চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬১
আরোবা চৌধুরী আরু
রাত গভীর হয়ে এসেছে, প্রায় তিনটা বাজতে আসলো ঘড়ির কাটায়। বাইরে দমকা বাতাসের শব্দ ভেতরে ঢুকছে জানালার ফাঁক দিয়ে। ঘরটা শান্ত, কেবল কিছুকিছু দূরের দূরের গাড়ির শব্দ ভেসে আসছে। কিন্তু নাফিসার ঘুম আসছে না। সে গভীর নিঃশ্বাস নিলেও মন শান্ত হচ্ছে না।
চোখ খুলেই নাফিসা লক্ষ্য করল, সায়মান গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে, নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলো তার হালাল পুরুষকে। ঘুমের মধ্যে একদম নিষ্পাপ বাচ্চাদের মত লাগছে। শ্যামলা বর্ণ হওয়াই আরো বেশি সুন্দর লাগে। যা খোঁচা খোঁচা দাড়ির মাঝখানে ফাঁকা ঠোঁটের দিকে তাকায় নাফিসা সেদিকে তাকিয়ে একটা ঢুক গিললো। তারপর ধীরে ধীরে সায়মানের দিকে এগিয়ে গেল। সে হাতের আঙ্গুলগুলো দিয়ে সায়মানের চুলের ভিতর দিয়ে আস্তে আস্তে বুলিয়ে দিল। তার স্পর্শে সায়মানের ঘুম ভেঙে না যাওয়ায় নাফিসা নিজেই হাসতে হাসতে থেমে গেল।
নাফিসা কিছুক্ষণ এইভাবে শুধু তাকিয়ে রইল। তার হৃদয় জোরে জোরে ধকধক করছে। শেষে সে সায়মানের ঠোঁটের উপরে হালকা চুমু দিল,তারপর নিজের স্বামী-স্ত্রীকে নিজেই অবাক হলো ।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
চুমুর পর সায়মান কিছুক্ষণ নাফিসার দিকে অচেতন চোখে তাকাল, নাফিসা এবার ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু তারপর আবার গভীর ঘুমে চলে গেল সায়মান।সেটা দেখে নাফিসা মুচকি হাসি।
কিন্তু হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে নাফিসার গা অস্বস্তিতে ভরে গেল। হঠাৎ বমি লাগার অনুভূতি। সে দৌড় দিল,ওয়াক, ওয়াক বমির শব্দে সায়মানের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খোলা সঙ্গে সঙ্গে সে দেখতে পেল নাফিসা দৌড়াচ্ছে, ওয়াশরুমের দিকে ছুটছে। সে দ্রুত উঠে পড়ল, ঘুম ভেঙে মাথা এখনও ঝিমঝিম করছে, কিন্তু ওয়াশরুমের দিকে নাফিসার পিছনে ছুটল।
“বউ! ঠিক আছে?” সায়মান তড়িঘড়ি বলল, হাতে হাত ধরে নাফিসাকে ধরে রাখল।
নাফিসা বমি করল, গা কাঁপছে। সায়মান ধীরে ধীরে নাফিসাকে ফ্রেশ করিয়ে নিল, পানি দিয়ে মুখ ও হাত পরিষ্কার করাল। তারপর সায়মান নাফিসাকে কোলে তুলে নিল। ঘরের ভিতরে হাঁটতে হাঁটতে নাফিসা বলল,
“আমি বেলকনিতে যাব। এখানে ভালো লাগছে না, ঘুম আসছে না।”
সায়মান মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
“ঠিক আছে, বউ। বেলকনিতেই বসি।”
নাফিসাকে কোলে নিয়েই সায়মান বেলকনায় গিয়ে দোলার ওপর বসল। বাইরে রাতের হাওয়া তাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে, চাঁদ হালকা আলো ফেলছে। নাফিসা ধীরে ধীরে তার মাথা সায়মানের কাঁধে রেখে নিঃশ্বাস নিয়েছে। সায়মান মৃদু হাসি দিল, তারপর আঙ্গুলগুলো দিয়ে নাফিসার চুলের ভিতর ঢুকে হালকা ম্যাসাজ করতে লাগল।
নাফিসার চোখ অর্ধখোলা, অর্ধবন্ধ। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে। শীতল রাতের বাতাস আর সায়মানের কোমল স্পর্শ মিলিয়ে নাফিসার শরীরে শান্তি নেমে আসছে। নাফিসা হাত তুলে সায়মানের ঘাড়ে জড়িয়ে ধরল।
বেলকনির দোলায় বসে থাকতে থাকতে নাফিসার চোখ হঠাৎ পাশের দিকটায় চলে গেল। অন্ধকারের ভেতরেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পাশের বাগানটা। আলো–ছায়ার ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে একটা আমগাছ। আর আশ্চর্য ব্যাপার হলো, গাছটায় বারোমেষে আম ধরেছে। মাঝারি সাইজের,ডাঁসা আম বাতাসে দুলছে, যেন ইচ্ছা করেই চোখে পড়ছে।
নাফিসা এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ দুটো হঠাৎ চকচক করে উঠল।
“ DSP সাহেব.. …”
কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা।
সায়মান চুলে হাত বুলাতে বুলাতে নিচের দিকে তাকাল।
“হুম?”
নাফিসা আঙুল তুলে গাছটার দিকে ইশারা করল।
“ওই যে আমগাছটা… দেখেছেন ?”
সায়মান তাকাল। বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগল না কোথায় চোখ আটকে গেছে ওর। হালকা হাসল।
“দেখছি। তারপর?”
নাফিসা প্রায় ফিসফিস করে বলল,
“আমি আম খাব।”
বলাটা এমনভাবে বলল, যেন এখনই না পেলে দুনিয়া শেষ।সায়মান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ,
“এই রাতে?”
“হ্যাঁ।”
নাফিসা মাথা নেড়ে নিশ্চিত করে দিল।
সায়মান ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ল।
“বউ, ওটা ডিএসসির বাংলো। ওখান থেকে এত রাতে আম নেওয়া সম্ভব না। কাল সকালে আমি নিজেই কিনে নিয়ে এসে দেব।”
নাফিসার মুখটা মুহূর্তেই বদলে গেল।
“না। এখনই খাব।”
সায়মান এবার একটু শক্ত গলায় বলল,
“এখন না। শোনো, রাত অনেক। তুমি অসুস্থ ছিলে একটু আগে।”
নাফিসা ঠোঁট বেঁকিয়ে ফেলল।
“আম খাব মানে খাব।”
সায়মান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“ স্টপ —”
“না!”
নাফিসা গলা উঁচু করল।
“কাল না, এখন।”
সায়মান এবার একটু ধমকের সুরে বলল,
“এইসব বেয়াদবি করো না। রাত তিনটা বাজে। চুপচাপ বসো।”
এই ধমকটাই কাল হলো। নাফিসার চোখ ভিজে উঠল। ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল। মুখটা ফিরিয়ে নিল।
“সব সময় না বলো… আমি একটু আম চাইছি, তাতেই—”
কথা শেষ হলো না। গলা ধরে এল। চুপচাপ কাঁদতে লাগল।
সায়মান প্রথমে শক্ত থাকার চেষ্টা করল। তারপর চোখের কোণ দিয়ে দেখল—নাফিসা নীরবে কাঁদছে, কাঁধ কাঁপছে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিল। নাফিসা তো বয়সের তুলনা যথেষ্ট ম্যাচিওর মেয়ে এত বাচ্চার মত করে না। তারপর মাথায় আসলো সব প্রেগনেন্সির সাইড ইফেক্ট। সে লম্বা করে শ্বাস নিল।
“আহ্… এই মেয়েটা…”
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হাল ছেড়ে দিল।
“আচ্ছা,”
সে বলল ধীরে।
“চলো।”
নাফিসা হঠাৎ থেমে গেল।
“কোথায়?”
সায়মান অসহায়ের মতো তাকাল।
“আম চুরি করতে।”
নাফিসার চোখ মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কান্নার কোনো চিহ্ন নেই।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। কিন্তু শর্ত আছে,”
সায়মান বলল।
“একদম চুপচাপ। শব্দ করা যাবে না।”
নাফিসা মাথা নেড়ে বলল,
“একদম না। আমি চোরের মতো থাকব।”
দুজন ধীরে ধীরে বেলকনি থেকে নামল। রাত গভীর। চারপাশে নিস্তব্ধতা। বাংলোর গেটের দিকে যেতে যেতে নাফিসা বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে, যেন কোনো অ্যাডভেঞ্চারে এসেছে।
DC বাংলোর দেয়ালটা খুব বেশি উঁচু না। চারপাশে গাছপালা। সায়মান আগে এগিয়ে গেল। হাত ইশারা করে বলল,
“এখান দিয়ে।”
দুজন দেয়ালের পাশে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। দূরে পাহারাদারের ঘর। আলো জ্বলছে, কিন্তু কেউ বাইরে নেই। সায়মান সাবধানে দেয়াল টপকাল। তারপর নিচে হাত বাড়িয়ে দিল।
“হাত দাও।”
নাফিসা একটু ভয় পেয়েও হাত দিল। সায়মান টেনে ওপরে তুলল। দুজন নরম ঘাসের ওপর নামল। আমগাছটা কাছেই। পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে আছে আম। নাফিসা নিচে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওগুলো দেখেন … ওইটা বড়টা।”
সায়মান বিরক্তে তাকালো,
“তুমি নিচে থাকো। আমি উঠছি।”
সায়মান ধীরে ধীরে গাছে উঠল। ডাল ধরে ভারসাম্য রেখে। পাতাগুলো নড়ছে, কিন্তু শব্দ কম। নাফিসা নিচে দাঁড়িয়ে দুহাত বাড়িয়ে রাখল।
“এদিকে ফেলেন ।”
সায়মান একটা আম সাবধানে ছিঁড়ে নিচে ফেলল। নাফিসা ধরে ফেলল। চোখে আনন্দ।
“আরেকটা!”
একটার পর একটা আম নিচে পড়ছে। নাফিসা গুনছে, হাসছে, চাপা উত্তেজনায়। হঠাৎ দূরে একটা কুকুরের ডাক শোনা গেল।
নাফিসা ফিসফিস করে বলল,
“নামেন , কেউ আসবে।”
সায়মান নিজের উপরে নিজের রাগ লাগছে এখন, কোনদিন ভাবতেও পারিনি এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। আল্লাহ তাকে দিয়ে কি কি করাচ্ছে। সায়মান তখনও গাছের ডালে দাঁড়িয়ে। হাতে আরেকটা আম। ঠিক সেই মুহূর্তে,
পেছন দিক থেকে হঠাৎ একটা কড়া গলা ভেসে এল।
“এই! ওখানে কে?”
গলাটা এতটাই স্পষ্ট যে রাতের নিস্তব্ধতা এক মুহূর্তে ভেঙে গেল।
নাফিসার বুক ধক করে উঠল। চোখ বড় বড় করে সায়মানের দিকে তাকাল। সায়মানের কানে কথাটা পৌঁছাতেই আর এক সেকেন্ড দেরি করল না। গাছ থেকে প্রায় লাফ দিয়েই নিচে নামল। মাটিতে পা দিয়েই ফিসফিস করে বলল,
“দৌড়াও!”
নাফিসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সায়মান ঝট করে নিচে পড়ে থাকা আমগুলো তুলে নিতে লাগল। একটার পর একটা—শার্টের পকেটে, প্যান্টের পকেটে, এমনকি একটার জায়গা না পেয়ে বগলের নিচে চেপে ধরল। পেছন থেকে আবার সেই গলা,
“এই! দাঁড়াও!”
এবার গার্ডের ছুটে আসার শব্দ পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। সায়মান আর ভাবল না। এক ঝটকায় নাফিসাকে কোলে তুলে নিল।
“ধর শক্ত করে!”
নাফিসা প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পরমুহূর্তেই ব্যাপারটা ওর কাছে অসম্ভব মজার লাগল। চোখে মুখে চাপা উত্তেজনা। সায়মান দৌড় দিল।পেছন পিছন গার্ডও দৌড়াচ্ছে।
“এই দাঁড়াও! চোর! দাঁড়াও বলছি!”
সায়মান দাঁড়াবে কেন!সে আরো জোরে দৌড়াতে লাগল। নাফিসা সায়মানের গলা জড়িয়ে ধরে আছে। বাতাসে ওর চুল উড়ছে, হঠাৎ ওর হাসি বেরিয়ে এলো। প্রথমে চাপা হাসলেও তারপর আর ধরে রাখতে পারল না।
“হি… হি… হিহিহি!”
