নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৪
নাজনীন নেছা নাবিলা
ইউনিভার্সিটির পার্কিং হলে গাড়ি থামালো মিহাল। গাড়ি থামিয়েই দেরি না করে গাড়ি থেকে বের হয়ে এলো।মুনভিও গাড়ি থেকে তৎক্ষণাৎ বের হয়ে এলো। মিহাল নীলার জন্য দরজা খুলে দিল আর মুনভি ইকরার জন্য।নীলা আর ইকরা দুজনেই কিছুটা অবাক হলো কিন্তু প্রকাশ করল না। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পরলো। নীলা গাড়ি থেকে নামতেই মিহালের সাথে আবার চোখাচোখি হলো।নীলার কাছে মনে হলো মিহালের দুচোখে যেন অসীম আকাশ আর অতল জলের রহস্যমাখা গভীরতা। ঠোঁটের কোণে হাসি বা রাগ—কোনোটিই অতিমাত্রায় প্রকাশ পায় না, বরং তা এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নীলা তৎক্ষণাৎ নিজের দৃষ্টি সংযত করে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালো।মিহালের পরনে ফর্মাল পোশাক।সে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের ভঙ্গিমা বোঝা দায়। ইকরা মুচকি হেসে মুনভি কে ধন্যবাদ জানালো।মুনভি বদলে মিষ্টি হাসি উপহার দিল। এইবার নীলা আর ইকরা মিলে দুজনকে আবার ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিয়ে যেই না চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল ওমনি মুনভি পেছন থেকে নীলা কে উদ্দেশ্য করে বলল ___
আজকে কিন্তু সময় মতো থেকো।
সঙ্গে সঙ্গে মিহালের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে সর্বপ্রথম পড়লো মুনভির উপর। তারপর কান খাড়া করে নীলার দিকে তাকালো নীলা কি বলে শোনার জন্য।নীলা পেছন ফিরে মুনভির দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলল___
হ্যাঁ অবশ্যই আমি সময় মতোন থাকব।
বলেই ইকরার হাত ধরে চলে গেল।নীলারা দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই মিহাল গম্ভীর কন্ঠে মুনভি কে জিজ্ঞেস
করল ___
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ওর সাথে তোর এত কিসের ভাব? আর তুই বা কেন ওর সাথে দেখা করতে চাইছিস? কি এমন কথা তোদের মাঝে?
মুনভি বাঁকা হেসে মিহালের কাঁধে বাম হাত রেখে ভর দিয়ে বলতে লাগলো ___
রিল্যাক্স ব্রো। আমি তো ওর সাথে দেখা করতে চাইনি বরং ও নিজেই আমাকে কল করে বলেছিল দেখা করার কথা।আমি তো তোর জন্যই করছি সবকিছু।
মিহালের কপাল আপনা আপনি কুঁচকে গেল।সে অবুঝের মতো তাকিয়ে মুনভির বলা কথা একটু ভিন্ন ভাবে প্রশ্নাত্মক ভঙ্গিতে পুনরাবৃত্তি করল__
আমার জন্যই সবকিছু করছিস?
