Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩১

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩১

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩১
নূরায়েশা মাহনূর

কাঠফাটা রৌদ্রের নির্দয় আঁচ ভেদ করে ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরছে নীলিমা। কলেজ ছুটির অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, তবু ইমনের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অবসন্ন পা আর টিকতে পারেনি। অবশেষে হাঁটার পথ বেছে নিয়েছে সে। কিছুদূর এগিয়ে এসে নদীর পাড়ে দাঁড়াতেই শরীরে নামলো প্রশান্তির ছায়া। বিরামহীন দহনকে শীতল করে দিলো নদী-বাহিত কোমল বাতাস। বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খানিকক্ষণ স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলো নীলিমা। হাওয়ার তীব্র ধাক্কায় পরনের বোরকা-হিজাব উন্মাতাল নৃত্যে লিপ্ত। বুকের মাঝে হাত গুঁজে আকাশের নীলিমায় চেয়ে আছে সে, অচিন্ত্য ভাবনার আবেশে।

– নীলু!
হঠাৎ উচ্চারিত আহ্বানে স্তব্ধ হয়ে গেলো তার পদক্ষেপ। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এলো অদৃশ্য শিহরণ। বহুদিনের অনুপস্থিতির পরও এই কণ্ঠস্বর তার কাছে অচেনা নয়। অস্থি-মজ্জায় আঁকড়ে থাকা পরিচিতি। পিছনে ফিরে দেখার আগেই আবার ভেসে এলো ডাক,
– কেমন আছিস, বোন?
কাঁপতে থাকা পায়ে ধীরে ঘুরে তাকাতেই দিশেহারা দৃষ্টিতে ছলাৎ করে উঠলো অন্তর। গলার গভীর থেকে ফিসফিসিয়ে বেরিয়ে এলো সুর,
– ভা…ভাইয়া!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

চোখের ধার বরাবরের চেয়ে ভারী, দুই ফোঁটা অশ্রু চেপে ধরে পড়ে গেল মুখদ্বয়ে। ভয়ে, ক্রোধে, অভিমানে মিলিত গলা গলনদীর মতো নীলিমার গলায় আটকে আছে। অমিতব্যয়ী নীরবতায় তাঁর ঠোঁটে সিল পড়ে গেছে। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সিয়াম। চুলে ঝলসে থাকা অগোছালো কোঁকড়, ফিকে পড়া জামা, দাড়ি-চুল মিশে এক খণ্ড অনাবশ্যিক কদর্য চেহারা; চোখের নিচে কাঁটা কালচে দাগ, লালচে অন্ধকারে জ্বলছে চোখ। নেশার রেখাচিত্র মুছে দিয়েছে তার কালের উজ্জ্বলতা। সে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। হাতে অপরূপ মমতা নিয়ে নীলিমার করুণ মাথার ওপর রাখলো একবারের জন্য।

– আমাকে ভুলে গেলি? তোর ভাইকে মনে নেই তোর?
নীলিমা ধীরগতিতে দুখানি পা পিছিয়ে দিল। মাথায় রাখা সিয়ামের হাত অস্থায়ীভাবে শূন্যতায় ঝুলে রইল; পরে সিয়াম সেও সাবধানে নামিয়ে নিল।
– জানি আমাকে অনেক ঘৃণা করিস। কিন্তু আমি তোকে অনেক মিস করি। শুধু তোকে…
নীলিমার মুখে কটূকম্পে এক ব্যঙ্গহাসি উঁকি দিল, কিন্তু নিকাবের আড়ালে তা বোঝা গেল না সম্পূর্ণভাবে। নিজেকে জড়িয়ে ধরে সে কণ্ঠটাকে কড়াভাবে স্থির করল।

– আমার জানামতে আমার কেবল একটাই ভাই… যে আমাকে অনেক ভালোবাসে। কোনো কিছুর কমতি রাখেনি সে। মায়ের পরে যে আমার একমাত্র অবলম্বন। বাকি আর কেউ নেই আমার।
– আমিও তোকে ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। কিন্তু তুই সব সময় আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিস। শুধুমাত্র তোর আরেকটা ভাইয়ের জন্য..কেনো? আমিও তো তোর ভাই, তাহলে এত ভেদাভেদ কি করে করতে পারিস তুই?
– ভাই??
নীলিমার ঠোঁটের কিনারা কুঁচকে এক চতুর হাসি ফোটালো। তারপর স্থির চাহনিতে তাকিয়ে কণ্ঠপাতটি নরমকঠোর করে বলল,

