আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৯
অরাত্রিকা রহমান
সকাল-৭টা~
সূর্যের আলো তীর্যক ভাবে ঘরের ভেতর ঢুকছে। এই বছর বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়েছে ঢাকায় তা আশেপাশের পরিবেশ আর সূর্যের কিরণ দেখেই বোঝা যায়। সকালের মৃদু আলোয় মিরার ঘুম ভাঙলো, মিটিমিটি চোখ খুলে তাকাতেই দেখলো রায়ান এখনো উন্মুক্ত শরীরে তার উপরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ঘুম ঘুম চোখে নিজের কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে এতোটা কাছে আবিষ্কার করে মিরা মুচকি হাসলো তবে পরো মুহূর্তেই তার রাতের কথা মনে পড়লো, তার সাথে নিজের হাসিও লুকিয়ে নিলো। সে আজ ভেবেই নিয়েছে রায়ানের সাথে তেমন কথা বলবে না প্রয়োজন ছাড়া, এমন কি পাত্তাও দেবে না তার কথার।
মিরা রায়ানকে নিজের উপর থেকে সরাতে চেষ্টা করলো কিন্তু এটা তার দ্বারা সম্ভব নয়। মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রায়ানের চুলে হাত রেখে রায়ান কে ডাকলো-
“শুনছেন? উঠুন। সকাল হয়ে গেছে।”
রায়ান চুপ করে আছে, কোনো কথা বলছে না। মিরা আবারো ডাকলো-
“রায়ান.. উঠুন। সকাল হয়েছে তো। আপনার না সাইটে যেতে হবে? কম্পানির অনেক কাজ প্যান্ডিং পড়ে আছে। উঠুন তাড়াতাড়ি।”
রায়ান মাথায় মিরার হাত আর ডাকার আওয়াজে একটু নড়ে উঠলো। ঘুমের ঘোরেই মিরার হাত নিজের মাথা থেকে সরিয়ে আঙুলের ভাঁজে আঙ্গুল দিয়ে মুঠো করে নিলো যেন আর ডাকতে না পারে।
মিরা রায়ানের হাত থেকে হাত সরাতে চেয়েও পারছে না-
“আল্লাহ, একটা মানুষের গ্রিপ ঘুমের ঘোরেও এতো টাইট কিভাবে হয়? উফফফ্!”
মিরা বুঝলো এভাবে হবে না, ভিন্ন কিছু করতে হবে। মিরা একটু চালাকি করতে অন্য হাত দিয়ে রায়ানের উন্মুক্ত পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মিষ্টি কন্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করলো-
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“আমার হাবি কি আরো একটু ঘুমাবে?”
রায়ান মৃদু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
-“কিন্তু সকাল হয়েছে যে, অফিস যেতে হবে না তার?”
রায়ান আবারও হ্যা সূচক মাথা নাড়লো।
রায়ান ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“কয়টা বাজছে এখন?”
রায়ানের কন্ঠস্বরে মিরা বেশ দূর্বল অনুভব করলো। সে জানে না এই আওয়াজে এমন কি আছে যা তার হার্টবিট বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। মিরা ঘড়ি দেখলো।
-“৭.৩০ বাজছে।”
রায়ান মিরার হাত ছেঁড়ে দিয়ে উঠে গেল বিছানা থেকে। হঠাৎ রায়ান বিছানার ছেড়ে এভাবে উঠে যাওয়ায় মিরার রাগ আরো বেড়ে গেল হয়তো- সে আশা করেনি রায়ান এতো তাড়াতাড়ি তাকে ছাড়বে এখন, কিন্তু ছাড়লো। রায়ান সোজা ওয়াস রুমের দিকে গিয়ে আবার কিছু একটা ভেবে বিছানায় ফিরে এসে আধ খোলা চোখেই মিরার কপালে চুমু খেয়ে বলল-
“Good morning Mrs..”
পুনরায় ওয়াস রুমের দিকে চলে গেল ফ্রেশ হতে। মিরা বিছানায় অবাক হয়েই বসে রইল আর রায়ানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল-
“Good morning habby..”
স্নিগ্ধ সকালে মিরা আর রায়ানের ঘরের বিপরীতে ছিল রুদ্র আর রিমির ঘরের পরিবেশ। রুদ্র রিমিকে জড়িয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে আর রিমিও গুটিয়ে আছে রুদ্রর শরীরের সাথে। কোনো কারণে তার বেশ ঠান্ডা লাগছিল তাই। অনেক টা সময় একই ভাবে শুয়ে থাকার পর রিমি ধীরে ধীরে নিজের চোখ খুলল।
আধ খোলা চোখেও নিজেকে কারো খুব কাছে আবিষ্কার করে রিমির গতকাল রাতের কথা মাথায় এলো। এমন একটা পরিস্থিতি থেকে বের হতেও হয়তো সময় লাগবে। রিমি রুদ্রর খুব কাছাকাছি থাকায় রুদ্রর নিঃশ্বাস রিমির মুখে পড়ছিল। রিমির মাথায় কাল রাতের চিন্তা আসতেই যখন সে কারো উপস্থিতি অনুভব করলো নিজের কাছে- অনেকটা ভয় পেয়ে গিয়ে চোখ বড় বড় করে খুলে নেয় আর সামনে কে আছে না দেখেই রুদ্রর বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো-
“না…না.. আমার কাছে আসবেন না। প্লিজ দূরে থাকুন।”
রুদ্র রিমির ধাক্কায় বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে ঘুমের ঘোরে নিজেকে মেঝেতে আবিষ্কার করলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই রিমির চিৎকার তার কানে পৌঁছালো।
-“কি..কি হয়েছে? কি হয়েছে?”
রিমি ভয়ে বিছানার এক কোণে হাঁটু মুড়ে মাথা নিচু করে না সূচক মাথা নাড়তে থেকে বলে যাচ্ছে এক কথা-
“প্লিজ ছেঁড়ে দিন আমায়। কা.. কাছে আসবেন না কেউ।”
রুদ্র মেঝে ছেঁড়ে উঠে একটু চোখ কচলে স্পষ্ট বিছানার দিকে তাকালো। রিমিকে এভাবে ভয় পেতে দেখে সে নিজেও ঘাবড়ে গেলো। তাড়াতাড়ি বিছানার উঠে রিমিকে বোঝানোর চেষ্টা করলো-
“রিমি আমি…আমি রুদ্র। আর কে আসবে? তাকান আমার দিকে। দেখুন আমি ছাড়া কেউ নেই এখানে। আপনি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। আমরা আমাদের বাড়িতে আছি। তাকিয়ে দেখুন।”
রিমি মাথা নিচু করে রেখেই রুদ্র কে নিজের কাছ থেকে সরাতে চাইলো-
“চলে যান এখান থেকে। আমার কাছে আসবেন না। দয়া করুন।”
রিমি হঠাৎ করেই কাঁদতে লাগলো ভয়ে। রুদ্র রিমিকে প্যানিক করতে দেখে রিমিকে শান্ত করতে চাইলো-
“শান্ত হন রিমি। আমি রুদ্র। আমার দিকে তাকিয়ে দেখুন। আমাদের কাল বিয়ে হয়েছে রিমি। আপনি চৌধুরী বাড়ির বউ এখন। কেউ কিচ্ছু করবে না আপনাকে।”
রুদ্র অনেক বোঝানোর পর, রিমি বিয়ের কথা শুনে একটু একটু করে শান্ত হলো। রিমি মাথা উঁচু করে রুদ্রর দিকে তাকাতেই তৎক্ষণাৎ কাঁদতে কাঁদতে রুদ্র কে জড়িয়ে ধরলো। রুদ্র হতবাক- তবে সেও সাথে সাথেই রিমিকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে থাকলো-
“আমি আছি তো। কিচ্ছু হবে না। You are completely safe..চুপ চুপ.. কাঁদে না। সব ঠিক হয়ে গেছে।”
রিমি রুদ্রকে কিছুক্ষণ ওভাবেই জড়িয়ে থাকলো। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর রিমি যখন বুঝতে পারলো সে এখনো রুদ্র কে জড়িয়ে ধরে আছে তৎক্ষণাৎ রুদ্র কে ছেঁড়ে দিয়ে আলাদা হয়ে গেল। রুদ্র ও আর আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলো না। রিমি কাল রাতের হঠাৎ বিয়ের সিদ্ধান্তেও খুব একটা খুশি ছিল না, তার মনে হচ্ছিল সে রুদ্রর জীবন নষ্ট করেছে। রিমি গুটিসুটি মেরে বিছানায় বসে আছে। তার হঠাৎ মাথায় এলো তার সাথে তো রাতে মিরা ছিল তাহলে এখন রুদ্র কেন তার সাথে? রিমি রুদ্র কে উদ্দেশ্য করে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করলো-
“আ..আপনি এই ঘরে কি করছেন? মিরা কোথায়?”
রুদ্র চুপ করে রইল- সে এই প্রশ্নের ভয়ই করছিল। এখন কি উত্তর দেবে সে নিজেও জানে না তাই কিছু বলছেও না। রিমি রুদ্র কে চুপ দেখে আরো রেগে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করলো-
“আপনার আর কি চাই? কেন আমাকে একা ছাড়ছেন না একটু?”
রুদ্র বিছানা থেকে নেমে গিয়ে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে রিমিকে বলল-
“একটু মাফ চাওয়ার ছিল। রাতে বিয়ের জন্য ওভাবে চেঁচিয়ে গালি দিয়ে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। সরি।”
রিমি ঠিক খেয়াল করতে পারলো না রুদ্র কিসের কথা বলছে কিন্তু রুদ্রর কথার সাথে তার প্রশ্নের কোনো সম্পর্ক নেই। রিমি রুদ্র কে নিচে বসে ক্ষমা চাইতে দেখে বলল-
“উঠে দাঁড়ান দেখতে পারছিনা আপনার চেহারা।”
রুদ্র তৎক্ষণাৎ উঠে দাড়াতেই রিমি আবারো জিজ্ঞেস করলো-
“আপনি কখন এসেছেন এই ঘরে আর মিরা কোথায়? আমার সাথে তো মিরা শুয়েছিল, তাহলে আপনি আমার পাশে কিভাবে এলেন?”
রুদ্র রিমিকে অন্যকিছু বলার আগে তাকে নির্দ্বিধায় সব সত্যি সত্যি বলে দিল-
“আপনি ভুল বুঝবেন না প্লিজ আমি কিছু করি নি। সত্যি বলছি। যদিও আমরা স্বামী-স্ত্রী, আমার অধিকার আছে তবুও কিছু করিনি। শুধু মাত্র জড়িয়ে ধরেছি সেটাও আপনি রাতে ভয় পাচ্ছিলেন তাই। আর কয়েকবার ঠোঁট ছুঁইয়েছি কপালে সেটাও আপনার জ্বর এসেছে কিনা দেখতে। বিশ্বাস করুন আর কিছু করি নি।”
রিমি কয়েক বার পলক ফেলে বোঝার চেষ্টা করলো রুদ্র এইমাত্র কি বলল তাকে। রিমি নিজের মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরে নিজের শোনা কথায় নিশ্চিত হতে আবার জিজ্ঞেস করলো-
“শুধু কি কি করেছেন বললেন আপনি?”
রুদ্র নিজের মুখে হাত দিয়ে মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল-
“কিচ্ছু না। কিচ্ছু না।”
-“না না , আবার বলুন। কি করেছেন?”
(বিছানা থেকে উঠে রুদ্রর দিকে এগোতে এগোতে)
-“আমার অফিসে যেতে হবে। আমি বরং যাই এখন। প্রয়োজন হলে মিরা বা আম্মু কে ডাকবেন।”
এই বলে ঘর থেকে চলে যেতে নিলে রিমি পিছু ডেকে বলল-
“আপনাকেই প্রয়োজন। ওখানেই দাঁড়ান।”
কে শুনে কার কথা। রুদ্র আর ওখানে দাঁড়ায় নি। রুদ্র ঘরে থেকে চলে যাওয়ার পর রিমি বিছানা থেকে নেমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। বিয়ের বিষয়টা এতোটা নতুন যে তার ভাবতেও কেমন কেমন লাগছে যে রুদ্র তাকে ছুঁয়েছে তাও সম্পূর্ণ অধিকার নিয়ে।
অন্যদিকে সকাল আটটার পর থেকে সোরায়ার ফোন বেজে যাচ্ছে বারবার। বিরক্ত হয়ে সোরা নিজের ফোনটা ঘুমের মধ্যেই তুলে নিয়ে কানে রেখে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল-
“হ্যালো কে? সকাল সকাল কল করেছেন কোনো সেন্স নেই নাকি?”
অপর পাশ থেকে কোনো পরিচিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো-
“৫মিনিটের মধ্যে কলেজের জন্য রেডি হয়ে নিচে না নামলে আমি উপরে উঠে যাবো।”
তারপরই কলটা কেটে গেল। সোরা কথাটা শুনতেই ফোনের স্ক্রিনে তাকালো-
“কে রে এইটাআআ…?”
চট করে চোখ খুলে বিছানায় উঠে বসে ভালো করে খেয়াল করে দেখলো মাহিরের নাম্বার ভাসছে। তার মানে মাহির কল করেছে। সোরা ফোন খেয়াল করে দেখলো কাল রাত থেকে কম করে ৫০টা মেসেজ মাহির অথচ সে ঘুমিয়ে গেছিল। রুদ্র আর রিমির বিষয়টার পর এমনি অনেক রাত হয়ে গেছিল আর এর আগে সারা দিনের জার্নি তে ক্লান্ত দেহ বিছানায় যাওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে গেছে। সোরা জিভ কামড়ে বিছানার থেকে নেমে দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে নিচে উঁকি দিয়ে দেখলো মাহির তার গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোরা বারান্দায় আসতেই মাহির উপরে তাকায়। সোরা মাহির কে দেখে মনে মনে ভয় পাচ্ছিল।
-“এতো গম্ভীর মুখ কেন ওনার? রেগে আছে আমার উপর? আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম তাই মেসেজ দেখি নি। রুদ্র ভাইয়ার ব্যাপারে ও তো জানেন না উনি। এবার কি হবে?”
মাহির নিজের হাতের ঘড়িতে আঙুল দেখিয়ে সোরাকে টাইমের কথা মনে করিয়ে দিতেই সোরা দৌড়ে ঘরের ভিতর গিয়ে কলেজ ড্রেস নিয়ে সোজা ওয়াশ রুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে।
রায়ান শাওয়ার নিয়ে আসার পর থেকে মিরাকে ঘরে দেখে নি। বিছানার উপরে সব গোছানো ছিল- শার্ট, কোর্ট, টাই, ঘড়ি, রুমাল, ওয়ালেট সব…! রায়ান নিজের মতো করে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা ও করেছে কিন্তু মিরা ঘরে আসেনি। কিন্তু রায়ানের চোখ তখনও মিরাকেই খুঁজছে। রায়ান সব শেষে নিজের হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বিড়বিড় করলো-
“অদ্ভুত..কোথায় গেছে ও! এখনো আসার নাম নেই।”
রায়ান মোজা পড়তে বিছানায় বসতেই মিরা রায়ানের জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে এসে সাইট টেবিলের উপর রেখে বলল-
“আপনার কফি। যাওয়ার আগে খেয়ে নিবেন নিচে টেবিলে নাস্তা দিয়ে এসেছি।”
এই বলে সোজা ওয়াশ রুমে চলে গেল। রায়ানের দিকে একবার তাকায়ও নি অন্য কিছু বলেও নি। রায়ান স্পষ্ট বুঝতে পারছে মিরা ইচ্ছে করে তাকে ইগনোর করছে। কিন্তু কারণটা আসলে কি সেটা নিয়ে সে কনফিউজড- কাল রাতের জন্য নাকি আজ সকালের জন্য! রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিটা খেলো। আর ঘরেই ল্যাপটপ নিয়ে বসে কাজ গুলো সব গুছিয়ে নিতে লাগলো, নাস্তা করতে আর নিচে যায় নি।
মিরা একটু পর ফ্রেশ হয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। রায়ান মিরার দিকে দেখলো কিন্তু মিরা সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। রায়ান চেয়েও আর ল্যাপটপে মন দিতে পারছে না। রায়ান ইচ্ছে করে নিজের পড়া টাইটা টেনে নষ্ট করে মিরাকে ডেকে বলল-
“মিরা…আমার টাইটা ঠিক করে দেও তো।”
মিরা এখনো রায়ানের দিকে তাকালো না উল্টো নিজের কাজ করতে করতেই বলল-
“যেভাবে ঠিক হবে ওভাবে ঠিক করে নিন। আমি ব্যস্ত আছি।”
রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো-
“সে তো দেখতেই পাচ্ছি খুব ব্যস্ততা আপনার।”
রায়ানও উল্টো ল্যাপটপের দিকে মন দিয়ে বলল-
“প্লিজ আসো না একটু। একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ দেখছি আমি। পারছিনা এখন নিজে নিজে ঠিক করতে।”
মিরা বারান্দায় গিয়ে নিজের হাতের টাওয়াল টা রৌদ্রে দিয়ে সোজা রায়ানের কাছে যায়। রায়ান ল্যাপটপ রেখে মিরার দিকে তাকায় কিন্তু মিরা এখনো শুধু এলোমেলো টাই টার দিকে দেখছে। মিরা নিজের মতো টাইটা গুছিয়ে দিয়ে রায়ানের থেকে সরে যেতে চাইলে রায়ান একহাতে মিরার কোমর পেঁচিয়ে ধরে মিরাকে এক ঝটকায় বিছানায় ফেলে দিয়ে নিজে তার উপরে এলো। আকস্মিক ঘটনায় মিরা অবাক হয়ে রায়ানের বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে বলল-
“হচ্ছে টা কি..! ছাড়ুন আমাকে।”
রায়ান খেয়াল করছে মিরা আশে পাশে দেখছে কিন্তু এখনো তার দিকে তাকাচ্ছে না। রায়ানের এখন বিষয় টা বেশ বিরক্তিকর লাগছে। সে মিরার চোয়াল আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নরম গলায় প্রশ্ন করলো-
“আমার পাখি কি আমার উপর রেগে আছে?”
মিরা সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল-“না,রেগে থাকবো কেন?”
রায়ান আবারও মিরাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল-
“রেগে না থাকলে এভাবে পানিসমেন্ট দিচ্ছো কেন?”
মিরা চোখ চোখ মেলাতে নারাজ তাই চোখে চোখ না রেখে গম্ভীর গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো- “কিসের পানিসমেন্ট?”
রায়ান একটু কাতর গলায় বলল-
“সবকিছু দেখছো শুধু আমাকে ছাড়া, এটা কি ধরনের পানিসম্যান্ট?”
মিরা এবার রায়ানের দিকে তাকালো কিন্তু কিছু বলছে না। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করলো নিজে থেকে-
“রাতের জন্য রেগে আছো?”
মিরা চোখ ঘুরিয়ে নিলে রায়ান স্বাভাবিক ভাবে বলল-
“বউ থাকতে আমি কেন বালিশে মাথা রেখে ঘুমাবো বলতে পারো?”
মিরা ছোট ছোট চোখ করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে পড়ে থাকা জামা কাঁধের দিকে থেকে একটু নামিয়ে গলা, কাঁধ থেকে বুক অব্দি একগুচ্ছ কালো দাগ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল-
“তাই তো, বালিশ তো মানুষের জন্য আপনার মতো রাক্ষসের জন্য না।”
রায়ান দাগ গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলো- সত্যি খুব অমানবিক কাজ মনে হচ্ছে দাগ গুলো দেখে। রায়ান আলতো হাতে দাগ গুলো তে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল ছুঁইয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“এগুলো ৩দিন আগের দাগ। অথচ এখনো শুকায় নি। কেন? যেই মলমটা এনে দিয়েছিলাম লাগিয়েছিলে?”
মিরা নাসূচক মাথা নেড়ে নিজের জামা কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে নরম গলায় বলল-
“উঁহু, ওটা আনতে মনে নেই আমার। রেখে চলে এসেছি। প্রথম দিন, আপনি দিয়ে দেওয়ার পর আর দেওয়া হয় নি। মনে ছিল না।”
রায়ান গম্ভীর গলায় বলল-
“তাহলে তিন দিন আগের দাগ দেখিয়ে এখন আমাকে কথা শোনানোর মানে কি! রাক্ষস হলে প্রতিদিন তরতাজা কামড়ের দাগ শরীরে নিয়ে ঘুরতে।”
মিরা তো এমনি বলছিল, এখন তো আর দাগ গুলো তে ব্যাথাও করে না। মূলত তার রাগ কাল রায়ান তাকে জোর করে চুমু খেয়েছে আর সকালে তার ছাড়তে বলার সাথে সাথে ছেড়ে দিয়েছে, এই নিয়ে। মিরা রায়ানের থেকে মুখ ফিরায়ে নিলে রায়ান আলতোভাবে মিরার জামা তার কাঁধ থেকে নামাতে উদ্যত হয়। মিরা তৎক্ষণাৎ রায়ানের হাত ধরে ফেলে-
“কি করছেন আপনি? আমি মাত্র শাওয়ার নিয়েছি।”
-“চুপ, আমি কি বলেছি, আবার শাওয়ার নেওয়াবো? যেই না শরীর, ইচ্ছে থাকলেও দিনে চার পাঁচ বার শাওয়ার নেওয়াতে পারবো না তোমাকে। পরে দেখা যাবে নিউমোনিয়া হয়ে গেছে।”
কথাটা বলে মিরার কাঁধ থেকে জামা নামিয়ে নিলো। মিরা আর কিছু বলল না। রায়ান মিরার গলা আর কাঁধে দিকে ঝুঁকে গিয়ে দাগ গুলোর উপর পরম আদরে ছোট ছোট চুমু দিতে থাকলো। মিরার সম্পূর্ণ শরীর আবেশে কাঁপছে, দুই চোখ বন্ধ করে এক হাতে বিছানার চাদর অন্য হাতে রায়ানের কোর্ট আঁকড়ে ধরে আছে। রায়ান মিরার ভেজা চুল ও গলায় দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বলল-
“এই দাগ গুলো যেন কেউ দেখতে না পায় হৃদপাখি। এগুলো দেখার অধিকার শুধু আমার। মনে থাকবে?”
মিরার সম্পূর্ণ শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। মৃদু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো মেয়ে টা। রায়ান বাঁকা হেঁসে গলা থেকে হালকা নিচে নেমে এসে বুকের উপর ঠোঁট ছুঁইয়ে আদর করে বলল-
“I can’t express how great it feels to see my mark on you baby… You look like totally mine..”
মিরা কিছু বলার অবস্থায় নেই কিন্তু রায়ান নিজেকে হারাতে বসেছে। রায়ান নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে নিজের মুখ তুলে মিরার দিকে তাকালো, মেয়েটাকে চোখ বন্ধ করে থাকতে দেখে তার অবাধ্য মন কেন যেন আরো উতলা হচ্ছে। রায়ান মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“চোখ খোলো পাখি। আমি নিতে পারছি না। তোমাকে এভাবে দেখলে আমার খুব আদর আদর পায়।”
মিরা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে চোখ দুটো খুলল, রায়ানের চোখে চোখ রাখতে চাইছে না। রায়ান মিরাকে কিছু বলতে না দেখে হঠাৎ নিজের টাই খুলতে খুলতে বলল-
“যদি কথা বলার ইচ্ছে না থাকে তাহলে চলো কিছু করা যাক।”
মিরা তৎক্ষণাৎ রায়ানের দিকে তাকিয়ে তার হাত ধরে ফেলে মায়াবী মুখ করে তাকিয়ে বলল-
“আপনি একটু আগেই বলেছেন কিছু করবেন না।”
মিরা কথা বলার পর রায়ান টাই ছেঁড়ে দিয়ে মিরার ঠোঁটের উপর আঙ্গুল দিয়ে স্লাইড করতে লাগলো। নিচের ঠোঁট টা লাল হয়ে একটু ফুলে আছে- হয়তো কাল রাতের ফল। রায়ান শান্ত গলায় আবদার করলো-
“Can I have a morning kiss? সারাদিন অনেক কাজ থাকবে, এনার্জি দরকার।”
মিরা আবার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল-
“ঢং দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে না। রায়ান চৌধুরী আমার অনুমতির তোয়াক্কা করে বলে আমার মনে হয় না।”
রায়ান চুপচাপ উঠে যায় মিরার উপর থেকে। মিরা একটু অবাক হয়ে দেখলো রায়ান কে। রায়ান আয়নার সামনে গিয়ে টাই আবার নিজে ঠিক করে, ল্যাপটপ টা নিয়ে নিচে চলে গেল। এইদিকে মিরা এখনো বিছানায় চুপ করে বসে আছে হা হয়ে-
“উনি কি আমার উপর রাগ করে চলে গেলেন? আমি না করেছিলাম নাকি? ধুর..সব সময় রাগ দেখাতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে যাই। কি ধুরোনধোর এই লোক..!”
মিরাও রায়ানের পিছন পিছন নিচে দৌড়ে চলে আসে নিচে।
প্রায় ১৫ মিনিট পর সোরা ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো তাড়াহুড়ো করে কলেজে যাবে বলে। নাস্তা করার সময় নেই তার মাহির এমনি তাকে দিয়েছিল ৫মিনিট অথচ এখন প্রায় ১৫ ২০ মিনিট হয়ে গেছে। সোরা সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি নেমে বাড়ি থেকে বের হতে সদর দরজার দিকে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলল-
“মামণি, আপু..আমি কলেজে গেলাম।”
রামিলা চৌধুরী চেঁচিয়ে বললেন-
“নাস্তা খেয়ে তার পর যা।”
সোরা জুতা বের করে রেখতে রাখতে বলল-
“দেরি হয়ে গেছে মামণি। নাস্তা আজ খেতে পারবো না। ফার্স্ট ক্লাস মিস হয়ে যাবে।”
মিরা জোরে চেঁচিয়ে বলল-
“তোর ক্লাস টিচার এখানে ক্লাস নেবে টা কে শুনি যে মিস হয়ে যাবে?”
সোরা থেমে গিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকালো- মিরা চেয়ারে বসে থাকা মাহিরের দিকে ইশারা করে বলল-
“ক্লাস নেওয়ার মানুষই এখানে বসা। চুপ চাপ খেতে বসে যা।”
সোরা মাহিরের দিকে তাকালো মাহির চোখ টিপে সোরা কে টেবিলের এসে বসে ইশারা করলো। সোরা অবাক হয়ে শুকনো ঢোক গিলে ধীর পায়ে টেবিলের কাছে গেলে। মাহিরের সামনাসামনি বিপরীতের চেয়ারটা টেনে বসলো। মাহিরের পাশের চেয়ারেই রায়ান বসা। মাহির কে সোরার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল-
“উমমম্…নজর সামলে।”
মাহির উল্টো ফোড়ন কেটে বলল-
“তুইও তোর বউকে দেখ। কেউ কি কিছু বলছে?”
