তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৮
তাবাস্সুম খাতুন
‘তোকে আজকে এই তানভীর চৌধুরী নিশানের বউ লাগছে।”
বলে নিশান সিমিকে টেনে নিয়ে একদম নিচে চলে গেলো। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে, নিজের গাড়ির কাছে গেলো। সিমিকে ফ্রন্ট সিট্ এ বসিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিট্ এ বসলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। সিমি মাথা নিচু করে বসে আছে। নিশান গাড়ি চালাতে চালাতে নিজের ফোন অন। করে সময়টা দেখে নিলো। নয়টা বেজে পঁচিশ মিনিট। নিশান নিকোলোর বাড়ি উদ্দেশ্য রওনা দিলো। আধা ঘন্টা পরে নিশানের গাড়ি এসে থামলো একটা বড়ো বাড়ির সামনে। বাড়ির বড়ো গেট টাও বিভিন্ন রকমের ফুল গাছ দিয়ে সাজানো। নিশান বেড়তেই সিমি ও নামলো। নিশান সিমির হাত ধরে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। বিশাল বড়ো বাগান। বাগানের এক পাশে বড়ো স্টেজ চেয়ার টেবিল রাখা বিভিন্ন ধরনের মানুষ পোশাক সব স্টাইলিশ ছোট ছোট। বিদেশের মানুষ। সিমি শুধু মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখতে লাগলো। এর মধ্যে একটা লোক এসে নিশান কে জরিয়ে ধরলো। লোকটা বাংলা ভাষাতেই বললো,
“দোস্ত কতদিন পরে তোকে বুকে জড়ালাম। আনন্দ লাগছে খুব।”
নিশান ও সেইভাবে বললো,
“আমারো ভালো লাগলো।”
সিমি সামনে তাকিয়ে লোকটা কে দেখলো। লোকটা সাদা ধবধবে। চুলগুলো ঘাড় পর্যন্ত লম্বা লাল রঙের। গায়ে কোর্ট প্যান্ট ইতালিয়ান। তবুও কেমন জানি বাংলাদেশি বাংলাদেশি লাগছে তার কাছে। সিমির ভাবনার মধ্যে একটা মেয়ে এলো, একদম অপ্সরার মতো দেখতে। দুধে আলতা গায়ের রং, চোখ দুটি ডাগর ডাগর তাতে কালো কাজল ঢেলে দেওয়া যেন। ঠোঁট দুটি লাল টুকটুক করছে, নাকটা সরু। মুখের আকৃতি গোল। চুলগুলো খৈরি রঙের সিল্কি একদম। ছেড়ে দেওয়া আছে পরনে একটা কালো রঙের গ্রাউন। কানে বড়ো বড়ো দুইটা ইয়ার রিং। গলায় একটা সিম্পল নেকলেস।সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ। মেয়েটার হাত ধরে আবার আরো একটা ছোট মেয়ে আসছে সেও একদম বড়ো মেয়েটার কপিক্যাট। দুইজনের সাজ ও একদম একই রকম। বাচ্চা মেয়েটার বয়স সম্ভবত তিন কি চার হবে। মেয়ে দুটো এসে ছেলেটার পাশে দাঁড়ালো। ছেলেটা নিশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“আমার বউ কে আর বাচ্চাকে তো দেখিস নি। এই দেখ আমার বউ বাচ্চা।”
নিশান হ্যালো বললো। নিকোলোর বউ এলিনা ও হ্যালো বললো। এলিনার নজর সিমির দিকে গেলো। যে হা করে তাঁদের দেখছে। এলিনা হেসে নিশানকে সে নিজেও বাঙালী ভাষায় বললো,
“এই মেয়েটা কে?”
নিশান সিমির পরিচয় করিয়ে দিলো। সিমিও হাসি মুখে পরিচিত হলো। বাচ্চা মেয়েটার বয়স মাত্র তিন আর তার নাম এলিরা খুবই কিউট। সিমি কোলেও নিলো। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। বুকটা কেন জানি কষ্টে ফেঁটে যাচ্ছে। যাবেই তো ঐযে সে যে মা হারা!তার মরা বাচ্চাটাকেও একটু বুকে জরিয়ে কান্না করতে পারি নি। একটা মায়ের বুঝি এর থেকে কষ্টের কিছু আছে। সিমির চোখের কোনে পানি আসতেই দ্রুত মুছে নিয়ে। তাঁদের সাথে গল্পে মজে উঠলো। নিশান ও অনেকের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে সিমির কাছে আসলো।সিমির হাত ধরে এক পাশে নিয়ে গেলো। সেখানে আপাতত তেমন কেউ নেই। স্টাফ কে খাবার আনতে বললো। সিমিকে নিয়ে বসলো। সিমি গাল ফুলিয়ে বললো,
“আমার কত খিদে পেয়েছে আপনি জানেন?”