– কারণ তার মাঝে আর তোমার মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ। না তার মত তুমি কখনো হতে পারবে, আর না তার মত করে আমাকে ভালোবাসবে। তাই কান খুলে শুনে রাখো, আমি আবারো বলছি আমার শুধু একটাই ভাই..
কথার আগেই সিয়ামের আক্রোশ ফেটে পড়ল; একটা ঘোরে ভরা আঘাত নিশ্ছিহ্নে নীলিমার গালে এসে পড়ল। রাগে সিয়াম ফুঁসে উঠল; গলার রগগুলো টেনে উঠেছে, চোখে আগুনের শিলা ঝিকিমিকি করছে। নীলিমা কপাল কুণ্ঠিত রেখে একহাতে গালে চেপে দাঁড়িয়ে পড়লো। রক্তসিক্ত রঙ্গ ছড়ালো চোখের ভেতরকার মণির দু’পাশে। অশ্রু যেনো নিরন্তর স্রোতে নামছে; দাঁড়িয়েই কণ্ঠকে কঠোর করে বলল,

– কেনো এসেছো? আর কি কি সর্বনাশ করার বাকি আছে তোমার?
সিয়াম নিজের চুলের মুঠো শক্ত করে চেপে ধরলো। দ্রুত এসে উপস্থিত হলো নীলিমার সামনে।
– আমার ভুল হয়ে গেছে, বোন মাফ করে দে। আমি মারতে চাইনি তোকে সত্যি বলছি। আমিতো তোকে দেখতে এসেছিলাম শুধু।
বলেই নীলিমাকে ধরতে নিলে পিছিয়ে যায় নীলিমা।
– আমার ভাই যদি তোমাকে ধরতে পারে তাহলে জিন্দা কবর দিবে তোমাকে। তাই ভালোয় ভালোয় এখান থেকে চলে যাও।
কথা শেষ করেই ঝপাঝপ হাটা ধরলো। কি ভেবে আবার থেমে গেলো মাঝপথে। ঘুরে তাকিয়ে আবার বলে উঠলো,

– আমার কাছে তুমি কখনোই আলাদা ছিলে না। সমানভাবে তোমাকেও ভালোবেসেছি আমি। আর সেই ভালোবাসা থেকেই বলছি, আমি চাই তুমি বেঁচে থাকো। তাই এখান থেকে পালিয়ে যাও। বড় ভাইয়ার হাতে পড়লে তুমি কুকুরের মত মারা পড়বে….
এই কথা বলে সে চট করে ধপাধপ পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলো। কিছুদূর এগিয়ে হঠাৎ থেমে মাটির বুকের উপর ভেঙে পড়ল নীলিমা। অন্তরের গভীর থেকে আগুনের মতন দপদপ করছে বেদনার শিখা। পিছনে তাকিয়ে বিস্মৃত দৃষ্টিতে খুঁজল সিয়ামের ছায়া। নেই কোথাও, শুধু নিস্তব্ধ প্রান্তর। চোখের কোণে জমে থাকা জল আর নিয়ন্ত্রণ মানছে না। কত সুন্দর জীবন, তবুও কেন এমন বিধ্বস্ত পরিণতি! ক্ষুদ্র হৃদয়টি এই বেদনাভার আর বহন করতে পারছে না। দৃষ্টি ঘোলা হয়ে আসছে, শ্বাস ভারী।
ওই মুহূর্তে অপর প্রান্ত থেকে বাইক ছুটে এল; ইমন!নীলিমার কাছে এসে হঠাৎ থেমে দ্রুত নামল মাটিতে। ঝুঁকে বসে কাঁধ স্পর্শ করল সে,

