অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৭+৩৮
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
এই সুবিশাল অন্তরীক্ষে লক্ষাধিক
রঙ বেরঙের পাখির মেলা…..!
অথচ এই অনিল এহসানের দৃষ্টি তার
অবুঝপাখির অবুঝপনামী তেই নিবদ্ধ
থাকে বেলা অবেলা….!”
অনিলের বলা এই হৃদয়স্পর্শী লাইনগুলোর গভীরতা বুঝলো কী হীরা? পেরেছে হয়তো। কান্না থেমে গেছে মেয়েটার। মাথা উঁচু করে পিটপিট করে তাকালো অনিলের মুখপানে। তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো অনিল। সে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে নিতে উদ্যত হলো হীরা। তবে বাধ সাধলো অনিল। হীরার থুতনি ধরে জিজ্ঞেশ করলো,
“ বুঝেছো কিছু? ”
উত্তরে উপর নিচ মাথা নাড়ালো হীরা। যার অর্থ সে বুঝেছে।
“ কী বুঝলে? ”
“ আপনার দৃষ্টি অন্য কারো মাঝে নেই। ”
কিঞ্চিৎ হাসলো অনিল। তারপর তার বুক সমান হীরার কোমড়ে চাপ প্রয়োগ করে উপরে তোলে নিজের মুখ বরাবর তার মুখখানা আনলো। গম্ভীর স্বরে বললো,
“ তোমার কেন মনে হলো আমি আনাদিয়া কে পছন্দ করি? ”
“ আপনি ঐ আপুর সাথে কী সুন্দর করে কথা বলছিলেন আবার আপুর অনেকটা কাছে ও গিয়েছিলেন। তাই আমার মনে হয়েছিলো আপনি ওনাকে পছন্দ করেন। ”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
প্রথমের কথাগুলো কিছুটা রাগী স্বরে বললেও শেষের কথাটা অপরাধী মুখে বলে থামলো সে। অনিল মনোযোগী শ্রোতা হয়ে তার কথাগুলো শুনলো। নিজেদের মাঝের সম্পূর্ণ দূরত্ব গজিয়ে নিজের পুরুষালী মুখমন্ডল হীরার নিকট এগিয়ে কাঁপন ধরানো কণ্ঠে বললো,
“ তোমার যতটা কাছে আসি ততটা কাছে গিয়েছি? ”
অনিলের তপ্ত নিশ্বাস হীরার ছোট্ট নারী সত্ত্বা টাকে পুরো নাড়িয়ে দিচ্ছে। শরীর মৃদু কাঁপছে মেয়েটার। কাঁপা কাঁপা হাতে অনিলের ঘাড় জড়িয়ে তৎক্ষনাৎ নিষেধাজ্ঞা জানালো সে,
“ না..নাহ। ”
হীরার শরীরের কম্পন অনুভব করে তাকে ছেড়ে দিলো অনিল। বাসায় ফিরে শাওয়ার নেওয়া হয়নি তার। যার দরুণ শরীর টা কেমন যেন ম্যাচম্যাচ করছে তার। তাই আর কিছু বললো না সে। হীরাকে ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো।
গুটি গুটি পায়ে বিছানায় এসে বসলো হীরা। ভাবতে লাগলো নিজেকে নিয়ে। আজকে অনিলের সাথে ঐ মেয়েটাকে দেখার পর তার এতো খারাপ লাগছিলো কেন? কই রনির ক্ষেত্রে তো এসব কিছুই হতো না। আবার রনি সাধারণত একটা রোম্যান্টিক কথা বললেই তার কেমন যেনো অসহ্য অনুভূতি হতো। সে ভাবতো ভালোবাসলে এসব বলতে হয় নাকি! সে নিজেও কখনো বলতে পারে নি। যেটা নিয়ে রনি তার উপর অনেক বিরক্ত হতো। অথচ অনিলের বেলায় সবকিছুই যেনো উল্টো। অনিলের একটু নরম স্বরেও তার ভালোলাগা কাজ করে। অনিলের ছুঁয়ায় সে খুঁজে পায় এক মিষ্টিময় অনুভূতি। যা কাঁপিয়ে তোলে তার পুরো সত্ত্বাকে- তবুও এর ভিতরেই লুকিয়ে থাকে তার ভালোলাগা। এসব কেন হয়? তার মানে কী সে রনি কে ভালোবাসেনি? রনি কী তার কিশোরী মনের আবেগ ছিলো মাত্র? হয়তো।