-“সোরা তোর বউ না।”
-“হতে কতক্ষন?”
রায়ান আর কথা বাড়ালো না। এর মাঝেই রুদ্র নিচে নামলো অফিসে যাবে বলে। রুদ্র নিচে নামতেই রায়হান চৌধুরী রুদ্র কে রিমির কথা জিজ্ঞেস করলেন-
“রুদ্র…বউ মা কোথায়?”
রুদ্র কিছু বলার আগেই মাহির মিরাকে দেখিয়ে বলল-
“এই যে, ভাবি তো এখানেই আংকেল।”
রায়হান চৌধুরী সহ সকলের মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির এক এক করে সবার নজর খেয়াল করলো। তখনি রিমি নিচে নেমে এলো। রিমি দেখে মাহিরের চোখে অদ্ভুত সন্দেহ নিয়ে রিমির দিকে তাকালো-
“রিমি…তুমি এখানে? কাল বাড়ি যাও নি?”
রিমি সবার উপস্থিতিতে একটু ইতস্তত বোধ করলো। কি করবে বা কি বলবে কিছুই মাথায় ঢুকছে না তার। মিরা গিয়ে রিমিকে নিয়ে সবার সামনে এনে দাঁড়া করালে রিমি রায়হান চৌধুরী ও রামিলা চৌধুরীকে উদ্দেশ্যে করে সালাম দিলো-
“আসসালামুয়ালাইকুম মামণি, আসসালামুয়ালাইকুম বাবা।”
রামিলা চৌধুরী ও রায়হান চৌধুরী এক সাথে -“ওয়ালাইকুম আসসালাম মা।”
মাহির এখনো বুঝতে পারছে না রিমি চৌধুরী বাড়িতে কি করছে। রায়ান মাহিরের হা হয়ে থাকা মুখ দেখে শান্ত গলায় বলল-
“ভাই আমার করে দেখিয়েছে। এখন রিমিকে ভাই বউ হিসেবেই দেখছি আমরা। I am so proud..”
মাহির রায়ানের কথায় আরো অবাক হলো। কয়েক সেকেন্ড নিলো সবটা মাথায় প্রসেস করতে। পুরোটা বিষয় নিজের মাথায় চিন্তা করে মাহির বড় বড় চোখ করে পর পর রুদ্র আর রিমির দিকে তাকালো। রুদ্র নিজের থেকে এগিয়ে এসে রিমির পাশে দাঁড়িয়ে রিমির হাত শক্ত করে ধরে পরিচয় করিয়ে দিল রিমিকে নতুন করে-
“মাহির ভাই, She is my wife, চৌধুরী বাড়ির ছোট বউ রিমি চৌধুরী। আমি জানি খবরটা অনেক সাডেন কিন্তু হঠাৎ করেই হয়ে গেছে।”
রিমি রুদ্রর দিকে ছাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে। মাহির এটা শুনেই সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো-
“কিহ্! কবে থেকে? কখন থেকে? কিভাবে?”
উপস্থিত সবাই মুখ টিপে হাসলো মাহিরের প্রতিক্রিয়া দেখে। রিমি লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলো। রুদ্র নিজের হাতে রিমির হাতের বাঁধনে হঠাৎ জোর দেখে বুঝতে পারলো রিমির অস্বস্তি হচ্ছে। রুদ্র মাহির কে শান্ত করতে বলল-
“মাহির ভাই, তুমি হাইপার হইও না প্লিজ। আমি তোমাকে পরে সব বুঝিয়ে বলব এখন খেতে বসো।”
রুদ্র মাহির কে বসতে বলে রিমিকে নিয়ে গিয়ে বসালো মিরার পাশে আর নিজে গিয়ে মাহিরের পাশে বসলো। মাহির এখন শোক খেয়ে রুদ্র আর রিমিকে দেখে যাচ্ছে। রায়ান মাহিরকে নাস্তা এগিয়ে দিয়ে বলল-
“তোর ছোট হয়েও খেলে গেল আমার ভাই। কি করলি জীবনে?”
এই বলে মাহির কে উদ্দেশ্যে করে বাঁকা হাসলো। মাহির বেশ বিরক্ত হয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে তার মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
“বেয়াদব।”
রুদ্র হঠাৎ আক্রমণে হতভম্ব হয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল। সবাই এদের কান্ড দেখে হেসে উঠলো। এরপর রামিলা চৌধুরী সবাইকে খাবার পরিবেশন করে নিজেও খেতে বসলেন। মিরা রিমির দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর রিমি মিরাকে জিজ্ঞেস করলো-
“রাতে কোথায় গিয়ে ছিলিস তুই?”
মিরা একটু বোকা বোকা ভাব ধরে রিমির কানে কানে মজা নিতে বলল-
“সেই উত্তর না হয় পরে দেবো। আগে বল তো তোর চুল ভেজা কেন? কি করেছিস আমার অনুপস্থিতিতে?”
রিমি চোখ ছোট ছোট করে মিরাকে ও উল্টো বলল-
“চুল তো তোর ও ভেজে। তুই কি এমন করেছিস যে সকাল সকাল শাওয়ার নিতে হয়েছে?”
মিরা রিমিকে ভেঙিয়ে খাওয়ার দিকে নজর দিলে রিমিও তাই করলো। এইদিকে মাহির আর সোরা একে অপরের সাথে ইশারায় কি কথা বলছে তা কারো চোখে পড়ছে না। এমন কি সোরা নিজেও বুঝতে পারছে না মাহির কি বলতে চাইছে তাই অবশেষে সেই দিকে আর নজর দিল না যদি কেউ খেয়াল করে এই ভেবে। কিন্তু মাহির বিরক্ত হয়ে সোরার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে টেবিলের নিচে থেকে বিপরীতে বসা সোরার পায়ে পা দিয়ে আঘাত করলো। সোরা ঘাবড়ে গিয়ে চোখ বড় বড় করে মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির সোরার প্রতিক্রিয়া দেখে হাসলে সোরা ও একই কাজ করে পা দিয়ে। মাহির আবারো সেই কাজ করে। কয়েকবার এভাবে চলার পর মাহির নিজের পা নিজের জায়গা থেকে সরিয়ে নেয় যেন সোরার পা আর না লাগে। কিন্তু এবার সোরা পা মারতে গিয়ে সেখানে মাহিরের পা না পেয়ে ভুলে রুদ্রর পায়ে পা লাগিয়ে দেয়। রুদ্র হঠাৎ পায়ে অন্য কারো পায়ের ছোঁয়া পেয়ে নিজের বিপরীতে বসা রিমির দিকে তাকালো।
-“এটা কি রিমি ছিল..উনি কি কিছু বলবেন?” (মনে মনে ভাবলো)
রুদ্র রিমির দিকে তাকিয়ে ছিল বলে রিমিও প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে রুদ্রর দিকে তাকায়। রুদ্র ভ্রু উঁচিয়ে রিমিকে ইশারা করলে রিমি কিছু বুঝলো না। রুদ্র ও পরে রিমির পায়ে পা ছোঁয়ালে রিমি টেবিলের নিচে তাকিয়ে দেখলো রুদ্র তার পায়ে পা দিয়েছে। রিমি একটু ইতস্তত বোধ করে মাথা নিচু করে নিলো। রুদ্র আবারো এক কাজ করলে রিমি নিজের পা গুটিয়ে নেয়। রুদ্র রিমির তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে আবারও জোরে পা মারলে পা মিরার পায়ে লাগলো। মিরা চমকে উঠে রায়ানের দিকে তাকালো কিন্তু রায়ান নিজের বোনের দিকে তাকিয়ে নিজের ই-মেইল চেক করছিল। মিরা বাকিদের দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করলো-
“তখন জেদ দেখিয়ে চলে এলো এখন আবার পা দিচ্ছে আমার পায়ে। কি অসভ্য লোক।”
মিরা দাঁতে দাঁত চেপে রায়ানের পায়ে লাথি মারলে রায়ান হঠাৎ কেঁপে উঠলো- “আউউ!”
রামিলা চৌধুরী রায়ানের আওয়াজ শুনে জিজ্ঞেস করলেন –
“কি হলো?”
রায়ান প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকালো। মিরা কোনো পাত্তা না দিয়ে খাওয়ার দিকে মন দিল। রায়ান বুঝতে পারলো না কেন মিরা এমন করলো হঠাৎ। এমন সময় হঠাৎ রায়ানের ফোনে কল এলে রায়ান সাথে সাথে কলটা রিসিভ করে কথা বলতে শুরু করে আর তার মাঝেই নিজের কোর্ট টা হাতে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-
“আমি আসছি।”
রামিলা চৌধুরী প্রশ্ন করলেন-“ও মা কি হয়েছে, খাবার টা শেষ করে যা।”
-“সাইটে ইমার্জেন্সি হয়েছে আম্মু। যেতে হবে। পরে খেয়ে নিব। আসি।”
রায়ান সদর দরজায় গিয়ে জুতা পড়তে লাগলো। মিরা শুধু তাকিয়ে আছে রায়ানের দিকে। রায়ানের চলে যাওয়া তার ভালো লাগছে না আবার থামাতেও পারছে না তাকে। রায়ান জুতা পড়া শেষ করে জোরে চেঁচিয়ে ডাকলো-
“হৃদপাখি… এখানে এসো একটু।”
সবাই মিরার দিকে তাকালো। মিরা একটু ইতস্তত বোধ করলো। রায়ান মিরাকে আস্তে না দেখে আবার চেঁচিয়ে উঠলো-
“আমি ডাকছি। কানে যাচ্ছে না?”
রিমি মিরার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল-“যাচ্ছিস না কেন? যা না।”
মিরা চেয়ার থেকে উঠে তাড়াতাড়ি করে রায়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো লক্ষ্মী মেয়ের মতো।
-“প্রথমবার ডাক শুনতে পাও নি?”
মিরা মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। রায়ান আর কিছু না বলে মিরার হাত ধরে বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়ে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাড়াঁ করালো।
-“কিছু বলবেন?”
মিরা একটু ভয়ে প্রশ্ন করলে রায়ান মিরার কোমর এক হাতে জড়িয়ে ধরে বলল-
“ঘরে কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তর পাই নি। এখন বলো, উত্তর কি আদতেও পাবো, নাকি ধরে নিবো এখন থেকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনই নাই?”
মিরা রায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতির গম্ভীরতা বুঝতে পারলো। তার কিছু বলার ছিল না তাই চোখ বন্ধ করে নিজের পায়ের উপর ভর দিয়ে রায়ানের ঠোঁটের দিকে নিজের ঠোঁট এগিয়ে দিল। রায়ান মিরার কান্ড দেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বলল-
“মুখে বলো।”
মিরা ওই ভাবে চোখ খুলে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো-
“কি বলবো?”
-“Can I have a kiss?”
রায়ান ভালো করেই জানে মিরা মুখে ব্যক্ত করতে পারে না এসব তাও ইচ্ছে করে এমন করে মিরার লজ্জা ভাঙতে। মিরা চোখ খুলে তাকিয়ে লজ্জায় আবার নিজের পা জমিনে রেখে দাঁড়িয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
“Actions speaks louder than words. মুখে বলতে হবে কেন?”
রায়ান মিরার দিকে ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করলো-
“Are you saying that I can also show what I want by my actions?”
মিরা রায়ানের দিকে অবাক চোখে তাকালে রায়ান মিরাকে দেখে হেসে ফেললো। মিরা মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলে রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার থুতনি ধরে নিজের মুখমুখি করে ঘুরিয়ে বলল-
“দেখি। অনেক হয়েছে, আর পারছি না। Fu** the ans..”
রায়ান মিরার মুখটা উঁচু করে নিয়ে মিরার ঠোঁট নিজের আয়ত্তে নিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর মেয়েটার ঠোঁট জোড়া মুক্তি দিয়ে বলল-
“ফিরতে রাত হবে। সবার সাথে খেয়ে নিও কেমন। কোনো দরকার পড়লে কল করবে। বুঝেছ?”
মিরা মাথা নিচু করে নিয়ে নীরবে থেকে ঘাড় কাত করে বলল-
“আচ্ছা।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার মুখটা নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে বলল-
“আর কত লজ্জা দেখবো তোমার কে জানে। লজ্জা পেলে তোমাকে বড্ড আদুরে লাগে হৃদপাখি।”
তারপরই মিরার কাঁধে মাথা নুইয়ে দিয়ে বলল-
“It’s hard for me to hold back.. I can’t even explain..”
মিরা বড় নিশ্বাস নিয়ে মুচকি হেসে রায়ান মাথায় আর পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-
“You don’t have to.. I understand..সাবধানে যাবেন। আমি অপেক্ষায় থাকবো।”
রায়ান মুখ তুলে মিরাযর সম্পূর্ণ মুখে ছোট্ট ছোট্ট চুমু খেয়ে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল। রায়ানের বেরিয়ে যাওয়ার পর পরই রুদ্র আর রায়হান চৌধুরী ও বেরিয়ে গেল অফিসের উদ্দেশ্যে। সাথে মাহির ও সোরা কে নিজের গাড়িতে উঠতে বলল কলেজের যাওয়ার জন্য। যেহেতু একই গন্তব্য মিরা অন্য কিছু ভাবেও নি।
গাড়ি নিজ গতিতে ছুটছে মাহিরের। সোরা চুপচাপ বসে বসে বই পড়ছে। মাহির আড় চোখে সোরা কে মন দিয়ে বই পড়তে দেখে কৌতূহলী হচ্ছে। কিছু সময় পার হওয়ার পর মাহির নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করলো-
“এতো মন দিয়ে কি পড়ছো?”
সোরা সাথে সাথে বই বন্ধ করে দিয়ে চট করে বইটা ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে বানোয়াট হেঁসে বলল-
“কই তেমন কিছু না একটা বই পড়ছিলাম।”
মাহির ভ্রু কুঁচকে সোরার দিকে তাকালো। হঠাৎ এমনভাবে বই লুকিয়ে ফেলার মতো কি হলো তার মাথায় ঢুকলো না। কিন্তু তবুও স্বাভাবিক ভাবেই বলল-
“হুম, বই তো দেখলাম। কি বই ছিল?”
সোরা আমতা আমতা করে বলল-
“বই..বই তো বই ই। কি বই আবার কেমন প্রশ্ন?”
-“আমতা আমতা করছো কেন? সাধারণ একটা প্রশ্ন। কি বই পড়ছিলেন তাই তো জিজ্ঞেস করলাম।”
সোরা কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলল-
“একটা গল্পের বই। উপন্যাস… সুন্দর অনেক।”
-“হুম, বুঝলাম। রোমান্টিক?”
সোরা মাহিরের প্রশ্ন সূচক কন্ঠে রোমান্টিক শব্দ টা শুনে কাঁশতে শুরু করলো। মাহির সোরাকে তার প্রশ্নে কাঁশতে দেখে
ঠোঁট কামড়ে হেঁসে আবার জিজ্ঞেস করলো-
“ডার্ক রোমান্স?”
সোরা আরো জোরে কাঁশতে শুরু করলো। মাহির একটু চিন্তিত হয়ে পানির বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বলল-
“হয়েছে হয়েছে। পানি খাও।”
সোরা পানি খেয়ে একটু স্থির হয়ে বসলে মাথা নিচু করে না খুঁটতে খুঁটতে বলল-
“ডার্ক না, সফ্ট রোমান্স।”
-“ওহ্, আচ্ছা। soft huh! Do you like that?” i mean do you like reading soft romance…”
-“উঁহু, ডার্ক..না. আর হ্যাঁ। yes I do like reading…গল্পে এগুলো খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা।”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৮ (২)
“I can do better than books..
-“কি বললেন..?”
-“কিছু না। বই পড়া ভালো। বেশি করে পড়বে।”
সোরা বেশ উৎসাহী মনে মাহিরের দিকে ঘুরে বলল-
“সত্যি? তাহলে আমাকে আরো কয়েকটা বই দেবেন?”
মাহির মুচকি হেঁসে সোরার মাথায় হাত দিয়ে ট্যাপ করে বলল-
“Anything my princess wants..”
সোরাও মাহিরের কথায় মিষ্টি হেসে সোজা হয়ে বসলো।