– কী হয়েছে আপনার? এখানে এমনভাবে বসে আছেন কেন?
অশ্রুসিক্ত চোখে নীলিমা তাকাল ইমনের দিকে। বুকের ভেতর ঢেউ তুলল ইমনের আবেগ। বহুদিন এমন কান্নার দৃশ্য দেখেনি সে। নিকাবের উপর দিয়েই ইমন হাত রাখল গালে।
– শরীরটা খারাপ লাগছে নাকি? ডাক্তার দেখাব? কী হয়েছে?
আতঙ্কে কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল তার। কিন্তু নীলিমার চারপাশ এখনও ঘন কুয়াশার মতো ঝাপসা। বুকে জ্বলন্ত যন্ত্রণা, ঠোঁটের কোণে কোনো শব্দের জন্ম নেই। মাথা নত করে হঠাৎই হাহাকারে ভেঙে পড়ল সে।ইমন ভয় পেয়ে তড়িঘড়ি তাকে দাঁড় করাল। দু’হাতে কাঁধ শক্ত করে ধরে নাড়া দিল,

– বলুন, কী হয়েছে? কেন কাঁদছেন? কেউ কিছু বলেছে আপনাকে?
নীলিমার অশ্রুধারা তবু থামল না; কেবল বুকের গভীর থেকে কান্নার শব্দ ফেটে বেরিয়ে আসতে লাগল।
– তাকান আমার দিকে।
দু’গাল আঙুলে ধরে নীলিমার চোখের গভীরে তাকাল ইমন। কণ্ঠে মোলায়েম সুর, তবুও লুকোনো উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ছে প্রতিটি শব্দে।
– কী হয়েছে বলুন তো? কেউ কিছু বলেছে? ভয় পাবেন না, খুলে বলুন… শরীর খারাপ লাগছে নাকি? কোথাও ব্যথা পেয়েছেন?
কথার মাঝেই হঠাৎ নীলিমা ঝাঁপিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। ইমন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল, বুকের ভেতর কাঁপুনি খেল। নীলিমা তার বুকে মুখ গুঁজে হাহাকার ভাঙল,

– বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে ইমন ভাই… অসহ্য কষ্ট হচ্ছে আমার। কেন এমন হলো আমাদের জীবন? আমরা কি পারতাম না সবাই মিলে শান্ত, নিখুঁত একটা জীবন বেছে নিতে?
ইমন কোনো জবাব দিল না; কেবল নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে হাতের আঙুলে আলতো সান্ত্বনার রেখা এঁকে দিল নীলিমার বাহুতে। কিছুক্ষণ পর নীলিমা ধীরে ধীরে দূরে সরে এল।
– বাড়ি যাবো।
শব্দটা উচ্চারিত হতেই ইমন দ্রুত বাইকের সিটে উঠে বসল। নীলিমাও পেছনে গিয়ে বসে পড়ল। দূরের গাছের আড়াল থেকে সিয়াম সব দেখছিল। রাগে তার দেহ থরথর করে কাঁপছে। চোখের ভেতর জমে উঠেছে ঝড়ের অগ্নি।

সবেমাত্র খেতে বসেছে সাইফ ও দৃষ্টি। ইমন আর নীলিমার প্রতীক্ষায় অনেকটা সময় গলে গেছে ঘড়ির বুকে। সাইফ অবশ্য কলের ওপার থেকে নিশ্চিত হয়েছে যে তারা পথে আছে, তাই ক্ষুধার জ্বালায় শেষমেশ নিজেই ভাতের দিকে হাত বাড়িয়েছে। দৃষ্টি স্নিগ্ধ ভঙ্গিতে সাইফের দিকে প্লেট বাড়িয়ে দিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার দিক থেকে ভেসে এল পায়ের শব্দ। নীলিমা আর ইমন এসে দাঁড়িয়েছে।
সাইফ সঙ্গে সঙ্গে দু’জনকে ডাকল, কিন্তু নীলিমা কিছু শোনেনি; নিস্তরঙ্গ ভঙ্গিতে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। সাইফ আর দৃষ্টি অবাক চোখে তাকাল ইমনের দিকে। হাত ধুয়ে এসে ইমন বসতে বসতে বলল,
– রাস্তাতেই কাঁদছিল । বারবার জিজ্ঞেস করলাম, তবু একটা কথাও বলল না।
সাইফের দৃষ্টি সরে এল দৃষ্টির মুখের দিকে। দৃষ্টি মৃদু ইশারায় আশ্বস্ত করল তাকে, মুখে অনাবিল একটুখানি হাসির আভাস আনার চেষ্টা করল,
– আরে, হয়তো হঠাৎ শরীরটা খারাপ হয়ে গেছে, তাই কিছু বলেনি। আপনারা বসে খান, আমি ওর খাবারটা ঘরে পৌঁছে দিবো।
– আপনিও বসে পড়ুন।