ওয়াশরুমের দরজা খট করে খোলার শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়ল হীরার। শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসলো অনিল। হীরাকে পড়তে না বসে বিছানায় বসে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে গেলো তার। বড়ো বড়ো পা ফেলে এগোলো হীরার নিকট। হীরার সেদিকে ধ্যান নেই সে ড্যাবড্যাব করে অনিলের দিক তাকিয়ে আছে।
“ তোমার কী পড়ালেখা করার ইচ্ছে নেই? ”
ঘোরের মাঝেই নিজের মনের কথা মাথা দু’দিকে নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলো হীরা। রাগ হলো অনিলের। বললো,
“ ঠান্ডা পানিতে চুবা খাওয়ার ইচ্ছা আছে? ”
“ এই না না…. ”
চেঁচিয়ে উঠলো হীরা। পানিতে চুবানি খাওয়ার কথা শুনে তৎক্ষনাৎ সম্বিৎ ফিরেছে তার। বুঝতে পারল এতক্ষন কার সামনে কী বলেছে। সে তো ভুলেই বসেছিলো তার এই সুদর্শন ডাক্তার সাহেব ডাক্তারির পাশাপাশি মানুষকে পানিতে চুবাতেও বেশ পারদর্শী। হীরাকে এমন ভাবনায় মগ্ন হয়ে থাকতে দেখে এইবার তাকে কোলে তুলে ডিরেক্ট ওয়াশরুমের দিক হাঁটা দিলো অনিল। ভরকে গেলো মেয়েটা। সাথে সাথেই অনিলের ঘাড় জড়িয়ে ধরলো। নিজের আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে ভয়ার্ত কন্ঠে আকুতি মিনতি করতে লাগলো,
“ আল্লাহ গো, এই ডাক্তার সাহেব। এমন করবেন না প্লীজ। আমি আর জীবনেও পড়া ছাড়া আর কিছু করবো না। আজকের মতো ছেড়ে দিন।”
একটু ও নরম হলো না অনিল। সে নিজের মতো চললো। ওয়াশরুমের দরজার নিকট আসতেই হীরা আবারও অনিলের বুকে মুখ ঠেকিয়ে অসহায় স্বরে বলে উঠলো,
“ ডাক্তার সাহেব, আপনি না আমার বুঝদার স্বামী। এখন আরেকবার শাওয়ার নিলে আমার ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো। ”
এইবার থেমে গেলো অনিল। তাকালো বুকের মাঝে মিশে থাকা তার পাঁজরের অংশীদারিনীর পানে। তাকে স্থির হতে দেখে ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে তাকালো হীরা। নিজেকে অনিলের ঘন লোমশ যুক্ত নগ্ন বুকে আবিষ্কার করতেই ভয়ার্ত মুখটায় ভির জমালো লজ্জা নামক অনুভূতিরা। ঢোক গিলে হাঁসফাঁস করতে লাগলো সে। ধীরে ধীরে মাথা তোলে অনিলের মুখ পানে চাইবে তখনই অতর্কিত ভাবে অনিলের অধর যুগল ছুঁয়ে দিলো তার শুষ্ক অধর যুগল। সাথে সাথেই চোখ, মুখ খিচে বন্ধ করে নিলো সে। সেকেন্ডের মধ্যেই অনিল ছেড়ে দিলো তাকে। বরফ হয়ে থাকা হীরাকে মেঝেতে দাঁড় করিয়ে নাকে নাক ঘষে বললো,
“ এখন লক্ষ্মী বউয়ের মতো স্বামীর কথা অনুযায়ী পড়তে বসো। ”
বলেই হীরাকে ছেড়ে গায়ে কাপড় জড়াতে ব্যাস্ত হলো সে। সেদিক তাকালো না হীরা। নিজের অনুভূতির সাগরে ডুবে থাকা টালমাটাল শরীর টা নিয়ে এগিয়ে চললো পড়ার টেবিলে।
