Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৭ (২)

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৭ (২)

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৭ (২)
জান্নাত নুসরাত

খান বাড়ির সান বাঁধানো বাঁ-পাশের পুকুরে হাতে বরশি নিয়ে চুপচাপ বসে আছে জায়িন। শান্ত ধাতে চেয়ে দেখছে পুকুরে মাছের নড়াচড়া। যেই বরশিতে থাকা টুপটা মাছ মুখে নিতে যাবে অমনি পাথর দিয়ে কেউ একটা ঢিল ছুঁড়ে মারল, তাই বরশিতে মাছ লাগার পূর্বেই তা পালাল। জায়িন চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্ত ভঙ্গিতে উপরের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো নুসরাতের সাথে, অমনি দাঁত বের করে ভেটকি মাছের মতো করে হাসল নুসরাত। হাত নাড়িয়ে বলল,”জায়িন ভাই, আপনার পেছন পেছন এখানেও চলে এসেছি।
জায়িন কথা বলল না, গম্ভীর মুখ করে ধ্যান দিল বরশির দিকে। নুসরাত পাত্তা না পেয়ে এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। ধীর পায়ে নিচের দিকে নেমে গিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে বসল। শ্রবণেন্দ্রিয় বেয়ে ভেসে আসলো প্রশ্ন,”কখন এসেছেন?

“এই তো দু-ঘন্টা হবে।
জায়িন পানির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ আর কে কে এসেছে?
নুসরাত নির্বিকার চিত্তে উত্তর দিল,
“আমি, আহান, আর আব্বা!
দু-জনের কথোপকথন এইটুকু হলো, কেউ কাউকে আর কোনো প্রশ্ন করল না, কিন্তু পাশে বসে থাকা নুসরাত জায়িনের বরশিতে মাছ আটকানোর পূর্বেই মুখ দিয়ে শব্দ করে ভাগিয়ে দিল, এতে বিরক্ত হলেও তা জাহির করল না জায়িন।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আরশের ছোট মামা বছর দশেক হয়েছে বিয়ে করেছেন। তার বড় ছেলে মেহুলের বয়স বর্তমানে চার। একসাথে দুটো বাচ্চা হওয়ায় উনার স্ত্রী টুম্পা বাচ্চা দুটোকে সামলাতে হিমশিম খান। মেঘলা কিছুটা শান্ত প্রকৃতির হলেও, মেহুল প্রচন্ড চঞ্চল। বাড়ির বয়স্কা কর্তী রোমানা খাতুন ছাড়া আর কাউকেই ভয় পায় না সে তেমন। নিজেকে এই বাড়ির বাদশা মনে করে পেট আগের দিকে দিয়ে হাঁটে। সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ায় বাড়ির এপাশে-ওপাশে, মনে ভয় ডরের লেশমাত্র সম্ভবনা নেই। নুসরাত এসেছে থেকে এই বাড়ির ইঁচড়েপাকা ছেলেটা তার পেছনে লেগেছে, একেকসময় একেকভাবে।

যেমন কখনো তার গায়ে তেলপোকা এনে ছুঁড়ে মারছে, কখনো বালুর দলা তো তো কখনো লেজ ছাড়া টিকটিকি। নুসরাত ভ্রু কুঁচকে শীতল চোখে দেখছে ছেলেটার আজগুবি কান্ডকারখানা। হুদাই তার সাথে এসে শত্রুতা করছে। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ করে শিয়ালের মতো তক্কে তক্কে আছে কখন এই ছেলেকে চেপে ধরে উচিত শিক্ষা দিবে, তাই মাথায় চাপ না দিয়ে, কাউচে এক পা তুলে বসে আরাম করে কামড় বসাল আপেলে। নির্লিপ্ত মুখটা হঠাৎ অদ্ভুত হাসির তোড়ে বেঁকে গেল। পেছন থেকে আসা ছায়া যখনই এগিয়ে এসে ঘাড়ের কাছে কিছু একটা রাখতে যাবে, অমনি হাতটা চেপে ধরে ধপাস করে এনে ফেলল নিজের সামনে মেহুলকে। তীরের ফলার ন্যায় এক ভ্রু উচিয়ে শুধাল,”বেয়াদব, বেয়াদবি হচ্ছে আমার সাথে?

