Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ১২

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১২

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১২
নূরায়েশা মাহনূর

– এই যে ম্যাডাম!
সাইফের কণ্ঠে বাজল এক তীক্ষ্ণ কোমল ঢাক। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দৃষ্টির দৃষ্টি এক লহমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এক অনাবিল মোহে। নিকাবের অন্তরালে তার নয়নজোড়া ঝলসে উঠল সন্ধ্যার প্রথম তারা হয়ে। সাইফ কয়েক পা এগিয়ে এসে স্থির দাঁড়ালো তার সামনে। আলতো ভঙ্গিতে হাতদুটো পেছনে নিলো। মাথাটি একটু ঝুঁকিয়ে দিলো সে দৃষ্টির সামনে। ঠিক কোনো রাজদরবারে হাতছানি দেওয়া বালকের মতো।

সেই অপলক ভঙ্গিমায় তাকিয়েই দৃষ্টি নিরবে হাসল। এক অভিমন্ত্রিত কোমলতায় সে হাত বাড়িয়ে সাইফের চুলের জঙ্গলে আঙুল ডুবিয়ে দিলো। একরাশ শিশুসুলভ চঞ্চলতায় সে এলোমেলো করে দিলো সাইফের চুলগুলো। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল গ্রীষ্মের দুপুরে হঠাৎ নেমে আসা ফোটা ফোটা বৃষ্টির মতো।
সাইফের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ব্যতিক্রমী, নিবিড় হাসি। হৃদয়ের অন্তঃকোণ থেকে বেরিয়ে আসা এক নিরব কবিতার মতো। একটানা কিছুক্ষণ চুলগুলো এলোমেলো করেই আবার যত্নে সেগুলো গুছিয়ে দিলো দৃষ্টি। সাইফ এবার মাথা তুলে নির্ভুল নিঃসৃত চাহনিতে চোখ রাখল তার চোখের গভীরতম রেখায়।আলতো, মায়াবী স্বরে ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– ভালোবাসি ম্যাডাম…
দৃষ্টিও নীরবে হেসে বলে উঠলো,
– আমিও ভালো…
কিন্তু বাকিটা উচ্চারিত হওয়ার আগেই ছেঁড়েখুঁড়ে ঝরে পড়লো সাইফের স্বপ্নের ক্যানভাস।
– এই ভাইয়া, আর কতকাল ঘুমাবি বল তো?
চিরচেনা কর্কশ কণ্ঠস্বর, সঙ্গে ঝাঁকুনির নিদারুণ বাস্তবতা। আচমকা আরও দুটো টান দিতেই স্বপ্ন-ভাঙা ছাইরঙা চোখে লাফিয়ে উঠলো সাইফ। স্বর্গসন্ধ্যাকে মুহূর্তেই নরকের প্রহসনে রূপান্তর করে, বিগড়ে গেল তার মেজাজ। এক ঝাঁকি দিয়ে নীলিমার মাথায় চাপড় বসিয়ে গর্জে উঠল,

– আর এক মিনিট দেরি করলে কি এই গ্রহভিত্তিক জীবনের ভরকেন্দ্র বদলে যেতো ? এত দারুণ একটা স্বপ্ন! ধ্বংস না করে পারলি না তুই?
– ভাইয়া… কতোবার বলেছি, আমার মাথায় এমন ঝাঁকি দিবি না। এমনিতেই মাথায় কিছু থাকে না… আর তুই এসে ওইটুকু যা ছিল তাও ঝাকিয়ে ঝুকিয়ে ভুলিয়ে দিস!
– দিলি তো, দিলি তো! আমার স্বপ্নের পরীটাকে নিয়ে গড়া অমল দৃশ্যটাকে তুই একেবারে কচুকাটা করে দিলি!
– আর কতকাল এইভাবে শুধু চোখ বুঁজে স্বপ্ন দেখবি ভাইয়া? এবার নিয়ে আয় না। আমিও তো মিস করি আপুকে খুব…