উল্টোদিকে খাটের গা ঘেঁষে উপুড় হয়ে নিথর শুয়ে আছে নীলিমা। চাহনির তীর নিক্ষিপ্ত হয়েছে জানালার বাহিরে। দূর, বহুদূরের অস্পষ্টতায় হারিয়ে গেছে তার দৃষ্টি। অনুভূতির ভারহীনতায় শূন্য তার অন্তরভূমি, সবই ধাঁধার মতো দুর্বোধ্য। জীবন আসলেই কি রহস্যময় ধাঁধা? কে কখন কোন স্রোতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবে, তার পূর্বাভাস কোথায়! সবই কি নিয়তির হিংস্র খেলাঘর? নাকি মানুষের কর্মফলই বুনে দেয় এই অদৃশ্য জালের ফাঁদ? নিয়তির নির্মমতা কতটা ভয়ংকর হতে পারে তার নিখুঁত উপলব্ধি করতে পারছে না নীলিমা। দুনিয়ার গহনতা সম্পর্কে তার বোধ শিশিরকণার মতো ক্ষুদ্র, ক্ষণস্থায়ী। এই চারদেয়ালের সীমারেখার বাইরে পা বাড়িয়ে বিশ্বকে জানবার আকাঙ্ক্ষা কখনো জাগেনি তার মধ্যে। বরং আপনজনদের দুঃখসুখের উথালপাথালেই কেটে গেছে তার ক্ষুদ্র জীবন, ফুসরতই মিলেনি বাইরের বিশাল জগতের দিকে চোখ ফেরানোর।

– খেলি না কেনো এখনো?
দৃষ্টির কণ্ঠরেশ ধরা পড়তেই অচেতন দেহে হঠাৎ কাঁপুনি এলো। নীলিমা এক মুহূর্ত ধরে নীরব থেকে তবেই ধীরে ধীরে ঘুরে বসল।
– খেতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না।
হাতে ধরা খাবারের প্লেটটা আলতো করে পাশের টেবিলে সরিয়ে রেখে নীলিমার শিয়রে এসে বসল দৃষ্টি। চোখ মেলে তাকাতেই তার দৃষ্টি থমকে গেল। নীলিমার মুখখানি অনুজ্জ্বল, দুফোঁটা অশ্রুতে ফুলে থাকা চোখ জ্বলজ্বল করছে লালচে আভায়, নাকের আগাটাও পর্দাহীন যন্ত্রণায় রঙ পাল্টে নিয়েছে। চুল বেয়ে এখনো গড়িয়ে পড়ছে অল্প অল্প জলকণা। নিশ্চয়ই দীর্ঘক্ষণ অবিরাম স্নানের জলে ভিজেছিল সে। নীরবে উঠে গিয়ে একটা তোয়ালে নিয়ে এলো দৃষ্টি, ফিরে এসে আবার বসলো তার পাশে। স্নিগ্ধ হাত বাড়িয়ে অনুজ্জ্বল কেশগুলো মুছে দিতে শুরু করলো। নীলিমা কিছুই বলল না।

– আমাকেও বলবি না, কী হয়েছে?
একবার ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টির চোখে চোখ রাখল নীলিমা, কিন্তু ঠোঁটের কোণে কোনো শব্দ ফোটালো না। বলতে ইচ্ছে করছে, অথচ মুখ খোলার সাথে সাথে দৃষ্টি আহত হবে, এই ভয়েই থেমে গেল। তার আপনজন, তার ভাই যে এমন দুঃসহ অন্যায় চাপিয়েছে এই মেয়েটার জীবনে, সেই কলঙ্কের কোনো ক্ষমা নেই। কোন পক্ষ বেছে নেবে, নিজের রক্তের না ন্যায়বোধের? উত্তরহীন প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে চুপই রইলো নীলিমা। দৃষ্টি অনবরত অনুরোধ চাপিয়ে দিল না। বরং সে সময় দিলো তাকে। জানে, বলার মত হলে একসময় নীলিমা নিজেই খুলে বলবে।