মেহুলের দু-হাত নিজের একহাতে চেপে ধরে আরশোলাটা নিজের অন্য হাতের মধ্যে নিল। ঘৃণিতে দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, সামনে চেপে ধরে রাখা মেহুলের পানে তাকাল,যে এখন তার হাত থেকে ছাড়ার পাওয়ার চেষ্টায় হাত পা ছুঁড়ছে৷ নুসরাত ছেড়ে দিল না, শক্তি লাগিয়ে, হাতের তালু দিয়ে ঠাস করে গাল বরাবর একটা থাপ্পড় বসাল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,”আর আমার সাথে বদমায়েশি করবা?
মেহুল দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে না জানাল, মনে মনে তখন ভেবে ফেলেছে এখান থেকে বের হয়েই কীভাবে প্রতিশোধ নিবে। পা দিয়ে লাথি মারার চেষ্টা করতেই, টুম্পা এসে দু-জনকে পেয়ে গেলেন ঝগড়া করতে। ছেলের কান্ডে ধমকালেন,”মেহুল, সম্মান দাও, বড় বোন হয় তোমার।

মায়ের ধমকে ছটফট থেমে গেল মেহুলের। হাত ঢিলে করে দিতেই ক্রোধানিত নয়নে নুসরাতকে দেখে চলে যেতে নিবে মুখ ঝামটা মেরে, নুসরাত রসিয়ে রসিয়ে জানতে চাইল,”আন্টি মেহুলের খাৎনা হয়ে গেছে?
ভদ্রমহিলা দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বললেন,“না তো মা।

নুসরাত ঠোঁটে হাত চেপে ধরল বিস্ময়ের ভান করে। বলল,” যত তাড়াতাড়ি পারুন সুন্নতে খাৎনা করে ফেলুন, এই তো বয়স খাৎনা করার। আমার মনে আছে আমাদের আহানের দু বছরে পাখি কাটা হয়েছিল, এমনকি ইরহামের ও।
মিথ্যেটুকু অনায়াসে বলে হাসল সে। মনে মনে নিজেকে বাহবা দিল এত গুছিয়ে মিথ্যে বলা নিয়ে। ইরহাম তার তেরোদিন আগে পৃথিবীতে ল্যান্ড করেছে, সে কীভাবে জানবে কখন ইরহামের খাৎনা হয়েছে, যাই হোক, মিথ্যে বলাই যায়, এই মহিলা তো আর জানে না ইরহাম আগে পয়দা হয়েছে নাকি সে। বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেহুলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চোখা করে ভেঙ্গাল। ভ্রু উচিয়ে ইশারাত জানতে চাইল,’’আর পাঙ্গা নিবা আমার সাথে?’
মেহুল নুসরাতকে ঠাট্টা করে হাসল, মনে করল তার মা মানা করবে। কিন্তু নুসরাতের সাথে সুর মিলিয়ে একইতালে বললেন তিনি,”ঠিক কথা মনে করিয়েছ মা, আল্লাহ তোমার ভালো করুক। আমি আজই ওর বাবা আর দাদির কানে কথাটুকু তুলব।
নুসরাত বিনয়ী হাসল। মিনমিন করে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ মানুষকে এভাবে বাঁশ দিয়ে সাহায্য করাই হলোই তো আমার দায়িত্ব কর্তব্য।

রাত এগারোটার সময় খাবার টেবিলে খাবার খেতে বসল সবাই। খাবার টেবিলে রাখার আগেই আহান আর নুসরাত এসে দু-হাত পা মেলে আরাম করে বসে পড়ল। নুসরাত কোনো বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হলো না, নির্লিপ্ত মুখে ভাত বেড়ে নিয়ে মুখে তোলার প্রস্তুতি নিল।
খাবারের পদের ক্ষেত্রে গরুর মাংস পছন্দের খাবার নুসরাতের, এই পদটা টেবিলে থাকলে অন্য কোনো খাবারের দিকে চোখ তুলে তাকায় না সে ভুলেও, তাই আজও একই কান্ড ঘটল, গরুর মাংসের বাটি সবার আগে টেনে নিল নিজের দিকে। পাশ ঘেঁষে বসা আরশ হাত বাড়িয়ে ছিল নেওয়ার আশায়, তা গুটিয়ে নিতে হলো রমনীর উৎসুকতায়।
ইসরাত মুরগীর মাংস বেশি পছন্দ করে, আহান ও একই, নুসরাত তো কখনো কখনো বলে পল্ট্রি চিকেন খেয়ে পল্ট্রি মুরগীর মতো হয়ে যাচ্ছে দু-জনেই। এতে বিশেষ পাত্তা দেয় না কেউই, কারণ সৈয়দ বাড়ির ভেতর নুসরাত একমাত্র ফালতু কথা বলায় উস্তাদ।