সামনে এক বান্ডিল খাতা ছড়িয়ে বিছানায় চিন্তামগ্ন অবস্থায় বসে আছে আনিকা। আজকে কলেজ থেকে আসার সময় সাদিক তাকে ডেকে নিয়ে এই খাতা গুলো ধরিয়ে দিয়েছে। আজকে সাদিকের এক একটা আচরন কেমন যেন অদ্ভুত লেগেছে তার কাছে। ক্লাসে এতো মেয়ে থাকতে তাকেই কেন খাতা দেখার দায়িত্ব টা দিতে হলো? ফাস্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট দের থেকে নাকি ক্লাস টেস্ট নিয়েছে ফিজিক্স প্রথম পত্রের। আর সেই খাতা গুলোই তাকে দিয়েছে। ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতেও পারে নি সে।এখন খাতা দেখতে গিয়ে একটা ম্যাথ তার নিজেরই সমস্যা হচ্ছে। সাদিক কে মেসেজে ও করতে পারছে না বেচারি। যেই কুকীর্তি ঘটিয়ে রেখেছে, এখন যদি সে তার নাম্বার থেকে সাদিক কে নক দেয় তাহলে সাদিক তো বুঝেই যাবে ঐ বাহাদুর নারী আর কেউ নয় তার চরমশত্রু আনিকা। নাহ, আনিকা না। সে তো আবার ঐ লোকের কাছে মিস. ইরাবতী নামে পরিচিত।
ভাবনার মাঝেই ফোন বেজে উঠলো তার। অলস ভঙ্গিতে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে ভেসে উঠা “ লঙ্কার বান্দর ( স্যার) ” নামটি দেখতেই বুকটা ধ্বক করে উঠলো তার। এই লোক তাকে কেন কল করছে! ইয়া আল্লাহ, উনি কী জেনে গেছেন যে, “রহস্যময়ী” আইডির মালকিন সে! মনের মাঝে জেগে উঠা হাজারো প্রশ্নের সাথেই কলটা রিসিভ করলো সে। স্বাভাবিক ভাবেই এপাশ থেকে সালাম দিলো। সালামের উত্তর দিয়ে সাদিক কোনোরূপ পরিচয় পর্ব ছাড়াই জিজ্ঞেশ করলো,
“ খাতা কতোটুকু দেখে শেষ করলেন মিস. ইরাবতী ওরফে রহস্যময়ী। ”
“ আপনি আমায় কী করে চিনলেন? ”
“ দুনিয়াতে আপনার মতো বাজে কণ্ঠের মালিকন এক জনই আছে তাই চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ”
চটে গেলো আনিকা। এই বদমাইশ লোক তাকে দিয়ে নিজের কাজ করাচ্ছে আবার তাকেই অপমান করছে! সে নিজের কণ্ঠের ঝাঁজ ফিরিয়ে এনে বললো,
“ দেখুন আপনি কিন্তু এখন আমার শিক্ষক নন, আমাকে অপমান করলে কিন্তু আমি ছেড়ে দেবো না। ”
“ আগে ধরুন মিস, তারপর ছাড়ার ব্যাপারটা আমিই দেখে নিবো। ”
স্তব্ধ হয়ে গেলো আনিকা। এই লোক এইভাবে কেন কথা বললো! শঙ্কায় জর্জরিত হয়ে কাঁপা কণ্ঠে বললো,
“ আপনি কী কোনোভাবে আমার সাথে ফ্লার্ট করছেন? ”
“ তা তো বলতে পারি না। আমি আবার এসব বিষয়ে খুব কাঁচা। ”
“ দেখুন আমি কিন্তু আপনার স্টুডেন্ট! ”
“ ওহ তাই নাকি! একটু আগে যে বললেন- এখন আমি আপনার শিক্ষক নই। তাহলে আপনি কীভাবে আমার স্টুডেন্ট হন? ”
নিজের কথার জালে নিজেই ফেঁসে গেলো বেচারি। এখন কী উত্তর করবে সে? আর কোনো কথা খুঁজে পেলো না সে। তবে হার মানার পাত্রী সে নয়। নিজের উড়নচণ্ডী রুপে ফিরে এসে বললো,
“ আচ্ছা আপনি মেয়েদের মতো এমন ঝগড়া করেন কেন? আল্লাহ মেয়েরাও বোধ হয় এতো কথা পেঁচায় না। ”
“ আমি মেয়েদের সাথে ঝগড়া করা তো দূর কথাই বলি না। তবে যার সাথে বলি তার মাঝে অবশ্যই স্পেশাল কিছু বিদ্যমান আছে। হয়তো আপনার ক্ষেত্রেও তাই। ”