নিশান সিমির দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমি খাবার আনতে বলেছি।”
“যাক ভালো করেছেন। নয়তো আবারো আমাকে না খেয়ে অজ্ঞান হতে হতো।”
নিশান ধমক দিয়ে বললো,
“কানের নিচে থাপ্পড় দেবো দুইটা। বেয়াদব মেয়ে সবসময় মুখে বেয়াদপি কথা।”
সিমি মুখ ভাঙিয়ে বিড়বিড়ালো,
“তোর মাথা শালা বিদেশি কুত্তা।নিজে বিদেশি ছিলিস হচ্ছিলো না শান্তি। যার জন্য আমাকে এনে মরলি। এখন আমাকে কি বলবে? বিদেশি কুত্তি? ওয়াক থু।”
সিমিকে থুথু ফেলতে দেখে নিশান ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কি হলো? থুথু ফেলছিস কেন?”
সিমি মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললো,
“আরে না কিছু হয় নি। এমনি।”
নিশান আর কিছু বললো না। নিজের ফোন স্ক্রল করতে লাগলো। সিমি এইদিকে ঐদিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেলো নিকোলো আর তার বউ এলিনার উপরে।সিমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাঁদের দেখে হঠাৎ নিশানের উদেশ্য বললো,
“একটা প্রশ্ন করি আপনাকে?”
নিশান হুম বলতেই। সিমি বললো,
“আপনার বন্ধু নিকোলো আর তার বউ এলিনা।আপনার কি মনে হয়? ওরা পারফেক্ট ম্যাচ!”
নিশান ফোন থেকে চোখ উঁচিয়ে সিমির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“তোর কাছে কি মনে হয়?”
“আমার কাছে পারফেক্ট লাগছে না। আপনিই দেখেন এলিনা কত সুন্দর। ওর সাথে সুন্দর একটা হ্যান্ডসম ছেলে মানাবে। এইদিকে আপনার বন্ধু নিকোলো হ্যা সে ধলা বিলাই। তবুও কেমন কেমন জানি ভেদা বিড়াল ভালো না একদম।”
সিমির যুক্তি শুনে নিশান ঠান্ডা কণ্ঠে বললো,
“ওদের পারফেক্ট জুটি হোক কিংবা না হোক। তাতে তোর সমস্যা কোথায়?”
সিমি মুখ গোমড়া করে বললো,
“আমার কাছে যা মনে হলো তাই বললাম।”
নিশান কিছু বললো না স্টাফ এসে খাবার দিয়ে গেলো। নিশান সিমিকে খেতে বললো। সিমির প্রচুর ক্ষুদা লাগছে তাই সে নিশানকে জিজ্ঞাসা না করেই নিজের মতো খেতে লাগলো। এর মধ্যে নিশান নিজের ফোন টেবিলে রেখেই সিমিকে বললো,
“তুই থাক। আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি।”
সিমি মাথা নাড়লো। নিশান চলে গেলো। নিশান যাওয়ার দুই মিনিট পরে। তার ফোনে কল আসলো।সিমি আরচোখে তাকালো সেখানে ‘Adil ” নামটা জ্বলজ্বল করছে। সিমি বেশি পাত্তা দিলো না। ফোন রিং হয়ে হয়ে কেটে গেলো। আবারো হলো পরপর দুইবার কেটে গেলো। তিনবার বাজতেই সিমি ফোনটা না পেরে রিসিভ করে কিছু বলতে যাবে তার আগে ওইপাশ থেকে আদিল বললো,
“বস গোপন সুড়ঙ্গের কারাগারে রাখা ফারহান দরিয়াস ভীষণ ঝামেলা করছে। আমাদের এক বডিগার্ড গিয়েছিলো খাবার দিতে। সে বডিগার্ড এর হাত ধরে টেনে এনে মাথা চেপে ধরে জোরে জোরে কারাগারে বাড়ি দিয়ে মেরে ফেলছে। আপনি দ্রুত আসার চেষ্টা করুন বস। ওকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। ঐরকম কতজনকেই তো মারলেন। সমস্যা কি এই কীট কেউ মেরে দিন বস দ্রুত আসুন।আর আমার TN টিম একটা মিশনে গেছে। একজনের খোঁজ লাগাতে। আপনি আসলে সবকিছু বিস্তারিত বলব। ফোনে সবকিছু বলা যাই না।”
আদিলের সম্পূর্ণ কথা সিমির কানে যেতেই সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। চোখ দুটো যেন কোন কারণে ঝাঁপসা হয়ে গেলো। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রেখে দিলো। কল কেটে গেছে। সিমি আর খাবার খেলো না। নাড়াচাড়া করতে লাগলো। মাথায় শুধু ঘুরতে লাগলো আদিলের বলা কথা গুলো। নিশান খুন করে? কতজনকে খুন করেছে? কিসের গোপন সুড়ঙ্গের করাগার? কে এই ফারহান দরিয়াস? আর নিশানকে কেনই বা বস বললো?TN টিম, এইটা কিসের টিম? আরো বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে লাগলো। এর মধ্যে নিশান আসলো।চেয়ারে বসলো।সিমিকে খাবার নাড়াচাড়া করতে দেখে বলে উঠলো,
“খাবার নিয়ে খেলা করছিস কেন?”