জায়িনের আবার খাবারের ক্ষেত্রে ভিন্নতা, সে পছন্দ করে ছাগলের মাংস। রুমানা খাতুন ইসরাতকে বিশেষ পছন্দ না করলেও নাতীদের পছন্দ অনুসারে রেখেছেন খাবারের সকল পদ।
আরশ আর নুসরাতের জীবনেও কোনো কিছুতে মিল না হলেও খাবারের ক্ষেত্রে একটু আকটু মিলে যায় পছন্দ। যেমন নুসরাতের গরুর মাংস পছন্দ, আরশের ক্ষেত্রেও তাই। ব্ল্যাক কফি দু-জনেই অপছন্দ করে, তবুও মুখ কুঁচকে গলদকরণ করে। সবজির ক্ষেত্রে নুসরাতের অপছন্দের তালিকায় সর্বপ্রথম করলা, আর আরশের পছন্দের তালিকায় সর্বপ্রথম এই সবজিটা। আরশের অপছন্দ হলো ফুলকপি, নুসরাতের আবার তা পছন্দ। শুটকি পছন্দ নুসরাতের, আরশ আবার তা দু-চোখে ঘৃণা করে। স্পাইসি খাবার সৈয়দ বাড়ির কারোর মুখে রোচে না, তাই খাবারে মরিচের পরিমাণ সবসময় কম থাকে। আরশ জাল খাবার পছন্দ না করলেও মিষ্টি আর টক খাবার একদম দু-চোখে দেখতে পারে না। এদিকে মিষ্টি আর টক খাবার নুসরাতের পছন্দের শীর্ষতালিকায়।

গরুর মাংস বাটি থেকে নিতে গিয়ে বারবার হাত ফসকে গেল নুসরাতের। আরশ হয়তো খেয়াল করল তা, হাত বাড়িয়ে টেনে নিল একপ্রকার চামচ। নুসরাত ঠোঁট চোখা করে কিছু বলতে নিবে, আরশ চুপচাপ প্লেটে চামচ ভরে ভরে মাংস তুলে দিল। ধমকে ওঠে বলল,”খা!
নুসরাত বিমূঢ় আঁখিপল্লব নিয়ে তাকিয়ে রইল। জিজ্ঞেস করল,”ধমকাচ্ছেন কেন, আশ্চর্য?
আরশ কথা বলল না। গরুর মাংস প্লেটে নেওয়ার জন্য চামচ হাতে নিতেই নুসরাত এমনি সেধে বলল,”আরশ ভাই আমি বেড়ে দেই?

আরশ মানা করে দিবে ভেবে নড়েচড়ে বসল। মনে মনে প্রহর গুণল মানা করার, কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আরশ হাত সরিয়ে নিল৷ ইশারায় বোঝাল বেড়ে দিতে, অস্ফুটে উচ্চারণ হলো,”হু!
আরশের রাজী হয়ে যাওয়ায় মোটেও খুশি হলো না নুসরাত। মেঘের আধারে ঢেকে গেল উজ্জ্বল মুখশ্রীটুকু! মিন মিন করল নিজ মনে,’’নিজে বেড়ে খা না ভাই, আমাকে বলছিস কেন!
আরশের কানে কথাগুলো গেলেও প্রতিক্রিয়া দেখাল না, বুকে হাত ভাঁজ করে তাকিয়ে দেখল নির্মিশেষ দৃষ্টিতে খাবার বেড়ে দেওয়া চিকন হাতটা। বাটি উল্টে ঢেলে দিতে দিতে নুসরাত প্রশ্নাত্মক কন্ঠে জানতে চাইল,”আর লাগবে আরশ ভাই?