– আচ্ছা, থাক… পরে বলবি। এখন একটু খেয়ে নে। ক্ষুধা থাকলে দুঃখ আরো গাঢ় হয়ে ওঠে জানিস তো?
– খাবো না আপু, নিয়ে যা তুই।
বলে শরীরটা আবার এলিয়ে দিল খাটে। দৃষ্টি দৃঢ় বাহু বাড়িয়ে তাকে টেনে তুলে বসালো। প্লেটটা হাতে নিয়ে খাবারের কণা এগিয়ে দিল তার ঠোঁটের কাছে।
– আর একটা কথাও শুনবো না।
নীলিমা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে অনড় থাকলেও, অবশেষে ভেঙে পড়লো দৃষ্টির একগুঁয়ে স্নেহে। কাঁপতে থাকা শরীর এগিয়ে মুখে খাবার তুলতেই দু’ফোঁটা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়লো গালের কোণে। দৃষ্টি অপর হাতে মুছে দিলো সেই লোনাজল, চোখের ইশারায় নিবারণ করলো কান্না। নীলিমা দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো দৃষ্টিকে, আর তার বুকে ঠেসে বসে বাকি খাবারটুকু ধীরে ধীরে শেষ করলো।

ঘরের ভেতর অস্থির পদচারণায় বারবার এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে দৃষ্টি। কিছুক্ষণ আগেই নীলিমার কক্ষে থেকে ফিরেছে সে। প্রবল জ্বরের তাপে কাঁপছিল মেয়েটা, তাকে ওষুধ খাইয়ে কষ্টেসৃষ্টে ঘুম পাড়িয়ে এসেছে দৃষ্টি। অথচ বুকের ভেতরের চাপ আরও বহুগুণে বেড়ে চলেছে। শরীর থরথর করে কেঁপে উঠছে তার। জ্বরের ঘোরে সিয়ামের নাম উচ্চারণ করে ফেলেছে নীলিমা। সেই সত্যে দৃষ্টির দেহের রক্ত অনিয়ন্ত্রিত রোষে জ্বলতে শুরু করেছে। কি করবে এই মুহূর্তে? কোন সিদ্ধান্ত নেবে কোনো কিছুই স্থির করতে পারছে না সে।
– কি হলো, এত অস্থির দেখাচ্ছে কেন আপনাকে?
হঠাৎই ঘরে ঢুকে পড়ল সাইফ। দৃষ্টির এলোমেলো অবস্থা দেখে তার ভেতরেও আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল। দৃষ্টি কোনো উত্তর দিল না, কেবল কাচুমাচু করে চারদিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করলো। জানে, সাইফ এখনই কিছু আঁচ করে ফেললে বাড়াবাড়ি অনিবার্য।

– কি হলো, বলুন!
দৃষ্টির কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করল সাইফ। গভীর শ্বাস টেনে অবশেষে দৃষ্টি বলল,
– নীলিমার অনেক জ্বর এসেছে। তাই অস্থির লাগছে।
– অবস্থা কি বেশি খারাপ? ডাক্তার ডাকব?
– ওষুধ দিয়ে এসেছি আমি। তবে রাতের বেলায় যদি বেড়ে যায়, সেই ভয়ে চিন্তা হচ্ছে।
– তাহলে কি করবো এখন?
ক্ষণিক নীরবতার পর দৃষ্টি স্থির কণ্ঠে বলল,
– আমি আজ রাতটা ওর সাথে থাকি। আপনি বরং একাই ঘুমান ।
– বউ!