কারেন্ট এ শক খাওয়ার মতো ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো আনিকার শরীর। সে আজ যতই নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে ততোই যেন সাদিক তাকে দমিয়ে দিচ্ছে। এমন কেন হচ্ছে তার সাথে! আর বুকের ভিতরে থাকা প্রাণপাখি টা যেনো আজ একটু বেশিই লাফাচ্ছে। নাহ, সে আর কথা বলতে পারবে না। এখন তার জন্য চুপ থাকাই শ্রেয়। কিয়ৎক্ষণ এভাবেই নিশ্চুপ রইলো দু’ ধারের দুটি মানব- মানবী। একজন নিজের কথার জালে ফাঁসিয়ে বাঁকা হেসে নীরবে অপর পাশের অভিব্যাক্তি বুঝতে চাইলো। তো আরেকজন নিজের অশান্ত মনকে শান্ত করার চেষ্টা চালাতে থাকলো। সহসা নীরবতা ভেঙে সাদিক ওপাশ থেকে বলে উঠলো,
“ তো খাতা কতোটুকু দেখে শেষ করলেন? ”
বাস্তবতায় ফিরে এলো আনিকা। বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে নিজের সমস্যার কথাটা বললো। সাদিক ও কোনো কথা না বাড়িয়ে কীভাবে ম্যাথ টা সলভ করতে হবে তা বুঝিয়ে দিয়ে তাদের কথার সমাপ্তি টানতে যাবে এর আগেই কী ভেবে যেনো আনিকা হঠাৎ বলে উঠলো,
“ স্যরি। ”
“ কেন? ”
সাথে সাথেই ওপাশ থেকে সাদিকের অবাক মিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে আসলো। কিছুটা বিব্রত বোধ করলো আনিকা। বললো,
“ আসলে ঐ দিন আমি বুঝতে পারি নি ঐ টা আপনি। তাই ওভাবে তুই/ তুকারি করেছিলাম। ”
“ আই নো। তার জন্যই তোমাকে কিছু বলিনি। ”
“ ওহ। ”
এখানেই সালাম দিয়ে কথা শেষ হলো দুজনের।
“তুই কী আসলেই আমাকে নিজের ফ্রেন্ড মনে করিস? ”
ক্লাসে বসে শঙ্কিত বদনে তাপসির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন টা ছুঁড়লো আনিকা। সে বেশ কদিন ধরে খেয়াল করছে তাপসি কেমন যেন হয়ে গেছে। আগের মতো কথা বলেনা, হাসেনা। এটা নিয়ে সে যতবারই জিজ্ঞেশ করেছে ততবারই তার একই উত্তর “ কিছুনা। ” আজকে আনিকার ভীষন রাগ হচ্ছে। আজ যদি এই মেয়ে তাকে না বলে তাহলে সে কখনো কথাই বলবে না আর ওঁর সাথে। তার জেদ দেখে তাপসি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“ দেখ আনিকা আমি বলছি তো তেমন কিছুই না। এমনিতেই আজকাল আমার ভালো লাগেনা তাই চুপচাপ থাকি। ”
বলেই সে আবারও চুপ হয়ে গেলো। আসলে সে আনিকা কে ঐ দিনের ঘটনা টা বলতে চাচ্ছে না। কারন তার নিজের কাছেই ব্যাপারটা কেমন যেন দৃষ্টিকটু লাগে। একদিনের অজানা, অচেনা একটা মানুষের ভয়েস শুনে কেউ নাকি তার প্রতি আটকে যায়- ব্যাপারটা হাস্যকর নয় কী! তাও সেটা অপর পাশের লোকটার একটা ডেয়ার ছিলো মাত্র। তাই সে এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চায় না। তার ভাবনার মাঝেই তার পাশ থেকে উঠে অন্য টেবিলে চলে যাচ্ছিলো আনিকা। তা দেখে সে তৎক্ষনাৎ আনিকাকে থামানোর উদ্দেশ্যে তার হাত চেপে ধরে বললো,
“ আরে আরে, কোথায় যাচ্ছিস? আজকে তো সাদিক স্যার এর ক্লাস সবার শেষে! ”
“ হাত ছাড়। আমার যেখানে ইচ্ছা আমি সেখানে গিয়ে বসবো। ”