আরশ মানা করার পূর্বেই পুরো বাটি আরশের প্লেটে দেখা গেল। নুসরাত আরশের দৃষ্টি উপেক্ষা করে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে খাবারের ধ্যান দিল৷
সাধারণ এই দৃশ্য সাধারণ ঠেকল না সামনে বসে রুমানা খাতুনের নিকট। নাতীর ওমন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটার দিকে হা করে পলকবিহীন তাকিয়ে থাকা বয়স্কার নিকট অদ্ভুত ঠেকল। খাবার বেড়ে দেওয়া একে অন্যের প্লেটে এটা ও মনে সূক্ষ্ম তেতোওতার সৃষ্টি করল। চামচ শব্দ করে ফেলে দিয়ে কিছু বলতে নিবেন, মুখ আটকালেন। গলবিলে দলা পাকানো কথাটুকু গিলে নিলেন আলগোছে৷ সবার দৃষ্টি নিজের দিকে উপলব্ধি হতেই বললেন,”আগামীকাল মেহুলের খাৎনা করা হবে, আতিক খাৎনাওয়ালা নিয়ে এসো সকাল সকাল।
নুসরাত ঠোঁট উচিয়ে তাকাল খাবার টেবিলে একপাশে গোমড়া মুখে বসে থাকা মেহুলের দিকে। দৃষ্টতা নিয়ে তাকিয়ে রইল, যেই মেহুল এদিকে তাকাল অমনি চোখাচোখি হলো দু-জনের। মেহুলের বিনা আর্তনাদে অসহায় মুখখানা দেখে, মুখের ভেতর থাকা খাবার না চাইতেও ছিটকে বেরিয়ে আসলো নুসরাতের। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল পুরো ড্রয়িং রুম কাঁপিয়ে। আহান নুসরাতের হা হা করে হাসি দেখে ঠোঁট টিপল নিজের হাসি আটকানোর জন্য, হলো না, নিজেও কাহিনি না জেনে সুর মিলিয়ে হেসে উঠল।

ঘড়ির কাটায় তখন কাটায় কাটায় এগারোটা বাজছে। মেহুলকে অনেকক্ষণ যাবত বোঝানোর চেষ্টা চলছে খাৎনা করার জন্য কিন্তু কোনোভাবেই সে রাজী না৷ দু-হাত পা ছড়িয়ে বাড়ির মেঝেতে শুয়ে আছে, সাথে ঘোৎ ঘোৎ করে নিজের মনের রাগ, ক্ষোভ প্রকাশ করছে। যেই সে নুসরাতের ওভাল আকৃতির মেসি বান করা হাস্যরস মুখটা দেখছে তখনই ইচ্ছে করতেছে চুল ছিঁড়ে মুখে আঁচড় কাটতে। রাগ রাগ চোখ মুখে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চ্যাঁচাল, কেউই কানে তুলল না মেহুলের আত্মচিৎকার। নুসরাত এক পা চেয়ারে তুলে বসে আরাম করে আপেলে কামড় বসাতে বসাতএ হাসল সবার অগোচরে। এতে হয়তো মেহুলের রাগে ঘি ঢালল, হাতের কাছে থাকা ফুলদানিটা তুলে ছুঁড়ে মারল তার দিকে। সেকেন্ডের ভেতর উড়ে এসে পড়তে নিল তার নাক -কপাল বরাবর তার পূর্বেই বিমূর্ত হয়ে বসে থাকা নুসরাতকে এক টানে সেখান থেকে সরিয়ে নিল একটা শক্তপোক্ত হাত। নুসরাত হকচকিয়ে দেখল মেহুলকে, চোখ-মুখ বিস্ময়ের অন্তর্ভুক্ত। নাসারন্ধ্রে কুস্তুরীর ঘ্রাণ প্রবেশ করতেই মাথা তুলে উপরে তাকাল, চোখাচোখি হলো নিষ্প্রাণ কালো বলয়ের আঁখিযুগলে৷ কানে ভেসে এলো,”ব্যথা পেয়েছিস?

