আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬১
অরাত্রিকা রহমান
ঢাকায় এখন প্রতিদিনই হালকা কুয়াশায় ঢাকা সকাল দেখা যায়, আজও তেমনি একটা সকাল। গতদিনে নিদ্রাহীন রাত পাড় করার পর রায়ান আর মিরা একে অন্যের সাথে লেপ্টে শুয়ে আছে বিছানায়, দুজনের মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করলে মিরার ঘুম ভাঙে। বরাবরের মতো রায়ান নিশ্চিতে তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মিরা রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছেলেটাকে দেখে যাচ্ছে। তার মাথায় রাতের দৃশ্য গুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। সে তাদের প্রথম রাত আর গত রাতের রায়ান কে গুলিয়ে ফেলছে বারবার। মিরা মুচকি হেঁসে রায়ানের মাথায় চুমু দিয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এতো যত্ন করে আদর করার কারণ কি, হুম?”
মিরা কোনো জবাবের আশা করেনি যেহেতু রায়ান ঘুমাচ্ছে তবে রায়ান ঘুমের ঘোরেই আড়ষ্ট গলায় জবাব দিলো-
“ভালোবাসি।”
মিরা অবাক হয়ে রায়ানের দিকে দেখলো এমন সহজ উত্তর শুনে, কিন্তু রায়ান এখন চোখ বন্ধ করেই আছে। মিরা একটু প্রসস্থ হেঁসে বলল-
“ভালোবাসি টু।”
রায়ান আরো শক্ত করে মিরার কোমর জড়িয়ে ধরলে মিরা একটু ছটফট করে বলল-
“ছেঁড়ে দিন না এখন। সকাল হয়েছে উঠুন।”
রায়ান মাথা স্পষ্ট না সূচক নাড়িয়ে নিজের মত দিল-
“আমার ঘুম হয়নি এখনো আমি আরো ঘুমাবো। শুয়ে থাকো আমার সাথে।”
-“আপনি ঘুমান তাহলে আমাকে ছাড়ুন। আমি ফ্রেশ হবো। এভাবে আর কতক্ষন থাকবো বলুন?”
-“এভাবেই আরাম লাগছে আমার। এলোমেলো তুমি টাই আমার জন্য বেস্ট। এখন চুপচাপ আমার সাথে শুয়ে থাকো। পরে একসাথে ফ্রেশ হবো।”
একসাথে ফ্রেশ হওয়ার কথায় মিরার বুকে ভয় জমলো। মিরা শুকনো ঢোক গিলে রায়ানের থেকে ছাড়া পেতে অযুহাত দিলো-
“আমার ওয়াশ রুমে যেতে হবে। ছাড়ুন প্লিজ।”
রায়ান বাধ্য হয়ে মিরার উপর থেকে সরে গিয়ে বিছানার অন্য দিকে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। আর বালিশে মুখ গুঁজে বিরক্ত হয়ে বলল-
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ভুলেও একা শাওয়ার নেবে না।”
-“যদি নিই তো ?”
-“সকাল সকাল দুবার শাওয়ার নেওয়ার শখ থাকলে go for it…ভালো কথায় ছাড়ছি, তাড়াতাড়ি আসবে। এই বালিশ আমার ভালো লাগে না।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রায়ানের উন্মুক্ত পিঠে তাকাতেই নিজের নখের আঁচড় দেখে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে নিজে বিছানা থেকে নামলো। চোখে মুখে লজ্জার ছাপ স্পষ্ট, বিছানা থেকে নামতেই দুই পায়ের ঊরুতে হালকা ব্যাথা অনুভব হলো তবে পাত্তা না দিয়ে মিরা শক্ত থেকে রাতের পরিহিত জামাকাপড় ফ্লোর থেকে তুলে ওয়াশ রুমে চলে গেলো।
প্রায় আধা ঘন্টা পরে মিরা একেবারে শাওয়ার নিয়ে বের হয় ওয়ারুম থেকে। এতে রায়ানের হুমকি যে তার গায়ে লাগে নি ভালোই বোঝা গেল। এর মাঝে রায়ান কখন ঘুমিয়ে গেছিল সে নিজেও জানে না। মিরা পড়ার জন্য কোনো জামাকাপড় ওয়াশ রুমে নিয়ে যেতে ভুলে গেছিল তাড়াহুড়ো তে। তাই টাওয়াল পেঁচিয়ে ঘরে আসতে হয়েছে। মিরা আলমারি খুলে নিজের জামা কাপড় বের করলো। আলমারি লাগিয়ে আয়নায় তাকিয়ে দেখলো আজও গলা, কাঁধ আর বুকের উপরের অংশে বেশ কয়েকটা লালচে দাগ। মিরা ওইগুলো তে আঙ্গুল বুলিয়ে আয়নার মধ্যে দিয়েই বিছানায় রায়ানের দিকে তাকালো আর বিড়বিড় করলো।
-“রক্তচোষা বাদুড় একটা।”
মিরা পুনরায় নিজের দিকে মন দিয়ে আলমারি লাগিয়ে দিয়ে নিজের ইনার টা হাতে নিল। বুকে সুপ্ত ব্যাথার দরুন বিরক্ত মুখে নিজে নিজে বলল-
“মেয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছি বলে এতো জ্বালা। আমার এইসব ইনার পড়তে অসহ্যকর লাগে।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই পিছন থেকে রায়ানও একই বিরক্ত মুখে বলল-
“আমারও অসহ্য লাগে। এসব পড়া বাদ দাও, আমার হাত কবে কাজে আসবে। I can hold them..”
রায়ানের গলা কানে আসতেই মিরা চমকে উঠলো। একটু আগেও মিরা রায়ানকে শুয়ে থাকতে দেখেছে এখন আবার কথা কে বলছে! মিরা চটজলদি বিছানার দিকে তাকাতেই দেখলো রায়ান উলঙ্গ শরীরে বিছানার হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বসে মিরাকে পলকহীন ভাবে দেখে যাচ্ছে। মিরা তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে নিজের শরীরে হাতে থাকা জামা কাপড় এলোমেলো করে জরিয়ে নিলো-
“আআআআ…আপনি কখন উঠলেন?”
রায়ান মিরার চিৎকার শুনে নিজের কানে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“হৃদপাখি ধীরে! সকাল সকাল এতো জোরে চিৎকার করে আমাকে বদনাম কেন করছো? কিছু তো করিও নি এখন।”
মিরা রায়ানের কথায় সাথে সাথে চুপ হয়ে গেলে রায়ান মিরাকে টাওয়ালে জাড়ানো অবস্থায় হাতের আলাদা জামা কাপড় দিয়ে নিজেকে ঢাকার বৃথা চেষ্টা করতে দেখে বলল-
“Huh..So after the whole night…আরো কিছু দেখার বাকি আছে আমার? এদিকে এসো, দেখি একটু, কি দেখা হয়নি আমার এখনো।”
মিরা নিজের দিকে তাকালো মাথা নিচু করে। সে নিজেও অবাক- নিজেকে কেন আড়াল করছে এভাবে। তারপরও ওভাবেই থাকলো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“কি যেন বলছিলে? হ্যাঁ! তোমার ওসব পড়তে ভালো লাগে না তাই না? প্লিজ বাড়িতে এসব পড়া বাদ দাও। অসহ্য কর লাগে আমার। এমনিতেও ওইগুলো ছো…!”
মিরা রায়ানের সম্পূর্ণ কথা শেষ হওয়ার আগেই ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে চিরুনি উঠিয়ে বিছানায় রায়ানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে সাবধান করে বলল-
“Don’t you dare to say, they are small…”
রায়ান বালিশ দিয়ে চিরুনির গতি ঠেকিয়ে নিজের কথা পাল্টে নিয়ে মিরাকে নরম কন্ঠে বলল-
“I dare not my Mrs..They are just perfect..”
-“Shut up…!”
রায়ান শব্দ করে হেসে উঠলো। মিরা আরো বিরক্ত হয়ে আবারও কিছু একটা রায়ানের দিকে ছুঁড়ে দিতে উদ্যত হলে রায়ান দুই হাত উঠিয়ে চেচিয়ে বলল-
“ওই…wait wait… বেইবি!”
মিরা থেমে গিয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-“কিইইইই…!”
রায়ান বিছানায় ইশারা করে বলল- “কাছে আসো না একটু।”
-“কেন? কিসের জন্য?”
-“আমি বলেছি তাই। তুমি এখানে আসবে না আমি ওখানে যাবো?”
মিরা উপায় না পেয়ে ধীরে পায়ে বিছানায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো মুখ ঝুলিয়ে ঠিক রায়ানের পাশে। রায়ান ঝুঁকে মিরার মুখটা দেখার চেষ্টা করলো। মিরা রায়ানের দিকে তাকাচ্ছে না বলে রায়ান আলতো হাতে মিরার মাথা থেকে ভেজা টাওয়ালটা খুলে নিয়ে মিরার ভেজা চুল গুলো ধীরে ধীরে মুছতে মুছতে বলল-
“আমি তোমাকে শাওয়ার নিতে না করেছিলাম হৃদপাখি।”
মিরা চুপচাপ মাথা নিচু করে নিজের নখ খুঁটতে শুরু করলো। রায়ান দ্বিতীয় বার আর একই প্রশ্ন করলো না। সে মিরার চুল মুছে মিরাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। মিরার মাথা তখনও নিচে। রায়ান মিরার দুই গালে হাত রেখে মুখটা উঁচু করে জিজ্ঞেস করলো-
“আমার বউ জানের এই চাঁদের মতো মুখটা এমন বাংলার পাঁচ হয়ে আছে কেন? জানতে পারি?”
মিরা রায়ানের দিকে একনজর তাকিয়ে কিছু না বলেই রায়ান কে জাড়িয়ে ধরল। রায়ান হঠাৎ এমন কিছুতে অবাক হলো কিন্তু খুব আদরে মিরাকে জড়িয়ে নিলো নিজের বুকে। মিরাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে আমার পাখির? মন খারাপ?”
মিরা রায়ানের খোলা বুকে আঙুল দিয়ে কি যেন আঁকিবুঁকি করছিল। রায়ান সেই দিকে মন না দিয়ে মিরার কাঁধ এসে থাকা একগুচ্ছ চুল সরিয়ে উন্মুক্ত ঘাড়ে ঠোঁট ছোঁয়াল। মিরা শিহরণে একটু কেঁপে উঠতেই রায়ান মিরাকে একটু স্থির করতে শক্ত করে জাড়িয়ে ধরল। মিরা কিছু বললো না বলে রায়ান মিরার গলায় ঘাড়ে ধীরে ধীরে নিজের বিচরণ বিস্তার করলো ঠোঁটের স্পর্শে। মিরা রায়ানের বুকে হাত ঠেকিয়ে রায়ান কে থামাতে চাইলো। রায়ান মুখ তুলে মিরার গলায় কাছে লাল দাগ গুলো তে আঙ্গুল স্লাইড করে অনুতপ্ত স্বরে বলল-
“সরি সোনা। I didn’t mean to hurt you.. ব্যাথা লাগছে?”
মিরা না সূচক মাথা নাড়ল- সত্যি তার ব্যাথা লাগেনি। তার মনে অনুভব বলতে সুখের অনুভব ছিল অন্য কিছুর নয়। রায়ান নিজের একহাত দিয়ে মিরাকে জড়িয়ে রেখে অন্য হাত দিয়ে সাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে পেইনকিলার আর বার্থ কন্ট্রোল এর ওষুধের পাতা, আর একটা মলম বের করতে করতে বলল-
“এই মলমটা লাগিয়ে দিচ্ছি, আর এই ওষুধ গুলো খেয়ে নাও। তারপর কিছু সময় রেস্ট নেও দেখবে সব ঠিকঠাক লাগছে।”
মিরা নীরব সম্মতি দিলে রায়ান পরম যত্নে ব্যাথার দাগ গুলো তে মলম লাগাতে থাকলো আর এই কার্য সম্পূর্ণ করার দরুন মাঝে মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ মিরার ঠোঁটে ছোট ছোট চুমু খাচ্ছে। মিরা চেয়েও আর নীরবতা ধরে রাখতে পারলো না। রায়ানের কান্ডে ফিক করে হেঁসে উঠে বিরক্তি নিয়ে বলল-
“কি হচ্ছে টা কি, হ্যাঁ? আপনার জন্য কি এখন একটু গোমড়া মুখেও থাকতে পারবো না?”
রায়ান মিরাকে হাসতে দেখে স্বাভাবিক ভাবে বলল-
“থাকো না গোমড়া মুখে। আমি কি না করেছি নাকি? তোমার জন্য কি এখন আমি আমার বউকে আদরও করতে পারবো না?”
-“করুন। আমি কি না করেছি নাকিইইই…?”
রায়ানের কথায় ফেসে গেছে বুঝা মাত্রই মিরা জিভ কামড়ে থেমে গেল। রায়ান নিজের ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরার মুখের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলো-
“Oh really…? না করছো না তাহলে?”
মিরা রায়ানের চোখে চোখ রাখলে রায়ান মিরাকে একটানে নিজের কাছে নিয়ে নেয়। মিরা সাপে কাটার মতো একদম ঠান্ডা স্থির হয়ে গেল সেখানে কোনো নড়াচড়া নেই। রায়ান মিরার গলায় মুখ গুজে মেয়েটার ভেজা চুলে নিজের এক হাত আর কোমরে অন্য হাতটা রেখে যতটা সম্ভব নিজের কাছে টানছে। রায়ান মিরার গলা ছোট ছোট চুমু দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে। মিরার উষ্ণ নিঃশ্বাস আঁচড়ে পড়ছে রায়ান ঘাড়ে। রায়ান মিরার কানের লতিতে চুমু দিয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“হৃদপাখি, আরেকবার শাওয়ার নিতে পারবে? প্লিজ।”
রায়ানের কথায় হঠাৎ মিরার অন্তর আত্মা শিহরণে কেঁপে উঠলো। সাথে সাথে রায়ানের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো-
“পারবো না। Trust me.. একদম পারবো না। ছাড়ুন আমাকে।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“I do trust you baby.. And I know you can..”
মিরা আরো ব্যস্ত হয়ে পড়লো নিজেকে ছাড়াতে। মিরাকে এতটা ছটফট করতে দেখে রায়ান দুষ্টু হেঁসে বলল-
“এই তো , এতক্ষণ পর মনে হচ্ছে এটা আমার বউ। তোমার আপসে আমার কাছে আসায় একটুও অ্যাডভেঞ্চার নেই বেইবি। I love it when you feel, you are gonna get a hard time under me.. এতো কেন ভালো লাগে তোমাকে ছটফট করতে দেখলে বলো তো?”
মিরা রায়ানের দিকে অবাক হয়ে তাকালো- মানুষ টা কি বলছে! মিরা উল্টো জবাব দিয়ে বলল-
“আপনার মাথায় সমস্যা আছে, তাই বউকে অস্বস্তিতে দেখে আপনার ভালো লাগে। পেয়েছেন উত্তর? এখন ছাড়ুন আমাকে।”
রায়ান ও মিরার শরীরে নিজের দেওয়া অধিকারের চিহ্ন ইঙ্গিত করে উল্টো জবাবে বলল-
“এসবের পরও যদি অস্বস্তি বোধ হয় বউয়ের আমি কোথায় যাবো? সারারাত একজন আরেকজনের সাথে লেপ্টে থাকার পর, সকালে তাকে ধরলেই মহারানির লজ্জা লাগে। আর কতবার লজ্জা ভাঙতে হবে বলো।”
মিরা রায়ানের কথা আর নিতে পারছিল না বলে রায়ানের মুখে হাত দিয়ে রায়ান কে থামালো- আরো কোনো কথা বেরলে মিরা লজ্জাতেই মরে যাবে। রায়ান চুপ করে গেলে মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের হাত সরিয়ে নেয়। রায়ান মিরার হাত ডান হাতটা নিজের হাতে নিয়ে নিজের মুখের কাছে নিয়ে হঠাৎ করেই কামড়ে ধরলো। মিয়াও সাথে সাথে চিৎকার করলো-
“আআহহহ্, কি করছেন আপনি?”
রায়ান দাঁত সরিয়ে একই স্থানে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদর করে বলল-
“করতে তো চাইছি অনেক কিছুই। করতে কই দিচ্ছ। নেহাতই ভালোবাসি তাই মায়া লাগে। এতো মায়াবতী না হলে হতো না তোমার?!”
মিরা হাসবে না কাঁদবে না রাগ করবে ভেবে পেলো না। রায়ান মিরাকে ছেঁড়ে দিয়ে ব্যাথা আর অন্য ওষুধ গুলো খুলে মিরার হাতে দিয়ে পানি এগিয়ে দিয়ে বলল-
“ওষুধ গুলো খেয়ে নাও।”
মিরা রায়ানের হাত থেকে ওষুধ গুলো নিয়ে রায়ানকে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“এই ওষুধ টা… আচ্ছা আপনি কি চান না আমাদের ছোট একটা বেবি আসুক?”
রায়ান মিরার দিকে খেয়াল করলো- মেয়েটা হঠাৎ খুব সিরিয়াস হয়ে গেছে। রায়ান এই সেন্সিটিভ বিষয়টা নিয়ে এখন কথাই বলতে চাইছিল না। তাই শান্ত গলায় বলল-
“তুমি এখনো অনেক ছোট হৃদপাখি। ১৮ বছর অনেক বড় কোনো বয়সসীমা না। তার উপর এখন তোমার শরীরের যে কন্ডিশন, বেবি ক্যারি করা তোমার জন্য ঠিক হবে না। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?”
মিরা চুপ করে শুধু শুনলো কিছু বলল না কারণ সে জানে রায়ান ভুল কিছু ও বলে নি। এখন জেদ করাটা একদম বাচ্চামি হবে এই ব্যাপারে। কিন্তু মুখে উদাসীনতা ছিল। রায়ান আর কথা ঘাটলো না- মেয়ে মানুষের মন হাজার ম্যাচিউর হলেও কখন কি মনে গেথে যাবে বলা যায় না। রায়ান মিরাকে ওষুধ গুলো খাইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
“আমার বাচ্চা বউটা, আর একটু বড় হক। তারপর সে যা চাইবে তাই হবে।”
-“ভালো লাগছে না আমার। এই নিয়ে আর কথা বলবেন না।”
-“কি করলে ভালো লাগবে আমার পাখির?”
-“বাদ দিন। কিছুর দরকার নেই। উঠে ফ্রেশ হয়ে নিন আমি চেঞ্জ করে আসছি।”
কথাটা বলে মিরা রায়ানের পাশ থেকে উঠে গেল। পরে আবারো ঘুরে তাকিয়ে বলল-
“ওহ, ভালো কথা। আজ থেকে ক্যাম্পাসে যাবো। স্যামিস্টার প্রায় শেষের পথে ফাইনাল পরীক্ষা ও সামনে। আটেন্ডেন্স এর বারোটা বেজে আছে। এখন একটু রেগুলার হতে হবে। আর বাড়ি ফিরে আমরা শপিং এ যাবো একটু।”
-“ঠিক আছে। কিন্তু আমরা বলতে কে কে?”
-“আমি, রিমি আর সোরা যদি যেতে চায় তো যাবে।”
-“তোমরা একা যাবে?”
-“হুম।”
-“দরকার নেই। অনলাইনে অর্ডার করো সব। আমার কার্ডে দিয়ে দিও সব বিল।”
-“অনলাইনে কিভাবে হবে? রিমির মন তেমন ভালো না। শপিং করলে একটু ভালো লাগবে তাই যাবো।”
রায়ান ভেবে দেখলো মিরার মন মেজাজ ও আজ ভালো না তাই শপিং এ যাওয়া নিয়ে আর আপত্তি করলো না-
“আচ্ছা, ঠিক আছে তাহলে আম্মু কে বলে দিবো আমি। আম্মুর সাথে যাবে।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“মামণি যেতে পারবে না বলেই আমাকে বলেছে রিমিকে নিয়ে বেরোতে। মামণি কে জ্বালাবেন না তো।”
রায়ান বিছানা থেকে উঠে মিরার কাছে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-
“আম্মুর সাথে না গেলে আমার সাথে যাবে। যখন বের হবে তার আগে কল করবে আমাকে বুঝেছ? নিতে আসবো আমি।”
মিরা আরো কিছু বলবে রায়ানের কথার উপর তার আগেই রায়ান সোজা খটমট করে হেঁটে ওয়াশরুমে চলে গেলো। মিরা নিজের মতো ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিলো।
রিমি আর রুদ্র গতকাল রাতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল রাইডে। আর বাড়ি ফিরেছে সূর্যোদয় দেখে। সকালে সবার উঠার আগে বাড়িতে ফিরে কিছু টা সময় রেস্ট নিয়েছিল দুইজন তারপর ফ্রেশ হয়ে একসাথে নিচে নেমেছে। নিচে সবাই একসাথে খেতে বসেছে। রামিলা চৌধুরী আর মিরা টেবিল সাজাচ্ছিল। পরে রিমিও তাদের সাথে সাথে সাহায্য করতে যায়।
রিমি-“Good morning everyone..”
মিরা-“Good morning..”
রামিলা চৌধুরী-“Good morning মা। তুমি টেবিলে গিয়ে বসো। সব হয়ে গেছে। মিরা তুই ও যা। খেয়ে নে তাড়াতাড়ি। ক্যাম্পাসে যেতে হবে না?”
রিমি আর মিরা রামিলা চৌধুরীর কথা মতো খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো। রায়ান রেডি হয়ে নিচে নামতেই দেখলো রিমি আর মিরা পাশাপাশি বসেছে তাই বাধ্য হয়ে সে রুদ্রর পাশে বসলো।
মিরা আর রিমি দুইজনের কারোরই রাতের ঘুম পুরো হয়নি বলে কাকতালীয় ভাবে একসাথে হাম তুললো দুইজনে। বিবাহিত মেয়েদের রাতে না ঘুমানো এতোটাই কমন যে তারা নিজেরাও সেটা বোঝে। মিরা রিমি একে অপরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রায় বলা চলে নিজেদের নজর চুরি করে খাবারের দিকে মন দিলো। সামনে রিমি আর মিরা কে দেখে রায়ান আরা রুদ্র একে অপরের সাথে চোখাচোখি করলো। তাদের মধ্যেও অদ্ভুত এক ইতস্তত ভাব। কিন্তু এখানে কার লজ্জা কি বিষয়ে বোঝা মুশকিল। মিরা রিমিকে স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলো-
“রিমি…তোরও কি রাতে ঘুম হয়নি?”
রিমি একটু আমতা আমতা করেই জবাব দিলো-
“তে..তেমন কিছু না রে। আসলে সব নতুন নতুন তো..না মানে নতুন পরিবেশ তো তাই আর কি।”
মিরা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলে রিমি উল্টো প্রশ্ন করলো-
“ওয়েট, ‘তোরও’ মানে? তোরও কি রাতে ঘুম হয় নি?”
মিরা রিমির প্রশ্নে শুকনো ঢোক গিলে বলল-
“ওই আর কি, অনেক পড়া বাকি ছিল পড়ছিলাম মাঝ রাত অব্দি। পরে আর ঘুম আসে নি তেমন।”
রিমিও মিরার কথা মেনে নিলো কিন্তু দু’জনেই জানে দুইজনের কেউই একে অন্যের অযুহাত বিশ্বাস করে নি। এইদিকে রায়ান আর রুদ্র আর মুখই তোলে নি। এর মাঝেই সোরায়া নিচে নামলো-
“Good morning everyone..মামণি খেতে দাও।”
মিরা ধমক দিয়ে বলল-
“একটা গাট্টা মারবো। হাত নেই তোর? খাবার টেবিলে রাখা আছে নিয়ে খা।”
সোরায়া মুখ ফুলিয়ে বলল-
“সরি। আচ্ছা আমি নিয়ে নিচ্ছি।”
রিমি মিরাকে বলল-
“আরে ও তো বাচ্চা মানুষ। ধমকাস কেন?”
তারপরই সোরায়াকে বলল-
“বনু তুই বোস। আমি দিচ্ছি।”
সোরায়া চেয়ারে বসে গেলে মিরা সোরায়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“কিরে..কয়দিন ধরে গোসল করিস না তুই?”
সোরায়া মিরার দিকে তাকিয়ে কিছুই না বুঝার ভাব নিয়ে সোজা উত্তর করলো-
“২দিন।”
মিরা বড় বোন হিসেবে সব সময়ই সোরায়াকে শাসন করে। তাই এর জন্যও তো সোরায়ার কথা শোনার ছিলো এটা সোরায়া নিজেও জানে। মিরা বিরক্ত গলায় বলল-
“তিন দিন হয়ে গেছে গোসল করিস নি। তাড়াতাড়ি গোসল করতে যা তো। খাবার খেতে হবে না।”
সোরায়া মিরার কথায় পাত্তা না দিয়ে খাবার খেতে খেতে বলল-
“আমার সাদা মনে কাঁদা নেই। কবি বলেছেন, যার মন পরিষ্কার তার সব পরিষ্কার। তাই আমি গোসল করবো না।”
টেবিলের সবাই একসাথে হেঁসে উঠলো। কিন্তু মিরা মুখ বাঁকিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলো-
“কোন কবি বলেছেন এটা? নাম বল তো।”
সোরায়া একই ভঙ্গিতে বলল-
“আপু তুমি কি জানো না, মানুষ বাঁচে তার কর্মে। কবির যা বলেছেন তা যে জানি এটাই বেশি। নাম জানা তো
বিলাসীতা।”
মিরা আরো কিছু বলবে তার আগেই রায়ান মিরাকে থামিয়ে দিলো-
“আহা, তো কি হয়েছে গোসল করেনি তো? শীতের সময় না করলেই কি? শীতে গোসল করা এমনিতেই অত্যাচারের সমান।”
সোরায়া সাথে সাথে সম্মতি দিল-
“ঠিক ঠিক, সহমত। ইহা একটি অত্যাচার।”
মিরা রায়ানের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“একটু আগে ঘরে জিজ্ঞেস করছিল, আরেকবার শাওয়ার নিতে পারবো কিনা। আর এখন সেটা অত্যাচার হয়ে গেল! তাহলে আমার সাথে যা হয় তা কি অত্যাচার না!”
মিরার চোখের চাহনি রায়ান ঠিকই বুঝলো তবে খুব একটা ফারাক পড়লো না। সে নিজেও মিরার চোখে তাকিয়ে মনে মনে বলল-
“ওইটাকে আদর বলে বউ। অত্যাচার হবে কেন?”
সোরায়া মিরাকে নিজের সাফাই দিতে বলল-
“আরে আপু তুমি দুই দিনকে তিন দিন কেন বানাচ্ছ। আজ তো করেছি গোসল। মাথা ভিজাইনি শুধু চুল শুকানোর টাইম নেই বলে।”
রামিলা চৌধুরী রান্নাঘর থেকে খাবার টেবিলের সামনে এসে সবার উদ্দেশ্যে বললেন-
“তোরা কি খাবি না সব খাবার সরিয়ে নেবো?”
তারপর সবাই খাওয়াতে মন দিলে রায়হান চৌধুরী খাবার খেতে আসেন। তারপর আর বাড়তি কোনো কথা হয়নি। ছেলেরা ছেলেরা ব্যবসা নিয়ে কথা বলছিল। সকালে স্বাভাবিক ভাবেই সবাই রেডি হয়ে যে যার যার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রুদ্র রায়হান চৌধুরীর সাথে অফিসে গেছে বলে রায়ান মিরা আর রিমিকে একসাথে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিয়ে নিজের বিজনেস সাইটে গেছে। আর সোরায়া তো মাহিরের সাথেই কলেজে চলে গেছে। সবার প্লেন এখন দুপুরের পর থেকে- একসাথে শপিং এ যাওয়ার।
কলেজ~
মাহির আর সোরায়া কলেজের ফেরার পর থেকে কলেজে অনেক উড়ো উড়ো খবর ঘুরে বেড়ায় মাহির আর সোরায়াকে নিয়ে। এই নিয়ে কলেজের বেশিরভাগ মেয়েদেরই সমস্যা, সাথে কিছু মেডামদেরও। কলেজের ক্লাস টাইম শেষ হলে টিফিনের সময় সোরায়া আর জুঁই নিজেদের মতো কথা বলছিল। হঠাৎ করেই সোরায়া জুঁইকে বলল-
“দোস্ত ভাবছি রিলেশনে যাব।”
-“আচ্ছা..? তো যা।”
-“কিন্তু বুঝতেছি না কিসে যাবো- বাসে না ট্রেনে? তুই কি দিয়ে গেছিলি?”
জুঁই সোরায়ার মজা বুঝতে পেরে সোরায়ার গায়ে ধাক্কা মারলো। দুইজনে একসাথে হেসে উঠল। দুইজনের মাঝে এমনি মজার কথা চলছিল হঠাৎ করেই এর মাঝে কলেজের সিনিয়র লতা আর তার দলবল সোরায়ারা যেখানে বসে ছিলো সেখানেই ইচ্ছে করে এসে শুনিয়ে শুনিয়ে মাহির আর নিজেকে জড়িয়ে কথা বলতে লাগলো-
“আরে তোরা খেয়াল করেছিস? আজ মাহির স্যার সম্পূর্ণ সময় শুধু আমাকেই দেখে যাচ্ছিল।”
-“আমরা আবার এসব খেয়াল না করবো? স্যার তো শুরু থেকেই তোকে পছন্দ করে।”
-“হ্যাঁ তাই তো। দেখলেও বোঝা যায়।”
জুঁই আর সোরায়া না চাইতেও কথা গুলো শুনছে। জুঁই সোরায়ার দিকে তাকালো, ভাবছিল হয়তো সোরায়া রাগ করবে আগের মতো কিন্তু এমন কিছুই হলো না। জুঁই অবাক হয়ে সোরায়াকে প্রশ্ন করলো-
“কিরে..তুই কিছু বলছিস না কেন?”
-“কি বলবো?”
-“কি বলবি মানে? ওরা মাহির স্যার কে নিয়ে কত আজেবাজে কথা বানিয়ে বানিয়ে বলছে। তোর খারাপ লাগছে না?”
সোরায়া মনে মনে হাসলো- জুঁই তো আর জানে না যে মাহির আর সোরায়া সত্যি সত্যি এখন একসাথে। সোরায়া জুঁইকে শান্ত গলায় বলল-
“আরে ধুর কিসের খারাপ লাগবে? তুই ওই সবে কান দিস না। নিজের কথা বল।”
লতা আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা অনেক চেষ্টা করেও যখন নিজেদের কাজে সফল হচ্ছিল না তখন লতা ইচ্ছে করে নিজের সীমা ছাড়ালো আর মিথ্যা বানিয়ে বলল-
“বাই দ্যা ওয়ে, জানিস স্যার না আমাকে নানান বাহানায় ছোঁয়ার চেষ্টা করে। হাঁটতে গেলে হঠাৎ ধাক্কা, কলম নেওয়ার বাহানায় হাত ধরা, আরো অনেক ভাবে।”
লতার কথায় তার সঙ্গী রা বিদঘুটে হেঁসে উঠলো কিন্তু সোরায়ার এই পর্যায়ে গিয়ে মিথ্যা আর সহ্য হলো না। সোরায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে লতার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল-
“এই যে মিস হুয়াট এভার, এতোই যখন প্রবলেম মাহির স্যার কে নিয়ে প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে নালিশ করলেই তো পারো। তবে আমার মনে হয় না তোমার এই মিথ্যা কথাও কেউ বিশ্বাস করবে বলে। আর হ্যাঁ আমার মনে হয় না স্যার এর সাথে তোমার কোনো পার্সোনাল রিলেশন আছে যেই সূত্রে স্যার তোমার প্রতি কোনো ভাবে ইন্টারেস্টেড হবেন। মিথ্যা বললে অন্তত এমন মিথ্যা তো বলা উচিত যেন সেটা বিশ্বাস করার মতো হয়। So dumb..”
লতা যা চাইছিল তা শেষ মেষ হয়েই গেল। লতা ইচ্ছে করে সিনক্রিয়েট করতে শুরু করলো-
“এই মেয়ে তোমার কি হ্যাঁ? আমি যাকে নিয়ে মন চায় তাকে নিয়ে কথা বলবো, যা ইচ্ছা তা বলবো। তোমার জ্বলে কেন?”
-“আমার জ্বলে কারণ তুমি যাকে নিয়ে কথা বলছো তিনি এই কলেজের টিচার আর আমাদের শিক্ষক। আমাদের তো জ্বলবেই তাই না?”
-“জ্বলা তো স্বাভাবিক। স্যার সবার মাঝে আমাকে এ্যাটেনশন দেন দেখে তোদের মতো মেয়ের তো আমাকে দেখে জ্বলবেই।”
এমনি কথা তাও ঠিক ছিল তুই তুকারিতে চলে যাওয়ার পর সোরায়াও আর চুপ থাকার মেয়ে না- এমন মেয়েকে দেখে কি না সে জ্বলবে। সোরায়া একটু বাজে ভাষার প্রয়োগ করেই বলল-
“কি আমার পটের বিবি এলেন রে, তাকে দেখে আমার জ্বলতে হবে? টিনের চালে কাওয়া.. তুমি আমার সাও**।”
সোরায়া পুরোটা বলার আগেই জুঁই সোরায়ার মুখ ধরে ফেলে বলল-
“আসতাগফিরুল্লা দোস্ত, নিজের ভেতরের জয় আমির নিজের ভেতরেই রাখ। কলেজে এসব বললে এক্সপেল করে দিবে।”
দুই জনের মাঝে এমন কথা কাটাকাটি লাগার পরে হঠাৎ করেই মাহির সেখানে এসে উপস্থিত হয়। সে মূলত সোরায়াকেই খুঁজছিল- মেয়েটা ঠিক মতো টিফিন খেয়েছি কিনা জানতে। দুই মেয়ে যখন একে অপরের চুল ঝরার অবস্থায় মাহির তাড়াতাড়ি সেখানে গিয়ে জোরে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“এখানে হচ্ছে টা কি?”
মাহির কে দেখে হঠাৎ করেই লতা বেশ নিতাম ভদ্র মেয়ের রূপ নিয়ে ন্যাকামি করে নালিশ করলো সোরায়ার নামে-
“স্যার, দেখুন না। এই মেয়েটা তখন থেকে আমার সাথে বাজে কথা বলা যাচ্ছে। আপনাকে আমাকে নিয়েও অনেক বাজে কথা বলেছে স্যার।”
এই বলে নেকা কান্না জুড়ে দিলো। সোরায়া আর জুঁই হতবাক লতার কান্না করা দেখছে। সোরায়া জুঁইয়ের হাত নিজের মুখ থেকে সরিয়ে আরো রাগ দেখিয়ে বলল-
“জুঁই ছাড় তো আমাকে। শালির চেংড়ি কি নাটক বাজ, দেখছিস?”
মাহির সোরায়ার ভাষা শুনে আরো হতবাক। জুঁই মাহিরের তাকানো দেখে বানোয়াট হেঁসে সোরায়াকে বলল-
“জয় আমির, আমার বান্ধবীর শরীর ছেঁড়ে দেও জান। সোরা মাহির স্যার সামনে দেখ। মুখ সামলা।”
সোরায়ার মাথা এতই গরম ছিল যে তার সামনে কে ছিল তার তোয়াক্কা সে করছিল না-
“তুই দেখ স্যার কে। আমি অনেক দেখেছি। শালি কি যাত্রাপালা জুড়েছে দেখেছিস তুই?”
লতা মাহির কে উষ্কানি দিয়ে বলল-
“দেখেছেন স্যার, কি খারাপ মুখের ভাষা। এতক্ষণ আপনাকে আর আমাকে জড়িয়ে অনেক কথা বলেছে। বলেছে আপনি নাকি আমাকে পছন্দ করেন।”
মাহির এই কথা শুনে কাঁশতে শুরু করে আর সোরায়া জোরেজোরে হাসতে শুরু করে। মাহির এখন কি বলবে সেটা সে ভেবে পাচ্ছে না। নিজের প্রেমিকা কি কখনো অন্য মেয়ের সাথে তার বয়ফ্রেন্ড কে জড়িয়ে কথা বলবে? স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে লতা মিথ্যা বলছে কিন্তু সত্যি টা বলার পরিস্থিতি ও নেই। এখন সোরায়া মাহির কে আরো চাপ দেয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল-
“হ্যাঁ স্যার, আমি বলেছি। আপনি এই মেয়েকে অনেক পছন্দ করেন। এমনটা আমার মনে হয় আর কি। এই বিষয়ে আপনার কি মতামত?”
মাহির কোনো মতো বিষয়টা এড়িয়ে গেল-
“এমন কিছু না। ভুল মনে হয় তোমার। আমি আংশিক বিবাহিত। আমার একটা সুন্দর বউ আই মিন হবু বউ আছে।”
সোরায়া আরো জোরে হেসে উঠলো- মাহির যে সোরায়ার কথা বলছে তা তো সোরায়রা জানেই। কিন্তু লতার মুখের বারোটা বেজে গেল সাথে সাথে। জুঁই ও অবাক মাহিরের কথা শুনে। পরিবেশ একটু শান্ত হলে মাহির সোরায়াকে বোঝাতে অফিস রুমে ডাকলো। সোরায়ার রাগ এখনো কমে নি তাই অফিস রুমে ঢুকেই মাহির কে উদ্দেশ্য করে বলল-
“আপনি ওই অসভ্য মেয়েটাকে কিছু বললেন না কেন? ওই মেয়ে আপনার নামে কি বলে বেড়ায় আপনার ধারণা নেই।”
মাহিরের একটু অদ্ভুত অনুভব হলো-“২৮ বছর বয়সে এখন ১৬ বছরের মেয়েকে কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে, হয়রে ভালোবাসা! আর কি কি করাবে আমাকে দিয়ে কে জানে।”
মাহির সোরায়া কে শান্ত করতে নরম গলায় আদুরে ডাকে ডেকে বলল-
“আমার জান পাখি, আমার জান বাচ্চা, আমার ছোট্ট বউ, চিল। শান্ত হও। বললেই কি সব হয়ে গেল বলো?”
সোরায়া আরো চেঁচিয়ে টেবিলের উপর রাখা পানির বোতল ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলল-
“একদম আগলা পিরিতি দেখাবেন না আমাকে। আপনার কথা শুনে এখন আমার জ্বর আসতেছে।”
মাহির চিন্তিত হয়ে সোরায়ার কাছে এসে কপালে গলায় হাত দিয়ে চেক করতে করতে বলল-
“কিহ্! জ্বর..দেখি! বেশি খারাপ লাগছে জান? ঔষধ এনে দিব?”
সোরায়া মাহির হাত ছিটকে ফেলে দিয়ে বলল-
“আমার কিছু লাগবে না। ওই শালির চেংড়ি আর একবার এইসব করলে ওর একদিন কি আমার একদিন। এই আমি বলে দিলাম”
মাহির সোরায়ার মুখে প্রথম গালি শুনছে। বেচারা সোরায়ার দুই কাঁধে হাত রেখে ভদ্রভাবে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো-
“আমার জান বাচ্চা না তুমি? ভালো মেয়েরা গালিগালাজ
করে না জান।”
সোরায়া উল্টো দাঁত কিড়মিড় করে বলল-
“Ooo hello Mr professor- With due respect, আপনি কি আপনার এই বালের জ্ঞান দেওয়া বন্ধ করবেন?! প্লিজ…”
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬০
মাহির বুঝতে পারলো আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়াকে হালকা টেনে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে তার মাথায় ছোট চুমু দিয়ে বলল-
“I am yours my janbaccha..And you are mine..keep that in mind..”
সোরায়া হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। বুক ধুকধুক করছে কোনো এক অজানা কারণে। সোরায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ ওভাবেই থাকলো। পরে আবার নিজেই মাহিরের থেকে দূরে যাওয়ার জন্য বলল-
“ক্লাসে যেতে হবে।”
মাহির তৎক্ষণাৎ সোরায়া কে বাঁধন মুক্ত করে দিলো আর সোরায়া ও মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে এক দৌড়ে বাইরে চলে গেল।

next part?