সায়মান ফিসফিস করে বলল,
“চুপ! হাসিস না বউ !”
কিন্তু নাফিসা তখন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
“আমরা চোর! আম চোর!”
বলেই আবার হাসি।
গার্ড পেছন থেকে শুনে আরো জোরে চিৎকার করল।
“ওই দাঁড়াও! থাম!”
সায়মান হাঁপাচ্ছে, তবু দৌড় থামায় না।
“এই মেয়ে তো আমাকে ধরা খাওয়াবেই! ”
দেয়াল চোখে পড়তেই সায়মান শেষ শক্তিটুকু জড়ো করল। দৌড়ের গতি কমাল না। দেয়ালের কাছে গিয়ে এক হাত দিয়ে ভর নিয়ে টপকাল। কোলে নাফিসা, পকেটে আম—কোনোমতে ওপারে নামল। গার্ড দেয়ালের এপারে থেমে গেল।
“ধরতে পারলাম না…” হাঁপাতে হাঁপাতে বিড়বিড় করল।
এদিকে ওপারে,
সায়মানের অবস্থা দেখে নাফিসা হেসে কুটি কুটি,
নিজেকে কোনো রকম সামলে বলে ওঠে,
“ডিএসপি সায়মান তাহের রাশিদ, আপনি কিনা বউয়ের জন্য চোরের খাতায় নাম লেখালেন? পুলিশ হয়ে!”
সায়মান নাফিসাকে নামিয়ে দিল। দুজন হাঁটুতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে।নাফিসার দিকে বিরক্তিতে তাকাই। রাগে মুখ লাল হয়ে গেছে,
সায়মানকে রাগতে দেখে নাফিসা আবার হেসে উঠল।
“হা হা হা!”
“ আপনার মুখটা দেখছিলেন ? কী ভয় পেয়েছিলেন ! এখন বোঝেন আপনি যখন আসামি ধরতে যান আসামির অবস্থা কেমন থাকে। ”
সায়মান হাঁপাতে হাঁপাতে তাকাল।
“ভয়? আমি?”
“হ্যাঁ,”
নাফিসা চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“ আপনি তো আমাকে কোলে নিয়ে অলিম্পিক দৌড় দিচ্ছিলেন !”
সায়মান অসহ্য লাগছে তার মতো একটা পুলিশ অফিসের কিনা শেষে বউয়ের পাল্লায় পড়ে, চুরি করলো।
এদিকে নাফিসা আজ মনে হচ্ছে পুরাই উন্মাদ হয়ে গেছে সে সায়মানের পকেটের দিকে হাত বাড়াল।
“আম দাও।”
সায়মান একটা আম বের করে দিল।
“এই নাও। জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক আম।”
নাফিসা আমটা হাতে নিয়ে আদর করে বলল,
“এই আমের জন্যই আপনি চোর হলেন ।”
সায়মান চোখ ছোট করে তাকাল।
“শুধু চোর না। আজ গার্ডের চোখে আমি ‘কুখ্যাত আম চোর’।”
নাফিসা একটা আম হাতে নিয়ে উঁচুতে তুলে বলল,
“জীবনের সেরা আম।”
সায়মান মাথা নেড়ে বলল,
“জীবনের সবচেয়ে ঝামেলার বউও।”
নাফিসার মুখটা চুপসে গেল, তারপর হঠাৎ গম্ভীর মুখ করে বলল,
“কিন্তু খুব মজা হয়েছে।”
সায়মান ওর মাথায় হাত রেখে বলল,
“মজা হয়েছে ঠিকই… কিন্তু আর কোনোদিন না।”
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬০
নাফিসা চোখ টিপে বলল,
“আগামীবার কাঁঠাল হলে?”
সায়মান হাল ছেড়ে দিল।
“এই বউ আমাকে একদিন নিশ্চিত জেলে পাঠাবে।”

খুব খুব খুব করে অনুরোধ করছি, পরের পর্বগুলো একটু তারাতারি দিন, আর একসাথে যদি সব পর্বগুলো পেয়ে যেতাম তাহলে তো সোঁনায় সোহাগা হয়ে যেতাম।🫶👏🫶
Hea apu ar sojjo hoy nh ❤️🩹
Kobe asbe porer porbo