নুসরাত রোবটের ন্যায় মাথা দু-পাশে দুলিয়ে না জানাল। মেহুলের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে হাসল তাচ্ছিল্য, তাকে টার্গেট করে নিক্ষেপ করা ফুলদানিটা ফসকে যাওয়ায়। কিছুক্ষণ পূর্বের হামলার কথা ভুলে গিয়ে জিভ বের করে ভেঙাল আবারো। বুড়ো আঙুল উল্টে দেখাল কাচকলা।
মেহুল তেড়ে আসতে নিবে তার আগেই খান বাড়িতে পর্দাপণ ঘটল খাৎনাওয়ালার। লোকটার সে কি ভীষণ তাড়া! এসেই তাড়া লাগালেন উনার শিগগির ফিরে যেতে হবে, তাই তাড়াতাড়ি বাচ্চাকে নিয়ে আসার জন্য। মেহুল লোকটাকে দেখে পালিয়ে যেতে চাইল দৌড় দিয়ে, খপ করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরল তাকে সার্থ৷ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল রুমের দিকে। মেহুল চ্যাঁচাচ্ছে,”ভাইয়া ব্যথা লাগবে, ভাইয়া আমি যাব না। নুসরাত আপু বলেছে ব্যথা লাগবে, ব্যথা!
নুসরাত শ্রাগ করে কপালে ভাঁজ ফেলল। বলল,

“আমি কখন বললাম ব্যথা লাগবে!
মেহুলকে কাঁধে তুলে নিয়ে যেতে যেতে স্বার্থ বলছে,”আরে কীসের ব্যথা, কোনো ব্যথা ট্যথা লাগবে না, এই যাবি আর এই আসবি।
মেহুল গলা ফেড়ে চিৎকার করলেও কেউ ধ্যান দিল না এতে। রুমানা খাতুন ততক্ষণে এসে ড্রয়িং রুমে হাজির হয়েছেন৷ খাৎনাওয়ালার সাথে কথা বলা শেষে দু-জনেই এগোলেন সম্মুখে। নুসরাত সেটা খেয়াল করেই আরশের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে, কোমরে দু-হাত রেখে দাঁড়াল। আরশের সম্মুখে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে কিৎকাল উপর-নিচ দেখল। দু-ভ্রু এর মাঝে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,”ব্রো তোমার হয়েছে?
আরশ দু-ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,

“কী!
নুসরাত ইশারা দিয়ে কিছু একটা বোঝাল। ইশারায় বোঝানোতে রপ্ত থেকে অস্ফুটে উচ্চারণ করল,”আরে ওইসব!
আরশ নুসরাতের হেয়ালিতে মেজাজ খোয়াল পরক্ষণেই। নাক মুখ কুঁচকে চ্যাঁচাল,”কীসব কী হবে!
“আরে বুঝেন না?
আবারো চোখ দিয়ে ইশারা করল আরশকে। না চাইতেও এবার ধৈর্য হারিয়ে তেড়ে আসলো নুসরাতের দিকে আরশ। বিকট শব্দে হুংকার দিল,”না বুঝি না, মুখ দিয়ে বল বেয়াদব।
নুসরাত আরশের থেকে নির্দিষ্ট দূরি তৈরি করল পিছু সরে যেতে যেতে। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে নির্লজ্জের মতো শুধাল,”আপনার সুন্নতে খাৎনা হয়ে গেছে আরশ ভাই?

আরশ ক্রোধে চোখ-মুখ লাল করে গর্জাল। দাঁতের কপাটি চেপে রাগ নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইল, নুসরাতের ভেটকানো দেখে তা আরো বৃদ্ধি পেল। কটমট করে দাঁতের কপাটি পিষল, মুখ দিয়ে হিসহিসিয়ে বের হয়ে আসলো,”না, তুই আর তোর বাপ এসে খাৎনা করবি বলে বসে ছিলাম, আয় করে দে খাৎনা।
নুসরাত দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর বৃথা প্রচেষ্টা চালাল, না পেরে হাত দিয়ে ঠোঁটের হাসি চাপিয়ে বলে ওঠল,” কাঁচি, বটি, তুলা, সেভলন, আর যা যা প্রয়োজন নিয়ে আসি, একমিনিট অপেক্ষা করুন আরশ ভাই, আমি এই যাচ্ছি আর আগামী তিনদিন এর ভেতর চলে আসছি..!