মুনভি মিহালে পিঠে চাপড় মেরে বলল___
তুই না বলেছিলি ইরফানের স্ত্রী কে ব্যবহার করে রিভেঞ্জ নিবি।আর আমাকে ইরফানের স্ত্রীর সাথে ভালোবাসার নাটক করতে হবে।আমি তো তাই করছি। এইটা তো কেবল প্রথম ধাপ।নাউ লুক এন্ড ওয়াচ আমি আর কি কি করি।
বলেই মুনভি স্থান ত্যাগ করল। কিন্তু মুনভির বলে যাওয়া কথাগুলো শোনা মাত্রই মিহালের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল।তার কপালের রগগুলো ফুলে উঠল, চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল মাটির দিকে। মিহালের রাগ এক জমাটবদ্ধ আগ্নেয়গিরির মতো, যা হঠাৎ ফেটে পড়ে অথবা নিভৃতে দগ্ধ করে।মিহাল চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে নীলার সাথে তার প্রথম দেখা হবার দৃশ্য ফুটে উঠল। সুস্পষ্ট হলো নীলার চোখ।নীলার চোখের চাহনিতে যে সততা ও সাহসের প্রকাশ, তা তার ভেতরের আধুনিক মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে। প্রথম দিনের সেই তীক্ষ্ম,তেজী চাহনি।তারপর পরবর্তী সময়ে দৃশ্য ফুটে উঠলো।ক্লিওপেট্রার মতো নীলার চোখ দুটি যেন জ্বলজ্বলে মনি,আবেগের অতল গহ্বর, যা কখনো গভীর সমুদ্রের মতো রহস্যময়, আবার কখনো শ্রাবণের ধারার মতো কোমল।সেই চাহনিতে থাকে নিমগ্ন ভালোবাসা, হালকা অভিমান, কিংবা সম্মানের আভা, যা মুহূর্তেই মিহালের মন জয় করে ফেলেছিল।অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে যাবার পর মিহাল নিজের চোখ খুলে মনের উদ্দেশ্য বলতে লাগলো __
আমি আমার নীলাঞ্জনার চোখে যেমন তেজ দেখেছি তেমনি লুকিয়ে থাকা কষ্টের সমুদ্র দেখছি। মনের মাঝে এক বোঝা নিয়ে চলাচল করছে আমার নীলাঞ্জনা। হয়তো হৃদয় তার ক্ষতবিক্ষত কাছের মানুষের দেওয়া আঘাতে।কাছের মানুষের দেওয়া আঘাত যেন বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস, যা নিঃশব্দে আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। বিশ্বাসের আয়নায় যখন আপনজন আঘাত হানে, তখন যন্ত্রণার চেয়ে অবিশ্বাসের গ্লানি বেশি পোড়ায় । এই আঘাতের ক্ষত বাহ্যিক নয়, বরং তা হৃদয়ের গভীরতম কোণে জমে থাকা ভালোবাসাকে বিষাক্ত করে তোলে।আর হয়তো আমার নীলাঞ্জনার সাথে তাই হয়েছে। কিন্তু আর না, আমি তাকে কখনোই ব্যবহার করব না আর কাউকে করতেও দিব না। অনেক ভুল করেছি নিজের ইগোর কারণে। নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড কে আঘাত করেছি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছি।নিজের ভুল বুঝতে পারার মুহূর্তটি ছিলো আমার বিবেকের জাগরণ, যেখানে অহংকারের দেয়াল ভেঙে পড়ে গিয়েছিল এবং অনুশোচনার তীব্র আলোয় সত্য উন্মোচিত হয়েছিল। এই উপলব্ধি আমার ভেতরের অহংকার বা ভ্রান্ত ধারণাকে চূর্ণ করে দিয়ে তাকে নতুন করে জীবনকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলো যা আমার ভুল স্বীকার করার সাহস ও সততার পরিচয়। কিন্তু অনেকটা দেরি হয়ে গেল।আজ মুনভি এবং আমার মাঝে এই দূরত্ব যার জন্য আমি ইরফান কে না বরং নিজেকে দায়ী করব।সকল সম্পর্কে বিশ্বাসের প্রয়োজন।আমি বন্ধু কে বিশ্বাস করা এবং নিজের ইগো কে সাইডে না রাখা এই দুটির মধ্যে ইগো কে বেছে নিয়ে অনেক বড় ভুল করেছিলাম। কিন্তু এখন আর সে ভুলের পুনরাবৃত্তি করব না। নীলাঞ্জনা কে আমি ভালোবাসি এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত বেসে যাব। কখনোই তার কাছের মানুষ হবার চেষ্টা করব না কারণ কাছের মানুষরাই আঘাত করে।আর কাছের মানুষের দেওয়া আঘাত মনে ক্ষত করে যেই ক্ষতের আঘাত এবং দাগ চির স্থায়ী।আমি আমার নীলাঞ্জনা অপ্রিয় হয়েই পাশে থাকবো। ভালোবাসবো।”