নিশানের এই সামান্য কথাটেও সিমি কেঁপে উঠলো। সিমিকে কাঁপতে দেখে নিশান ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কি হয়েছে? কাঁপছিস কেন?”
সিমি নিজেকে সামলিয়ে কোন মতে বললো,
“ভালো লাগছে না। বাড়ি যাবো।”
নিশান আর কোন প্রশ্ন করলোনা। সিমির হাত ধরে উঠে পড়লো। যাওয়ার আগে নিকোলোর সাথে কথা বলে চলে গেলো। সিমিকে গাড়িতে উঠিয়ে নিজেও উঠে বসলো। সিমির দিকে না তাকিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো। সিমি গটশট হয়ে বসে রইলো।যা নিশানের চোখে পড়লো। সে বলে উঠলো,
“কোন সমস্যা? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”
সিমি কিছু বললোনা। গাড়ি চলছে। সিমি নিশ্চুপ থেকে হঠাৎ নিশানকে প্রশ্ন করলো,
“এই ইতালির রোম শহরে আপনার আসল পরিচয় কি?”
নিশান গাড়ি চালাতে চালাতে বললো,
“আমার নাম কি তুই জানিস না নাকি? তানভীর চৌধুরী নিশান। সব জায়গায় আমার আসল পরিচয় তানভীর চৌধুরী নিশান।”
নিশানের কথা শেষ হতেই সিমি মাথা নিচু করেই বললো,
“তাহলে TN টিম এর বস কে?”
সিমির মুখে TN টিমের নাম শুনতেই নিশান দ্রুত গাড়ি ব্রেক করলো। সে সিমির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সিমি মাথা নিচু করে আছে এখনো। নিশানকে কিছু বলতে না দেখে সে নিজেই বললো,
“আমার কথা শুনে গাড়ি থামিয়ে দিলেন যে!”
নিশান নিজেকে স্বাভাবিক করে স্টেয়ারিং এ হাত দিয়ে বললো,
“এমনি।”
বলে গাড়ি চালাতে লাগলো। সিমি হেসে প্রশ্ন করলো,
“আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার কারন?”
“কোন প্রশ্ন?”
“TN টিমের বস কে?”
নিশান গাড়ি থামলো তবে সাইট করে। সিমির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“সেইটা আমি কিভাবে বলব? কোথাকার কিসের টিম। আমি কিভাবে জানবো?”
সিমি মাথা নাড়িয়ে বললো,
“ও তাহলে আপনি জানেন নাহ?”
“আমার জানার কি কোন কথা ছিলো?”
“হ্যা জানার কথা তো। কারন আজ নয়তো কাল ফারহান দরিয়াস কে খুন করবেন যে।”
সিমির মুখে ফারহানের নাম শুনতেই নিশান রাগী গলায় বললো,
“এই নাম তুই কোথা থেকে শুনলি?”
সিমি আগের মতোই বললো,
“অবাক হচ্ছেন?”
তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৭
নিশান নিজের সিট্ বেল্ট খুলে সিমির দিকে এগিয়ে এসে সিমিকে আটক করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“এত নাটক আমার পছন্দ না। ইশু, তুই এইসব কোথা থেকে জানলি? ফারহান দরিয়াসের নাম কোথায় শুনেছিস?”
সিমির মাথা নিচু ছিলো। তবে সে নিশানের দিকে তাকালো নিশানের চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো,
“গোপন সুড়ঙ্গের কারাগারে, কতজন কে হত্যা করেছেন? TN টিমের বস তানভীর চৌধুরী নিশান।”