নুসরাত নিজের এমন বেহায়পনায় মোটেও লজ্জা পেল না, উল্টো আরশের এমন রেগে যাওয়ায় বেশি অবাক হলো। নিত্যনতুন একই ঘটনা ঘটার পর একটা লোক কীভাবে তার উপর সেইম কাহিনির জন্য রেগে যায় তা ভাবতে গিয়ে মাথায় জট পাঁকিয়ে গেল, তবুও জট ছাড়ানোর চেষ্টা না করে আরশকে আবারো জ্বালাতে ব্যস্ত হলো মনপ্রাণ কাজে লাগিয়ে। চোখ তুলে উপরে তাকাতেই থাবা দিয়ে ঘাড় চেপে ধরল আরশ তার। কন্ঠ খাদে নামিয়ে আওড়াল,”নুসরাত, খুব বাড় বেড়েছিস তুই!
মেয়েটা হাসল। আরশের হাত থেকে ঘাড় ছাড়ানোর চেষ্টা করল না। গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হেসে কিছু বলতে নিবে কানে ভেসে এলো কিছু শব্দ,”আর যদি একটা ফালতু কথা বকিস তাহলে মাথায় তুলে আছাড় মারব তোকে।
নুসরাত অবাক কন্ঠে জানতে চায়,

“কোথায় কী বকলাম?
আরশ ভ্রুদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলে জানতে চায়, “তাহলে এতক্ষণ কী করছিলি?
“আমি তো শুধু বলছিলাম!
নুসরাতের কথা শেষ হতেই ঘাড়ের কাছে চেপে ধরা হাতটা আরো শক্ত হয়ে আসলো। আরশ হুশিয়ারি দিল,”আর যদি বলিস তাহলে পানিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিব।
নুসরাত শ্রাগ করল। মৃদু আওয়াজে আওড়াল,
‘“তো ফেলে দেন না, আমি ভয় পাই নাকি?
আরশ তর্জনী আঙুল দিয়ে নুসরাতের কপালের কাছে দুটো টোকা দিয়ে শুধায়,,”এখানে মস্তিষ্ক বলতে কোনো জিনিস আছে?
“না নেই, আমি বাদে আপনার আর আপনার চৌদ্দ গুষ্টির শুধু আছে।
আরশ চুটকি বাজাল। ঠোঁটে স্মিথ হাসির রেখে খেলে গেল। বলল,”রাইট, ইউ আর রাইট নুসরাত নাছির।

মাছ ধরার জন্য গতকাল লোক আনানো হলেও তেমন মাছ জালে আটকায়নি, তাই আজ আবারো আনানো হয়েছে তাদের। প্রায় ত্রিশ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর পেছনের পুকুর থেকে বড় একটা রুই মাছ উঠেছে জালে, সেই নিয়ে হট্টগোল চলছে সবার মাঝে। নুসরাত আর আহান পাশাপাশি বসে পুকুর পাড়ে মাছ জালে ধরা দেখছিল, দেখা শেষে বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল ফিরে যাওয়ার জন্য খান বাড়িতে। ওয়াইড লেগ জিন্স এর পেছন ঝেড়ে নিয়ে যেই মাথা ঘোরাতে নিবে অমনি ধপাস করে পানির মধ্যে শব্দ হলো, বাড়িতে আর ফিরে যাওয়া হলো না তার। চোখ দুটো রসগোল্লার ন্যায় হয়ে গেল প্রকট। পানির মধ্যে খাবি খাওয়া, ছটফট করতে থাকা ইসরাতের ফ্যাকাশে হয়ে আসা মুখটা অক্ষিকোটরে অন্তরগত হলো। কন্ঠে মারাত্মক অস্তিরতা নিয়ে চ্যাঁচাল,”জায়িন ভাইয়া, ইসরাত পানিতে পড়ে গেছে, বাঁচান ওকে।
জায়িন প্রথমে পরিস্থিতি ঠাহর করতে পারল না, যতক্ষণে বুঝতে পারল ততক্ষণে হাজারো বুদবুদ উপরের দিকে উঠে নিচের দিকে তলিয়ে গেছে মেয়েটা। হাত-পা অনবরত পানিতে ঝাপাঝাপির আওয়াজ হলো। একইসাথে কানের কাছে নুসরাতের চিৎকার,”এইইই জায়িন ভাই, ইসরাত সাতার জানে না। আরে ভাই এমন দাঁড়িয়ে আছেন কেন, নামুন না পানিতে।

জায়িনকে থম মেরে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নুসরাত নিজে সিঁড়ি ভেঙে দৌড়াল পানিতে নামার জন্য। ভুলে বসল সে ও সাতার জানে না। আনাড়ি এ ক্ষেত্রে! পায়ের পাতায় পানি লাগার আগেই ছিটকে এসে একদলা পানি লাগল নুসরাতের গায়ে। কানে ভেসে এলো জায়িনের স্বর,”আমি ও সাতার জানি না..!