আনিকার রাগটা ধরতে পারল তাপসি। সে বুঝেছে আজ এই মেয়েকে আসল ঘটনা না বলে তার রেহাই নেই। তাই আর বাড়াবাড়ি না করে বললো,
“ আচ্ছা বস, আমি সব বলছি। ”
এটারই অপেক্ষায় ছিলো আনিকা। বলার সাথে সাথেই জায়গায় বসে গেলো সে। বললো,
“ তাড়াতাড়ি বল। ”
টেবিলে মাথা ঠেকালো তাপসি। তারপর আস্তে আস্তে ঐ দিনের ঘটনার সব খুঁটি নাটি বলতে শুরু করলো আনিকাকে। আনিকাও একই ভঙ্গিতে মাথা ঠেকিয়ে মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনলো। শুনতে দেরি অথচ রাগ মাথায় চড়তে দেরি নেই তার। কতো বড়ো সাহস ঐ লোকের! না জেনে, না শুনে একটা অচেনা মেয়ের কাছে এমন মধুর ভয়েস পাঠায়। খেলার ভিত্তিতে হোক বা যেভাবেই এমন একটা ভয়েস পাঠালে অপর পাশের মানুষটার উপর কেমন প্রভাব পড়বে- এটা তো ভাবার দরকার ছিলো তার। তাপসি পুরো ভয়েস টা একদম সূক্ষ্ম ভাবে বলেছে আনিকার কাছে। সেদিনের পর থেকে আজ অব্দি প্রতিদিনই ভয়েসটা একবার করে হলেও শুনেছে সে। যার দরুণ তা একেবারে মুখস্থ হয়ে গেছে তার। সেটা তাপসির বলার ধরন দেখেই বুঝতে পারলো আনিকা। সে রেগে বোম হয়ে বললো,
“ বাসায় গিয়ে ঐ বেডার নাম্বারটা পাঠাবি আমায়। আজকে ঐ লোকের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়বো আমি। ”
প্রবল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কিছু বলতে নিচ্ছিলো তাপসি তার আগেই আনিকা তর্জনী তোলে বললো,
“ আর তুই যদি বাঁধা দিতে আসিছ তো তোর একদিন কী আমার একদিন। ”
মুখটা ফুঁটো হওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেলো তাপসির। সে জানতো তার এই রগচটা বান্ধবী এরকম কিছুই করবে। ভাবনার মাঝেই ক্লাসে স্যার এর আগমন ঘটলো। আর কথা বাড়ালো না সে। আজকে কী হতে যাচ্ছে সেটা ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
হীরার হাত ধরে স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে জারা। আনিকার জন্য অপেক্ষা করছে তারা। অথচ আনিকার আসার কোনো নাম গন্ধ নেই। আজকে তারা ফুচকা খাওয়ার প্ল্যান করেছে। অনিল পৌঁছে দেওয়ার সময় বলেছিলো, আজকে আসতে একটু লেট হতে পারে। আর সেটারই সুযোগ নিবে তারা। কিন্তু এইদিকে আনিকা আবার আসতে লেট করছে। পরে না আবার অনিল ঐ এসে পরে।
ক্লাসের সবাই বের হয়ে গেছে আনিকা ও তাপসি সাদিকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। আনিকার দেখা খাতাগুলো চেক করছে সাদিক। কিছুক্ষনের মধ্যেই সবগুলো খাতা চেক করে সাদিক সূক্ষ্ম হেসে আনিকার উদ্দেশ্যে বললো,
“ থ্যাঙ্কস আ লট মিস. ইরাবতী। ”
প্রতিত্তুরে আনিকা সৌজন্য মূলক হাসি উপহার দিয়ে বললো,
“ ওয়েলকাম মি. সাদিক। ”
সাথে সাথেই দাঁত দিয়ে জিভ কেটে ভূল শোধরে বললো,
“ স্যরি, স্যরি স্যার। ”
কুঁচকানো ভ্রু দ্বয় শিথিল হলো সাদিকের। বললো,
“ ইট’স ওকে। ”
“ আজকাল আপনি কেমন যেন ভালো মানুষদের মতো বিহেভ করছেন স্যার। ”
“ এতদিন কী খারাপ মানুষদের মতো বিহেভ করতাম? ”
“ খারাপ মানুষ ও আপনার মতো এমন আচরন করতো না। শয়তান লোক, আমাকে পুরো ৪৫ মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। সেটা কী আপনার কাছে মানুষদের কাজ মনে হয়! ”
মনে মনে কথাটা বললেও উপরে মেকি হেসে উত্তর করলো,
“ নাহ, তাও এখন একটু বেশিই ভালো আচরন করেন। আচ্ছা আমি তাহলে যাই আজকে। ”
বলেই তাপসির হাত ধরে পিছন ঘুরে হাঁটা ধরলো সে। এর মাঝেই সাদিক পিছন থেকে ডেকে উঠলো,
“ শুনুন মিস. ইরাবতী। ”
ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিক তাকালো আনিকা। সে তাকাতেই তাকে অবাক করে দিয়ে সাদিক বলে উঠলো,
“ স্যরি, আপনাকে ঐদিন এতক্ষন দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য। আর হ্যাঁ আমি আর বেশিদিন থাকবো না এই কলেজে। তার জন্যই সবার সাথে একটু সুন্দর আচরন করার চেষ্টা করছি।”
কথাগুলো শুনতেই মাথায় ছোটখাটো একটা বজ্রপাত পরলো আনিকার। থাকবে না মানে! এলোই তো দু’ এক মাস হলো। সে অবাক হয়ে বললো,
“ থাকবেন না মানে! ”
“ থাকবো না মানে চলে যাবো অন্য কলেজে। ”
“ কেন এখানে কী সমস্যা? ”
তাকে এমন অধিকার দেখিয়ে কথা বলতে দেখে কনুই দিয়ে গুঁতো মারল তাপসি। এই মেয়ে কী পাগল হলো নাকি! এভাবে কেন কথা বলছে স্যার এর সাথে? আর স্যার গেলে তো ওঁর আরো খুশি হওয়ার কথা। তাহলে এমন রিয়েকশন দিচ্ছে কেন? তার ভাবনার মাঝেই সাদিক আনিকার উদ্দেশ্যে বললো,
“ এখন যাচ্ছি না আপনাদের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেই যাবো আশা করি। ”
“ ওহ, আচ্ছা। ”
আর কথা বাড়ালো না তারা। যে যার গন্তব্যে পা বাড়ালো। কলেজ থেকে বের হতে হতেই তাপসি সন্ধিহান কণ্ঠে আনিকার উদ্দেশ্যে বললো,
“ এই তুই তখন স্যার এর যাওয়ার কথা শুনে এমন রিয়েক্ট করলি কেন? ”
“ আরে এমনেই একটু বেশিই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম তাই আর কী। ”
উপরে উপরে এইগুলো বললেও ভিতরে সে নিজেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। আসলেই তো, সে এমন কেন করলো! আর সাদিকের যাওয়ার কথা শুনে তার বুকটা এমন ছ্যাৎ করে কেন উঠেছিলো! তার তো আরো খুশি হওয়ার কথা ছিল।
একটা গাছের নিচে বেঞ্চে বসে আছে হীরা, আনিকা, তাপসি ও জারা। সামনেই তাদের জন্য ফুচকা বানাচ্ছে একজন বৃদ্ধ লোক। লোকটির বানানোর মাঝেই বেশ কয়বার তাকে তাড়া দিলো তারা। প্রত্যেকের হাতেই সময় খুব কম। আনিকা ও হীরার হচ্ছে অনিলের এসে যাওয়ার ভয়। আর তাপসির হচ্ছে বাড়িতে যাওয়ার তাড়া। তাপসি দের বাড়ি যাওয়ার ঐ দিকটায় গাড়ি চলাচল নেই। সে জায়গাটা তাকে হেঁটেই যেতে হয়। আবার এমনেই আজকে লেট হয়ে গেছে যার জন্য মেয়েটা ফুচকা খেতেই আসতে চায়নি। তবে সবার অনুরুধে তাকে বাধ্য হয়েই আসতে হয়েছে।