– ইশ! তোর আপু যে আগুনের গোলা সেটা কি তোর অজানা? তাকে ছুঁতে গেলেই গনগনে শিখায় ভষ্ম হয়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাবো আমি। নিয়ে আসা তো দূরের কথা চেষ্টা করলেই তো আমাকে দুনিয়ার ম্যাপ থেকে মুছে ফেলবে।
ভাইয়ের কথায় একটা দীর্ঘ, গরম শ্বাস ফেললো নীলিমা। কতদিন হয়ে গেলো, দৃষ্টিকে চোখের দেখাও মেলে না।কবে আবার আগের মতো দিন আসবে?আসবে তো? নাকি সময় চুপিচুপি সবকিছু নিজের মতো গুছিয়ে নিয়ে গেছে?
– ভাই, আর কত ঘুমাইবেন? তাড়াতাড়ি উঠেন, কলেজে যাইবেন না নাকি?
ইমনের ডাক শুনে একসাথে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো নীলিমা আর সাইফ। ইমনকে দেখেই নীলিমার ঠোঁটে ভেসে উঠলো একটা বিরক্তিতে মোড়ানো হাসি।

– এই যে নাটের গুরু এসে গেছে!
– আমি আবার কী করলাম!
নীলিমার কথায় হাসফাস করতে করতে কথাটা বলে উঠলো ইমন। মনে হচ্ছে সে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু, যাকে কেউ অন্যায়ভাবে অপবাদ দিচ্ছে।
– আপনাকে তো কতবার বলেছি ভাইয়াকে কোনো আকাম-কুকামে উৎসাহ দিবেন না। তবুও কানে ঢোকে না আপনার?
– ইশশ! আপনার ভাইয়া একদম ধোয়া তুলসীপাতা! দুধভাত খাওয়া নিষ্পাপ শিশু। আমিই আপনার ভাইয়াকে নষ্ট করে ফেলেছি!

– হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আপনার সঙ্গে থেকে থেকে আপনার আজাইরা প্যাচাল পাড়া শুনে আমার ভাইয়া এখন ফুল টাইম পাগল। সারাদিন কানের পাশে আপনার ইমন গীত শুনে শুনে আমারও বধির হওয়ার জোগাড়।
– কী বললেন? আমি প্যাচাল পাড়ি? ইমন এমন কাজ কখনোই করতে পারে না, বুঝলেন? উল্টো আপনার ভাইয়াই আমাকে শেষ করে দিচ্ছে! আমি ছিলাম ভালো ঘরের লক্ষ্মী ছেলে, এখন দিনে তিনবার আয়নায় নিজের চরিত্র শনাক্ত করতে হয় আমার !

– খবরদার! আমার ভাইয়াকে নিয়ে একটাও কথা বললে… আপনার জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো বুঝেছেন?
নীলিমার চোখে রীতিমতো আগুন। মুখে ঘোরতর হুমকি, গলায় রাজকুমারীর মতো তেজ।
– ওহ্? দেখি ছিঁড়ে দেখান! আপনার হাতে কতটুকু জোর, আমিও দেখি একবার।
ইমন খিলখিল হেসে কথাটা বললেও, ভেতরে চাপা একটা ভীতি । এক ধাপে এগিয়ে এলো, একটুখানি খেলাও হয়ে যাবে সাথে। কিন্তু তার আগেই সাইফ আচমকা তার কান চেপে ধরলো। একটানে তাকে নীলিমার থেকে আলাদা করে এনে হুঙ্কার ছাড়লো,

– আমি থাকতে আমার বোনের এতো কষ্ট করতে হবে কেনো? আমি ছিঁড়ে দিচ্ছি, আয় এক্ষুণি!
– ভাই ছাড়েন। আপনি সবসময় এমন করেন! কোনো একদিকে লাগলে, চুলও ছিঁড়েন, কানও মুচড়ান।
– টেনে ছিঁড়ে দে একেবারে ভাইয়া! ওনার জিহ্বা একটু বেশিই বড় হয়ে গেছে। যত্তসব!
ইমন হাতজোড় করে বলে উঠলো,
– আমি নিরপরাধ! আমার জিহ্বা শুধু আবেগে দীর্ঘ হয় ভাই। এটা হৃদয়জাত সমস্যা, চিকিৎসার দায় আপনাদের না! ছাইড়া দেন।
নীলিমা আড়ালে ঠোঁট টিপে হেসে উঠলো। পরক্ষণেই ঠোঁট বাঁকিয়ে মুখ ফিরিয়ে ঘূর্ণায়মান পায়ে বেরিয়ে গেলো। নীলিমা সরে যেতেই সাইফ ধীরে ধীরে ইমনের কান ছেড়ে দিলো। পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,

– কাজ কতদূর?
কান এখনও রণভাগা সেনার মতো ঝুলছে ইমনের। তার মাঝেই ইমন কাঁপা গলায় বললো,
– সব রেডি ভাই। চলেন, কেবল যুদ্ধঘণ্টা বাজানো বাকি।
– বাইক বের কর… আমি আসতেছি।

সাইফের নির্দেশমতো বাইক আনতে বাইরে বেরিয়ে গেল ইমন। আর ঠিক তখনই ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সাইফ। এক অদ্ভুত স্থিরতা তার চোখে। আলো-ছায়ার ছায়াপটে দাঁড়িয়ে থাকা এক অন্তর্মুখী সৈনিক যেন।
চিরুনি তুলে আঙুলে জড়ালো; তারপর নিখুঁত অনিয়মে আচড়াতে লাগল ঘাড় ছুঁইছুঁই চুলগুলো । কিন্তু আচমকাই থেমে গেল সেই নৈপুণ্যের ছন্দ। স্বপ্নের সেই দৃশ্য হঠাৎ করেই মাথার ভেতর আলোর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জ্বলে উঠল। সেই আধো আলো, আধো ছায়ার দৃশ্যপট। নিকাবের আড়াল থেকে ঝলসে ওঠা চোখজোড়া। সেই খিলখিলিয়ে হাসির ধ্বনি। আর মাথায় আঙুল ডুবিয়ে চুল এলোমেলো করে দেওয়া ছায়াস্পর্শ।

তার বুক ধকধক করল প্রবল যন্ত্রণায়। চোখে ধোঁয়া ধোঁয়া এক স্নিগ্ধতা, আর আঙুলে এলোমেলো ঘূর্ণন। এক হাতে নিজের চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো সে। অন্য হাতে চিরুনিটা ছুঁড়ে দিল ড্রেসিং টেবিলের উপর। ঘরের নিস্তব্ধতায় সেই ধাতব শব্দটা অস্থির আত্মার আহাজারির মতো শোনা গেল। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ এক অপ্রকাশ্য হাসি ফেটে উঠল তার ঠোঁটে,
– তুই সত্যিই পাগল হয়ে গেছিস, সাইফ…
ভেতরের কণ্ঠস্বর মস্তিষ্ককে বিদ্ধ করলো কটাস করে।দু’হাত দিয়ে চুলগুলো পেছনে ঠেলে ব্যাক ব্রাশ করল নিপুণ দক্ষতায়। কোণার স্ট্যান্ড থেকে অফ-হোয়াইট চাদরটা টেনে নিয়ে একবারে গলায় পেঁচিয়ে নিল। পরনে আজ নির্লিপ্ত রঙের কালো একটা কুর্তা।
আয়নার সামনে নিজেকে শেষবারের মতো পরখ করল সাইফ। এরপর বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। পেছনে ফেলে গেল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক অবিচারিত প্রেমিকের প্রতিবিম্ব।

কাঁধে ঝুলে থাকা ব্যাগের ফিতেটা আঙুলে জড়িয়ে মেইন ফটক পার হয়ে কলেজের আঙিনায় পা রাখবে, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎই এক অদৃশ্য টান খপ করে থামিয়ে দিলো দৃষ্টিকে। কেউ একজন তার কব্জি আঁকড়ে ধরেছে দৃঢ়ভাবে। চমকে উঠে দৃষ্টি তাকালো সামনের দিকে।
– দৃষ্টি আপু, একটু সাহায্য করবেন প্লিজ?
স্বরে শীতল গুমোট। কণ্ঠটা একটা চাপা আতঙ্কের অন্তঃস্বর। দৃষ্টি তড়াক করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,

– কি হয়েছে তোমার?
– আপু, আমার ফ্রেন্ড খুব ব্যাথা পেয়েছে… একটু সাথে আসবেন?
– কোথায়? আমি তো কিছুই করতে পারবো না এখানে। কাউকে বলো, হাসপাতালে নিয়ে যাও।
মেয়েটির চোখ দুটো অস্থির। সে গলাটা আরো নিচু করে বলল,
– আপু, কেউ নেই আশেপাশে… কাউকে তো দেখতেই পাচ্ছি না যে সাহায্য করতে পারে। প্লিজ আপু…
আর কিছু বলার অবকাশ রইলো না। মেয়েটির চোখের জল নীরব আশঙ্কার সংবাদ হয়ে দৃষ্টির সামনে গড়িয়ে পড়লো।

– আচ্ছা, চলো। দেখিই কী হয়েছে।
কণ্ঠে অনিচ্ছুক জিজ্ঞাসা, তবুও পায়ে সাড়া দিয়েই এগিয়ে গেলো সে অজানা গন্তব্যের দিকে… মেয়েটার পেছনে পেছনে পা বাড়ালো দৃষ্টি। হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটা তাকে টেনে নিয়ে এলো কলেজের পেছন দিকে। একদম জনশূন্যতার কিনারে। উত্তেজনার ঘূর্ণিতে প্রথমে তেমন কিছু বুঝে উঠতে পারেনি দৃষ্টি।
চোখের অগোচরে তারা পৌঁছে গেলো এক জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত ভবনের সামনে। এখানে দিনের আলোও ঢোকে দ্বিধায়। পাশেই ঘন বাঁশবনের জটলা।প্রকৃতির ঘোমটা টেনে রাখা হয়েছে সেই নিঃসঙ্গ ভবনের চারপাশে। অন্য দিকে ধানক্ষেতের সবুজ সমুদ্র, যার মাথায় মাথায় নীরবতার ঢেউ খেলে যায়। এপথে মানুষের চলাচল তো দূর, কথার সোঁতা পর্যন্ত পৌঁছে না। এই নির্জন প্রান্তে এসে হঠাৎ করেই দৃষ্টির পা জমে গেলো মাটিতে। মুহূর্তেই স্তব্ধতা নেমে এলো। মেয়েটা ঘুরে তাকিয়ে গেল চমকে,

– আপু থেমে গেলে কেনো? চলো না!
– দাঁড়াও। কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে?
তার চোখ দুটো ক্ষীণভাবে অনুসন্ধান করছে মেয়েটার মুখ। থমথমে গলায় এবার মেয়েটা ফিসফিস করে বলে উঠলো,
– ওই তো আপু, এখানেই আছে আমার ফ্রেন্ড… আসুন না প্লিজ…
কণ্ঠের নিচু সুরে একটা অদ্ভুত টান। দৃষ্টি এক পা এগিয়ে আবার থেমে গেল। চারপাশে তাকিয়ে একটা অস্বস্তিকর শীতলতা টের পেলো সে। বাতাসেরও ভিন্ন ঘ্রাণ। এক মুহূর্ত থেমে থেকে, গলা শক্ত করে বললো দৃষ্টি,
– না, চলো বরং কলেজে ফিরে যাই। কোনো স্যারকে বলি। ওরা ঠিক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
মেয়েটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সোজা পিছু হাঁটা ধরতেই আচমকাই সামনে এসে পড়লো ইমন।

– ভাবি… শুনেন, কোথায় যাচ্ছেন?
ইমনের কথায় থমকে দাঁড়ালো দৃষ্টি। ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালো।
– আপনি এখানে কী করছেন?
– ভাই আপনাকে ডেকেছে চলুন।
এবার দৃষ্টি তার চাহনি ছুঁড়ে দিলো সেই মেয়েটার দিকে। দৃষ্টির চোখ মুহূর্তে ধারালো হয়ে উঠলো রক্তচক্ষুর মতো। মেয়েটা গলার কাছটায় ওড়না চেপে ধরলো। চোখ নামিয়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা, হাত কচলিয়ে আমতা আমতা করে কৃত্রিম ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। সব মিলিয়ে শরীরী ভাষায় ফাঁস হয়ে যাচ্ছে সব। দৃষ্টির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে না পেরে ইমন এবার নিজেই বলে উঠলো,

– ওকে কিছু বলার দরকার নেই, আমরা ওকেই বলেছি আপনাকে এখানে আনতে।
মেয়েটা এবার আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। বিড়বিড় করে বললো,
– আমি তাহলে যাই… আমার কাজ তো শেষ…
বলেই মুহূর্তে শরীর ঘুরিয়ে দৌড় দিলো। ইমন আবারও পেছন থেকে কণ্ঠ ছুঁড়ে দিলো,
– আসেন ভাবি, ভাই যাইতে কইছে।
দৃষ্টি এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে কাঁধ ফেরালো। গলায় সাফ প্রত্যাখ্যানের শীতল সুর,
– আমি কোথাও যাবো না।
বলেই পা ঘুরিয়ে উল্টো দিকে হাঁটা ধরলো সে, চোখে বিরক্তি। ইমন লাফ দিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো, হাঁটু দুটোতে ব্যাকুলতার ভর।

– চলেন না ভাবি, আপনার জন্য একটা চমক আছে। প্লিজ… একটুখানি!
বলেই মুখটাকে বাচ্চাদের মত করে বানিয়ে ফেললো, চোখ দুটোতে দুষ্টুমির জলছবি। দৃষ্টি একবার চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। বিরক্তির শীতল রেখা গড়ালো চাহনিতে। তারপর একটা গা-জড়ানো দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পা বাড়াল সামনে, নীরব সম্মতির ভাষায়। ইমন তখন খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠলো,
– আহা! আমি তো জানতাম, ভাবি রাজি হবেনই!
ইমন দৃষ্টিকে টেনে আনলো বাঁশবাগানের ছায়াঘেরা প্রান্তে। সেখানে, এক বিশাল প্রকাণ্ড বটগাছের নিচে থেমে দাঁড়ালো সে। থামা মাত্রই দৃষ্টির চোখ বিস্ফোরিত হলো বিস্ময়ের তাপে। চক্ষু কপালের বাইরে উঠে আসার উপক্রম।
বটগাছের গুঁড়ির সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে সজলকে। তার মুখ কাপড় দিয়ে গোঁজা, শব্দ করার সামান্য সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। চোখে আতঙ্কের উন্মুক্ত আর্তি।
আর একটু দূরে মাটির ধুলোমাখা একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন সাইফ। পায়ের ওপর পা তুলে, ঠান্ডা চোখে গোটা দৃশ্য উপভোগ করছে। দৃষ্টি আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লো। চোখ সরাসরি ইমনের দিকে।

– এসব কী হচ্ছে এখানে?
ইমন চওড়া হাসি ছড়িয়ে বললো,
– সারপ্রাইজ!
তার দাঁতের সারি ক্রমেই প্রসারিত হলো। তিন সেকেন্ড। দৃষ্টির চোখ লাল। মুঠো শক্ত। চতুর্থ সেকেন্ডে একটা বজ্রের মতো আওয়াজ। তার হাত ছিটকে গিয়ে ইমনের গালে পড়লো সজোরে।
– উফফ ভাবি!
চড় খেতেই ব্যথার গুঞ্জনে দু’পা পিছিয়ে গেলো ইমন। গাল চেপে ধরেছে এক হাতে, চোখে মিশ্র অনুভূতির ঝলক।

– সবসময়ই খালি মারেন… আপনার কথার মর্যাদা রাখতেই তো এই আয়োজন করলাম!
কণ্ঠে অভিযোগ, কিন্তু তাতে ভয় ঢেকে রেখেছে বাকি সব। ইমনের গাল লাল, আর মুখে শিশুসুলভ হতোদ্যমতা। ইমন চড় খেতেই চেয়ারটায় বসে থাকা সাইফ একটু নড়েচড়ে বসল। গলা থেকে চাদরটা আলগে করে সরিয়ে নিলো ধীরে। কণ্ঠনালি বরাবর একটা গোপন ঢোক গিলে ফেললো নিরবে।যতই সে অন্যদের কাছে ভয়ংকর হয়ে উঠুক, দৃষ্টির সামনে পড়লেই তার সমস্ত অহংকার গলে গিয়ে কোমল হয়ে পড়ে। এককথায় দৃষ্টির সামনে এলেই সে বাঘ থেকে বিড়ালে রুপান্তর হয়।

দৃষ্টির চোখে জমে থাকা রক্তলাল চাহনি সোজা গিয়ে বিঁধলো এবার সাইফের দিকে। দৃষ্টি এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো, তারপর বিদ্যুতের মত তেড়ে এগিয়ে গেলো তার দিকে।
এই দৃশ্য দেখে সাইফ থমথম করে উঠলো। তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। বুকের ভেতর আচমকা হৃৎস্পন্দনের গতি দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এবার তার চোখেমুখে দম্ভের বদলে সুশাসিত শঙ্কা।
– ভাবি! ভাবি শুনেন!
সাইফের মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে আসছে বুঝেই দৃষ্টির সামনে আগেভাগে ঝাঁপিয়ে দাঁড়ালো ইমন। দুহাত নেড়ে থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা।

– আপনেই তো কইছিলেন, এই পোলারে মৌচাকের নিচে বাঁইধা রাইখা চাকে সরাসরি ডিল মারতে চান। সেই ব্যবস্থাই তো করলাম!
ইমনের কথার রেশ কাটতে না কাটতেই দৃষ্টির চোখ ঘুরে গেল সজলের দিকে। চোখে বিস্ময়ের তীক্ষ্ণ ঝলক। সজলের ঠিক মাথার উপর একটা আস্ত মৌচাক ঝুলছে। বাঁশবনের ছায়া থেকে ঝরে পড়া বিষমধুর শাস্তির মতো। মৌচাকটা এমন ভঙ্গুর ভরসায় ঝুলে আছে যেটাতে একটু ধাক্কা খেলেই অজস্র রণরাগিণী মৌমাছির দল ঝাঁপিয়ে পড়বে সজলের গায়ে।
দৃষ্টি থমকে গেল,বুকের ভেতর কেমন এক ধাতব ঠাণ্ডা ঢেউ খেলে গেল। এই চাকের কামড় একবার যদি নামে, তাহলে রেহাই নেই। সজলের গা থেকে সরাসরি কবরে নামার মতো অবস্থা হবে।

– কে বলেছে এত উপকার করতে হ্যাঁ?
কণ্ঠে বজ্রধ্বনির মতো হুংকার, দৃষ্টির গলা চেঁচিয়ে উঠলো ক্ষিপ্ত বিস্ময়ে। চারপাশের বাতাস মুহূর্তেই ভারি হয়ে উঠলো। শব্দের আঘাতে গাছের পাতার নড়াচড়াও থেমে গেল। ইমন চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর মাথার পেছনে হাত চুলকে এক প্রকার বোকা হাসি হেসে বলল,
– আপনে তো জানেনই ভাবি… আপনার ইচ্ছা ভাইয়ের কাছে আদেশের সমান। তাই আমরা একটু…
– মুখ খুলে দিন ওনার।
কঠিন নির্দেশ ছুঁড়ে দিলো দৃষ্টি, চোখে শীতল তর্জনি।ইমন আর দ্বিধা করলো না। সজলের কাছে গিয়ে কাপড়টা টেনে নামিয়ে দিলো তার মুখ থেকে। মুখ খুলতেই জমে থাকা কান্না আর আতঙ্ক একসাথে উথলে উঠলো সজলের কণ্ঠে।

– দৃষ্টি… দৃষ্টি প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও… আমি আর কোনোদিন এমন ভুল করবো না। প্লিজ তুমি ওদের বলো আমাকে ছেড়ে দিতে… আমি কথা দিচ্ছি, এমন কিছু আর কখনো… জীবনেও… আমার দ্বারা হবে না!
– একটা শর্তে আপনাকে ক্ষমা করতে রাজি আছি৷
– একটা না তুমি শ খানে শর্ত দাও আমি সব পূরণ করবো।
কথার সঙ্গে সঙ্গে সাইফের বাম মুষ্টি সজলের গালের মাংসের সঙ্গে প্রাণবন্ত ধাক্কা খেলো। চোয়াল দাতের বন্দোবস্তে বন্দী হলো সজলের। ঘুষি হাঁকিয়ে সজলের চোয়াল ক্ষীপ্ত হাতে চেপে ধরে সাইফ করুণ চিৎকার তুলল,
– তুমি করে সম্মোধন করার সাহস কে দিয়েছে? আপনি করে বল হারামজাদা।
কন্ঠস্থবির সজল কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠলো,

– আপনি, আপনি… প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দেন আপু।
সাইফ সজলের গাল ছেড়ে দিতেই দৃষ্টি বলে উঠলো,
– যতগুলো মেয়ের সাথে অসভ্যতা করেছেন সবার কাছ থেকে ক্ষমা চাইবেন। আর এরপর থেকে মেয়েদের থেকে একশো হাত দূরে থাকবেন।
এরপর ইমনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
– ইমন ভাই আপনি ওনার উপর নজর রাখবেন। যদি আবার এমন কিছু করে তখন শাস্তি দ্বিগুণ হবে।
ইমন দ্রুত মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে উঠলো,

– ঠিক আছে ভাবি।
– বলুন পারবেন?
দৃষ্টির কথায় সায় জানিয়ে সজল বলে উঠলো,
– হ্যাঁ হ্যাঁ খুব পারবো। এবারের মতো আমাকে ক্ষমা করে দেন।
– ইমন ভাই ছেড়ে দেন ওনাকে।
দৃষ্টির আদেশে ইমন সজলের শরীরের বদ্ধশৃঙ্খল ছিন্ন করল। মুক্তি পেয়ে সজল আর মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। অবিলম্বে পায়ে হেঁটে সেখান থেকে সরে গেল। সজলের প্রস্থানের সাথে সাথে সাইফ একটু এগিয়ে এলো দৃষ্টির নিকটে। সাইফকে দৃষ্টির কাছে আসতে দেখে ইমন ততক্ষণে দ্রুত পায়ে সরে গেলো সেখান থেকে। তাদের একান্ত সময়ের অবকাশ দিল।
সাইফ একবার এগোতেই দৃষ্টি এক পা পিছিয়ে গেল। চোখ তুলেও দেখল না তার দিকে। মাটির মায়াবী আবরণে নুয়ে আছে তার চাহনি।

– উপরে উপরে তো ঠিকই নিজেকে অনেক কঠিন দেখান ম্যাডাম, এ সামান্যটুকু শাস্তি দিতে পারলেন না কেন? এত কোমল হৃদয়ের কেন আপনি?
সাইফের শব্দগুলো দৃষ্টির কোনো কর্ণপাত পেল না; নিরবে তার অন্তরের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । তার নিজের মনেও আঁকড়ে ছিল শাস্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু মুখে কথা ফুটলেও, নিজ চোখের সামনে কারো প্রাণ যন্ত্রণায় অবিচল ছটফট করতে দেখবার সাহস তার ছিল না। তাই আর একবার ক্ষমার দরজা খুলে দিয়েছে সে শেষবারের মতো।
চুপিসারে দৃষ্টির নিস্তব্ধতায় সাইফের অস্থিরতা ঘনীভূত হলো। আরেকবার জোরে বললো,

– বাড়িতে আসবেন কবে?
– যাবো না কখনো।
বলেই মুখ ঘুরিয়ে হাটা ধরল দৃষ্টি। পেছন থেকে সাইফ আবারো বলে উঠলো,
– আর আমি যে আপনাকে ভালোবাসি, আমার জন্য কি একটুও মায়া হয় না? নীলিমাও আপনাকে খুব মিস করে তার সাথে গিয়ে কি একটা বার দেখা করা যায় না?
সাইফের কথা শুনে থমকে দাঁড়ালো দৃষ্টি। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সাইফের দিকে। চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো,

– নীলিমাকে আমিও খুব মিস করি আমারও ইচ্ছে হয় তার সাথে দেখা করার কিন্তু আপনার জন্য মায়া হয় না। আমি তুচ্ছ ভালোবাসার দামে নিজের আত্মসম্মান বিকোই না। এমন মেয়ে আমি নই যে কারো প্রহসনে নিজের সত্তা বিসর্জন দেয়। তাই নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করুন। অতি বাড় বাড়বেন না। আগবাড়িয়ে আমার জন্য কিছু করারও প্রয়োজন নেই।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১১

বলেই গড়গড় শব্দে পা ছাপিয়ে ধীরে ধীরে সরে গেল দৃষ্টি। দৃষ্টির যাওয়ার দিকে মন উড়ে যাওয়া চোখে তাকিয়ে থেকেই সাইফের মুখে আনমনে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠলো। তার ভালোবাসা কি আদৌ এতটা তুচ্ছ? নাতো! তার ভালোবাসা তো সমুদ্রের অতল গভীরতার চেয়েও বেশি গভীর, অক্ষুন্ন আর অবিচল। একদিন, অনিবার্যভাবেই, দৃষ্টি সেই গভীরতার স্পন্দন অনুভব করবে। আর সেদিন শীঘ্রই আসবে!

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৩