মাথায় গাথল কী সেই কথা বোঝা গেল না। নুসরাত চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে রইল খাদের মতো পুকুরটার দিকে। দিকবিদিক ভুলে, শূণ্য মস্তিষ্কে নিজেও লাফিয়ে ওঠে পানিতে নেমে গেল। পুকুরে নামার পর বুঝল কতবড় ভুল করেছে সে, হাত পা ঝাপটে যত উপরের দিকে উঠে আসলো, তত তলিয়ে গেল অন্ধকারের দিকে, মনে হলো রাক্ষসের মতো গিলে নিচ্ছে তাকে নিজের ভেতরে পুকুরটা। শ্বাস নেওয়ার জন্য হা করতেই নাক মুখে পানি ঢুকে কুহ কুহ করে কেঁশে উঠল। হাপড়ের ন্যায় চোখের পাতা ঝাপটাল বাঁচার আশায়, সামনের আলোচ্ছন্ন দুনিয়া দেখার লোভে, সম্ভব হলো না, আধারে ছেয়ে গেল সবটুকু। ঠোঁট চেপে চোখ বন্ধ করে নেওয়ার পুর্বে অক্ষিকোটরে ভাসল, তার দিকে দ্রুততার সহিত ধেয়ে আসা একখানা মুখ। নিজের বিভ্রমে নিজেকে তাচ্ছিল্য করে হাসল,বাঁচার আকাঙ্ক্ষাটুকু হারিয়ে গেল অচিরেই, কানের কাছে তখন সাইরেনের মতো শব্দ হচ্ছে, হয়তো জান কবজের ফেরেস্তা আসছেন তার নিকট জান কবজ করতে। অপটু হাত-পায়ে পানিতে ঝাপটানো থামিয়ে হাল ছেড়ে দিল, মৃত্যুকে দু-হাতে আলিঙ্গন করতে, তলিয়ে গেল নিচের দিকে। বন্ধ চোখের পাতায় ভাসল আরশের সাদা কালো অসহায়, ক্রোধে লাল হওয়া চেহারাটা। ঠোঁটে আবারো ভেসে উঠল করুণ হাসি। খুব কাছ থেকে নিজের মৃত্যুকে দেখতে পেল সে,নিজের অন্তিম মুহুর্তের প্রহর গুণল মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ জোড়ে, কখন এসে ধরা দিবে সেই মুহুর্ত, না চাইতেও মুখ দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ হলো,’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ…!!’

যতক্ষণে খান বাড়ির সবাই আসলো ততক্ষণে পানিতে থাকা মানুষগুলোর অস্তিত্ব ডুবে গেছে। শান্ত পানিতে বুদবুদ উপরে উঠছে শুধু৷ কেউ কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধড়াম করে পানিতে আবার শব্দ হলো। লিপি বেগম যখন দেখলেন পুকুরের পানিতে তার ছোট ছেলে তখন কিছু বলতে ভুলে গেলেন৷ হেলাল সাহেব হেড়ে গলায় পেছন থেকে ছেলে মেয়েদের নির্বুদ্ধিতা চ্যাঁচাচ্ছেন,”চারটার একটা ও সাতার জানে না, বোকাদের মতো ঝাপাল কীভাবে পানিতে?
আহান কিৎকাল বর্তমান পরিস্থিতি দেখল গোল গোল চোখ দুটো দিয়ে, পানিতে নামার জন্য পা টিপেটিপে সিঁড়ি ভেঙে নামল। ভয়ার্তহীন মুখে পানিতে পা রাখার পূর্বেই এক হাতে স্বার্থ টেনে নিল তাকে। ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,”কোথায় যাচ্ছো পিচ্চি?