অনিলের গাড়ি এসে গেইটের সামনে থামতেই যখন সে আশেপাশে তাকালো তখন কাঙ্ক্ষিত মুখগুলো দেখতে না পেয়ে কপালে ভাঁজ পড়ল তার। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো সে। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই বলেলেন ঐ দিক টায় যেতে দেখেছেন তিনি। তার কথা অনুযায়ী সেদিকে পা বাড়ালো অনিল। কিছুদূর যেতেই দৃষ্টিগোচর হলো ফুচকা হাতে বসে থাকা রমনীদের। মুহূর্তেই মাথায় রাগ চড়ে উঠলো তার। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বড়ো বড়ো পা ফেলে এগিয়ে গেলো সেদিকটায়।
ফুচকার মধ্যে টক পুরে মাত্র ফুচকাটা মুখে পুরতে নিচ্ছিলো আনিকা ও তাপসি তখনই নজরে এলো অগ্নিমূর্তি হয়ে তাদের দিক এগিয়ে আসা অনিলকে। সাথে সাথেই ফুচকা টা হাত থেকে পড়ে গেলো বেচারি দের। এইদিকে অনিলের উল্টো হয়ে বসা হীরা ও জারার নজরে পরলো না অনিলকে। তারা আনিকা ও তাপসিকে মূর্তিবনে যেতে দেখে দু’ জন দু’জনের তাকালো। তারপর আনিকা ও তাপসির উদ্দেশ্যে বললো,
“ এই আপু কী হয়েছে তোমাদের? ”
বলে তাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছনে তাকাতেই বিদ্যুৎ বেগে বসা থেকে উঠে গেলো হীরা। কোলে থাকা প্রিয় খাবার গুলোর স্থান হলো মাটিতে। সেদিকে খেয়াল নেই কারোরই। সবায় ই এখন তাদের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত। মুহূর্তেই তাদের নিকটে চলে আসলো অনিল। কণ্ঠে সকল গাম্ভীর্যের রেশ টেনে জিজ্ঞেশ করলো,
“ এখানে কী? ”
সকলেই মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে আছে। একেক জন একেক জনের দিক তাকিয়ে ঢোক গিললো। তারপর যখন অনিলের দিক তাকালো তখনই একটা অপ্রত্যাশিত কান্ড ঘটে গেলো। গাছের উপর থেকে একটা পাখি সহসাই নিজের ব্যাক্তিগত কাম সেরে দিলো। যা একদম অনিলের বুকে ভাঁজ করা হাতের মধ্যে গিয়ে অবস্থান লাভ করলো। বিষয়টা এত শীঘ্রই ঘটলো যে কারোরই বোধগম্য হলো না। তবে ঘটনা বুঝে আসতেই হো হো করে হেসে উঠলো হীরা। সবাই এতক্ষন অনিলের ভয়ে মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছিলো। হীরার হাসি দেখে এবার সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। হাসির মাঝেইা সবাই বারবার মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। আর আনিকা তো নিজেকে নিজে শাসাচ্ছে “ এই অটিস্টিক আনিকা, বইন থাম তুই। এটা হাসার টাইম নয়, দুঃখ প্রকাশ করার টাইম। একটু পরেই তোর ইন্নালিল্লাহ হতে যাচ্ছে। ”
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৫+৩৬
হাসি বাবা জ্বি কী আর তার কথা শুনে? অবশেষে নিজের হাসির কাছে হার মেনে আনিকা মনে মনে সান্ত্বনা দিতে লাগলো, “ থাক এখন হেসে নেই, পরে নাহয় সবাই মিলে একসাথে দুঃখ বিলাস করা যাবে। ”
আর এইদিকে সবাইকে এভাবে হাসতে দেখে রাগ তরতর করে বেড়ে গেলো অনিলের। তবে চারপাশে এতো মানুষ দেখে সে এখানে নিজের রাগ প্রকাশ করলো না। টিস্যু দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে গট গট করে হীরা ও আনিকা কে রেখেই গাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো।
