ যখন হিয়াকে অপমান করেছিলো, তিনি তো দেখেছিলেন হিয়ার চোখের পানি। হিয়ার জায়গায় তিনি থাকলেও এরকমই করতেন। নাসিমা হিয়ার সামনে ধরা দিলেন না যে তিনি হিয়ার মতলব বুঝতে পেরেছেন। বরং অবাক কন্ঠে বললেন,
“তাই? এমা তাহলে তো আজই যেতে হবে।”
হিয়া দ্রুত উপরনিচ মাথা ঝাঁকালো। সে মনে মনে ভিষণ খুশি হলো। যাক তাকে আর বেশি কিছু বোঝাতে হয়নি। বলল,

“হ্যাঁ হ্যাঁ আন্টি। আমাকে যেতে হবে আজই।” একটু থেমে আবারও বলল,
“রুহি আপুরা তো ঘুমাচ্ছে তাই আর ডাকছি না ওদের। আমি তাহলে যাই আন্টি?”
হিয়ার রাস্তা এখন পরিষ্কার। সে নিশ্চিন্তে যেতে পারবে। রমনী স্বস্তির শ্বাস ফেললো। তবে সে শ্বাস নেওয়ার আগেই বাঁশ রেডি হলো। হিয়া যেতে নিলে নাসিমা হিয়ার হাত ধরে বললেন,
“একদিন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ্যাটেণ্ড না করলে তেমন কিছুই হবে না। বরং তুমি যদি চলে যাও আমি অনেক কষ্ট পাবো মা। আমি জানি, তুমি আমার ছেলে-বৌমার কথায় কষ্ট পেয়েছো। তাই চলে যাচ্ছো।”
“না না আন্টি এমন কোন বিষয় নয়। আমার যেতে হবে এখন।”
নাসিমা আবারও হিয়াকে বললেন,

“উহুম… কোনো কথা শুনবো না। তোমার বড় চাচ্চু আগামী সপ্তাহে আমাদেরকে যেতে বলেছেন। তুমি যদি এখন চলে যাও, তাহলে কিন্তু আমরা যাবো না।”
নাসিমা শক্ত কন্ঠে বললেন,
“হিয়া সত্যি আমি কষ্ট পাবো তুমি চলে গেলে।”
হিয়া মনে মনে বেশ বিরক্ত হলো। এটা কেমন মসিবত রে বাবা! তার তো এখানে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তা কি কেউ বুঝতে পারছে না? আশ্চর্য! হিয়া আর কথা বলতে পারলো না নাসিমার সামনে। শত হলেও হিয়ার মায়ের বয়সী। তার সামনে তো আর হিয়া কথা বলতে পারে না। হিয়া ব্যর্থ হয়ে ঘুরে নিজের রুমে চলে গেল। তার কিছুই ভালো লাগে না। পুরো জীবনটাই লস তার।

হিয়া চলে যাওয়ার পর নাসিমা আবারও শান্তিতে পড়াতে মনোযোগ দিলেন। সকালে একটু হাদিস-কোরআন না পড়লে ভালো লাগেনা তার। পুরোনো অভ্যাস এটা। তাছাড়া এখন বাজেই বা কত? নাসিমা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সবে সাতটা পঁচিশ বাজে। নাসিমা এবার সত্যি সত্যিই অবাক হলেন। মেয়েটা ঘুমোইনি নাকি? সে যাক গে! হিয়া যে থেকে গেছে এটাই অনেক। নাসিমা সকল চিন্তা বাদ দিয়ে পড়তে বসলেন। ঠিক তখনই কল এলো ফোনে। নাসিমা বেজায় বিরক্ত হলেন। এখন আবার কে কল করলো। একটু পড়তে এসেছিলেন সেটাও শান্তিতে করতে পারছেন না। নাসিমা পাশ থেকে ফোনটা নিলেন। স্ক্রিনে নম্বর দেখে তিনি হতবাক হলেন। একবার তাকালেন উপর তলায় নাফির রুমের দিকে।

রুহি নিজের সমস্ত কাপড় বের করেছে। সেগুলো হিয়ার সামনে দেখাচ্ছে আর এটা সেটা বলছে। রুহির ইচ্ছে হিয়াকে জেলাস করানো। কিন্তু হিয়া তো ফিরেও তাকাচ্ছে না রুহির দিকে। ও নিজে ফোন নিয়ে ব্যস্ত। এতে বেজায় রেগে গেল রুহি। ও আলমিরা বন্ধ করে হিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। হিয়ার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো সে। খাটের উপর ছুঁড়ে মেরে বলল,
“তুই নিজেকে বেশি স্মার্ট ভাবছিস না হিয়া?”
হিয়া বলল,