কাতর স্বরে ডাক দিয়ে ফ্যাকাসে মুখে দৃষ্টির দিকে তাকালো সাইফ। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না দৃষ্টি, পরক্ষণে উপলব্ধি হতেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। তবে মুখে জড়ালো গাম্ভীর্যের আবরণ। প্রকাশ করলো না সাইফের সামনে। অবুঝের মত করে বলে উঠলো,
– কি হয়েছে? একা একা ওকে ঘুমাতে দেবো? এত জ্বরের মধ্যে? রাতে যদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন কি হবে?
– তাহলে আমি একা ঘুমাবো? আপনাকে ছাড়া ঘুম আসবে না আমার।
– আগে তো ঘুমাতেন!
– আগের কথা বাদ দিন, এখন তো আপনাকে জড়িয়ে ধরা ছাড়া ঘুম আসে না ।
– শুনুন…
দৃষ্টির কথার মাঝেই তাকে টেনে নিল সাইফ। খাটের কোণে বসে দৃষ্টিকে বসিয়ে নিলো হাঁটুর ওপর। দু’হাতে আঁকড়ে ধরে অনুনয় জানাল,

– প্লিজ, বউ…
দৃষ্টি গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিছুক্ষণ মাথা নুইয়ে নিস্তব্ধ রইল। সাইফও নীরব থেকে ধীরে বললো,
– আচ্ছা, একটা রাতই তো কষ্ট করে কাটিয়ে নেবো।
কণ্ঠে তার শিশিরভেজা ভঙ্গুরতা। তবুও বোনের জন্য এইটুকু করতেই পারে। কথাগুলো শেষ হতেই দৃষ্টি আড়ালে গোপন স্নেহে হেসে উঠল, দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল সাইফকে।

জানালার ধারে টেনে আনা চেয়ারে স্থির হয়ে বসে আছে দৃষ্টি। নিশুতি রাত অনেক গাঢ় হয়ে এসেছে। সময় এখন প্রায় দুইটার কাছাকাছি। বহুক্ষণ আগে সাইফকে কামরায় রেখে এসেছিল সে। এখন নিশ্চয়ই ছটফট করতে করতে অবশেষে অবসাদে ঢলে পড়েছে ঘুমে। দৃষ্টিও একবার ঘুমের আবেশে তলিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নীলিমার জ্বরে কাতর গুঞ্জরণ হঠাৎই ঘুম ভেঙে দিলো তার। তারপর থেকে আর কোনোভাবেই চোখের পাতায় নিদ্রা নামছে না। ছোট্ট একটি আলো জ্বালিয়ে জানালার ধারে বসেছে বই হাতে। অথচ পড়ার ছলে মন ভেসে যাচ্ছে অচেনা অন্ধকার ভাবনায়।
বইয়ের অক্ষর গলে গিয়ে চাহনি বারবার আটকে যাচ্ছে জানালার বাইরের আকাশে। আজ আকাশ স্বচ্ছ, তারা মিটিমিটি দীপ্তিতে টলমল করছে, অথচ কোথাও চাঁদের দেখা নেই। চারপাশে নিস্তব্ধ আলো-অন্ধকারের রাজত্ব। কিন্তু দৃষ্টির বুকজুড়ে অদৃশ্য দহন। সিয়ামের নাম উচ্চারণের পর থেকে ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত কাঁপন, শীতল খচখচানি থামছেই না। একদিকে নিজের ক্ষত, অন্যদিকে সাইফকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা কোনোটাই সহজ হচ্ছে না। তাই সব অচিন্ত্য অস্বস্তি ঠেকাতে বইয়ের পাতায় আশ্রয় নিয়েছিল সে। তবুও ব্যাকুলতা শেকড় গেঁথে বসে আছে চারপাশে, কোথাও মুক্তি নেই!