আহান নিজের টি-শার্ট টেনে ছাড়িয়ে নিল। মুখে বিরক্তির ছাপ। নাক ফুলিয়ে বলল,”সবাই পানিতে নেমে গেছে দেখছ না, আমি ও নামছি যাতে পানি থেকে কোনো সূত্র আবিষ্কার করতে পারি।
স্বার্থ দেখল আহানের বোকা বোকা গুলুমুলু মুখটা। দু-আঙুলের সাহায্য গাল শক্ত করে টেনে দিয়ে বলল,”সাতার জানো তুমি?
আহানের নির্লিপ্ত উত্তর,
“না।
“ তাহলে কোন সাহসে তুমি নামছো?

আহান কোনো যুথসই শব্দ খুঁজে পেল না বলার জন্য, তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ততক্ষণে নাছির সাহেব আর হেলাল সাহেব দু-জনেই পানিতে নেমে গেছেন৷ পটু হাতে অগ্রসর হচ্ছেন অন্ধকার গহব্বরের দিকে। একে একে জালুয়ারা ও নিজেদের জাল নিয়ে পানিতে নামছেন। পাড়ে দাঁড়ানো লিপি বেগমের মুখটা কালো বর্ণ ধারণ করে থমথমে হয়ে গেছে। চোখ-মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, পারলে এই মুহুর্তে এই বাড়ি থেকে প্রস্থান নিতেন, শুধু নিজের অপরাগতার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আহানের হাতের কব্জি চেপে ধরলেন নিজের হাতের মুঠোয়। বিড়বিড় করে আওড়ালেন,”আল্লাহ আল্লাহ করে সবাই সুস্থ হয়ে ফিরুক পানি থেকে ফিরুক, আর এক মুহুর্ত এই বাড়িতে থাকব না আমি।

গাড়ির ব্যাক সিটে বোন আর ভিক্টরের মাঝখানে চুপচাপ বসে আছে মাহাদি। মুখটা গোমড়া, দেখেই বোঝা যাচ্ছে জোর করে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। মাহাদির পরিবার আজ মেয়ে দেখতে যাচ্ছে মীরা বাজার। অনিকার মুখটা খুশিতে প্রফুল্ল হলেও মাহাদির মুখটা অন্ধকার। সবকিছু বিরক্ত বিরক্ত ঠেকছে তার নিকট। মমোকে পাত্রী হিসেবে না করতেই, পরেরদিন থেকে একের পর এক পাত্রীর ছবি নিয়ে তার সামনে হাজির পুরো পরিবার। দু-দিন যাবত কোনোরকম না করে সবাইকে টলানো গেলেও আজ কাউকে টলানো গেল না,একদম বগলদাবা করে নিয়ে এসেছে পাত্রী দেখাতে।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৭

গাড়ি চলতে চলতে এক সময় এসে নিজ গন্তব্যে থামল শব্দ করে, হর্ণ বেজে ওঠল, আর এতেই চিন্তাকরণ থেকে বের হয়ে আসলো মাহাদি। মুখটা গম্ভীর করে ধুপধাপ পায়ে নামল গাড়ি থেকে। হাতে কালো রঙের কোট, গ্রে কালার শার্ট ইন করে পরা কালো প্যান্টের সাথে, শার্টের হাতা কব্জি পর্যন্ত গোটানো। উপর থেকে একদম ফিটফাট। পায়ে শু এর জায়গায় এক জোড়া স্যান্ডেল। অনিকা যখন সেটা খেয়াল করল, তখন জিজ্ঞেস করল,”এই জুতো কোথা থেকে নিয়ে আসছো তুমি?
মাহাদি বিরক্ত ভঙ্গিতে বোনের দিকে তাকিয়ে বলতে নিল কাবার্ড থেকে, তার আগেই নেত্রকোণায় ভাসল পায়ের জুতো জোড়া। কপালের ভাঁজ নিমেষে শীতল হয়ে গেল। মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো,’”ওয়াশরুম থেকে।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৮

11 COMMENTS

  1. আচ্ছা গল্পের পর্বগুলো তাড়াতাড়ি দিলে কি এমন ক্ষতি হয়।😭😭😭

  2. Ekta porbo lekhte etto somoy lage majh khane to apni 1din por por porbo dichen abr ager moto suru korchen ken ki somossa? Ekta porbo ditei 5-7din somoy lagaitechen… Ami eto dhoirjoshil na protidin cek kori ekhono ditechen na plz boin plz taratari next part den 🙏

Comments are closed.