“আমি এমনিতেই স্মার্ট। এখানে বেশি আর কম ভাবার কি আছে?”
রুহি রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো। ও পারে না হিয়ার গায়ে তোলে। কিন্তু এটা শশুরবাড়ি। এখানে রুহি নিজের ইমেজ নষ্ট করতে চাইছে না। তাই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“হিয়া তোকে এখানে এজন্য আসতে বলা হয়নি। তুই এসেছিস আমাকে গুছিয়ে দেওয়ার জন্য।”
“হ্যাঁ তা গোছাতে দাও না। তোমার জামাইয়ের গুনগান শোনার জন্য আমাকে তো আসতে বলা হয়নি তাই না?”
রুহির শুধু শশুরবাড়ি বলে সবটা সহ্য করে নিলো। নাহলে এই হিয়াকে সে আস্ত রাখতো না। দুই বোনের কথোপকথনের মধ্যে ভেতরে এলো রাজ। রুহির মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলো, এখানে কিছু হয়েছে। সে আগুনে ঘি ঢালার মতো এসে রুহিকে বলল,

“বেইবি কি হয়েছে? আমার সোনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”
হিয়ার হাসি পেল ভিষণ। সে হেঁসেও ফেললো ফিঁক করে। এসব ঢংয়ের মেয়াদ কতদিন হয় সেটাই দেখার বিষয়। হিয়াকে হাঁসতে দেখে রাজ বিরক্ত হলো। রুহির কাছে গেলো সে। হিয়াকে দেখিয়ে দেখিয়ে রুহির চিবুক ধরলো সে। সামনের বেবি হেয়ার গুলো সরিয়ে দিলো। রুহির কপালে চুমু খেয়ে ন্যাকা স্বরে বলল,
“রাগ করে না বেবি। আমার সোনা বেবিল। তবে তোমাকে রাগলে কিন্তু বেশিই সুন্দর লাগে।”
হিয়া ফিরেও দেখলো না ওদের দিকে। ও নিজের ফোনটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ওদের দিকে না তাকিয়েই বলল,
“আমাকে নিশ্চয়ই এসব ফষ্টিনষ্টি দেখাতে আনা হয়নি। এসব শেষ হলে আমাকে ডাক দিও।”
হিয়া দরজার কাছে গিয়ে আবারও বলল,

“তাছাড়া আমার চেয়েও তোমার ফ্যাশন সেন্স ভালো আপা। এটা সবাই’ই জানতো। হঠাৎ আমাকে আনার কারনটা আমি ঠিক ধরতে পেরেছি। এসব বাদ দিয়ে ভালো হও। ভালো হতে পয়সা লাগে না।”
হিয়া চলে যাওয়ার পর রুহি ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিলো রাজকে। খেঁকিয়ে বলল,
“তোমাকে বিয়ে করার কারন হিয়াকে শায়েস্তা করা। এটা ভুলো না কখনোও। আমরা আসার পর যেন হিয়ার মুখের হাসিটা না দেখি।”
রাজ বাঁকা হাসলো। তারও তো হিয়ার থেকে প্রতিশোধ নেওয়া বাকি। এইবার এমন ব্যবস্থা করবে না? ওই হিয়া আর মুখও দেখাতে পারবে না লোক সমাজে।

“আমি ভুলিনি, আমাকে মনে করানোর প্রয়োজন নেই। কালকে সকালেই আমরা যাচ্ছি, সব গুছিয়ে নাও।”
রুহি রাজের কথাতে সম্মতি দিলো। সে লেগে পরলো গোছানোর কাজে। শুক্রবার যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু তারা বৃহস্পতিবার যাবে। অর্থাৎ আগামীকাল। এইজন্যই তো এতো তোড়জোড়। নাফিই প্রথমে বললো শুক্রবার যেতে, আবার আজকে বললো কালকে যেতে।
রাজ বুঝতে পারছে না নাফির মতলব কি। সেই প্রথম দিন থেকেই নাফিকে কেমন অন্যরকম লাগছে। নাফি এমন মানুষ যে, তার পাশে মেয়েরা ডান্স করলেও ফিরে তাকায় না। আর সেই ছেলে কি’না হিয়াকে পরে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে? হিয়ার উপর আগে থেকে নজর না রাখলে কিভাবে দেখতে পেলো?

হেলেনা হিয়ার ঘরে বসে আছেন। মূলত হিয়ার ঘরটা ঘর গোছাচ্ছিলেন তিনি। হিয়া বাড়িতে না থাকলে তার ভালো লাগে না। সবকিছুই তার মেয়েটাকে ঘিরে। মেয়েটা না থাকলেই তার একা একা লাগে। অথচ কিছুদিন পরই মেয়েটা পরের ঘরে যাবে। তখন কিভাবে থাকবেন তিনি? এসব ভাবলেই হেলেনার চোখের কোনে জল জমে। হেলেনা এসব কথায় ভাবছিলেন। হঠাৎ তার ফোনে কল এলো। ফোনটা পাশেই রাখা ছিলো। হেলেনা ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে নম্বর দেখে অবাক হলেন। বিরবির করে বললেন,
“রুহির শাশুড়ী আমাকে কেন কল করলো?”
হেলেনা কল রিসিভ করলেন।

রাতে ছাঁদে হাঁটাহাটি করার অভ্যাস অনেক পুরোনো। একা থাকাটা উপভোগ করতে রাতের ছাঁদের বিকল্প নেই। খোলা আকাশে মাথার উপর জ্বলজ্বল করতে থাকা চাঁদ টা বেশ উপভোগ করা যায়। আর চাঁদ দেখতে কার না ভালো লাগে? সেই সাথে মনের কথা গুলো ঢেলে দেওয়া যায় প্রকৃতির কাছে। হিয়া আজও ছাঁদে উঠলো। তবে আজ সে আর অলসতা করলো না। যাওয়ার সময় এক কাপ কফি বানিয়ে তবেই উঠলো ছাঁদে।

আজ বোধহয় হিয়ার ছাঁদে উঠতে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। হিয়া দেখলো তার জায়গাটায় নাফি দাঁড়িয়ে আছে। মানে কালকে সে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছিলো, আজকে সেখানে নাফি দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটাই হিয়া বিরক্ত হলো। এই লোকটা সে আজ সারাদিন যথাসম্ভব ইগনোর করে চলেছে। কিন্তু সে’ই রাতের বেলা দেখা হতেই হলো। সারাদিন পরে হিয়া একটু নিজের মতো সময় কাটাতে আসলো, সেটাও পছন্দ হলো না? হিয়া শুধু নাফি না, গোটা দুনিয়ার উপরেই বিরক্ত হলো। একটা বড়সড় বিস্ফোরণ ঘটুক আর তাতে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাক। তাহলে যদি হিশা একটু শান্তি পায়। বাবা গো বাবা! যেখানেই যায় না কেন সেখানেই ঝামেলা৷ হিয়া নাফির দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো, তার বোধহয় ঝামেলালগ্নে জন্ম হয়েছে৷ বাড়িতে গিয়ে মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে।
হিয়া এগিয়ে গেল। তবে নাফির দিকে গেল না। ছাঁদের অন্য পাশে গেল সে। নাফি আঁড়চোখে দেখলো সবটা। সে এইবার নিজেই গেল হিয়ার কাছে। হিয়ার থেকে সামান্য দুরত্বে দাঁড়ালো গিয়ে।

“এমন ভূতের মতো এসে কেউ দাঁড়ায়? আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।”
“ভয় পেলে তো এখানে এসে দাঁড়াতে পারতেন না।”
“আচ্ছা তুমি কালকে কি বলছিলে যেন? ওই যে ক্যাফেতে কি যেন একটা কথা বলেছিলে। ওইটার বিষয়েই তো বলছিলে তাইনা?”
দিলো তো হিয়াকে মনে করিয়ে? আচ্ছা এটার কি কোনো দরকার ছিলো? হিয়া চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলো জোরে। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“মনে যখন ছিলোই তাহলে কাল এতো নাটক করলেন কেন?”
নাফি গোবেচারার মতো ভাব করে বলল,
“নাটক? আমি তো কোনো নাটক করিনি। কালকে আমার মনে ছিলো না। আজকে মনে হয়েছে। এটা কি আমার দোষ বলো?”
“আজ মনে পরেছে তাহলে?”
“হ্যাঁ অবশ্যই। বিয়ে না কি যেন একটা করতে বলেছিলে তাই তো?”
হিয়া তাকালো নাফির দিকে। হিয়ার দৃষ্টিতে যেন আগুন জ্বলছে। যে আগুনে নাফি ভষ্ম হয়ে যাবে। নাফি বোকা হাসলো সেদিকে চেয়ে। মনে মনে মুগ্ধ হলো বৈকি!
“হায় আল্লাহ! এভাবে কেন তাকাচ্ছ? তুমি জানো আমি তোমার কত বছরের সিনিয়র?”
হিয়া নিজের রাগ সংবরন করে বলল,

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৪

“আপনি আমার সাথে মশকরা করছেন নাফি? আপনি আমার দুলাভাইয়ের বড়ভাই হিসেবে আপনাকে অনেক সম্মান করেছি। কিন্তু আর করবো না কিন্তু!”
হিয়াকে হতবাক করে দিয়ে নাফি হিয়ার এক হাত হ্যাঁচকা টান দিলো। হঠাৎ এহেন কাজে তাল সামলাতে পারলো না হিয়া৷ সোজা গিয়ে নাফির সাথে বারি খেলো। হিয়ার তখন বেহাল অবস্থা। ওই অবস্থাতেই নাফি হিয়ার কানের কাছে হিসহিসিয়ে বলল,
“তোমার কাছে সম্মান কে চেয়েছে? আমি আগাগোড়াই ব্যাড বয় হিয়া। যেটা তুমি খুব শিগগিরই বুঝতে পারবে।”

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৬