অস্থির হয়ে শেষমেশ উঠে দাঁড়াল দৃষ্টি। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে নিদ্রিত নীলিমার দিকে তাকালো। জ্বর অনেকটাই নেমেছে, শরীর শান্ত, গভীর নিস্তব্ধতায় তলিয়ে গেছে সে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল দৃষ্টি। এই সুযোগে সাইফের কক্ষের দিকে একবার যাওয়া যায়।
যেই চিন্তা, অমনি কাজ। পা টিপে টিপে ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো দৃষ্টি। দরজাটা টেনে বন্ধ করেই সোজা পা বাড়ালো তাদের কামরার দিকে। কিন্তু দোরগোড়ায় এসে থমকে দাঁড়াল সে। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ নয় আলগা করে ঠেসে রাখা, ফাঁক দিয়ে অচেনা অন্ধকার উঁকি দিচ্ছে। সাইফ কি দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে?
দৃষ্টি আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। টেবিলের ধারে এসে থামল। মোবাইলটা হাতে তুলে ফ্ল্যাশ জ্বালাতেই আলো সরাসরি গিয়ে পড়লো বিছানার দিকে। খাট শূন্য, কোনো চিহ্ন নেই সাইফের! বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইল দৃষ্টি। এই রাতদুপুরে সাইফ গেল কোথায়?

চমকে গিয়ে দ্রুত ফ্ল্যাশ নিভিয়ে দিলো সে। চারপাশে আবারো আধার গাঢ় হয়ে উঠলো। দ্রুত বেরিয়ে এলো। এই পুরোনো বাড়ির প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি কোণ তার চেনা। আঁধার অন্ধকারে হাঁটতেও তাই তেমন অসুবিধে হলো না। আর তাছাড়া দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকলে, চারপাশের অস্তিত্ব এমনিতেই ধরা দেয়।
হাঁটতে হাঁটতে ঘর পেরিয়ে উঠোন, করিডর, বারান্দা সব ঘুরে এলো দৃষ্টি। কিন্তু কোথাও সাইফ নেই। পুরো বাড়ি শুনশান শূন্য।বুকের ভেতর এক অচেনা সঙ্কেত দপদপ করে জ্বলছে। এই গভীর রাতে সে গেল কোথায়? একটা ফোন দিয়ে দেখবে কি?

বাগানের জংধরা লোহার দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে এলো সাইফ। হাতে গুটিকয়েক প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সব একসাথে কাপড়ে ভাজ করে ছোট্ট পোটলা বানানো। আস্তে করে সেই পোটলাটা মাটিতে নামিয়ে রেখে আবার উপরে উঠে এলো। দরজাটা সাবধানে আগের মতো ঠেসে লাগিয়ে দিলো, তারপর ঝোপঝাড়গুলো এমনভাবে ছড়িয়ে দিলো যে বুঝবার উপায় নেই, এখানে কোনো গুপ্তপথ লুকিয়ে আছে। জামাকাপড় ঝেড়ে নিয়ে টর্চটা হাতে তুলেই দাঁড়িয়ে গেলো সে। অন্ধকারে টর্চের আলো ঘুরিয়ে পিছনে ফেলতেই বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড হঠাৎ থেমে আসার মতো কেঁপে উঠলো।
চোখ গোল করে স্থির দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি। বুকে দু’হাত গুঁজে রাখা। চোখেমুখে এক বিন্দুও ভয় বা বিস্ময় নেই। বরং পাথরকঠিন চাহনি অচঞ্চল হয়ে আছে। ঠিক যেন কোনো অশরীরী, রক্তলোভী ছায়া। সাইফের বুক ধড়ফড় করে উঠলো। হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝনঝন শব্দে টর্চটা পড়ে গেল মাটিতে। নিসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে, শরীর জুড়ে অচল স্রোত বয়ে গেলো।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩০

দৃষ্টি আস্তে ঝুঁকে টর্চটা হাতে তুলে নিল। আলো ছুড়ে দিল সাইফের মুখে। মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে উঠলো তার ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল। রক্ত সরে গেছে শরীর থেকে, চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ ছড়িয়ে পড়েছে। টর্চের আলোয় পড়তেই সাইফ তাড়াহুড়ো করে হাতে ধরা কাপড়ের পোটলাটা পেছনে সরিয়ে নিলো। কিন্তু দৃষ্টির চোখে এড়ালো না সেই দৃশ্য । ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বাঁক খেলে গেলো তার। অদ্ভুত এক হাসি ভেসে উঠলো মুখে। এই পরিস্থিতিতেও সে হাসছে? আশ্চর্য!

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩২