Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩১+৩২

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩১+৩২

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩১+৩২
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

পিচঢালা রাস্তায় ড্রাইভিং এ ব্যাস্ত অনিল। তবে মন তার অন্য কোথাও আটকে আছে। বারবার চোখে ভাসছে হীরার লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা। আজ দু’দিন হয়ে গেছে অথচ হীরা এখনো অনিলের সামনে আসতে পারে না। এলেও তার দিক না তাকিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করে কথা বলে। অনিলের ব্যাপারটা অসম্ভব মনে ধরেছে। ঐ ছোট্ট গোলগাল মুখটায় লজ্জাটা বেশ ভালোই মানায়। লজ্জায় রক্তিম হওয়া কপোল দ্বয় যেনো তার সৌন্দর্য আরও গভীর করে তোলে। তার তো ইচ্ছে হয় সর্বক্ষণ হীরাকে নিজের সামনে বসিয়ে ওর ঐ গোলাপের ন্যায় লাল হওয়া গাল দুটো মুগ্ধ নয়নে দেখতে। তবে হীরার জন্য তা আর পেরে উঠা হয়না- এসব ভাবতে ভাবতেই ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠলো তার। সহসা সামনে চোখ পড়তেই মাথায় ছোটখাটো বজ্রপাত পরলো তার। সাথে সাথেই গাড়ির ব্রেক কষল। সাথে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো একটা বাক্য,

“ ওহ শ্যিট! ”
তবে শেষ রক্ষে আর হলো না। অনিলের গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে একজন মহিলা মাটিতে চিৎ হয়ে পড়লেন। গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এলো অনিল। এসেই তার মায়ের বয়স্ক মহিলাটিকে ধরে তুলতে তুলতে ব্যাস্ত গলায় জিজ্ঞেশ করলো,
“ কোথায় লেগেছে আপনার? ”
মহিলাটির হাত, পা চেক করতে লাগলো অনিল। দেখলো পা টা সামান্য কেটে গেছে, হাতের অনেক জায়গায়ও ছিলে গেছে। ভাগ্যিস সে সঠিক সময়ে ব্রেক কষেছিল নয়তো আজ একটা অঘটন ঘটে যেতো। নিজের অসচেতনায় বেশ বিরক্তি লাগলো নিজের উপর। অনিলের ব্যাবহার দেখে মহিলাটি বেশ মুগ্ধ হলেন। তিনি শান্ত স্বরেই অনিলকে বললেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ ওমন কিছু অয়নাই বাবা, তুমি চিন্তা করন লাগতো না। ”
মহিলাটির কথাগুলো কেমন যেন একটা চেনা ঠেকলো অনিলের কাছে। পরপরই মস্তিষ্ক জানান দিলো আগে হীরাই এমনভাবে কথা বলতো। সেটা নিয়ে আর তেমন কিছু ঘাটলো না সে। ভাবলো গ্রামের লোক হয়তো তাই এমন ভাবে কথা বলছে। মহিলাটিকে নিয়ে নিজের গাড়িতে বসিয়ে দিলো সে। যদিও সে নিষেধ করেছিলো তবে অনিল তার কথা শুনে নি। সে গাড়িতে থাকা ফাস্টএইড বক্স টা নিয়ে মহিলাটির কাটা যায়গাগুলো স্বযত্নে তোলো দিয়ে মুছে সেখানে মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো। মহিলাটি শুধু অনিলকে অপলক দৃষ্টিতে দেখতে থাকলো। তারপর অনিলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো,

“ তোমার নাম কী গো বাবা? ”
“ অনিল এহসান। ”
ফাস্টএইড বক্স টা জায়গা মতো রাখতে রাখতেই অনিল উত্তর করলো। তারপর তার উদ্দেশ্যে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লো,
“ আপনি কোথায় যাবেন? আমি পৌঁছে দিয়ে আসি। ”
“ লাগবো না বাবা, আমার পোলায় আইয়া লইয়া যাইবো আমারে। আমি ওঁরে ফোন দিতাছি তুমি জাওগা। ”
অমায়িক হেসে বললেন তিনি। তাকে আর জোর করলো না অনিল। শুধু করুন স্বরে বললো,
“ আমাকে ক্ষমা করবেন আন্টি, আমি খেয়াল করতে পারি নি। ”
“ সমস্যা নাই। পরের বার মন দিয়া গাড়ি চালাইও। ”
কিছু একটা ভেবে আবারও বললো,

“ তুমি বিয়া করছো? ”
“ জ্বি। ”
“ তা বউয়ের ভাবনায়ই বুঝি ছিলা? ”
বিব্রত বোধ করলো অনিল। তার ঐ কিশোরী বউয়ের কথা ভাবতেই ভাবতেই এসব হলো। মহিলাটি অনিলের কাণ্ডে হাসলেন। বললেন,
“ নাম কী তোমার বউয়ের? ”
“ হা… ”
নামটা শেষ করতে পারল না অনিল। এর আগেই মহিলাটি ফোন হাতে নামতে নামতে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
“ আইজ আই বাবা, আমার ছেলে আইয়া পরছে। তুমারে কতো কথা জিগাইলাম কিছু মনে কইরো না।”
তার কথায় অনিল মুচকি হেসে বলল,

“ নাহ অন্টি কিছু মনে করিনি আমি। বরং আপনি কিছু মনে করবেন না, আজকের ঘটনার জন্য আমি খুবই দুঃখিত। ”
মহিলাটি আর কিছু বললেন না। কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে চলে গেলেন। তিনি যেতেই অনিল গাড়ি স্টার্ট করল উদ্দেশ্য হীরাদের স্কুল।

স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছে হীরা ও আনিকা। অপেক্ষা করতে করতে দুজনেই খুব বিরক্ত। কেউ মোবাইল ও নিয়ে আসেনি যে, অনিলকে কল করে জিজ্ঞেস করবে- “ সে নিতে আসবে কিনা আজকে? ”
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না হীরার। এইবার একটু সামনে হাঁটা ধরলো সে। আনিকা পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলল,
“ আরে আরে কোথায় যাচ্ছ হীরা! ভাইয়া এসে না দেখলে বকবে। ”
“ আপু দাঁড়িয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না। চলো একটু হেঁটে আসি সামনে থেকে। এক্ষনি চলে আসবো আবার। ”

“ আচ্ছা চলো। ”
একটু ভেবে আনিকাও পা মেলালো হীরার সাথে। তার এমনিতেই আজকে মনটা ভালো নেই। কেন যে ভালো নেই সে নিজেই জানে না। পুরো কলেজ টাইমই আজকে মন মরা হয়ে ছিলো সে। প্রতিদিন সাদিকের ক্লাসে কিছুনা কিছু নিয়ে লড়াই তো হয়ই সাথে হাসি ঠাট্টা ও হয়। আজকে সাদিক কলেজে আসেনি আর নাতো সে সাদিক কে জ্বালাতে পেরেছে। আর এটাই হয়তো তার মন খারাপের কারন। কিন্তু সে এটা মানতে নারাজ। ঐ উগান্ডা লোকের জন্য কেন তার মন খারাপ হতে যাবে! তার তো উল্টো আরও খুশি হওয়ার কথা। অথচ তার এই খবিশ মন টা উল্টো কাজ করছে। তার এই মনটাকে এই কনকনে শীতে ঠান্ডা পানিতে চুবিয়ে মারতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় একটা বাড়ির সামনে এসে সেখানে ফুলের বাগান দেখে থেমে গেলো হীরা। দেয়াল করা বাড়িটার দেয়াল ডিঙিয়ে ফুলগুলো বেরিয়ে আছে। গ্রামে হীরা যখনই কারো বাগানে ফুল দেখতো সেখান থেকে একটা হলেও ফুল নিয়ে নিতো। এবারেও সেটাই করলো সে। এগিয়ে গিয়ে পা উঁচিয়ে ফুলে টান দিলো সে। অন্যহাতে একটা ফুল ছিড়ে নিলো তবে ডালটা নরম হওয়ায় সেটা মটমট শব্দ করে ভেঙ্গে গেলো। শব্দ পেয়ে আনিকার ধ্যান ভাঙলো। হীরাকে ফুল ছিঁড়তে দেখে বিস্ময়ে কিছু বলতে নিবে তার আগেই বাড়ির করিডোর থেকে কেউ চেঁচিয়ে উঠলো,

“ এই মেয়ে, এই তুমি ফুল ছিঁড়লে কার থেকে অনুমতি নিয়ে। ”
হীরা আঁতকে উঠলো। অপরাধী মুখে কিছু বলতে নিবে এর মাঝেই মহিলাটি আবারও চিল্লিয়ে উঠলো,
“ মা- বাবা শিক্ষা দেয়নি- অন্যের জিনিস চুরি করতে শিখিয়েছে বুঝি? স্কুলে গিয়েও এসবই শিখে এসেছো! ”
তার এক একটা কথা কাঁটার মতো বিধলো হীরার ছোট্ট মনে। চোখের কার্নিশ বেয়ে ঘেঁষে পরলো অশ্রুকণারা। হাত থেকে ফুলটা পরে গেলো আপনা আপনিই। মুখ খুলে আর কিছু বলার সাহস পেলো না মেয়েটা। এইদিকে আনিকা হতভম্ভ হয়ে গেছে। সামান্য একটা ফুলের জন্য কেউ এতো কিছু বলবে সে ভাবতেই পাড়ে নি। হীরার চোখে পানি দেখে আর সহ্য হলো না তার। সেও মহিলাটির বিপরীতে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

“ আপনার মা- বাবা আপনাকে খুব ভালো শিক্ষা দিয়েছে বলেই তো আপনি একটা ফুলের জন্য মানুষের সাথে এমন আচরন করছেন। ”
“ চুরের মায়ের বড়ো গলা। শুধু ফুল নেয়নি গাছটাও ভেঙেছে এই বেয়াদব মেয়ে। আবার গলা উঁচিয়ে কথা বলা হচ্ছে! বড়ো দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় জানোনা? ”
“ ওহ তাইতো! আপনার ব্যাবহারে মুগ্ধ হয়ে আপনি যে বড়ো তা ভুলেই বসেছিলাম। মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। ”
বলেই হীরার হাত ধরে হনহন করে চলে গেলো আনিকা। আনিকার কথায় মহিলাটি থতমত খেয়ে গেলেন। রুমে যেতে যেতেই বিড়বিড়ালেন,
“ বেয়াদব মেয়ে কোথাকার। ”

“ এই হীরা তুমি এইভাবে কাঁদছ কেন? ঐসব থার্ডক্লাস মহিলার কথা গায়ে লাগানোর কোনো মানে হয়! কান্না অফ করো। ”
দু’হাতে হীরার চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বললো আনিকা। তবে হীরার চোখের পানিকে থামাতে সক্ষম হলো না সে। মেয়েটা অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে। সামান্য এই একটা কারণে তার বাবা-মাকে তোলে কেউ কথা বলতে পারে- জানলে কোনোদিনই ফুলগুলো ছুঁয়েও দেখতো না সে। এভাবেই মেয়েটা বেলা অবেলা মা-বাবাকে কষ্ট দেওয়ার অনুশুচনায় ভোগে, সবসময় মনে হয় সে বাবা-মায়ের ভালো মেয়ে হতে পারেনি। ইদানিং অনিলের যত্নে কিছুটা ভুলে গিয়েছিলো এই বিষয়টা। তবে এখন মহিলাটার কথাগুলো শুনে আবারও সেই ভাবনা মাথায় চড়ে উঠেছে। হীরাকে এভাবে অনবরত কাঁদতে দেখে আনিকা শান্ত স্বরে বললো,

“ সবসময় মানুষের কথায় কাঁদতে নেই। কিছু সময় তাদের জবাব দেওয়া প্রয়োজন। এতে নিজে কিছুটা বেয়াদব হলেও সমস্যা নেই। ”
“ আপু ঐ আন্টি একটা ফুলের জন্য এমন করবে জানলে আমি কখনোই ফুল ধরতাম না। ”
“ জানি আমি, তুমি এতকিছু ভেবে ধরো নি। এখন কান্না থামাও দেখো সবাই কীভাবে তাকিযে আছে তোমার দিকে। ”
আশেপাশে চোখ বুলালো হীরা। দেখলো রাস্তার অনেকেই তাদের দিক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সাথে সাথেই কান্না থামিয়ে নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো সে। সক্ষমও হলো।
কিছুক্ষনের মধ্যেই অনিল গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হলো। অনিল কে দেখে আনিকা ও হীরা গিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লো চুপচাপ। আনিকা এসেই ভাইয়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো,

“ ভাইয়া আজকে এতো দেরি হলো কেন? ”
“ রাস্তায় একটু সমস্যায় পড়েছিলাম। ”
ছোটো জবাব অনিলের। সে মিরোরে হীরাকে দেখছে- কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগলো মেয়েটাকে। চোখে, মুখ খানিকটা ফোলা। সে আনিকার উদ্দেশ্যে ঠান্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“ কিছু হয়েছে? ”
আনিকা কিছু বলতে নিবে তার আগেই তার হাত ধরে তাকে থামিয়ে দিলো হীরা। চোখ ইশারা করে বলল, “ না বলতে ”। ব্যাপারটা চোখ এড়ালো না অনিলের। সে কপাল কুঁচকে তাকিযে রইলো মিররে ভেসে উঠা হীরার প্রতিবিম্বের দিকে। হীরার নিষেধাজ্ঞায় মুখের কথাটুকু গিলে ফেললো আনিকা। মেকি হেসে উত্তর করল,
“ কিছু হয়নি ভাইয়া। ”
অনিলও আর কথা বাড়ালো না।

নিজের মায়ের হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ দেখে কপাল কুঁচকে গেলো সাদিকের। দৌঁড়ে মায়ের নিকট গেলো সে। বিচলিত কণ্ঠে বললো,
“ কী হয়েছে মা? তোমার হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ কেন? ”
“ আরে ওমন কিছুই হয় নাই। ঐ একটু গাড়ির সাথে ধাক্কা খাইছিলাম। ”
“ মানে! কে ধাক্কা দিয়েছে? তুমি জানালে না কেন আমায়? ”
“ আরে যে পোলায় ধাক্কা দিছিলো ঐ পোলায়ই ব্যান্ডেজ কইরা দিছে। পোলাডা খুব ভালো। ”
মায়ের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেললো সাদিক। তার মা দুনিয়ার কাউকে আজ পর্যন্ত খারাপ বলেছে কিনা সেটাই মনে করতে পারলো না সে। আর কথা না বাড়িয়ে মাকে নিয়ে হাঁটা ধরলো।

বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামালো অনিল। গাড়ি থামতেই নামতে ব্যাস্ত হলো হীরা ও আনিকা। গাড়ি থেকে নেমে মাত্র বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়াচ্ছিল হীরা। তখনই অনিল পিছন থেকে ডেকে উঠলো। থেমে গেলো মেয়েটা। পিছন ফিরে দেখলো অনিল গাড়ি থেকে বেরিয়ে তার নিকট আসছে। ঢোক গিললো সে- যাই হোক সে অনিলকে এই ব্যাপারে কিছু বলবে না। উনি জানতে পারলে পরে কী না কী করবে আল্লাহ মালুম! এর আগে তো স্যার কে পুরো চাকরি থেকেই বের করিয়ে দিয়েছিলো। আর এখানে তার নিজের ঐ দোষ সেই তো মানুষের গাছের ফুল ছিড়েছে। তার ভাবনার মাঝেই অনিল সম্মুখে এসে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“ কেঁদেছিলে কেন? ”
“ কখন? ”
মেজাজ গরম হলো অনিলের। সে কিছুটা রুষ্ট স্বরে আদেশ ছুড়লো,
“ যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দাও, রাগীও না আমায়। ”
হীরা যেনো আজ অনিলের রুষ্ট স্বর শুনেও দমলো না। সে উল্টো বললো,
“ আমার ভালো লাগছে না, আমি ঘরে যাবো। ”
বলেই সামনে ফিরে হাঁটা ধরলো। তবে এক পা ও এগোতে পারল না। এর আগেই অনিল তার কনুই চেপে ধরলো। নিজের রাগটা কে সংযত করে ভারী কণ্ঠে বললো,
“ কিসের জন্য কেঁদেছো বলবে তুমি? ”
হীরার এইবার রাগ লাগলো। সে অনিলের থেকে নিজের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে তেজি কণ্ঠে বললো,
“ আপনার জন্য কেঁদেছি, শুনেছেন এইবার। ঐদিন আমি মরে গেলেই সব কিছু সমাধান হয়ে যেতো। আপনি কেন বাঁচালেন আমায়? ”

বলতে বলতেই চোখ থেকে দু’ফোঁটা জলবিন্দু গড়িয়ে পরলো গাল বেয়ে। আর দাঁড়ালো না সে দৌঁড়ে চলে গেলো বাড়ির ভিতর। অনিল তব্দা খেয়ে গেলো একদম। এর আগে কখনো হীরা এমন আচরন করে নি তার সাথে। আচরন যেমন তেমন হীরার শেষের কথাটা শুনে সে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে। নিশ্চই কেউ খারাপ কিছু বলেছে যার জন্য এমন কথা বললো মেয়েটা। অনিল ফোন বের করে অনিকাকে কল করে নিচে আসতে বললো। ভাইয়ের বলতে দেরি আনিকার নিচে আসতে দেরি নেই। আনিকা আসতেই অনিল গম্ভীর স্বরে বললো,

“ কী হয়েছে তাড়াতাড়ি বল। নয়তো আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না বলে দিলাম। ”
ভাইয়ের এমন ঠাণ্ডা কণ্ঠের সতর্ক বার্তায় শুষ্ক ঢোক গিললো আনিকা। পরপর ভয়ে প্রথম থেকে শেষ অব্দি সব ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে অনিল দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বললো,
“ তুই কোথায় ছিলি? নিষেধ করলি না কেন ওঁকে? ”
মাথা নিচু করে ফেললো আনিকা।
“ আচ্ছা ঘরে যা। ”
বলেই পিছন ফিরে হাঁটা ধরলো অনিল। গাড়ি নিলো না সাথে করে। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় এসে অনেক গুলো ছেলেকে সাথে নিয়ে তার গন্তব্যে রওনা হলো। ছেলেগুলো অনিলকে আগে থেকেই চেনে তাই অনিলের এক ডাকেই তার সাথে চলতে লাগলো।

বিকেল বেলা,
নাজিয়া বেগম মাত্র বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। তখনই অনিল ও তার পিছনে অনেকগুলো ছেলকে গাছ হাতে বাড়িতে ঢুকতে দেখে বিস্ময়ে হা হয়ে গেলেন তিনি। বললেন,
“ কিরে অনিল এতগুলো গাছ দিয়ে কী করবি তুই! ”
অনিল উত্তর দেওয়ার আগেই আনিকা এসে হাজির। অনিল বাড়ির সামনে এসেই আনিকাকে মেসেজ করে জানিয়েছিল। সে এসে তার মায়ের কাছে সব ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে নাজিয়া বেগম বেশ চটে গেলেন। বললেন,

“ কোন বাড়ির ঐ মহিলাটা? ঐ মহিলারে আমি একশ ফুল গাছ মুখে ছুড়ে আসবো। শুধু বল আমায়। ”
“ আচ্ছা পরে ওসব করো। এখন চলো আমরা সবাই মিলে গাছ লাগাই, আমাদের ভাবীর মন ভালো করতে হবে আগে। ”
বলেই মায়ের হাত ধরে অনিলদের কাছে গেলো। তারপর সবাই মিলে গাছ লাগাতে ব্যাস্ত হলো। যদিও অনিল তার মাকে নিষেধ করেছে তবে তিনি শুনেন নি। অনিলদের দু’তলা বাড়ির চারপাশে দেয়াল করা। বাড়িতে ঢুকার ঢালাই করা সরু একটা রাস্তা আর তার দু’পাশে ফাঁকা জায়গা। ফাঁকা জায়গার একপাশে ছেলেগুলো অপর পাশে অনিলরা সবাই গাছ লাগাচ্ছে। গাছ লাগাতে লাগাতে বেশ বেলা গড়িয়ে গেলো। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢেলে পরছে। কাজ শেষ হতেই অনিল আনিকাকে ইশারা করে বললো হীরাকে নিয়ে আসতে।

বই হাতে টেবিলে বসে পড়ছে হীরা। পড়ছে বললে ভূল হবে পড়ার থেকে বেশি দুপুরে মহিলার কথাগুলোই স্মৃতিচারণ করছে সে। এখনো মাথা থেকে কথাগুলো বের করতে পারছে না। এটা তার ছোটো বেলারই স্বভাব- কেউ কিছু বললে সেটা নিয়েই সারাদিন ভাববে আর কাঁদবে। তার নিজেরই ব্যাপারটা বেশ বিরক্ত লাগে তবে মানুষ অভ্যাসের দাস, এতে তার কিছু করার নেই। সে চাইলেও নিজের অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারে না। সহসা দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করলো আনিকা। এসেই চিল্লিয়ে বলে উঠলো,

“ আরে হীরা তুমি এখানে? বাইরে দেখে যাও কী হয়েছে! ”
আনিকার গলায় ভরকে গেলো মেয়েটা। চোখ বড়ো বড়ো করে বললো,
“ কী হয়েছে আপু? ”
“ আরে তুমি এসো না। ”
বলেই হীরার হাত ধরে তাকে টেবিল থেকে উঠিয়ে দৌঁড় লাগালো। হীরা তাল সামলাতে পারছে না, অনেক কষ্ট করে নিজেকে পরে যাওয়া থেকে বাঁচাচ্ছে সে। মুহূর্তেই নিচে পৌঁছে গেলো তারা। দরজার সামনে যাওয়ার আগে আনিকা হাত দিয়ে হীরার চোখ ধরে ফেললো। ছটফটিয়ে উঠলো হীরা। তড়িঘড়ি করে আনিকার হাত সরানোর চেষ্টা করে বললো,

“ আরে, আরে কী করছো আপু! তুমি চোখ ধরলে আমি দেখবো কীভাবে? ”
উত্তর করলো না আনিকা। বাইরে এসে নিজেই হাত সরিয়ে নিলো। পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালো হীরা। তবে সামনের দৃশ্য চোখে পড়তেই আর পলক ফেলতে পারল না সে। চারিদিকে শুধু ফুল গাছই দেখতে পাচ্ছে সে। এতো রকমের ফুল আগে দেখেছে বলে মনে হচ্ছে না তার। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো তার। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো ফুল গাছ গুলোর দিকে। হাত দিয়ে ছুঁতে লাগলো এক একটা জানা অজানা ফুল। প্রথম ফুলটা ছুঁয়েই আনিকার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো,

“ এতো ফুল গাছ কে আনলো আপু? আর কখনোই বা লাগালো? ”
উত্তরে গেটের দিক আঙুল তাক করলো আনিকা। ছেলেগুলোর প্রত্যেক কে সন্তুষ্ট জনক টাকা হাতে ধরিয়ে তাদের বিদায় দিয়ে গেট লাগিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করছে অনিল। আনিকার ইশারা অনুসরণ করে সেদিক তাকালো হীরা। সে অবশ্য জানতো এই কাজ কার হতে পারে তবুও ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস করা। সে অপলক দৃষ্টিতে অনিলের পানে তাকিয়ে রইলো। ভাইয়াকে আসতে দেখে আনিকা আর থাকলো না সেখানে।

“ এভাবে কী দেখছো? ”
সহসা অনিলের কণ্ঠে সম্বিৎ ফিরল হীরার। তৎক্ষনাৎ চোখ নামিয়ে নিলো। কিছুক্ষন পর আবারও মাথা তুলে অনিলের দিক তাকিয়ে আবদার করে উঠলো,
“ আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরি? ”
ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে অনিল বললো,
“ যদি বলি না? ”
“ কিশোরীদের মানা করতে নেই। আর আপনি মানা করলেও আমি ধরবো। ”

বলেই পা জোড়া উচুঁ করে অনিলের গলা জড়িয়ে ধরলো। হাসি গাঢ় হলো অনিলের। কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়া সেও আকড়ে ধরলো তার কিশোরীকে। কতক্ষণ এভাবে কাটলো জানা নেই। হীরার চোখের পানিতে অনিলের ঘাড় ভিজে গেছে। মেয়েটার চোখ দিয়ে না চাইতেও পানি বেরিয়ে আসছে। তবে তা দুঃখের নয় বরং অত্যাধিক সুখের। সে ওভাবেই অনিলের ঘাড়ে মুখ রেখে থেমে থেমে বললো,
“ দুপুরে আপনার সাথে করা ব্যাবহারের জন্য স্যরি। আর কখনো এমন ব্যাবহার করবো না আমি। ”
“ ইট’স ওকে, বউদের এইটুকু রাগ সহ্য করাই যায়। ”
অনিলের মুখে বউ ডাক শুনে প্রতিবারের মতো এবারও খানিক কাঁপল হীরার ভিতরটা। এর মাঝেই অনিল আবারও বললো,

“ তবে আর যদি কখনো বাইরের মানুষের কথায় কাঁদতে দেখি তাহলে… ”
চট করে ঘাড় থেকে মুখ তুলে অনিলের দিক তাকালো হীরা। বললো,
“ তাহলে…? ”
“ তাহলে তোমায় ইনজেকশন দিয়ে দিবো। ”
চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালো হীরা। অনিলের বুকে কিঞ্চিৎ ধাক্কা মেরে বললো,
“ ভন্ড ডাক্তার সাহেব। ”
হেসে ফেললো অনিল। প্রতিত্তুরে বললো
“ ভীতু রুগী সাহেবা। ”
“ জানেন আপনাকে হাসলে কী যে সুন্দর লাগে। একদম সুহাসানা। ”
কপাল কুঁচকে গেলো অনিলের। বললো,
“ তুমি কী আমার লিঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করছো? ”

খিলখিল করে হেসে উঠলো হীরা। অনিলের কুঞ্চিত কপাল মসৃণ হয়ে গেলো মুহূর্তেই। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার গলা জড়িয়ে আকাশের পানে চেয়ে হাসতে থাকা হীরার পানে। হাসির চোটে পুরো শরীর ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে মেয়েটার। অনিল শুষ্ক ঢোক গিললো। কিয়ৎক্ষণ বাদে হীরা অনিলের দিক তাকালো। হাসি এখনো থামে নি তার। হাসতে হাসতেই বললো,
“ মেয়েদের হাসি সুন্দর হলে তাকে বলে সুহাসিনী। আপনি ছেলে দেখেই তো সুহাসানা বললাম। এতে লিঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা কোথায় দেখলেন আপনি? ”

“ এই অদ্ভূত নামে ডেকে আমায় দ্বিধায় ফেলার প্রয়োজন নেই। এতোদিন যেই নামে ডাকতে ওইগুলোই ঠিক আছে। ”
“ আচ্ছা ডাক্তার সাহেব। এইবার আমায় নামিয়ে দিন। ”
“ ওকে রুগী সাহেবা। ”
বলেই উচুঁ করে ধরে রাখা হীরাকে নামিয়ে দিলো সে। নেমেই হীরা ছুট লাগালো ফুল গাছের কাছে। এক এক করে সবগুলো সারির ফুল গুলো খুঁটে খুঁটে দেখতে লাগলো। আর অনিল খুঁটে খুঁটে দেখতে লাগলো তার কিশোরীকে। হীরার চোখে, মুখে খুশি উপচে পড়ছে। ফুল হাতা যুক্ত জর্জেটের লং ফ্রক পড়ে আছে হীরা। সূর্যের আবছা লাল আলোয় হাজারো ফুলের মাঝে গাঢ় সবুজ রঙের ফ্রক পরিহিত কিশোরীটিকেই যেনো একটা জীবন্ত ফুল মনে হচ্ছে অনিলের কাছে। বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত গুঁজে হীরার সব কান্ড কারখানা অপলক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো অনিল। সহসা সেও একটা ফুলের সারির মধ্য দিয়ে হীরার উল্টো হয়ে হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতেই মাথার চুলগুলো খানিকটা এলোমেলো করতে করতে গেয়ে উঠলো,

“ বেসামাল, হয়েছি আজ বেসালাম
তুই তাকালি এমন করে…
ও হো হো এ কদিন
হয়েছে দেখা তোর আমার
দিলি মন টাকে কেমন করে….
তোকে জানাতে জানাতে চাই,
আমি বেঁচেছি ভালোবাসায়
মনের কোণে আপন মনে
ঠিকানা বানাতে চাই…. ”
এর মাঝেই হীরা অনিলের দিক একবার তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই একটা মুচকি হাসি উপহার দিলো। তার হাসি দেখে অনিল বুকে হাত দিয়ে আবারও পরের লাইনটা ধরলো,

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৯+৩০

“ আওয়ারা, আওয়ারা দিল
আওয়ারা রে….
আওয়ারা, আওয়ারা দিল
আওয়ারা রে….”

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৩+৩৪