দুপুরের বাড়ি ফিরল নীলা আর ইকরা। আজকে তাদের দিন ভালোই কেটেছে।কাল থেকে আবার চিতই পিঠার বিজনেস শুর করবে।তাই আজকেই ভর্তা বানিয়ে রাখবে। কিন্তু যেহেতু আজকে মুনভির সাথে দেখা করতে যেতে হবে মনে হয়না সেইখান থেকে এসে আজ আর ভর্তা বানানো হবে না।আর যদি একবার ফুফুর খোঁজ পেয়ে যায় তাহলে তো আজ তার ঘুমই হবে না।
দুজন মিলে বাড়ি ফিরে আগে গোসল করে নিল।ইকরা গোসল শেষে নামাজ আদায় করে নিল।আর নীলা ততক্ষণে খাবার গরম করতে লাগলো। ইকরার নামাজ শেষ হলে দুজনে মিলে একসাথে খেয়ে নিবে। খাবার গরম করতে করতে নীলা লিসার কথা ভাবতে লাগলো। কারণ আজ সারাদিনই এই মেয়েটিকে সে ইউনিভার্সিটিতে দেখে নি। সে তো ভেবেছিল গতকাল সে যা করেছে তার রিভেঞ্জ নিতে আজ এই মেয়েটি অন্য কিছু করবে তার সাথে। অবশ্য নীলা তৈরি থাকে সব সময়।নীলা ছোটবেলা থেকেই এমন প্রতিবাদী। কেউ কিছু বললে কখনো তাকে ছেড়ে দেয়নি।
একবার ছোটবেলায় খেলার সময় তার এক বান্ধবী রাগের মাথায় ইচ্ছে করে তার ডল হাউস ভেঙে ফেলেছিল। তখন নীলার বয়স ছিল ৯ কি ১০।তখনও সে ওই বান্ধবীদেরকে নিয়ে পুতুল দিয়ে খেলতো। তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকলেও তাকে অল্প বয়সে কখনোই ফোন দেওয়া হয়নি। তাই মাঝেমধ্যেই পুতুল দিয়ে খেলতো সে। আর ডল হাউসটি তার খুব পছন্দের ছিল। যখন সেটি তার বান্ধবী ভেঙে ফেলল তখন সেই কান্নাকাটি না করে সঙ্গে সঙ্গে সেই বান্ধবীর বাসায় গিয়ে তার একটি ডল হাউস ভেঙ্গে ফেলল। এর পরে নিজের মায়ের কাছ থেকে অনেক বকুনি খেয়েছিল সে।
তার মা বলল____
সে তোর ডল হাউস ভেঙেছে বলে কি তুই ও তার ডল হাউস ভেঙে ফেলবি?
তখন নীলা জবাবে বলেছিল____
যদি সে ভুলবশত ভাঙতো তাহলে আমি এতটা পাত্তা দিতাম না। কিন্তু সে আমার বাড়িতে,আমার রুমে, আমার সাথে, আমার পুতুল দিয়ে খেলেই আমার ওপর রাগ করে আমার ডল হাউস ভেঙে ফেলেছে। তাও ইচ্ছে করে ভেঙ্গে ফেলেছে। সে জন্যই সে যেমনটা করেছে তার সাথে তেমনটাই করলাম।
নীলার মা রাগান্বিত কন্ঠে বললেন____
কুকুর কামড় দিলে কি তুইও তাকে কামড় দিবি?
নীলা জবাবে বলেছিল____
কুকুর কামড় দিলে বদলে তাকে কামড় না দিতে পারলেও লাঠি দিয়ে কুকুরকে বারি দিয়ে কুকুরের মাথা ফাটিয়ে দিতে পারব। এই ক্ষমতা এই নীলা মির্জার আছে।
সেই দিন নীলার কথা শুনে বাড়ির সকলে বেশ অবাক হয়েছিল। কিন্তু নীলার বাবা এবং চাচার অনেক গর্ববোধ করেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল নীলা অনেক সাহসী এবং তেজী মেয়ে হবে ভবিষ্যতে।
পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ নীলা ঠোঁটে হাসি লেখা ফুটে উঠলো। যখন দেখল পুরনো স্মৃতি মনে করতে গিয়ে অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে যেগুলো একসময় তার জন্য আবেগময় হলেও এখন বিষাক্ত তৎক্ষণাৎ সে অতীতের চিন্তাভাবনা থেকে ফেরত এলো। নিজেকে শাসিয়ে
বলল ___
কোন বিষাক্ত স্মৃতি মনে করতে নেই নীলা। আর আজকে তো তোর আনন্দের দিন তুই ফার্স্ট হয়েছিস। তার উপর আবার প্রাইস পেয়েছিস। তাই সেসব কাছের মানুষের কথা আজ ভাববি না যারা তোকে আঘাত দিয়েছে। আসলেই আঘাত কেবল কাছের মানুষ গুলোই দেয়।অথচ পেয়ারে লাল আমার অপ্রিয় এবং পর হওয়া সত্ত্বেও আমার জন্য কতটা করলো। সারারাত জেগে আমার প্রজেক্ট বানিয়ে দিল। আমার জন্য তিনি এতটা কেন করলেন এই প্রশ্নের জবাব নেই আমার কাছে। শুধু এতটুকু জানি মা-বাবা এবং চাচাদের পরে এই প্রথম কেউ আমার জন্য এতটা করলো, আমার চোখের পানির মূল্য দিতে পারলো।অপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও পেয়ারে লালের কাছে আমি ঋণী থাকব। জীবনে আর যাই হোক এমন একটা প্রফেসরের দরকার।
কথা গুলো বলেই আনমনে হেসে উঠলো নীলা। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলিয়ে নিল। উপলব্ধি করতে পারল নিজের ভুল। মনে মনে নিজের ভুল নিজেকে ধরিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো____
তুই এত ওভার সেনসিটিভ কেন নীলা? একটা মানুষ তোর জন্য যা করেছে অন্যের জন্য তাই করতে পারি এখানে অস্বাভাবিকতার কিছুই নেই। এক ভুল বারবার করবি না। তোর উপকার করেছে তার জন্য একটি থ্যাংকস গিফট দিবি এবং পরবর্তীতে সুযোগ পেলে তার উপকার করে দিবি এনাফ। এর থেকে বেশি কিছু ভাববে না। কারোর কথা বেশি ভাবলেই তার প্রতি দুর্বলতা চলে আসে। আর নীলা মির্জা কখনো কারো প্রতি অথবা কারো জন্য দুর্বল হতে পারে না।
সকালে মুনভি মিহালের সাথে কথা বলে চলে এসেছিল।ক্যাব বুক করে বাড়ি ফিরেছে।মিহালের সাথে তার ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিল কেবল নিজের কটন ক্যান্ডিকে এক নজর দেখার জন্য। কিন্তু কল্পনাও করতে পারেনি কটন ক্যান্ডির সাথে এতটা সময় কাটাতে পারবে।মন তার ভীষণ ফুরফুরে।আজ আবার তার অফ ডে। হসপিটালে যেতে হবে না তাই নীলার সাথে দেখা করবে। কিন্তু কাহিনীতে একটা টুইস্ট আছে।সে মিহালের সামনে নীলাকে বিকাল ৫ টায় দেখা করতে বলেছিল। কারণ সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর মিহাল কোনো না কোন বাহানায় চলে আসবে। এবং তাদের কথোপকথন শুনবে। যেহেতু সে টাইম পাঁচটায় বলেছে তার মানে মিহাল বিকেল সাড়ে চারটায় সেখানে থাকবে। সে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড কে খুব ভালো করে চেনে, জানে এবং বুঝে। হয়তো কোন এক কারণে দুজনের মাঝে এক অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেয়ালের অপর পাশের ব্যক্তিটি তার অচেনা নয়। মুনভি শুধু চায় মিহাল যেন রাগের মাথায় কোন ভুল সিদ্ধান্ত না নেয়।সে চায় মিহাল ইগোর সাথে লড়াই করতে সক্ষম হয়। এবং বিজয়ী হয়। তার জন্য না হয় সে একটু খারাপ হলো। নিজের বন্ধুর ভালোর জন্য কখনো কখনো নিজেকে খারাপ প্রমাণিত করতে হয়।
নিজের চিন্তা ভাবনা থেকে ফিরে এলো এবং নিজের আসল প্লেন মত কাজ করা শুরু করল।
সে নীলা কে কল করে বলল_
সরি ফর ডিস্টার্বিং কিন্তু বিকাল পাঁচটার বদলে বিকাল ৩ঃ০০ টায় দেখা করলে ভালো হতো।
নীলাও আপত্তি করল না। ফোন কেটে দিয়ে মুনভি নিজে নিজেই বলল____
এক দেড় ঘন্টা আগে গেলে নীলা কে অনেকটা সত্যি বলতে পারবো।আর নীলা যথেষ্ট বুদ্ধিমতি মেয়ে অবশ্যই আমার কথা বুঝবে এবং বিশ্বাস করবে। আর তাছাড়াও তো আমার কাছে প্রমাণ আছে সেগুলো না হয় সঙ্গে নিয়ে যাব। এবং এই সুযোগে নিজের কটন ক্যান্ডির কাছাকাছি থাকতে পারবো।
বিকেলে সেইন নদীর পানি সোনালী আলোয় ঝিলমিল করে, যা নদীর পাড়ের ঐতিহাসিক ভবনগুলোতে চমৎকার ছায়া ফেলে। ফুটপাতের ক্যাফেগুলোতে কফির সুগন্ধের সাথে ভেসে আসে মানুষের মৃদু গুঞ্জন, কেউ বই পড়ছে, কেউ বা শুধুই অলস সময় পার করছে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আইফেল টাওয়ারটি বিকেলে আভিজাত্যের সাথে শহরের দৃশ্যপটকে সাজিয়ে রাখে, যা সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। নদীর তীরে যুগলদের আনাগোনা এবং ভালোবাসার তালা ঝোলানোর দৃশ্য শহরটিকে এক অদ্ভুত রোমান্টিক রূপ দেয়।প্যারিসের এই বিকেল যেন শিল্পের শহরকে এক নতুন রূপে সাজিয়ে তোলে।
নীলা সঙ্গে করে ইকরা কে নিয়ে এসেছে।ইকরা আসতে চায়নি। সে বারবার বলেছিল_____
এইটা তোর পারিবারিক বিষয় আমি কেন এর ভেতর আসবো?
কিন্তু নীলা একই কথা বলেছে_____
আমি এত শত কিছু বুঝি না, তোকে আমি বিশ্বাস করা শুরু করেছি তাই তুই আমার সাথে থাকবি।
তারপর আর কি? অগত্যা ইকরাও আসলো নীলার সাথে।আর এখানেই তো তারা পিঠা বিক্রি করবে। তাই এখানে আসলে পরবর্তীতে জায়গাটা ভালো করে চিনে নিতে পারবে। সব সময়ের মতো এখনো দুজনের পরনে বোরকা হিজাব। হাতে পার্স। তিনটা বাজার ১০ মিনিট পূর্বে তারা এখানে উপস্থিত হয়েছে যাতে দেরি না হয়ে যায়। দুজন মিলে আশপাশ ভালো করে দেখে নিচ্ছে। বাংলাদেশের অনেক জায়গায় ঘোরাঘুরি করেছে, ইন্ডিয়াও গিয়েছে তারা। একেক জায়গায় সৌন্দর্য এক এক রকম। ঠিক তেমনি বিদেশের সৌন্দর্য ভিন্ন। বিশেষ করে প্যারিসের।প্যারিসের বুকে, সেইন নদীর তীরে আকাশচুম্বী আইফেল টাওয়ার যেন এক লোহার কাব্য।দূর থেকে দেখলে মনে হয় আকাশের সাথে আলিঙ্গন করছে, আর কাছে গেলে এর বিশালত্ব মানুষকে ক্ষুদ্র করে দেয়।
ইকরা কৌতুহলী হয়ে নীলাকে জিজ্ঞেস করল____
আচ্ছা নীলা তুই কি এই শহরের সম্পর্কে কিছু জানিস?
নীলা মুগ্ধ হয়ে তার পাশ দেখতে দেখতে বলতে শুরু করল__
প্যারিস শহরটি যদি একটি সুন্দরী নারী হয়, তবে আইফেল টাওয়ার তার মাথার মুকুটের সেই উজ্জ্বল রত্ন। ১৮৮৯ সালের বিশ্বমেলার জন্য নির্মিত এই কাঠামোটি প্রথমে সমালোচিত হলেও, আজ এটি শহরের আত্মার সাথে মিশে গেছে। এটি প্রায় ৮১-তলা ভবনের সমান, যা পেটা লোহার (wrought iron) তৈরি, যেন লোহা দিয়ে বোনা কোনো সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম।এটি কেবল একটি স্থাপত্য নয়, বরং একটি যুগের প্রতীক।যুদ্ধের সময় এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লেও, এটি আজও অটল দাঁড়িয়ে আছে, যা ভালোবাসার শহর প্যারিসের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জানান দেয় ।
ইকরার কান যখন নীলার কথা শুনতে ব্যস্ত চোখ তখন আকর্ষনীয় দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই পেছন থেকে পুরুষালি কন্ঠ ভেসে এলো। ইকরার বুঝে উঠতে সময় লাগলো না যে এটা তার জেন্টলম্যান। সে মুনভির কন্ঠস্বর খুব ভালো করে চেনে। মুখ ভরা হাসি নিয়ে পেছনে ফিরল। দুজনের চোখাচোখি হল। ইকরা সালাম দিলো মুনভি হাসিমুখে সালাম এর জবাব দিল। ততক্ষণে নীলাও মুনভি কে দেখলো।সে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলো।
মুনভি বলল_____
ব্রিজের কাছের খোলা কপি শপে গিয়ে বসে কথা বলি?
নীলা এবং ইকরা দুজনেই সায় দিল। তারপর তিনজন মিলে কি দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।
অন্ধকার রুমে চোখ, মুখ, হাত বাঁধা অবস্থায় পরে আছে এক তরুণী।আজ সকালে যখন ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল, নিরিবিলি রাস্তায় তার গাড়ির সামনে গাড়ি এসে থামল। রাগের মাথায় গাড়ি থেকে বের হতেই, অপর পাশের গাড়ি থেকে মুখোশ পরা কিছু লোক বের হয়ে তার মুখে কাপড় চেপে ধরে তাকে অজ্ঞান করে এখানে নিয়ে এলো। এখন বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে আছে সে। কোথায় আছে, কি করে আসলো এখানে, কেই বা আনলো এখানে এসব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তরুণীর। কিন্তু তার মস্তিষ্ক তাকে জানান দিচ্ছে সে এখন বিপদে আছে। ভয়ংকর বিপদে আছে।
চেয়ারে পায়ের উপর পা রেখে ক্রূর হাসছে এক পুরুষ।তার চোখের কোণে জমে থাকা হিংস্রতা কোনো পশুর চেয়ে কম নয়। সে ক্ষমতার এক অন্ধ নেশায় মগ্ন, যেখানে যুক্তি বা আইন—কোনো কিছুরই তোয়াক্কা সে করে না। তার প্রতিটি পদক্ষেপ মানেই একটা ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ”। তার সামনের একটি বর মিরর যেখানে অপর পাশের রুমে কি হচ্ছে তা সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। এবং দেখে পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে। জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল__
আমার নীলাঞ্জনা কে কষ্ট দিয়েছিস তুই, কাঁদিয়েছিস, হয়রানি করেছিস, চিন্তায় ফেলেছিস। তোকে তো তোর কর্মের শাস্তি পেতেই হবে। এত সহজে তো তোকে ছাড়বো না।আমার নীলাঞ্জনা কে অন্ধকার রুমে বন্দি করতে চেয়েছিলি তাই না? এখন নিজে বন্দি থেকে বোঝ কেমন লাগে।নরক যন্ত্রণা কাকে বলে এবং কত প্রকার তা তোকে বুঝাবো আমি।মিহাল খান নিজের সাথে হয়ে যাওয়া অন্যায় কখনো ভুলে না এবং অন্যায়কারীকে কখনো শাস্তি না দিয়ে খান্ত হয় না।আর নীলাঞ্জনা তো আমারই। তাই তার সাথে কিছু ঘটা মানে আমার সাথে ঘটা। এবং আমার ছোঁয়ায় আসলে সবকিছু ঝলসে যাবে। হতে পারে আমি নীলাঞ্জনার পেয়ারে লাল। কিন্তু অন্যদের জন্য লাল জলন্ত আগুন যাকে কেবল নীলাঞ্জনা নামক নীল শীতল বরফ ঠাণ্ডা করতে পারে।
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৩
নিজের স্থান থেকে উঠে বলল মিহাল। হাত ঘড়িতে নজর বুলালো। কেবল ৩ টার ১০ বাজে।এখন তাকে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে তৈরি হয়ে আবার আইফেল টাওয়ারের ব্রিজে যেতে হবে বিকাল সাড়ে চারটার ভেতর। তাই আর দেরি না করে স্থান ত্যাগ করল সে। অন্ধকার রুমে পরে রইল এক তরুণী যে জানে না এখান থেকে তার মুক্তি কবে।

পরের পর্ব কবে দিবেন 🙂😩🤌